শুক্রবার, নভেম্বর ৩০, ২০১৮

অপর্ণা চৌধুরী

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ৩০, ২০১৮ |
চায়ের কাপ
ড়কড় করে বাজ পড়ল। “ ও লতা লতা কোথায় গেলি তুই!” ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন আরতি দেবী। 

“এইতো আমি। তুমি ভয় পাচ্ছ কেন?” বলে আরতি দেবীকে জড়িয়ে ধরল লতা। লতাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা মেয়ের মত ঘুমিয়ে পড়লেন আরতি দেবী। বাজের আওয়াজ কে চিরকাল ই খুব ভয় করেন উনি। আজকাল চলাফেরার শক্তি চলে যাবার পর ভয় টা আরও বেড়ে গেছে।

লতা আরতি দেবীর দেখাশোনা করে। আগে লতা এ বারিতে ঝাড়ু পোঁছার কাজ করতো, কিন্তু আরতি দেবী অসুস্থ হয়ে পড়ার পর এখন ও এ বাড়ীতে থাকে , আরতি দেবীর দেখাশোনা করে। আরতি দেবীর কোমর থেকে পা পক্ষাঘাতগ্রস্ত। শিরদাঁড়ায় একটা আঘাত লাগার পর আস্তে আস্তে ওনার পাগুলো অবশ হতে থাকে। প্রথম দিকে উনি পা ঘসে ঘসে হাঁটতে পারতেন। পরে আস্তে আস্তে সে ক্ষমতাও চলে যায়।

তখন বর্ণালীর বিয়ে। বর্ণালী ওনার একমাত্র মেয়ে। comparative literature নিয়ে M.A. করার পর ও চাকরি করছিল। সেখানেই দেখা হয় দিব্যেন্দুর সঙ্গে। দিব্যেন্দু খুব ভালো ছেলে। মাঝে মাঝেই বাড়ীতে আসতো। যখনই আসতো সাথে এক গাদা মিষ্টি, ফিস ফ্রাই, ভেজিটেবিল চপ নিয়ে আসতো। দরজা থেকেই হাঁক মারত, “ লতা চা...”। তারপর নিজেই চলে যেত রান্নাঘরে , খাবারগুলো থালায় ঢেলে নিয়ে আসতো বসার ঘরে। তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলতো আড্ডা। বিয়ের পর ওরা কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাট নেবে ঠিক করলো। তাহলে ওদের পক্ষে আরতি দেবীর দেখাশোনা করা সহজ হবে। পাঁচ বছর আগে বর্ণালীর বাবা মারা যাবার পর থেকে , ওরা মায়ে মেয়েতেই থাকে এই ফ্ল্যাট টা তে। বর্ণালীর বিয়ে হয়ে যাবার পর আরতি দেবী একেবারে একলা হয়ে যাবেন। দিব্যেন্দুর বাবা মা জলপাইগুড়িতে থাকেন। মাঝে মাঝে আসেন ছেলেকে দেখতে। ওরা ঠিক করলো ডিসেম্বরে বিয়ে করবে।

বর্ণালীর বিয়ের সব দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন আরতি। কেনাকাটা , নেমন্তন্ন এই সব হাজার কাজের মধ্যে রোজ পায়ের আসন গুলো নিয়মিত করা হত না। বিয়ে নির্বিঘ্নে মিটে গেলো। কিন্তু তারপরই ওনার পা দুটো একেবারে অচল হয়ে পড়ল। 

প্রথম দিকে সকাল বিকালের নার্স রাখা হয়েছিল । কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই বোঝা গেলো আরতি দেবীর এই সমস্যাটা সহজে ঠিক হবার নয়। তাই তখন লতাকে রাখা হল। 

বর্ণালী আর দিব্যেন্দু প্রথম দিকে নিয়মিত আসত। তারপর যা হয়, আস্তে আস্তে সংসারের চাপে আসা যাওয়া কমতে লাগলো। পরেরদিকে শনি বা রবিবার বর্ণালী এসে দেখা করে যেত। 

বিয়ের বছর খানেক পর দিব্যেন্দুকে অফিস থেকে আমেরিকাতে একটা অ্যাসাইনমেন্টে যেতে বলল দু বছরের জন্য। সঙ্গে বর্ণালীকেও যাবার অফার দিলো। ওরা দুজনেই এসেছিল আরতি দেবীর কাছে। বর্ণালীর চোখ লাল, “ আমি ওকে বলেছি তুমি যাও আমি যাব না।“ আবার টপ টপ করে মেয়ের চোখ থেকে জল পড়তে লাগলো। দিব্যেন্দু অসহায়ের মত চুপ করে বসে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,” তাহলে থাক , যেমন চলছে চলুক।“ 

“ তোরা অত চিন্তা করিস না। আমি ঠিক থাকব। লতা আছে, ডঃ বোস আছেন। উনি এসে আমাকে নিয়মিত দেখে যাবেন। আর দুটো তো বছর, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। “ বলেছিলেন আরতি দেবী। 

তারপর পাঁচ বছর কেটে গেছে। দিব্যেন্দু নতুন চাকরি নিয়েছে। বর্ণালী চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। ওদের একটা মেয়ে হয়েছে, মিতিন। তার এখন সাড়ে তিন বছর বয়স। খুব মিষ্টি করে কথা বলে ভিডিও চ্যাটে ,” দিদুন, বাও আচ?” 

প্রতি সপ্তাহে ভিডিও চ্যাট করে ওরা। প্রতি মাসে ওরা ব্যাঙ্কে টাকা পাঠিয়ে দেয়। প্রতি বছর আসবে বলে কিন্তু কোন না কোন কারণে আসা হয়না। প্রথম বছর বর্ণালী অন্তঃসত্ত্বা ছিল, দ্বিতীয় বছর মিতিন খুব ছোট ছিল। এই করে করে পাঁচ বছর কেটে গেলো। এবার ওরা আসবে বলেছে। দুর্গা পুজোতে। 

আরতি দেবী লতাকে দিয়ে সব কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন।  “ গোলাপি চাদরটা পাতবি ওদের বিছানায়। বাথরুমে গোলাপি তোয়ালে। জানিস তো ওদেশে মেয়েরা গোলাপি আর ছেলেরা নীল রঙের জিনিষ ব্যবহার করে। আমার মিতিন রানী তো গার্ল, তাই সব পিঙ্ক। “

পর্দা বদলানো হয়েছে, ও ঘরের টি ভি টা ঠিক করানো হয়েছে। বাড়ীতে সাজো সাজো রব। ডঃ বোস চেক আপ করতে এসে অবাক,” কি ব্যাপার ম্যাডাম? বাড়ির তো হুলিয়া বদলে ফেলেছেন একেবারে?”

“আমার নাতনী আসছে যে!“ এক গাল হেসে উত্তর দিলেন আরতি দেবী।

“তাহলে তো ওষুধপত্র আর বেশি লাগবে না মনে হয়।“ হাসলেন ডঃ বসু। উনি এখন মোটামুটি বাড়ির লোকই হয়ে গেছেন। লতার আনা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন,” জোকস অ্যাপার্ট, নাতনী আসলেও , অনিয়ম করা কিন্তু চলবে না। ঠিক আছে?”

“আচ্ছা বাবা আচ্ছা!” বললেন আরতি দেবী। 

সকাল সকাল হুইল চেয়ারে করে বারান্দায় এসে বসেছেন উনি। শরতের ঝকঝকে রোদ, ফুরফুরে হাওয়া, নিচে পাড়ার পুজোর প্যান্ডেল বাঁধা হচ্ছে। মিতিন দিদিভাই কে নিয়ে এইখান থেকে পুজো দেখবেন উনি। কত গল্প বলবেন, মা দুর্গার, রাজা রানীর। কল্পনার লোকে চলে যান উনি। টেলিফোনটা বেজে উঠলো। আনন্দে নেচে ওঠে ওনার মনটা। আজ নিশ্চয়ই আশার তারিখটা বলবে ওরা। লতা ফোনটা তুলে কথা বলছে। কথা বলেই চলেছে। কি এতো কথা বলছে? 

“লতা, ও লতা! কি এতো বক বক করছিস? ফোন টা দে না?”

লতা মুখটা ব্যাজার করে ফোনটা নিয়ে এসে ওনার হাতে দিয়ে “ কতা বল, আমার হয়েছে জ্বালা! ” , বলে ধুপ ধাপ করে পা ফেলে চলে গেলো।

“ চলন দেখ ! কোন লক্ষ্মীশ্রী নেই ..। হ্যাঁ বল। কবে আসছিস?” আরতি দেবীর গলা থেকে আনন্দ ঝরে পড়ছে।

খানিক স্তব্ধতা,“ মা ... আমরা এবারও আসতে পারছি না। আসলে তোমার জামাই মিতিন কে Orlando তে Walt Disney র যে পার্ক টা আছে সেটা দেখাতে চায়। এটা একটা lifetime experience.” তুমি বুঝতে পারছো তো মা?”

আরতি দেবী নীরব। 

“মা আমরা ওখান থেকে তোমার সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করবো। আসলে আমরা একটা ভালো ডিল পেয়েছি ... তাই ...” বর্ণালীর কণ্ঠস্বর অপরাধীর মত শোনালো। 

ঝন ঝন করে কিছু একটা ভাঙল রান্না ঘরে। 

“পরের বছর সিওর আসবো মা ... মা শুনতে পাচ্ছ? আর তোমার টাকাটা ব্যাঙ্কে...”

“ কি ভাঙলি লতা?” চেঁচিয়ে উঠলেন আরতি দেবী। “ শোন এখন আমি রাখছি। দেখি লতা আবার কি ভাঙল ...” ফোনটা রেখে দিলেন আরতি দেবী।

লতা এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দার দরজায়। মাথা চুলকোতে চুলকোতে বলল,” একটা ক্ষতি করেছি বৌদি।“

“কি করলি আবার?” একরাশ বিরক্তি আর রাগ নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আরতি দেবী।

“আমার চায়ের কাপটা , জানলার ওপর রাখতে গিয়ে হাত ফসকে পড়ে গেলো...”

“ তুই ওই সবুজ বড় কাপটা নিয়ে নে।“

“ওটা তো দিদির কাপ?” বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলো লতা। 

চিরকালই কাজের লোকদের চায়ের কাপ আলাদা এবাড়ীতে। আরতি দেবীর শাশুড়ির আমল থেকে চলে আসছে এই নিয়ম। সাধারণত একটু কান ভাঙ্গা কোন কাপই দেওয়া হয় ওদের , আর সেগুলো রাখা হয় জানালার কাছে।

“হোক দিদির কাপ। আজ থেকে তুই ওই কাপেই চা খাবি। আর শোন কাপটা জানালার পাশে না, বাসনের তাকে তুলে রাখবি। বুঝলি? ” গলাটা কান্নায় কেঁপে উঠলো আরতি দেবীর। লতাকে কাছে ডেকে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,” তুই কি আমার মেয়ে না?” ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন আরতি দেবী।


aparna.chaudhuri9@gmail.com


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-