রবিবার, মে ২৬, ২০১৯

পিনাকি

sobdermichil | মে ২৬, ২০১৯ |
ধূসর সন্ধ্যার রং
!১১!

ঘুম ভাঙতেই ,দানি চোখ খুলে দেখলও চারপাশ খুব শান্ত । পাখিদের সুর কানে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে । সবুজ কাঁচা ধানের জমির উপর চিত হয়ে শুয়ে , আকাশের বুকের দিকে চোখ রেখে কিছু খুঁজছিল ! ভোরে খুব হাল্কা আলোয় চারপাশ অদ্ভুত রকমের নিরীহ হয়ে উঠেছে । এখন সময় কত হবে ? মাথায় স্মৃতির শেষটুকু মনে করে দেখল , অজ্ঞান হওয়ার আগে সাধু বাবার মুখের অদ্ভুত পরিবর্তন দেখেছিল । সেই পরিবর্তন দেখেই সে ভীত হয়ে যায় । সাধুবাবা দানির হাত ধরে বলেছে – ব্যাটা ভয় নেই , তন্ত্রের জগতে যারা প্রথম প্রবেশ করে ;তোর থেকেও তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয় । অভিজ্ঞতা আসলে বড়রকমের মানসিক পরীক্ষা । যে জয়ী হয় ,সে মানসিক ভাবে শক্তিশালী হবে । তোকেও হতে হবে ।

দানি ভাবছিল সে ,একটা রাত স্বপ্ন দেখেছে । তবে তন্ত্রের যে অভিজ্ঞতা তার হয়েছে , এর আগে সে এমন কিছুযে এই জগতে রয়েছে , টেরই পায়নি । আগের রাতের অভিজ্ঞতা থেকে সে নিশ্চিত এইসব কিছু ভুল হতে পারেনা । তবে তার কাছে এখন রহস্য হচ্ছে -সে কেমন করে এই মাঠে এলো ? কেই বা নিয়ে এসেছে ? আর এই প্রশ্নের উত্তর সে তখনই পাবে , যখন সেই রহস্যময় সাধুর দেখা পাবে । 

দানি উঠে দাঁড়িয়ে দেখল দিনের আলো ক্রমশ ভারী হচ্ছে । এখন আর এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই । ঘরে ফিরতে হবে । মাঠের পথ দিয়ে হাঁটতে –হাঁটতে দানি ভাবছিল ,তাকে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো ;তা সত্যি না নিজের মনের খেয়াল ! আপাতত এই প্রশ্নটাই তাকে খেয়ে ফেলছে । আকাশের দিকে তাকিয়ে টের পাচ্ছে , সময় পরিণত হচ্ছে । সময় থেমে থাকেনা । মানুষ যখন অবসর নেয় , তখনো সময় এই সভ্যতার বুকে নিজের পদচিহ্ন এঁকে চলে । আমরা সকলে সে পদচিহ্ন দেখতে পাই ? পদধ্বনি কান পেতে শুনি ? এই মহাবিশ্ব , রহস্যময় । 

দানি ঘুম ভাঙবার পর থেকে এখন পর্যন্ত একটা বিষয়ে স্থির করতে পারল , সে একদিন আগেও একটা বিশেষ অনুভূতিহীন ছিল । আজ মনে হচ্ছে সে অনেক পূর্ণ ; ভবিষ্যতে অনেক কিছুর সাক্ষী হতে চলেছে ! হ্যাঁ যেমন দানির মন বলছে , গ্রামে আজ কিছু ঘটবে । মৃত্যুই হবে ,মনের ভিতর তেমনই একটা ভাবের খেলা সে টের পাচ্ছে । 

গ্রামের দিকে এগিয়ে চলেছে । সামনে পুকুরে মুখ ধুয়ে নিলো । বাড়ির দিকে এগিয়ে চলেছে । , গলির মুখে আসতেই কান্নার সুর ! হ্যাঁ , দানির সামনেই ভিড় জমেছে । দানি ভিড় ঠেলে একটা দৃশ্য দেখতে পাচ্ছে , পাশের বাড়ির সুবলার ছেলে ।হ্যা দুবছর বয়স ।ইস সুবলার দিকে তাকিয়ে ,বুকটা কেঁপে উঠল ।আকাশে লুকিয়ে থাকা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে দানি বলল – আরেকজন মায়ের কোল খালি করলে ! 

সারাদিন আজ এমন একটা বিশ্রী ভাব নিয়ে কাটাতে হবে । ছেলেটাকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে , দাহ করতে হবে । গ্রামের মোড়লরা মিলে ঠিক করেছে , এইসব দেহ গুলোকে না পুড়িয়ে বিশেষ এক স্থানে মাটিতে পুঁতে দিতে । আগুনে পুড়িয়ে তাদের নবাগত প্রাণকে কষ্ট দেওয়া । আর সবাই মিলে ঠিক করেছে , এই গ্রাম পুরোপুরি অভিশপ্ত প্রান্তর । এখানে থাকা যাবেনা । 

দানি ফাঁকা জায়গায় বসে সব কিছু দেখছিলও ।ভিড় মাটি খুঁড়ল । দেহটা পুঁতে দিলো ।মাটি চাপা দিয়ে চলে যাচ্ছে । তাকেও ফিরতে হবে । এখানে আর কতক্ষণ! এক গভীর চিন্তা গ্রাস করছে । এই যে রোগের প্রাদুর্ভাব , প্রকোপ ---এর হাত থেকে কেউ এই অসহায়দের বাঁচাবে ! 

দানি দেখলও আচমকা চারপাশে কোথা থেকে যেনও হাওয়া ছুটে আসছে ! হ্যাঁ , মাথার উপরে যে আকাশ ,সেখানে দুপুরের রোদ নেই । কিছুক্ষণ আগেও , এখানে লোক ছিলও । ঘড়িতে দুপুর দুটো । এখন সবাই ফিরে গিয়েছে ।বসে আছে একা দানি , সে এই লোক চলে যাওয়ার ব্যাপারটা খেয়াল করেনি । সবাই তাকে না বলেই চলে গেল ! এইবার ঝড় প্রচণ্ড হচ্ছে ,হ্যাঁ আরেকটা ব্যাপার সে খেয়াল করলো যে রকমের ঝড় হচ্ছে , সেই রকম ভাবে তার দেহ উড়ে যাচ্ছে না ! নিজে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ! এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার । দানির ভয় হচ্ছেনা ,তবে কৌতূহল উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে । 

এটা সে ঠিক দেখছে ! না নিজের মনের ভুল ! এই চারপাশে একটা প্রবল ঝড় উঠেছে , আর সেই ঝড়ে সব কিছু যেনও ঘূর্ণির মতন উঠেছে । সে নিজে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঝড়ের মধ্যে । সব কিছু অস্থির , উলটপালট । সেই হাওয়ার শব্দ কানের ভিতরে আছড়ে পড়ছে । যেনও এক প্রলয় । প্রকৃতি ক্ষুব্ধ , অথচ সে সেই প্রলয়ের মাঝেও দাঁড়িয়ে রয়েছে । নিশ্চল , অবিরত ,অনবরত ,নির্ভয় । একঅদৃশ্য মাধ্যাকর্ষন শক্তি তাকে আটকে রেখেছে ।এইবার ঘাড় নামিয়ে পায়ের তলায় দেখলও , আর তাতেই দানির চোখে বিস্ফোরণ হয়েছে ! একি ! পায়ের নীচে যে প্রবল ঘূর্ণি ছুটছে ,তা ধুলোর নয় , আগ্নেয়গিরির লাভার মতন । পাতালের এক গভীর লাভা ,আগুন , সব কিছু পায়ের তলায় ঘুরছে ।আশ্চর্য সে দাঁড়িয়ে রয়েছে , কিছুই হচ্ছে না । 

-কি রে ব্যাটা ভয় পেলি ?

আরে ! এ তো সেই স্বপ্নে দেখা নাগা সাধু ! হ্যাঁ দেহে বস্ত্র নেই । নগ্ন । মাথায় জটা । চোখ দুটো স্থির , শান্ত আর দৃঢ় । দানির দিকে তাকিয়ে রয়েছে । সেই চোখে যেনও অফুরন্ত অনন্ত আগুনের হল্কা । দানির দিকে তাকিয়ে বলল – এইসব কিছু তুই দেখছিস । তোরমন স্থির , খুঁজছে এইসব ঘটনার উৎস খুঁজছে । এর মানে জানিস ?

দানির দুই চোখে এখন সেই সাধুর চোখের আগুন । সে বলল – প্রণাম আপনি সেই রাতের স্বপ্ন !!

-হাঃহাঃ । স্বপ্ন তোর কাছে ? এখনো বিশ্বাস করছিস না ! তুই আমার চ্যালা হয়েছিস । তন্ত্র সাম্রাজ্যের অধিবাসী ।নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে শিখতে হয় রে মূর্খ । পৃথিবী ,জগত ,বিশ্ব ---এই বিশ্বাসেই টিকে রয়েছে । আমাদের দেহটার কোন অস্তিত্ব নেই ,সেখানে সময় থাবা বসায় । আমাদের বিশ্বাসই চিরনবীন ।একে কখনো নষ্ট হতে দিতে নেই । বিশ্বাস চলে গেলে , এই জগতে কিছুই থাকেনা । 

-আপনি বিশ্বাস ?আমার সামনে আমার বিশ্বাস রয়েছে ।

-আমিইতো বিশ্বাস ।আবার আমিই স্বপ্ন । স্বপ্নই বিশ্বাস । বিশ্বাস করে স্বপ্ন দেখা শিখতে হয় । তুই যেটাকে স্বপ্ন ভাবছিস ,সেটা সত্যি ।সত্যিকে বিশ্বাস করতে শেখ ।

- আপনি কে ? আর কেনইবা সেইদিন আমাকে সেই রহস্যময় স্থানে নিয়ে গিয়েছিলেন! তারপর আচমকাই অদৃশ্য হয়ে গেলেন! আবার আজ এখানে! আমাকে এই রহস্যময় পরিবেশের সত্যতা বলুন। আপনিই গুরু ,আমি চ্যালা পথ দেখান ।

-পথ কেউ দেখাতে পারেনা । সব মানুষের নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হয় । পৃথিবীটা একটা গোলক ধাঁধাঁ । আমরা সবাই ঘুরছি । তোর নিজের প্রতি বিশ্বাস আছে ? যদি থাকে ,তাহলে নিজের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে নিবি । আর এই উদ্দেশ্যই পথ দেখাবে । দেখ চারপাশে যে প্রলয় ,তা তোকে ছোঁয়নি ! এর কারন কী মনে হয় ?

-আপনার অলৌকিক আশীর্বাদ । 

-হা হা । একদম নয় । তোর বিশ্বাস । তন্ত্র সাম্রাজ্যে ,এই বিশ্বাসই আসল সম্পদ । তোর আগামি দিনে , এই সম্পদ পৃথিবীর মানুষের কাজে আসবে । নিজের সব কিছু ফুরিয়ে যাক , বিশ্বাস যেনও না হারায় । এই সম্পদ হারিয়ে গেলে ,তুই তোর শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় পাবিনা । 

-শত্রু ? বিজয় ? যুদ্ধ ? আমিতো কিছুই বুঝতে পারছি না । 

-আগে প্রস্তুত হয়ে নে । তারপর নিজের শত্রুদের ঠিক চিনতে পারবি । 

-কেমন ভাবে প্রস্তুত হবো ? কে বানাবে আমায় যোদ্ধা । আমার জীবনের উদ্দেশ্যও খুঁজবো কেমন করে !

-নিজেকে প্রশ্ন কর । উত্তর পাবি । 

-আজ সেই অজানা জ্বরে , আরেকজন শিশু মারা গেল ! দেখুন , ওইখানে আর সকলের মতন ওর দেহটাও পুঁতে দেওয়া হয়েছে । আমার গ্রামের ভবিষ্যত ধুলোয় মিশে যাচ্ছে । আমি দেখছি …

-কিছু করতে মন চাইছে না ? 

-আমি যে দুর্বল ! আমি চাইলেই যদি কিছু করতে পারতাম ,তাহলে করতাম । 

-কেন ? কিছু করতে মন চাইলে চুপ করে থাকবি ?

-কার বিরুদ্ধে লড়বো ? এই মৃত্যু নিয়তি নির্বাচিত । আমি সামান্য মানুষ , 

-নিজেকে সামান্য মনে করাটা দুর্বলতা । আত্মসমর্পণ করা । তুই যুদ্ধের আগেই হেরে বসেছিস । 

-না । আমায় সেই পথ বলুন । আর এই সবের পিছনে ,কে আছে ?

সাধু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন । বললেন – আজ , মধ্যরাত অতিক্রান্ত হলে ঠিক । এইখানে আসবি … 

দানি চারপাশে কুয়াশা দেখছে ।এই অসময়ে কুয়াশার রহস্য সে বুঝতে পারল না ! দেখলও , আকাশে ছিটেফোঁটা আলো নেই । এই ঢিবিটার চারদিকে অন্ধকার । আর অন্ধকারের মাঝে দানি একা ছায়া মানব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । তাকে ফিরতে হবে । রাতে এখানে আসবে । আজ রাতে অনেক কিছু ঘটতে পারে , মন বলছে । 

অনেক রাত , ঘরের বাইরে এসে দেখল চারপাশ কালো অন্ধকারে ভরে গিয়েছে । দূরে শেয়াল ডাকছে ।মাথার উপর আকাশ , সেখানে নক্ষত্র খচিত আসর বসেছে ! দানি আকাশে তাকিয়ে মনে –মনে বলল – এই জগত রহস্যময় । ওই তারাদের বুকে কত রহস্য আছে ,এই মাটির বাসিন্দা তার খবর রাখেনা ! প্রকৃতি কত ঠাণ্ডা , অথচ এই গ্রাম আবার কাল দিনের আলোয় কান্নায় ভিজে যাবে। মায়ের বুক ফাটা কান্নাতে কানে আঙুল দিয়েও রেহাই পাব না ! প্রতিবার যে যন্ত্রণা চারিদিকে , তা যেনও আমাকেও ছুঁয়ে যায় ! সেই স্পর্শে , প্রবল জ্বালা থাকে । মনে হয় গোটা দেহে বিদ্যুৎ খেলে গেলো !
যন্ত্রণা থেকে রেহাই নেই । এক বিষণ্ণতা দানিকে গিলে খেয়েছে । এই বিষণ্ণতা থেকে উদ্ধারের পথ সে জানেনা । দেশ এখনো স্বাধীন হয়নি । ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের লড়াই চলছে । সেই লড়াই , নিজেদের শোষন আর বঞ্চনাকে ঘিরে । শুধু তাই নয় ,ইংরেজ সরকারের অধীনে তারা যে দাস এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই । অবশ্য কবেইবা ভারতীয়রা স্বাধীন ছিল ? দানির জন্ম এমনই এক পরাধীন অবস্থাতেই । তখন অবশ্য মুঘল আমলের রমরমা আগের মতন নেই । সিপাহী বিদ্রোহের আঁচে সব কিছু ঝলসে গিয়েছে । এখন তার বয়স চল্লিশ । সাল ১৯০০ । আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে ছিলও ১৮৬০। তার জন্মের বছর। দানি নিজের বয়সের হিসেব এর জন্যই করলো ,সে এই দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ করে নিজেকে একজন দাস হিসেবেই পেয়েছে। সে এটাও বুঝতে পেরেছে , এইদাসত্ব ভারতীয়দের এতোটাই হীনমন্যতা প্রদান করেছে যে , তারা নিজেদের সংস্কৃতি ,কীর্তি নিয়ে মাথা ঘামায়না । অবশ্য এক পেট ক্ষিধে আর ধূসর দৃষ্টি নিয়ে কোন জাতিই তাদের ঐতিহ্য নিয়ে গর্বিত হতে পারেনা। দারিদ্রতা মানুষকে ছোট করে । সংকুচিত করে । তাই বলে দারিদ্রতা মানুষকে দুর্বল করতে পারেনা। পৃথিবীতে যে মানুষের কাছে টাকা নেই ,সে গরীব । তাইবলে গরীব মানুষ হারতে পারেনা । কেননা এখানে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে; যোগ্যতাই মানুষকে জীবনে এগিয়ে নিয়ে চলে। তারমানে টাকা ছাড়াও কিছু একটা আছে , যা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে । এই কিছুটা হচ্ছে বিশ্বাস । হ্যাঁ , প্রবল কষ্টের মধ্যেও যে লড়তে চায় । প্রবল ঝড়ের মধ্যেও যে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে । শত অত্যাচারেও যার মাথা নুইয়ে যায়না –সেই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবে । দানি যেনও খুব দ্রুতই নিজের পথ খুঁজে পাচ্ছে ! 

সে এগিয়ে চলেছে । এইসব ভাবতে –ভাবতে দানির মনে হচ্ছে ,এই পৃথিবীতে থাকলেও সে এক রহস্যময় জগতের বাসিন্দা হয়ে উঠছে । একজন চাষি সে । ছোটবেলাতে খুব বেশি পড়তে পারেনি ।পাঠশালাও যেতে পারেনি । ইদানীং নিজের মধ্যে এমন অনেক প্রশ্ন আসছে , যা প্রমাণ করছে --- তার ভিতরে অন্য এক বোধ এসেছে । সেই রহস্যময় সাধু তাকে যে জগতের কথা বলেছে , আগে বিশ্বাস না করলেও ; ইদানীং সে বুঝতে পারছে -- কিছু একটা আছে । চারপাশটা আমরা যেমন ভাবে দেখি ,তেমন ভাবে নয় । সব মানুষ যেমন একই ভাবে জীবন কাটায় না , একই ভাবে ভাবেনা --- তেমনই এই জগতের খোঁজের ইচ্ছাও সকলের মনে আসেনা । 

সেই রহস্যময় সাধু তাকে যেতে বলেছে ,যেখানে গ্রামের সব বাচ্চার মৃতদেহকে পোঁতা হয়েছে । 

হাঁটতে –হাঁটতে দানি সেই জায়গায় এসেছে , কিছুটা দূরে নিচু স্থানে তাকিয়ে রয়েছে । চোখ ভিজে আসছে । অনেক প্রাণ চোখের সামনে হারিয়ে গেলো ! দানি হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো । 

কিছুক্ষণ বাদে দানি উপলব্ধি করলো কানের পাশে অনেক শিশুদের শব্দ ! না শব্দ নয় তাদের পাতলা কণ্ঠস্বর ! হ্যাঁ , হাসছে তারা ।না কেউ আবার রাগের কণ্ঠ । কিন্তু এটা কি ? মানে এই ফাঁকা স্থানে ,এতো শব্দ আসছে কোথা থেকে ! দানি মাথা তুলতেই একটা অত্যাশ্চর্য দৃশ্য দেখল ! সামনে নীল আলোয় ছড়িয়ে গিয়েছে ! সে মাঠের মাঝখানে বসে রয়েছে , আর তাকে ঘিরে ধীরে –ধীরে ফুটে উঠছে নীল রঙের আলোর স্তম্ভ । সেখান থেকে প্রচণ্ড আলো এসে তাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে । সেই আলোয় সে দেখলও নিল নীল স্তম্ভ গুলো হাওয়ায় ভাসছে ।আর সেইসব ভাসমান আলোর স্তম্ভ গুলো ছোট –ছোট দেহ । না । এরা তার গ্রামের শিশু । তার মাথার উপরে ,দানিকে ঘিরে গোলাকার বৃত্তে ঘুরে চলেছে । আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে । 

এই দৃশ্যের প্রকৃত অর্থে অস্তিত্ব আছে কিনা বিশ্বাস করতে পাচ্ছে না । কেননা দানি ঘাড় তুলে যতদূর তাকিয়ে আছে , শুধুই মাথার উপর সেই অগুনতি বাচ্চার দেহ থেকে নীল আলো আসছে । এইসব মুখ তার পরিচিত নয় । তাহলে কোথা থেকে এসেছে ! কেনই বা এসেছে ? সে এখানে এসেছিলো রহস্যময় সাধুর সাথে দেখা করতে , তিনি নেই ;অথচ এমন অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে চলেছে ! দানি দেখলও আকাশে আজ এখন আগের দিনের মতন মেঘ নেই । না ঝড়ের কোন চিহ্নই নেই । চাঁদ শান্ত । আলোতে চরাচর ভেসে যাচ্ছে ! সেই আলোয় শিশুদের দেহ কেমন যেনও নীল রঙের হয়ে গিয়েছে । মনে হচ্ছে , নীল রঙের স্বচ্ছ থলিতে জল ভরে ,কেউ আকাশে ভাসিয়েছে !

এমন দৃশ্য দেখেও দানি জ্ঞান হারায়নি ! সে এখনো কিছু বুঝতে পারছে না । শুধু দেখছে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকা সেই নীল রঙের দেহ গুলো তাকে ঘিরে ধরেছে । সে মাঝখানে , আর তার চারপাশে অজস্র শিশুদের দেহ । সেখান থেকে হাল্কা স্বচ্ছ নীল আলো বেরিয়ে আসছে । এই ঘটনার কারণ জানা নেই ।

দানি বুঝতে পারছেনা , ওরা নিরীহ , তবে এক্ষুনি যদি আক্রমণ করে ! তাকেও সেই তুলনায় নিজেকে বাঁচাতে হবে । কিন্তু কেমন ভাবে ? এই চারপাশের চক্রব্যূহ থেকে নিজেকে উদ্ধার করবে কেমন করে ? ওরা তার দিকে এগিয়ে আসছে ? কিন্তু কেন ? সে নিজে বুঝতে পারছে না ! এরা কিছু বলবে হয়তো ? কিছু বলতে , কী বলবে ? সে নিজেকে পালানোর প্রস্তুত করছে । 

দানি মনে –মনে বলল - কিছু একটা গভীর ষড়যন্ত্র চলছে ! প্রথমে সেই রহস্যময় নাগা সাধু । তারপর দানির সেই রহস্যময় স্থানে যাওয়া । আর এখন এই সব কাণ্ড । সব কিছু একটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে ----- এই গ্রামে কিছু একটা শুরু হতে চলেছে । এই গ্রামে অদৃশ্য কোন শক্তি আছে , যে লুকিয়ে থেকে এইসব ঘটাচ্ছে । 

ওরা ধীরে –ধীরে দানিকে ঘিরে ঘুরছে । ‘দানি , ওরা কিছু বলতে চাইছে ’- ভারী কণ্ঠস্বরে পিছনে ঘুরে দেখলও সেই সাধু দাঁড়িয়ে আছেন , পিছনেই । বললেন – ভয় নেই , এরা সূক্ষ্ম আত্মা । তোর ক্ষতি করবে না । 

-আপনি !

-আমিতো এখানেই তোর সাথে দেখা করবো বলেছিলাম । আমি এসেছি ।

-আমিও এলাম ।

-না এসে থাকতে পারবিনা ,আমি জানতাম । তুই আসবি । 

-এরা কারা , প্রভু এরা আমাকে ঘিরে ধরেছে কেন ?

-ধুস বোকা । তোকে কেন ঘিরে ধরবে ! এরা এখানেই থাকে ,আমরাই ওদের স্থানে চলে এসেছি ।

-মানে ?

- দেখ ভালো করে দেখ , ওদের দেহ নয় ওটা স্বচ্ছ আত্মা। ওদের মুক্তি হয়নি। তাই প্রতি রাতে এখানে ওরা ঘুরে বেরায় । দিনের আলো তে আত্মগোপন করে । 

-কিন্তু কেন ?

-মুক্তি হয়নি বলে । এই যে নীল রঙ দেখছিস ,ওরা পবিত্র । তাই দেখছিস । স্বচ্ছতা ওদের পবিত্রতাই । দেখো , তুই ওদের দেখতে পাচ্ছিস ।আমিও দেখছি ।আমরা দুজনেই দেখবো । আর কেউ দেখতে পারবে না । 

-কিন্তু কেন ?

- পৃথিবীতে সব কিছু দেখবার নিজস্ব দৃষ্টি থাকে। তোকে সেই বিশেষ দৃষ্টি অর্জন করতে হবে যদি তোর কাছে থাকে,তখন যা দেখবি প্রথমে সেই দেখাকে বিশ্বাস করতে অসুবিধা হবে। কিন্তু বিশ্বাসই আসল ,সেটা যেনও না হারায় ।

-এরা এখানে কেন ?

-ওদের দেহ যে পুঁতে রেখেছে এখানে ।

-আমাদের তাই তো নিয়ম । 

-তাই বুঝি ? তা কেন ?

-অত শিশু ,তাদের গায়ে আগুন দেবো !

-শুধুই তাই ? 

-আমি জানিনা , তবে গ্রামের মোড়লরাই এইসব বলেছে । আমরা শোকে ভেঙে পড়েছি । জানিনা এই অভিশাপ থেকে নিজেদের গ্রামকে মুক্ত করবো কোন পথে ! 

-তন্ত্র । এটা অভিশাপ নয় ,নিয়তি নয় । এটা প্রতিশোধ । 

-মানে ? কে প্রতিশোধ নেবে ? কাদের বিরুদ্ধেই বা নেবে ? আমি কিছু বুঝতে পারছি না ।

-সব বুঝতে পারবি । তুই এখন আর সাধারণ মানুষ নেই । তোর দায়িত্ব অনেক । 

-আমি কে ? আমার দায়িত্ব বা কী ? আমার উদ্দেশ্য আপনি আমাকে বলুন ।

-সব কিছু জানতে পারবি । সব কিছু বুঝতে পারবি । এখন নিজেকে প্রস্তুত কর ।

-কিসের জন্য ? 

-লড়াইয়ের জন্য । এই যে অদৃশ্য জগত ,যেটার সন্ধান তুই পেয়েছিস । আমি যেই জগতের কথা তোকে বলছি । এই জগতই আসল । বাকী সব মায়া । তন্ত্র সাম্রাজ্যে এক যুদ্ধ আসন্ন । সেই যুদ্ধে তুই আমাদের সাথ দিবি । 

দানি হাত জোর করে হাঁটুভাঁজ করে নাগা সাধুর পায়ের কাছে বসলো । বলল – প্রভু আমি অজ্ঞ আমাকে বলুন , আগের দিন তন্ত্র নিয়ে বলেছিলেন , কিন্তু সেখানে ক্ষমতা দখলের ব্যাপার কোথা থেকে আসছে ! কাদের হাতে এই সাম্রাজ্য নিরাপদ নয় ? আর ভবিষ্যতে এর সাথে আমার সম্পর্ক কী ?

নাগা সাধু হাসছে । বলল – তাহলে আজ থেকে কয়েক শো বছর আগে এক ঘটনায় ফিরে যেতে হবে ।ওই দিকে গিয়ে আমরা বসি । আয় ,এরা এখানে খেলা করুক ।

নাগাসাধু আর দানি নদীর ধারে গিয়ে বসলো । সামনেই পাতলা স্রোতের নদী বয়ে যাচ্ছে । আকাশে চাঁদের আলো নদীর জলে এসে এমন ভাবে মিশেছে , যেনো কোন প্রেমিক শায়িত প্রেমিকার জঙ্ঘা স্পর্শ করেছে ! প্রকৃতি নিজের মতন সেজে নিয়েছে ।

দানি আর নাগা সাধু পাশাপাশি বসেছে । নাগা সাধু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল – 

আজকের এই অবস্থার পিছনে সেই সময়ের ঘটনাই দায়ী । কোন ইতিহাস বইয়ে এই অতীতের কথা পাবিনা । ভবিষ্যত প্রজন্ম জানতে পারবে না , তন্ত্রের ইতিহাস । ভারতবর্ষে ইতিহাস কখনই নিরুপেক্ষ নয় । , আর আগামীতেও নিরুপেক্ষ ইতিহাস লেখা হবে না । এটা পৌরাণিক সময়ের কথা , কেউ এই কথা বিশ্বাস করেনা । ঈশ্বর , তন্ত্র আর পৌরাণিক গল্প --- ভারতীয় সভ্যতার রন্ধ্রে –রন্ধ্র । তাই মন দিয়ে শুনবি , সত্য , ক্রেতা দ্বাপর , কলি --- এই চারটি যুগে সভ্যতা চলছে । 

১২ 

তখন এই যে ভূখণ্ড ,সেই ভূখণ্ডে অনেক বড় যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে । কুরুক্ষেত্রে যে বিপুল পরিমাণে রক্ত ঝরেছে , তাতে ভারতবর্ষ এতো ভিজেছে ,যে কয়েক বছর খরা হলেও , রক্তের দাগ শুকোবে না । আমার এই কাহিনী তেমনই এক অখ্যাত গ্রাম থেকে শুরু হচ্ছে , সেই গ্রামের নাম শম্ভল গ্রাম । সেখানে সুমতি আর বিষ্ণুযশা নামে ব্রাহ্মণ দম্পতি বাস করতেন । তাঁদের তিন জন সন্তান ছিলও , কবি ,প্রাজ্ঞ আর সুমন্তক । গ্রামটি খুব শান্ত । মানুষের মধ্যে তখনো ভালোবাসা , সহানুভূতি রয়েছে । চারপাশে কিন্তু এক দমবন্ধ পরিবেশ । মানুষে –মানুষে হানাহানি শুরু হয়ে গিয়েছে । ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ , প্রেম সব যেনও হারিয়ে গেলো ! আগে মানুষ ধর্ম মানে সরল ভাবে ঈশ্বরকে ডাকতো । উপাসনা করতো , এখন ধর্মের লক্ষ্যই নিজের মতাদর্শ বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া । সন্ত্রাস তৈরি করা । জাতিবিদ্বেষ । এক নতুন ধর্মমতকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে , আর এই সব কিছু হচ্ছে মানুষকে ভয় দেখিয়ে । রাষ্ট্র ছিলও , ভূখণ্ড ছিলও , রাজাও আছে ---- কিন্তু অভাব হচ্ছে দেশের প্রতি ভালোবাসার । রাজা যদি দেশ হয় তা হলে রাজার প্রতি অনুগত থাকতে হতো । সেই হওয়াটা অনেকেই মানতে পারছিলো না । তারা অবাধ স্বাধীনতা চাইছিল , আর এই চাওয়ার সুযোগ নিয়েই এই দেশটাকে নিজের মতন করে শাসন করবার স্বপ্ন দেখলও কেউ –কেউ । এই কেউই ভবিষ্যতে গিয়ে খুব বড় বিপদের কারণ হয়েছে । পুরাণ এমনই এক সময়কে কলি বলেছে । এই যুগ কলি যুগের শুরু হয়ে গিয়েছিলো । জগতে ঈশ্বরের পাশাপাশি অশুভ শক্তির উপস্থিতি ছিলও , আর কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থেই শয়তানকে আহ্বান করতে শুরু করলো । 

এমনই এক সময়ে , সুমতি এক সকাল বেলা উঠোন ঝাড় দিচ্ছিল । সে দেখলও , মাটির দরজার উল্টো দিকে গৌর বর্ণের একজনজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে । সুমতি দেখলও , সাধু কিছু পড়েনি , মাথায় জট । সে সুমতির দিকে তাকিয়ে বললেন – সে আসছে । এই এখান থেকেই শুরু হবে তার কীর্তি । পরিত্রাতা ।

সুমতি কিছু বুঝতে পারলো না । সে সরল মা । এই সাধুটিকে দেখে , মনে মনে সেবা করবার ইচ্ছা হচ্ছে । 

সাধু সুমতির দিকে তাকিয়ে বলল – যাকে তুই পেটে ধরবি ,সেই ভবিষ্যতে এই বিশ্বকে মুক্তির পথ দেখাবে । তুই যে তার মা । তোর সেবা নিতে পারবো না ।

সুমতি অবাক হয়ে গেল ! এই ভোরে এমন এক আত্মভোলা সাধু ,এসেছে । তাঁকে সেবা করবার যে ইচ্ছা তা পূরণ হবে না!

সাধু বললেন - এই হানাহানির পরেও শয়তান জেগে উঠবে । কলি জেগে উঠছে ।

সুমতি কিছু বুঝতে পারলো না । সাধুর পা ছুঁতে গেলেই , সাধু পা সরিয়ে নিয়ে বলল – মা , তুই কেনও পা ধরবি । আমরাই ধরবো । শয়তানের হাত থেকে উদ্ধার পেতে , আসছে ...

সুমতি কিছুই বুঝতে পারছে না । সে বলল – বাবা , আপনি বসুন আমি জল আর বাতাসা আনছি ।

সাধু বলল – আমি আসবো । এখন নয় । শুধু বলতে এসেছি , তুই কিছুদিন বাদেই মা হবি । তখন তুই বুঝতে পারবি । এই সন্তান , যেমন তেমন নয় । এক যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে । 

সুমতির মুখে লজ্জার নরম ছাপ । এক আগন্তুকের মুখে , নিজের ব্যক্তিগত বিষয় শুনে ভারতীয় নারীদের মনে , যতটা লজ্জা দেখা যাবে , ততটাই হতো । কিন্তু নাগা সন্ন্যাসী ভারতীয় সমাজে সন্তানের মতন । এরা আর পাঁচ জনের থেকে আলাদা । সুমতি এতক্ষণে বুঝে গিয়েছে ,এই নাগা সাধারণ সাধক নন । কেননা সে সুমতির মনের ভিতরের কথা টের পেয়ে গিয়েছেন ! এখন তার ভিতরে যে প্রশ্নটা আসছে তা হলও – সুমতির সন্তানের সাথে ভবিষ্যতের কোন গভীর যোগাযোগ আছে ! সে কেমন হবে ? আর কোন শয়তানের বিরুদ্ধে লড়বে ?

সব কিছুর সাথে আর এই নাগা সাধুটির সাথে সুমতির প্রায় আগত সন্তানের ভবিষ্যত কোন সূত্রে বাঁধা ? তাহলে বিধাতা কোন বিশেষ রহস্যের জন্ম দিচ্ছে , যা এই সাধক পূর্বাভাস পেয়েছেন ! 

সে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিল । খেয়াল হতেই দেখলও , বাইরে কেউ নেই ! নাগা সাধক এখানেই ছিলেন । গেলেন কোথায় ! সুমতির শরীরটা খারাপ লাগছিলো । বাড়ির ভিতর মাটির উঠোনে গিয়ে বসল । 

(ক্রমশ ............) 


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-