রবিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

সঞ্জীব সিনহা

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ |
সিন্ধুমাসির সিন্দুক
সিন্ধুমাসির নিজের বলতে কেউ নেই, গ্রামের গোঁসাইবাড়ির এক কোনে পরিত্যক্ত ঘরটায় থাকে, থাকে মানে কোন রকমে বেঁচে আছে। সে অনেক বছর আগের কথা, অমিতেশ্বর গোঁসাইয়ের বিয়ের পাঁচ বছর কেটে গেলেও যখন বউ কাত্যায়নীর পেটে বাচ্চা এলো না শাশুড়িমা নাতির আশায় বউমাকে নিয়ে সাধুবাবার আশ্রমে নিয়ে গেল, তাবিজ পরালো, কিন্তু কোন ফল হলো না। শাশুড়ির আদেশে পাড়ার নাপতিনী রাধির সঙ্গে তারকেশ্বরে গিয়ে কাত্যায়নী সন্তান কামনায় বাবা তারকনাথের মাথায় জল দিয়ে এল। অমিতেশ্বরের বাবা ছেলেকে ডেকে চুপি চুপি বলল, “শোন অমু, তোর মা বংশধরের কামনায় বৌমাকে নিয়ে ঠাকুর দেবতা, তাবিজ, তুক তাক যা করে করুক, তুই বাপু বউমাকে নিয়ে একবার বর্ধমানে ডাক্তার দেখিয়ে আন।“ বাবার কথায় অমিতেশ্বর তার স্ত্রীকে নিয়ে বর্ধমানে ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তারবাবু উভয়কেই পরীক্ষা করে বিধান দিলেন। তা বাবা তারকনাথের কৃপায় হোক বা ডাক্তারবাবুর হাতযশের ফলেই হোক মাস তিনেকের মাথায় জানা গেল কাত্যায়নী মা হতে চলেছে। যথা সময়ে ঘর আলো করে কাত্যায়নীর কোলে এক পুত্রসন্তান এল। শাশুড়ি বাবা তারকনাথের নামে তার আদরের নাতির নাম রাখল তারক। ওদিকে কাত্যায়নীর বাবা তাঁর কন্যা ও নবজাতকের সেবা শুশ্রূষা ও দেখভাল করার জন্য সেই গ্রামেরই এক দরিদ্র পরিবার সদানন্দ চাটুজ্জের সদ্যবিধবা কন্যা সিন্ধুবালা দাসীকে বেয়াই বাড়ি পাঠালেন। 

সিন্ধুবালা এক অতি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, তেরো বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে তার বাবা নিজেকে কন্যাদায় মুক্ত করেন। কিন্তু বিধাতার পরিহাস, বিয়ের তিন মাসের মধ্যেই কয়েক দিনের জ্বরে তার স্বামীর মৃত্যু হয়। অপয়া অপবাদ দিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলে সে আবার তার গরীব বাবার কাছেই ফিরে আসে। কাত্যায়নীর শ্বশুরবাড়িতে তার একটু স্থান হওয়ায় সে বাঁচার আলো দেখতে পায়। এখানে সিন্ধুবালা তার নিজের সন্তানের মতই তারককে কোলে পিঠে করে লালন পালন করতে লাগলো। তারক কথা বলতে শিখলে সিন্ধুকে মাচি বলে ডাকতো। মায়ের থেকে মাসির কাছেই তারকের আবদার বেশি ছিল। দিনেরবেলা সব সময় মাসির কাছে থাকত। রাতে শোবার সময় শুধু তার মায়ের কাছ তারক ঘুমাত। তারককে নিয়ে রোজ একটু করে ঘুরতে যেতে হবে, বিকাল হলেই তারক সিন্ধুবালার কাছে গিয়ে বলে, “মাচি, বেলা চল”, ওকে নিয়ে বেড়াতে না বেরলেই কান্না। একটু বড় হলে তার আবদার - মাসি আমাকে গুলি কিনে দাও, ঘুরি কিনে দাও, মাসির সঙ্গে বসে লুডো খেলবে এবং মাসিকে তারকের কাছে হারতে হবে। সিন্ধু তারককে যেমন ভালবাসত তেমনি তারকের খেলার সঙ্গীসাথীদেরও ভালবাসত। ধীরে ধীরে পাড়ার সব ছোট ছোট ছেলে মেয়ের কাছে সিন্ধুবালা তাদের প্রিয় সিন্ধুমাসি বা মাসি হয়ে গেল। তারকের যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তারকের ঠাকুরদা ও ঠাম্মা মোক্ষলাভের আশায় গঙ্গাসাগরে যান, তারা আর বাড়ি ফিরে আসেনি, শোনা যায় গঙ্গাসাগর থেকে ফেরবার সময় নৌকা ডুবিতে তাদের মোক্ষ লাভ হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে অমিতেশ্বরের দুতিন বিঘে জমি ছিল, তার ভাগ চাষ থেকে যা পেতো আর যজমান বাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে শাকটা মুলোটা যা আসতো তা দিয়ে তাদের কোন রকমে চলে যেতো। গ্রামের মন্দিরে নিত্যপুজো এবং যজমান বাড়ির পুজোআর্চা করে নৈবদ্যর যে চালটা পেত সেটাও কিছুটা সুরাহা করত। যখন অমিতেশ্বর ছোট ছিল বাবার সাথে বছরে বার তিনেক বিভিন্ন শিষ্যবাড়ি যেত, শিষ্যবাড়ি থেকে ফেরবার সময় ঝুড়ি ও পুঁটলি ভর্তি গুরুবিদায়ী জিনিসপত্র আসতো। বাবার অবর্তমানে অমিতেশ্বরই এখন শিষ্যদের কুলগুরু,সেও বছরে কয়েক বার শিষ্যবাড়ি যায়, ধনী শিষ্যবাড়ি হলে তারককেও নিয়ে যায়, ওখানে বাবার সাথে ছেলেরও নতুন জামা কাপড় মেলে। এই ভাবেই বেশ চলছিল। একবার বর্ষা শেষে শিষ্যবাড়ি থেকে ফেরবার সময় বাড়ির কাছেই একটা খালের ধারে সর্পাঘাতে অমিতেশ্বরের মৃত্যু হয়। তারক তখন খুবই ছোট, অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। বাড়িতে মা, ও তার মাসি ছাড়া আর কেউ নেই, এখন তারকের ওপরেই সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ল। 

বাবার অবর্তমানে যযমানবাড়ির পূজাগুলো যাতে বজায় থাকে সেই জন্য তারক পাশের বাড়ির ভটচাযদাদুর কাছে পূজাপাঠ শিখে নিল। তারককে পূজাপাঠ শিখিয়ে তার ভটচাযদাদু বলে দিলেন, “ তারকদাদুভাই, তুই মন দিয়ে পূজাপাঠ কর, কিন্তু ইস্কুলের পড়াশোনা ছাড়িস না, পড়াশোনা করলে জীবনে ঠকবি না।“ প্রথম দিন মন্দিরে পুজো করে এসে তার মাকে তারক বলল, “জানো মা, মন্দিরে পুজো করতে ঢোকার আগে ভয় ভয় করছিল, ভাবছিলাম আমি ঠিকমত পুজো করতে পারব তো? তারপর রঘুবীরকে স্মরণ করে মনে জোর এনে পুজো করলাম, পুজো করার পর মনটা বেশ ভালো লাগছিল।“ তারক মন্দিরে ও যযমানবাড়ির পূজাপাঠের সাথে ইস্কুলের পড়াশোনাও চালিয়ে গেল। সিন্ধুবালা কাত্যায়নীকে বলল, ’’দিদি, তুমি চিন্তা কোরো না, আমি তো আছি। আমি ছোটবেলায় মায়ের সাথে গ্রামের লোকেদেরর কাঁথা সেলাই করতাম, মুড়ি ভেজে দিতাম। তা থেকে যা মজুরী পেতাম তা দিয়ে আমাদের সংসার খরচের কিছুটা সুরাহা হোতো। এখানেও আমি বাড়ির সব কাজ সেরে লোকেদের কাঁথা সেলাই করে, মুড়ি ভেজে কিছুটা উপায় করব, আর যজমানবাড়ির পুজোর যোগার করতে ডাক পেলে তাও করে দেব। এসব থেকে যা পাব তা দিয়ে আমাদের সংসারের কিছুটা সুরাহা হবে। দেখো ঠাকুরের কৃপায় আমাদের না খেয়ে মরতে হবে না।“ সময়ের সাথে ধীরে ধীরে সব কিছু ঠিক হয়ে গেল, তবে মাধ্যমিকের পর তারক আর এগোতে পারেনি। তার বাপ ঠাকুরদার মতন সেও পুরোহিতগিরি ও গুরুগিরিতেই পূর্ণ মনোনিবেশ করলো। বছর তেইশ বয়সে তাদের পাশের গ্রামের পরাণ চাটুজ্জের মেয়ে অভয়ার সাথে তারকের বিয়ে হল। বিয়ের পর প্রথম কয়েক বছর মা, বউ, আর মাসিকে নিয়ে তারকের সংসার সুখে শান্তিতেই চলছিল। কাত্যায়নী ও সিন্ধুবালা যেমন তাদের বৌমা অভয়াকে আদর যত্ন করত, অভয়াও তার শাশুড়িমা আর মাসিকে সেবা যত্নের কোন ত্রুটি রাখত না। 

তারকের বিয়ে হয়েছে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল, অভয়ার এখনও কোন ছেলেপিলে হয়নি। ডাক্তার দেখানো হয়েছিল, ডাক্তার বলেছিল অভয়ার কোন দোষ নেই, তারকের চিকিৎসার প্রয়োজন। অনেক অনুরোধ করেও অভয়া তারককে তার চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে পাঠাতে পারেনি। সিন্ধুবালার এখন বয়স হয়েছে , শরীর ভেঙ্গে গেছে, এখন আর আগের মতন অত কাজ করতে পারে না। অভয়ার কাছে সে এখন একটা অবাঞ্ছিত বাড়তি বোঝা। অভয়ার কাছ থেকে সিন্ধুবালা দুবেলা দুটো খেতে পায় ঠিকই কিন্তু তার সঙ্গে জোটে কারণে অকারণে নানা গঞ্জনা। কাত্যায়নীরও বয়স হয়েছে, মুখে কিছু না বললেও সে নিজেও অভয়ার কাছে এখন একটা বাড়তি ভার। সব দেখেও কিছু বলতে পারে না, মুখ বন্ধ করে সব সহ্য করতে হয়। তারকও এখন পালটে গেছে, যে মাসি তাকে নিজের ছেলের মতন কোলে পিঠে করে বড় করে তুলল বউ এর কথায় এখন আর তার ধারে কাছে যায় না, খোঁজও করে না যে মাসি দুবেলা খেতে পাচ্ছে কিনা বা মাসি কেমন আছে। অযত্নে ও বিনাচিকিৎসায় সিন্ধুবালার অসুস্থতা ক্রমশ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেল। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক সিন্ধুবালাকে রোজ একবার করে দেখে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে যেতেন, তিনি তারককে বললেন, ”আমি বাপু ভালো বুঝছিনা, তুমি তোমার মাসিকে কোন পাশ করা ভালো ডাক্তার দেখাও।” 

সিন্ধুবালা এখন বুঝে গেছে যে তার দিন এবার শেষ হয়ে আসছে। সন্ধ্যায় খাবার দিতে আসার সময় অভয়ার সাথে আজ তারকও মাসিকে দেখতে এসেছে। তারককে দেখে সে বলল, “তারক, আমি বুঝতে পারছি আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে, আমি মরে গেলে তিরপেণীর গঙ্গার ঘাটে তুই আমার মুখে আগুন দিস। আর একটা কথা আমার ছেরাদ্দের দিনে পাড়ার বাচ্চাছেলেগুনোকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াবি।“ এই কথা শুনে অভয়া মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠল, - ও মুখে আগুন দেবে দিক, আমাদের অত ট্যাকা পয়সা নেই, কাউকে খাওয়াতে টাওয়াতে পারব না বলে দিলুম, হ্যাঁ। 

– না বৌমা তোমাদের খরচ করতে হবে না, আমার ওই টিনের বাক্সোটায় যা আছে মনে হয় ওতেই হয়ে যাবে।

এবার অভয়া তারককে বলল, - নাও, শুনলে তো? তোমার মাসীর ওই সিন্দুকে নাকি অনেক ট্যাকা পয়সা আছে, ওদিয়েই ওনার ছেরাদ্দের খরচ হয়ে যাবে। 

এর দিন পাঁচেক পরে এক দিন সকালে সিন্ধুবালার ঘরে খাবার রেখে “খাবার দিয়ে গেলাম, এবার খেয়ে উদ্ধার কর” বলে চলে আসার সময় অভয়া দেখল মাসি হাঁ করে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে আর তার চোখ মুখের ওপর মাছি ভনভন করছে। সে মনে মনে ভাবল, বুড়িটা টেঁসে গেল নাকি। মাসি মাসি বলে কয়েকবার ডেকেও সাড়া না পেয়ে সে তারককে ডেকে নিয়ে এল। তারক মাসিকে ডেকে সাড়া না পেয়ে মাসির হাতটা ধরে নাড়াতে গিয়ে দেখে শরীর একদম ঠাণ্ডা, মাসি অনেক আগেই তাদের ছেড়ে চলে গেছে। সিন্ধুবালার শেষ ইচ্ছানুযায়ী ত্রিবেণীর গঙ্গার ঘাটেই তার শেষ কাজ সম্পূর্ণ হল। পরের দিন সকালে চা খেতে বসে অভয়া তারককে বলল, - তোমার আদরের মাসিতো চলে গেলো, নাও এবার মাসির ছেরাদ্দের ট্যাকা পয়সা যোগার কর। 

- হ্যাঁ, তাতো করতেই হবে। মাসি বলে গেছে পাড়ার বাচ্চাগুলোকে খাওয়াতে, তাও যাহোক করে করতে হবে। দেখ, রঘুবীরের কৃপায় সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। 

- হ্যাঁগো, মাসির টিনের বাক্সোটা খুলে দেখ না ওর ভিতরে কি ধন সম্পত্তি মাসি রেখে গেছে যা দিয়ে নাকি ওনার ছেরাদ্দের সব খরচ মিটে যাবে। 

- চল, দেখি গিয়ে মাসির ওই মান্ধাত্তা আমলের মরচে পরা টিনের বাক্সোটায় কি আছে। একটা হাতুড়ি নিয়ে যাই, চাবি কোথায় আছে জানি নাতো, যদি চাবি না পাই, তখন তালাটা ভাঙ্গতে কাজে লাগবে।

সিন্ধুবালার ঘরে ঢুকে তারক মাসির বিছানার তলা, ঘরের এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে বিছানার মাথার দিকে কুলুঙ্গিটাতে রাখা একটা মাকালীর ছবির পাশে লালফিতে দিয়ে বাঁধা একটা চাবি পেল। সেই চাবিটা দিয়ে মাসির বাক্সের তালা খোলার চেষ্টা করতেই সহজেই খুলে গেল। বাক্সর ভেতরে ওপরেই রয়েছে একটা বিয়ের ছবি, হয়ত মাসি আর মেসোর বিয়ের ছবি, কয়েকটা কাপড়, আর কাপড়ের নীচে একটা ছোট থলিতে রয়েছে সোনার একটা হার, একজোড়া দুল, একটা আংটি ,আর একটা নাকছাবি। পাশেই আর একটা কাপড়ের ভাঁজে রয়েছে বেশ কিছু দশটাকা পঞ্চাশ টাকা আর একশ টাকার নোট, একটা পাউডারের কৌটো ভর্তি খুচরো টাকা পয়সা। গয়নার থলিটা তার বউ এর হাতে দিয়ে তারক টাকাপয়সাগুলো মেঝের এক পাশে ঢেলে গুণতে আরম্ভ করল। বেশ কয়েক বার গুণে দেখল মোট এগারো হাজার তিনশো পঁয়ত্রিশ টাকা হয়েছে। তারক অভয়াকে বলল – তুমি তাচ্ছিল্য করে বলছিলে মাসির সিন্দুকে নাকি অনেক টাকা পয়সা আছে। দেখ মাসির এই টিনের মরচে পড়া বাক্সটাকে তুমি সিন্দুক বল আর যাই বল মাসি এতে যা রেখে গেছে তা দিয়ে ভালো ভাবে মাসির শ্রাদ্ধের কাজ করে , মাসির কথা মত পাড়ার ছেলেপুলেদের খাইয়েও অনেক থেকে যাবে। 

ssanjibkumar@gmail.com

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-