Monday, April 15, 2019

অনিন্দিতা মণ্ডল

sobdermichil | April 15, 2019 |
পর্ব ৪

মাতৃতন্ত্রে মাতৃআরাধনা এবং মাতৃত্বর গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেই সময় পেরিয়ে আমরা এসে পড়েছি মাতৃতন্ত্রের কণ্ঠরুদ্ধ হচ্ছে যখন, সেই কালে। সৃষ্টির প্রকাশ যখন প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে নারীর মধ্যেই দেখা যেত তখন মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করেছে, সমীহ করেছে। নারীর ঋতুকালকে পবিত্র কাল ধরা হয়েছে। কারণ রজঃস্বলা নারী প্রাণদানের উপযোগী শরীর পেয়েছে। সে তাই ঈশ্বরী। আরাধনা করতে হয় তাকে। সেই ধারণা বদলে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ঋতুমতী নারী অশুদ্ধ। অশুচি। দেবতার স্থানে, পুজার স্থানে তার প্রবেশ নিষেধ। আশ্চর্য! কিন্তু এমনটা হলো কি করে? আরেকটু দেখা যাক। ঋক বেদের পুরুষসুক্ত। সেখানে পুরুষকে সহস্রচক্ষুর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। সে সর্বময়। সর্বাত্মক অস্তিত্বে সে বিশ্বে নিজেকে প্রকাশ করছে। কেমন করে? যেমন করে তার রেত নিম্নগামী হয়ে সৃষ্টি করছে প্রাণ। সেটিই সৃষ্টিবীজ। নারী ধারয়িত্রী। পুরুষ শুচি। সর্বকালে সে পবিত্র। কারণ তার শরীরে রেত সৃষ্টি হয়। নারী নির্বীজ। সে শুধুই ধারণ করে। যেমন করে এই পৃথিবী ধারণ করে বীজ। উদ্ভিদ তার ভুমিকে উদ্ভিন্ন করে জেগে ওঠে। তাই ঋতুকালে নারীস্পর্শ অনুচিত। রজঃস্বলা নারী স্নান শেষে পুরুষের সঙ্গে মিলনে যাবে। কিন্তু তাই কি? বিজ্ঞান কি বলছে? শুধুই শুক্র প্রাণের বীজ? গমনশীল বলে? নারীর ডিম্বাশয় থেকে যে ডিম্বাণু ঋতুচক্রের বিশেষ সময়ে শুক্র দ্বারা নিষিক্ত হয় সেটিই তো ভ্রূণ হয়ে ভবিষ্যতের আলো দেখার অপেক্ষা করে! ডিম্বাণু স্থিত। স্বাভাবিক! পুরুষ তো সদা সঞ্চরণশীল। নারী তো সেই কোন কাল থেকে আপন ঐশ্বর্যে স্থিত! কিন্তু কি অদ্ভুতভাবে ধীরে ধীরে নানা গভীর দর্শনের মধ্যে দিয়ে জানানো হলো, পরম পুরুষ ঈশ্বর। নারী শুধু মানবী নয়, অবমানবী। তার মধ্যে রেত জন্মায়না। সেই রেত উর্দ্ধমুখী হয়ে সে উর্দ্ধরেতা হতে পারেনা। আর যার রেত নিম্নভুমি থেকে ওপরে না গিয়েছে সে আর সেই ঈশ্বরীয় আলো দেখবে কি করে? প্রাণের আলো? কারণ শুক্রই তো প্রাণ, ব্রহ্ম! (ছান্দোগ্য উপনিষদ – ৮/১২) এ একরকম বুঝিয়ে দেওয়া গেলো যে ঈশ্বর অতএব পুরুষ। অথচ আলোর আবার লিঙ্গভেদ হয় বলে আমরা জানিইনা। এইভাবে নারীর সৃষ্টিশীলতাকে একেবারে শূন্য করে দেওয়া হলো। বীজ না পড়লে যেমন প্রাণ জন্মাবেনা তেমনই বন্ধ্যাভূমিতে বীজ পড়েও প্রাণের উন্মেষ ঘটবেনা। সুতরাং নারীর সৃষ্টিশীলতা প্রয়োজন বৈকি! 

এরপর ঘটল অদ্ভুত সব সামাজিক পরিবর্তন। ঋকবেদের কাল ধরা হয় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দী বরাবর। সূত্রগুলি সেইসময় লিপিবদ্ধ করা শুরু হয়েছে। আমরা দেখতে পেলাম সেই বৈদিক সময়ে নারীকে কিভাবে অবমানবীর মর্যাদা দেওয়া শুরু হলো।

একটি অনুষ্ঠানের বর্ণনা দিই। স্ত্রী গর্ভবতী হলে পুংসবন অনুষ্ঠান করতে হতো (অথর্ব বেদ)। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে শুধুমাত্র পুত্রসন্তানের জন্যই এই যজ্ঞ। সমস্ত প্রার্থনাগুলিও পুত্রের জন্য, কন্যাসন্তান জন্মানোয় বাধা দেয়। এরপরের অনুষ্ঠানটি ভয়াবহ। সীমন্তোন্নয়ন। এতে যে নারীর স্বামী পুত্র জীবিত, শুধু তারাই গর্ভিণীর সামনে বীনা বাজিয়ে নাচবে গাইবে। তারপর রান্না করা ভাতের একটি পিণ্ড তার সামনে ধরে জিজ্ঞেস করবে – কি দেখছ? সে উত্তর দেবে – সন্তান। তারা উত্তরে বলবে – বীরপ্রসবিনী হও। (গোবহিলা গৃহ্যসূত্র) এইভাবে অনুষ্ঠান চলাকালে যাবতীয় প্রার্থনা স্বামী ও সন্তানের দীর্ঘজীবনের কামনা করে করা হয়ে থাকে। কোথাও নারীটির দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা নেই। কারণ সন্তান জন্মের পর তার মৃত্যু হলে স্বামী স্ত্রীর সৎকারের পরদিনই বিবাহ করতে পারে। 

পুত্র জন্মের পর মায়ের ভুমিকা কি ছিল? পটভূমিকায় মাতা হিসেবে তার নাম বহন করা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ পিতা তার হাত ধরে বাইরের পৃথিবীতে আনে। পাঁচ বছর বয়স হলেই সে গুরুগৃহে যায়। মাতার সংস্রব ত্যাগ করে। কি অপরূপ কৌশলে নারীকে তার ন্যায্য অধিকার, সন্তানসঙ্গের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

ক্রমশ
anindita.gangopadhyaya@gmail.com

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.