সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

জয়া চৌধুরী

sobdermichil | ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮ |
আজাইরা বাজার কথন ১৩ জয়া উবাচ/
বসময় সুখের কথা পড়তে ভাল লাগে পাঠক? চাদ্দিকে এত মাইকের চিৎকার এত ফুর্তির ঢাকঢোল আমার কেন যেন বিরক্তি লাগে ইদানীং। কী আশ্চর্য তাই না? সারাক্ষণ সুখে নেই সুখে নেই সুখ দাও সুখ দাও করে আমরা কতই না বিলাপ করছি। অথচ মাইক মেলা আলো মদের ফুর্তিতেও মন খারাপ। সারাক্ষণ ফ্রাস্ট্রেশন চতুর্দিকে। বাজারে গেলাম সব জিনিষ আগুন দাম। যাওনের পকেটে পাঁচশ টাকার নোট বের করলে ফিরতি পকেটে পাঁচশ পয়সা থাকছে। হে ভগবান শীতকালেও দাম এত চড়া! মাছের দোকানে যান পুজোর পর থেকে দাম মোটেই বাড়ে নি। বরং দাম কমতে পারে দু দশ টাকা। কিন্তু সবজির দাম গরমকালের চেয়ে বেশী ছাড়া কম নয়। হতাশা আসবে না! কিন্তু যারা চাকরী করছে তারাও সুখী নয় কিন্তু! তাদের মুখেও শুনি এত কম রোজগারে জীবন চালানো কঠিন। আর পারা যাচ্ছে না। কিন্তু জীবন চলে কিসে? কীভাবে চললে আমরা চালানো বলতে পারি! পাড়ার নাইটগারডের মাইনে সাকুল্যে সাড়ে তিন হাজার। মানে দিন প্রতি একশ দশ টাকা। চারবেলা খাবার কেনা সম্ভব এই টাকায়? পাউরুটি মুড়ি খেয়ে কতবেলা কাটানো যায় বাঙালির সন্তান হয়ে? কিন্তু ওদের তো কাটছে। তরুণ যে যুবকটি সেলসের চাকরী করছে বা যে যুবতী প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ইংরিজি পড়াচ্ছে তার পকেট ভর্তি সাটিফিকেট অথচ মাস গেলে সাকুল্যে ছয় সাত আট নয় হাজার টাকা মাইনে। নাইটগারডের ইস্ত্রী করা প্যান্ট শার্ট না পড়লেও চলে। কিন্তু এদের তো জামাও পড়তে হবে আবার সবসময় স্ট্রিট স্মার্টনেস বজায় রাখতে হবে। আচ্ছা কী করে এরা হাসিমুখে থাকবে? মাসে একদিন মাংস কিনে খেতেও এদের ভাবতে হবে কীকরে মাস চালাব? আবার উচ্চপদের সরকারী কর্মচারী বা স্কুল শিক্ষকের হতাশা ডিএ বঞ্চিত থাকছে কিংবা বাজার দরের চাইতে কম বাড়ছে মাইনে। তাহলে সুখী কে? চাকরি না করলে তো আরো অনিশ্চিত মাস। হতাশা থাকবে না কেন? 

আজ্ঞে হতাশা ব্যাপারটা সব সময়ে টাকার ওপর নির্ভর করে না মশাই। আমি কী চাইছি, কতটা চাইছি তার ওপরেই বেশী নির্ভর করছে একক। পেট ভরে গেছে আর খাব না ভাবলে পেটের মাপে খাবার লাগবে। আর পেট ভরে গেছে তবু পরে খিদে পাবে ভেবে জমাই তাহলে আরো খাবার লাগবে। পেট ভরছে ঠিক আছে কিন্তু আমার খাবারের ভ্যারাইটি চাই তখন আরো চাপ। আরো টেনশন খাবার জমানোর। কিন্তু থামাটাই বা কোথায়? 

সোভিয়েত রাশিয়া চলে গিয়েছে মহাকালের গর্ভে। তার দখলে থাকা ছোট ছোট দেশগুলোও তাই কমিউনিজম ঝেড়ে ফেলেছে। বেশ কথা। দিব্যি ব্যবস্থা। কার মাথার দিব্যি আছে যে সারাজীবন একভাবেই কাটবে! কিন্তু শুনছি সেখানেও সবাই নতুন ব্যবস্থায় ভাল নেই। পূর্ব জার্মানির অবস্থা পেপারে পড়ি নাকী শোচনীয়। উত্তর কোরিয়ায় কিম সব দেশবাসীকে মাংসের কিমা বানিয়ে রাখছে। এসব দেশ সবই একধরনের অর্থ বণ্টনের নীতি মেনে চলত, অন্ততঃ নীতিগত ঘোষণা তাই ই ছিল। অথচ আজ শুনছি তারা কেউ ভাল নেই। আবার সেই যে আমেরিকার ব্যাঙ্ক বিপর্যয় ঘটল ২০০৮ সালে তারপর থেকে গোটা পৃথিবীতেই সেই মন্দার প্রভাব চলতেই লাগল। স্পেনে এই তো ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যান পড়েছিলাম সেথায় ৫ মিলিয়ন মানুষ কাজের খোঁজে দেশ ছেড়েছে। লক্ষ লক্ষ তরুন বাড়ির অভাবে রাস্তায়। কেননা মর্টগেজ শোধ করতে পারে নি বলে ব্যাঙ্কগুলো তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। মানে যে যেমন ছিল কেউই ভাল ছিল না। এখনকার পৃথিবী আবার সিরিয়া বা মায়ানমারের শরণার্থী নিয়ে জেরবার। কেউই তার দেশে তার ঘরে সুখে নেই। সবাই দুঃখী। গোটা দুনিয়া এখন একঘেয়ে। সমস্যার এমন বিভিন্নতা আর চাহিদার এত জঘন্য মনোটনি কখনও সভ্যতা দেখে নি শিল্প বিপ্লবের পরে। সকলের এক পছন্দ, সকলের আকাঙ্ক্ষা একধরনের সকলেই নিরন্তর অসুখী। 

জানি জানি একদল ঝাঁপিয়ে পড়বেন আমার ওপর লজিক পড়ে। শরণার্থী সমস্যা আর ভাতের সমস্যা কি এক? হ্যাঁ মশাই এক না হলেও এক শ্রেণীর। শিশুকালে পড়া মনে নেই? ফুড শেলটার অ্যান্ড কমিউনিটি আমাদের প্রাথমিক চাহিদা? হ্যাঁ কেউ কেউ আবার যৌনতাকেও এর মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। আমি অবিশ্যি রাজী নই। ঐ বংশ বা গোষ্ঠী সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া এ চাহিদার জন্য অন্য মানুষের ওপর মোটেও নির্ভর কর্তে হয় না।কমিউনিটির দরকার নিরাপত্তার কারণে হতেই পারে। কাজেই এই সমস্যা আমাদের সুপ্রাচীন সমস্যাই বটে। কিন্তু তার বাইরের মানুষগুলো এমন হতাশ কেন? এত আত্মহত্যা কেন? এত মনোরোগ কেন? এত বিকৃত অপরাধের সংখ্যা কেন? 

দেখুন দাঁত পড়ে গেলে অনেকেই নিরামিষ ভোজী হয়ে ওঠে। কিন্তু দাঁত থাকতে আমিষের লোভ যদি না এড়াতে পারেন তাহলে ধিক্কার মশাই আপনাকে। তাহলে আর সাফল্য আসবে কী করে! এক ছাত্রের বাড়ি কুকুর পোষে। আরে শুনুন না মশাই দুটো জীবনের কথা বলতে এলাম। ভদ্রলোকের মানে পোষা জীবটির খুব বিস্কুট চকোলেট খাবার শখ। এদিকে আমায় প্লেটে করে ওসব দিলে ওর ঘেউঘেউ বন্ধ হয়ে যায়, প্লেট বেষ্টন করে ক’পাক ঘুরতে ঘুরতে ফের নিজের জায়গায় বসা। কারণ ডাক্তারের বারণে তিনি পরিমিত মাংসভাত ছাড়া আর কিছু খাবেন না। অতএব উদাসীন পেট চিত করে শুয়ে তারপর পাশ ফিরে শুয়ে পড়া চক্ষু অর্ধনিমীলিত। বহুক্ষণ পরে প্লেট শেষ করা মাত্রই তিনি তড়াক করে উঠে বসে একবার জিভ চেটে নেন। ব্যস লোভ আসা ও তাকে দমন করা। প্রমাণ থাকে হাজারও যে মানুষের যত অসংযম পশুর তার এক শতাংশ নয়। আমাদের দশা কুকুরের চেয়ে অধম নয় কি?

সারা দুনিয়াতে এখন মানুষ পুরনো শাসনব্যবস্থায় ফিরতে চাইছে। আগে সুখ ছিল আগে ময়ূরপঙ্খী নাওয়ে রাজপুত্র আসত, আগে হাতিশালে হাতি ঘোড়াশালে ঘোড়া থাকত, আগে রাজা ছিল, আগে রামরাজা ছিলেন সব্বাই দোর খুলে রাতে ঘুমোত চোর ছ্যাঁচোড়ের ব্যাপারি ছিল না , আগে আগে আগে...আগেই ভাল ছিলাম। না হলে কি আর গরু খাওয়ার বদলা মানুষের লাশ পোড়ানো দিয়ে হয়, না আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসে বা জার্মানিতে নাৎসি সমর্থক বাড়ে? আমরা তো কত বই কত সিনেমা বানিয়ে ফেলে প্রমাণ করেছি এরা মন্দ তাতে কি জনতা বুঝে গেছে? কাঁচকলা।জনতা সুখে নেই তাই জনতা বোঝে নি। জনতা চেনে দুটাকার চাল, জনতা বিশ্বাস করে নোটবন্দীর রূপকথা।

এই এইখানেই আসল অসুখ লুকিয়ে আছে। অ-সুখ আমাদের মননে জড়িয়ে গেছে। যা আছে তাতে সন্তুষ্টি নেই। প্রয়োজন আর চাহিদা গুলিয়ে দিয়েছে শিল্প বিপ্লব পরবর্তী দুনিয়ায় ধনতন্ত্র। কোনটা ভাতের খিদে, বাড়ি না থাকার বেঘরের কষ্ট আর কোনটা দামী লিপস্টিক বা নতুন মডেলের গাড়ি না থাকার কষ্ট সব গুলিয়ে গেছে আমাদের। আমরা কমিউনিজমেও দুঃখী ছিলাম আমেরিকানিজমেও দুঃখীই আছি। আমরা তাই সবেতেই অসুখী। তাই মনে হয় ছোট প্রাপ্তিতে সুখ আর ছোট দানে অসুখ এই চিরকালের সারসত্যটা প্র্যাকটিস করতে পারলে আমাদের জীবনে সুখ ঝাঁপিয়ে পড়বে আবার। আপনাদের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও জ্ঞান দিয়ে রাখলাম। চলি


jayakc2004@yahoo.co.in


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 

বিশ্ব জুড়ে -

Flag Counter
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-