Monday, April 15, 2019

বদিউর রহমান

sobdermichil | April 15, 2019 |
মাস্টার মশাই
যে মাস্টার মশাইয়ের কথা বলতে বসেছি তাঁর পিতৃপরিচয় দেওয়া আবশ্যিক মনে করি। তিনিও ছিলেন পেশায় শিক্ষক। শিক্ষকতা করতেন প্রাইমারি স্কুলে। আমি ছোট বেলায় তাঁকে দেখতাম, তাঁর গ্রাম থেকে আধ মাইল দূরে জি টি রোড হয়ে পূব দিক বরাবর আরও এক মাইল দূরের এক স্কুলে যাওয়া-আসার পথে, এক হাতে মাথার উপর ছাতা ধরে রেখেছেন আর অন্য হাতে রুমাল দিয়ে নাক ঢেকে রেখেছেন। রাস্তার ধুলো-বালি, গাড়ির ধোঁওয়া ইত্যাদির জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। তিনি সাইকেল চড়তে জানতেন না। আজীবন পায়ে হেঁটে কাজ সারতেন। মানুষ হিসাবে ছিলেন খুবই সরল প্রকৃতির। তাঁর আমগাছে পাড়ার ছেলেদের অত্যাচার চলত গুটি ধরারও আগে থেকে। গাছের উপরে উঠে আম-জাম পাড়ার মুহূর্তে কোন ছেলেকে তিনি তৎক্ষণাৎ কিছু বলতেন না। তাঁর ধারণা ছিল সেসময় তাদের কিছু বললে যদি ভয়ে বা অসাবধানতায় গাছ থেকে পড়ে যায় তাহলে তো আমের থেকে মূল্যবান একটা প্রাণসংশয় দেখা দিতে পারে! আর ওই রকম ভাল মানুষ বলেই তাঁর পুকুরে পাড়ার ছেলেদের মাছ চুরিরও হিড়িক লেগে থাকত। ছিপ দিয়ে কোন ছেলে মাছ চুরি করছে দেখেও তিনি তখন কিছু বলতেন না। পাছে আচমকা বঁড়শির কাঁটা হাতে ফুটিয়ে কোন কেলেঙ্কারি বাধায়। পাড়ার রাস্তা-ঘাটে ঐ ছেলেদের দেখতে পেলে মৃদু স্বরে বলতেন, “কারো দ্রব্য না বলে নিতে নেই। আম-জাম অথবা মাছ খাওয়ার ইচ্ছা হলে একবার অনুমতি নিলেই পার।”

ঐ রকম নিখাদ ভাল মানুষের সন্তান ছিলেন আমাদের আলোচ্য মাস্টার মশাই। নমস্য পিতৃদেবের সন্তান সুসন্তান হবেন তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বংশপরম্পরা বা বংশধারার গুণে গুণান্বিত হয়েও কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের মাস্টার মশাই তাঁর বাবাকেও অতিক্রম করে গিয়েছেন। ইনি ষাটের দশকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম এ। কর্ম সূত্রে ছিলেন উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক। কর্মরত অবস্থায় বি. টি. ডিগ্রিও অর্জন করেন। তাঁর বাবার মত আমাদের মাস্টার মশাই ধুতি-শার্ট পরে স্কুলে যেতেন। বাবার সঙ্গে তফাৎ ছিল ইনি সাইকেল চড়তে জানতেন; ফলে গ্রাম থেকে পাণ্ডুয়া স্টেশন পর্যন্ত সাইকেলে যেতেন। জি টি রোডের যেটুকু অংশ পারাপার না করলেই নয় শুধু সেইটুকু ঐ রাস্তা অতিক্রম করে অন্য কাঁচা রাস্তা দিয়ে ঘুরপথে স্টেশন যেতেন – পাকা রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়ার ধোঁওয়া ও বিভিন্ন প্রকারের ক্ষতিকর জীবাণুর ভয়ে। বাবার মতো তিনি ছাতা ও রুমাল সমান তালে ব্যবহার করতেন।

মাস্টার মশাইকে সাদা ধুতি-শার্টে, বেশ পরিপাট হয়ে তৈলাক্ত কেশ বিন্যাসে স্কুল যাওয়া আসার পথে বহুদিন দেখেছি। পাণ্ডুয়া থেকে ট্রেনে গিয়ে খন্যানে নেমে সেখানে তাঁর রাখা আর একটা সাইকেল চড়ে স্কুল পৌঁছাতেন। তাঁর সাইকেলের হ্যান্ডেলে সবসময় ঝুলতো একটা থলে বা প্যাকেট। সেটার প্রয়োজন কী ছিল তা একটু বলি। মাস্টার মশায় ছিলেন উঁচু ক্লাসের ক্লাস টিচার। খন্যানের আশে পাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে পড়তে আসা ছাত্ররা প্রতিদিন ঠিক সময়ে স্কুলে আসতে পারত না। ঐ রকম দেরী করা দু-একটা ডেঁপো ছাত্র মাস্টার মশাইয়ের জন্য লাউ, বেগুন, কপি যাহোক কিছু যে কোন ক্ষেত খামার থেকে তুলে মাস্টার মশাইয়ের ক্লাসের দরজার বাইরে থেকে সেগুলি মাস্টার মশাইকে দেখিয়ে বলত “স্যর আসব?” মাস্টার মশাই সিঁড়ির পাশে রাখা তাঁর সাইকেলের প্যাকেটের দিকে ইঙ্গিত করলে ছাত্রটি সুবোধ বালকের মত সেগুলো তাঁর প্যাকেটস্থ করে ক্লাসে বসত। ওরকম প্রাপ্তি যোগ যে প্রতিদিন হত তা নয় তবে প্রায়শই হতো।

একবার শীতের শুরুতে এক দেরী করা ছাত্র দুটো ফুল কপি মাস্টার মশাইয়ের প্যাকেটে রেখে যথারীতি ক্লাস করে। টিফিনের সময় আর এক শিক্ষক অন্য শিক্ষক বন্ধুদের বলেন যে ছুটির পর তিনি সকলকে ফুলকপির সিঙাড়া খাওয়াবেন। আমাদের মাস্টার মশাই যারপরনাই খুশি। ছুটির পর সকলে দু’টি করে হাতে গরম সিঙাড়া পেয়ে হাল্কা শীতের বিকালে সুস্বাদু সিঙাড়ার প্রশংসা করলেন। মাস্টার মশাই সংযোজন করলেন “সিঙাড়ায় ফুল কপি থাকায় স্বাদ আরও মাত্রা পেয়ে অতিরিক্ত সুস্বাদু হয়েছে।” এবার সকলে বাড়ি ফিরবেন। মাস্টার মশাই তাঁর সাইকেলের প্যাকেটটা উঁকি দিয়ে দেখেন ওর মধ্যে কপি নেই। যিনি সিঙাড়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন “এটা কি রকম হল! এই ঝোলার মধ্যে দুটো কপি থাকার কথা সেগুলো দেখছি না।” উত্তর এলো, “দেখবেন কী করে সেগুলো দিয়েই তো সিঙাড়া হ’ল!!”

যাইহোক, মাস্টার মশাই ছিলেন নম্রভাষি। আমার বাবা তাঁকে আমার এক দাদা ও দিদির বাংলার গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। বৈঠকখানার এক দিকে চেয়ার টেবিলে পড়াশুনার কাজ চলত। ঐ ঘরের মাঝখান দিয়ে বাইরে থেকে অন্দরমহলে যাওয়া আসা করা যায়। সেই ঘর দিয়ে আসা যাওয়ার পথে শুনতাম তিনি তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের ‘শুকুন্তলার পতিগৃহে যাত্রা’ বা অন্য কিছু স্কুল-পাঠ্য বিষয় থেকে পড়ে শোনাচ্ছেন। কখন কোন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা এলে মাস্টার মশাই হঠাৎ বলতেন “মারোদ্দাগ, আর পাশে লেখ V.I.” আবার কখনও বলতেন ‘V.V.I.’ লিখতে। দাদারা দুষ্টুমি করে বলতেন ‘স্যর, পেন্সিল নেই,’ মাস্টার মশাই তৎক্ষণাৎ তাঁর ফুল হাতা শার্টের পকেট থেকে ছ’-সাতটা বিভিন্ন রঙয়ের পেন্সিল বের করে দিতেন যেগুলোর সাইজ এক-আঙ্গুলেরও অর্ধেক। পড়ানোর শেষে যাওয়ার আগে প্রায়শই বলতেন “ডাক্তার বাবুকে বলবে, ‘স্যর ঠিক ঠিক চালচ্ছেন’।” শেষের এই ‘চালাচ্ছেন’ বা ‘পড়াচ্ছেন’ এই অংশটুকু প্রায়শ ছাত্রদের মুখ থেকে বলিয়ে নিতে ভালবাসতেন। সেটার একটা পদ্ধতি ছিল। তিনি বলতেন “স্যর ঠিক ঠাক” বলে মাথাটা ডান দিকে হেলিয়ে ‘হ্যাঁ সূচক’ কিছু বলার কাজটা শ্রোতাকে দিয়ে করিয়ে নিতে চাইতেন। যতক্ষণ পর্যন্ত পরিপূরক কিছু না বলা হত তিনি তাঁর নিজের মাথা ডান দিকে আরও ঝুঁকিয়ে চলতেন। আমার দাদা দুষ্টুমি করে কখনও কখনও স্যরের অনুকরণে মাথা ঝুলিয়ে যেত। ছাত্র ও শিক্ষক সেরকম করতে করতে যখন মাস্টার মশাইয়ের মাথাটা প্রায় টেবিলের কাছাকাছি চলে যেত তখন দাদা বলত “চালাচ্ছেন”। মহানুভব মানুষটিকে তাতে কখনও বিরক্ত হতে দেখিনি।

আমি তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র ছিলাম না; তার কারণ আমি বাংলা পড়ার সুযোগ পাইনি। ছোট থেকেই উর্দু-আরবি-ফার্সি পড়তে হতো। কিন্তু মাস্টার মশায় আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি সপ্তাহান্তে রবিবার হাটে যেতাম। মাঝে মধ্যে তাঁকে দেখতে পেতাম কেনাকাটার পর একটা বইয়ের ভিতর থেকে টাকা বের করে বিক্রেতাকে দাম মেটাচ্ছেন। তাঁকে দেখতে পেলেই আমি তাঁর কাছে গিয়ে নমস্কার করলে সবরকম কুশল জানতে আগ্রহী হতেন। তারপরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ নিতেন; বিশেষ করে অধ্যাপক কক্ষের আরাম কেদারায় এখন কোন অধ্যাপকরা বসেন জানতে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। আমি তাঁর কৌতুহলের মধ্যে অস্বাভাবিক তীব্র নস্টালজিয়া দেখতে পেতাম।

আমার বাবা ছিলেন মাস্টার মশাইয়ের পারিবারিক ডাক্তার। প্রয়োজনে সকালের দিকে বাবার কাছে আমাদের বাড়িতে তিনি আসতেন। একদিন তিনি এসে বৈঠকখানায় বাবার জন্য অপেক্ষা করছেন। নমস্কার করে তাঁর কাছে বসে বললাম যে ‘আপনাকে একটু পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছে।’ বললেন “তুমি ঠিকই বলেছ। মেয়ের বিয়েতে খুব খাটাখাটুনি গেল; তাই হয়ত পরিশ্রান্ত দেখাচ্ছে।” বললাম, স্যর মেয়ের বিয়ে দিলেন সে তো খুবই আনন্দের কথা। তা পাত্র কেমন? কী করে? মাস্টার মশাই উত্তর করলেন “হ্যাঁ মেয়ের বিয়ে দিলাম, সত্যিই খুব আনন্দের কথা। তা পাত্র আমারই মত এম এ, বি এড। আর আমারই মত উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষক। খুবই সু-পাত্রে পাত্রস্ত করতে পেরে ভালই লাগছে।” আমি হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে বসলাম যে, “স্যর দেনা-পাওনা কিছু ছিল নাকি?” উত্তরে বললেন “তা ছিল বৈকি! প্রায় এক লাখ দিতে হল!” আমি বলে ফেলি তাহলে যে বলছিলেন সুপাত্র! তিনি বললেন ‘হ্যাঁ একদিক দিয়ে তুমি ঠিক। অত শিক্ষিত হয়েও পণ নিল; এটাতো ভাল হওয়ার লক্ষণ নয়।” আমি অতি সরল মাস্টার মশাইকে ব্যথা দিতে চাইনি। বললাম, ঠিক আছে স্যর, আপনার ছেলের যখন বিয়ে দেবেন তখন ঐ টাকাটা মেয়ের বাপের কাছ থেকে নিয়ে আপনি উসুল করে নেবেন। উত্তর শুনলাম “আমার তো কোন ছেলে নেই – থাকলে না হয় টাকাটা উসুল করতে পারতাম। দুঃখটা তো সেখানেই।” 

prof_badiur@rediffmail.com 

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.