সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

শর্মিষ্ঠা ঘোষ

শব্দের মিছিল | ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮ |
অর্ধেক আকাশ


মেয়েটা বড্ড গোঁয়ার মেয়েটা বড্ড হুল্লোড়বাজ মেয়েটা বড্ড আদুরে আহ্লাদী ... মেয়েটাকে মা রোজ ‘মেয়ে ‘ হয়ে উঠতে বলে .. মেয়েটাকে মা রোজ ঘরকন্না শেখাতে চায় ... মেয়েটাকে মা রোজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তবে পরের ঘরে যেতে বলে ... মেয়েটার বাবা ব্যাপক ক্ষেপে যায় মেয়ে সংসারের কুটোটি নাড়লে , কারণ পরের ঘরে গিয়ে কি করতে হবে কে জানে , অন্তত বাপের ঘরে সুখে থাকুক... 

মেয়েটার ভাই মনে মনে ভাবে , মেয়েটা বাপ মার কাছে ‘প্রিভিলেজড’... মেয়েটা খাতার পেছনে নদী আঁকে , মেয়েটা মেঘ করলে কৃষ্ণকলি’ গায় , মেয়েটা অঙ্কে একশোয় আশি , মেয়েটা ঠেলায় পড়লে ঘরদোর ও সামলায় ... মেয়েটা কলেজ যাবে শহরতলী থেকে দূরে ... মেয়েটা এখুনি বিয়ে করবে না ... মেয়েটা গ্রাজুয়েশানের পর এম এ পড়বে ... তারপর কম্পিটিটিভ একজাম ... মায়ের একটা রান্নার লোক রেখে দেবে , বাবার ওষুধের খরচটা বাবার পেনশানে কুলোয় না , ভাইটা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চায় তো পড়বে ...

মেয়েটা মায়ের শাড়ি পরে কলেজ গ্যাছে প্রথম দিন ... আঠেরোর শরীর ভরা বর্ষার নদীর মত ... কলেজের ফ্রেশারস ওয়েলকামের দিন মেয়েটা বাধ্য হয়েছিল থার্ডইয়ারের দাদাকে মঞ্চের ওপর চুমু খেতে ... মেয়েটার বাড়ি ফিরতে রাত হয় ... মা চিন্তা করে বাবা চিন্তা করে ভাই গিয়ে বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়ায় বেশি দেরি হলে ... মেয়েটা সাইকেল কিনবে একটা , টুইশান পরতে যাবে দু কিলোমিটার রোজ , তারপর নাকে মুখে গুঁজে কলেজ ... মেয়েটা আমার আপনার পাশের বাড়ির পাশের পাড়ার পাশের শহরের মেয়ে ...

মেয়েটা খবরের কাগজের হেডলাইন হতে চায় নি , মেয়েটার রাজ কপালে ছিল সেটা হওয়া , তাই শত পিছু টেনেও ঠেকাতে পারলো না মেয়েটার অতি বড় শত্রুও ... বিখ্যাত হতে গ্যালে কিছু নগদ বিদায় করতে হয় , বিখ্যাত হয়ে গ্যালে বদলে যায় সকলে ... তাই, মেয়েটা আর কোনদিন হেসে হেসে উঁচু গলায় যখন তখন যেখানে সেখানে কথা বলবে না , কবিতা লিখবে না , গান গাইবে না অকারণ , মায়ের আঁচলে মুখ মুছে কলেজ যাবে না , বাবার গলা ধরে বায়না করবে না , ভাইকে পড়তে বসার জন্য বকুনি দেবে না ... অথচ মেয়েটা দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে ... মেয়েটাকে খাইয়ে দিলে খায় , নাইয়ে দিলে আপত্তি করে না ... মেয়েটা কোলরিজের কবিতার প্রাচীন নাবিকের মত লাইফ ইন ডেথ দেখেছে ... মেয়েটা ঘুমের তৃষ্ণায় মরে যায় ... গোটা দুনিয়া ঘুমায় ঘুম ঘুম ঘুম ঘুম চতুর্দিকে ঘুমঘোর, শান্তি , স্বস্তি , সুখ , স্বপ্ন , মেয়েটার চোখে রাত খালি রাত , আর কিছু নেই ...

মেয়েটার বিয়ে হবে না ভেবে মা গলায় দড়ি দিতে চায় , মেয়েটার জন্য বাবা পথেঘাটে বেরোতে চায় না , দিদির কথা উঠলে ভাই গম্ভীর হয়ে যায় ... মেয়েটার বাড়ি দুম করে চিনে ফেলল শাসক বিরোধী কাগজওয়ালা  ভবঘুরে ভিখিরি প্রত্যেকে ... মেয়েটার গোপনাঙ্গের ছবি এম এম এস হয়ে ছড়িয়ে পড়লো শহরময় ... ভাদুরে কুকুরের পালের চেয়েও নির্দয় খামচে কামড়ে টেনে হিঁচড়ে কয়েক মাতাল অ্যানাটমি শিখতে চেয়েছিল কিনা ভেবে টাকে চুল গজিয়ে ফেলল মনস্তাত্বিক দল ... সমাজকল্যাণ কর্মীর কাজ জুটেছে নতুন আর একটা ডেলিকেট কেস কাউন্সেলিং এর ... মেয়েটা একটা ‘গ্লাস মেনাজারি’ বা ‘ডলস হাউস’ এর মত কিছু লেখা হলে নব্য নায়িকা হলেও হতে পারে ...কিম্বা আরেকটা ফুলনদেবীও হয়ে উঠতে পারে মেয়েটা ...  মেয়েটা ভার্জিনিয়া উলফের বড্ড ফ্যান ছিল ... অরুন্ধতি রায় কেন আর সেভাবে লেখেন না , মেয়েটা খেয়ে না খেয়ে ভাবতো সেটাও ... মেয়েটা জড়ভরত হয়ে আরও কতদিন বাঁচবে কে জানে , মা বাবাও মৃত্যু কামনা করে তবে সন্তানের কখনো কখনো ...

মেয়েটা কাগজে কলমে অর্ধেক আকাশের দাবীদার ... মেয়েটা সংবিধান অনুযায়ী বাবার অর্ধেক সম্পত্তির দাবীদার ... মেয়েটা সভ্যতার বিবেক অনুযায়ী আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম অধিকারের দাবীদার ... মেয়েটা ধর্মাচরণের সম অধিকার নিয়েও সরব ছিল ... মেয়েটার অভিধানে ‘না ‘ ছিল না ... মেয়েরা পারে না এমনকিছু হয় বলে মেয়েটা বিশ্বাস করতে চাইতো না ... মেয়েটা কোনোদিন তার ছেলে বন্ধুদের হিংসে করে নি , ভাইকেও নয় ... বাবা ছিল মেয়েটার সবচেয়ে কাছের জন ... মেয়েটা বুঝতেই চাইতো না নারীকে আপন ভাগ্য জয় করার সুযোগ দিলেও সে সবসময় পেরে ওঠে না বিধাতারই এক চক্রান্তে , বুঝতেই চাইতো না , সে একতাল মাংসপিণ্ডের মত লোভনীয় নরখাদকদের কাছে ...

মেয়েটার জন্য সুশীল সমাজের বাকি অর্ধেক আকাশ কথা দূষণে কালো হয়ে গ্যাল ... মেয়েটার জন্য বন্ধুরা বাইট দিল ... উঠতি সাহিত্যিক হাতে গরম থিম পেয়ে ফাটিয়ে লিখল ... প্রেমিক প্রেমিকা নিজ নিজ দলের সমর্থনে কয়েকদিনের প্রেমালাপ মাটি করলো ... মেয়েটার জন্য ব্যান্ডএইড ও বিকোল মন্দ নয় ... মেয়েটার জন্য স্লোগান দিয়ে দিয়ে গলা বসে গ্যাল অতি উৎসাহীদের ... মেয়েটার জন্য ঘরের দোরে চাকরি চলে এল ভাইএর ... বিরোধীরা ‘ধ্যাত্তেরি’ বলে হাত ধুয়ে অন্য মুরগি ধরতে গ্যাল ...  নাবালক ভাই আর ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্বপ্ন দ্যাখে না , রোজ বয়স গোনে , কবে জয়েন করতে পারবে নতুন চাকরিতে , উফ আর কতদিন বাকি সাবালক হতে , ততদিন এই সরকারকে রেখে দাও , ঠাকুর ! ... মেয়েটার বাবা বলল , অমন ছেলে তার হতেই পারে না , মা কিছুই বলল না , মাকে আসলে কেউ কিচ্ছু বলে নি ...


sharmisthaghosh1974@gmail.com


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-