Thursday, February 21, 2019

পিনাকি

sobdermichil | February 21, 2019 |
 ধূসর সন্ধ্যার রঙ ...

খুব সকালেই আমার ঘুম ভেঙে গেল ! কানের সামনে যদি অনবরত ফোনের রিংটোন বাজতে থাকে , আর নিজের ঘুম তাতে ভেঙে যায় --- এমন একটা পরিস্থিতিতে কাকে দায় করব ? আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে ,মুমিনের ফোন । অনেক রাতে শুয়ে ছিলাম । বেশ কিছু লেখা লিখতে গিয়ে দেরী হয়ে গেল । 

আজ রবিবার , ইচ্ছা ছিল বেলা দশটা পর্যন্ত ঘুমাবো । আমাকে মাঝপথেই আমার ঘুম এর মায়া ছাড়তে হল ।

-হ্যাঁ মুমিন ।

-বেদ এক্ষুনি তৈরি হয়ে নে।

-কেন ?

-ত্রিনুদার বাড়ি যেতে হবে ।

-কেন বলত ? 

-ভাই এমন কিছু ঘটেছে যা আমাকে চমকে দিয়েছে ! 

-মানে ? 

-এইসব কথায় সময় নষ্ট হচ্ছে । তুই তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে ।

-যাব টা কোথায় ?

-আপাতাত ত্রিনুদার বাড়ি । 

-খবরটা কী ? 

মুমিন বলল – সব্যসাচী বণিক মারা গিয়েছে ! আরেকটু খুলে বলতে গেলে , এইমাত্র খবর পেলাম সকালে ঘর ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢোকে । অনেকক্ষণ ডাকলেও সারা দেয়নি । ভিতরে ধুকে দেখে বাথরুমে উল্টে পড়ে আছে । এই মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা । তবে আমার মনে হচ্ছে এর পিছনে কোন অপশক্তির হাত রয়েছে । 

আমার ত্রিনয়নদার মধ্যের যে সম্পর্ক ,তার শুরুটা আজ থেকে পাঁচ বছর আগে । তখন ত্রিনুদার বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ আর আমার আঠাশ । বর্তমানে আমি তেত্রিশ আর ত্রিনুদা চল্লিশ । মুমিন আর আমি সমবয়সী । এই পাঁচ বছরের অনেক অভিজ্ঞতার সাক্ষী থেকেছি আমরা । এইসব কিছু আর পাঁচজনের কাছে বুজরুকি বলে মনে হতে পারে । আমাদের কাছে এইসবটা অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা কখনই অলৌকিক নয় । প্রবল ভাবে লৌকিক।

ফোন পেয়ে নিজেকে প্রস্তুত করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই । আমি ভেবে সময় নষ্ট না করে বাথরুমে চলে গেলাম ।

ত্রিনুদার বাড়ির সামনে এসে দেখলাম মুমিন আর দাদা দাঁড়িয়ে আছে । ত্রিনুদা খদ্দেরের পাঞ্জাবি আর জিনসের প্যান্ট পড়েছে । মুমিন টিশার্ট আর ট্রাউজার ; আমিও তাই ।

মুমিন আমাকে বলল – কাল রাতেই ঘটেছে । আমি খবরটা মায়ের কাছ থেকে শুনি । প্রথমে চমকেই গিয়েছিলাম ।

ত্রিনুদা বলল – মুমিন আমাদের যাওয়াটা ঠিক হবে ?

-সব্যসাচীর বাবা –মা চাইছেন আমি যেনও তোমাকে নিয়ে আসি । বিশেষত কাকিমা বিশ্বাস করেন এই মৃত্যু সাধারণ নয় । এর পিছনে কোন রহস্যময় কারণ রয়েছে । আমাদের সেই কারণের সন্ধান করতে হবে ।

ত্রিনুদা বলল –মুমিন , আমরা শখে এইসব কাজ করিনা ।এটা আমাদের পেশা । তাই একজনের বাড়ির লোক যখন ভিতর থেকে চাইছে না তখন আমাদের এই সবে নাক গলিয়ে নিজেদের ছোট করাটা ঠিক নয় । তাছাড়া এখানে আমরা কেন যাব?

-আমি ওনাদের বলেছি আমরা তন্ত্র নিয়ে চর্চা করি । তুমি একজন তান্ত্রিক ।

ত্রিনুদা মুচকি হেসে বলল – এখানেই ঘেঁটে ফেললে ! এখনো আমাদের এখানকার অর্ধেকের বেশি মনে করে , তান্ত্রিক মানে সে জটাধারী হবেন , হাতে নরমুণ্ড আর মৃত মানুষের হাড় নিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করতে –করতে অলৌকিক ভূতের খেলা দেখাবে !! আমাদের এখানে ওঝা , তান্ত্রিক , প্রেতবিশারদ , জ্যোতিষ সব্বাই এক ছাতার তলায় । সত্যি বলতে আমরা সকলেই এইসব পেশার মানুষদের সিনেমায় দেখতে বা গল্প উপন্যাসে পড়তে ভালোবাসি ; সামনা –সামনি দেখলে বুজরুকি ভাবি । আমার মনে হয় সখের এইসব করে লাভ নেই । 

-দাদা , আমি ওদের কাছে তান্ত্রিক ছাড়া আর কি বা বলতাম ! তুমি তন্ত্র নিয়েই গবেষণা করছ । চর্চা করছ । বিদেশী নামকরা পত্রিকায় নিয়মিত তোমার জার্নাল ছাপা হয় । যে যাই ভাবুক আমাদের উচিত একবার অন্তত কাকিমার কথা ভেবে যাওয়া ।

আমি বললাম – আমারও তাই মনে হচ্ছে ।


নেতাজীনগর আদর্শপল্লী তে এতো সকালে একটা কাণ্ডই হয়ে গিয়েছে ! পুলিশের ভ্যানটাকে দেখেই বুঝতে পারলাম ,সব্যসাচীর প্রাণহীন দেহটা নিয়ে যাওয়া হবে । আমি ভাবছিলাম সব্যসাচীকে এখন তার নিজের নামে ডাকা যাবে ! মানুষ বেঁচে থাকলে তার যে পরিচয় থাকে , মৃতদেহ হয়ত পরিচিত মানুষটির পরিচয় পায় না ! এই পৃথিবীতে মৃতদের পরিচয় শুধুমাত্র তার কীর্তি । জীবিতরা তাই নাম পায় আর জীবিত ব্যক্তি মৃত হলে লাশ হয়ে যায় ! সব্যসাচী এখন লাশ । এর উপর আত্মহত্যার ব্যাপার । আজ মন খুব খারাপ লাগছে । কেন লাগছে ? এই ছেলেটি আমার পরিচিত নয় , তিনতলা থেকে মায়ের যে তীব্র বুক ফাটা আর্তনাদ ভেসে আসছে ...। আমি বেশীক্ষণ এখানে থাকতে চাইনা । কিন্তু ত্রিনুদার জন্য এখানে থাকতেই হবে । আমি এতটুকু বিশ্বাস করি কিছু বুঝেই ত্রিনয়ন ঘটক এখানে এসেছে । 

ত্রিনয়ন ঘটকের সাথে আমার প্রথম পরিচয়ের গল্প আজও মনে আছে । তারপর বেশ কয়েক বছর তার সাথে এক অদ্ভুত আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়েছে । আমাদের মধ্যে সম্বোধনে দাদা আর ভাইয়ের সম্পর্ক হলেও , ত্রিনুদা আমার অভিভাবক থেকে কম নয় । আবার আমিও তার বন্ধু হয়ে উঠি কখনো । মুমিন আমার বন্ধু নয় ,ওর সাথে আলাপ হয় ত্রিনুদার বাড়িতেই । আমার সাথে পরিচয় হওয়ার একবছর আগে ত্রিনুদার সাথে মুমিনের পরিচয় । 

আমরা সিঁড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছি । তিনতলায় সিঁড়ির কাছে আসতেই দেখলাম , ছেলেটির মৃত দেহ নিয়ে যাচ্ছে ! আমি দেখে আচমকাই ভয় পেয়েছি ! এমনটা কেন হল ? হয়ত এই দৃশ্য আগে দেখবার অভিজ্ঞতা ছিল না বলেই । আমার দিকে মুমিন তাকিয়ে ঈশারা দিল । ত্রিনুদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওর চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে । উল্টো দিকে থেকে সব্যসাচীর বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন । তিনি মুমিনের দিকে এগিয়ে বললেন – ভোরের দিকেই ...

ভিতর থেকে একজন বিধবা মহিলা বেরিয়ে এলেন , বললেন – দিদি আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে ।

সব্যসাচীর বাবা তাড়াতাড়ি ছুটে গেলেন !

আমরা নিচে নামছি । সামনে লাশ । আমার মনে হচ্ছে এক্ষুনি যদি সাদা কাপড় সরে যায় ! সব্যসাচীর বীভৎস মুখটা দেখব ! যন্ত্রণায়বিদ্ধ মুখ দেখে আঁতকে উঠব । এই মৃত্যু সাধারণ নয় । এই মৃত্যুর পিছনে অলৌকিক কোন শক্তি কাজ করেছে ; ত্রিনুদা আর মুমিন তাই ভাবে । 

আমরাও নামছি আর সাথে -সাথে আগে মৃতদেহটাও নিয়ে চলেছে চারজন ডোম । আমি কোন ভাবেই লাশের দিকে চোখ দিচ্ছিনা পাছে চোখে পড়ে যায় ! আর চোখে পড়লেই আজ সারাদিন এই রেষ থেকে যাবে , মৃত মানুষের মুখের শেষ কষ্টের ছাপ , আমাকেও ভারাক্রান্ত করে তুলবে ! আমি যতটা পারছি নিজেকে সরিয়ে রেখেছি । 

আমরা নেমে এলাম । লাশটাকে পুলিসের প্রিজম ভ্যানে তোলা হল । একজন পুলিস অফিসার আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন ।

-আপনারা ?

ত্রিনুদা কিছু বলবার আগেই , একজন বছর চল্লিশের লোক এগিয়ে এসে বললেন – এনারা সব্যসাচীর মক্কেল । 

মুমিন বলল – হ্যাঁ , খবরটা শুনে বিশ্বাস করতে পারিনি ।

অফিসার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন – ভদ্রলোক পয়সাওয়ালা বাড়ির ছেলে । নিজেই সুইসাইড করেছে । তবে কারণ হয়ত আছে । মানসিক চাপেই , গলায় দড়ি দিয়েছে । তদন্ত চলবে । আপনারা কিছু বলতে পারবেন ?

মুমিন বলল – আমাদের সাথে অনেকদিনকার পরিচয় নয় । সব্যসাচীর সাথে দেখা করিয়ে দেয় পলাশ দা । নতুন একটা কেস নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল । কিছু ভাড়াটিয়া সংক্রান্ত ব্যাপার । তারমধ্যেই ...

অফিসার আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন – সেই সময় উনি কিছু বলেছিলেন ?

-না । 

এইসব কথা যখন হচ্ছিল , আমার চোখ খোলা প্রিজম ভ্যানের লাশের উপর গিয়ে পড়ল । গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে । আমরা গাড়ির পিছনে কিছুটা দূরে গল্প করছি , ওখান থেকে ভিতরটা দেখা যায় । আমি দেখলাম এই মুহূর্তে লাশটাকে দেখে মনে হচ্ছে একজন মানুষ শুয়ে আছে , শীতে মাথা পর্যন্ত নীল রঙের প্ল্যাস্টিক বাঁধা । কাল শেষ রাত পর্যন্ত যে বেঁচে ছিল , আজ মৃত ! জীবন আর মৃত্যু পাশাপাশি হেঁটে চলেছে । 

আমি লাশটার দিকে চেয়ে দেখছি , মনে হলও লাশটা আমাদের প্রতি ভীষণ রেগে আছে ! এমন হয় নাকি !! ত্রিনুদার সাথে থাকতে -থাকতে এইসব ভাবনা ,ভাবতে শুরু করেছি । 

ত্রিনুদা আমার কাঁধে হাত দিয়ে বলল –এতো ভাবিস না । ভাবনার একটা শক্তি থাকে । মৃত মানুষের দেহ খারাপ ট্রান্সফরমারে মতন , সেখানেও অনেক নেতিবাচক তরঙ্গ থাকে । তোর চিন্তা সেই তরঙ্গে মিশলেই গণ্ডগোল । 

অফিসার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন - যার যাওয়ার সে যাবেই । আমরা শুধু সেই যাওয়ার কারণ খুঁজতে পারি । 

আমি বললাম - ঠিক বলেছেন স্যার ।

অফিসার হেসে বললেন – আমাকে প্রিতম বলেও ডাকতে পারেন । প্রিতমদা বলুন । আমরা প্রায় কাছাকাছি বয়সের । 

আমার এইসব কথা কানে আসছিল না । মনে হচ্ছে ওই লাশটার ভিতর হিংসা , দ্বেষ , ঘৃণার বারুদ জমে রয়েছে । বিস্ফোরিত হতে দেরী নেই ! কিন্তু কেন এমন মনে হল ?

ত্রিনুদা আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলল –বেদ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো । তুমি দুর্বল নও । 

মুমিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল , - নিজের চিন্তাকে থামা, নচেৎ ভবিষ্যতে খুব সমস্যা হবে ।

মাথাটা ভারী হয়ে আসছে । প্রিতম বাবু আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন – এতো সকালে পরিচিতের মৃতদেহ দেখেছেন , এমনটা হওয়া স্বাভাবিক ।

আমি এতটুকু বুঝে গিয়েছি , এই মৃতদেহের মধ্যে এমন রহস্যের বীজ পোঁতা হয়ে গিয়েছে , যার সন্ধান ওরা পেয়েছে । এই পুলিস অফিসারটির কাছে এই মৃত্যু , নেহাত সুইসাইড হলেও ; ত্রিনুদাকে এই মৃত্যু রহস্য আকর্ষিত করেছে । খুব শীঘ্রই আমরা নতুন রহস্যে ঢুকতে চলেছি ... 


বিছানায় চিত হয়ে প্রথমে কোমর ভাঁজ করে দুটো কাঁধের দিক থেকে যাওয়া হাত দিয়ে ঠেলছে । পায়ের তালু দিয়েও ঠেলছে ,ক্রমশ পুরো শরীর উল্টিয়ে চক্রের মতন মাথা নরম বিছানায় ছুঁয়ে রয়েছে । এটাকে চক্রাশন বলে । ত্রিনয়নদা প্রায় পনেরো মিনিট এমন ভাবেই থাকবে । পনেরো হতে দুমিনিট বাকী । 

এই আসনটা প্রতিদিন ত্রিনুদা করে । আমিই আজ এতো সকালে চলে এসেছি । এই আসবার পিছনে কারণ আছে । ত্রিনুদাই ফোন করে ডেকেছে । এখন ঘড়িতে সকাল ছটা । আজ আমি পাঁচটায় উঠেছি । ঠাণ্ডা বাড়ছে । আমি দেখলাম এই ঠাণ্ডার মধ্যেও খালি গায়ে নির্বিকার হয়ে ত্রিনুদা শরীরচর্চা করে চলেছে । বাড়ির ছাদেই মাদুর বিছিয়ে তার উপর নরম চাঁদর দিয়ে এই বিছানা তৈরি করেছে । 

এই চক্রাশন দেহে জাদু করে ! নিজের বয়েসকে একটা জায়গায় থামিয়ে দেয় । সুখাশনে , মানে লম্বা হয়ে শুয়ে সাধারণ ভাবে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল – বেদ ভোরবেলা উঠে ব্যায়াম করবে । দেহ সবসময় ভালো থাকবে । সাথে মন চাঙ্গা থাকবে । 

আমি বললাম – অবশ্যই । 

ত্রিনুদা গায়ে সাদা রঙের সিল্কের উত্তরীয় জড়িয়ে বলল – লেখা কেমন চলছে ? 

-কাল মাঝরাত পর্যন্ত একটা লেখা লিখেছি । চোখ ঘুমে ভরে আছে । তুমি ডাকলে কেন ?

- একটা খবর দেওয়ার জন্য ।

-খবর!!

-সব্যসাচীকে কাল রাতে দেখা গিয়েছে ।

-মানে !!!!!!!!!!

এক ঝটকায় ত্রিনুদার কথা শুনে আমার চোখে ভারী হয়ে আসা হয়ে ঘুম পাতলা হয়ে গেল ! বিদ্যুত খেলেছে । আমি বললাম – মৃত মানুষ বেঁচে ওঠে !

-না উঠবার কিছু নেই । মৃত এই ব্যাপারে সন্দেহ নেই । তবে বেঁচে ওঠেনি । সুস্থ মানুষ কখনই রাত তিনটে তে ছাদে পায়চারি করেনা । আর কোন মানুষকেই কোন ভাবেই প্রকৃতির বিপক্ষে গিয়ে বাঁচানো সম্ভব নয় । তবে অনেকে মন্ত্র শক্তি দিয়ে সেই মানুষের আত্মাকে ক্রীতদাস করে ব্যাবহার করে । এটাও প্রকৃতির বিরদ্ধাচারন । 

-মানে বলতে চাইছ সব্যসাচীকে ঘিরে তন্ত্রের পরিবেশ তৈরি হয়েছে !

- তুমি সেইদিন লাশের দিকে তাকিয়ে যা ভাবছিলে তা আমি টের পেয়েছিলাম । তাই নিষেধ করছিলাম , মৃতদেহের থেকে যে তন্ত্র করা তরঙ্গ আসছিল ,সেটাকে কোন ভাবেই যেন তোমার চিন্তা গ্রহণ না করে । নতুবা তোমার মনকে মন্ত্র শক্তি দখল করে নেবে । তোমার বাড়ির হদিশ পেয়ে যাবে । তাইতো আমি কথা বলে তখন তোমার মনঃসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছিলাম । 

আমি কিছু বুঝতে পারছিলাম না ! এতো দ্রুত সব ঘটে গেল যে মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি ত্রিনুদাকে বললাম 

-মুমিন জানে ?

-মুমিন আমাকে ফোন করে সব বলেছে । আজ রাতে কথা হবে । তুমিও চলে এসো । মুমিনের মুখ থেকেই শুনবে । 

রাত দশটার সময় গোল করে আমি আর মুমিন বসলাম খাটের উপর । ত্রিনয়নদা শুয়ে আছে । মুমিন বলল – কাকিমা ঘটনার দিন রাতে অনেকক্ষণ ছাদে ঘুরছিলেন । আচমকাই দেখতে পেলেন সব্যসাচীকে ! কাকিমা প্রথমে চমকে গিয়েছিলেন , তারপর ভাবলেন আজ সারাদিন যা দেখেছেন তা শুধুমাত্র স্বপ্ন ছিল । বাজে স্বপ্ন। এইসব ভেবে নিজের ছেলের দিকে এগিয়ে চলেছেন । সব্যসাচী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল । তার চোখের মনি স্থির আর শক্ত । ভাবলেশহীন । অনবরত সেই দিকে তাকিয়ে আচমকা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন । 

মুমিনের মুখে শুনে আমার মনে হচ্ছিল , এইসব স্রেফ চোখের ভুল হবে হয়ত । এটা স্বাভাবিক । ত্রিনুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল – তোর ভাবনাটা ভুল নয় । তবে আমার মনে হচ্ছে , সব্যসাচীকে তন্ত্র করে খুন করা হয়েছিল। ত্রিনুদা উল্টোদিকের মানুষের মন পড়তে পারে । আমার দিকে তাকিয়ে বলল – কাল আমরা যাব ।

-আমি বললাম কিন্তু ওনাদের কিছু না জানিয়ে !

ত্রিনুদা বলল - সব্যসাচীর বাবা আমাকে ফোন করেছিলেন । তাই আমরা এখন থেকে এই তদন্তের সাথে যুক্ত হয়ে পারি । 

আমরা অনেক সময় মনে কিছু ভাবলে ,মুখে ফুটে ওঠে । অনুভূতির নিজস্ব মানচিত্র রয়েছে । ত্রিনুদা সেই অনুভূতি মানচিত্র পড়তে পারে । এরজন্যই অনেকে আচমকা তার কথা শুনে ভাবে , এটা একটা অলৌকিক ব্যাপার ! ত্রিনুদা এটাকে প্রবল লৌকিক বলেছে । দীর্ঘ অনুশীলন আর মনঃসংযোগের ফলে , মানুষের মুখের উপর ভেসে ওঠা মনের গোপন কথাটা জানা যায় ; এটাই হয়ত কবির ভাষায় –‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে ...’


আমরা খুব সকালবেলাতেই চলে এলাম । আমার সম্পাদক খুব খেচ –খেচ করছিল । স্বাভাবিক , অফিস ফাঁকি দিয়ে এইসব তদন্ত সম্পাদকের একদম পছন্দ নয় । তাকে বোঝাবো কেমন করে ,আমার কাছে অফিসটা দরকারি অনলাইন ম্যাগাজিনটার জন্য । এই ম্যাগাজিনে পাঠকদের কাছে ত্রিনুদার কথা বলতে হলে আমাকে সেই জায়গায় থাকতে হবে । আমি অতিরঞ্জিত করে লিখতে পারিনা । আমি অদক্ষ লেখক । অনেক চেষ্টা করেছি নিজের বই ছাপাতে , প্রকাশকরা লাল –লেবুচা সামনে রেখে বলেছে –‘ এইবারেরটা থাক পরের বইমেলায় দেখছি ...’ 

আমি বুঝতে পারছি আমার আর নিজের বই প্রকাশ দেখা হবে না । এইসব কিছু মেনে নিলেও আমার একজন সুন্দরি রুচিশিলা পাঠিকা রয়েছেন । ত্রিনুদার গল্প তাকে শুনিয়েছি । কখনো পাশ আবার কখনো ফেল ! নতুন তদন্তের কথা জানতেই , আমাকে সাবধান করে দিয়েছে --- ত্রিনুদার সাথে জায়গায় না থেকে ,একটা শব্দ যেনও বানিয়ে না লিখি !!

বেলা দশটা বেজেছে । বিছানায় শুয়ে সব্যসাচীর মা । পাশে আমরা বসে । ত্রিনুদা বলল 

-আপনি ঠিক কি দেখেছিলেন ?

-আঁধার রাতে সে আসছে ! কেউ বাঁচব না ! মৃত্যু সামনেই ...

কথাটা শুনে আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল । ক্ষীণ , পাতলা স্বর । তবুও স্পষ্ট । এমন ভাবে বললেন ,যেনও উনি নিশ্চিত এই মৃত্যু আসবেই । ত্রিনুদা বলল 

-কার মৃত্যু ?

-মানুষের । গলা কাটা মানুষের । ওরা আমার চারপাশ ছারখার করে দেবে । বইয়ে দিল রক্তগঙ্গা ! এতো লাল , আমি আগে দেখিনি !!!

-কেমন মৃত্যু ?

-ভয়ানক । একটু –একটু করে তোমার আস্তানা দখল করে নেবে । 

-কেমন দেখতে ?

নিভা দেবী চুপ করে চেয়ে রইলেন । স্থির তার চোখের মনি । কেউ দেখলে ভাববেন এমন স্থির ভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে কেন ? আমার কানের কাছে ওনাদের পারিবারিক ডাক্তার মুখ এনে বললেন – এটাই রোগ । স্নায়ুর কঠিন অসুখে ভুগছেন । এমন ভাবেই বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থাকবে । এইসময় কোন হুঁশ থাকেনা । 

ত্রিনয়নদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল – আমাদের আবার আসতে হবে ।

পাশেই বসে আছেন সব্যসাচীর বাবা অশনি বণিক ত্রিনুদাকে বললেন – কাল একবার আসতে পারবে ?

ত্রিনুদা বলল – এই নিয়ে এতো ইতস্তত করবেন না । এখানে পেশাদারিত্ব আগে । আমার কাছে সন্তোষজনক তথ্য না এলে , আরও অনেকবার আসতে হবে ,আসবো । 

আমরা রাস্তায় নেমে এসেছি । বেলা বারোটায় মাথার উপর রোদ নিয়ে হেঁটে চলেছি । আমি বললাম 

-কিছু বুঝলে ?

পকেট থেকে হজমোলার শিশি থেকে দুটো বড়ি নিয়ে মুখে পুড়ে দিল । বলল - সব কিছু বোঝা যায় না ,অনেক কিছু বুঝে নিতে হবে ।

মুমিন বলল – আমার কাজ এখন তাহলে কী ? 

ত্রিনুদা হেসে বলল - তুই কিছুদিন এই বাড়িই চারপাশে নজর রাখবি । প্রয়োজনে আমার হয়ে থানায় যেতে হবে । আমি জানিনা আদৌ পুলিশ আমাদের কতটা সাহায্য করতে পারবে !

-তুমি কিছু বুঝতে পারলে ?

আমি কথা গুলো বললাম , ত্রিনুদার দুই চোখে হাল্কা উদ্বেগ খেলা করছে ! আমি দেখেছি । 

-মাত্র কয়েকটা কথায় কিছুই বোঝা যায়না বেদ । আবার অনেক কিছুই বোঝা যায় । আমরা যা বুঝি , সেটা নিজেদের বোঝার উপর নির্ভর করে । নিভা দেবী আমাকে কিছুই বললেন না । শুধুই এমন কিছু সম্ভাবনার কথা বললেন , যা আমি নিজেও বুঝতে পারছিনা !

-বুঝলাম না । 

-আমিও বুঝতে পারছি না , সব্যসাচীকে দেখবার বিবরণটা জানতেই পারলাম না । যতটুকু বললেন তাতে ভীষণ ভাবে অজানা একটা মৃত্যু ভয় ছিল ।

মুমিন বলল – ত্রিনুদা এটা হয়ত স্নায়বিক সমস্যা , মানে ছেলেটা আত্মহত্যা করেছে । বয়স এমন কিছু নয় । তাতে এমন ভাবে আচমকাই যে দুর্ঘটনা ঘটেছে তাতে আমরাই মেনে নিতে পারিনি । একজন মায়ের পক্ষে এমন ব্যবহারটাই স্বাভাবিক । হয়ত তন্ত্র বলে এখানে কিছুই হয়নি । 

ত্রিনুদা মুমিন আর আমার দিকে তাকিয়ে বলল , সামনেই মোড়ের মাথায় একটা আশ্রম আছে । তার সামনেই মিষ্টির দোকান । যদিও এখন প্রায় মাঝদুপুর ,তবুও কচুরি , ছোলার ডাল আর জিলিপি চলতে পারে । তোদের ?

ত্রিনুদার এই অভ্যাস নতুন নয় । আগেও দেখেছি যখনই গল্পে চমক থাকে বা থাকবার আভাস পেয়ে যায় , কিছুক্ষণের জন্য ঝুলিয়ে রাখবে । মুমিন বলল – দাদা তারমানে তুমি কিছু দেখেছো । বুঝেছও । 

ত্রিনুদা হাসল । বলল - ক্ষিধের সময় খাবার পেটে না গেলে আমার আবার বুদ্ধি খোলে না...। 

কচুরি গুলোর উপর ত্রিনুদা বিন্দুমাত্র দয়া দেখাচ্ছে না । ছোলার ডালে মেখে মুখে পুড়ে দিল । টেবিলের মুখোমুখি আমরা বসে আছি । মুমিন বলল - তুমি জানলে কেমন করে ? 

ত্রিনুদা হাসছে । তারপর বলল - সব্যসাচীর মৃতদেহ আমরা কতজন দেখেছি । 

-মানে !

-যেই দিন ওর লাশটা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল , আমরা দেখেছি ?

-আমি দেখেছি । কেন বলতো ?

-মুমিন তুমি কিছু দেখেছো ? 

-মুখটা ভয়ানক হয়ে গিয়েছিল ! ব্যাস এটাই । এছাড়া আর কিছু দেখিনি ।

-একজন তান্ত্রিক এখানেই আলাদা ! দেহকে মন্ত্রের দ্বারা দখল করে নিলে , সেই দেহ এক অন্য রকমের হয়ে ওঠে । মন্ত্র বেশ শক্তিশালী । আমি সব্যসাচীর মুখে মৃত্যুর আগে ভয়ের ছাপ দেখেছি । গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকবার জন্য , মুখ বিকৃত হয়ে গিয়েছে । তবে বিকৃত মুখের ভিতর চাপা থাকা ভয়ের হদিস পেয়েছি । সেখান থেকেই আমার চিন্তা শুরু । ওদের বাড়িতে ঢুকেই ভীষণ দমবন্ধ করা পরিবেশ আমি টের পেলাম । আমার সন্দেহ এখান থেকেই শুরু । এরপর বেদ তুমি যেমন ভাবে লাশটার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছিলে আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম , মৃতদেহটাতে তন্ত্র প্রয়োগ করা হয়েছে । আমার বলতে একটু ভুল হলও , তন্ত্র একটা সংস্কৃতি । আসলে সব্যসাচীকে কোন মন্ত্রের দ্বারা ধীরে –ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল । আর সব্যসাচী নিজের হাতে নিজেকে হত্যা করলেও , এই হত্যার পিছনে সেই অদৃশ্য কালো শক্তির হাত রয়েছে । এরপর আজকে যখন নিপা দেবীর মুখে সেই কথা শুনলাম আমি নিশ্চিত এখানে কেউ কালো শক্তির খেলা খেলছে ।

আমি ভাবছিলাম , ত্রিনুদা যেইসব কথা গুলো বলছে , তা মোটেও বানানো হয় । আমরা যারা ওর কাজের সাক্ষী রয়েছি , তারা দেখেছি । আমি নিশ্চিত এই কাজেও আরও অনেক কিছু আমরা দেখব , যা আগে কল্পনা করতে পারিনি ! 

ত্রিনুদা বলল –আমার মনে হচ্ছে সব্যসাচী মৃত্যুর আগে এমন কিছু দেখে ফেলেছিল ; আর নিপা দেবী বর্তমানে সেই দিক দিয়েই যাচ্ছে ।

মুমিন বলল – তুমি বলতে চাইছো , মা আর ছেলে একই ব্যক্তি দ্বারা আক্রান্ত ।

ত্রিনুদা একটু শব্দে ‘হাঃহাঃ’ হেসে উঠল । আমি আর মুমিন ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না । ত্রিনুদা বলল – ব্যাক্তি না সমষ্টি ,মানুষ না মন্ত্র , শরীর না প্রেত ---- আমরা কেউই জানিনা । এতটুকু নিশ্চিত দু’জনেই এমন কিছু দেখেছে , যা সুস্থ মানুষের চোখ মেনে নিতে পারবে না । আমরা কিন্তু সেই কারণটার পিছনেই ছুটছি । সত্যি বলতে যতক্ষণ পর্যন্ত সেই অদৃশ্য কারণের সামনে যেতে না পারছি , রহস্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারব না । 

আমাদের খাওয়া হয়ে গিয়েছে । শেষপাতে মিষ্টি চাই । ত্রিনুদার লাল জিলিপি রসে চোবানো খুব প্রিয় । অবশ্য এই বেলায় জিলিপি পেলাম না , তবে কালো পান্তুয়া মুখে পুরে দিলাম । বললাম 

-তারমানে এই রহস্যের কাছাকাছি যেতে হলে কোন পথ দিয়ে হাঁটব ?

-বেদ , রহস্য আমাদের নিজের দিকে টেনে নেবে । শুধু তার কাছাকাছি থাকব । 

মুমিন বলল – ত্রিনুদা , তন্ত্রে এমন কোন দিক আছে , যেখানে মৃত ব্যক্তির চেহারা নিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো যায় ! 

ত্রিনুদা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল । 

-তন্ত্র একটা জীবন পদ্ধতি । সংস্কৃতি , যা সনাতন ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ পৃথক । যদিও বেদের প্রভাব তন্ত্রে রয়েছে । এখানে মানুষের ইচ্ছাশক্তিকে নিজের আয়ত্তে এনে ,বশীভূত করা যায় । আবার আত্মাকে নিয়ন্ত্রিত করে প্রেতে রূপান্তরিত করাও সম্ভব । এখন কথা হচ্ছে এই কাজটি যিনি করছেন , তিনি কতটা পারদর্শী । সাধক ছাড়া এমনটা করতে পারবেনা , তবে শুধু সাধক হলেই হবে না । উত্তম সাধক হতে হবে । 

মুমিন বলল – যদি কেউ উত্তম সাধক না হয়েও , এমনটা করেন ? 

ত্রিনুদা চোখ দুটোকে গোল করে বলল – ফলাফল ভয়ানক হতে পারে । সাধক নিজের ক্ষতি করবে , সাথে তাকে ঘিরে থাকা আরও অনেকেই সেই ফলাফলের অভিশাপে অভিশপ্ত হয়ে উঠবে । 

আমি বললাম – তুমি নিজে দেখেছো ?

-দেখেছি । 

-তোমার অভিজ্ঞতা আমাদের বলও ।

-সব কথা , সবসময় একসাথে বলতে নেই । সঠিক পরিস্থিতির অপেক্ষা করতে হয় । 

মুমিন বলল –দাদা মনে হচ্ছে তোমার গল্প বেশ কিছুটা সময় নেবে । তিন ভাঁড় দুধ চা অর্ডার দেব ?

ত্রিনুদা হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল , তিনটে । গালে হাত ঘষতে –ঘষতে বলল – দোকানে সবাই ঝিমুচ্ছে । আমাদের মুখ দেখে এনারা বুঝতেই পেরেছেন , আমরা ভদ্রলোক । তাই তাড়া দিল না । দেখে এখানেই গল্প শুরু করি , ওরা চারটের কাছাকাছি এলে তিন ভাঁড় দুধ চা এর অর্ডার দিস । 

আমাদের সামনে থেকে থালা নিয়ে গেল । আমরা মুখ ধুয়ে আবার নিজেদের জায়গায় বসলাম । দোকানের একদম শেষের টেবিলে বসলাম । ত্রিনুদার মুখোমুখি আমি ও মুমিন । ত্রিনুদা গল্প শুরু করল । 


আজ থেকে বছর কুড়ির আগেকার কথা । এই সব সাধনা সকলেই গোপনে করে । সাধক একা নিভৃতে নিজের শক্তি বৃদ্ধিতে ব্যস্তা। আমি খুঁজে চলেছি । 

আমার বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে এসেছি । আমরা দু’জনেই কলেজে পড়ি ; সেখান থেকেই আলাপ । আমি শুনেছি ওদের পরিবার দীর্ঘ দিন ধরে তন্ত্র উপাসনা করে আসছে । আমি অবশ্য ছেলেটির মুখেই শুনেছি , তাদের এই সাধনা দেখবার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ করেছিল । 

মুমিন বলল - তুমি গিয়েছিলে ? 

-আমি তখনো তন্ত্র নিয়ে কিছুই বুঝতাম না । তবে এতোটুকু টের পেতাম , আমি যেমন ভাবে আমার চারপাশকে দেখেছি বা দেখে আসছি তেমন ভাবে আর সবাই দেখেনা । অতীন্দ্রিয় অনুভূতি বলে কিছু থাকতে পারে , নচেৎ মাঝে -মধ্যেই আমার চোখ এমন কিছু দেখে ফেলে যা বর্ণনা করা যায় না । আমার এই অদ্ভুত ক্ষমতাকে আমি ক্রমশই ভয় পেতে শুরু করেছিলাম । আমরা সবাই অলৌকিক ক্ষমতার মালিক হতে চাই , কিন্তু চোখ বন্ধ করলে বা রাস্তায় যেতে গিয়ে যদি আমচকাই এমন কিছু দেখি যা আমার দেখা দুনিয়ার থেকে আলাদা তখন !

আমি বললাম – ত্রিনুদা , তুমি প্রায়শই কি দেখতে ?

-বেশ কিছু অদ্ভুত , অস্পষ্ট মানুষ । প্রায়ন্ধকার স্থানে আমার সামনে এসে যেতো । আমার গায়ে গা ঠেকিয়ে অথচ আমি অনুভূতিহীন ! এটা বানানো গল্প বা রূপকথার মতন শুনতে লাগছে ।। অথচ সেই যৌবন বয়সে আমি এইরকমই অস্থিত্বহীনতায় ভুগতাম ! নিজের চারপাশের যে পরিবেশ ,তার ভিতরেই এই অচেনা মুখ আমাকে নিজের প্রতি সন্দেহ করতে বাধ্য হতাম । কলেজে আমার এই আনমনা হয়ে থাকা অনেকেই বুঝতে পারত না । আমিও বোঝাতে পারতাম না ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম – ত্রিনুদা তোমার কলেজের নাম কি ? 

-নিউআলিপুর কলেজ । নিউআলিপুর পেট্রোলপাম্পের কাছেই । 

আমার মুখের মুচকি হাসি দেখে ত্রিনুদা বলল –হাসছ !

মুমিন বলল –দাদা , বেদেও তোমার কলেজে থেকে স্নাতক পড়েছিল । 

ত্রিনুদা পকেট থেকে হাজমোলার শিশি বের করল । ঢাকনা খুলে দুটো বরি মুখে দিয়ে বলল – অতিউত্তম , মানে আমরা একই গুরুর শিষ্য নই , তবে গুরুকূল একই ।

তিনজনেই হেসে উঠলাম । 

আবার গল্প শুরু হলও । ত্রিনুদা বলল – আমার বন্ধুর নাম শিবপ্রসাদ সেনাপতি । বীরভূম গ্রামে ওর বাড়ি । এখানে মানে কলকাতায় থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি খুঁজছিল । টালিগঞ্জের দিকেই মেস ভাড়া করে থাকত । আমাকে একদিন বলল , আমি এতো আনমনা কেন ?আমি আমার সমস্ত সমস্যা ওকে বললাম । জানিনা প্রথম দিন থেকেই শিবপ্রসাদ আমার বিশ্বাসের অনেকটাই অধিকার করে নিয়েছিল কেন ! কিম্বা এতোদিনে আমি বিশ্বাস করবার মতন কন বন্ধু পেলাম । আমার কথা শুনে আমাকে বলল সে সামনের মাসে গ্রামে যাবে ,আমি পারলে তার সাথে যেনও যাই । আমি বলেছিলাম আমি গিয়ে তাদের সমস্যা বাড়বে । শিবপ্রসাদ আমাকে বলল , আমার দেহে সে তন্ত্র সাম্রাজ্যের বাসিন্দা হওয়ার চিহ্ন দেখেছে । সেও তান্ত্রিক পরিবারের ছেলে । তার পিতা তন্ত্র সাধনা করে । এটাই মানে আমাদের দেখা হওয়াটাই ভবিতব্য ছিল ।

ত্রিনুদা এই পর্যন্ত গল্প থামিয়ে , আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল - তোরা ভাগ্য মানিস তো ? 

আমি বললাম – ত্রিনুদা আপাতত গল্পটা শুনতে চাই ।

ত্রিনুদা বলতে শুরু করল - বর্ধমানের কাছাকাছি খণ্ডঘোষ গ্রামে শিবপ্রসাদ সেনাপতির বাড়ি । আমার জীবনে এক ভয়ানক অধ্যায়ের সূচনা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল । বলতে পারিস নিরীহ এই অপেক্ষা , শান্ত গ্রাম , আমার জীবনে এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে বুজতেও পারিনি । এখনকা খণ্ডঘোষ যদি তোরা বলিস আলো বিচ্ছিন্ন পিছিয়ে থাকা বাংলা , আমার সময়ে মানে প্রায় কুড়ি বছর আগে সেই খণ্ডঘোষ ছিল জনবিচ্ছিন্ন অন্ধকারে ভেসে থাকা একখণ্ড অন্য জগত । তোরা কল্পনাও করতে পারছিস না । 

আমি ঘড়িতে দেখলাম বিকেল চারটে । ওদিকে চায়ের আয়োজন শুরু হয়েছে । মনে হচ্ছে , ত্রিনুদার গল্পের পরবর্তী পর্বে ঢুকবার আগে এক রাউন্ড চা হয়ে যাক। আমি ঈশারায় মিষ্টির দোকানের কর্মচারীটিকে ডাকলাম। এটা শুধু মিষ্টির দোকান নয় সাথে চায়ের ব্যবস্থা রয়েছে , পাড়ার দোকান বিকেল হলেই অনেকেই , চা আর সিঙারায় আড্ডা জমায় । ত্রিনুদা মুমিনের দিকে তাকিয়ে বলল ,- চা আর সিঙারা হলে মন্দ হয়না । আমার খুব ইচ্ছা করছে ।

আমি চমকে উঠতাম , কিন্তু ত্রিনুদার অন্যের মুখে ভেসে ওঠা অস্থির অনুভূতির ছাপ ,পড়ে ফেলবার যে ক্ষমতা রয়েছে ; আমি তার প্রমাণ আগেও পেয়েছি । আমি বললাম – শুরু করবে । 

এমন সময় বাচ্চা মতন ছেলেটা এসে জানতে চাইল আমাদের কাছে । 

-দুটো করে তিন প্লেট সিঙারা আর দুধ চা তিনটে । 

ছেলেটা চলে যেতেই গল্প শুরু হল । 

( আমার দেশ ভারতবর্ষ এই সময় রক্তে স্নান করছে । আমি এতোটাই অপদার্থ , ভীতু , মেরুদণ্ডহীন – সেই যন্ত্রণা লাঘব করতে অক্ষম । আমি শুধুমাত্র শব্দ ক্ষয় করতে শিখেছি , গুলি চালাতে বা যুদ্ধ করতে অপারগ । নিজের প্রতি করুণা হয় ; কাজী নজরুল ইসলামের মতন সর্বভারতীয় শক্তিশালী সাহসী যোদ্ধা সাহিত্যিকের খুব অভাব বোধ করছি।
আমার ত্রিনয়নের গল্পের এটি দ্বিতীয় কিস্তি । লিখতে মন চাইছিল না। তবুও আমার মতন অতিসামান্য লেখকের গুটিকয় পাঠক রয়েছেন , তাদের জন্যই দ্বিতীয় কিস্তি লিখলাম । কাশ্মীরের পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলা এবং পরবর্তী সময়ে শনিবার মানে ১৪ এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি যাদের খুন করা হলও ; সেই সব শহীদের পরিবারের সাথে সমব্যথী । আমি আমার জ্ঞানত অবস্থায় কোন বিপ্লবি দেখিনি । এইসব শহীদদের আত্মত্যাগ দেখছি , দেখবার সৌভাগ্য হচ্ছে । আমি এনাদের এবং এনাদের পরিবারকে শত প্রণাম করছি , ব্যক্তি নয় ভারতীয় সেনা বাহিনীর আত্মত্যাগই জাতীয়তাবাদী দর্শন । ভারাক্রান্ত মন নিয়ে , ঈশ্বরের কাছে আজ অন্তত শান্তি চাইব না; বিচার চাইব । আমি বুদ্ধিজীবী নই । আমার বুদ্ধিজীবী হওয়ার কোন যোগ্যতাও নেই । তাই বুদ্ধিজীবীদের প্রতিবাদ করবার সময় যে ভয় থাকে , আমি সেই ভয় থেকে মুক্ত । আমি মানবতা মানে মানবতাই বুঝি , তোষণ এর ভণ্ডামি নয় । সুবিধাবাদী আমি ; আমার দেশের সুবিধা আগে দেখব । ) 
১ম পর্ব পড়ুন -
chakrabortypinaki50@gmail.com

Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.