শুক্রবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৮

অতনু জানা

sobdermichil | নভেম্বর ৩০, ২০১৮ |
 মধুচন্দ্রিমা
জ্যোৎস্নার আলোয় সমুদ্রের বহুদূর অংশ নরম আলোয় অবিরাম ভিজে চলছে। যত দূর চোখ যায় - এই আলো ক্রমশ দূরের দিকে ম্লান হতে - হতে শেষ সীমানায় ভয়ানক ঘুটঘুটে একটা অন্ধকারে পরিনত হয়েছে। আর ওখানেই আকাশটা সমুদ্রের সাথে মিলে মিশে এক হয়ে গেছে, ওটাই দিগন্ত রেখা।ম নে হয়, ও প্রান্তে আর কিচ্ছুটি নেই - কেবল ঘুট-ঘুটে অন্ধকারময় শূন্যতা। প্রথম প্রথম, ও প্রান্তে তাকালেই অসম্ভব ভয়ে বুকটা তার কেঁপে উঠত। অথচ তৃপ্তি চলে যাওয়ার পর ওই অন্ধকারময় শূন্যতার দিকে তাকিয়েই তার আজীবন কেটে যায়- - বুকের মধ্যে অনুভব করে তৃপ্তির অস্তিত্ব। হয়ত, কোনো একদিন এই অন্ধকার থেকেই তৃপ্তি হাঁটতে হাঁটতে অরিত্রের দিকে এগিয়ে আসবে, তাকে বলবে - "এই দেখো অরিত্র আমায় দেওয়া তোমার সেরা উপহারটা আমি কুড়িয়ে এনেছি।"

বহুদূর সমুদ্রের থেকে প্রবল বেগে ঢেউগুলো ক্রমশ শক্তি হারাতে হারাতে অবশেষে ভীষণ শব্দে পাড়ে এসে আছড়ে পড়ছে। যেন একবিন্দু ও তার বিরাম নেই, প্রতিমুহূর্তে সে আপন কাজেই মগ্ন। সে যেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তার প্রিয় কোনো মানুষের কাছে, এবং সেই মানুষটির জন্য যেন অনবরত জানপ্রাণ দিয়ে স্ব-ইচ্ছায় নিজের সমস্তটুকু উজাড় করে দিতে চায়। এই যে এত বড় পৃথিবী, রোজ কোথা-ও না কোথা-ও অনবরত এত কিছু ঘটে চলছে, কোনো দিকেই তার নজর নেই -

সমুদ্রের ফেনা গুলোকে চাঁদের আলোয় মুক্তোর কনার মত মনে হচ্ছে, সারা সমুদ্র জুড়ে সে গুলো ক্রমাগত এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে অনবরত ভেসে বেড়াচ্ছে। সমস্ত আকাশ জুড়ে নানান রকমের মেঘ, ক্লান্তিহীন ভাবে অবিরাম ভেসে চলছে। প্রত্যেকটার আকার আবার পৃথক পৃথক রকমের। কেউ দেখতে অবিকল ঘোড়ার মত কেউ বা মানুষের মত। এক একটার আকার আবার একে-ক রকম।

ঠিক মাথার ওপর অবিকল ডাইনোসোরের মত দেখতে একটা বৃহৎ আকারের কালো কুচকুচে মেঘ বহুদূর থেকে ভাসতে ভাসতে একেবারে চাঁদের কাছে এসে চাঁদটাকে গপ্ করে গিলে নিল, আর সারা পৃথিবী জুড়ে একটা ঘন অন্ধকার নেমে এল। তারপর মিনিট খানেক বাদেই মেঘটা ভাসতে ভাসতে সরে গেল, ওমনি আবার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল চারিদিক। সে আলোয় সমুদ্রের রূপ যেন আরো শত গুণ বেড়ে গেল। এভাবেই মেঘের সাথে চাঁদের ক্রমাগত একটা খেলা চলছে, আর সে খেলায় সমুদ্রতটের রূপ ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েই চলছে- কখনো এ পৃথিবীকে মনে হচ্ছে ভীষণ মায়াবী আবার খানিক বাদেই ভয়ঙ্কর কুৎসিত -

বড় বড় ঢেউ গুলো একটা নির্দিষ্ট ছন্দে বহুদূর সমুদ্রের থেকে ভাসতে ভাসতে পাড়ে এসে আছড়ে পড়ছে, আর তার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ সমুদ্রের পাড় ছাড়িয়ে আরো ও বহুদূর ছড়িয়ে পড়ছে-

সমুদ্রের একেবারে শেষপ্রান্তে কয়েকটা আলো তখনো টিমটিম করে জ্বলছে। সে গুলো হাওয়ার বেগে কখোনো নিভছে আবার কখনো জ্বলছে, সে আলোর স্থায়িত্ব বড়ই কম। এই আছি ;তো এই নেই, রকমের -

বিশালাকার ঢেউ গুলো ক্রমশ শক্তি হারাতে হারাতে পাড়ে এসে স্পর্শ করেই ফিরে যাচ্ছে। মনে হয়; সমস্ত আস্ফালনের বিন্দুমাত্র লেশটুকু তার আর নেই। শেষ সীমানায় মাথা নত করে পরাজয় স্বীকার করা ছাড়া যেন তার আর কিচ্ছু করার নেই। ঠিক যেন মানুষের দম্ভের মত, অবশেষে একদিন মানুষ যে ভাবে আত্মসমর্পন করে তার অনিবার্য মৃত্যুর কাছে। 

হঠাৎ অরিত্রের পায়ের মধ্যে কিছু যেন একটা খামচে ধরল -আচমকা হাওয়ার মধ্যেই পা টা ছুঁড়ে মারল। পকেট থেকে মোবাইলটা অন করে পায়ের দিকে টর্চের আলোটা জ্বালালো, নাহঃ কিচ্ছু নেই, এমনকি কোনো আঘাতের চিহ্নটুকুও নেই! একটু দূরে চোখ পড়তেই, সে দেখতে পেল- একটা ছোট্ট সাইজের কাঁকড়া দৌড়ে পালাচ্ছে। তার গায়ে আলো পড়তেই প্রাণপনে দৌড়ে গিয়ে একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। অন্ধকার পাড়ে উঁচু একটা পাথরের উপর বসে অরিত্র কতক্ষণ এই সমস্ত আকাশ পাতাল ভাবছিল, তার খেয়াল নেই। ঘড়ির দিকে তাকাতেই চমকে উঠল ! নাহঃ বেশ রাত হয়েছে- এবার ফিরতে হবে; নয়ত গোপাল আবার বেরিয়ে পড়বে। 

অদ্ভুত একটা আত্মীয়তায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে এই মানুষ গুলোর সাথে, কেমন যেন জড়িয়ে পড়েছে এখানকার সমস্ত কিছুর সাথে। এই সমুদ্র এই আকাশ ভালো- মন্দ,সুন্দর-কুৎসিত সমস্ত কিছু মিলে মিশে তার কাছে অনেক দিনের চেনা।

অরিত্র উঠে হাঁটা শুরু করল, বেশ কিছুটা খাড়াই পাড় অতিক্রম করে তবে সামনের রাস্তায় পৌঁছানো যায়। এই রাস্তাটা এখন সম্পূর্ন অন্ধকার কিছুক্ষন আগেও ঝুপড়ির মত দোকান গুলো থেকে হালকা আলোর আভা সামনের রাস্তাটায় খানিক আলোকিত করে রেখেছিল। এখন আর নেই - এমনিতেই দোকান গুলোতে খাওয়ার বলতে চা ডিম ম্যাগি মুড়ি টাইপের হাল্কা খাবার। রাত বাড়ার সাথে সাথেই পর্যটকের সংখ্যা একেবারে কমে যায়, তাই খদ্দেরের অভাবে সে গুলোও বন্ধ হয়ে যায়। আর সাথে সাথেই সমুদ্রের পাড় জুড়ে আদিম একটা অন্ধকার নেমে আসে। বহুদূরে দু একটা ল্যাম্পপোষ্টের আলো হালকা আভার মত কিছুটা পথ আলোকিত করে রেখেছে, সেই আলোয় অরিত্রের পেছনে নিজের ছায়াটা ক্রমশ আবছা হতে হতে একসময় কোথাও যেন উধাও হয়ে গেল। আর সাথে সাথেই প্রবল একটা একাকীত্ব তাকে গ্রাস করে নিল, আর সারা বুকটা যেন খান-খান করে চুরমার হয়ে গেল। এরকমই একটা একাকীত্ব প্রতিনিয়ত বুকের মধ্যে নিয়ে তাকে যে আরো কত কাল তাকে একা একা অপেক্ষা করতে হবে কে জানে! সে যে তৃপ্তিকে কথা দিয়েছে - "বাকী কয়েকটা দিন তাকে সেদিনের মত উপহার দেবে "

যতক্ষন সে সমুদ্রের পাশে থাকে প্রতিমুহূর্তেই যেন তৃপ্তির খুব কাছে থাকতে পারে । প্রতিমুহূর্তেই তৃপ্তির স্পর্শ সে অনুভব করে। এই বুঝি তৃপ্তি ওপারের ঘন অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে এসে তাকে বলবে -

"এই অরিত্র, "দেখো সেই নাম না জানা ফুলটা আমি কুড়িয়ে এনেছি।" 

হোটেলের সামনের দোকানটা তখনও খোলা। ছোটো একটা কেরোসিনের ল্যাম্প টিমটিম করে জ্বলছে। সেই আলোয় দোকান দারের মুখটা দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। সামনের বেঞ্চটাতে দু-তিনজন বসে বসে ফিসফাস করে যেন কিছু একটা আলোচনা করছিল  । অরিত্রকে দেখা মাত্র তারা চুপ করে গেল।


অরিত্রের মনে হল কেউ যেন দরজায় নক্ করছে। শাওয়ারের আওয়াজে ঠিক মত বোঝা যাচ্ছিল না। শাওয়ারটা বন্ধ করে আরো একবার ভাল করে শোনার চেষ্টা করল। হ্যাঁ, যা ভেবেছে তাই। অরিত্র চিৎকার করে বলে উঠল -

"হ্যাঁ বাথরুমে আছি।"

ওপার থেকে গোপালের কন্ঠ ভেসে এল - বাবু খাওয়ারটা?

- হ্যাঁ, টেবিলের ওপর রেখে যাও।

-খেয়ে নেবেন কিন্তু, কালকের মত টেবিলের খাওয়ার টেবিলেই যেন না পড়ে থাকে।

- না না- চিন্তা করোনা, আমি আজ খেয়ে নেবো।

- আর কিছু লাগবে বাবু?

- না, আপাতত কিছু লাগবে না, লাগলে জানাবো।

দরজাটা ভেজানোর শব্দ হল। গোপাল টেবিলে খাওয়ার রেখে চলে যেতেই মনে হল দেশালাইটা বোধ হয় ফুরিয়ে গেছে! স্নান সেরে বাইরে এসে টাওয়ালটা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে অরিত্র আয়নার দিকে এগিয়ে গেল। এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে অনেকদিন আয়নায় নিজেকে ভাল কেরে দেখা হয়নি। শেষ কবে ভালভাবে নিজেকে দেখেছিল খেয়াল ও নেই ! মাথায় চিরুনি দেওয়ার সময় আয়নার সামনে দাঁড়ালে ও খুঁতিয়ে খুঁতিয়ে নিজের চোখ মুখ নাক শেষ কবে দেখেছিল খেয়াল নেই তার। এইমুহূর্তে আয়নার সামনে নিজের প্রতিবিম্বটাকে দেখে নিজেরই যেন অচেনা মনে হচ্ছে। হওয়াটাই স্বাভাবীক ! প্রায় কুড়ি বছর বাদে এই ভাবে নিজেকে দেখছে এখন-

লম্বা লম্বা চুল,চোখের নীচে গাড় কালো ছাপ সারা গাল জুড়ে ঘন লম্বা দাঁড়ি গালের মাংস গুলো তার নিচে ঢাকা পড়ে রয়েছে ... সে গুলো দেখা যাচ্ছে না। গায়ের রঙটা আগের থেকে অনেক বেশী কালো হয়ে গেছে। লম্বা চুল গুলো থেকে তখনও হালকা জলের ফোঁটা গড়িয়ে ঘাড় ও বুকের মধ্যে গড়িয়ে পড়ছে। মুখের মধ্যে বিশ বছর আগের একফোঁটাও জেল্লার ছাপ তার আর নেই - কপালে আড়াআড়ি ভাবে ভয়ানক সেই ক্ষতর দাগটা এখনো পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। 

এমনকি সুস্থ হওয়ার পর প্রথমবার অরিত্র যখন এখানে আসে,  গোপাল তাকে দেখে প্রথমদিকটায় চিনতে পারছিল না । খানিক বাদে চিনতে পেরেই তার প্রতি আতিথেয়তার ডালি সাজিয়ে অভ্যর্থনায় একেবারে উজাড় করে টেনে দিয়েছিল। নিজের শরীরের দিকে তাকাতে তাকাতে বিশ বছর আগের দিন গুলোর কথা তার মনে পড়ল -

তখন সপ্তাহান্তে ছুটি পেলেই অরিত্র আর তৃপ্তি দুজনে মিলেই বেরিয়ে পড়ত। অরিত্র আর তৃপ্তি দুজনেই ঘুরতে খুব ভালবাসত। তৃপ্তির বরাবরের পছন্দ ছিল পাহাড়- বরফের চাদরে মোড়া একটা পাহাড় - বহুদূরে পাহাড়ের নিচে টিম-টিম করে জ্বলে উঠছে অজস্র গ্রাম - আর আকাশটা পুরোপুরি মাটির সাথে সেখানে মিশে রয়েছে - উফঃ ঠিক যেন স্বপ্নের মত ! 

যদি ও অরিত্র একটু শীত-কাতুরে ,তবে ঘুরতে যাওয়ার কথা উঠলেই তার পাহাড় জঙ্গল সমুদ্র কোনো বাচবিচার নেই। শহর ছাড়িয়ে বাইরে কোথাও শান্ত একটু নির্জন জায়গা পেলেই হয়। শহুরে জীবন আর অনবরত কাজের চাপে মাঝে মধ্যেই নিজেকে পাগল পাগল লাগত ! একমাত্র পুজোর ছুটি ছাড়া লম্বা ছুটি নেওয়াটাও তার পক্ষে অসম্ভব। তবে মাঝে মধ্যেই অফিসের কাজের চাপ বুঝে দু-চার দিনের জন্য তৃপ্তিকে নিয়ে কাছে পিঠে কোথাও  ও বেরিয়ে পড়ত। তৃপ্তির অফিসে চাপ থাকলেও সেও অরিত্রের জন্য সমস্ত কিছু উপেক্ষা করে অরিত্রের সাথে বেরিয়ে পড়ত। 

কোলকাতা থেকে কাছে পিঠে নির্জন জায়গা ভাবতেই অরিত্রের মনে পড়ে গেল শংকরপুরের কথা।  কয়েকদিন আগেই অনিন্দ-রা ওখান থেকেই ঘুরে এসেছে। হোটেল, যাতায়াত সবকিছু ফোনে কনফার্ম করে দিতে পারবে সে। তাছাড়া অনিন্দর মুখে শুনেছিল জায়গাটার সৌন্দর্য্য ও নির্জনতার অপরূপ রূপ ! অনিন্দর মুখে জায়গাটার বর্ননা শুনেই সে মুগ্ধ হয়ে উঠেছিল - জায়গাটা দীঘা যাওয়ার পথে মোটামুটি ঘন্টা খানেক আগে চোদ্দোমাইলে নেমে পড়লেই হয়, ওখান থেকে একটা রিক্সা নিয়ে মিনিট কুড়ি গ্রামের মেঠো রাস্তা ধরেই এগোলে পৌঁছে যাওয়া যায়। 

তখনো সেখানে লোকজন খুব একটা যায় না বললেই চলে, পাকাপাকি ভাবে একেবারে টুরিস্ট স্পট যাকে বলে, ঠিক তেমনটা নয়! জনবসতি বলতে; হাতে গোনা মাত্র কয়েকটা বাড়ি, তাও আবার সমুদ্রের তীরবর্তী অঞ্চল থেকে বেশ কিছুটা দূরে। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে কেবল বালির স্তুপ আর সারি সারি ঝাউ গাছ, মাঝে মধ্যেই বালির ঢিবি গুলোর উপর কাঁটা জাতীয় ফনিমনসার গাছ। সমুদ্রের দিকটায় বসতি বলতে প্রায় নিশ্চিহ্ন।  কিছুই নেই - হাতে গোনা মাত্র কয়েকটা হোটেল আর সদ্য গজিয়ে ওঠা কয়েকটা ঝুপড়ি । সে গুলোকেই খাওয়ারের দোকান হিসেবে চালিয়ে নিচ্ছে । সকালের দিকটাতে তাও কিছুটা লোকজন দেখা যায়- ওই সময়টায় জেলেরা সব একে একে নৌকোয় করে সমুদ্রের পাড়ে এসে জড়ো হয়। বিশাল আকারের জটলা পাকানো জাল গুলোকে পাড়ে এনে জট খুলতে থাকে, আর তা থেকে নানা ধরনের সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া গুগলি ইত্যাদি বের করে সে গুলোকে বাজারের উদ্দেশ্যে চালান করে দেয়। এই তাদের একমাত্র প্রধান জীবিকা,তাই ওই সময়টা জুড়েই তাদের যত ব্যাস্ততা, আর বেলা বাড়ার সাথে সাথেই তারা যে যার বাড়ি ফিরে যায়, ওমনি সারা সমুদ্র জুড়ে আবার নির্জনতা নেমে আসে। আর রাত্রির দিকটাতে নির্জনতার সাথে সাথে সমুদ্র তার একাকীত্বের সমস্ত উপকরন গুলোকে উজাড় করে ঢেলে দেয়, এবং সম্পূর্ণ নিজস্বতায় পরিপূর্ন হয়ে ওঠে।ঘুটঘুটে কালো অন্ধকার-অবিরাম উথাল পাতাল স্রোত, তারই মাঝে ঘন ঘন ঢেউ-এর আস্ফালন আর বাতাষে সর্বক্ষন আঁসটে মত একটা মাতাল করা গন্ধ - 

এই প্রথমবার কোলকাতার বাইরে। এর আগে একসাথে বহুবার তারা কাছেপিঠে বেড়িয়েছে ঠিক, কিন্তু এই প্রথম বার একেবারে আলাদা করে একান্তে অরিত্রকে সম্পূর্ন নিজের করে পাবে- ভাবতেই, মনের মধ্যে আলাদা এক রকমের শিহরন খেলা করছে। তার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল - একটা সম্পূর্ণ দিন অরিত্রকে একান্তে নিজের মত করে পেতে, যেখানে অরিত্র একমাত্র তার, কেবল তার। অরিত্রের সারাটা দিন কেবল মাত্র তৃপ্তির। কোলকাতায় থাকাকালীন একসাথে বেরিয়েও একটা সারাটা দিন তাকে সম্পূর্ণ নিজের মত করে আজ অবধিও তার পাওয়া হয়ে ওঠেনি। কাজ আর কাজ -একান্তে যে একটু নিজেদের মত করে মেতে উঠবে সে সুযোগও  ছিল আর কই? 

বহুবার তো এরকমও হয়েছে, কোনো একটা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নিজেরা হয়ত গভীর আলোচনায় মত্ত। এমন সময়েই ঢ্যাং ঢ্যাং করে অরিত্রের ফোনটা বেজে উঠেছে, আর সাথে সাথেই তৃপ্তির মনে হয়েছে -হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেই রাস্তায়!

আঁকা বাঁকা মেঠো পথ ধরে গাড়িটা ক্রমশ সমুদ্রের তীরের দিকে এগিয়ে চলছে। ঝড়ের মত উন্মাদ এলোপাথাড়ি হাওয়া- অরিত্র আপন মনে নিজের অজান্তেই হাতের আঙ্গুল দিয়ে চুল গুলোকে বার-বার ঠিক করেছে। প্রকৃতির সম্পূর্ণ এই উন্মুক্ত রূপ এর আগে তৃপ্তি কোনোদিনও দেখেনি। সবুজ গাছ-গাছালি দিয়ে পুরোপুরি মোড়া এই মেঠো পথ, বাঁ দিকে সংকীর্ণ একটা খাড়ি লম্বালম্বি ভাবে রাস্তার ধার ঘেঁষে বহুদূর চলে গেছে - ও প্রান্তে চোখ পড়লেই চোখটা জুড়িয়ে যায়। পলি মিশ্রিত সাদাটে ঢালু মত পাড় ক্রমশ ওপরের দিকে উঠে গেছে আর সেই সুন্দর উর্বর পাড় জুড়ে নানা ধরণের ছোটোখাটো গাছ। কোথাও বা ছবির মত দু-একটা নৌকা ঠিক যেন নিজের খেয়ালেই ভেসে চলছে।

রাস্তার দুধারে সারি সারি  গাছ, ডাল-পালা গুলো ক্রমশ দু-দিক থেকে ঝুঁকে পড়েছে রাস্তার উপর। পাতায় গড়ে উঠেছে ছায়া সুনিবিড় শ্রান্ত এক সামিয়ানা। কেউ যেন অতি সযত্নে এই পথ সাজিয়ে রেখেছে। মাঝে মধ্যে দু একখানা টালির চালের ঘর - কোথাও বা বন্য প্রজাতির ঝোপঝাড়। নাম না জানা অজস্র বুনো ফুলের সমারোহে চোখ দুটো জুড়িয়ে যায়। এই পথ যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই শুরু হয়েছে উলঙ্গ সমুদ্রের উন্মাদ ক্রোধ। যেন সর্বক্ষন ভীষণ অভিমানে সে অনবরত ফুঁসেই চলছে ! উন্মুক্ত সমুদ্রটা যেখানে এসে শেষ হয়েছে আড়া আড়ি ভাবে একটা বালির রাস্তায়।  সেই রাস্তাটা ধরেই খানিক এগিয়েই তারা পৌঁছে গেল হোটেলে।

আগে থেকেই ফোনে বুক করা ছিল সুতরাং চেক-ইনের সমস্ত পদ্ধতি গুলো প্রায় সম্পূর্ন করাই ছিল আগে। শুধুমাত্র খাতায় একটা সাইন করেই ওরা ওদের নিজেদের ঘরে প্রবেশ করল। এই যে এত খানি পথ তারা জার্নি করে এলো, এক ফোটা ও ক্লান্তি নেই তাদের। এমনকি সকাল থেকে একটা দানা ও যে তখনো পেটে পড়েনি, সেটুকুও খেয়াল নেই তাদের। ঘরের মধ্যে ঢুকেই অরিত্রের বুকের মধ্যে আছড়ে পড়ল তৃপ্তি। 

এই প্রথমবার একান্তে অরিত্রকে পেয়ে সে আপ্লুত, সমগ্র পৃথিবীর সমস্ত অর্বাচিন দৃষ্টিকটূতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল অরিত্রকে, এখানে কোনো বাঁধা-নিষেধ, আড়ষ্টতা তার আর কিচ্ছু থাকতে পারেনা। সম্পুর্ন নিজেদের ঘর আর একান্ত নিজেদের পৃথিবী। আর এমন পৃথিবীর বুকেই তো সে বাঁচতে চেয়েছিল ! আজ আর কোনো সামাজিক আড়ষ্ঠতাই তাকে আটকে রাখতে পারবে না -

অরিত্রকে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজের মধ্যে জড়িয়ে ধরল- শরীরের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ গুলি ক্রমশ প্রসারিত হতে হতে একসময় দুটো শরীর যেন বিলীন হয়ে গেলো। এই মুহূর্তে কেবল দুটো হৃদ-স্পন্দন ছাড়া আর সব কিছু যেন স্তব্ধ। এই প্রথম বার তৃপ্তি খুঁজে পেল এ বুকেই তার আমরণ নিরাপত্তা। অরিত্র তার শরীরের প্রতিটি কোষে -কোষে অনুভব করছে তৃপ্তির উন্মত্ততা। সমস্ত কিছু ছাপিয়ে অরিত্র অনুভব করল - একটা পবিত্র আত্মা, এই আত্মার কাছেই তো তার সবটা সে উৎসর্গ করতে চেয়েছিল। এ ভাবেই কত সময় যে তাদের কেটে গেল, সে দিকে তাদের কারোর খেয়াল ছিল না। ঘড়িটা ঢ্যাং-ঢ্যাং করে বেজে জানান দিল -দুটো বেজে গেছে। সে শব্দে তাদের হুশ ফিরে এলো -লাঞ্চের সময় পেরিয়ে যাবে, এবার তাদের রেডি হতে হবে।

#

অরিত্রের ঘুম ভেঙ্গে গেল।  জানালায় চোখ পড়তেই দেখতে পেল অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরের লাইট পোষ্টে থেকে হালকা আলো ঠিকরে এসে পড়েছে পেছনের বাগানে, আর সেই আলোয় গাছের পাতা গুলোকে যেন আরো বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। কখন যে বিকেল অতিক্রম করে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে খেয়াল নেই, শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত ছিল, তাই দুপুরে স্নান সেরে খেয়ে দেয়ে এসেই শুয়ে পরা। একটু খুনশুটি করতে করতে কখন যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেছিল,কিচ্ছু মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে তৃপ্তি গল্প করতে করতে তার মাথায় হাত বোলাচ্ছিল। ভীষণ আরাম লাগছিল, চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল তার-

পাশে তৃপ্তি তখনও ঘুমিয়ে আছে, এমন তৃপ্ততা তার মুখে অরিত্র এর আগে কখনো দেখেনি।মনে হয়,তৃপ্তি যেন এই মুহূর্তে নিশ্চিন্ত একটা নিরাপত্তার কোলে নিজেকে সম্পূর্ণ আলগা করে দিয়েছে ! অরিত্র তার সাথে রয়েছে - সুতরাং যমও তাকে এসে ছুঁতে পারবেনা । ঘুমন্ত তৃপ্তির কপাল জুড়ে এলোমেলো চুলগুলিকে  অতি সযত্নে সরিয়ে কপালে আলতো করে একটা চুমু এঁকে দিল -

নাহ্‌ - নির্বিঘ্নে ঘুমোচ্ছে যখন ঘুমোক ও । চেয়ারটা টেনে এনে জানালার পাশে হেলান দিয়ে বসল সে । অন্ধকারে বসে আলোর দিকে দেখতে দেখতে - অরিত্র ভাবল না থাক, যতটা সময় ও শান্তির ঘুম ঘুমোচ্ছে ও ঘুমোক। এই মুহূর্তে তার এই টুকু শান্তি যাতে কোনো ভাবে বিঘ্ন না ঘটে তাই নিস্তব্ধে জানালার পাশে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল। 

বাইরে কয়েকটা লতানো গাছ জানালার নিচ থেকে উঠে এসে লোহার খাঁচা গুলোকে পাকিয়ে জড়িয়ে রয়েছে। লতানো ডালের শেষ প্রান্তে বেশ কয়েকটা নাম না জানা ছোট্টো ছোট্ট বুনো ফুল, হাওয়ার তালে অনবরত নেচেই চলছে।একেকটা ফুলের আকৃতি দেখে তার মাস চারেক আগে তৃপ্তির হারিয়ে যাওয়া প্রিয় সেই কানের দুলের কথা মনে পড়ে গেল। দেখতে অবিকল এক রকমের মনে হচ্ছে।

গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে চোখ পড়তেই দেখতে পেল- সমদ্র তীরের মায়াবী রূপ। অন্ধকার ভেদ করে চাঁদটা একটা বিশাল বড় থালার মত সবে দিগন্ত রেখাটা স্পর্শ করেছে। আর সেই আলোয় খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। দূরে একটা গাছের মাথায় রূপালী আলোগুলো পড়েই আবার ঠিকরে ছড়িয়ে যাচ্ছে চারিদিকে। ঢেউ গুলো অনবরত বালির তটে এসে প্রচন্ড বেগে যেন অভিমানে আছড়ে পড়ছে, আর প্রত্যেকটা আছাড় থেকেই সৃষ্টি হচ্ছে লক্ষলক্ষ মুক্তোর কণা।নিস্তব্ধ এই চরাচরে চারিদিকে আর কেউ কোথাও নেই। 

বহুদূরে চাঁদের আলোয় সে দেখতে পেল দুটো ছায়ার মত শরীর -একে অপরের হাত ধরে সমুদ্রের তীর ধরে হেঁটেই চলছে। তাদের এই হেঁটে যাওয়া যেন আর শেষ হবে না কোনোদিনও।


সেদিন সন্ধ্যায় ঘুম থেকে উঠে অরিত্রকে দেখতে না পেয়ে তৃপ্তির চোখ দিয়ে প্রায় জল বেরিয়ে আসার জোগাড়। হঠাৎ করে একটা একাকীত্বের গাড় ছায়া যেন তার বুক জুড়ে নেমে এলো, বুকের বাঁ দিক জুড়ে টের পেল তীব্র একটা ব্যাথা। মুহূর্তেই তাকে যেন খান-খান করে দিল। ডান দিকে ঘাড়টা ঘোরাতেই দেখতে পেল, অন্ধকারে জানালার পাশে একটা চেয়ারে গুটিশুটি মেরে বসে আছে অরিত্র। উফঃ স্বস্তি পেল সে। আর একটু হলেই সে প্রায় মরেই যেত ! এমন ভাবে অন্ধকারের মধ্যে অরিত্র বসে রয়েছে তাকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। দেওয়ালের সাথে পুরোপুরি ভাবে যেন সে সেঁটে রয়েছে, মাথার পেছন দিকটায় পর্দাটা তাকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছে। আর ঘরের মধ্যে সিলিং ফ্যানের হাওয়ায় অনবরত দুলেই চলছে। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে সে উঠে দাঁড়াল। এই মুহূর্তে অরিত্রকে সে আচমকা একটা সারপ্রাইজ দেবে ভেবে কোনোরকমে পা টিপেটিপে অরিত্রের পেছনে এসে দাঁড়াল। অরিত্রের চোখ অনুসরণ করে বাইরের দিকে তাকাতেই সে মুগ্ধ হয়ে উঠল - রাত্রির এই মনোমুগ্ধকারী রূপ এর আগে সে কক্ষনো দেখেনি । সমগ্র সমুদ্র জুড়ে যেন কেউ একটা রূপালী চাদরে ঢেকে দিয়েছে। চাঁদটা যেন বৃহৎ আকারে একেবারে সমুদ্রের ওপর নেমে এসেছে। এই বিশ্ব চরাচরা চারিদিকে আর কেউ কোত্থাও নেই ! 

পেছন থেকে সে অরিত্রকে জড়িয়ে ধরল,  মাথাটা নিজের বুকের মাঝে টেনে এনে অরিত্রকে সে একেবারে নিজের করে নিল।অরিত্র তৃপ্তির বুকে মাথাটা রেখে সোজাসুজি ভাবে ওপরের দিকে তাকাল। চিবুক ছুঁইয়ে নাক অতিক্রম করে দৃষ্টিটা যখন সোজাসুজি তার চোখে এসে পড়ল, সে পুরোপুরি স্থির হয়ে গেল। তৃপ্তির চোখ জুড়ে অরিত্র দেখতে পেল আর একটা মায়াবী চাঁদের আলোয় পরিপূর্ণ পৃথিবী। খানিক আগেই সে জানালার বাইরে যা কিছু দেখেছিল সব কিছু যেন তার ওই চোখের মাঝেই এই মুহূর্তে খুজে পেলো। ওমন মায়াবী শ্রান্তস্নিগ্ধ আয়তকার চোখটাই যেন বাইরের মায়াবী চাঁদনী রাত আর অরিত্র যেন প্রকৃতীর প্রেমীক -"কবি"। যেন অমন প্রকৃতির কাছে নিজেকে সম্পূর্ন উন্মুক্ত করে দিয়েছে। প্রকৃতির অমন মায়াবী রূপের নির্যাসটুকু  আষ্টেপৃষ্ঠে সে উপভোগ করে নিতে চায় তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে।

একসময় তৃপ্তির শ্বাস আরো ঘনও হয়ে উঠল। তার গরম প্রশ্বাস অরিত্রের মুখে এসে পড়ছে। কোনোরকমে ঘোর কাটিয়ে অরিত্র বলে উঠল - 
চলো, সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে বাইরের চাঁদের আলোয় গিয়ে একটু ভিজে আসি...... 


ঘড়িতে তখন প্রায় রাত্রি আটটা, দুজনেই রেডি হয়ে বেরোলো। বেরোনোর আগে গোপাল কে বলে গেল, ফিরে এসেই খাবে।

গোপাল বলল- আজ কিন্তু শুক্লা পঞ্চমী, সমুদ্র ফুঁসছে। খুব সাবধানে ঘুরবেন, সমুদ্রের খুব একটা কাছাকাছি যাবেন না। আর হ্যাঁ; খুব বেশী দেরী করবেন না। আমি খাওয়ার রেডি করে অপেক্ষা করবো।

হোটেলের গেটটা ছাড়িয়েই কাঁচা মাটির রাস্তা। সবুজ ঘাসে দু-প্রান্ত থেকে ঢেকে এসেছে, মাঝে পায়ে মাড়ানো সরু মাটির সাদা পথ ধরে তারা সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চললো। মিনিট দুয়েক এগিয়েই একটা বুড়ো ঝাউগাছ অতিক্রম করেই বালির রাস্তায়। রাস্তাটি ক্রমশ ঢালু হয়ে সোজাসুজি একেবারে সমুদ্রে এসে পড়েছে। স্রোতের টানে বড় বড় নুড়ি পাথর গুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবিকল বাঁধের মত একটা সীমারেখার সৃষ্টি করেছে। যেন ঠিক জলভাগ আর স্থলভাগের মাঝে একটা প্রাকৃতিক  সীমানা। যেন ওই সীমানার বাইরে যাওয়া তার বারণ! তবু কে শোনে কার কথা? তার প্রবল স্রোত প্রায়শই সেই সীমানা অতিক্রম করে গ্রাস করে নিতে চায় স্থল ভাগের আরো অনেকটা অংশ। সুবিশাল ঢেউয়ের স্রোতে সেই সীমারেখায় অবস্থিত অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র আকৃতির নুড়ি পাথর গুলো অবিরাম গড়িয়েই চলছে। কখনো কখনো ছোটোখাটো পাথর গুলো স্রোতের টানে একবার এগিয়ে আসছে তো আবার খানিক বাদেই পিছিয়ে যাচ্ছে । অরিত্ররা সমুদ্রের যত কাছাকাছি এগিয়ে আসছে সমুদ্রের গর্জনটা ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ় গাড়তর হচ্ছে। আর বড় বড় ঢেউ গুলো নুড়ি পাথরে ঘেরা অস্থায়ী পাড়ের ওপর ছলাৎ ছলাৎ শব্দে আছড়ে পড়ছে, ঠিক যেন বহুদূর থেকে আগত বাতাসে  ভেসে  আসা কোনো এক সঙ্গীতের সূরের মূর্ছনা। 

ওদিকে আকাশটা যেন ঠিক সমুদ্রের সাথে মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। দিগন্ত রেখার ওপর অবস্থিত অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল আকাশটার বুক চিরে বিশালাকার রুপোর থালার মত চাঁদটা একেবারে সমুদ্রের ওপর। তার উজ্জ্বল আলোয় সমুদ্রের যে দিকেই চোখ যায় কেবল রাশি রাশি মুক্তোর কণা - অবিরাম স্রোতের টানে সে গুলো সমুদ্রের এ প্রান্ত থেকে অপ্রান্তে বহমান। সবকিছু ঠিক যেন ছবির মতো ।

ওরা হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে এসেছে কখন খেয়াল নেই। সমুদ্রের জলগুলো মাঝে মধ্যে এসে পা ছুঁয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে। জলটা ফিরে যাওয়ার সাথে সাথেই কয়েকটা কাঁকড়া তীব্র গতিতে দৌড়ে পালাল। আর সে গুলোকে দেখতে পেয়েই হঠাৎ করে তৃপ্তি ওদের পেছনে হন্ হন্ করে হাঁটা দিল। আর ওর পায়ের আওয়াজে কাঁকড়া গুলো আরো দ্বীগুন গতিতে দৌড়ে গিয়ে গর্তের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। এই ভাবে খেলতে তার বেশ মজা লাগছিল। অরিত্রও পেছনে পেছনে ভেজা বালির ওপর হাঁটতে হাঁটতে তৃপ্তির সব পেয়েছির আনন্দের মুহূর্ত গুলো উপভোগ করছিল। প্রিয় মানুষটির অন্তরের অন্তর থেকে বেরিয়ে আসা আনন্দের উচ্ছাস তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে কার না ইচ্ছে করে?

তৃপ্তির এত উচ্ছাস এর আগে সে কোনোদিন ও দেখেনি। অরিত্র মনে মনে আজ ভীষণ খুশী। তার হৃদয় আজ পরিপূর্ণ। তৃপ্তির তৃপ্ততার এমন বহিঃপ্রকাশ এর আগে সে কক্ষনো দেখেনি। দিনের পর দিন শুধুই কাজ আর কাজ ! তাকে সে ভাবে সময় দিতে পেরেছে আর কই? একটা রোবোটিক জীবন আর হাজারো দায়িত্ব তাকে যেন বদ্ধ করে দিয়েছিল আপন কাজের নিষ্ঠার প্রতি। তৃপ্তির ভাললাগা গুলোকে সে এতদিনে বুঝতে পেরেছে। এই প্রথমবার অরিত্র টের পেল, শুধুমাত্র আগলে রেখে বা কৃত্তিম সুখের চাদরে তাকে ভাসিয়ে রেখে, আনন্দে মশগুল করে রাখার সিদ্ধান্তটা সম্পূর্ণ ভুল। তাকে সুখে রাখতে গেলে একেবারে মাটির সাথেই তাকে মিশে যেতে হবে। কারন মাটির মধ্যেই মিশে আছে তার অনাবিল আনন্দ। সে অর্থ যশ সন্মান প্রতিপত্তি কোনো কিছুর কাঙাল নয়। সে একমাত্র ভালবাসার কাঙাল, কেবল মাত্র দু মুঠো শান্তির কাঙাল। তৃপ্তি হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে কিছু একটা কুড়োলো। অরিত্র কাছে যেতেই দেখতে পেল একটা ছোটো জ্যান্ত কাঁকড়া তৃপ্তির হাতের তালুর মধ্যে। এতটুকু ও নড়তে পারছে না। বোধ হয় পায়ে চোট পেয়েছে!

অরিত্রকে ডেকে বলল - দেখো অরিত্র কেউ বোধ হয় মাড়িয়ে চলে গেছে। পা গুলো একেবারে ভেঙ্গে গেছে। বেচারার নড়ার মত অবস্থা নেই।
কী করি বলতো?

-অরিত্র হাতে করে একটু জল এনে তার গায়ের মধ্যে দিল।তারপর ওকে নিয়ে গিয়ে একটা ছোটো মতো গর্তের মধ্যে ছেড়ে দিল। বলল - জল রয়েছে ও ঠিক সুস্থ হয়েই বেঁচে উঠবে। তুমি অত চিন্তা করো কেনো? ডারউইনের স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স পড়োনি? লড়াই- লড়াই আর লড়াই, হয় লড়াই করো,নয় চিরতরে হারিয়ে যাও। এটাই হল জীবনের বেঁচে থাকার সূত্র । ওকে এই পৃথিবীতে লড়ে থাকার জন্য বাস্তব ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করার সুযোগ দাও - ও লড়াইয়ের সংগ্রামে ঠিক টিকে থাকবে।

এরপর ওরা এগোতে এগোতে একটা সুন্দর মত জায়গা দেখতে পেল। সমুদ্রের পাড়টা যেখানে সোজা জংগলে উঠে গেছে, ওখানটায় বেশ কয়েকটা পাথর জমে একটা উঁচু সুপ্রশস্ত ঢিবির ন্যায় আকৃতি ধারন করেছে। জায়গাটা মোটামুটি পরিস্কার বললেই চলে।

লতানো একটা গাছ স্তুপটার পাশ থেকে নাম না জানা অচেনা একটা গাছকে অবলম্বন করে প্রায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। অন্ধকারে অবিকল হাতির শুঁড়ের মত মনে হচ্ছে। আর সে গুলো থেকে বিভিন্ন বর্নের অজস্র ফুল থোকা থোকা হয়ে ঝুলছে। এই ফুল এর আগে সে কোনোদিন ও দেখেনি। এমনকি, বই তে ও সে কখনো পড়েনি। অদ্ভুত একটা মন মাতানো গন্ধের মাদকতায় চারিদিক ভরে উঠেছে, একটা পেঁচার আওয়াজ পেয়ে ডানা ঝাপটে উড়ে সমুদ্রের দিকে উড়ে চলে গেল তারপর একটু দূরে গিয়ে জ্যোৎস্নার আলোয় যেন হারিয়ে গেল। একঝলক দেখে মনে হল লক্ষ্মী পেঁচা, কারন দেখতে একেবারে ধপ্ ধপে্ সাদা। তৃপ্তি অরিত্রের সুঠাম হাতের ওপর ভর করে উঁচু ঢিবিটার ওপর উঠে বসল। ঢিবি তো নয়, দেখে মনে হয় একটা যেন একটা বেঞ্চ। একেবারে সমুদের প্রান্তে আড়া আড়ি ভাবে একটা সুপ্রশস্ত বৃহৎ আকৃতির পাথর নিচের দিকটা ক্রমশ ঢালু হয়ে একেবারে সমুদ্রে গিয়ে নেমে গেছে। প্রায় কুড়ি ফুট নীচে ওই জায়গাটায় অনেক গুলো ছোট্টো -মাঝারী এবং বৃহৎ আকৃতির পাথর গুলো এবড়ো খেবড়ো ভাবে একটা স্তুপের মত সমুদ্রের মধ্যে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর যতবার ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে প্রত্যেকবার সমুদ্রের জল কিছুটা ছিটকে এসে ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। পেছনের দিকটাতে দু-তিন খানা পাথর ওই বড় পাথরটার ওপর এমন ভাবে বসে রয়েছে যাতে ওই বড় পাথরটার ওপর পা ঝুলিয়ে বসে অনায়াসেই পেছনের পাথর গুলোর ওপর হেলান দিয়ে বসা যায়। আর পেছনের ওই লতানো গাছটার ফুল পাতা গুলো প্রায় একটা ছাতার আকৃতি ধারণ করেছে। এক ঝলক দেখলে মনে হয় বহু পরিশ্রম করে হয়ত মানুষ হাতে করেই এটা বানিয়েছে। অথচ প্রকৃতির এই খাম-খেয়াালীতেে এমন নিখুঁত এক এক-একটা বস্তুর জন্ম হয় তা চোখে না দেখলে একেবারে বিশ্বাস করা যায় না। অরিত্র তৃপ্তির পাশে এসে পা দুটোকে সমুদ্রের দিকে ঝুলিয়ে বসল। সাথে সাথেই ঢেউএর ঝাপ্টায় বেশ কিছুটা ঠান্ডা জল পায়ে এসে পড়ল। 

অন্ধকারে ঝোপের মাঝে বেশ কয়েকটা পাখি কিচ-কিচ করে ডাকছে। চাঁদের আলোয় সে গুলোকে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে না। তবে তাদের আকৃতি খুব ছোট্ট। এর মধ্যেই একটা পাখি ডানা ঝাপ্টে উড়ে আবার পাশের ডালে গিয়ে বসল। সাথে সাথেই বেশ কয়েকটা ফুল উড়ে এসে তাদের গায়ে পড়ল। অরিত্র সে গুলোর মধ্য থেকে সব থেকে সুন্দর ফুলটাকে হাতে করে তুলে নিয়ে তৃপ্তির মাথায় গুঁজে দিল। আর সাথে সাথেেই তৃপ্তির রূপ যেন আরো সহস্র গুন বেড়ে গেল।

এমনিতে তৃপ্তি খুব একটা সাজে না। একটু সাজলে আর দেখতে হবে না! এক একজন হয় না এরকম, কপালে একটা টিপ-ই যথেষ্ট, ঠিক তেমনটাই। নিখুঁত মুখের গড়ন - পাতলা গোলাপি ঠোঁট, ভাসা-ভাসা চোখ, সুন্দর টিকালো নাক, হাঁটু অবধি দীর্ঘ ঘন চুল। শুধু মাত্র কপালে একটা ছোট্ট টিপ আর চোখে হালকা কাজল ব্যাস, আর কিচ্ছুটি লাগেনা! 

এই নিয়েই মাঝে মধ্যেই অরিত্রকে সে খ্যাপাত - 

রাস্তা ঘাটে অথবা ট্রামে বাসে ছেলেরা যে হারে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, একটু পাত্তা দিলেই কেউ না কেউ আমার প্রেমে পড়ে যাবে। তখন তুমি থাকো তোমার ওই কাজ নিয়ে- আমাকে আর পেতে হবে না।

একদিন তো এরকমও হয়েছিল - প্রিন্সেপ ঘাটের সামনে অরিত্র সিগারেট কিনতে ঢুকেছিল, সামনের রাস্তাটায় তৃপ্তি একা দাঁড়িয়ে অরিত্রর জন্য অপেক্ষ্যা করছিল। ওমনি কোথা-থেকে একটা ছেলে সামনে দাঁড়িয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে একদৃষ্টিতে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। তৃপ্তির ছেলেটার দিকে চোখ যেতেই তার ভীষণ অসস্তি হচ্ছিল। তাই সে ওখান থেকে দোকানের দিকে হন্ হন্ করে হাঁটা শুরু করল। ছেলেটা ও অরিত্রকে খেয়াল করেনি বোধহয়, তাই সে ও এগিয়ে এল।  তৃপ্তি অরিত্রকে এসে পুরো ব্যাপারটা বলতেই অরিত্র ক্ষেপে যেই তেড়ে গেল ওমনি ছেলেটা মরি কী বাঁচি ! 

লম্বা এক দৌড় - সাথে সাথে অরিত্র নিজের চপ্পলটা এক হাতে তুলে সোজা ওই ছেলেটার পেছনে ছুড়ে মারল, আর সপাটে গিয়ে ছেলেটার পিঠে লাগল। 

সে আর দাঁড়ায়?

দৌড়ে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে কোনোরকমে বাঁচল।

আর ওই দেখে তৃপ্তির সে কী হাঁসি -

অরিত্র যেখানে বসেছিল, ওই লতানো গাছটার ছায়ায় মুখটা প্রায় ঢেকে গেছে। আর সেই আবছা আলোয় তৃপ্তি তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। মুখ- -চোখ - নাক সবটুকুই তার চেনা, এমন অন্ধকারের মধ্যেও স্পষ্ট দেখতে পেল তার সেই উজ্জ্বল চোখ। তৃপ্তি দেখতে পেল তার একমাত্র আশ্রয়। কী অসম্ভব তার চোখের স্পর্ধা! শক্ত - শ্রান্ত অথচ ভীষণ উজ্জ্বল সেই দৃষ্টি। ঠিক যেন,একটা আলোর জ্যোতি ! 

অমন একটা আলোর জ্যোতিকে ভরসা করেই তো সে বাঁচতে চেয়েছিল আজীবন। অমন  একটা আলোর জ্যোতি একান্ত তার হয়েও হাজার কাজের ভিড়ে তাকে তো সর্বক্ষন পাওয়া হয়ে ওঠেনা তার। সে একমুহূর্তও তাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। তাকে ছাড়া যে তার এক মুহূর্তও কাটেনা,অথচ সারা পৃথিবীর দায়ভার মুক্ত করেই সে ফিরে আসে তৃপ্তির কাছে। অপেক্ষার মুহূর্ত গুলো তখন যেন তার কাছে মৃত্যু যন্ত্রনার সমান।

তার মনে হচ্ছে এ ভাবেই যদি কেটে যেত একটা জীবন এর থেকে সুখের আর কিচ্ছু হোত না - 

আচমকা তৃপ্তি ঢেউ-এর বেগে অরিত্রের বুকে এসে অভিমানে আছড়ে পড়ল। অরিত্র তৃপ্তির মাথায় হাত দিয়ে চুল গুলোকে সরিয়ে তার সিথির মধ্যে একটা গাড় চুম্বন এঁকে দিল। তৃপ্তির চুলের মধ্যে অদ্ভুত একটা ঘ্রান- অরিত্রকে বরাবর পাগল করে দেয় -

অরিত্র তার মাথার মধ্যে নাক- মুখ ঘষতে ঘষতে এ ভাবেই দীর্ঘ সময় বুঁদ হয়ে ছিল। উন্মুক্ত সমুদ্রের হাওয়ার বেগে ওই নাম না জানা ফুলগুলো তখন অবিরাম বৃষ্টির মত ওপর থেকে অঝোর ধারায় ঝরে পড়ছে। পায়ের নিচে এবড়ো খেবড়ো পাথরে সমুদ্রের স্রোত প্রবল বেগে আছড়ে পড়ার পর জলের ঝাপটা গুলো বৃষ্টির ঝাটের মত বাতাসে উড়ে এসে তাদের সমস্ত শরীর শ্রান্ত করে দিচ্ছে। দূরের জঙ্গলটার মাথায় একটা কোকিল অনবরত মিষ্টি সূরে ডেকেই চলছে, সেই সূর এই জোছনায় ভেজা বালিয়াড়িকে স্পর্শ করে বাতাসে ভাসতে ভাসতে বহুদূরে সমুদ্রের মাঝে গিয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তৃপ্তি অরিত্রের কানে কানে বলল - হ্যাঁ গো, প্রকৃতি ও আজ আমাদের সাথ দিয়েছে। এমণ মধুর-ক্ষণ যদি আর কোনো দিন ও না আসে?

অরিত্র কানের কাছে আস্তে আস্তে বলল -

আসবেই, আমি আনবই। কেবল নিজের ওপর বিশ্বাস রেখো, আর ধৈর্য্য রেখো। সমস্ত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে আমি তোমার জন্য জীবনের বাকী প্রত্যেকটা দিন তোমায় এ ভাবেই একেক-টা দিন উপহার দেব। আর এই আমাদের শুরু। আর আজ আমাদের মধুচন্দ্রিমা। 

তারপর তৃপ্তিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘক্ষণ ঠোঁটের মধ্যে তার উষ্ণ ঠোঁটটা গভীর ভাবে ডুবিয়ে দিল। তৃপ্তি অরিত্রকে জড়িয়ে ধরে অনুভব করছে অরিত্রের শরীরের সমস্ত উষ্ণতা। অরিত্র ক্রমশ অবশ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে যেন অরিত্র তার শরীরেরই একটা অবিচ্ছন্ন অঙ্গ। দুটো শরীর আস্তে আস্তে অবশ হয়ে এল - হাতের সাথে হাত, কপালের সাথে কপাল,ঠোঁটের সাথে ঠোঁট মিলে মিশে দুটো বিপরীত লিঙ্গের দুটো মানব যেন এক হয়ে গেছে -

তৃপ্তি আজ সম্পূর্ণ- পরিপূর্নতায় দিশাহারা। এতদিনের ইচ্ছা যেন আজ তাকে সম্পূর্ণ রূপে ধরা দিয়েছে । আনন্দে আপ্লুত, তার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় কান্না গড়িয়ে পড়ল -

#

রাত্রি যত বাড়ছে সমুদ্রের গর্জন যেন আরো প্রখর হচ্ছে, সমুদ্র যেন ফুঁসছে তার সর্বশক্তি দিয়ে। এই পূর্ণিমার ভরা কটালে সে শক্তি যেন আরো কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ায় তৃপ্তির চুলের খোঁপা থেকে ফুলটা উড়ে গিয়ে প্রথমে তৃপ্তির পায়ের কাছে প্রশস্ত পাথরটার ওপর পড়ল, তৃপ্তি ঝুঁকে কুড়োতে গেল তার "মধুচন্দ্রিমার সেরা উপহারটা"। ওমনি আর একটা দমকা হাওয়ায় উড়ে গিয়ে ফুলটা পড়ল প্রায় কুড়ি পঁচিশ ফিট নীচের ওই এবড়ো-খেবড়ো পাথরটার ওপর। অরিত্র কিছু বুঝে ওঠার আগেই তৃপ্তি পা ফস্কে ফুলটার পেছনে পেছনে গড়িয়ে পড়ল প্রকান্ড একটা ঢেউএর ওপর।

তার পর জল আর জল - আর কিচ্ছুটি তার চোখে পড়ছে না। তার জীবনের সমস্ত কিছু যেন এক লহমায় ওই সুবিশাল ঢেউটার আড়ালে চলে গেল। কিচ্ছু আর তার চোখে আসছে না। চোখটা কেমন যেন ধোঁয়া হয়ে গেল। আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না সে। অরিত্র আকস্মিকতার ঘোর কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই প্রাণ-পণে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওই বিশালাকার ঢেউ এর ওপর।

ততসময়ে ঢেউটা সরে গিয়ে এবড়ো খেবড়ো জায়গাটা আবার আগের মত উন্মুক্ত হয়ে গেছে। অরিত্রের দেহটা প্রায় কুড়ি ফিট উঁচু থেকে গিয়ে পড়ল ওই ধারালো এবড়ো খেবড়ো পাথর গুলোর ওপর। 


তখন রাত প্রায় বারোটা। গোপাল অপেক্ষা করে করে ভীষণ অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে। খাওয়ার রেডি করে আর কতক্ষণ এ ভাবে বসে থাকা যায়! চোখ দুটো প্রায় বন্ধ হয়েই আসছে। ঢুলতে ঢুলতে একটু এগিয়ে ... খুঁজতে খুঁজতে কতদূর চলে এসেছে খেয়াল নেই। কোথাও খুঁজে পেলনা তাদের। প্রচন্ড ভয়ে তার মুখ চোখ শুকিয়ে প্রায় কাঠ হয়ে এল। অবশেষে বাধ্য হয়ে ফিরে এল হোটেলে।  আরও দুজনকে সাথে ডেকে বড় একটা লন্ঠন নিয়ে ওরা সমুদ্রের সারা পাড় তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াল। নাহঃ তাদেরকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। গোপালরা যখন শেষরাতে নিরুপায় হয়ে ফিরে আসছে -আকাশে তখন চাঁদটা ডুবে গেছে। সারা সমুদ্র জুড়ে একটা ভয়ানক অন্ধকার গ্রাস করেছে।  অন্ধকারের উদ্দাম স্রোতে সমুদ্রটা যেন সারা পৃথিবীকেই গ্রাস করে নিতে চাইছে। সাথে সাথেই ওরা থানায় গিয়ে খবর দিল। 

পরের দিন সকাল ন-টা নাগাদ একটা পুলিশের গাড়ি এসে হোটেল থেকে গোপালকে তুলে নিয়ে গেল রামনগর জেলা হসপিটালে। সেখানে গিয়ে গোপাল অরিত্রকে চিহ্নিত করতে পারল। অরিত্রের সারা শরীর রক্তে ভেসে গেছে, কপালের ওপর আড়া আড়ি একটা গভীর ক্ষত। একটা পাথরের ওপর সারারাত পড়েছিল সে, আশেপাশে আর কাউকে পাওয়া যায়নি।

পুলিশ অরিত্রকে উদ্ধার করতে পারলেও তৃপ্তিকে আর খুঁজে পেলনা। বছর পাঁচেক মত লেগেছিল তার সুস্থ হতে - প্রথম দিকটায় সম্পূর্ণ বোবা হয়ে থাকত -পুরোনো কিছুই সে মনে করতে পারত না। পরের দিকটায় যখন ধীরে ধীরে একটু সুস্থ হল - কেবল তৃপ্তি ছাড়া আর কোনো কিছুই সে ভাবতে পারেনি। তৃপ্তি ছাড়া তার কাছে সমস্তকিছুই মূল্যহীন। সমস্ত কিছু ছেড়ে দিয়ে এখন দিন রাত চারিদিকে কেবল তৃপ্তিকেই খুঁজে বেড়ায়। তার-পর থেকে প্রায়শই তৃপ্তিকে খুঁজতে সে এখানে চলে আসে। সে বিশ্বাস করে সমুদ্রের ওপাড়ের ঘন অন্ধকার থেকে একদিন তৃপ্তি ঠিক উঠে আসবে। আর বলবে - এই অরিত্র, "দেখো সেই নাম না জানা ফুলটা আমি কুড়িয়ে এনেছি।"


atanuabmcadila@gmail.com


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 

বিশ্ব জুড়ে -

Flag Counter
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-