শনিবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৯

রুমকি রায় দত্ত

sobdermichil | জানুয়ারী ২৬, ২০১৯ |
রুমকি রায় দত্ত
জোন্‌হা থেকে হুড্রুতেঃ
হালকা একটা ফিনফিনে হাওয়া বইছে। পাথরের উপর বসে শুনছি, জল আর পাথরের ভালোবাসার গল্প। জলের ছুঁয়ে যাওয়াতে সুখ আর পাথরের ছোঁয়া পাওয়াতে। অনন্তকাল ধরে এভাবেই তো ভালোবেসে আসছে একে অপরকে। সিঁড়ির উপর থেকে একটা ডাক শুনলাম।ফিরে তাকাতেই দেখলাম,হাত নেড়ে ডাকছে সেই ছেলেটি।কিযেন নাম বলেছিল, শুকরা লহরা। ডাকছে আমাদের খাবার প্রস্তুত করে। আসতে আসতে উঠে এলাম উপরে। একটা ছোট্ট ঘর, তার ভিতরে রাখা ছিল চেয়ার-টেবিল। সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। আমরা বসতেই সামনে সাজিয়ে দিল শালপাতার থালা তিনটি। দুটো আমাদের আর একটা নিরামিষ আমাদের অটোর ড্রাইভারের জন্য। হাতে তৈরি শালপাতার থালায় সাজানো, ঝরঝরে সাদা ভাত,পেঁয়াজ দিয়ে আলুমাখা, একটা শালপাতার ঠোঙায় ডাল আর আরেকটা ঠোঙায় ডিমের ঝোল। 

আমাদের ছোটোবেলায় বিয়ে বাড়িতে দেখতাম শালপাতার চল ছিল। তখন এমন থার্মোকলের থালা বা চীনেমাটির প্লেটের তেমন চল ছিলনা। শালপাতার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। খাবারের সাথে সেই গন্ধটা মিশে গেলে একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরি হয়। ছোটো থেকেই ঐ গন্ধটায় আমার ভীষণ ভয় ছিল। ঐ গন্ধে বিয়েবাড়ি ঢোকার আগেই বমি করে দিতাম। বেশ বড় পর্যন্ত এই নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ বছর পর সামনে অমন শালপাতার থালায় সাজানো খাবার দেখে প্রথমে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। কিন্তু একবার খাবার মুখে দিতেই আমার সব ভয় উড়নছুঁ। একটা অসাধারণ তৃপ্তি যেন ছড়িয়ে পড়ল মন জুড়ে। অসাধারণ স্বাদ সেই রান্নার! আজও ভুলতে পারিনি। খাওয়া শেষে পাতা তুলতে যেতেই চেপে ধরল হাত। কিছুতেই ফেলতে দিল না।

বললাম, কে রান্না করেছে শুকরা?

সে বলল, আমি আর আমার বউ, দুজনে মিলে।

বললাম, বউকে বলো, দারুণ রান্না হয়েছে।

কথাটা শুনেই সে বলে উঠল, ‘আজই চইলে যাবেন? থেইকে গেলে ছোঁ-নাচ দেখতে পেতেন। কাল এখানে সারা রাত ধরে ছোঁ-নাচ চইলবে। পুরুলিয়া থেইকে ছোঁ-নাচের শিল্পীরা আসবে। প্রতিবছর এই সময় এখানে ছোঁ-নাচ হয়’।

বললাম, না ভাই, থাকার উপায় নেই। কালই আমাদের ফেরার টিকিট কাটা।

দেখলাম একটা গাছতলায় বসে এক শিল্পী আপন মনে বসে বসে কাঠ কেটে জিনিস বানাচ্ছে। একটা বয়স্ক মহিলা পাকা কুলের পসরা সাজিয়ে বসেছে। ক’টা কুল কিনে মুখে দিয়েই মনটা ভালো হয়ে গেল। শুনেছিলাম, রাঁচির কুল নাকি দারুণ স্বাদের। সত্যিই প্রমাণিত হল সেকথা। এমন স্বাদের কুল সত্যিই আগে খাইনি। বেশি সময় এখানে ব্যয় করা যাবে না। এখনও বাকি হুড্রু জলপ্রপাতের কাছে যাওয়া। জোনহা থেকে ফিরতি পথ ধরলাম। পথে সেই বাচ্ছাগুলো তখনও প্যাকেট ভর্তি কুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। কিনে নিলাম ওদের থেকে প্রায় তিন কেজি কুল। বাড়ি ফিরে আচার বানাব।

শুকরাকেই জিজ্ঞাসা করেছিলাম ওদের কিভাবে দিন চলে। এখানে ঘুরতে আসা মানুষদের সবাই যে হাবার খায় এমনতো নয়! সব সারা বছর ধরে যারা এখানে ঘুরতে আসে সবাই তো আর দূর থেকে ঘুরতে আসে না। রাঁচির আসে পাশের মানুষজন ছুটির দিনে এসে হয়তো কিছুটা সময় কাটায়, তাদের তো আর ভাত খাওয়ার প্রয়োজন হয়না। আর জায়গাটা বেশ রোমান্টিকও তাই কলেজ পালানো প্রেমিক যুগলদের ভিড় নেহাত মন্দ নয়। ফিরতি পথেই তো চোখে পড়েছে বেশ কয়েকজোড়া।

হেসে ছিল শুকরা। কত সাবলীল ভাবে বলেছিল, ‘ চলে যায় এভাবেই আমাদের। যখন ট্যুরিস্টদের সিজন চলে তখন আমি এদিকেই থাকি। এক ফসলের জমিতে মাঝে মাঝে কাজ হয়। ফাঁকে ফাঁকে কাঠ কেটে নিয়ে আসি বিক্রি করি। আমাদের মধ্যে অনেকে চলে গিয়েছে বড় শহরে, কোলকেতায়।মিস্ত্রির কাজ করে সেখানে। আবার অনেকে বক্সাইট খনিতেও শ্রমিকের কাজ করে। শুধু শুকরা নয়, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষই এভাবেই বেঁচে থাকে টুকরো টুকরো পাওয়ার মাঝে একমুখ হাসি নিয়ে। কিছুক্ষণ আগেই কথা বলে আসা শুকরার কথা ভাবতে ভাবতে এখানকার মানুষের জীবনের যাপনের কাল্পনিক এক রূপরেখা আঁকতে আঁকতে কখন যে হুড়্রুর কাছে চলে এসেছি খেয়ালই করি নি। তবে যাত্রাপথে মাঝে মাঝেই বাইরে চোখ পড়তেই একটা জিনিস ভীষণ ভাবে নজরে আসছিল, কয়েক কিলোমিটার অন্তর অন্তরই স্কুল। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া পড়ুয়া। আর কিছুটা পথ এগোতেই পৌঁছে গেলাম হুড়্রুর সামনে, মানে যেখান থেকে প্রায় সাতশ সিঁড়ি নিচে নেমে যেতে হবে আমাদের। ছেলের বয়স তখন তিন বছর। মনে মনে ভাবলাম এই এত সিঁড়ি পুচকেটা কিভাবে নামবে? ওকে কোলে নিয়েই বা আমরা কিভাবে নামব? সব ভাবনায় জল ঢেলে সে দিব্বি হাত ছাড়িয়ে ছুটে নামার চেষ্টা করতে লাগল। কুটুর কুটুর পায়ে কখন যে ওর সামনে আর পিছনে আমরাও নিচে নেমে এলাম বুঝতেই পারলাম না। এক মাঝবয়সের দম্পতির মধ্যে তখন রাগারাগি চলছে। রেগে গিয়ে মহিলা তাঁর স্বামীকে বললেন, ‘ঐ টুকু বাচ্চা কেমন সাতশো সিঁড়ি গড়গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে,আর তুমি পারছো না’। ভদ্রলোক বললেন, ‘তোমারও যেমন বুদ্ধি,ওর সাথে আমার তুলনা করছো? আর আমি তো পারব না বলিনি। একটু ভয় লাগছে,উঠতেও তো হবে’।

যাইহোক নিচে নেমেই ভেবেছিলাম দেখা পাব তার। ও বাবা! দেখি সহজে তো পৌঁছানো যাবে না তার কাছে। সামনে একটা বড় উঁচু পাথর। পাথরে উঠতেই হতবাক! একেবারে কাছে যাওয়ার তো কোনো রাস্তায় নেই! না ছুঁয়ে দূর থেকে দেখে কি মন ভরে? দেখলাম, একজন ভদ্রলোক হাত ধরে অস্থায়ী বাঁশের পাটাতনের উপর দিয়ে নিচে নামাচ্ছেন তাঁর স্ত্রীকে। আমরাও ঐপথে পৌঁছে গেলাম হুড়্রুর খুব কাছে। একটা পাথর ঘেরা কুপের মধ্যে জল নেমে আসছে উঁচু পাহাড়ের গা বেয়ে। কি অপরূপ শোভা সে জলধারার! পাথরের দেওয়ালের মতো চারিদিকে ঘিরে আছে। কোনো আদিম মানবের গুহা কি? এই পাথরের গঠনগত একটা ভিন্নতা ভীষণ ভাবে চোখে পড়ল। জোনহার পাথরের গঠন এবড়োখেবড়ো। হলদেটে একটা ভাব। আর এই পাথরগুলোর গা মসৃণ। কালচে দেহে স্তরে স্তরে বিভিন্ন শিলার গঠন শৈলী আঁকা। কোথাও কোথাও ঐ শৈলীর উপর দিয়ে নেমে আসছে দুরন্ত জলধারা। মনে হল গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি ঐ জলধারার নিচে। বসে পড়লাম জলধারার এপারে বড় একটা পাথরের উপর। একটু ঝুঁকে নৌকার দাঁড়ের মত হাত নেড়ে জল ছুঁলাম। বেশ কিছুক্ষণ তিনজনে নীরবতার বুকে কান পেতে শুনতে লাগলাম জল আর পাথরের ভালোবাসার কথা। তবে সুখ তো কপালে বেশিক্ষণ সয়না! কোথা থেকে একে একে জুটতে লাগলো কথা বলা পাবলিক। উফ্‌! এমন নির্জনে এসেও কেন যে এদের কথা ফুরোয় না! 

বেলা গড়িয়ে চলেছে,তবু মন থেকে যেতে বলছে। কোথায় থাকব? প্রকৃতি কি এই শহুরে মানুষদের বুকে ঠাঁই দেবে? শহরের বিলাসিতা আমাদের বন্যতা কেড়ে নিয়েছে। বনের জীবন ফেলে আমরা এতটা পথ এগিয়ে এসেছি যে, সে পথে কেবল মনে মনেই ফেরা যায়। এই যেমন একটু আগেই মনে মনে ঝরণার নিচে দাঁড়িয়ে ভিজছিলাম। কিছুক্ষণ আগেই দুই পাথরের দুরূহ খাঁজে লুকিয়ে ছিলাম মনে মনে। নাহ্‌! ক্রমশ মানুষের কথার বন্যায় ভেসে যাচ্ছে নির্জনতা। আর ভালো লাগেনা বসে থাকতে। উঠে পড়লাম আমরা। ফিরতি পথে দেখলাম, দু-একজন মহিলা বড় বড় হাঁড়ি নিয়ে বসে আছে পথের ধারে। জানতে চাইলাম, ‘এটাতে কি আছে?’

সে বলল, ‘ হাড়িয়া’।

শুনেছি এতা নাকি অসম্ভব নেশা হয়। দু-একজন ছেলে ছোকরা আসেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে প্লাস্টিকের গ্লাসে পান করতে শুরু করেছে এই মধুরস। ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগলাম। এবার মজা টের পাচ্ছি। কিছুটা উঠেই দাঁড়াতে হচ্ছে। পায়ের পেশি যেন ক্লান্ত হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করছে। অবশেষে সাতশো সিঁড়ি পেরিয়ে উপরে উঠে এলাম। উপরে তখন গ্রাম্য হাটের মতো জমে উঠেছে দোকানপাট। মনে হচ্ছে কোনো এক রূপকথার অচিনপুরী থেকে ফিরে যাচ্ছি বাস্তবের অঙ্গনে। ফিরতেই হয়,এভাবেই তো ফিরতে হয় আমাদের...।

ক্রমশ...

rumkiraydutta@gmail.com

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-