বুধবার, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

বদিউর রহমান

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ৩১, ২০১৮ |
সব ভুলে যাচ্ছি, কিন্তু...
প্রতিদিন অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ আগের কথাই ধরুন না, একটা বাজারের থলে নীচে আমাদের দারোয়ানের হাতে দেওয়ার ছিল। নীচে গিয়ে তপনের দোকানের পাশে দশ নম্বর ট্যাংকের বাস স্টপেজের সুন্দর করে সাজানো সিটে প্রায় আধ ঘণ্টা বসে বিভিন্ন মডেলের গাড়ির আসা-যাওয়া এবং সেক্টর ফাইভে কর্মরত স্মার্ট ছেলেমেয়েদের যুগলে ঘরে ফেরা দেখে ফেরার সময় মনে পড়ল, থলেটা সঙ্গে নিয়ে নামতে ভুলে গিয়েছি। থলে না হয় কিঞ্চিৎকর বস্তু, সেটা আগামীকাল দিলেও চলবে। কিন্তু গত সপ্তাহে ইরান সোসাইটির ফাউণ্ডেশন ডে-উদযাপনে প্রাক্তন বিচারপতি চিত্ততোষ মুখার্জি ও আরও এক প্রাক্তন বিচারপতি শ্যামল সেন মহাশয়ের বক্তব্য শোনার জন্যে প্রত্যয় করেছিলাম যে, সেখানে যাব। আমি তৈরি হয়ে অধ্যাপক ফিরোজকে ফোন করলাম। বললেন, ‘ওটা তো গতকাল হয়ে গেছে; আপনাকে দেখব আশা করেছিলাম’। শুনে আমি শরমে মরি। আজকাল এমন ভুলও করছি।

সত্যি বলছি, আজকাল প্রায়শঃ আমার ভুল হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বসে কোনোএকটা বইয়ের খোঁজে পাশের ঘরে গিয়ে ভুলে যাচ্ছি, ওখানে কেন গেলাম। সে-ঘর থেকে ফেরৎ আসার পর, টেবিলে বসার কিছুক্ষণ পরে মনে পড়ছে সেই বইটার নাম যেটার সন্ধানে ও-ঘরে গিয়েছিলাম। পরীক্ষার খাতা দেখার জন্য লাল কালির কলমটা কোথায় রাখলাম, আর খুঁজে পাই না। দোকান থেকে আবার লাল কালির কলম কেনার পর যে-খাতাগুলো দেখা হয়ে গিয়েছিল তার ভেতর থেকে হঠাৎ পুরাতন কলমটা বেরিয়ে মেঝেতে পড়ে আমার দিকে চেয়ে হাসতে থাকে। দেখুন না, গতকাল থেকে এক বিরল প্রতিভাধর ব্যক্তিত্বের কথা ভাবছিলাম। মনে পড়ছিল, বিভিন্ন ভাষায় তাঁর বুৎপত্তির কথা বিশেষতঃ আরবি-ফার্সি ভাষায় অপূর্ব দখলের কথা; এমনকি মুয়াল্লাকা-র টীকাসহ ব্যখ্যা ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ আরবি লেখনীর কথা। আরও মনে পড়ছিল, স্যার আশুতোষের সঙ্গে কোনো কারণে মতানৈক্য হওয়ায় তাঁদের একে অপরের মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ছিল। ভাবছিলাম, ওঁদের মত বিরল প্রতিভাধর মানুষদেরও মতানৈক্য হয়, যার পরিণামে দূরত্বও সৃষ্টি হয়। এটাকে কি 'স্টার ওয়ার' বলা যায়? অনেক কিছুই ভাবছিলাম। আর চিন্তা করছিলাম, সেই প্রতিভার উপর ক’টা লেখা পড়েছি এবং কোন পত্রপত্রিকায়। সেই বিরল ব্যক্তিত্বের ছবিটাও স্মৃতিপটে ভেসে উঠছিল। কিন্তু কেন জানি না, ওঁর নামটা কিছুতেই স্মরণ করতে পারছিলাম না। সেই বিখ্যাত স্যার ‘হরিনাথ দে’ ধরা দিলেন পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টা পরে। যদিও তার আগে ওঁর সুঠাম চেহারাটার প্রতিচ্ছবি বারবার এবং লাগাতার মাথার মধ্যে ফ্ল্যাশ করে যাচ্ছিল।

মাঝে মাঝে অনুশোচনা হয়, শিক্ষকতা করতে স্মরণ শক্তি প্রখর থেকে প্রখরতর হওয়া উচিৎ। কিন্তু আমার এরকম ভুল ভ্রান্তি কেন হচ্ছে! এবার কি সময় হল, পড়ানো থেকে অবসর নেওয়ার। ভাবি, শল্য চিকিৎসকরাও একটা সময়ের পর আর নিজের হাতে অপারেশন করেন না; নিজের হাতে তৈরি করা ছাত্রদেরকে অপারেশন করতে দিয়ে নিজে পাশে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করেন। ভাবি, আমারও কি সেই সময় আগত! পরক্ষণে নিজেকে আশ্বস্ত করি এই বলে যে, শল্য চিকিৎসায় ভুল হলে রোগীর প্রাণ সংশয় হয়। আর আমার শিক্ষকতায় ভুল ভ্রান্তি হলে, ছাত্রদের সেই রকম প্রাণহানির মত ভয়ের কিছু নেই। খুব জোর তত্ত্বগত ভাবে কিছু ভুল শিখবে; মারা তো যাবে না। ছাত্রদের সামনে আমার ভুলে যাওয়ার কথা বললে, ওরা বলে, 'স্যার বয়স হয়েছে তো, তা বয়সকালে ওরকম ভুল হয়'। প্রায় প্রতিদিন দু' একজনে স্মরণ করিয়ে দেয়, আমি বৃদ্ধ। শিয়রে যমদূত দাঁড়িয়ে। তা আমার ছাত্ররা ভালো থাকুক; দীর্ঘজীবী হোক। কিন্তু ওদেরকে যখন বলতে শুনি ‘অনেক পাঠ্য বিষয় ভুলে যাচ্ছি’; আর পরীক্ষার আগে তো প্রায় প্রত্যেকটা ছাত্রের ঐ অভিযোগ, ‘স্যার সব ভুলে যাচ্ছি’; ভিতরে ভিতরে পুলকিত হই, যুবকরাও তো ভুলছে! তাহলে আমাকে বাড়িতে কেন শুনতে হয় 'মতিভ্রম' হচ্ছে বলে। কখনো আবার সাধু ভাষায়, 'বয়স্কালে ভাম হচ্ছে' কথাটা শুনতে হয়। ভ্রম শব্দটার অপভ্রংশ হয়ে হয়েছে ভাম- যেটা আমার মত বয়স্কদের শুনতে হয়। কিন্তু যুবকদের ভুলে যাওয়ার জন্য কোনো শব্দ ব্যবহার হয় কি না, আমার জানা নেই।

পড়ানোর সময় নির্দিষ্ট পাঠ্য বিষয় পড়াতে গিয়ে অনেক সময় অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকদের প্রসঙ্গ ও তাঁদের উক্তি রেফারেন্স হিসাবে উদ্ধৃত করার সময় ছাত্রদের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা প্রায়শঃ প্রকাশ পায়। এমনকি আরবি শব্দের ব্যাখ্যায় কোর’আন শরীফের আয়াতের উদ্ধৃতি দিতে গিয়েও অধিকাংশ ছাত্রদের মধ্যে কোর’আনিক জ্ঞানের অভাব দেখতে পাই। কখনো কখনো আক্ষেপ করে বলি মুতানাব্বি, মা’আররি, উমার বিন আবি রাবিয়া এমনকি লম্পট ইমরাউল কায়েসকে কেন আমার স্মৃতিতে এই বয়সেও ধরে রাখতে হবে। আমারতো এখন আল্লাহর নামে তসবিহ জপ করার কথা অথচ আমাকে উদ্ধৃতি দিতে হচ্ছে ‘ওমা যারাফাত আইনাকে ইল্লা...’ অথবা ‘তাসদু ও তুবদি আন আসিলিওঁ’ অথবা মুতানাব্বির ‘ওয়া শাকিইয়াতি ফাকদুস সাকামে...’ ইত্যাদির। ঐ জাতীয় কবিতাবলীর বিশেষ অংশগুলোতো যুবক ছাত্রকুলের জিভের ডগায় থাকার কথা; কবিদের রসজারিত কথাগুলোতো প্রাণের কথা বলে মনে রাখা উচিত তাদের। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেনে’র “চুলতার কবে কার...”-এর বর্ণনার সঙ্গে একযোগে ‘ওয়া ফার’ইন ইয়াযিনুল মাতনা আসওয়াদা ফাহিমিন...’ উল্লেখ করতে গিয়ে ছাত্রদের সবকিছু ভুলে যাওয়া দেখে অবাক হই। অনেক দুঃখে তাদের বলি “যতদিন না একটা চাকরি পাচ্ছ ততদিন অন্ততঃ সবকিছু স্মৃতিতে ধরে রাখার চেষ্টা করো। চাকরি পাওয়ার পর না হয় সব ভুলে যেও। আর যদি শিক্ষতার চাকরি কর তাহলে তোমার ক্লাসের ছাত্রদের বলো ‘তোমরা সবাই নিজে নিজে পড়ো। কেউ চিৎকার-হট্টগোল করবে না’। তারপর তুমি মোবাইলে ডুবে যেও। যেমন মাঝে মধ্যেই ক্লাসে করে থাক। তবুও ওরা ভোলে; পাঠ্য বিষয় ভুলতে যেন ওদের ভাল লাগে। ওরা ভুলে গেলে কোন অপরাধ নয়; আমি শিক্ষক বলে সব কিছু মনে রাখাটা যেন আমারই দায়িত্ব। ওরা বুঝতে চায়না আমিও রক্তমাংসের মানুষ। ওদেরই মতো কাতুকুতু দিলে হাসি, ব্যাথা দিলে কষ্ট পাই। যদিও সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অমোঘ ব্যাথাকে ভুলে কষ্টটা লাঘব করতে চাই। হয়তো কিছু ব্যাথা ভুলতে পারার মধ্যে আছে জীবনের স্পন্দন। তবুও স্বীকার করি অষ্টাদশী কন্যার জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত স্মৃতিপটে প্রায়শঃ ভেসে উঠে প্রমাণ করে এখনও আমার স্মৃতিশক্তি প্রখর। হয়তো ঐ স্মৃতির ভারে অন্যান্য অনেক কিছুতে ভুল করি। অনেকে বলেন ওটা বয়সের জন্য স্বভাবজনিত ভুল। আমি বলি আমার ক্ষেত্রে তাদের ঐ ধারণাটাই ভুল।

ব্যাথাতুর জীবনের অনেক ক্ষেত্রে ভুল করি। বিশেষতঃ নামাযে। কোন্‌ সুরাটা পড়লাম, ক’রেকাত পড়লাম, দোওয়া-কুনুত পড়লাম কি না, মনে থাকে না। নিবিষ্ট চিত্তে নামায পড়া হয়না আর। ঐ সময় কেন জানিনা মনটা ‘তার’ স্মরণে আরও ভারাক্রান্ত হয়ে পদে পদে ভুল করে বসি। ভাগ্যিস অন্যেরা বুঝতে পারেনা। শুধু বুঝি আমি ও আমার আল্লাহ। অবশ্য কয়েকটা ব্যাপারে আমার স্মৃতি খুব প্রখর। আবার অন্য কয়েকটা ব্যাপারে সমধিক দুর্বল ও ভঙ্গুর। যখন কারও কাছ থেকে কোন কারণে টাকা ধার নিই, সে ব্যাপারটা অবলিলাক্রমে ভুলে যাওয়াটা আমার চারিত্রিক দোষ। অন্যদিকে আমার কাছ থেকে কেউ টাকা ধার নিলে সেটা ভুলি না। এই রকম ঋণ গ্রহিতার লিস্টে চার পাঁচ জনের কথা ভুলেও ভুলিনা। এখানে শুধু একজনের কথা উল্লেখ করব।

তখন ইলিয়ট হস্টেলে থাকি। দিনটা ছিল রবিবার। তারই মধ্যে রবিবার হস্টেলের ভালমন্দ খেয়ে দুপুরের ঘুমের তোড়জোড় করছি। এমন সময় তেরো নম্বর রুমের দরজায় কয়েকটা টোকার আওয়াজ। দরজা খুলে দেখি বছর আঠারোর এক ছেলে। জিজ্ঞেস করল “বদিউর নামে কে এখানে থাকেন?” বললাম ‘আমি। আমি বদিউর রহমান। তা কী হয়েছে?’ বলল “আপনার এক আত্মীয় নুরুল হক নাম। এখন হাওড়া ষ্টেশনের লোকআপে; বিনা টিকিটের যাত্রী বলে। উনি ফাইনের টাকা দিতে পারেননি। আপনাকে খবর দেওয়ার জন্য আমাকে ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়েছেন। আপনাকে দেড়শো টাকা বা সমতুল্য মূল্যের কিছু নিয়ে গিয়ে উনাকে ছাড়াতে বলেছেন। তা না হলে আগামীকাল কেস উঠলে আরো বেশি সাজা হতে পারে”। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা তোমাকে কী করে পেলেন?’ বলল “আমি এভাবে খবর দেওয়ার কাজ করে কিছু ইনকাম করি।” আমি আমার আত্মীয়দের মধ্যে ওই নামের কোন ব্যাক্তি খুঁজে পাচ্ছিলামনা। তাই একটু সন্দেহ হচ্ছিল যে, আমাকে কোনোভাবে কেউ ফাঁসাতে চাইছে না তো? হাওড়ার ঐ ফাটকটার অবস্থান আমার জানা ছিল। ভাবলাম ঐ জায়গায় আমাকে কেউ কাবু করতে পারবে না; আর তখন আমার চেহারাটা ছিল আরো সুঠাম। রুমমেট মুফিজকে বললাম “আমি যাচ্ছি, সন্ধ্যার পরেও না ফিরলে আমার খোঁজ করো।”

হাওড়ার অকুস্থলে পৌছে অনতিদূরে ফাটকের পেছনে দেখি নুরুল দা। উনি আমার থেকে দু’বছর সিনিয়র। ‘মুম্‌তায’ (স্নাতকোত্তর সমতুল্য) পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবাসী কলেজে বি.এ. তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। বললাম, ‘এ কি নুরুল দা! আপনার এ দশা কেন?’ বললেন, “আগে টাকা পয়সা মিটিয়ে আমাকে এখান থেকে বের কর তারপর সব বলব”। টাকা মিটিয়ে দিয়ে উনাকে ফাটক থেকে মুক্ত করলাম। সেখান থেকে বের হয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে পড়লেন। তারপর চা খেতে খেতে বললেন, “অন্যান্য দিন শিয়ালদহ দিয়ে যাওয়া আসা করি। এক দঙ্গল ছাত্র-ছাত্রীর সঙ্গে হৈ হৈ করতে করতে শিয়ালদহের গেট দিয়ে বের হই। টিকিট চেকাররা সমীহ করে সরে দাঁড়ায়। আজ রবিবার, ইংরেজির অধ্যাপক পরীক্ষা সন্নিকটে বলে এক্সট্রা ক্লাস নেবেন। তাই কলেজ যাচ্ছিলাম। সকালে ভাবলাম আজ তো অন্যান্য ছাত্রদের ট্রেনে পাব না। তাই পাড়ার এক চাকরিজীবীর মান্থলিটা নিয়ে হাওড়া দিয়ে আসছিলাম। জুলিয়াস সিজারের বই ও ডাইরিটা বুকের কাছে ধরে হাওড়া ষ্টেশনের গেট দিয়ে বের হওয়ার সময় চেকার টিকিট চেয়ে বসল। তাঁর কথায় কান না দিয়ে মেজাজে বেরিয়েও গিয়েছিলাম। ছকরা চেকারটা দৌড়ে এসে পথ আটকে বলল ‘টিকিট’। ঝাড়লাম দু’চারটে ইংরেজি। চেকার একটুও না দমে বলল ‘টিকিটা দিন’। মান্থলিটা একটু বের করে পকেটে ঢুকাতে চাইলে উনি বলেলন ‘ওটা আমার হাতে দিন’। দিলাম। জিজ্ঞেস করলেন ‘কী নাম’? আসল ব্যক্তির নামটা জানা ছিল তাই ঠিকই বললাম। এবার জিজ্ঞেস করলেন ‘বয়স’? বয়সটা তো লক্ষ্য করিনি। অতএব বয়স বলতে ভুল করলাম। আবার চেষ্টা করলাম ইংরেজি ঝেড়ে যদি রেহাই পাই। দেখলাম, কাজ হল উল্টো। রেগে গিয়ে বললাম ‘ক্লাসে দেরী হয়ে যাচ্ছে আমাকে টিকিটটা ফেরৎ দিন’। উনি বললেন ‘ও রবিবারেও ক্লাস! তা ছাত্র যদি স্টুডেন্টস মান্থলী নেই কেন? যেটা দিয়েছেন ওটা তো সাধারণ যাত্রীর মান্থলী। দু’টোর রংই তো আলাদা হয় তা জানো হে ছোকরা’।” নুরুল দা বললেন, ‘যখন ছোকরা বলল তখন মেজাজটা উঠল চরমে। দিলাম ইংরেজিতে বেশ কয়েকটা ব্রজবুলি। ও বাবা দেখি কি কালো কোটের পকেট থেকে বিল বই বের করে বলছে পঞ্চাশ টাকা ফাইন। সঙ্গে মাত্র গোটা পঁচিশ টাকা। এবার অনুরোধ করতে শুরু করলাম। বললেন ‘যত পারো ইংরেজি ঝাড়ো ফাইনটা দাও, না হলে ফাটকে দেব’। শেষ পর্যন্ত যা হল তা তো তুই চাক্ষুস করলি। যাক তোর টাকাটা আগামীকালই দিয়ে দেব।” সেই টাকাটা বিগত চল্লিশ-পয়তাল্লিশ বছরেও নুরুল দা’র ফেরৎ দেওয়ার সময় হয়নি। শিক্ষকতা করে আমার আগে রিটায়ার করেছেন। আমার টাকাটার কথা উনি ভুলেই গেছেন। আমি কিন্তু ভুলিনি। ঐরক দু’চারটা কেস আরও আছে। কিন্তু প্রত্যেকটা ডিলই আমার স্মৃতিতে এখনও জলজল করছে। কোনোটাই ভুলিনি। বললাম না আমি কারো কাছে টাকা পেলে সেটা ভুলি না। সেরকম আরেকটা জিনিষও আমি ভুলি না। এবার সে কথাটা চুপিসারে আপনাকে বিশ্বাস করে বলছি, জানি আপনি এই কথাটা পাঁচ-কান করবেন না। তা হল সুন্দরীদের মুখ। কত সুন্দর মুখ যে স্মৃতিপটের অ্যালবামে সযত্নে লুকিয়ে রেখেছি তা বলার নয়। হয়তো ওদের জন্যে কবির কথা ধার করে বলা যায় “ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি না...” মনের গভীর কুঠুরিতে এমনভাবে লুকোনো যে, আমার স্ত্রীর মত চালাক রমণীও তার হদিস আজ পর্যন্ত পায়নি। অন্যদের কথা তো কোন ছার। এ ব্যাপারে উর্দু কবির উক্তি “চান্দ তাসবীরে বুতাঁ, চান্দ হাসীনো কে খুতুত/ বাদ মারনে কে মেরে ঘার সে ইয়ে সামাঁ নিকলা” অনুযায়ী আমার ঘর থেকে সেরকম কিছু পাওয়া যাবে না হলফ করে বলতে পারি। তবে, সুন্দরীদের ভুলতে না-পারার কারণ হল, বড় বড় কবিদের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমিও নিজের অজান্তেই সুন্দরের পূজারী হয়ে বসে আছি। চল্লিশ বছর আগে ইংরেজির এক অধ্যাপক দু-দু’টো ক্লাসে বুঝিয়েছিলেন ‘বিউটি ইজ ট্রুথ, ট্রুথ বিউটি’। ছোট্ট ঐ দু’টো কথার মধ্যে যে ব্যাপক দর্শন নিহিত হয়তো তা সম্যক গ্রহণ করতে পারিনি। তা হলেও ‘বিউটি ট্রুথ’-এর অংশ বিশেষ আমাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই আমি আজও সৌন্দর্যের পূজারী। কিছুটা প্রকৃতির সৌন্দর্যের; কিন্তু অনেকটা সুন্দরীদের রূপের। নিষ্পাপ, নিষ্কলঙ্ক, স্বর্গীয় রূপের পূজারী হলে দোষ কোথায়! উর্দু কবি সারসার সালানি তো বলেছেন- “মেরে তাসবীহ কে দানে হ্যাঁয় ইয়ে সারে হাসীঁ চেহরে/ নিগাহেঁ ফিরতি জাতি হ্যাঁয়, ইবাদাত হোতি জাতি হ্যায়”। আমি অবশ্য তাদেরকে স্মরণ করা-কে কখনই ইবাদতের মর্যাদা দান করিনি। তবে সুন্দর মুখগুলোকে এখনও ভুলিনি। ভোলা যায়ও না। ও ব্যাপারে স্মৃতিভ্রম–মতিভ্রম কিছু হয় না আমার! উর্দু-ওয়ালারা বলেন “আপনি আদাত সে মাজবুর হ্যাঁয় হাম”। প্রবচনটা হয়তো আমার ক্ষেত্রে সম্যক প্রযোজ্য। এবার সেই সিক্রেটটা বলি- আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দরী হলেন আমার মা। আর দ্বিতীয়জন সালমা; যে আমার একমাত্র কন্যা ছিল। এদেরকে ভুলি না। ভুলতে পারি না। ভোলা যায়ও না...। 

matin.cu@gmail.com

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-