সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

রাণা চ্যাটার্জী

sobdermichil | ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮ |
" চিকিৎসা,হয়রানি ও দৈনন্দিনতা "
বহাওয়া দপ্তর না হয় প্রকৃতির মেজাজ কখন কেমন হবে, তার একটা পূর্বাভাস দেবার চেষ্টা করেন,কিন্তু মানুষের জটিল দেহে হটাৎ কখন কি যে অসুস্থতার আশঙ্কা,শরীর খারাপের কালো মেঘ আসবে তা অনুমান করা খুব মুশকিল।

বাইরে থেকে বোঝাও মুশকিল যে,কার কি হয়েছে বা হয়ে বসে আছে শরীরের মধ্যে ,সত্যিই তা উপলব্ধি করা দুঃসাধ্য।যখন সাদা চোখে বাহ্যিক লক্ষণ ফুটে ওঠে কখনো, তখন বেশ খানিকটা দেরি হয়ে যায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। কর্মসূত্রে পরিবার তখন থাকতো অন্য এক শহরে ,সপ্তাহান্তে গিয়ে দেখি নার্ভ সংক্রান্ত অসহ্য যন্ত্রণায় রাতের পর রাত কষ্ট পাচ্ছে পরিবারের আপন কেউ । আশে পাশে শুভাকাঙ্খীদের পরামর্শে এক ভালো ডাক্তার বাবুর সন্ধান পেতেই সকালে দৌড়ালাম ।পুরানো প্রাসাদোপম বাড়ির নিচে চেয়ার টেবিল পেতে কম্পাউন্ডার মশাই নাম লিখছেন দেখে ডাক্তারকে দেখানো যাবে এই ভরসায় বুক বেঁধে ,উনার সামনে পৌছে দেখি আগামী তিন দিনের জন্য নাম অলরেডি বুক হয়ে গেছে । ভালো ওষুধ খেলে কাজ জলদি হবে এই আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনে হাসিমুখ নম্র ডাক্তার বাবুর কে দেখানোর সুযোগ পেলাম।

উনি খচখচ করে অনেক ওষুধ দেবার সাথে প্রয়োজনীয় হাতের,কোমড়ের বেল্ট প্রভৃতি কেনার উপদেশে ফিজিওথেরাপিস্ট এর নাম সহ দোকানের একটি কার্ড ধরিয়ে দিলেন।বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে ,খিদে তেষ্টায় নাকাল হয়ে বাড়ি ফিরলাম। বিকেলবেলায় পাড়ার মোড়ে ওষুধের দোকানে ওষুধ কিনতে গিয়ে এক নতুন বিভ্রাট। দোকানদার দাদা স্মিত হেসে বললেন ,এই ডাক্তার বাবুর হাতের লেখা উদ্ধার আমরা করতে পারি না ,অন্য কোথাও দেখুন। অন্য দোকানে গিয়েও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ।উনি পরামর্শ দিলেন চেম্বারের সামনে একটা নির্দিষ্ট দোকানই একমাত্র এই প্রেসক্রিপশন, ওষুধের নাম বুঝতে পারবে! মনে মনে ভাবলাম ,এ আচ্ছা জ্বালা হলো তো, এতটা রাস্তা আবার কিনা আমায় যেতে হবে এখন!ভেবেই বিরক্ত লাগল,অথচ উপায় আর কি,কিনতে তো হবে ওষুধ। মনের মধ্যে ভাবনা আসছিল,একমাত্র ওই দোকানই ডাক্তার বাবুর হস্তাক্ষর বুঝতে পারবেন শুনে,তার মানে এমন নয় তো ,মহান চিকিৎসক মহাশয় ইচ্ছে করে কোড সম্মৃদ্ধ লেখা লিখছেন,ওই দোকানের সাথে গোপন বোঝাপড়ায় !সেই সঙ্গে বুঝতে অসুবিধা হলো না,আমাকে ধরিয়ে দেওয়া কার্ড অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট দোকান যত দূরেই হোক আমায় পৌঁছাতেই হবে।সত্যি সাবাস ডাক্তার বাবু,সাবাস আমাদের বাধ্য হয়ে মেনে নেওয়া রোগীদের অসীম ধৈর্য্য।

এই ঘটনাটি ছাড়াও সামগ্রিকভাবে দেখা যায় বহু ডাক্তারবাবুর হস্তাক্ষর,অনেক ওষুধ দোকানদাররা বুঝতে না পেরে স্রেফ আন্দাজের ওপর ওষুধ দেন। এর ওপর ক্রেতা যদি হয় অশিক্ষিত,গ্রাম গঞ্জের ছাপোষা মানুষ জন,যাদের অন্যদের ওপর বিশ্বাস আর ঠকা দৈনন্দিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়,তারা হলে তো চোখ বুজে অন্য কপোজিশনের ওষুধ দিতেও কোনো বাধা থাকে না দোকানিদের। ভেবেই অবাক হচ্ছি,বাপরে বাপ, এর ফল যে কি মারাত্মক তা কি আন্দাজ করতে পারছেন! সমীক্ষায় দেখা গেছে ভারতবর্ষে প্রতি বছর প্রচুর মানুষ ভুল চিকিৎসায় ,ভুল ওষুধ খেয়ে মারা যায় । এটা তো সত্যিঘটনা যে, অল্প বেতনে নামমাত্র ইংরেজি পড়া বিদ্যায় পারদর্শী কর্মচারীগণ কে ওষুধ ব্যবসায়ীগণ, দোকান সামলাতে রাখেন।এরাও মালিক কে খুশি করতে দোকানের অভিজ্ঞ কর্মীর অবর্তমানেও কেবল গতানুগতিক আন্দাজে ক্রেতা সামলান। এই যে বিরাট এক ফাঁক, গয়ংগচ্ছ মনোভাব,অবহেলার ফল যে কি মারাত্মক তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না । কিন্তু যদি প্রেসক্রিপশন গুলো কম্পিউটার টাইপ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয় বা ধীরে ধীরে প্রবণতা বাড়ে, অথবা ডাক্তারবাবুরা বড় হস্তাক্ষরে ওষুধের নাম লিখে দেন আখেরে রোগী ও রোগীর পরিবার উপকৃত হয় ভীষণ ভাবে।ডাক্তারবাবুরও সুনাম বৃদ্ধি পায়।

অপর আর এক বিষয় ভীষণ ভাবে নজর কাড়ে,যা একটু খেয়াল রাখলেই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে সকলের কাছে।এটা অনেকেই লক্ষ্য রেখেছি, ডাক্তার বাবু হয়তো কোনো ওষুধ, টানা পাঁচ দিন বা সাত দিন খাবার পরামর্শ দিলেন প্রেসক্রিপশনে। দোকানদার কিন্তু সেই মতো ওষুধ কিছুতেই স্ট্রিপ কেটে বিক্রিতে রাজি নন।অগত্যা "ফেলো কড়ি মাখো তেল" এই ভাবনা নিয়ে রোগে জর্জরিত ,দুশ্চিন্তা গ্রস্থ রোগী ও রোগীর পরিবারকেই পুরো স্ট্রিপ কিনে নিতে হয় প্রয়োজন ছাড়াই।

ওষুধ ব্যবসায়ী সংগঠনের বক্তব্যও এ বিষয়ে ফেলা দেওয়া যায় না,ওনাদের মত হলো, পরবর্তীকালে কাটা ওষুধ কেউ কিনতে যেমন চায় না সেইসঙ্গে এই কাটা ওষুধের পেছনে তারিখ,নাম না থাকায় দোকানদারদের কাছে, এই খুচরো ওষুধকে ,ঠিক মতো সংরক্ষণ করাটাও বেশ চাপের। 

তবে এটা ঠিক যে,সমস্যা যখন থাকে তার সমাধানও থাকে ,আর যদি ঊর্ধতন কতৃপক্ষ বিষয়টি কে নিয়ে হস্তক্ষেপ করেন কিছুটা হলেও দুর্ভোগ কম হয়।ওষুধের কম্পানি যদি প্রত্যেকটি ওষুধের নিচে,ছোট করে হলেও,ওষুধের নাম ও প্রয়োজনীয় বিষয় প্রিন্ট করে দেন তাহলে কাটা,খুচরো ওষুধ রাখা ও বিক্রিতে আর যাই,সব কিছুতে কোপ পড়া নিম্ন ও মধ্যবৃত্ত রোগীর পরিবার বর্গের একটু হলেও উপকার হয়।এই ভাবে কিছু সমস্যা জিইয়ে রাখা হয়,কিছু ইচ্ছাকৃত ভাবে অধিক লাভের আশায় ।মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ,স্বার্থসিদ্ধির জন্য,সমাজ কে উত্তরণের দিশা না দেখিয়ে,দুর্দশার জালে জড়িয়ে দিয়ে আখেরে সমাজেরই ক্ষতি করে।

chatterjeeranabengal@gmail.com



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 

বিশ্ব জুড়ে -

Flag Counter
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-