সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

শ্রীপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়

sobdermichil | ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮ |
লক্ষ্মীর ঝাঁপি
ঘোলা হাসপাতালে একদিন স্যালাইন আর দুটো ইনজেকশন ঠুসেই কঠিন কেস বলে আরজি কর-এ পাঠানোর সুপারিশ করল। আরজি কর বলল পিজি। পিজিতে বিছানা ফাঁকা নেই। ছেলেটা খাবি খাচ্ছে। আপৎকালীন ওয়ার্ডের বাইরের বারান্দায় শয্যা বানিয়ে চিকিৎসার জন্য শুয়ে থাকা মানুষগুলো মৃত্যুর দিন গুনছে। মৃণালিনীর অবস্থা কি এদের মতো এতটা খারাপ? একমাত্র ছেলের চিকিৎসাটুকু করাতে পারবে না? প্রীতমের সঙ্গে আদালতে দস্তুর মতো লড়ে ছেলের দায়িত্ব জিতেছে। পোস্ট অফিসে এজেন্সি করে যা উপার্জন তাতে মা আর ছেলের চলে যাবে প্রমাণ দিয়ে তুমুল লড়াই।  

চলে যাচ্ছিলও। হঠাৎ ছেলেটার এমন ব্যাধি ধরা পড়ল। আইনি লড়াইয়ে এমনিতেই নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর জেদ করে ক্ষতিপূরণও দাবি করেনি। প্রীতমের কাছে এখন টাকা চাওয়ার কি মুখ আছে? চাইলে দেবে? নতুন বৌ নিয়ে নতুন করে বাঁচা শুরু করেছে। কিন্তু নিজের টাকায় ছেলেকে সরকারি হাসপাতালের মেঝেতে শুইয়ে রাখার চেয়ে কি  ছেড়ে যাওয়া বরের কাছে হাত পেতে নার্সিংহোমের বিছানায় শোয়ানো শ্রেয় নয়? 

প্রীতম কথা শোনালেও ফেরায়নি। তার নতুন জীবনসঙ্গিনী জানে প্রাক্তনীর কোনও দায় তার বরের নেই। ছেলেরও না। তবু সে দেহের ভাষায় সামান্য অসন্তোষ জ্ঞাপন করলেও আপত্তি করেনি। বৌ প্রাক্তন হতে পারে, সন্তান তো হয় না। নার্সিংহোমে দেওয়া মাত্র অয়নকে ভেন্টিলেশনে দিয়ে দিল। অবিলম্বে বৃক্ক প্রতিস্থাপন করতে হবে। প্রচুর টাকার বিনিময়ে দাতা হতে কিছু প্রার্থী পাওয়া গেলেও রক্ত সহ অন্যান্য কোষকলার জরুরি মিল পাওয়া দুষ্কর। 

ব্যাংক ও পোস্ট অফিসের সেভিংস অ্যাকাউন্টে টাকা শেষ। মেয়াদ পুর্তির আগেই ভাঙতে হয়েছে সমস্ত স্থায়ী আমানতও। অস্ত্রোপচারের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। হাজার চল্লিশেক আরও দরকার। মরিয়া হয়ে টাকার সন্ধান আলমারিতে রাখা ফাইলে, তোষকের তলায়, লক্ষ্মীর ভাঁড়ে। এর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শোনা গেল পুরোনো পাঁচশো আর হাজারের নোট বাতিল। হাসপাতালে ছুটবে না ব্যাংকের বাইরে লাইন দেবে? 

রোজ নানা রকম কথা ভাসছে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পুরোনো নোট নেওয়ার অনুমতি থাকলেও ক্যাশে বসা কর্মীরা নিতে চায় না। অগত্যা পাঁচশো প্রতি চারশোর কড়ারে ঘোলা জলে মাছ ধরা একজনের কাছ থেকে বাতিল নোটে কুড়ি হাজারের বিনিময়ে সচল একশোর নোটে ষোল হাজার। বিপদে প্রীতমকে এভাবে পাবে একত্রবাসের সময় ভাবা যায়নি। ঘোরের মধ্যে দুজন কখনও ব্যাংক কখনও ওষুধের দোকান কখনও নার্সিহোমের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটেছে। বাতিল নোট বদলের সময় সীমা কয়েস মাস হলেও মরণাপন্ন রোগী অতটা সময় দিতে অক্ষম।

মাত্র পনেরো হাজারের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্র বেঁকে বসল। পুরো টাকা না পেলে অপারেশন হবে না। মৃণালিনী তার একমাত্র সন্তানের জন্য নিঃস্ব হতে পারে, কিন্তু প্রীতমের কি নতুন স্ত্রী সন্তানের ভবিষ্যৎ জলাঞ্জলি দেওয়ার উপায় আছে? শেষ পর্যন্ত অনেক কাকুতি মিনতির পর ডাক্তার সাহা নিজের দক্ষিণা থেকে টাকাটা মকুব করায় চয়নকে ওটি-তে ঢোকানো হল নির্ধারিত তারিখের তিনদিন পরে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। ডাক্তার থেকে অন্যান্য কর্মীরা বলল অস্ত্রোপচারটা সময় মতো হলে বাঁচার সম্ভাবনা উজ্জ্বল ছিল। মাত্র পনেরো হাজারের জন্য বড্ড দেরি হয়ে গেল।

মৃন্ময়ীকে আক্ষরিক অর্থেই নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেল চয়ন। টানা পনেরো দিন হাসপাতাল ওষুধের দোকান ব্যাংক এটিএম করার পর এক অদ্ভূদ শূন্যতা গ্রাস করল। জীবনটা উদ্দেশ্যহীন মনে হলেও কর্মক্ষেত্রে আবার যোগ দিতে হল। যাদের পলিসি করিয়েছে তাদের প্রতিও তো কিছু দায়িত্ব আছে। 


কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। প্রীতমের একটা সার্টিফিকেট মৃণালিনীর কাছেই থেকে গেছে। প্রীতমের ডায়রিতে লেখা আছে মেয়াদ পুর্তির তারিখটা। মেয়াদ শেষ হয়েছে মাস চারেক আগে। চয়নের জন্য ছুটোছুটিতে খেয়াল ছিল না। ভাগ্যিস ছিল না। নইলে চক্ষু লজ্জার খাতিরে হয়তো প্রীতমকে সেই টাকাটা দিয়ে দিতে হোত। সব চুকে যাওয়ার পর কাগজগুলোর খোঁজ পড়েছে এখন। তন্নতন্ন করে যাবতীয় ফাইল পত্র ব্যাগ সুটকেস ঘেঁটে কোথাও পাচ্ছে না মৃণালিনী। খাটের তলার ট্রাংক থেকে বাসন বার করতে গিয়ে একটা পুরোনো ব্যাগ চোখে পড়ল। অব্যবহারে শক্ত হয়ে গেছে। ভেতরে কিছু কাগজ। আরে প্রীতমের এনএসসি এখানে লুকিয়ে ছিল? যাক। পরের ধন পরকে ফেরত দেওয়া যাবে।

দুটো খাম কেন? একটায় প্রীতমের সার্টিফিকেট। অন্যটায় নিজের নামে করা আর একটা দশ হাজারের এনএসসি। দ্বিগুণ হয়ে কুড়ি হাজার পাবে। মনে ছিল না প্রীতমকে দিয়ে করানোর সময় নিজের নামেও একটা লুকিয়ে করে রেখেছিল সময় মতো চমক দেবে বলে। টাকাটা আর চার মাস আগে পেলে –

হাতের কাগজগুলো রাগে ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে। ব্যাগের ভেতরের চেনটা অন্যমনস্ক হয়ে খুলে ফেলল। কতগুলো লালচে নোট বেরিয়ে এল। এক-দুই-তিন করে পাঁচটা হাজার টাকার নোট। আজ চৌঠা এপ্রিল। একত্রিশে মার্চের আগে খুঁজে পেলেও রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বদলানো যেত। এখন সংগ্রহশালার সামগ্রী হয়ে গেছে।

চিরকাল হিসেবের বাইরে লক্ষ্মীর ঝাঁপিতে নিজের গোপন সঞ্চয় নিয়ে এক ধরণের তৃপ্তি বোধ করেছে মৃণালিনী। সংসারে সময় অসময়ে কতবার তার এই ক্ষুদ্র আমানত ঠেক জোড়া দিয়েছে। হাতে স্থায়ী আমানতের সার্টিফিকেট আর বাতিল নোট নিয়ে মনে হল লক্ষ্মীর ঝাঁপির মতো এত বড় প্রতারক আর হয় না।



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-