শুক্রবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৮

রুমকি রায় দত্ত

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ৩০, ২০১৮ |
রুমকি রায় দত্ত
বেতলায় দু’রাত্রিঃ

বান্দরকা কামাল! কিছুই বুঝলাম না, তখনও রহস্য অনেক বাকি। কিন্তু সমস্যা হল এই নির্জনে মোমের আলোয় সেই রাত দশটা পর্যন্ত সময় কাটবে কি করে? একটু আগেই দিয়ে যাওয়া খাবারের পাত্রের ঢাকা খুলে দেখলাম, দলা পাকানো ফ্রাইড রাইস। এ খাবার যে ঠান্ডা হলে আর খাওয়া যাবে না,তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঘড়িতে সন্ধে সাতটা তখন। আইপ্যাডে একটা সিনামা লোড করা ছিল। অন্ধকারে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, সাথে সিনামা আর বাইরে জঙ্গল। আহা! এমন মেলবন্ধন কি সহজে হয়? সাড়ে আটটা বাজতে না বাজতেই মনে হল কিছু খেলে হতো, একটু চা বা কফি! কোনো চান্স নেই। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। লম্বা করিডোর পুরো ফাঁকা। সুন্দর সাজানো ঝকঝকে পরিবেশে বাঁধানো রাস্তায় সোলারে আলো জ্বলছে। বাইরে বেশ ঠান্ডা। চাদর গায়ে একটু বেরিয়ে এলাম। একটু এগোতেই বাঁ-দিকে একটা দরজাহীন ঘরে দেখলাম জনা তিনেক লোক গভীর ঘুমে আচ্ছান্ন। আকাশে মায়াবী চাঁদ, দূরে কালো জঙ্গলের অবয়ব গায়ে কুয়াশা মেখে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হিমভেজা গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসের গায়ে। এই নিঃশব্দতার মধ্যে হঠাৎ মনে হল,জঙ্গল থেকে যদি কোনো বাঘ ঢুকে পড়ে এখনই! বাঘ আছে কি এই জঙ্গলে? নিজের হাঁটার শব্দ বারবার ফিরে আসতে লাগল নিজের কানে। এসবের মাঝে কখন যে দশটা বেজে গিয়েছে মাথায় ছিল না। হঠাৎ ঘরের লাইটটা জ্বলে উঠতেই বদলে গেল পরিবেশটা। না, বেশ ক্লান্ত তখন আমরা।সারাদিনের ক্লান্তি চোখের পাতা জুড়ে,তাছাড়া খুব ভোরে উঠতেও হবে। সকালে এলিফ্যান্ট সাফারি আছে। এখানে দুটি হাতি আছে।একটার নাম আনারকলি,আরেরকটার নাম জুঁহি। দুটো হাতিই সকালে দু’বার সাফারি করায়, তাই আগের দিন বিকেলেই বুকিং করে রাখতে হয় হাতি। একটা হাতিতে চারজন বসার জায়গা। আমাদের সাফারি টাইম সকাল সাড়ে ছ’টা। 

ঘুম ভেঙে বাইরে এসে দেখলাম, চারিদিকে ঘন কুয়াশা। কুয়াশা হালকা না হলে সাফারি শুরু হবে না, তবু সময়েই পৌঁছে গেলাম স্পটে। জঙ্গলের এলাকার মধ্যেই একটা উঁচু কাঠের বাড়ির মতো করা। সেখানে টিকিট দেওয়া হল আমাদের। হাতি এসে দাঁড়াল ঠিক সাতটা। হাতির পিঠের সমান উচ্চতায় তখন দাঁড়িয়ে আছি আমরা।একটা ছোট্ট গেট খুলে কাঠের বাড়ির বারান্দা থেকে উঠে বসলাম হাতির পিঠে আমরা তিনজন,তিনজন বলাও ভুল। আমরা আড়াই জন। অনুরাগ তখন তিন। হাতির কানের পিছনে বসে আছে মাহুত। সামনের গেট খুলে যেতেই নড়ে উঠলাম আমরা। হাতি চলছে আর তার চলনের সাথে তালে তালে দুলতে দুলতে চলেছি আমরা। ঘন কুয়াশা ক্রমশ গায়ে লেগে দূরে সরে সরে যাচ্ছে। বড় বড় গাছের মাঝ দিয়ে আঁকা আছে পথে রেখা, সেই পথে চলেছি আমরা। গতদিন শেষ দুপুরে যেখানে হরিণ ছিল, সেখানে শুরু হয়েছে একটা দুটো হরিণের আনাগোনা। একটা ছোট্ট জলার পাশে দাঁড়ানো গাছের গায়ে প্রভাত কিরণে ফুটে উঠছে আলোর নক্সা। জলে চকচকে রোদ্দুর একফালি। ধীরে ধীরে যেন ঘুম ভাঙছে প্রকৃতির। পথের পাশে বাঁশঝাড় দেখে হাতি আনারকলি বেঁকে গেল সেই দিকে। মাহুতের শাসনে আবার সোজা চলতে শুরু করল। কিছুটা এগোতেই ডানদিকে গভীর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল হাতি। গভীর জঙ্গল! এলোমেলো দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছের ডালপালা দু’হাতে ঠেলে খুব সাবধানে আমরা বসে রইলাম হাতির পিঠে। একেই হাতির দুলকি চালে পিঠে সুষ্ঠভাবে বসে থাকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, তাতে আবার জঙ্গলের এবড়োখেবড়ো পথ,পুরো বোতলে রাখা জলের মতো নাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের। ছোট্ট বাচ্ছা নিয়ে নিজেকে সামলে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে। গভীর জঙ্গলে কোথাও মস্ত বেলগাছে তার ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরও গভীরের দিকে চলেছি আমরা। 

একটা অদ্ভুত এ্যডভেঞ্চার বোধ কাজ করছে মনের ভিতরে। হঠাৎ দেখলাম মাহুত ঝুপ করে নেমে পড়ল হাতির পিঠ থেকে। চেঁচিয়ে উঠলাম, আরে আরে... করছেন কি? তিনি মুখে অদ্ভুত একটা শব্দ করে নিচ থেকেই হাতিকে পরিচালনা করতে লাগলেন, আর আমাদের বললেন, ‘আগর জংলি হাতি দিখায়ি দিয়া তো মুঝে বাতানা’। শুনেই বুক কেঁপে উঠল। মানে এখানে জংলি হাতিও আছে নাকি? মাহুত জানাল সেখানে মাঝে মাঝেই জংলি হাতি চলে আসে, আর ওরা পোষা হাতি দেখলে বিপদ হতে পারে। যাই হোক দুরুদুরু বুকে তখন সামনে এগোতেই ভয় লাগছে, অথচ পিছোনোর পথ নেই। মালভূমির পথ এমনিতেই উঁচু নিচু সেই পথে হাতির পিঠে যে কত ভয়ানক পরিস্থিতি হতে পারে তা তখনও আমাদের জানা ছিল না। গভীর জঙ্গলে অসংখ্য কাঁটা ঝোপের ভিতর দিয়ে চলেছি। হঠাৎ হাতি দাঁরিয়ে পড়ল। সামনের পথ প্রায় ফুট তিনেক নিচে। মাহুত বলল, ‘পিছে খিঁচকে ব্যইঠিয়ে, সিট কো আচ্ছেসে পকড়কে’। হাতি একটা পা নিচে দিতেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লাম আমরা। দু’হাতে সামনের ধরার জায়গাটাতে ভর দিয়ে দেহের ভার সামলানোর চেষ্টা করতে লাগলাম,নিজের সাথে বাচ্চার ভার সামলানো যে কত কঠিন! ঠিক সেই মুহূর্তে একবার সত্যিই মনে হল বড্ড বেশি সাহস দেখিয়ে ফেলেছি আমরা। নিজেদের সামলানোর আগেই হাতি হুড়মুড় করে প্রচন্ড দুলুনি দিয়ে নেমে পড়ল নিচে। সামনে অজানা পথ, প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যদি পড়ে যাই নিশ্চিত মৃত্যু। বেশ কিছুটা এগিয়ে এসে দাঁড়ালাম এক নির্জন জলাশয়ের সামনে। সত্যি বলতে বাঁধা নেই, ঠিক সেই মুহূর্তে অপরূপ প্রকৃতির মাঝেও অদ্ভুত একটা অস্থিরতা কাজ করে চলেছে। পাশের পাহাড়ের মতো উঁচু একটা জায়গা দেখিয়ে মাহুত বলল, ঐ গুহাতে আগে বাঘ বাস করত। জানতে চাইলাম, ‘এখন বাঘ থাকে না?’ উত্তর এল,

--আভি বো ইধার নেহি রহেতা

---আপনি কখনও বাঘ দেখেছন?

--হাঁ, ইসি জাগাপে। বহুতবার দেখা। শের ইঁহা পানি পিনে আতা থা।

-- জলাশয়ের উলটো দিকে একটা ছোট্ট পাঁচ বাই পাঁচ ফুটের ঘরের মতো জায়গা দেখিয়ে বলল, শিকারি লোগ পহলে উঁহা পর ছুপা রহেতে থে। শের ইঁহা পর পানি পিনে আতে থে। 

হাতিটা ততক্ষণে জলাশয়ে শুঁড় ডুবিয়ে জল খেতে শুর করেছে। খেলছে জল নিয়ে। আমার মনে কেমন যেন একটা অজানা ভয় কাজ করছে তখন। আগে বাঘ থাকত, কিন্তু যদি হঠাৎ করে এই মুহূর্তে সত্যিই বাঘ চলে আসে! যেমন মাঝে মাঝেই শোনা যায় লোকালয়ে কোথা থেকে বাঘ এসে হাজির। এটা তো তার নিজের আস্তানা। ভয়ে ভয়ে মাহুত কে জিজ্ঞাসা করলাম, যদি হঠাৎ বাঘ চলে আসে?

সে বলল, হাতি সে বাঘ ডরতে হ্যয়। হাতি কে পিঠ মে বাঘ কুছ নেহি কর পায়ে গা। 

তবু কি ভয় যায়! সঙ্গে বাচ্চা আছে যে, মাথায় আবোলতাবোল ভাবনা আসতে লাগল। হাতি জল খেয়ে ছোট্ট জলাটা পেরিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। আবার সেই উঁচুনিচু পথ! এক ঘন্টারও অধিক সময় আমরা এভাবে চলছি। এক অন্য সবুজ পথে এবার ফিরতে লাগলাম। ঘড়িতে তখন প্রায় ন’টা বাজতে চলেছে। দ্বিতীয় হাতিটিও ততক্ষণে একদল সাওয়ারী নিয়ে ফিরছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার দুজনে নতুন যাত্রী নিয়ে জঙ্গলে যাবে। এক প্যাকেট বিস্কুট হাতির নরম মুখে ঢুকিয়ে দিতেই সে শুঁড় মাথায় তুলল। আসলে পশুরা মানুষ নামক পশুর থেকে অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হয়, সেটা আবার প্রমাণ হল।

সারাটা দিন আজ শুধু নির্জনবাস। এখানে দেখার মূল আকর্ষণ এই জঙ্গলই। এছাড়া আছে একটা জীর্ণ দুর্গের অবশিষ্ঠ অংশ। না আজ আর কোথাও যাব না, পায়ে হেঁটে ঘুরব এই জায়গাটা। সাফারি সেরে সামনেই লজের ক্যান্টিনে চা পান করলাম। আজ যেন প্রকৃতই একটা অবসর যাপন। স্নানের তাড়া নেই, কাজের তাড়া নেই, নেই কোথাও যাওয়ার তাড়া। ক্যান্টিনের সামনে বসেই রইলাম, দেখলাম ক্রমশ ট্যুরিস্টরা আসছে। ভিড় বারছে। আসে পাশে বাঁদরের দল যেন মিছিল করছে। ভিড় ভালো লাগছিল না, ফিরে গেলাম ঘরে, খোলা ব্যলকনিতে চেয়ার নিয়ে বসার উপায় নেই, বাঁদর ঝুলছে রেলিং ধরে, জানালা খুলতেই একটা এসে টুকি দিয়ে গেল ঘরের ভিতরে। দাঁত খিঁচিয়ে মুখ ভেঙাল না, ভালোবাসল বুঝতেই পারলাম না। স্নান সেরে বারোটার দিকে শীতের মিঠে রোদ পিঠে মেখে বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের ক্যাম্পাস ছেড়ে রাস্তায়। একটু এগোতেই একটা ছোট্ট ঘুনটি।পান, সিগারেটের দোকান। পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ধরে কিছুটা এগোতেই বিকট গন্ধ নাকে এল। দেখলাম, একটা বাড়িতে রোদে শুকাচ্ছে পাঁপড়ের মতো কিছু। জানতে চাইলাম কি ওটা, নামটা বলল, কিন্তু আমার মগজ থেকে নিমেষে উড়ে পালাল সেটা। আমার মগজটা এমনই একটু, যেটা মনে ধরে না, সেটাকে কিছুতেই স্থান দেয় না। এখন স্মার্ট ফোনের দৌলতে এমন অনেক মনে রাখতে না পারা কথা রেকর্ড করে রাখি তাই। বেরোনোর সময় শুনেছিলাম মিনিট পাঁচেকের পথ মেইন রাস্তা ধরে এগোলেই আছে একটা জঙ্গলের প্রাণীদের সংগ্রহশালা। চললাম, সেই পথে। 

একটা ছোট্ট সংগ্রহশালা। ফিরতে ফিরতে দুপুর একটা।  ক্যান্টিনেই খাওয়া সেরে রোদে নির্জীবের মতো ঝিমানো, বেশ আরামের কিন্তু। ধীরে ধীরে কমছে ট্যুরিস্টদের ভিড় শীতের নরম রোদের বিকেলে এক ভাঁড় গরম চা খেয়ে উঠে পড়লাম আমরা, বিকেলে আবার যাব জঙ্গলে জিপ সাফারি। যে দাদা আমাদের নেটারহাট থেকে বেতলা এনেছিলেন তিনিই নিয়ে যাবেন। পৌনে চারটের দিকে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম জঙ্গলের পথে। জঙ্গলের ভিতরে আঁকা পথরেখা দেখে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি। সন্ধের এই সময়ে সাধারণত অনেক জীব-জন্তু দেখা যায়। ড্রাইভার দা জানালেন, কপালে থাকলে তবেই দেখা মেলে তাদের। জঙ্গলের মাঝে কোথাও ফাঁকা মাঠ, আবার কোথাও বিস্তীর্ণ জলাশয়। ঝোপঝাড়ের দিকে চোখ পড়লেই মনে হচ্ছিল এই বুঝি দুটো জ্বলজ্বলে চোখ দেখতে পাব ঝোপের আড়াল থেকে। না, কোনো চোখ দেখা আমাদের ভাগ্যে ছিল না,তবে দেখলাম ময়ূর। চলতে চলতে দেখতে পেলাম গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে কেমন ঝুপ ঝুপ করে নেমে আসছে সন্ধে রং। ঠিক সন্ধের মুখে ফিরে এলাম বনবাংলোয়। সোলার গুলো ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে, আবার গিয়ে বসলাম ক্যান্টিনের সামনে। হাতগুলো বেশ ঠান্ডা হয়ে উঠছে। আকাশে গাছের ফাঁক দিয়ে উজ্জ্বল চাঁদের আলো উঁকি মারছে কি মায়াবী সেই চাঁদের আলো। গরম চায়ে চুমুক দিয়েছি সবে আবার চলে গেল ক্যারেন্ট। বিকল্প উপায়ে ক্যারেন্টের ব্যবস্থা যদিও ছিল,কিন্তু সব সোলার প্যানেল গুলো খারাপ হয়ে পড়ে আছে। আগের থেকেই আরও কিছু মোমবাতির জোগাড় করেই রেখেছিলাম। দশটা পর্যন্ত চলে যাবে। একটা মন খারাপের অন্ধকার রাত। সকাল হলেই চলে যাব এই নির্জনতার কোল থেকে...রাঁচির পথে। আবার নতুন একটা পথ। ক্রমশ......

rumkiraydutta@gmail.com

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-