Sunday, May 26, 2019

অভিজিত পাল

sobdermichil | May 26, 2019 | |
ভারতভূমির নিবেদিতা : নিবেদিতার ভারতভূমি
১৮৬৭, ২৮ অক্টোবর ইউরোপের প্রখ্যাত শহর ইংল্যাণ্ডের লাগোয়া একটি শান্তিপূর্ণ ছোট দ্বীপভূমি আয়ারল্যান্ডে জন্ম হয়েছিল শ্বেতপদ্মের একটি সুন্দর কলির। এই সেই অপাপবিদ্ধ শ্বেতপদ্মের কলি যাঁর কর্মময় পূর্ণরূপ প্রাচ্যভূমি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের পৃষ্ঠায় অতি যত্নে সুশোভিত, এই সদ্যজাত কলিটিরই নাম মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। এই মার্গারেটই তাঁর জীবন নিবেদিত করতে পেরেছিলেন ভারতের সেবায়, ভারতবাসীর সেবায়। ইনিই সেই অগ্নিপ্রাণা রুদ্রাণী, ভারতভূমিকে যিনি ভালোবাসতে পেরেছিলেন নিজের সত্তার সঙ্গে মিলিয়ে। অনেক সাধনার মধ্যে দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন একজন সত্যিকারের ভারতাত্মজা, ভারতের নিজের মেয়ে। তিনি আমাদের নিবেদিতা। পিতামহ জন নোবেল ছিলেন প্রগাঢ় দেশপ্রেমিক, ছিলেন নিষ্ঠাবান মুক্তমনা ধর্মযাজক। জন নোবেলের যথার্থ অর্ধাঙ্গিনী ছিলেন মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নীলাস। পিতামহীর নামের সূত্রেই নিবেদিতা তাঁর মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল সন্ন্যাস-পূর্বনামটি পেয়েছিলেন। ধর্মপ্রাণ জন নোবেলের পুত্র স্যামুয়েল রিচমণ্ড নোবেল ও মেরী ইসাবেল হ্যামিলটন পবিত্র বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হলে মার্গারেটের জন্ম হয়। প্রগাঢ় ইচ্ছাশক্তি, নিখাদ দেশপ্রেম ও সুগাঢ় ধর্মনিষ্ঠার যে ধারাবাহিক স্রোত তাঁর পূর্বপুরুষ ও পূর্বনারীর রক্তে দীর্ঘদিন ধরে প্রবাহিত ছিল, তা স্বাভাবিক নিয়মে এই পরিবারে জন্মসূত্রেই মার্গারেট পেয়েছিলেন এবং বহন করেছিলেন নিজের জীবনযাপনের প্রতিপদে চিরকাল। আকাদেমিক ছাত্রীজীবনের সিঁড়ি পার হয়ে প্রাপ্তবয়স্ক মার্গারেট যখন আয়ারল্যাণ্ডের ভূমিতে নিজেকে গড়ে তুলছিলেন, তখন তাঁর দু'চোখের সামনে অনেক স্বপ্ন, অনেক অনেক কাজ, নিজেকে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের কাজে লাগানোর অসীম ইচ্ছা এবং অনন্ত প্রত্যাশা। কেসউইক অঞ্চলে কর্মজীবন শুরু করে তাঁর মনে হয়েছিল পৃথিবীতে মানুষ বড় কাঁদছে, সেই ক্রন্দনরত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোটা এই সব তাঁর আত্মকেন্দ্রিক আপাত স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে অনেক বেশি করে প্রয়োজন। সঠিকভাবে নিজেকে নিজে বুঝতে পারাটা একজন মানুষের পক্ষে তার সমগ্র জীবন সম্পর্কে সঠিক পথ অনায়াসে তৈরি করে দিতে পারে। মার্গারেট নিজেকে নিজে যথেষ্ট ভালো বুঝতেন, তিনি কর্মজীবনের শুরুতেই অনুভব করেছিলেন পড়ানোর কাজে তিনি আনন্দ পান সবচেয়ে বেশি, তিনি বুঝতে পারছিলেন অন্য পেশার কাজে তিনি এতটা মানসিক তৃপ্তি পাবেন না। রাগবির অনাথ আশ্রমের অনাথ মেয়েদের অগাধ সাহস ও যথার্থ শিক্ষা দিয়ে গড়ে তোলার প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে কর্মমুখর জীবন শুরু করেন এই বিদ্যাব্রতী। এর পরবর্তী সময়ে রেক্সহ্যাম, চেস্টার, লন্ডন শহরে তিনি পর্যায়ক্রমে তাঁর প্রাথমিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যান। পাশ্চাত্যে সেই সময় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, নিরীশ্বরবাদ, যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ, লোকহিতবাদ, ঐহিকতা, প্রত্যক্ষ ধ্রুববাদ, স্বদেশপ্রেম, নারীমুক্তির মতো আধুনিক বিষয়। তরুণী মার্গারেটের কাছেও তা অজ্ঞাত ছিল না। এছাড়াও সিগমুন্ড ফ্রয়েড, চার্লস ডারউইন, কার্ল মার্কস, জন স্টুয়ার্ট মিল, ডেভিড হিউম সহ আরও বেশ কয়েকজনের তত্ত্ব ও ভাবনার প্রভাব ক্রমশ সারা পৃথিবীর নব্যশিক্ষিতদের মানস চালচিত্রে কমবেশি দাগ ফেলতে শুরু করে। সম্ভবত এই সময়পর্বেই মার্গারেট ভেতরে ভেতরে একটা আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের সন্ধান করছিলেন। সেই আধ্যাত্মিক আশ্রয় তিনি জন্মসূত্রেই খুঁজে পেয়েছিলেন মানবতার পরম মূর্তি যীশুর মধ্যে। এর সঙ্গেই তিনি আরেকটি আশ্রয়ের সন্ধান পেয়েছিলেন ভারতীয় সভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহামানব গৌতমবুদ্ধের মধ্যে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অহিংসা ও জ্ঞানের প্রতীক গৌতমবুদ্ধের প্রতি মার্গারেটের এই অনুরাগ সারাজীবন বহাল ছিল। তাঁর কলকাতার বাগবাজার অঞ্চলের বাড়িতেও ছিল একটি সুন্দর বুদ্ধমূর্তি, যার উল্লেখ বহু গ্রন্থে পাওয়া যায়। এমনকি শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর আঁকা নিবেদিতার ঘরের একটি স্কেচেও সেই বুদ্ধমূর্তির বিশেষ অবস্থান দেখা গেছে। পাশ্চাত্যদেশের মহামানব যীশু ও প্রাচ্য ভারতের মহামানব বুদ্ধদেবের এক অপূর্ব সমন্বয় অনেক আগে থেকেই ঘটতে শুরু করেছিল তাঁর জীবনচর্চায়। তখনও শ্রীরামকৃষ্ণ বা বিবেকানন্দ নামদুটির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়নি। পৃথিবীর ইতিহাসের এই দুই প্রাচীন মহৎ মানব আদর্শের আশ্রয়ের সঙ্গে সঙ্গে মার্গারেট মনে মনে সন্ধান করতে শুরু করেছিলেন এমনই এক মহানুভব মানবের, যিনি হবেন একদম নতুন, একেবারে সমসাময়িক একজন, যাঁর বিদ্যাচর্চা, জ্ঞানচর্চা, মুক্তমন, চিন্তা-চেতনা থেকে আধ্যাত্মিক ধ্যানধারণা সবটাই হবে সময় ও যুগোপযোগী, যিনি হবেন পৃথিবীর অখণ্ড মানবাত্মার রক্তমাংসের মূর্তবিগ্রহ! মার্গারেট বহুদিন ধরে সন্ধান করছিলেন মূর্তিমান মানব সভ্যতার অখণ্ড সত্যের, চিরন্তনী ধ্রুবের, আবহমান ঋতের।

শেষাবধি সেই অমোঘ দিনটি এল। নভেম্বর মাসের একটি রবিবার, ১৮৯৫ সাল। মার্গারেট তাঁর অন্যতম অন্তরঙ্গ বান্ধবী লেডি ইসাবেলের বাড়িতে একটি ঘরোয়া বৈঠকে উপস্থিত হলেন। ভরা ঠান্ডার সন্ধ্যায় লন্ডন শহরের ওয়েস্ট এন্ড-এ পনেরো-ষোলো জনের সেই ছোট ঘরোয়া আলোচনা সভায় মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল তাঁর এত দিনের অনুসন্ধান ও ভাবনাকে প্রথম জীবন্ত ও পূর্ণরূপে পেতে দেখলেন। কিন্তু আবেগে ভেসে না গিয়ে বুদ্ধি ও বিচারের কষ্টিপাথরে সবকিছু যাচাই করে নিয়ে আস্থাবান হতে চাইলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বিগত প্রায় সাত বছর ধরে যে পার্থিব মহামানবের অনুসন্ধান করছিলেন, যেন মিরাকেলের মতো খুঁজে পেলেন তাঁকে। সেই সভায় এসেছেন এক তরুণ ভারতীয় উপমহাদেশের সনাতন হিন্দু সন্ন্যাসী। যাঁর মধ্যে তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণের সূত্রে পাওয়া প্রাচীন ভারতের অধ্যাত্মচর্চার সারাংশ ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি অপূর্বভাবে মিশে রয়েছে তাঁর নিজস্ব আধুনিক মেধা, শিক্ষা, ভাবনা, চিন্তা-চেতনা ও মনন। যিনি ইতিমধ্যে বিশ্বধর্মসভায় যোগ দিয়ে ভারতের আনন্দ বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বের শুভ শক্তির দরবারে। যিনি ভরা সভায় ঘোষণা করেছেন তাঁর দেশ ভারতভূমি গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে কতটা অবদানের দাবিদার। সেই দেশের ধর্ম—সনাতন বৈদিক হিন্দুধর্ম কতটা ভালোবাসার ধর্ম, কতটা প্রেমের ধর্ম। তিনি জানিয়েছিলেন শক্তি ও শান্তির সহাবস্থানকারী ধর্মের কথা। সেই তরুণ ব্যক্তিত্বময় প্রাজ্ঞ সন্ন্যাসীর নাম স্বামী বিবেকানন্দ। সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যের একটি সরল বর্ণনা দিয়েছেন নিবেদিতা গবেষক প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা :

সন্ন্যাসীর পরিধানে গৈরিক পরিচ্ছেদ, আকৃতি উজ্জ্বল ও বীরত্বব্যঞ্জক, প্রবল ব্যক্তিত্বপূর্ণ আয়ত নয়ন; আর প্রশান্ত আননে বাফেল-অঙ্কিত দিব্য শিশুর কমনীয়তা!

অপরাহ্ন শেষ হইয়া গোধূলি ও অন্ধকারের মিশন এক অপূর্ব তন্ময়তা সৃষ্টি করিল। বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে সন্ন্যাসী প্রায়ই সংস্কৃত শ্লোক সুর করিয়া আবৃত্তি করিতেছিলেন। এই সুরের ঝঙ্কার ইংলণ্ডের গীর্জা গুলিতে প্রচলিত গ্রিগরি-প্রবর্তিত সুরের কথা মনে করাইয়া দেয়, অথচ উহা হইতে কত ভিন্ন! ক্রমে সন্ধ্যা গাঢ়তর হইয়া আসিল। স্বামিজী মাঝে মাঝে 'শিব!' 'শিব!' বলিয়া উঠিয়েছেন। সমস্ত পরিস্থিতিই নূতন; পাশ্চাত্য জীবন-যাত্রার সহিত কোন অংশে সঙ্গতি নাই, অথচ কী গভীর চিত্তাকর্ষক!১

স্বামী বিবেকানন্দের বক্তব্যে উঠে আসা ধর্ম ও কর্মের মেলবন্ধন প্রাণিত করেছিল নিবেদিতাকে। এই প্রথম সাক্ষাতের দিনে অজ্ঞাতে ও অচিরেই ঘটে গেল মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলের আগামী জীবনের পট পরিবর্তন। মার্গারেট নোবেলের অন্তর্যামী দেবতা হয়তো তাঁকে সেই মুহূর্তেই ভেতর থেকে বলেছিল তাঁর নবজীবন আসন্ন। মার্গারেট সেদিন লহমায় বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যে সেবাময় কর্মমুখর অথচ একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক জীবনযাত্রা চান, তার সঠিক সন্ধান দিতে পারেন এই তরুণ ভারতীয় সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ। মনে অপার শ্রদ্ধা নিয়ে কর্মযোগী মার্গারেট সেদিন থেকেই বিবেকানন্দের অনুগতা। স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে মার্গারেট যোগাযোগ রাখতে শুরু করেছিলেন। মার্গারেট ভারতভূমির সেবার জন্য প্রথম ভারতাগমনের পূর্বে স্বামী বিবেকানন্দকে তাঁর প্রেরিত চিঠির উত্তরে ক্ষুদ্র-দীর্ঘ মিলিয়ে মোট দশটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পেয়েছিলেন।২ অনুমান করা যেতে পারে, এই চিঠিগুলি থেকেই প্রত্যক্ষত ভারতভূমির ঐতিহ্য ও ভাবনাবিশ্ব বুঝতে বুঝতে ও জানতে জানতে ক্রমশ ভারতভূমিকে ভালোবাসাতে শুরু করেন তরুণী মার্গারেট নোবেল। তিনি সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন তিনি যেভাবে বহুজন হিতের বার্তা বহন করতে চান, তার আদর্শ ক্ষেত্র সেই মহৎ ভারতভূমি। অতএব ভারতে যাওয়া তাঁর জরুরী। এবার লক্ষ্য সেই বিবেকানন্দেরই স্বদেশ, সুদূর প্রাচ্যদেশ ভারতভূমি!

মার্গারেট স্বামী বিবেকানন্দের মতাদর্শে প্রাণিত হয়ে ভারতভূমিকে ভালোবাসতে শুরু করেন। নিজের পূর্বপুরুষ পূর্বনারী পরিজনদের ভূমি ত্যাগ করে ভারতে যাওয়ার জন্য স্বামী বিবেকানন্দের কাছে আর্জি ও আবেদন জানান। স্বামী বিবেকানন্দ আবেগ আর কর্মপদ্ধতির সহাবস্থান ও বিরোধ উভয়কেই নিজের জীবন দিয়ে জানতেন, তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয়নি বিদেশিনী মিস মার্গারেটের ভারতাগমনের এই ইচ্ছে জুড়ে আছে হৃদয়মথিত সেবার আবেগ, ভারতেরকর্কশ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মার্গারেট প্রায় কিছুই জানেন না। স্বামীজি পাশ্চাত্যে বারবার ভারতের শুভ দিকগুলি তুলে ধরেছিলেন, জ্ঞানত তিনি তৎকালীন ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলি প্রকাশ করতে চাননি। এর কারণ হিসেবে তৎকালীন বিশ্বের দরবারে ভারতের পরিচয়টি স্মরণযোগ্য। ভারত তখনও অসভ্য, অসংস্কৃত, কালো বর্বর মানুষের দেশ হিসেবে অনেকাংশে পরিচিত ছিল। স্বামীজি তাঁর স্বদেশ সম্পর্কে এই কদর্য ভাবনাগুলির বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ভারতের শুভ দিকগুলিরপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। বিদেশি সভ্যতার চোখে ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও প্রাচ্য-ধর্মের প্রতি ভ্রান্তিকে দূর করতে স্বামীজির এই প্রয়াসকে বাস্তবিকই সময়োপযোগী বলা উচিত মনে হয়। কিন্তু মার্গারেট ভারতে আসতে চাইছিলেন সাময়িক ভারত-ভ্রমণেরজন্য নয়, সেবার মনোভাব নিয়ে স্থায়ী বসবাসেরজন্য। তাই ভারতে আসার আগে ভারত সম্পর্কে তাঁকে সবটাই জানানো প্রয়োজন ছিল। ভারতভূমি সম্পর্কে কোনো অলীক কল্পনা নিয়ে মার্গারেট ভারতে আসুন তা স্বামীজি চাননি। ১৮৯৭ সালের ২৯শে জুলাই আলমোড়া থেকে স্বামী বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে চিঠি দিয়ে জানান ভারতের কিছু নঞর্থক দিক, পাশাপাশি এটিও জানান এই সব কিছু জেনে, ভয় না পেয়ে যদি মার্গারেট ভারতে আসেন, তবে ভারতের বাস্তবিক উপকারই হবে। স্বামীজি তাঁর স্নেহের মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলকে সেই ঐতিহাসিক চিঠিতে লিখছেন:

...মিস মূলারের কাছ থেকে তোমার কর্মপ্রণালী সম্বন্ধে যা জানতে পারলাম, তাতে এ পত্রখানিও আবশ্যক হয়ে পড়েছে; মনে হচ্ছে, সরাসরি তোমাকে লেখা ভাল।

তোমাকে খোলাখুলি বলছি, এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে যে, ভারতের কাজে তোমার এক বিরাট ভবিষ্যৎ রয়েছে। ভারতের জন্য, বিশেষতঃ ভারতের নারীসমাজের জন্য, পুরুষের চেয়ে নারীর—একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন।... তোমার শিক্ষা, ঐকান্তিকতা, পবিত্রতা, অসীম ভালবাসা, দৃঢ়তা—সর্বোপরি তোমার ধমনীতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্য তুমি ঠিক সেইরূপ নারী, যাকে আজ প্রয়োজন।

কিন্তু বিঘ্নও আছে বহু। এদেশের দুঃখ, কুসংস্কার, দাসত্ব প্রভৃতি কি ধরণের, তা তুমি ধারণা করতে পারো না। এদেশে এলে তুমি নিজেকে অর্ধ-উলঙ্গ অসংখ্য নরনারীতে পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে। তাদের জাতি ও স্পর্শ সম্বন্ধে বিকট ধারণা; ভয়েই হোক বা ঘৃণাতেই হোক—তারা শ্বেতাঙ্গদের এড়িয়ে চলে এবং তারাও এদের খুব ঘৃণা করে। পক্ষান্তরে, শ্বেতাঙ্গেরা তোমাকে খামখেয়ালী মনে করবে এবং তোমার প্রতিটি গতিবিধি সন্দেহের চক্ষে দেখবে।

কর্মে ঝাঁপ দেবার পূর্বে বিশেষভাবে চিন্তা করো এবং কাজের পর যদি বিফল হও কিংবা কখনও বিরক্তিআসে, তবে আমার দিক থেকে নিশ্চয় জেনো যে, আমাকে আমরণ তোমার পাশে পাবে...

স্বামীজির এই সম্পূর্ণ চিঠিটিতে তৎকালীন ভারতের যে বাস্তব ছবি আঁকা রয়েছে তা ঐতিহাসিকরাও স্বীকার করতে বাধ্য। চিঠিটি যেন এক ভয়ঙ্কর সত্যির মুখোমুখি হতে সাহায্য করে। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, মার্গারেট যদি শুধুমাত্র আবেগ তাড়িত হয়ে ভারতের প্রতি আকর্ষণ বোধ করত তবে তিনি ভারতে আসবার পরিকল্পনা এই চিঠিটি পাওয়ার পর থামিয়ে দিতেন। আমাদের অনেক সৌভাগ্য যে, তা ঘটেনি। এই চিঠিটিতে স্বামী বিবেকানন্দের এই আহ্বানবার্তা ও অভয়বার্তা পেয়ে মার্গারেট ভারতে আসবার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেন। তিনি অন্তর থেকে বুঝেছিলেন, মানুষের সেবা যদি করতেই হয়, তবে সেই দেশেই তাঁর যাওয়া দরকার যে দেশেরমানুষের সেবার প্রয়োজন অনেক গুণে বেশি। অতএব এবার কেন্দ্র ভারতবর্ষ। কিছুদিনের মধ্যেই স্বামী বিবেকানন্দকে মার্গারেট জানান তিনি ভারতে আসছেন। ১৮৯৮ সালের ২৪শে জানুয়ারি সকাল দশটায় মাদ্রাজ বন্দরে মার্গারেটদের বিদেশি জাহাজ 'মম্বাসা' এসে থামল। এই তাঁর সেই ভারতভূমি! তারপরের দিন আবার যাত্রা শুরু হয়ে অবশেষে ২৮শে জানুয়ারী তাঁদের জাহাজ কলকাতা বন্দরে এসে থামল। প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা সেই দৃশ্য বর্ণনা করছেন:

জাহাজ ধীরে ধীরে কলিকাতা বন্দরে আসিয়া থামিল। দ্রুত-স্পন্দিত হৃদয়ে মার্গারেট তীরের দিকে চাহিলেন। তাহার আশা ব্যর্থ হয় নাই। মার্গারেটকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ জেটিতে অপেক্ষা করিতেছিলেন। এতক্ষণে মার্গারেট সাহস ফিরিয়া পাইলেন।

স্বামীজি মার্গারেটের থাকার ব্যবস্থা করে দেন কলকাতার চৌরঙ্গী অঞ্চলের একটি হোটেলে। এর কিছুকাল পরেই বিবেকানন্দের আদর্শে প্রাণিত আরও দুই নারী ভারতে আসেন – মিসেস ওলি বুল ও মিস ম্যাকলাউড। তাঁদের প্রাণেও মার্গারেটের মতো ধ্বনিত হয়েছিল ভারতসেবাই মহামন্ত্র। সেই সময় রামকৃষ্ণ মিশনের প্রথম ও প্রধান কেন্দ্র বেলুড় মঠের কাজ চলছে। কিছু দিনের মধ্যেই বেলুড় মঠের কাছে একটা ভাড়া বাড়িতে এই তিনজন বিদেশিনী ভারতকন্যা আশ্রয় নেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রাথমিক পর্যায়ের সেবাযজ্ঞের সঙ্গে এই সময়েই তিনি পরিচিত হন। স্বামী বিবেকানন্দের যে 'বহুজনের হিত বহুজনের সুখের' কথা তিনি দীর্ঘদিন ধরে শুধু শুনে আসছিলেন, এবার তার প্রায়গিক রূপটিও দেখতে পেলেন মার্গারেট।

স্বামী বিবেকানন্দের কাছে বৈদিক মন্ত্র দীক্ষার আগেই মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল রামকৃষ্ণ মিশনের 'হাইকোর্ট' শ্রীমা সারদা দেবীর সাক্ষাৎ পান। সঙ্গে ছিলেন মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস ওলি বুল। দিনটি ১৭ই মার্চ, ১৮৯৮। যে দিনটিকে নিবেদিতা বলেছিলেন 'Day of days'। সেই সময় শ্রীমা কিছুদিনের জন্য বাগবাজারের ১০/২ বোসপাড়া লেনে বসবাস করছিলেন। তখনও কলকাতায় সারদা দেবীর স্থায়ী বাড়ি (উদ্বোধনের মায়ের বাড়ি নামে বর্তমানে যে বাড়িটি পরিচিত) গড়ে ওঠেনি। নিবেদিতা গবেষক প্রব্রাজিকা মুক্তপ্রাণা, আচার্য শঙ্করীপ্রসাদ বসু, স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ সহ আরও অনেকে সেই দিনটির অপূর্ব বর্ণনা করেছেন। সম্প্রতি দর্শন শাস্ত্রের অধ্যাপিকা মধুমিতা ঘোষ এই দিনটি সম্পর্কে লিখছেন:

খুকি এল তার মায়ের কাছে। সঙ্গে আরও দুটি আলোয় ধোওয়া শ্বেতপুষ্প কলি– মিসেস সারা বুল ও মিস জোসেফিন ম্যাকলাউড। তেজস্বিনী বহ্নিশিখা মিস মার্গারেট নোবল অবগুণ্ঠিতা শুচি-স্নিগ্ধ শান্ত 'আলোর আলো'র কাছে কী পেলি কে জানে!... মায়ের অমল স্নেহ, ভালবাসা আদরে গলে গেল সে।... প্রথম দেখার ক্ষণেই মা যে তাদের কোলে তুলে নিলেন! প্রজ্ঞাস্বরূপিনী তাদের 'আমার মেয়ে' বলে একসঙ্গে খেলেন পর্যন্ত! সমাজের ছুঁৎমার্গের অন্ধকারের গ্রহণমুক্তি হলো।... এক্কেবারে নিজের বাড়ির মতো। এক্কেবারে নিজের মা। বিস্মিত পাশ্চাত্যের নারীত্রয়। বিস্ময়-আনন্দে উচ্ছ্বসিত ভারতসূর্য স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দও। ঘর খুঁজে পেল চঞ্চল সুদূরপিয়াসি খুকি।৫

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, সারদা দেবীর এই বিদেশিনী ভারতকন্যাকে তিনি চিরকাল 'খুকি' বলেই ডাকতেন। নিবেদিতাকে লেখা চিঠিতেও তিনি একই সম্বোধন করতেন।৬ আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণী সারদা দেবী বিবেকানন্দের এই বিদেশিনী কন্যাদের এত সহজে যে গ্রহণ করতে পেরেছিলেন তার মধ্যে উনিশ শতকীয় পাশ্চাত্য শিক্ষার আলোয়অভিষিক্ত নবজাগরণের প্রভাবের চেয়েও শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও শ্রীরামকৃষ্ণের প্রদর্শিত 'ভক্তের ধর্মনিরপেক্ষতার'৭ প্রভাব বেশি ছিল বলে মনে হয়। আকাদেমিক ডিগ্রিহীন সারদা দেবীর এই মুক্ত মন তৎকালের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদেরও নত করে। শ্রীরামকৃষ্ণের জাত ও ধর্ম সম্পর্কে ভেদবুদ্ধি ছিল না। স্বামীর এই সৎ ও মানবিক গুণের অংশীদার হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। শ্রীরামকৃষ্ণের শরণাগত হওয়া এই তিন বিদেশি নারীকে গ্রহণ করতে ও তাঁদের সঙ্গে একত্রে আহার করতেও তাই সেদিন সারদা দেবীর মধ্যে কোনো সংকীর্ণতা ছিল না তা প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বয়ং নিবেদিতার বয়ানেই পাওয়া যায়।৮ নিজেদের বাড়িতে নিবেদিতাকে আশ্রয় দিতেও সারদা দেবী সমাজ ও সমাজপতিদের ভয় করেননি। অবশ্য এর সঙ্গে সারদা দেবীর বিশ্বজনীন মাতৃত্বও জাগ্রত ছিল। স্বয়ং বিবেকানন্দের ভয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ঘরোয়া এক নারী এই বিদেশিনী অভারতীয় অহিন্দু কন্যাদের কেমন করে গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে! তিনি শ্রীমায়ের কাছে মার্গারেটদের পৌঁছে দিয়ে স্বামী যোগানন্দের সঙ্গে অন্যত্র আড়াল হয়েছিলেন। অন্দরমহলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অভূতপূর্ব মিলনের সংবাদ পেয়ে স্বামীজির সংশয় নিমেষে কেটে গিয়েছিল। তিনি নিশ্চিত হয়েছিলেন, ভারতের সেবার জন্য তিনি সঠিক শ্বেতপদ্মের চয়নই করেছেন তিনি। এরপরই নিবেদিতাকে বৈদিক ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করেন স্বামীজি। কিছুকাল পরে সারদা দেবীর বাড়িতেই একসঙ্গে আশ্রয় পেয়েছিলেন তাঁর খুকি। সমাজের অনেকেই এটি ভালো চোখে দেখেননি। সারদা দেবী তবুও জেদ করে সংগ্রামের সাথে নিবেদিতাকে নিজেদের বাড়িতে একসঙ্গে রেখেছিলেন। মার্গারেট সেখানে ছিলেন প্রায় তিন সপ্তাহ। সারদা দেবীকে এই কাজের জন্য কিছু সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। মিস মার্গারেট বুঝতে পারছিলেন সমস্যাটা। তিনি সারদা দেবীর বাড়ির কাছে নিজেই অন্য বাড়িভাড়া করেন একটি। তখনও ভারতভূমি জানত না এই বাড়িতেই শুরু হবে তাঁর কর্মযজ্ঞ। শ্রীমায়ের বাড়ির আশ্রয় ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও, সেই বাড়িতে যাতায়াত মার্গারেট বজায় রেখেছিলেন। সারদা দেবীও মার্গারেটের নতুন বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত রেখেছিলেন। সারদা দেবীর হাত ধরেই নিবেদিতা ভারতের নারী, নারী-আদর্শের স্বরূপকে যথার্থ চিনতে, বুঝতে, অনুভব করতে শেখেন। মার্গারেটের কাছে সারদাদেবী হয়ে উঠেছিলেন ভারতপ্রতিমার মাতৃরূপ। এখানে একটা প্রসঙ্গ উল্লেখ করা প্রয়োজন সারদা দেবী ইংরেজি জানতেন না, নিবেদিতা অবশ্য কিছুদিনের মধ্যেই বাংলা শিক্ষা করেন এবং ভাঙা ভাঙা বাংলা বলতেও শিখেছিলেন। কিন্তু প্রাথমিক পর্বে উভয়ের ভাষা উভয়ের কাছে ছিল অজ্ঞেয়। অথচ একত্র বাসে তাদের অসুবিধা হয়নি। সেই বাড়িতে দোভাষী অনেকেই ছিল, কিন্তু নিবেদিতা-সারদা সম্পর্কের আন্তরিকতায় ভাষা কোনো প্রতিবন্ধক হয়নি সম্ভবত। সারদাদেবী ও মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলের একাসনে বসে থাকা একটি ঐতিহাসিক ছবিটিও এর একটি মূল্যবান প্রমাণ। সারদা দেবী ছাড়াও রামকৃষ্ণ ভাবমণ্ডলের আরেকজন শ্রেষ্ঠ নারী শ্রীমতি অঘোরমণি দেবী (যিনি রামকৃষ্ণ বলয়ে গোপালের মা নামে পরিচিত) মার্গারেটকে সহজেই গ্রহণ করেছিলেন। সারদা দেবীর কাছে আসবার অনেক আগেই মার্গারেট বৃদ্ধা অঘোরমণি দেবীর ভালোবাসার পরিচয় পেয়েছিলেন। এই দুই মুক্তমনা নারীর ভালোবাসা মার্গারেটকে ভারতে বাৎসল্য ও মাতৃত্বের রসে ভরিয়ে তুলেছিল। নিজের মাকে দেশে ফেলে আসা মার্গারেট ভারতে এসে মা পেয়েছিলেন। এরপরই ২৫শে মার্চ নিবেদিতাকে বৈদিক ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করেন স্বামীজি। লক্ষ্যনীয় ভারত ও ভারতবাসী সম্পর্কে সম্যক ধারণা গড়ে ওঠার পরেই মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলকে স্বামী বিবেকানন্দ দীক্ষা দিলেন। নতুন নামকরণ করলেন—নিবেদিতা। ভারতের জন্য যিনি থাকবেন সর্বদা নিবেদিত উৎসর্গিত মহাপ্রাণ। ইংরেজি 'Dedicated' শব্দটির সঙ্গে মিলিয়ে স্বামীজি এই নামকরণ করেছিলেন কি না জানা যায় না। তবু সেই নামটি নিঃসন্দেহে সার্থক হয়েছিল। বদলে গেল মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেলের জীবন। ততদিনে রামকৃষ্ণ মিশন বেলুড় মঠের প্রতিষ্ঠা ও মানবের হিতমুখী কর্মকাণ্ড বড় আকারে শুরু হয়ে গেছে। ভারতকে আরও সঠিক ভাবে বোঝা ও একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুভাইদের সঙ্গে ভারতভ্রমণের সুযোগ পান নিবেদিতা ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গীরা। ভারতের ঐতিহ্য ও বৈচিত্রময় জীবনযাত্রা, বিবিধের মাঝে ঐক্য, দরিদ্র মানুষের যন্ত্রণা, পরধীনতার জ্বালার কষ্ট প্রভৃতি সম্বন্ধে মহাজ্ঞান নিয়ে ফিরে আসেন তিনি। স্বামী বিবেকানন্দের মাধ্যমে নিবেদিতা চিনতে পেরেছিলেন ভারতের অন্তরলোক। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের লক্ষ্য ছিল শুধু আত্মমুক্তি নয়, শিবজ্ঞানে জীবসেবা। ১৮৯৯ সালে কলকাতায় ভয়াবহ প্লেগ মহামারির রূপ নিলে স্বামী বিবেকানন্দের অনুগামীরা সর্বাগ্র এগিয়ে আসেন মানবসেবার মনোভাব নিয়ে। এগিয়ে আসেন রামকৃষ্ণের গৃহীভক্তরা, বেলুড় মঠের সন্ন্যাসী-ব্রহ্মচারীরা এবং নিবেদিতাও। শুরু হল নিবেদিতার ভারতসেবা। আচার্য শঙ্করীপ্রসাদ বসু লিখছেন:

কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারে বক্তৃতার আয়োজন হয়েছে। সভাপতি স্বামী বিবেকানন্দ। বক্তৃতা দেবেন ভগিনী নিবেদিতা। বিষয়–প্লেগ ও কলকাতার ছাত্রসমাজ।... নিবেদিতা বললেন–

'প্লেগ নিবারণের ব্যাপারে সাহায্য করবার জন্য, মানুষ বলে নিজেকে মনে করে এমন প্রতিটি মানুষকে আমি ডাক দিচ্ছি। আজ ধর্মের আহ্বান বেজেছে, এসেছে কর্মের আহ্বান। শ্রেষ্ঠ পূজার অর্ঘ্য হল নিজেকে বলি দেওয়া। কলকাতার ছেলেরা! কতজন তোমরা পারো নিজেকে বলি দিতে? কতজন পারো তোমাদের বিশ্বাসকে আগুনের বিশ্বাসে, আগুনের নিঃশ্বাসে পরিণত করতে? এই শহরের এক প্রান্তে ধর্মের শ্রেষ্ঠ আচার্য শ্রীরামকৃষ্ণ থাকতেন। তিনি ব্রাহ্মণ-সন্তান। পাছে কেউ বাধা দেয়, রাত্রে গোপনে চলে যেতে মেথরদের ঘরে, তাদের নর্দমা-পায়খানা পরিষ্কার করতেন নিজের মাথার চুলে...'

কলকাতা শহর তার জীবনের অপূর্ব দৃশ্য দেখল। ঝাড়ু-বালতি হাতে একটি বিচিত্র ঝাড়ুদার দল। সবাই ভদ্রসন্তান। তাঁদের সামনে আছেন এক শ্বেতাঙ্গিনী।

ভারতের মেয়ে নিবেদিতার সেবাধর্মের সম্পর্কে বেশ কিছু কথা প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণার 'ভগিনী নিবেদিতা' ও নিবেদিতা-গবেষক আচার্য শঙ্করীপ্রসাদ বসুর 'নিবেদিতা লোকমাতা' গ্রন্থে রয়েছে। নিবেদিতার এই সেবাকার্যে মৃত্যুভয় ছিল। প্লেগ স্পর্শের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ার ভয় থাকে। প্লেগ কুষ্ঠের চেয়েও ভয়ংকর, যদিও কুষ্ঠ স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না, কিন্তু সে সময় তা প্রমাণিত হয়নি। আমরা নিবেদিতার এই সেবাকার্যের কথা হয়তো অনেকটা ইচ্ছে করেই ভুলে গেছি, ইচ্ছে করেই নিবেদিতাকে স্বীকৃতি দিতে চাইনি। ভগিনী নিবেদিতার মধ্যেও যে 'মাতা নিবেদিতা' ও 'সন্ত নিবেদিতা' উপাধি পাওয়ার মতো মহৎ গুণগুলি ছিল তা আমরা বিস্মৃত হয়েছি। প্রচন্ড বুদ্ধিমত্তার সাথে অনেকটা ইচ্ছে করেই আলোচনার আলোয় আনতে চাইনি এবং সেটা এখনও চলছে। অবশ্য নিবেদিতার প্রয়োজন ছিল না কোনো 'মাতা' বা 'সন্ত' উপাধির। তিনি শুধু জানতেন কাজ আর কাজ। আমরণ কাজ করে যাওয়ার মন্ত্র, সেবা করে যাওয়ার মহাজ্ঞান তিনি গুরুর কাছে পেয়েছিলেন। সারাজীবন দিয়ে সেই জ্ঞান ও মন্ত্রের ফলিতরূপ দেখিয়েছেন ভারতীয়দের। তিনি সাধারণ মানুষের কাছে 'মা' হয়ে উঠতে পেরেছিলেন, নিজের আধ্যাত্মিক জীবনচর্চায় স্বমহিমায় সন্তত্ব লাভ করেছিলেন। শুধু তার মধ্যে পাশ্চাত্য থেকে আগত বাহ্যিক চাকচিক্যময় আধ্যাত্মিক 'ডিগ্রি' ছিল না।

ইতিমধ্যেই স্বামীজির এই ভারতকন্যা কলকাতার বাগবাজার অঞ্চলের ১৬নং বোসপাড়া লেন-এ স্কুল খুলেছেন। এই কাজে স্বামী বিবেকানন্দ, তাঁর গুরুভাই ও শিষ্যরা, সারদা দেবী এবং রামকৃষ্ণায়েৎ গৃহীরা সহ আরও অনেকেই প্রত্যক্ষ, পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিলেন। রামেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে লিখছেন:

১৩ নভেম্বর ১৮৯৮ কালীপূজার দিন শ্রীশ্রীমা গোলাপ মা এবং যোগীন মা-র সঙ্গে এসে পূজারি করে বিদ্যালয়ের সূচনা করলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বামীজী ছাড়াও স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও স্বামী সারদানন্দ। শ্রীশ্রীমা বিদ্যালয়ের শুভকামনা করে তাঁর আশীর্বাণীতে বললেন, "আমি প্রার্থনা করছি, যেন এই বিদ্যালয়ের ওপর জগম্মাতার আশীর্বাদ বর্ষিত হয় এবং এখান থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত মেয়েরা যেন আদর্শ বালিকা হয়ে ওঠে।"১০

স্বামীজির আহ্বানবার্তার জন্য নিবেদিতার স্কুলে অনেকেই তাদের মেয়েদেরও পড়তে পাঠিয়েছিলেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দ, স্বামী সারদানন্দ ও স্বামী সুরেশ্বরানন্দ এই স্কুলের প্রথম দিকে বাড়ি বাড়ি থেকে মেয়েদের স্কুলে নিয়ে আসতেন এবং পাঠের পর তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। বঙ্গীয় নারীশিক্ষার ইতিহাসে নিবেদিতার অবদানের অধ্যায়টিও বর্তমানে যথেষ্ট অনালোচিত। নিবেদিতার এই ধর্মহীন নারীকল্যাণ মূলক স্কুল অনেক অনেক খ্রীস্টান মিশনারী স্কুলের থেকে ছিল অনেক বেশি নিঃস্বার্থ। নিবেদিতার কর্মজীবনের এই অধ্যায়টি আলোয় আনার আশু প্রয়োজন এখনও। ১৬নং বোসপাড়া লেন-এ নিবেদিতা যে স্কুলটি খুলেছিলেন, সেখানে বাঙালি মেয়েদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে পূর্ণতা দানের চেষ্টা করেছিলেন তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা। নিবেদিতা ও তাঁর মেয়েদের বেশ কিছু আঁকা ছবি এখনও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে। নিবেদিতা তাঁর প্রচেষ্টায় সফল হয়েছিলেন সর্বাংশে। স্বয়ং সারদা দেবীর কথায় তার যথেষ্ট প্রমাণ মেলে। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে নারীকে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করার যে চেষ্টা নিবেদিতা করেছিলেন তা এক কথায় অনবদ্য। আমরা এখনও সেই স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করে চলেছি সারাদেশে! সারদা দেবী তাঁর এক অনুগতকে তার বিবাহযোগ্যা কন্যার প্রসঙ্গে বলেছেন :

বে (বিয়ে) দিতে না পার, এত ভাবনা করে কি হবে? নিবেদিতার স্কুলে রেখে দাও। লেখাপড়া শিখবে, বেশ থাকবে।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় যে সময়ে শহর কলকাতাতেও মেয়েদের বিবাহ না হলে নিন্দা হত, সেই একই সময়ে দাঁড়িয়ে সারদা দেবী নিবেদিতার স্কুল সম্পর্কে এমন কথা বলছেন। বিবাহ করে হাঁড়ি ঠেলার জীবনের বাইরেও যে মেয়েদের একটি বৃহত্তর ও মহত্তর জীবন থাকা খুবই স্বাভাবিক তার কথা ভাবছেন সারদা দেবী, যিনি রামকৃষ্ণের স্ত্রী! শ্রীরামকৃষ্ণ নিজেও নারীশিক্ষার পক্ষে ছিলেন। তাঁর চেষ্টায় সারদা দেবী পড়তেও শিখেছিলন। এই স্কুলের ছাত্রীদের কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে সন্ন্যাস নিয়ে দক্ষিণেশ্বর সারদা মঠের গুরু দায়িত্ব সামলেছেন। স্বামী বিবেকানন্দের ইচ্ছে ছিল শ্রীরামকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে বেলুড় মঠ নির্মাণের আগে শ্রীমা সারদা দেবীকে কেন্দ্র করে মেয়েদের একটি মঠ হোক। একটি চিঠিতে স্বামীজি লিখছেন :

আমাদের দেশ সকলের অধম কেন, শক্তিহীন কেন? –শক্তির অবমাননা সেখানে বলে। মা-ঠাকুরানী ভারতে পুনরায় সেই মহাশক্তি জাগাতে এসেছে, তাঁকে অবলম্বন করে আবার সব গার্গী মৈত্রেয়ী জগতে জন্মাবে।... এই জন্য তাঁর মঠ প্রথমে চাই।... আগে মায়ের জন্য মঠ করতে হবে। আগে মা আর মায়ের মেয়েরা, তারপর বাবা আর বাপের ছেলেরা, এই কথা বুঝতে পারো কি?

নিবেদিতা তাঁর গুরুদেবের এই ভাবনাটিকে ক্ষুদ্র আকারে রূপদান করতে শুরু করেছিলেন। বিবিধ জটিল কারণে স্ত্রীমঠ নির্মাণের কাজ বিবেকানন্দ করে যেতে পারেননি। কিন্তু শ্রীসারদা দেবীকে ঘিরে যে মহান শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবসম্পৃক্ত নারীমুক্তি আন্দোলন চলেছিল এবং উত্তরোত্তর প্রসারিত হচ্ছিল তার অন্যতম পতাকাবাহক ছিলেন নিবেদিতা। নারীবলয়ে এই অঘোষিত আন্দোলনের অন্দরমহলের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন সারদা দেবী ও বাইরের কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন নিবেদিতা। তাঁদের উভয়ের এই বৃহত্তর কর্মকাণ্ড কতদূর সফল হয়েছিল তার মূর্ত প্রমাণ বর্তমানে দক্ষিণেশ্বর অঞ্চলে অবস্থিত শুধুমাত্র নারী সন্ন্যাসিনী ব্রহ্মচারিনীদের মাধ্যমে পরিচালিত 'শ্রীসারদা মঠ'। 

দীর্ঘকাল ভারতে থাকার পর বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের জন্য কিছুদিন ইউরোপ ও আমেরিকায় ছিলেন ভগিনী নিবেদিতা। প্রায় আড়াই বছর। ১৯০২ সালের প্রথম দিকে ভারতে প্রত্যাবর্তন করেন ভারতাত্মজা। এই বছরই স্বামী বিবেকানন্দের মহাপ্রয়াণ ঘটে ৪ঠা জুলাই। মহাপ্রয়াণের মাত্র কয়েক দিন পূর্বে স্বামীজি বেলুড় মঠে নিমন্ত্রণ করেছিলেন নিবেদিতাকে। পরম যত্ন নিয়ে শিষ্যার সেবা করেন বিবেকানন্দ। ভারতীয় সংস্কার মতো নিবেদিতা গুরুরকাছ থেকে সেবা নিতে আপত্তি জানালে, বিবেকানন্দ জানিয়েছিলেন প্রভু যীশুও তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে সেবা করেছিলেন। নিবেদিতা জানতেন যীশুর মহাজীবনের শেষ পর্যায়ের এই ঘটনার কথা। কিন্তু যীশু একর্মটি করেছিলেন মৃত্যুর মাত্র কিছুদিন আগে! বিবেকানন্দ হয়তো ইঙ্গিত করেছিলেন তাঁর আসন্ন মহাসমাধির, কিন্তু নিবেদিতা বা বিবেকানন্দের গুরুভাইয়েরা কেউই তখন তা বুঝতে পারেননি। বিবেকানন্দের মৃত্যুতে নিবেদিতা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বেলুড় মঠের পবিত্র মাটিতে বিবেকানন্দের নশ্বর শরীর দাহের মুহূর্তেই ভেতর থেকে বুঝেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বপ্রাণ আরও ব্যাপ্তি পেয়ে গেছে।

স্বামীজির কায়িক মৃত্যুর পর নিবেদিতা আংশিক ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি আবার গুরুর বৃহত্তম কর্মযজ্ঞে অগ্রসর হন। জাতীয়তাবোধের মহাজ্ঞান নিবেদিতা পেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের কাছে। নারী হিসেবে এই জাতীয়তাবোধের প্রয়োগে প্রাথমিক পাঠ শিখেছিলেন সারদা দেবীর কাছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের সৈনিকরা অনেক সময় আশ্রয় পেয়েছিলেন কোয়ালপাড়া আশ্রমে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সৈনিকদের আশ্রয়ভূমি এই আশ্রমটির নাম এখনও বঙ্গদেশেরস্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সার্বিক স্বীকৃতি পায়নি। এই আশ্রমে শ্রীসারদা দেবীর যাতায়াত ছিল, আশ্রমটি ইংরেজ শাসকদের সুনজরে ছিল না তা বলাই বাহুল্য। সেই সময়ের অনেক তরুণ স্বাধীনতা সংগ্রামীই আদর্শ বলে স্বামী বিবেকানন্দকে গ্রহণ করেছিলেন। তরুণ বয়সে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও রামকৃষ্ণ মিশন বেলুড় মঠে যোগ দিতে চেয়েছিলেন। সুভাষকে স্বামী ব্রহ্মানন্দ (রাখাল মহারাজ, বেলুড় মঠের প্রথম সঙ্ঘাধ্যক্ষ) নির্দেশ করেছিলেন তাঁর জন্য দেশমাতৃকা অপেক্ষমান, সন্ন্যাসীর পথে তাঁর না আসাই ভালো। তাঁর জন্য বৃহত্তর জীবন পরে রয়েছে। বাকি কথা আর আশা করি নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই কীভাবে নেতাজির হাতের অর্ঘ্য দেশমাতৃকা পূজা নিয়েছেন। রামকৃষ্ণ মিশনের বাংলা মুখপত্র 'উদ্বোধন' জাতীয়তাবোধের মন্ত্র ছড়াতে সক্ষম হয়েছিল। ১১৯ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত এই পত্রিকাটিও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যথার্থ সম্মান পায়নি। অথচ বাংলা সাহিত্যের অনেক খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিক এই পত্রিকাটিতে লিখেছেন। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের আকাঙ্ক্ষা তো শুধু নিজের আত্মমুক্তি নয়! স্বাধীনতা সংগ্রামের গোপন বিপ্লবী দলের সঙ্গে নিবেদিতার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রকাশ্য যে সব সংগ্রাম চলছিল তাতেও নিবেদিতার উৎসাহ সিঞ্চন হয়েছিল। এভাবে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতেজড়িত হয়ে যাওয়ার পর তিনি রামকৃষ্ণ মিশনের সদস্যপদ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি হয়তো অনুভব করেছিলেন রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে জাতীয় আন্দোলনে যোগ দিলে মিশন ইংরেজ শাসনের ক্রদ্ধ দৃষ্টির শিকার হতে পারে। রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেও তিনি শ্রীমা সারদা দেবী ও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে একই রকম যোগাযোগ রেখেছিলেন। শ্রীসারদা দেবীর 'উদ্বোধন' বাড়ির ঠাকুরঘরেও ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত। জাতীয় কংগ্রেসের চরমপন্থী, মধ্যপন্থী, নরমপন্থী সংগ্রামীরা অনেক উৎসাহ ও সংগ্রামী মনোভাব পেতেন নিবেদিতার থেকে। সংগ্রামীরা নিবেদিতার মধ্যে দিয়েই তাঁর গুরুদেব স্বামী বিবেকানন্দের জ্বালাময়ী উপস্থিতি টের পেতেন মনে মনে। নিবেদিতার মধ্যে তাঁরা দেখতে পেতেন বিবেকানন্দের বাণীর ফলিত রূপ। বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ, লোকমান্য তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, লালা লাজপত রায়, রাসবিহারী ঘোষ, গোপালকৃষ্ণ গোখলে, শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, সুরেন গঙ্গোপাধ্যায়, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, সাহিত্যসাধক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন সহ আরও অনেক বিশিষ্ট মানুষ নিবেদিতার দ্বারা প্রাণিত হয়েছেন। তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী যথাসাধ্য সাহায্য করেছিলেন নিবেদিতা। ১৯০৫ সালে কাশীর বারাণসীতে জাতীয় কংগ্রেসের একটি অধিবেশনে বক্তৃতা দিয়েছিলেন নিবেদিতা। তখনও জাতীয় কংগ্রেসের কোনো পতাকা ছিল না। পরের বছর নিবেদিতার হাতে গড়ে ওঠে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের পতাকা। টকটকে রক্তরাঙা কাপড়ের উপরে বজ্র আঁকা। আড়াআড়ি করে লেখা এক মহামন্ত্র–'বন্দেমাতরম্'!১৪ ভারতীয় শিল্পকলা সম্পর্কে নিবেদিতার যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। এ প্রসঙ্গে একটি তথ্য পেশ করা প্রয়োজন : 

ভারতশিল্পকে দেখার চোখ তৈরী করে দেন তাঁর গুরু বিবেকানন্দ। জানা যাচ্ছে, ১ ডিসেম্বর ১৮৯৯ তারিখে শিকাগোতে ভারতের চারু ও কারু শিল্পের ওপর বক্তৃতা দেন নিবেদিতা। বক্তৃতার আগে স্বামীজির কাছে কিছু বিষয় জেনে নিয়েছিলেন।

ফলে নিবেদিতার বানানো কংগ্রেসের পতাকায় যে দেশিয় ভাব ও ভাবনা স্বাভাবিক নিয়মেই বজায় ছিল। বৃহত্তর হিতের জন্য আত্মত্যাগী মহান ঋষি দধীচির বজ্র আর সংগ্রামী দেশের সৈনিকদের একত্রে মিশিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ভারতীয় উপমহাদেশের দর্শন ও ঐতিহ্যের সম্পর্কে কতটা জ্ঞান ও ভালোবাসা থাকলে এমন ভাবনা সম্ভব তা সহজেই অনুমেয়। স্বদেশিযুগে অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ভারতমাতার মতো হতে চেয়েছিলেন নিবেদিতা। যেন সেই চিত্রের ভারতমাতার মতো চারহাতে খাদ্য, বস্ত্র, বিদ্যা ও অধ্যাত্মচিন্তনের মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছিলেন নিজের মধ্যে যথার্থভাবে। সেবার গুণে এই প্রচেষ্টায় তিনি যে সফলতা পেয়েছিলেন তা ইতিহাস স্বীকৃত, হয়তো তা চাইলেও সম্পূর্ণ অস্বীকার করা অসম্ভব। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন ও স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে পরাধীন ভারতীয়দের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন সন্ন্যাসিনী নিবেদিতা। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি প্রদান সভায় দাঁড়িয়ে সমবেত ভারতীয়দের 'মিথ্যাচারী, মিথ্যেবাদী' বলে লর্ড কার্জন দাম্ভিকতা প্রকাশ করলে সমবেত আকাদেমিক ডিগ্রীলোভী শিক্ষিত বাঙালি চুপ করে থাকেন। তৎকালের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরাও শুধু মাথা নত করে থাকলেন। ইউনিভার্সিটির হল থেকে বেরিয়ে প্রতিবাদী স্বরে স্বোচ্চার হন একা নিবেদিতা। শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখায় ও বহু জায়গায় এর উল্লেখ আছে। সম্প্রতি 'আনন্দবাজার পত্রিকা'তেও তার উল্লেখ চোখে পড়েছে:

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন হল। লর্ড কার্জন এসেছিলেন উপাধি বিতরণ সভায়। ভারতবাসীদের তিনি কৌশলে মিথ্যেবাদী বললেন। পরদিন খবরের কাগজে একটি খবর বেরোল। কোরিয়ার রাজদূত হয়ে গিয়েছিলেন লর্ড কার্জন। তখন নিজের প্রকৃত বয়স গোপন করেছিলেন তিনি। ভারতবাসীরা নন, কার্জনই মিথ্যেবাদী। নিবেদিতাই লিখেছিলেন সে লেখা।

ভারত ও ভারতবাসীদের কতটা ভালোবাসলে এই তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ সম্ভব। সেদিন ইউনিভার্সিটির হলে যাঁরা অপমানটা সহ্য করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন গণ্যমান্য। অথচ ভারতীয় হয়েও শুধুমাত্র আত্মস্বার্থ রক্ষায় তাঁরা কেউ প্রতিবাদ করেননি। অবশ্য নিবেদিতার তীব্রভাবে স্বোচ্চার হওয়ার পর তাঁদের কেউ কেউ প্রতিবাদ করেছিলেন। তবু অনেকেই চুপ ছিলেন। এক-একজন গণ্যমান্য ভারতীয় দেশের হিতকারী কাজের জন্য, সম্মানের জন্য যেসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেননি, নিবেদিতা এগিয়ে গেছেন নির্ভয়ে। পরাধীন ভারতীয়দের হয়ে এতটা লড়াই বরদাস্ত করেনি শাসকশ্রেণিও। ফলে তাঁর কাজের যথোপযুক্ত স্বীকৃতি নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে তিনি পাননি। তখনও না, এখনও না।

১৯০৭ সালের শেষ দিক থেকে ১৯০৯ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নিবেদিতা ইউরোপ ও আমেরিকায় অবস্থান করেন। কর্মযজ্ঞ চালানোর সময়ই নিবেদিতার কাছে সংবাদ যায় তাঁর রত্নগর্ভা মা অসুস্থ। তাঁর মায়ের ইচ্ছে ছিল দেবত্বের স্পর্শ পাওয়া প্রথমা কন্যাকে একবার দেখবার। ঈশ্বর তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেছিলেন। কন্যার একনিষ্ঠ সেবা পেয়েছিলেন মেরী ইসাবেল হ্যামিলটন। জীবনের শেষ সময়ের মায়ের কানে পৃথিবীর শেষ শব্দ নিবেদিতা উচ্চারণ করেন—'হরি ওঁ! হরি ওঁ!' আচার্য শঙ্করীপ্রসাদ বসুর লেখা থেকে প্রামাণিক তথ্য পাই, নিবেদিতার মায়ের পূর্ব-ইচ্ছা অনুসারে তাঁকে হিন্দুদের মতো দাহ করা হয়। ১৯০৯ সালে ভারতে ফিরে আসার পর তিনি তাঁর অসমাপ্ত গ্রন্থ সমাপ্ত করার চেষ্টা করেন। ১৯১০এর ১লা ফেব্রুয়ারী স্বামী বিবেকানন্দের শুভ জন্মতিথির দিন নিবেদিতা তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল The Master As I Saw Him গ্রন্থটির একটি বাঁধাই সংস্করণ বেলুড় মঠে স্বামীজির ব্যবহৃত ঘরে রেখে একাগ্রচিত্তে শ্রদ্ধা জানান। বইটিতে স্বামী সারদানন্দের (শরৎ মহারাজ, স্বামী বিবেকানন্দের অন্যতম গুরুভাই) আশীষ সহ শুভেচ্ছা বার্তা রয়েছে। বহু বিশেষজ্ঞের মতে এই গ্রন্থটি বিশ্বের অন্যতম এক সেরা স্মৃতিকথা ও ধর্মসাহিত্য। এর পাশাপাশি এখনও এই গ্রন্থটি বিবেকানন্দ চর্চার অন্যতম এক স্মারক, একটা মাইল ফলক বলা যেতে পারে। এর পরবর্তী সময়ে নিবেদিতা পুনরায় প্রবল উৎসাহে তাঁর কর্মযজ্ঞে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। গড়ে তুলছিলেন তাঁর মেয়েদের অক্লান্ত পরিশ্রম দিয়ে। ১৯১০-এ মিসেস ওলি বুলের গুরুতর অসুস্থ হওয়ার খবর পেয়ে নিবেদিতা বস্টেনে চলে যান। এই সময়েই তাঁর একান্ত সহকর্মী তথা স্বামী বিবেকানন্দের সেরা শিষ্য স্বামী সদানন্দও পরমাত্মায় লীন হন। মিসেস বুলও চলে যান অমরলোকে। প্রবাসে অনেকটা একাকীত্ব অনুভব করেছিলেন নিবেদিতা। হঠাৎই গির্জায় প্রার্থনাকালে তাঁর মনে পড়েছিল তাঁর একান্ত আশ্রয় সারদা দেবীর কথা। ১৯১০সালের ১১ডিসেম্বর একটি আন্তরিক আবেগমথিত চিঠি লিখেছিলেন তিনি:

আদরিণী মাগো,

আজ সকালে খুব ভোরে গীর্জায় গিয়েছিলাম সারার (মিসেস বুল) জন্য প্রার্থনা করতে। সেখানে সবাই মেরীর কথা ভাবছিল, হঠাৎ আমার মনে পড়ে গেল তোমার কথা। তোমার মিষ্টি মুখ, তোমার ভালবাসায় ভরা চোখ, তোমার সাদা শাড়ি, হাতের বালা, সবকিছু সামনে ভেসে উঠল। তখন ভাবলাম, অভাগী সারার রোগের ঘরটিকে শান্তিতে আর আশীর্বাদে ভরিয়ে দিতে পারে একমাত্র তোমারই পরশ। আর মাগো, জান কি, ভাবলাম—সন্ধ্যাবেলায় শ্রীশ্রীঠাকুরের পূজার সময়ে তোমার ঘরে বসে ধ্যানের চেষ্টা করে কি বোকামিই করতাম! কেন বুঝিনে যে, তোমার শ্রীচরণের কাছে ছোট্ট মেয়েটির মত বসে থাকাটাই সব—সব কিছু! মা, মাগো—ভালবাসায় ভরা তুমি! তোমার ভালবাসায় আমাদের মত উচ্ছ্বাস আর উগ্রতা নেই, তা পৃথিবীর ভালবাসা নয়, স্নিগ্ধ শান্তি তা, সকলের কল্যাণ আনে, অমঙ্গল করে না কারো। সোনার আলোয় ভরা তা, খেলায় ভরা। সেই যে রবিবারটি কয়েকমাস আগে, পুণ্যভরা সেই দিনটিতে গঙ্গাস্নান সেরে ছুটে তোমার কাছে ফিরে এসেছিলাম এক মুহূর্তের জন্য, তখন তুমি আশীর্বাদ করেছিলে, আর কি যে শান্তি আর মুক্তি বোধ করেছিলাম তোমার বাঞ্ছিত আবাসে! প্রেমময়ী মাগো, তোমাকে যদি একটি অপরূপ স্তোত্র কিংবা প্রার্থনা লিখে পাঠাতে পারতাম! কিন্তু জানি, সেও যেন তোমার তুলনায় শব্দমুখর, কোলাহলময় শোনাবে! সত্যিই তুমি ঈশ্বরের অপূর্বতম সৃষ্টি, শ্রীরামকৃ্ষ্ণের বিশ্বপ্রেম ধারণের নিজস্ব পাত্র—যে স্মৃতিচিহ্ণটুকু তিনি তাঁর সন্তানদের জন্য রেখে গেছেন—যারা নিঃসঙ্গ, যারা নিঃসহায়। আমরা তোমার কাছে খুব শান্ত হয়ে চুপটি করে বসে থাকব। তবে মজা করবার জন্য একটু-আধটু গোলমাল করব বই কি! সত্যই ভগবানের অপূর্ব রচনাগুলি সবই নীরব। তা অজানিতে আমাদের জীবনের মধ্যে প্রবেশ করে—যেমন বাতাস, যেমন সূর্যের আলো, বাগানের মধুগন্ধ, গঙ্গার মাধুরী– এইসব নীরব জিনিসগুলি সব তোমারই মতো।

বেচারা সারার জন্য তোমার শান্তির আঁচলখানি পাঠিও। রাগদ্বেষের অতীত সমুচ্চ শান্তিতে সমাহিত থাকে নাকি তোমার ভাবনা! তা কি পদ্মপাতায় শিশিরবিন্দুর মত ভগবানের বুকের শিহরিত ভালবাসা নয়—যা পৃথিবীতে স্পর্শ করে না কখনো।

প্রিয়তমা মা আমার, তোমার চিরকালের বোকা খুকি,
নিবেদিতা 

অনেক আগেই শ্রীসারদা দেবীর মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর মাকে। ১৯১১সালের এপ্রিলে কলকাতায় চলে আসেন নিবেদিতা। অক্টোবর মাসে পুজোর সময় ছুটি কাটাতে চলে যান উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং-এ, সঙ্গে ছিলেন সপরিবারে বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসু। পূর্ববঙ্গে ত্রাণকার্যে গিয়ে অত্যাধিক পরিশ্রম করে অনেক আগেই শরীর ভাঙতে শুরু করেছিল তাঁর, সেই শরীর আর সেরে ওঠেনি ভালো করে। নিবেদিতা অসুস্থতা বৃদ্ধি হলে বিশিষ্ট বাঙালি ডাক্তার নীলরতন সরকার নিয়মিত দেখছিলেন তাঁকে। ১৩ই অক্টোবর আনন্দময়ী লোকমাতা নিবেদিতা কায়িক মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে অমৃতের পথে যাত্রা করেন – শেষ হয়ে যায় এক কর্মযোগীর কায়িক জীবন। শুরু হয় অনন্তের পথে তাঁর নতুন জয়যাত্রার। সেই যাত্রা তাঁর হাতে গড়া স্কুলটির মধ্যে দিয়ে বহমান রেখেছিলেন তাঁর অনুগামী উত্তরসাধিকারা। এখনও অনেকটাই অচর্চিত রয়ে গেছেন সার্ধশতবর্ষীয়া এই ভারতকন্যা। সত্যিই হয়তো নিজেদের 'আত্মশুদ্ধির জন্য আজ তাঁকে আমাদের প্রয়োজন'। এই প্রয়োজন অস্বীকার করার আর হয়তো কোনো অবকাশ নেই।


তথ্যসূত্র :

১. প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, 'ভগিনী নিবেদিতা', সিস্টার নিবেদিতা গার্লস্ স্কুল, দশম সংস্করণ, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০৭, পৃ. ২৫-২৬

২. দ্র. স্বামী বিবেকানন্দ,'পত্রাবলী', উদ্বোধন কার্যালয়, চতুর্থ সং. ২২তম পুনর্মুদ্রণ , কলকাতা, ২০১৬,

৩. তদেব, পৃ.৫৮৫-৮৬

৪. প্রব্রাজিকা মুক্তিপ্রাণা, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৫৫

৫. মধুমিতা ঘোষ, "মা ও মায়ের খুকি", 'উদ্বোধন' ১১৮, ১০ (কার্ত্তিক ১৪২৩) : ৯১৫-১৬

৬. দ্র. 'মায়ের চিঠি', রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, তৃতীয় সংস্করণ, কলকাতা, ডিসেম্বর ২০০৮, পৃ. ১০-১১

৭. দ্র. শ্রীম (ছদ্ম.), 'শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত' (অখণ্ড), প্রথম সংস্করণ-৪১তম পুনর্মুদ্রণ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৪২১বঙ্গাব্দ, পৃ. ১০৭

৮. দ্র. স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ, 'শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের নিবেদিতা', প্রথম সংস্করণ-পঞ্চম মুদ্রণ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৪২২বঙ্গাব্দ, পৃ. ২০

৯. শঙ্করীপ্রসাদ বসু, 'আমাদের নিবেদিতা', প্রথম সং. ১৮শ মুদ্রণ, ২০০০, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, পৃ. ৩৮

১০. রামেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, 'ভারত-উপাসিকা নিবেদিতা', প্রথম প্রকাশ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৪২৩বঙ্গাব্দ, পৃ. ২৭

১১. 'শ্রীশ্রীমায়ের কথা' (অখণ্ড), অষ্টম প্রকাশ ৩৪তম পুনর্মুদ্রণ, ১৪১৫ বঙ্গাব্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, পৃ.১১

১২. দ্র. তদেব, পৃ. ২২১-২২

১৩. স্বামী বিবেকানন্দ, "আমার ভারত অমর ভারত", প্রথম সং. নবম মুদ্রণ, ২০০৬, রামকৃষ্ণ মিশন ইনস্টিটিউট অব কালচার, কলকাতা, পৃ.৬৪

১৪. দ্র. প্রব্রাজিকা আপ্তকামপ্রাণা, "ভারতশিল্প ও ভগিনী নিবেদিতা", 'উদ্বোধন' ১১৮, ১০ (কার্ত্তিক ১৪২৩): ১০০০-১০০৮

১৫. 'আনন্দবাজার পত্রিকা', উত্তর সম্পাদকীয়, জয়দীপ মুখোপাধ্যায়, "ঋণ শোধ করতে পারি না?", ২৮ অক্টোবর ২০১৬, শহর সং. পৃ.৪

১৬. 'আনন্দবাজার পত্রিকা', ৫ নভেম্বর ২০১৬, 'পত্রিকা' ক্রোড়পত্র, শহর সং. পৃ.৩

১৭. স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ, প্রাগুক্ত গ্রন্থ, পৃ. ২৬-২৭

১৮. 'আনন্দবাজার পত্রিকা', উত্তর সম্পাদকীয়, স্বামী দেবেন্দ্রানন্দ, "আত্ম শুদ্ধির জন্য আজ তাঁকে আমাদের প্রয়োজন", ২৮ অক্টোবর ২০১৬, শহর সং পৃ.৪


চিত্র :

১. ভগিনী নিবেদিতা


বিশেষ কৃতজ্ঞতা:  ১. রামকৃষ্ণ মঠ, বেলুড়, হাওড়া।  ২. শ্রীসারদা মঠ, দক্ষিণেশ্বর, কলকাতা। ৩. 'উদ্বোধন' পত্রিকা দপ্তর, বাগবাজার, কলকাতা। ৪. 'নিবোধত' পত্রিকা দপ্তর, দক্ষিণেশ্বর, কলকাতা।
avipal2015@gmail.com
Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.