শনিবার, জানুয়ারী ২৬, ২০১৯

পিনাকি

sobdermichil | জানুয়ারী ২৬, ২০১৯ |



-তুমি যে কি বলও !

-কেন ? বলতে চাইছিস আমার আগের গল্প তোর পাঠিকার ভালো লাগেনি !

-আমি কিছু বলিনি , পাঠিকা যা আমায় বলেছে তাই বললাম ।

-আরে আমি তো গল্প বলিনি । যা ঘটেছে তাই বলেছি । তোরই দোষ , নির্ঘাত বাহবা নেওয়ার জন্য , নিজের পাঠিকাকে বলেছিস যে গল্পটা তুই লিখেছিস । 

-দেখো সুন্দরী শিক্ষিতা রুচিশীল পাঠিকার কাছে আমার মতন লেখক একটু নিজের বিজ্ঞাপন দেবেই । যতই বড় শিল্পী হোক অনুরাগীদের কাছে সে ভিক্ষুক , নিজের প্রশংসা বাহবা নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে । হ্যাঁ নিজের গুরুগম্ভীর ভাব রক্ষা করবার জন্য হয়ত উদাসীনতার অভিনয় করেন । তবে সে বিখ্যাত লেখকদেরই মানায় । আমার মতন চুনোপুঁটিদের নিজের ঢাক নিজেকেই পেটাতে হবে । 

-হ্যাঁ পেটা । আমি বলছি পেটানোর আগে অভ্যাস করে নে , কেমন ভাবে পেটাবি । তা না হলে ফেটে যাবে

যে ! 

-সে যাক । আমার ঢাক যদি ফাটেও , আমার হাতেই ফাটবে ।

-আরে আমি আমাকে বাজাতে দিতে বলছিনা , অন্তত নিজের বিজ্ঞাপন কখন , কেমন , কীরকম ভাবে দিবি --- অন্তত শিখে নে । 

এমন সময় আমরা টের পেলাম কেউ খুব দ্রুতই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসছে । এই শব্দ শুনে মনে হয়েছে এইদিকেই আসছে । 

ত্রিনুদা দরজায় চোখ রাখতেই দেখলাম মুমিনের মুখ । 

-কি ব্যাপার ! এতো রাতে ।

-রাত ! এই সময়তো অতি উত্তম । মনে আছে আমরা আগে প্রায়ই প্রেত সন্ধানে বেড়িয়ে পড়তাম ।

আমি বললাম – তোকে ফোন করে বললাম আয় ,তা তুই বললি আজ হয়ত আসতে পারবি না । আমি তাই একাই চলে এলাম । 

মুমিন ঘরে এসে ঢুকল । চেয়ার টেনে বসল ।- বেদদা আজ আমার না এলেও কোন অসুবিধা ছিলা না । তাও আসতে হল ।

-কেন ?

- আসলে আমি এখানে আসবার আগে আমার দাদার এক পরিচিতের বাড়ি গিয়েছিলাম । আলিপুর আদর্শপল্লী ।সেখান থেকেই আসছি ।

ত্রিনুদা পাতলা পাঞ্জাবি আর পাতলা পাজামা পড়ে আছে । গায়ে সাদা চাদর জড়িয়েছে । বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে । বালিশের পাশেই হাজমোলার শিশি । ধাকনা খুলে দুটো হজমিগুলি মুখে পুড়ে দিল । আমরা কেউ খাইনা । এই হজমিগুলি খাওয়াটা ত্রিনয়নদার অভ্যাস । ত্রিনয়নদাকে আমরা ত্রিনুদা বলি । 

ত্রিনুদা বলল – ব্যাপারটা কী ? 

মুমিন টেবিলে রাখা বোতলের জল পান করল । বলল - আমার দাদার বন্ধুর ভাই । ওদের বাড়িতে এই শেষ একমাস থেকেই অদ্ভুত কিছু কাণ্ডকারখানা দেখতে পাচ্ছি । যদিও এই ঘটনার কোন যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা কেউ খুঁজে পায়নি । তাই আমাকে ডাকা হয়েছিল । 

-কেমন ?

ত্রিনুদা বুকের চাদরটা বেশ ভালো করে টেনে নিল । বেশ কয়েকদিন কলকাতায় ভালো ঠাণ্ডা পড়েছে । কিছুক্ষণ আগেই জানালা বন্ধ করা হয়েছে । এখন রাত সাড়ে দশটা । এই অঞ্চলে এখনো বড় –বড় গাছ রয়েছে । অনেক পুরানো বাড়ি রয়েছে । তাই সূর্য ডুবলেই ,অন্ধকারে গাছেদের মাথা থেকে যেনও ঠাণ্ডা ক্রমশই ছড়িয়ে যায় । 

আমি বললাম – মুমিন , গোটা ঘটনা খুলে বল ।

মুমিন বলল – আসলে আমি যার জন্য গিয়েছিলাম তার নাম সব্যসাচী বণিক । পেশায় শিক্ষানবিশ আইনজীবী । অনুশীলন করে আলিপুর কোর্টে । যাইহোক । আমার এই যাওয়ার পিছনে সব্যসাচীর জ্যাঠতুঁতো দাদার সাথে আমার জামাইবাবুর পরিচিতি রয়েছে । সেই সূত্রেই আমাকে ডেকেছে । একমাস ধরে সব্যসাচী যেনও একটু –একটু করে পাল্টে যাচ্ছে ! আগে ছেলেটা খোলামেলা ছিল , কিন্তু ক্রমশই ওর মধ্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে । বাড়ির লোকের কথায় , মাঝরাতে মানে প্রায় একটা থেকে তিনটের মধ্যে দেখা যায় একা ছাদে দাঁড়িয়ে আছে । দু’দিন সব্যসাচীর বাবা দেখেছে । পরের দিন জিজ্ঞেস করতেও , এড়িয়ে যায় । শুধু তাই নয় বাড়িটা যেনও ক্রমশই পাল্টে যাচ্ছে । মানে বাড়ির লোকের মনে কোন আনন্দ নেই । সবটাতেই অজানা এক উদ্বেগ দেখলাম । আমাকে এই সব কথা বলে জামাইবাবুর বন্ধু অলকেশ জানা । সব্যসাচীর জ্যাঠার ছেলে ।

এই অব্দি শুনে , ত্রিনু দা বালিশের পাশে রাখা শিশি থেকে দুটো হজমোলা মুখে পুড়ে নিল । বলল 

-তুই বাড়িতে গিয়ে কি দেখলি ? 

মুমিন চোখ দুটো বড় করে বলল – কিছু যে দেখেছি ,এটা বলব না । তবে কিছু একটা টের পেয়েছি । ছেলেটার সাথে দেখা হতেই মনে হল সুস্থ নয় । তবে আমাকে অবাক করে দিল ,যখন ছেলেটা প্রথম দেখাতেই জানতে চাইল -- আমারে বাড়িতে আসবার পিছনের উদ্দেশ্যটা ! 

ত্রিনুদা বলল –আর কিছু ?

-ছেলেটার মা বললেন , অনেক রাতে ঘুম থেকে উঠে এমন অনেক কথা বলে যার যুক্তি নেই । যেমন এখানে আর কত দিন থাকবে ! ফিরে যাব । এটা ঠিক নয় । ইত্যাদি । আমার হাত ধরে মাসিমা বললেন , এই ছেলেটার মাথার ঠিক নেই । আমার দিকে তাকিয়ে হাসল আর বলল , আমি সবকিছুতে বাড়তি উৎসাহ দেখাই । এতা আমার জন্যই ক্ষতিকারক ।

ত্রিনুদা মুচকি হাসল । এই হাসির অর্থ আমরা বুঝি । ত্রিনয়ন ঘটক পরবর্তী কেসের গন্ধ পাচ্ছে । আমি বুঝতে পারলাম না এখানে এমন কোন রহস্য আছে নাকি ? আমি মন্ত্র শক্তিতে বিশ্বাস করি । ত্রিনুদার সাথে থাকতে –থাকতে এই একটা ব্যাপারে আমি নিশ্চিত , জীবনটাকে ,চারপাশের পরিবেশটাকে আমরা যেমন ভাবে দেখি ,তা পুরোটাই তেমন নয় । এই যে জগত যেখানে নিঃশ্বাস ফেলা জীবকেই জীবিত বলি ; নিঃশ্বাস নেয়না এমন কিছু অস্তিত্ব রয়েছে । প্রাণ নেই , তারা প্রাণী নয় । কিন্তু অস্তিত্ব রয়েছে । আচ্ছা অনুভূতি , ভয় , ভালবাসা , ইচ্ছাশক্তি --- এগুলোর প্রাণ নেই ; তাই বলে অস্তিত্ব নেই !! আছে , অস্তিত্ব রয়েছে । মানুষের বেঁচে থাকবার সাথে এগুলো ওতপ্রোত ভাবে জড়িত । এর আগে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে , যা আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে । এই যে প্রমাণিত জ্ঞান , তা আমাদের কাছে বিজ্ঞান । আর বিজ্ঞান সম্মত বিশেষ জ্ঞান , যা সবসময় প্রমাণের মাপকাঠিতে থাকে না। আবার প্রমাণ বলতে যদি নিজের উপলব্ধি হয়ে থাকে ,তবে তাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় মানুষ ।

আমি এতো কথা কেন বলছি ? না বলে থাকতে পারছিনা ,কেননা মন্ত্র শক্তি , প্রেত চর্চা , এগুলোর উপস্থিতি আমরা যেমন ভাবে ত্রিনয়নদার কাছে পেয়েছি ; তেমন কোথা থেকেও পাইনি । ত্রিনয়ন ঘটককে আমরা ত্রিনুদা বলে ডাকি । আমাদের এই সম্পর্ক প্রায় পাঁচ বছরের । আমি ত্রিনুদার ক্ষমতা দেখেছি । তাইতো তার কথাই আমি আমার পাঠককে বলতে চাই । 

-তারপর চলে এলি ?

ত্রিনুদা , মুমিনকে জিজ্ঞেস করল । কানে কথা আসতেই আমার হুঁশ ফিরল ! আমি বললাম –এইটুকুতে বড় কিছু বিষয়ে ভাবা যায়না ! 

-না বেদ , এইটুকুতেই অনেক কিছু বোঝা যাচ্ছে ।

-মানে !

আমি ত্রিনুদার দিকে কিছুটা অবাক হয়েই তাকালাম ।

ত্রিনুদা গলার স্বর পাল্টে দিল । বলল - মুমিন দেখ এখন এগারোটা বেজে গিয়েছে । আমি বলছিলাম তোরা এখন বাড়ি যাবি । আমরা এই নিয়ে কালকে আলোচনা করব । আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয় । তবে আগামী দিন আমি সন্ধ্যা আটটায় এখানে আয় । আমি এই নিয়ে আলোচনা করব ।

মুমিন বলল – দাদা আমি কিন্তু টাকা চাইতে পারব না।

ত্রিনুদা বলল – আমি পারিশ্রমিক ছাড়া নিজে কাজ করিনা । আমি তোকে সব কিছু বলে দেব । তুই শুধু ওনাদের গিয়ে বুঝিয়ে বলবি । আর বাকী কাজ করবি । 

আমি মুমিনের দিকে তাকিয়ে বললাম – এমন কি কাজ ! বাড়িতে প্রেত শক্তির অবস্থান আছে নাকি আমরা তা জানব কেমন করে ? আর না জানলে মুমিন কেমন ব্যবস্থা নেবে !

ত্রিনুদা আমার কথা শুনল । চুপ করে থেকে বলল – আমি জানিনা মুমিন ওদের দিক থেকে কতটা সাড়া পাবে । তবে এই ঘটনার সাথে তন্ত্র যুক্ত রয়েছে । অন্তত আমার তাই মনে হচ্ছে । আর সেই তন্ত্র ছেলেটির ইচ্ছাশক্তিকে অনেকটাই দখল করে নিয়েছে । দেখা যাক ,পরের দিন মানে তুই কবে যাবি ?

-দিন দশেক । 

-মুমিন , খুব ভালো ভাবে বাড়ির পরিবেশটাকে পর্যবেক্ষণ করে আসবি ।

আমরা আজকের মতন আড্ডা ভাঙলাম ।

# ২ #

খুব সকালেই ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ! ত্রিনুদা ফোন করেছে । এতো সকালে কেন ?

-হ্যালো ।

-কিরে কটা বাজে ?

-সকাল নটা । আমি আজ দশটা পর্যন্ত ঘুমাবো । আজ রবিবার । তুমি কেন ফোন করলে !

-এগাররোটার মধ্যে চলে আয় । দুপুরে এখানেই খাবি । মুমিন আসবে বলেছে । 

আমি আর না করতে পারলাম না। ত্রিনুদার বাড়ি গিয়ে বেশ জমে গল্প গুজব হয় । শুধু আফসোস ঘুমটা হবে না ! 

আমি খুব দ্রুত খাট থেকে নেমে , বাথরুমে গেলা। আমার ঘর থেকে ডাইনিং পেড়িয়ে বাথরুমে যেতে হয় । মাঝে বারান্দা আছে । যেতেই দেখি বাবার বলল – আজ এই বাড়ি না ওই বাড়ি ?

আমি বললাম – ত্রিনয়নদা কিছুক্ষণ আগেই ফোন করেছিল ।

-তাহলে আমি আর বাজার যাচ্ছি না 

আমরা যে ঘরে তিন মূর্তি জড়ো হয়েছিলাম ,তা হচ্ছে একতলার বসবার ঘর । ত্রিনুদা লাল রঙের টিশার্ট আর ব্লু জিনসের প্যান্ট পড়েছে । মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো । এতো ফিটফাট হয়ে আছে ,মানে নির্ঘাত কেউ আসবে । দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ত্রিনু দা পকেট থেকে হজমোলার শিশি নিয়ে , মুখে পুড়ে দিল । আমরা আজ পর্যন্ত কখনই ত্রিনুদাকে ধূমপান করতে দেখিনি । এই হজমোলা একমাত্র নেশা । দাদা নিজে বহুবার বলেছে , যে কোন নেশায় নাকি তার ধ্যান করতে অসুবিধা হয় । তাও দাদা নিজের একমাত্র নেশা ছাড়তে পারেনি ! 

ঘরের বেল বেজে উঠতেই ,কেষ্টদা দরজা খুলে একজন কে ঘরে নিয়ে এলো ।

চেহারা দেখে বয়সের আন্দাজ করতে পাচ্ছিলাম না ।প্রায় বত্রিশের কাছাকাছি হবে । চোখে কালো চশমা । ফর্সা , হাল্কা চেহারার । জিনস আর টপ পড়েছে । সুন্দরী কাকে বলে জানিনা ! তবে আকর্ষণীয় । 

আমাদের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করলেন । বললেন – ত্রিনয়ন ঘটকের সাথে কথা বলতে পারি ?আমি কিছক্ষণ আগে ওনাকে ফোন করেছিলাম । 

ত্রিনুদা হাত জোর করে বলল –বসুন । আমার সাথেই ফোনে আমার কথা হয়েছিল । এরা আমার সহযোগী , বেদ আচার্য আর মুমিন । আপনার সমস্যার কথা খুলে বলতে পারেন , অসুবিধা নেই । 

ভদ্রমহিলা বসে পড়লেন । তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন 

-আমি বেলেঘাটায় থাকি । এই সমস্যা প্রায় একমাস ধরে হচ্ছে । পেশায় আমি একজন আইনজীবী । আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী । ভগবানে আমার বিশ্বাস নেই । ভূত , প্রেত , অলৌকিকতা –এগুলো সিরিয়াল ,সিনেমার বিষয় বলে মানতাম । কিন্তু গত একমাসে আমার এই ভাবনার পরিবর্তন এসেছে ! জানিনা মানে জানব বলেই আপনার কাছে এসেছি । 

ত্রিনুদা ভারী গলায় বলল – গত একমাসে ঠিক কেমন কি ঘটল ? সুস্মিতা আপনি ভূতের কোন উপস্থিতি পেয়েছেন ? 

-রাত তখন প্রায় দুটো ,আচমকাই ঘুম ভেঙে গেল!! আমি বুঝতে পারলাম না , এই ঘুম ভাঙবার কারণ ।আগের শেষ রাতে অনুষ্ঠান ছিল , মদ্যপান করেছিলাম । বেশ কয়েক পেগ , কড়া ছিল । এই ঘুম চলে যাওয়ার কারণ তাও হতে পারে । পাশের টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে জল নিয়ে , গলা ভেজালাম । তারপর গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে ঘুমাতে যাব , এমন সময় খাটের কোনাকুনি থাকা সোফাতে একটা ছায়াকে বসে থাকতে দেখলাম ! হ্যাঁ , সেই মুহূর্তে ভেবেছিলাম আমার মতিভ্রম হবে হয়ত ! ছায়াটা জায়গা ছাড়ল না , পা থেকে মাথা পর্যন্ত ছায়াই ছিল । মুখ দেখতে পাচ্ছি না । এই যে বসে রয়েছি উল্টো দিক থেকে আল এসে মুখে পড়লে পিছনে ছায়া তৈরি হয় , তেমনই ছায়া ! বুকের ধকপুকানি শুনতে পেলাম । নিজের চোখকে বিশ্বাস করিনি । বেশ কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম , সোফার সেই ছায়া এখন আর নেই ! একটা ছায়া থাকা আর না –থাকবার মধ্যে যে ফারাকটা তা এখন টের পাচ্ছি । আমি ভয় পেলাম , এতটুকু বুঝে গিয়েছি আমার কোন স্নায়ু ঘটিত সমস্যা হয়েছে । তারফলেই চোখের এই ভুল ! 

ত্রিনুদা বলল –এর পরের রাতেও কোন অভিজ্ঞতা ছিল ? নাকি এটাতেই...। 

মেয়েটি হাসলেন – ত্রিনয়ন বাবু , আমি এতো সহজে কাবু হওয়ার মানুষ নই । যত দিন এগোতে লাগল , ততই নানারকমের দৃশ্য দেখতে লাগলাম । আমি আগে বিশ্বাস করতে চাইতাম না , এখন যেনও বিশ্বাসই হচ্ছে শুধু । আমার পরিচিত জগৎ এর পিছনেও ,আরেকটা সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা আস্তানা আছে । আমি ক্রমশই সেই পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে উঠছি ! 

-কেন ?

-আমি ক্রমশই নিশাচর হয়ে উঠছি । মানে কোন কারণ না থাকলেও , ছাদে দাঁড়িয়ে থাকি । ছাদে যখন থাকি তখন মনে হয় কেউ আমার উপর নজর রাখছে । আমি ঘুমিয়ে পড়লেই গলা টিপে ধরবে । আমি নিজে লক্ষ্য করলাম , আমি আমার গোছানো জিনিস ভুলে যাচ্ছি ! 

-আপনি একাই থাকেন ?

-মা আর আমার মেয়ে থাকে । 

-মেয়ে ?? 

-আমি ডিভোর্সি । কিন্তু দয়া করে এই নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না । আমি আমার অন্ধকার অতীত ভুলতে চাইছি । 

-তা আমি কি করব ?

-দেখুন সাতদিন আগে রাতের বেলায় আচমকাই মনে হচ্ছিল কেউ বিছানায় আমার পায়ের দিকে বসে রয়েছে ! মেয়েটা মায়ের কাছে ঘুমায় । ঘরে আমি একাই । পায়ের কাছে সেই ছায়া মূর্তিটা , আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি গলা শুকিয়ে আসছে । 

-কোন ভালো মনোবিদ দেখান । এটা নার্ভের সমস্যাও হতে পারে । 

-দেখিয়েছি । ওরা বলেছে স্নায়ুর অতিরিক্ত চাপের জন্য ।

-তাহলে আর আমার কাছে কেন ! মেডিটেশন করুন টেনশন মুক্ত হোন ।

- আমার চেহারা দেখবেন , চশমাটা খুলি ...

চশমা খুলতেই আমরা আঁতকে উঠলাম ! দুটো চোখের কোটরে গর্ত হয়ে উঠেছে । মুখ শুকিয়ে গিয়েছে । 

মহিলা বললেন – আমার মনে হচ্ছে , যতদিন যাচ্ছে ততই কেউ আমার ইচ্ছা শক্তিকে শুষে নিচ্ছে । আমি ক্রমশই বিশ্বাস হারাচ্ছি । ত্রিনয়ন বাবু , অনেক কষ্ট করে আপনার খবর নিয়ে তবে এসেছি , ফিরিয়ে দেবেন না । আমি বাঁচতে চাই । আমার ছোট্ট মেয়ের জন্য আমাকে বাঁচতেই হবে । প্রশাসন কখনই আমাকে বিশ্বাস করবে না । আর তান্ত্রিক , জ্যোতিষীদের টাকা উপার্জনেই আগ্রহ । এমন অবস্থায় , আমি আপনার খবর পরিচিত মাধ্যম থেকেই পেয়েছি। আমাকে বাঁচান স্যার । 

ত্রিনুদা বলল – আমার পারিশ্রমিক ছয় হাজার টাকা ,এই কেসে । দুহাজার টাকা অগ্রিম । কাজ শেষ হলে বাকীটা । কাজ না হলে পাঁচশটাকা নিয়ে পুরোটাই ফেরত পাবেন রঞ্জনা বসু । আমরা কাল সন্ধ্যার দিকে যাব । দরকারে থাকতেও পারি । 

মহিলা হাতজোর করে অগ্রিম দিয়ে গেলেন । যা দেখছি দুহাজার টাকার নতুন নোট , এখন খুচরোর মতন হয়ে গিয়েছে !

ত্রিনুদা আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল – দুপুরের খাওয়া খেয়ে আমায় একটু বেরোতে হবে । কাল সন্ধ্যায় । মনে থাকে যেনও । বেলেঘাটা যাব । 

 # ৩ #

ঘরে ঢুকতেই ত্রিনুদা কেমন মুচড়ে গেল ! আমরা বুঝতে পারলাম না । চোখের লাল চশমাটা খুলে রঞ্জনা বসুর দিকে তাকিয়ে ত্রিনুদা বলল – আপনি সত্যিই নিশ্চিত আপনার এখানে কোন অপশক্তি রয়েছে ?

-দেখুন আমি ভূতে বিশ্বাস করিনা । কিন্তু বিগত একমাসে আমার এই বিশ্বাসে ভাঙন ধরেছে । আমার অভিজ্ঞতা আপনাকে বলেছি । আর নতুন কিছু ঘটেনি । 

-আমি বলছিলাম আপনি নতুন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছেন ?

-মানে ?

আমরা চারজনেই সোফায় বসে আছি । বাইরে সন্ধ্যা মিশে গিয়েছে রাতের বুকের আঁধারে । শহরের মাথায় নক্ষত্ররা মালার মতন ঝরে পড়ছে । আচমকাই আকাশে এতো নক্ষত্র উল্লাস দেখে , আমার ভালোই লেগেছে । প্রেম এই নশ্বর সময়ে , অবিনশ্বর । আকাশে যে তরঙ্গ , তা আমার মনেও ধ্বনি তুলেছে । সেই সুর আমাকে ভালোবাসার কথা মনে করিয়ে দিল !

এতো কথা আমি এর জন্যই বলছি , এখানে এই ঘরে আমরা বসে রয়েছি । আমার সামনে রঞ্জনা বসু । উল্টো দিকে ত্রিনুদা আর মুমিন । ত্রিনুদা এই সন্ধ্যা বিগলিত রাতের কিছু আগের প্রস্তুতির পর্বে চোখে লাল চশমা , টিশার্ট আর ব্লু জিনস পড়েছে । চশমার কাঁচের রঙ লাল । হাতে রুদ্রাক্ষের মালা । এই মালা ধরে মনে –মনে জপ করে । এটা একটা অনুশীলন । মন কে নিজের হাতের মুঠোয় রাখবার । আমার মনে পড়ে গেল একদিন ত্রিনুদা দেখলাম খুব ভোরে ছাদের চাতালে আসন পেতে বসে আছে , আর হাতের মালা জপতে –জপতে বলল – বেদ চারপাশে যে নিস্তব্ধতা রয়েছে , তার ভিতরেও শব্দ রয়েছে । আমি শুনতে পাচ্ছি । এটা কোন গল্প বা অলৌকিক কথা নয় । তুই অনুশীলন করলে শুনতে পারবি । তখন ভোর চারটে হবে । আগের দিন গভীর রাত অব্দি আমরা তিনজনে চার্লি চ্যাপলিনের ছবি দেখেছিলাম । অনেক রাতে শুয়েও ত্রিনুদা পৌনে চারটেতে উঠে যায় । তারপর চলে যোগাভ্যাস । এইসব কিছু তন্ত্র ক্রিয়ার অংশ । ত্রিনয়নদা কী তান্ত্রিক ? এই প্রশ্ন আমরা অনেকবার দাদা কে করেছি । সব সময়ের জন্য হেসে এড়িয়ে গিয়েছে ; বলেছে – না , আমাদের দেশে যে তন্ত্র ঐতিহ্য রয়েছে সেখানে নিজেকে তান্ত্রিক বলতে মাথা নুইয়ে আসে । তবে হ্যাঁ তন্ত্র পরিবারের একজন ভাড়াটে , যেইদিন ভাড়া দিতে পারব না , সরে যাব । 

এই ভাড়া দেওয়ার ব্যাপারটাই আমার কাছে পরিচিত নয় । 

ত্রিনুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল –বেদ , এ খন এইসব না ভেবে এইদিকে খেয়াল রাখ । 

আমি জানি , আমার মনের ব্যাপারস্যাপার নির্ঘাত মুখে ফুটে উঠেছে । ত্রিনুদা সেই ভাষা পড়ে ফেলেছে !

আমি নিজের এলোমেলো চিন্তাকে স্থির করে বললাম – দাদা ,উপরের ঘর দেখব না ? 

-আমার মনে হচ্ছে তার আর দরকার হবে না ।

রঞ্জনা বসু ত্রিনুদার দিকে তাকিয়ে বললেন –আপনাদের দরকার পড়লে বলতে পারেন । পুরো বাড়ি দেখাতে অসুবিধা হবে না ।

-আমাদের দরকার হলে ,আপনার অসুবিধা শুনতাম না। ম্যাডাম আত্মা মানুষের মতন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলাফেরা করতে পারেনা । সে সীমাবদ্ধ । তাকে নিজের সীমা পেরিয়ে যেতে হলে কোন মাধ্যমের সাহায্য নিতে হয় । আমার মনে হচ্ছে আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে হবে ।

রঞ্জনা বসুর মুখে এখন একটু উদ্বেগের ছাপ দেখতে পেলাম । বললেন –সেই দিন সবটাই বলেছি ।আর কিছু বাকী নেই । 

চা এসে গেছে । আমরা চায়ের কাপ হাতে তুলে নিলাম । ত্রিনয়নদা হাসতে –হাসতে বলল –আপনি ঠিক ততটুকুই বলেছেন , যতটুকু আমি আপনার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছি । এখনো বেশ কিছু কথা শোনা বাকী আছে । 

-মানে !

- রঞ্জনা ,আপনি প্রথম কবে এমন অনুভূতি অনুভব করেন ?

-তারিখ মনে নেই ।

-হুবহু দরকার নেই । আপনি বলেছেন একমাস ধরে ।মাসের প্রথমে ,মাঝে না শেষে এইটুকু বলুন । 

-দশ তারিখের পর হবে । আচমকাই মধ্যরাতে ।

-সেই দিন কোথায় গিয়েছিলেন ? মনে করুন । মনে নেই বলবেন না । 

উনি কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন – অফিস থেকে বাড়ি । আর কোথাও নয় ।

-ভুলে যাচ্ছেন না তো ?

কিছুক্ষণ থেমে বললেন – হ্যাঁ , মাঝে মন্দির গিয়েছিলাম ।

-যেই দিন থেকে এইসব ঘটনা ঘটেছিল , তার কতদিন বাদে আপনার চেহারা ভাঙতে শুরু করে । মেজাজে পরিবর্তন আসে । এমনকি আত্মবিশ্বাস পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায় !

-এটা স্পষ্ট মনে আছে , একসপ্তাহ । হ্যাঁ , এক রবিবার দেখলাম । নিজেকে আয়নায় দেখে নিজেই চমকে 

গেলাম ! 

-আপনার শরীর ছাড়া বাড়ি র আর কোন মানুষ বা পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে ?

-আমার চোখে পড়েনি । সত্যি বলতে আমি নিজেকে নিয়েই যেনও ঘোরের মধ্যে রয়েছি ! ক্রমশই বুঝতে পারছি , চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছি । ত্রিনয়ন আমি বাঁচতে চাই । আপনি বাঁচান ।

ত্রিনুদা চায়ের কাপে অন্তিম চুমুক দিয়ে ,খালি কাপটা টেবিলের উপর রেখে বলল – আমি কাউকে বাঁচাতে পারিনা । আপনিই নিজের উদ্ধার করতে পারেন । তাইতো বলছি , কিছু লোকাবেন না । যদি এমন কোন কাজ যা নিজের চোখে নিজেকে ছোট করে দিয়েছে --- তাও স্বীকার করুন । 

আমি স্পষ্ট দেখলাম - রঞ্জনা বসুর চোখ দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে । 

উনি বললেন – আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন ?

-একেবারেই নয় । তবে রঞ্জনা বসু আপনি যে ঘৃণ্য কাজটা করে ফেলেছেন ,তার জন্য ক্ষমা চাইতে বলছি ...

এই কথাটা শোনা মাত্রই আমি আর মুমিন আচমকাই বিদ্যুৎ -ছোঁয়া খেলাম ! ত্রিনুদার মুখে এই মেয়েটির প্রতি যে বিরক্তি আর কঠোরতা ফুটে উঠেছে , তাতে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না , এই রহস্যের শিকড়ের সন্ধান ত্রিনয়ন ঘটক পেয়েছে ! এই রহস্যের শুরুতে আমাদের যেতেও আর দেরী নেই । 

ত্রিনুদা চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিল । বলল – আমাকেই কেন ডাকলেন ? 

চোখ খুলে বলল – ম্যাডাম ,সবকিছু বললেন আর আসল কথাটাই চেপে গেলেন !

-মানে !!!

-আমাকে বিশ্বাস না করতে পারলে , আমি আপনার কোন সহযোগিতা করতে পারব না । চাইলেও না। আমি প্রথমই বলেছি । 

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন । ত্রিনুদা বলল –আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন । আপনি নিজের ছড়ানো জালে জড়িয়ে গিয়েছেন । ক্রমশই আপনার জীবনকে ছায়া ঢেকে ফেলেছে । আপনি হাত বাড়িয়ে সম্পূর্ণ ভাবে আমাকে বলুন । ম্যাডাম ‘তন্ত্র’ অতি প্রাচীন পন্থা । জীবন চর্চা । নিজের ক্ষুদ্র লাভের জন্য , লোভে অনেকেই সেই পন্থাকে নৃশংস ভাবে ব্যবহার করে । মনে রাখবেন , সব ক্রিয়ার সমান বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকবে । এটাই নিয়ম। 

মুহূর্তের জন্য ঘর শান্ত হয়ে গেল ! এখন রাত দশটা । ত্রিনুদা বলল – আমি আপনার সমস্যা মেটাতে পারব না , আপনি আমাকে বিশ্বাস করে না বললে আমার পক্ষে কিছু করবার ক্ষমতা নেই । আপনার ঘরে কোন প্রেত তত্ত্বের উপস্থিতি টের পেলাম না । আমার দৃঢ় বিশ্বাস , আপনি একজনের উপর তন্ত্র ক্রিয়া করেছেন । আর সেই ক্রিয়া বর্তমানে এক ভীষণ ক্ষতিকারক শক্তির রূপ নিয়েছে ! বলতে পারেন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে । আপনাকে এখনই প্রাণে মারবে না । তবে স্নায়ুকে দুর্বল করে ধীরে –ধীরে বাড়ির সকলের মনের শক্তিকে দখল করবে । তারপর নিজের মতন পরিচালনা করবে । আমি নিজেও জানিনা , এই খেলা কোথায় থামবে ! বাড়ির সকলের জন্য নিজেকে বাঁচান । আর হ্যাঁ , আপনার অর্ধেক টাকা আমি ফেরত দিয়ে দেব । যদি আপনি কেসে রাজি না থাকেন ,কালকে আমার বাড়িতে কাউকে পাঠিয়ে দেবেন । আর যদি রাজি থাকেন দু’দিনের মধ্যেই জানিয়ে দেবেন । 

# ৪ #

আমরা হলুদ ট্যাক্সি ধরেছি । এটাই আমাদের যোধপুরপার্কের বাড়িতে নিয়ে যাবে । গাড়ি ছুটছে । ত্রিনুদা পকেটের কৌটো থেকে দুটো হজমোলা মুখে পুড়ল । আমি বাঁদিকে জানালার ধারে বসে আছি । মুমিন মাঝখানে , পাশে ত্রিনুদা ।

ত্রিনুদা বলল - আমাদের চারপাশে অনেক পন্থা আছে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর । এই পথ বাঁকা , ঘোরালো । মনে রাখতে হবে , এটাও পথ । দূর থেকে মনে হবে এই পথে ঢুকে যাই । হ্যাঁ বিপদজনক হবে হয়ত । তা ঢুকেও গেলাম । এখানেই সব কিছু শেষ হয়না । তন্ত্র কখনই কার্য সিদ্ধির সিঁড়ি হতে পারেনা । তবুও আমরা চেষ্টা করি । লোভে পড়েই । 

ত্রিনয়নদা বাইরের দিকে তাকিয়ে এইসব কথা বলছিল । 

আমি বললাম – দাদা তুমি বুঝলে কেমন ভাবে এটা তন্ত্রের খেলা ।

ত্রিনুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল - আসলে ঘ্রাণ শক্তিকে প্রখর করতে হবে । এরজন্যই আমি তোদের বলি সূর্য উঠবার আগে উঠে যোগাভ্যাস কর ,ধ্যান কর । চারপাশের গন্ধকে মনের কারখানায় বিশেষণ কর । আপাতত এটাকে ফালতু কাজ বলে মনে হচ্ছে , কিন্তু করেই দেখনা । আমি ওই ঘরে কোন রকমের অপশক্তির গন্ধ পাইনি । ওখানে থেকে লাভ হবেনা , তাই রাতে থাকিনি । কেননা এটা কোন আত্মার কাজ নয় । প্রেতাত্মা থাকলে চারপাশে তার চিহ্ন ফুটে উঠত । আমি কিন্তু ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখেছি । তাই বাড়িতে ঢুকেই সময় নষ্ট না করে , রঞ্জনার শোওয়ার ঘরেই গিয়ে কথাবার্তা বললাম । অনবরত জপ করছিলাম । 

-কিন্তু তন্ত্র কেমন করে বুঝলে ?

-তন্ত্র আসলে আমাদের ভারতীয় দর্শন শাস্ত্রেরই অংশ । প্রাচীন বেদ , উপনিষদেরই একটি অংশ । এটা এমন শাস্ত্র যার সাহায্যে মানুষ অতীন্দ্রিয় শক্তি লাভ করতে পারে । তন্ত্র সাধনা যত এগিয়ে যাবে ততই এর ভিতরের কৌশল গুলোর ক্ষমতা আমরা বুঝতে পারব । এমনই কৌশল হচ্ছে বশীকরণ । এই কৌশলে যে কোন জীবিত প্রাণীকে বশ করতে পারবি । তবে মনে রাখবি এই বশ অবশ্যই খুব সাবধানতার সাথে করতে হবে । হিন্দু দর্শনে যে ৮ প্রকার অষ্ট সিদ্ধির কথা বলা হয়েছে , তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ঈশিত্ব , এর দ্বারা স্থাবর - অস্থাবর সকলের উপর প্রভুত্ব করবার ক্ষমতা আয়ত্ব করা যায় । এই ক্ষমতার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বশীকরণ । যদি কোন সিদ্ধ পুরুষের সহায়তায় মন্ত্রশক্তিকে কোন জীব আত্মার উপর প্রয়োগ করা হয় এবং সেই জীবাত্মার সাথে নিজের আত্মার একটা তারঙ্গিক যোগসূত্র রচনা করে ফেলি , তাহলে অবশ্যই নিজের মনের মতন সেই মানুষটিকে চালনা করতে পারব । মনে রাখতে হবে , সেই মানুষটির আত্মা যদি ভুল কিছু শক্তিকে নিজের সাথে যুক্ত করে ফেলে তাহলে যার বশে রয়েছে সেও ক্ষতির সম্মুখীন হবে । 

মুমিন বলল – তার মানে ত্রিনুদা তুমি বলতে চাইছো রঞ্জনা বসু কোন মানুষকে বশ করেছেন , নিজের আত্মার মাধ্যমে । আর এখন সেই আত্মাই রঞ্জনার আত্মার উপর প্রভাব বিস্তার করছে !!

-আমাকে ডাকা হয়েছিল , শুধু মাত্র নিজেকে মুক্ত করবার জন্য । উনি সব জেনেই ডেকেছিলেন। যাতে আমি গিয়ে ওনাকে মুক্তি দিতে পারি।কিন্তু এখন উনি নিজেই এই বিপদজনক খেলার মধ্যে ঢুকে পড়েছেন ! 

আমার সব কিছু কেমন জানি টানটান কোন অলৌকিক অভিযান বলে মনে হচ্ছিল ! কিম্বা এমন একটা রহস্যময় গল্প , সবে শুরু হয়েছে ।রঞ্জনা বসুকে সন্ধ্যা মনে হয়েছিল ,সেখানেও সব কিছু ধূসর !! আমি ঢোঁক গিলে বললাম – গল্প শুরু হলও ?

ত্রিনয়ন ঘটক আমার দিকে তাকিয়ে ,পকেট থেকে হাল্কা লাল রঙের কাঁচের চশমাটা পড়ে নিল । হাতের রুদ্রাক্ষের মালাটা পেঁচিয়ে বলল – বেদ , এতো তাড়াহুড়ো কেন ? পাঠিকাকে আশ্বস্থ করতে পারিস , গল্প সবে শুরু হচ্ছে...


chakrabortypinaki50@gmail.com

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-