সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

অতনু জানা

শব্দের মিছিল | ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮ |
" অ-রাজনীতি "
হুটারের শব্দটা মুহূর্তের জন্য বন্ধ হতেই অনীকের কানে এল মাইকের আওয়াজ - "মানুষকে বোকা বানিয়ে এই এতগুলো টাকা আত্মসাৎ করেছেন, তা আপনাদের ফিরিয়ে দিতেই হবে " এ অন্যায় আমরা কোনও ভাবে মানছি না; মানবো না।" অনীক ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছিল,পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল -হিমাদ্রি বাবুর বুকটা তখনও প্রবল গতিতে ওঠানামা করছে, অসহ্য যন্ত্রণায় চোখটা প্রায় ঠিকরে ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসার উপক্রম। উমাদেবী প্রাণপণে চোখের জল আটকে রেখে হিমাদ্রি বাবুর মাথাটা নিজের কোলের মধ্যে রেখে অতি স্ব- যত্নে মাথায়, ঘাড়ে, বুকে হাত বোলাতে বোলাতে অনবরত সান্ত্বনা দিয়েই চলছেন। আর পায়ের কাছে বসে রয়েছে ওনাদের একমাত্র সন্তান তাতান। কত আর বয়স হবে ! এই তো সেদিন সিক্স পাশ করে সবে ক্লাস সেভেনে উঠল -সময়ের সাথে সাথে বাবার শরীরের ক্রমাগত এই অবনতি তাকে পুরোপুরি মুষড়ে দিয়েছে -বাবার পায়ের কাছে বসে অনবরত তাঁর পা -বুক- হাত ম্যাসেজ করেই চলছে।

নাহ: যা ভেবেছিল তাই -সম্ভবত কোনও রাজনৈতিক দলের ধর্না - দূর থেকে ক্রমাগত স্লোগানের শব্দ। প্রায় মিনিট দশেক ধরে বুম্বা অনেক চেষ্টা করেও কোনও ভাবে এ্যাম্বুলেন্স কে একফোঁটাও নড়াতে পারেনি। সামনে দুটো সিটের মাঝ বরাবর ছোট্ট একটু জায়গা - যেখান থেকে সামনে ও পেছনের দিকে কিছু জিনিস পত্র আদান প্রদান করা যেতে পারে, ওই সামান্য একটু ফাঁকা জায়গা দিয়েই অনী পেছনের দিকে ঝুলে পড়ল। হিমাদ্রি বাবুর মুখের সাথে অক্সিজেনের মাস্কটা ভালো করে আটকে দিয়ে সে নেমে পড়ল -চোখে মুখে বিরক্তির সাথে ভয় -মিলিয়ে মিশিয়ে অদ্ভুত এক রকমের অস্থিরতা। যে ভাবেই হোক হিমাদ্রি বাবুকে দ্রুত হসপিটালে পৌছাতেই হবে - এদিক ওদিক কিচ্ছুক্ষণ তাকিয়ে কি মনে হল হঠাৎ হন হন করে সামনের দিকে এগিয়ে চলল -সামনে পেছনে ডানদিকে বা দিকে বাস ট্যাক্সি প্রাইভেট কার মোটর বাইক একটার সাথে আর একটা মিলে মিশে ভয়ংকর যানজট। গাড়িগুলো যেন একটার সাথে আর একটা জট পাকিয়ে রয়েছে। এই জট ছাড়ার আপাতত কোনও উপায় নেই!

এর মধ্যে পেছনের দিক থেকে ক্রমাগত ধাবমান গাড়ি গুলো একটার পর একটা আসছে, আর সারি সারি হয়ে পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে পড়ছে। যত সময় এগোচ্ছে লাইনটা ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সামনে পেছনে যত দূর চোখ যায় কেবল সারি সারি গাড়ি - পেছনের দিকে ফিরে আসার ও আর উপায় নেই। ভিড় ঠেলে কোনোরকমে এদিক ওদিক কাত হয়ে সামনের দিকে সে এগিয়ে চলছে। এদিক-ওদিক ঠোকাঠুকির পর অনেক চেষ্টায় কোনোক্রমে জমায়েতটার কাছে এসে পৌঁছল । 

প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন মত হবে নারীপুরুষ নির্বিশেষে বিভিন্ন বয়সের মানুষ। পাঁচ মাথার মোড়টাকে পুরো-পুরি স্তব্ধ করে দিয়েছে। এমনকি একটা সাইকেলও গলার মত অবস্থা নেই। একেবারে মধ্যখানে কয়েকজন জটলা করে বসে রয়েছে, তাদের পেছনের সারিতে আর ও কয়েকজন ঝাণ্ডা হাতে রাস্তাটাকে পুরোপুরি ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খানিক দূরেই রাস্তার ওপর একটা অস্থায়ী মঞ্চ - সেখানে নেতা স্থানীয় কয়েকজন মঞ্চে বসে রয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ একজন মাইক্রোফোন হাতে চাঁচাছোলা ভাষায় বক্তব্য রাখছেন। নীতি -আদর্শ - বাক-স্বাধীনতা -মানুষের ওপর চক্রান্ত করে কি ভাবে তাদের প্রতিনিয়ত শাসক দল বোকা বানাচ্ছে, ইত্যাদি- ইত্যাদি। অনীর সামনে কতগুলো মানুষ জটলা করে মঞ্চের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তৃতা শুনছিলেন, তাই ওই ভদ্রলোককে ঠিক মত দেখতে পাচ্ছিল না।

এই সমস্ত বক্তব্যগুলো কানে আসতেই অনীর সারা শরীর জুড়ে একটা শিরশিরানির চোরা স্রোত বয়ে গেল। হাত পা ক্রমশ যেন তার অস্থির হয়ে আসছে, চোয়ালটা হটাত কেমন যেন শক্ত হয়ে এল। অসম্ভব একটা রাগে তার সারা মাথা গরম হয়ে গেল, কপালের দুটো পাশে সে অনুভব করল সরু সরু শিরা দুটো দপ দপ করছে।

এই সমস্ত ন্যায্য দাবী গুলো আদায়ের তাগিদেই তারা আজ রাস্তায় নেমেছে। মানুষকে সচেতন করার তাগিদেই বোধ হয় বাধ্য হয়েই তারা আজ ধর্নার পথ অবলম্বন করেছে। এ ছাড়া ও তারা শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রশাসনিক অচলাবস্থা দুর্নীতি ইত্যাদি হাজার অবক্ষয় নিয়ে বর্তমান সরকারের বিপক্ষে মানুষকে সচেতন করার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে -

এত গুলো সাধারণ মানুষের এত গুলো কষ্টার্জিত অর্থ, এই ভাবে গ্রাস করে নিয়ে তারা আজ পার পেয়ে যাবে?

কখনোই মেনে নেওয়া যায়না !

এমনকি শাসক দলের বহু রথী-মহারথীরাও এর মধ্যে সুস্পষ্ট ভাবে জড়িত। আর ওদিকে প্রশাসন সব কিছু জেনে বুঝে ও কোনও অ্যাকশন নিচ্ছে না। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন গরীব খেটে খাওয়া মানুষ আক্ষেপে আত্মহত্যাও করে ফেলেছে- সরকারের সেদিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই !

আত্মহত্যা করবেই না বা কেন -কোনও কোনও গরীব খেটে-খাওয়া মানুষ তার সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ সুরক্ষিত ভেবে এখানেই গচ্ছিত করে রেখেছিল। তাদের কাছে ভরসার জায়গা ছিল এটাই -

এত গুলো হেভি-ওয়েট নেতা যেখানে আস্থা দিয়েছেন, সেখানে এই অর্থ যে সুরক্ষিত থাকবে না, তা কেউ কখনো ভেবে দেখেছে? কেউ হয়ত ভবিষ্যৎে মেয়ের বিয়ের জন্য, অথবা কেউ ছেলের পড়াশুনার জন্য সঞ্চিত করে সুরক্ষিত ভেবে এখানেই গচ্ছিত রেখেছিল। অথচ আজ তাদের সমস্তটাই চলে গেল -উপরন্তু সরকার শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার আশায় রোজ রোজ তাদের হয়েই সাফাই গেয়ে চলছে -

রাজনৈতিক নেতাদের মুখে এই সব জনহিতকর কথাবার্তা শুনলে অনীর মনটা বেশ ভাল হয়ে যায় তার -মনে মনে ভাবতে থাকে হয়ত সত্যিই একদিন মানুষের সমস্ত সমস্যা গুলো দূর হয়ে যাবে !হয়ত, এদেশের মানুষ গুলো একদিন সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জন করবে ! হয়ত, ব্রিটিশ আমলে সংঘটিত লাখো লাখো বিপ্লবীদের আত্মবলিদান সত্যিই একদিন সার্থক হবে !

তাদের স্বপ্নের ভারতবর্ষ একদিন তাদের দেখানো পথেই সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জন করবে। হয়ত একদিন এদেশের প্রত্যেকটা মানুষ -অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান, স্বাস্থ্য -শিক্ষার মত অতি প্রয়োজনীয় অধিকার গুলি নিয়ে অন্তত সত্যিকারের মানুষের মত বেঁচে থাকতে পারব, অন্তত এদেশের প্রত্যেকটা মানুষের সামান্যতম বাক-স্বাধীনতার অধিকার টুকু একদিন মানুষ ফিরে পাবে।

আচমকা অনী ঘড়ের মধ্যে ঠাণ্ডা মত কিছু একটা স্পর্শ অনুভব করল। মনে হল কেউ যেন তার ঘাড়ে হাত রেখেছে! ঘাড়টা ঘোরাতেই সে দেখতে পেল-

খুব চেনা একটা মুখ,চোখ গুলো ও যেন তার ভীষণ চেনা। অথচ দীর্ঘদিন না দেখা হওয়ার ফলে আচমকা ঠিক মনে করতে পারছে না। সারা গাল জুড়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আগের থেকে অনেকটা মোটা লাগছে তাকে। এবার সে ঠিকই চিনতে পেরেছে, হ্যাঁ - বান্টি-ই তো -

বান্টি হাসতে হাসতে বলল - ভাই, এতদিনে আমাদের মনে পড়েছে? শুনেছিলাম, তুই নাকি আমাদের পার্টি ছেড়ে দিয়েছিস? বিশ্বাস হচ্ছিল না ! শুনেছিলাম, তোকে ওরাও নাকি দলে নেওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল। ভাগ্যিস, তুই ভুল করে ও ওদের দলে যাসনি । যে যাই ভাবুক, আমি অন্তত জানতাম, আর যাই হোক- তুই অন্তত অমন একটা আদর্শ- হীন ধান্দা-বাজীদের দলে কক্ষনো যাবি না । তোর প্রতি সেই বিশ্বাস-টুকু আমার বরাবরই ছিল। সেই কলেজ থেকে তোকে আমি এত কাছ থেকে দেখে এসেছি। রাজনীতিটাও শুরু হয়েছিল আমাদের একসাথে -তারপর এত গুলো বছর, আমরা হাতে হাত রেখে এগোচ্ছিলাম - মনে আছে তোর, তুই ওই সময় বেশিরভাগ দায়িত্ব গুলোই স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছিলিস?

সাম্যবাদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যৎে একটা স্বপ্নের সমাজ গড়ে তোলার প্রয়াস ছিল তোর দিনরাত। প্রায়শই তুই আমাদের বলতিস- দেখে নিস বাণ্টি, আমরা একদিন সারা ভারত বর্ষ জুড়ে এমন এক সমাজ গড়ে তুলব, যেখানে কৃষক তার ফসলের সঠিক মূল্য পাবে,শ্রমিক পাবে তার পরিশ্রমের সঠিক মূল্য , উদ্বৃত্তের সুষম বণ্টন-হেতু ফারাক কমে আসবে শাসক আর শোষিত-র মধ্যে। শাসকের মাত্রাতিরিক্ত উপার্জনের কিয়দ অংশ শুল্ক-বাবদ আইনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভাণ্ডারে এসে জমা পড়বে । আর সেই দিন দেশের সমস্ত মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থান একটা সমান ধারায় পর্যবসিত হবে। মানুষের অতি প্রয়োজনীয় অধিকার গুলি রাষ্ট্র তার উপার্জনের উদ্বৃত্ত থেকে সুনিশ্চিত করবে। স্বাস্থ্য- শিক্ষা-বস্ত্র বাসস্থান এমনকি নিরাপত্তার মত অতি প্রয়োজনীয় অধিকার গুলো রাষ্ট্র তার সঞ্চিত অর্থ ভাণ্ডার থেকে ব্যয় করবে। লেখক স্বাধীন ভাবে লিখে যাবে, গায়ক তার মনের মত করে গান গাইবে, দার্শনিক তার নিজস্ব দর্শন সবার সামনে তুলে ধরবে -কেউ কোনোভাবে সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না।আর জনগণ সব কিছু বিচার বিবেচনা করে তার নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে স্বাধীন ভাবে একজন যোগ্যা রাষ্ট্রনেতা নির্বাচন করবে। আর সেই নির্বাচিত রাষ্ট্রনেতা তার সমগ্র ক্ষমতার উপকরণ গুলোর সহযোগিতায় রাষ্ট্রের অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তাদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার দায়িত্বে অবিচল থাকবে।

আমরা অবাক হয়ে তোর সেদিনের কথা গুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম আর সেই স্বপ্নের সমাজে ভবিষ্যতে বসবাস করার স্বপ্ন দেখতাম। তোর নেতৃত্বেই তো সে বছর আমরা কলেজে বিরোধী পক্ষকে প্রায় ক্ষমতা-চ্যুত করেছিলাম। ওরা মাত্র দুটি সিট পেয়েছিল সে বছর। তোর চিন্তাধারার সাথে পার্টির আদর্শ মিলে মিশে এক হয়ে গেল, আর তুই সমস্ত ছাত্র-যুব দের কাছে একটা আদর্শ মুখ হয়ে উঠলি।

অমরেশ দা ও তো তোর কাজকর্মে ভীষণ খুশি হয়েছিলেন, তোর চিন্তা-ধারা, আচার-ব্যাবহারে অভিভূত হয়ে উনি সেদিন আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন - রাজনীতিতে তোমরা সবে পা রেখেছ, মানুষের আস্থা অর্জন করতে শেখো। অরিত্রের মত সৎ হও - মানুষের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়ো, আর সাম্যবাদের আদর্শে উপযুক্ত একটা সমাজ গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করো। আদর্শে অবিচল থেকো, দেখবে তোমরা ও অনীর মত মানুষের মধ্যে ক্রমশ আপন হয়ে উঠবে।

তারপর কলেজ শেষ করে শুনেছিলাম, তুই যুবতে-ও নাকি খুব অ্যক্টিভ ছিলিস, তার পর তোর কি হয়ে গেল? একেবারে পার্টি থেকে ভানিস হয়ে গেলি?

আমি তোদের লোকাল কমিটিতে ও বহুবার খবর নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কেউ কখনো এ ব্যাপারে মুখ খোলেননি। বেশ কয়েকবার পরেশ-দাকে ও জিজ্ঞেস করেছিলাম - একদিন আমায় বিরক্তির সুরে বলেছিলেন যারা পার্টির গাইড লাইন অমান্য করে, তাদের খোঁজখবর রেখো না ?

বহুবার জিজ্ঞেস ও করেছিলাম - পার্টি বিরোধী কোনও কাজ কর্ম করেছিল কিনা ?

অমরেশ দা সেদিন আর কোন ও উত্তর দেয়নি । শুধু বলেছিলেন- ও নিজেই থাকতে চায় না,বড় একটা চাকরি পেয়েছে। ওর হাতে এখন আর সময় কই ? 

এক সাথে এতগুলো বছর এত কাছে থেকে তোকে দেখে এসেছি, তোকে আমি ভুল চিনব ! গড় গড় করে বান্টি একনাগাড়ে বলেই চলল ।

বান্টির কথা শেষ হতে না হতেই অনী তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল -

বাণ্টি,আমি খুব বড় একটা সমস্যায় আছি রে, ঠিক কি করব বুঝে উঠতে পারছি না -

- তোর কি হয়েছে অনী, তুই বল !

আমার পাড়াতেই থাকেন, হিমাদ্রি বাবু। উনি দুপুরে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, ডাক্তার বাবু বলেছেন- খুব শীঘ্রই ওনাকে হসপিটালে না নিয়ে যেতে পারলে বাঁচানো সম্ভব নয়। অথচ দেখ - গাড়িটা নিয়ে সেই তখন থেকেই ওই জ্যামের মধ্যে আটকে রয়েছি। একবিন্দু ও নাড়াতে পারছি না।

বান্টি বেশ কিছুটা উত্তেজিত হয়ে জিগ্যেস করল -

কোথায় ?

দূরের ওই যানজট-টার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটা দেখাল অনী।

অনেকটা পেছনে, রাস্তার মাঝ-বরাবর আটকে রয়েছে সামনে সারি সারি করে প্রায় গোটা সত্তর আশিটা গাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে। অসম্ভব অবস্থা!

বান্টি অনেক চিন্তা ভাবনা করে অনীকে বলল - ঠিক আছে, তুই চিন্তা করিস না, একটু দাঁড়া। আমি দেখছি কিছু যদি একটা করা যায় -

বান্টি মঞ্চটার দিকে এগিয়ে গেল - পেছনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন অল্পবয়স্ক ছেলেদের ডেকে হাত নেড়ে কি সব বলল। ওদের কাউকে সে এর আগে কখনো দেখেনি। সাথে সাথেই বেশ কয়েকটা ছেলে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এল।

ওদেরকে অ্যাম্বুলেন্সটা দেখিয়ে দিল। তারপর অনীর কাঁধে হাত রেখে বলল - চিন্তা করিস না, ওরা ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবে । একসাথে এত গুলো ছেলে চলে আসায় জটলার জায়গাটা বেশ কিছুটা ফাঁকা হয়ে গেছে। সাথে সাথেই অনী দেখতে পেল অশোক দা, বিকাশ দা, স্বপন জেঠু, অতুল কাকা আরও অনেককে- প্রায় সব পরিচিত মুখ, এদের অনেক-কেই সে খুব ভাল ভাবেই চেনে।

অনেকদিন বাদে অনীকে দেখে অশোক দা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল -

কি হয়েছে অনী ?

অনীকে কিছুই বলতে হল না, পুরো ব্যাপারটাই বান্টি গুছিয়ে বলল। একসময় এই লোক গুলোই অনী-কে খুব স্নেহ করতেন, প্রায় বছর দু-এক হয়ে গেল এখন আর আগের মত যোগাযোগ নেই।সে অবশ্য নিজেই আর কোনও যোগাযোগ রাখেনি। অন্যায়ের সাথে আপোষ করে সে যে আর কোনও মতেই তাদের সাথে থাকতে পারবে না। বহুবার নালিশ করে ও যখন কোনও কাজ হয়নি- সে বাধ্য হয়েই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। প্রথম প্রথম দলের অনেকেই চেষ্টা করেছিল অনীর সাথে যোগাযোগ রাখতে। ব্যক্তিগত ভাবে কেউ কেউ এখনো অনী-কে ভীষণ স্নেহ করেন। হটাত করে রাস্তাঘাটে এর ওর সাথে দেখা হলেই সে টের পায়। এই তো বছর খানেক আগের ঘটনা - অকস্মাৎ ট্রেনের মধ্যে অশোক-দার সাথে দেখা। ওই ভিড় ঠেলে অশোক-দা এগিয়ে এসে তাকে প্রায় বুকের মধ্যে টেনে নিয়েছিল, বলেছিল- তোদের মত ছেলেদের এই দলে সত্যিই খুব দরকার। কোথায় থাকিস এখন?

একেবারেই বেপাত্তা হয়ে গেছিস -কাল ব্রিগেডে আসিস - কৃষক সম্মেলন আছে।

অণীর অফিসে সেদিন আহামরি কোনও কাজ ছিল না, চাইলে সে যেতেই পারত। তবু ও সে যায়নি - আসলে, কবির কাকুর ব্যাপারটা ততদিনে তাকে অনেক কিছু নতুন করে বুঝতে শিখিয়েছে। অমন ভ্রান্ত পথে সে আর যাবে কেন ?

কিসের কৃষক সম্মেলন!

কৃষক সম্প্রদায় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটা দল সমগ্র কৃষক সম্প্রদায়কে উপেক্ষা করে কেবল মাত্র ঝাণ্ডার নিচে আশ্রয় গ্রহণকারী কয়েক-জন কৃষকদের নিয়ে সারা দেশের কৃষক সম্প্রদায়ের উন্নয়নের খসড়া প্রণয়ন করবে ! যেখানে কৃষক-দের তুলনায় অন্যান্য সম্প্রদায়ের সংখ্যার আধিপত্য বেশী- যাদের কৃষির সাথে কস্মিনকালে ও কোনও সম্পর্ক ছিল না। তাদের নিয়ে কৃষক সম্মেলন?

কবির কাকুর সাথে সেদিন যা হয়েছিল, সে কোনোদিনও ভুলতে পারবে না। কবির কাকুদের মত লক্ষ লক্ষ কৃষকদের ওপর গোপনে যে ধরনের দৈনন্দিন আঘাত নেমে আসে এই ঝাঁ চক-চকে শহরে বসে কজন-ই বা সে খবর রাখে? বাজারী খবরের কাগজগুলো ঠিক যে ভাবে মানুষকে বোকা বানিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করে, ঠিক ওই-টুকুই -

অমন লোক দেখানো কৃষক সম্মেলনে সে কেনই বা আর অংশগ্রহণ করবে?

একটা নিপাট সাদা-সিধা অশিক্ষিত লোক, যে কিনা- সকাল থেকে রাত অবধি কৃষির বাইরে আর কোনও কিছুই বোঝে না, কারোর সাতে পাঁচে থাকে না, সে ও কিনা খুন হল ! তার অপরাধ ছিল সে পরিবর্তন-পন্থী দলের হয়ে সেদিন মিছিলে হেঁটেছিল। কেবলমাত্র মুখেই এদের গণতন্ত্র- অথচ বাস্তবে বিরোধী পক্ষকে দুমড়ে মুচড়ে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার তীব্র প্রয়াস। স্বাধীন ভারতে একটা মানুষের নিজস্ব মতামত টুকু ও থাকবে না! আর অন্তত সেটাই যদি না থাকে তবে আমরা কিসের স্বাধীনতা অর্জন করেছি? শুধুমাত্র বিদেশী একটা শক্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে আর একটা স্বদেশী বর্বর শক্তির হাতে আমাদের ক্ষমতার হস্তান্তর করেছি।

কেবল খাতা কলমেই স্বাধীনতা ! 

সেদিন গভীর রাতে কবির কাকুর বাড়িতে হানা দিয়ে ওনার বিবি ও বাচ্চাটার ওপর পাশবিক অত্যাচার করা হল, তারপর তাকে ফাঁকা মাঠে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করা হল - সবার সামনে হাড় হিম করা একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হল, যাতে কেউ কখনো খোকন-দা-দের বিপক্ষে অন্তত প্রচার করার সাহস-টুকু আর না পায়।

আর খোকন-দা ছিল তৎকালীন এম এল এ হরিহর ব্যানার্জীকে ডান হাত,সুতরাং থানা-পুলিশ করে ও কোনও লাভ হয়নি, বরং প্রশাসনিক কর্তাদের সহযোগিতায় আসল ঘটনাটাকে পুরোপুরি গোপন করে দেওয়া হল। সরকারি রিপোর্টে দেখানো হল - "চুরির দায়ে গণ ধোলাই" এ মৃত্যু।

এই যদি একটা গণতন্ত্র-কামী দলের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নমুনা হয়, তবে অমন একটা দলের সহযোদ্ধা হয়ে সে আর নিজেকে নিজের কাছে মাত্রাতিরিক্ত অপরাধী করে তুলতে পারবে না। এসব জানার পর এই দলের হয়ে কাজ করতে সত্যিই তার ঘেন্না করছিল। একটা অপরাধ বোধ ক্রমশ তাকে গ্রাস করে নিয়েছিল। মনে হচ্ছিল- কেউ বুঝি তাকে একটা অন্ধকূপের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তার পাপের শাস্তির-দরুন । এই দলের অনেক কার্যকলাপে সে নিজেও তো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল ! সে ও তো হরিহর ব্যানার্জীকে ভোটে জেতানোর জন্য অনেকাংশে সাহায্য করেছিল।

ভোটের প্রচার থেকে শুরু করে সারা বছর ধরে এই যে এত গুলো মানুষকে সাম্যবাদ সম্পর্কে অভিহিত করার প্রচেষ্টা, সে সমস্ত ও জনমানুষে প্রভাব ফেলেছিল। সর্বোপরি গণতন্ত্রে তার নিজের অন্তত একটা ভোটের অবদান ও তো নেহাত কম কিছু না ! তখন কে জানত, ভোটে জিতে যাওয়ার পর হরিহর বাবুরা আদর্শ বিচ্যুত হয়ে আস্থা রাখবে পাড়ার খোকন দা-দের মত মস্তানদের কাছে। আর তার অমন একটা মস্ত-ভুলের মাশুল দিতে হল কবির কাকুর মত একজন নিপাট দুর্বল মানুষকে। না জানি, এদেশে এমন কত হাজার হাজার দুর্বল কবির কাকুরা রোজ এই ভাবে রাজনীতির বলি হয় ! 

সেদিন যদি একটু দূরদর্শী হয়ে সে এই ভুলটা না করত, তবে হয়ত খোকন-দাদের মত অমন আদর্শহীন মানুষদের রাজনীতিতে কোনোদিন প্রবেশ ঘটত না। যার ফলে অন্তত এই নৃশংস জানোয়ারদের হাত থেকে কবির কাকুরা চিরতরে রেহাই পেয়ে যেত।

অনী কি করে তার নিজের অমন একটা মস্ত ভুলের দায় এড়িয়ে যাবে?

এই কবির কাকুদের মত দুর্বল একটা ও মানুষ যদি এক মুহূর্তের জন্য অত্যাচারিত হয়, তার দায় এসে পড়বে অনীদের মত শিক্ষিত সচেতক কিছু যুবকদের ঘাড়ে। একটা শিক্ষিত সচেতক যুবকের কাছে এই সমাজ ও এই সমাজে বসবাসকারী হাজার হাজার দুর্বল মানুষ অন্তত এ -টুকু প্রত্যাশা তো করতেই পারে। আর সেটুকুই দায়িত্ব যদি তারা না সামলাতে পারে, আর তারা ও যদি লক্ষ-লক্ষ অশিক্ষিত অসচেতন মানুষদের মত ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হয়, তবে এই সমাজ আর কার কাছেই বা আস্থা রাখবে ?

হাজার হাজার হত দরিদ্র মানুষকে কারা-ই বা আর পথ দেখাবে? 
কোন পথে গেলে তারা নিরাপত্তার আশ্রয় খুঁজে পাবে? 
তবে কি আগামী দিনে সমাজের উত্থানের পথ পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেছে !
তবে কি,এই সমাজটা এভাবেই প্রতিনিয়ত কেবল মাত্র ধ্বংসের অপেক্ষায় দিন গুনবে?

সে নিজেও তো অমন একটা দলের সহযোদ্ধা ছিল। একটা শিক্ষিত সচেতক যুবক হয়ে অমন একটা ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াটা তার একেবারে ঠিক হয়নি। অনেক অভিযোগ জানিয়ে ও যখন কোনও লাভ হয়নি, সুতরাং পার্টি খোকন-দাদের এই পাশবিক অন্যায়টাকে ও পূর্ণ সমর্থন করছে। সে আর কোনোদিনও ওই পাশবিক মুখ গুলোর সাথে এক-ঘাটে জল খেতে পারবে না। অন্যায়ের সাথে আপোষ করে আরও কয়েকটা পাশবিক কার্যকলাপ সে কোনও ভাবেই মন থেকে মেনে নিতে পারবে না। সুতরাং পার্টির থেকে দূরে সরে যাওয়া ছাড়া তার কাছে আর অন্য কোনও পথ ছিল না। কারণ সে এতদিনে বুঝে গেছে তার সাম্যবাদে আদর্শিত দল খোকন-দাদের মত পাশবিক মুখ গুলোকে নির্দ্বিধায় সমর্থন করে। হয়ত ভোট ব্যাংকটাই এদের আসল লক্ষ - খোকন দার এক ডাকে আজকাল হাজার হাজার লোক মুখ বুজে ময়দানে জমা হয়ে যায়। সুতরাং দলের কাছে তার গ্রহণ-যোগ্যতাটা অনেকটাই বেশী। তাই সেদিন অনীর এই অভিযোগ কেউ গুরুত্ব দেয়নি। অনীর মনে হচ্ছিল অমন একটা আদর্শহীন মানুষদের পরোক্ষ ভাবে ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত করাটা তার মত যুবক দের অন্তত উচিত হয়নি। একটু বিচার বুদ্ধি না করে,কেবল মাত্র একটা প্রতীকের ওপর আস্থা রেখে সে এই মারাত্মক ভুলটা করে ফেলেছে। এবং তার দরুন হাজার-হাজার কবির কাকুর মত হত-দরিদ্র মানুষ রোজ নৃশংস ভাবে খুন হচ্ছে। অথচ এই অন্যায়ের হাত থেকে তাদের পরিত্রাণের কোনও উপায় নেই - 

সে আগে যা ভুল করে ফেলেছে, ভুল করে করেই ফেলেছে। নতুন করে সে এক ভুল আর দু-বার করবে না। অন্তত একটা ও অসহায় মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারবে না। নিজেকে আর মাত্রাতিরিক্ত অপরাধী করে তুলতে পারবে না।

মানুষের সেবাটাই যখন তার প্রধান উদ্দেশ্য,সে কেবল সেবাই করবে, প্রয়োজনে সে একাই করবে। যতটা পারবে সে একাই করবে। তাতে যদি একটা ও মানুষ উপকৃত হয়, সে তাই করবে।

আর যাই হোক, তাতে করে রাজনৈতিক দলাদলির ফলে কিছু নিরীহ মানুষের শিকারে সে নিজে অন্তত শিকারিদের সহ-যোদ্ধার তকমা গায়ে নিয়ে বয়ে বেড়াতে পারবে না। অন্য কারুর ওপর ভরসা করে আর একটা মানুষকে ও সে খুন করতে সহযোগিতা করবে না। ভাবতেই নিজের প্রতি ঘেন্না লাগে - সে ও সাম্যবাদের দোঁহায় দিয়ে এত দিন নিজেও এই দলের সহযোদ্ধা ছিল, যারা ক্ষমতার লোভে দরিদ্র এবং নিরীহ মানুষকে ও হত্যা করতে একবিন্দুও পিছুপা হয় না ! তারা ও রাতের অন্ধকারে গণতন্ত্রের টুঁটি ছিঁড়ে দিয়ে এসে দিনের আলোয় রাজপথে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মিথ্যা স্লোগান দেয়।

ছিঃ কি বিচিত্র সব মানুষ - কি বিচিত্র তাদের মুখোশ - আর এই বিচিত্র তাদের রাজনীতি ! কেন একটা রাজনৈতিক দলের আদর্শচ্যুত হয়ে যাওয়া অসংখ্য মানুষের পাপের দায় সে নিজের ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে যাবে? কেনই বা একটা শিক্ষিত সচেতক যুবক হয়ে ও আদর্শহীন কিছু মানুষকে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করিয়ে দেওয়ার কর্মযজ্ঞে সে তার নিজের অবদান রাখবে? 

কেবলমাত্র একটা আদর্শের প্রতি আস্থার দরুন -

না: অন্তত সে নিজের হাতে করে আর কক্ষনো কোনও ভবিষ্যৎের খুনিকে নির্বাচিত করবে না,এমন-কি কোনও ভাবে উৎসাহ প্রদান ও করবে না। আর যাই হোক; সাম্যবাদের পথ সু-প্রতিষ্ঠিত করা অন্তত এদের দ্বারা কোনোদিন ও সম্ভব নয় - এরা সার্বজনীন উন্নয়নের থেকে বেশি গুরুত্ব দেয় কেবলমাত্র নিজেদের ঝাণ্ডার নিচে আশ্রয় গ্রহণ-কারী কিছু মুষ্টিমেয় মানুষকে। এমন একটা গোষ্ঠীর স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সে তো এই পথ বেছে নেয়নি। সে নিজেকে সমর্পণ করতে চেয়েছিল সাধারণ মানুষের উন্নয়নের বৃহৎ এক কর্ম যজ্ঞে। কেবলমাত্র সার্বজনীন উন্নয়নের লক্ষ্যেই সে নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিল। নেহাত কোনও একটা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থ-সিদ্ধির জন্য নয়। সুতরাং অমন একটা আদর্শহীন গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থ-সিদ্ধির জন্য সে আর নিজের মূল্যবান সময়ের একটা মুহূর্তও আর অপচয় করবে না।

#

এর মধ্যেই বেশ কয়েকটা গাড়ি অনীদের পাশ কাটিয়ে ধীর গতিতে মঞ্চের পিছনের দিকটায় এগিয়ে গেল। বান্টি ইশারায় অনীকে যান-জট-টার দিকে দেখতে বলল- অনী সে দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল - স্তব্ধ যানজট-টার মাঝ বরাবর ধরে বেশ কয়েকটা গাড়ি সামনের দিকে ধীর গতিতে এগিয়ে আসছে, কয়েকটা অল্প বয়সী ছেলে লাঠি- ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে সেই গাড়ি গুলোকে খুব দক্ষতার সাথে কন্ট্রোল করছে। তারা একটা নির্দিষ্ট সারি ধরে গড়ি গুলোকে টেনে এনে বাইরের দিকে মঞ্চটার পেছনের লম্বা লেনটার মধ্যে পার্কিং করছে। বাদ বাকী সারির গাড়ি গুলো তখনো আগের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। যার ফলে মাঝ বরাবর লম্বা মত একটা বিশালাকার শূন্যস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই শূন্যস্থানের একেবারে শেষ প্রান্তে তখন বুম্বা সবে অ্যাম্বুলেন্সটা স্টার্ট করেছে। আর ওই ছোট্ট শূন্যস্থান জুড়ে অল্পবয়স্ক ছেলে গুলো ঝাণ্ডা-লাঠি যার কাছে যা কিছু ছিল সবটুকু নিয়ে প্রাণপণে অ্যাম্বুলেন্সটাকে বের করে আনার চেষ্টায় নিজেদেরকে পুরোপুরি উজাড় করে দিয়েছে। কেউ কেউ এমন ভাব করছে যেন তার বুকের ওপর দিয়েই অ্যাম্বুলেন্সটা বেরিয়ে যাক,ক্ষতি নেই- যে ভাবেই হোক পেশেন্টটাকে দ্রুত হসপিটালে পৌঁছে দিতে হবে। হুটারের আওয়াজটা অনীর কানে আসা মাত্র সে বেশ কিছুটা নিশ্চিন্ত হতে পারল । এর আগে বহুবার রাস্তা ঘাটে সে যখনই হুটারের আওয়াজ শুনেছে সাথে সাথে সে কেমন যেন একটা অস্থির হয়ে পড়ত। অথচ আজ তার আজকে সেই একই আওয়াজে অন্য রকম একটা অনুভূতি হচ্ছে। এই প্রথমবার হুটারের আওয়াজ শুনে অস্থির হওয়ার পরিবর্তে যেন সে আশ্বস্ত হল -

ওই অল্প বয়স্ক ছেলেরা প্রবল উত্তেজনায় অ্যাম্বুলেন্সটাকে বাইপাসে পৌঁছে দেওয়ার সমস্ত চেষ্টা করছে, জান-প্রাণ উজাড় করে দিয়ে তারা অ্যাম্বুলেন্সটাকে বাইপাসে বের করবেই। অনী এই ছেলেগুলোর মধ্যে থেকে একজনকে খুব ভালভাবে খেয়াল করল। হুবহু নিজের মত দেখাচ্ছে। বছর দুয়েক আগে অনী যে ভাবে রাস্তাঘাটে লাঠি ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে নেমে পড়ত -ঠিক তেমনটাই। কে জানে সে ও হয়ত একদিন ভবিষ্যতে মতাদর্শের সাথে স্বার্থান্বেষী কার্য কলাপের বিস্তর ফারাক খুঁজে পাবে ! তারপর নিজের বিবেকের কাছে স্বচ্ছ থাকতে গিয়ে, সে ও এই পথ পরিত্যাগ করবে। অথবা একদিন তার তারুণ্যের প্রবল জ্যোতিতে খোকন-দা-দের মত লাখো লাখো পাশবিক মানুষরা জলে-পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তার পর এই স্বপ্নের ভারতবর্ষের বুকে সাম্যবাদের নতুন এক ভিত-প্রস্তর স্থাপন করবে। যেখানে তাদের স্লোগানের সাথে তাদের কার্যকলাপ এক হয়ে গিয়ে কেবল মাত্র সার্বজনীন উন্নয়নের যজ্ঞেই তারা আবার মেতে উঠবে। আর সেই দিনই হয়ত গড়ে উঠবে, আদর্শ সাম্যবাদী চিন্তাধারার আদর্শে আদর্শিত একটা স্বপ্নের সমাজ।

হুটারের আওয়াজটা ক্রমশ গাড় হতে হতে একসময় প্রবল শব্দে একেবারে অনীর কানের কাছে এসে আছড়ে পড়ল।সেই শব্দে সাম্যবাদের স্লোগান গুলো অনেকটা ঢাকা পড়ে গেল। একটা মৃত্যু পথ- যাত্রী মানুষকে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ সে অন্তরের অন্তর থেকে অনুভব করল। অ্যাম্বুলেন্সটা এসে অনীর সামনে দাঁড়াতে-ই তড়িঘড়ি করে গেটটা খুলে বুম্বার পাশের শিট-টায় গিয়ে বসল। বান্টি জানালার পাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে অনীকে উদ্দেশ্য করে বলল -

কিছুই তো জানা হল না , সবকিছু সামলে নে। আবার আমাদের দলেই ফিরে আসিস -

অনী খুব শ্রান্ত কণ্ঠে বান্টিকে বলল - তুই রাজনীতির প্রোটোকলে আটকে থেকে কবির কাকুদের মত অসহায় কিছু মানুষের মৃত্যু ঘটিয়ে কতটা সমাজ সেবা করতে পারছিস ঠিক আমি জানি না, তবে আমি অন্তত এটুকু হলফ করে বলতেই পারি,অন্তত সমাজ সেবাটা করতে পারছি।

বাণ্টি মনে আছে তোর- আমরা দুজনেই যখন রাজনীতিতে পা দিয়েছিলাম, আমাদের উদ্দেশ্য ছিল - সমাজ সেবা।

"আমি এখনো সমাজ সেবা-ই করছি, এই দেখ- এখনো পর্যন্ত আমি আমার কর্তব্যে অবিচল আছি"।

অনী ইশারায় বুম্বাকে অ্যাম্বুলেন্স ছাড়তে বলল- মুহূর্তের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সটা প্রবল গতিতে কালো পিচের রাস্তা চিরে ক্রমশ তার কর্তব্যের পথে এগিয়ে যেতে থাকল - আস্তে আস্তে মিনিট খানেক বাদে অ্যাম্বুলেন্সটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।অনীর শেষ কথাটা বাতাসে ভাসতে ভাসতে এসে বান্টির কানে যেন সপাতে একটা চড় মেরে গেল -

"আমি এখনো সমাজ সেবা-ই করছি, এই দেখ- এখনো পর্যন্ত আমি আমার কর্তব্যে অবিচল আছি"।



atanuabmcadila@gmail.com



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-