রবিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

ঋতুপর্ণা রুদ্র

শব্দের মিছিল | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ |
অসূরদলনী
!!১!!

আজ দুদিন থেকে মেয়েটার সাথে দেখা নেই, মনটা বড় খারাপ হয়ে আছে। রোজ বারান্দায় এসে দাঁড়াই, চোখ চলে যায় পাশের বাড়ির দিকে, দেখি বাবলুকে, বাবলুর পিসি নীপাকে, ওর বাবা বিপিনবাবুকে, যে যার মত বেরোচ্ছে ঢুকছে। ওদের দোতলার বারান্দা আমার শোবার ঘরের মুখোমুখি, কত দিন সেখানে দাঁড়িয়েই কথা বলেছি খুকুর সাথে কিন্তু এখন একবারও দেখিনা। খুকু নামটা আমার দেওয়া, ওর আসল নাম ময়ুরাক্ষী বিশ্বাস, সেটাও অবশ্য আমারই দেওয়া।

খুকুর মা স্বপ্না আমার খুব বন্ধু ছিলো, খুকু হতে হাসপাতালে গেলো, যাবার সময়ে তাকে সাহস দিলাম। নিজে তো মা হতে পারিনি মনটা খারাপ হয়ে ছিলো। স্বপ্না জড়িয়ে ধরেছিলো আমাকে “বাবুই, যে আসছে সে তোরও সন্তান হবে, একদম মন খারাপ করবিনা।” 

চোখে জল মুখে হাসি টেনে বিদায় জানিয়েছিলাম ওকে। বিকেলে দেখতে যাব এই কথা হয়ে রইলো দুই বান্ধবীতে। কর্তাকে নিয়ে বিকেল পাঁচটা না বাজতেই ছুটেছিলাম জেলা হাসপাতালে, গিয়ে দেখি বিপিনবাবু মুখ কালো করে বসে আছেন, স্বপ্নার অবস্থা খুব খারাপ, ঘণ্টা দুএক আগে মেয়ে হয়েছে, সে অবশ্য ভালো আছে।

সেরাতেই মারা যায় স্বপ্না, অনেক রক্ত দিয়েও বাঁচানো যায়নি ওকে। দুদিন পরে খুকুকে নিয়ে বাড়ি ফিরলেন বিপিনবাবু। বড্ড বিপদের মধ্যে ছিলেন, স্ত্রীর শোক, বাবলু তখন বছর ছয়েকের, তাছাড়া খুকু। খুকুর ঠাকুমা অবশ্য সঙ্গেই থাকেন তবুও তার পক্ষেও পুরো সংসার আর দুটি বাচ্চা দেখা সম্ভব ছিলো না। ছাপোষা কেরানি বিপিনবাবুও লোকজন রাখতে অপারগ। এই অবস্থায় খুকুর দায়িত্ব পুরোটাই নিয়েছিলাম আমি, আমার কাছে এনেই রাখতাম, এমনকি রাতেও। বিপিনবাবু অফিস থেকে ফিরে ওকে নিয়ে যেতেন, রাতে আবার নিয়ে আসতাম। কর্তা মাঝেমাঝে বকাবকি করতেন, বলতেন পরের সোনা কানে দিতে নেই, মানতে পারতাম না, ছোট্ট একটা মুখের হাসি, কান্না, আদর সব গোলমাল করে দিত, কিন্তু কর্তার কথাটাই ঠিক সেটা পরে বুঝেছিলাম।

!! ২ !!

আজ মোড়ের দোকানে হলুদ আনতে গেছি, দেখি বিপিনবাবু। সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, “দাদা, খুকুকে দেখতে পাচ্ছিনা কেন? ওর কি হয়েছে?”

অন্যদিকে তাকিয়ে অপরিসীম ক্লান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “ওর শরীরটা ভালো নেই। বাইরে বেরোচ্ছে না।”

“কি হয়েছে ওর? ডাক্তার দেখিয়েছেন? বাইরে কেন বারান্দাতেও তো দেখি না।”

“ডাক্তার দেখাইনি, নীপা ওষুধ দিয়েছে, আপনি চিন্তা করবেন না।”

দাদার গমনপথের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, নীপা ওষুধ দিয়েছে মানে কি? নীপা কি ডাক্তার? বাড়ি এসে সারা সকাল মন উচাটন হতে লাগলো, একবার ভাবলাম যাই খুকুকে দেখে আসি, কিন্তু নীপার মুখ মনে করে সাহস হোল না, জানি গেলেও দেখা করতে দেবেনা।

খুকুকে নিয়ে আমার ফাঁকা জীবনটা যখন মায়াময়, আর খুকু ক্লাস টু তে উঠেছে, তখন ওই বাড়িতে নীপার আগমন। সম্পর্কে সে বিপিনবাবুর আপন বোন, অল্পবয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন বর্ধমানের এক সচ্ছল পরিবারে। দুই ছেলে, বর নিয়ে নীপার সাজানো সংসারে বিপিনবাবুদের তেমন যাওয়া আসা ছিলোনা। বড়লোকের ঘরণী গরিব দাদার সাথে তেমন সম্পর্ক রাখতেও চাইতো না, এসবই আমার স্বপ্নার কাছ থেকে শোনা। সেবার পুজোর ছুটিতে সপরিবারে নীপা গিয়েছিলো হরিদ্বার হয়ে দেরাদুন মুসৌরি । পথে এক বাস দুর্ঘটনায় নীপার সাজানো বাগান ধূলিসাৎ, নীপাসহ বাসের প্রায় তিরিশ জন কম বা বেশি আহত, কেবল মারা গেছে তিনজন ওর দুই ছেলে আর বর। ফিরে এসে শ্বশুরবাড়িতে আর জায়গা হয়নি ওর, এমন অপয়া বৌমাকে পত্রপাঠ দাদার সংসারে পৌঁছে দিয়ে গেলেন ওর এক ভাসুর।

যে বাপেরবাড়ির সাথে গরিব বলে সম্পর্কই রাখতো না নীপা, নিয়তির পরিহাসে সেখানেই ফিরতে হোলো ওকে। ওর শ্বশুরবাড়ি অবশ্য ওর ভাগের কিছু টাকাপয়সা ওকে দিয়েছিলো, তবে বাড়ি বা স্থাবর সম্পত্তি কিছু পাবে না, এবং কোনপ্রকার যোগাযোগ রাখা যাবে না এটাও জানিয়েছিলো। ঠিক বলতে নীপার আগমনে প্রথমে আমার মনটা মায়ায় ভরে উঠেছিলো, ভাইবোনের একই রকম কপাল। এই সংসারে এসে নীপা নিশ্চয় আঁকড়ে ধরবে বাবলু আর খুকুকে এমনই ভেবেছিলাম। কদিন যেতেই বুঝলাম নীপা অন্য ধাতুতে তৈরি, নিজের টাকাপয়সার জোরে ও সবার ওপরে ছড়ি ঘোরাতে লাগলো। বাবলু আর খুকুর ওপরে শুরু হোল কড়া শাসন। মাসিমা আর বিপিনবাবু দুজনেই মুখচোরা শান্ত প্রকৃতির, খুব কিছু বলতে পারতেন না।

আমাকে প্রথম থেকেই বিষচোখে দেখেছিলো নীপা, ওদের বাড়িতে যখন তখন আমার আসা যাওয়া, খুকুর প্রতি ভালোবাসা, সব কিছুর ওপরই দাঁড়ি টেনে দিলো ও। সেই থেকে আমি আর যাইনা ওই বাড়ি। খুকু আসে মাঝেমাঝে স্কুল যাওয়া আসার পথে, কখনো বারান্দা দিয়ে দুচারটে কথা বলে। ভালো কিছু রান্না করলেই ওর জন্য রেখে দিই, খেতে বড় ভালোবাসে মেয়েটা। বারো বছর বয়স হলেও মনে মনে শিশুই রয়ে গেছে। এই বাড়িতে এলে ‘মণিমা’ বলে আমার গলা জড়িয়ে ঝুলতে থাকে। ওর কি হয়েছে জানতেই হবে আমাকে।

পরদিন সকালে কাপড় মেলতে গিয়ে দেখলাম, নীপা বাড়ির সামনে থেকে রিকশা ধরে বেরোলো, মাসের প্রথম, বোধহয় ব্যাংকে যাচ্ছে বা অন্য কাজে। এই সুযোগে আমিও ওবাড়িতে ঢুকে পড়লাম। দরজা খুললেন বিপিনবাবু, আমাকে কিছু বলার আগেই আমি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছি, পিছন থেকে উনি বলে চলেছেন “বৌদি, বৌদি, শুনুন ও ঘরে যাবেন না, খুকুর শরীর ভালো নেই…”

আমি দাঁড়ালাম না, ভেবেই এসেছি আজ কোন কথা শুনবো না। দোতলায় ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম, সব জানলা বন্ধ, দিনের বেলাতেও আলো জ্বলছে, খাটের ওপরে শুয়ে আছে খুকু নাকি খুকুর ছায়া। রোগা, ম্লান, কান্না ভরা অসুস্থ মুখ। আমাকে দেখে ক্ষীণ গলায় ডেকে উঠলো “মণিমা…”

খাটে বসে জড়িয়ে ধরেছি ওকে, সারা গায়ে কালশিটে আর কাটার দাগ, কোথাও কোথাও ব্যান্ডএইড লাগানো, দুচোখ দিয়ে জল পড়ছে ওর, কান্নার দমকে কেঁপে উঠছে খুকু আমার বুকের ভিতরে..


!!৩!!

তুলিকে যখন ফোন করি, ও তখনসবে আউটডোর শেষ করেছে। তুলি আমার ছোটবেলার বন্ধু, ডাক্তার আর আমার পিসতুত দাদার বৌ। “তুলি তুই এখনই আমার বাড়ি আয়, ঘণ্টা খানেকের বেশি লাগবে না, খুব খুব দরকার।”

আমার আর্তস্বর তুলিকে কিছুক্ষণ স্তব্ধ করে দিলো, “বাবুই কি হয়েছে! কার কি হয়েছে! দীপদা ঠিক আছে তো? খুব আর্জেন্ট হলে হসপিটালে ভর্তি করে…”
“আমরা ঠিক আছি, খুকু ঠিক নেই… কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করবো না, তুই আয় শিগগির।” 

ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিট বাদে তুলির গাড়ি আমার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো। আমার একতলার শোবার ঘরের বড় খাটে খুকুকে শুইয়েছি, বিপিনবাবু খুকুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। অল্প কথায় তুলিকে সব বুঝিয়ে আমরা বাইরে এসে দাঁড়ালাম। মিনিট পনেরো বাদে তুলি বাইরে এলো, গম্ভীর মুখ, বললো “নরপিশাচটা কে?”

চোখে জলভরা তবুও সব খুলে বললাম। বছরখানেক ধরে খুকু অঙ্ক করতে যায় সুদেব স্যরের কাছে, ফেরে রাত আটটা নাগাদ। সপ্তাহে তিনদিন বিপিনবাবু গিয়ে ওকে নিয়ে আসেন। সেদিন বিপিনবাবু এক সহকর্মীর বাড়িতে অনুষ্ঠান উপলক্ষে দেরি হবে, নীপা খুকুকে একাই ফিরে আসতে বলে। সুদেব স্যরের বাড়িটা হাঁটাপথে প্রায় আধ ঘণ্টা। বড়রাস্তা দিয়ে অটো ধরে না ফিরে খুকু ভিতরের রাস্তা দিয়ে একাই হেঁটে ফিরছিলো। বোসেদের পুকুরের কাছে রাস্তাটা নির্জন, পুবে বন্ধ হয়ে যাওয়া রেমিংটন কারখানার লম্বা টানা প্রাচীর, কোথাও কোথাও ভেঙেও পড়েছে। ওই অবধি আসার পরের হাল্কা বৃষ্টি নেমেছিলো, খুকু আধো অন্ধকারে তাড়াতাড়ি হাঁটছে এমন সময় সাক্ষাত যমদূত এসে রাস্তা আগলে দাঁড়ালো। বাইক থামিয়ে সেই পিশাচ খুকুর মুখ চেপে কারখানার পাঁচিলের ওপারে নিয়ে গিয়ে চরম অত্যাচার করে ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় ফেলে পালিয়ে যায়। আর হ্যাঁ কারোর কাছে মুখ খুললে প্রাণে মারার হুমকিও দিয়েছে সে।

তুলি মুখ তুললো এতক্ষণে, খুকুর বয়সি ওরও একটা মেয়ে আছে.. “বিপিনবাবু এই ঘটনা তো অন্তত তিন চার দিনের পুরনো, আমি জানতে চাই এতদিন আপনারা ডাক্তার দেখাননি কেন? পুলিশ ডাকেন নি কেন? আজ বাবুই আমাকে ডাকলো, ব্যাপারটা কি?”

“ব্যাপারটা আমি বলছি”, কখন আমার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে নীপা, আমরা সবাই চমকে তাকালাম। “মেয়ের তো যা হবার হয়েছে, এখন বাইরের লোককে, ডাক্তারকে পুলিশকে ডাকলে লজ্জার আর কিছু বাকি থাকবে না। সবাই ছিছি করবে, পুলিশ আর টিভির লোকেরা এসে বাড়ির মাটি নেবে। সে সব সামলাবে কে শুনি! তারচেয়ে কদিন শুয়ে থাকলে আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। আমি তো ওকে ব্যাণ্ডএইড লাগালাম, ব্যাথার ওষুধও দিয়েছি। দাদা তোমাকে বলেছিলাম না চুপচাপ থাকতে, কিসের জন্য বাইরের লোকদের এত কথা বলেছো?”

নীপার মেজাজি গলা শুনে ভেতরে যেন বিস্ফারণ হোল আমার।

“শোনো নীপা, স্বপ্না মারা যাবার সময়ে খুকুর বয়স ছিলো এক দিন, সেই ছোট্ট বাচ্চাটাকে মানুষ করেছিলাম, বড় করেছিলাম আমি, এই বাবুই সেনগুপ্ত। আমিই ওর মা, বাইরের লোক নই। তখন কোথায় ছিলে তুমি? শ্বশুরবাড়ি থেকে কদিন এসে ভাইপো ভাইঝির খোঁজ নিয়েছিলে বুকে হাত দিয়ে বলোতো। আজ খুকুর এতবড় বিপদে একটা ডাক্তার অবধি দেখাওনি, সেপটিক হয়ে ও মরেও যেতে পারতো, আবার ঝগড়া করতে এসেছো?” এতটা বলে হাঁফিয়ে পড়ি আমি। তুলি ব্যাটনটা তুলে নেয়।

“শুনুন নীপাদেবী, আপনারা স্বার্থপরের মত চরম অন্যায় করেছেন এই বাচ্চাটির সাথে, ওর বাইরের ক্ষত তো সারাতেই হবে, আর সেটা কটা ব্যান্ডএইড লাগিয়ে হবে না। সেই সাথে ওর বেশ কিছু ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন জরুরী, ও প্রেগন্যান্ট হয়ে থাকতে পারে। প্রথমেই জানা গেলে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সেসব না করে চাদর চাপা দিয়ে ঘর বন্ধ করে ওকে শুইয়ে রেখে কিছু আটকানো যাবে না। আর বিপিনবাবু আপনি শিক্ষিত লোক হয়ে, ওর বাবা হয়ে এরকম কাজ করলেন কি করে?”

“আমি সত্যিই বড় অন্যায় করেছি, সেদিন বাড়ি ফিরে বৃষ্টির মধ্যে ওকে খুঁজতে গিয়ে দেখি ওই অবস্থায় পুকুরের ধার থেকে ফিরে আসছে।” ভাঙা গলায় হাহাকার করে উঠলেন দাদা। “নীপা বললো লোক জানাজানি করা যাবে না, আমি আর বাবলুও মেনে নিলাম।”

“ঠিক আছে, আপাতত এই ওষুধগুলো চলবে, এগুলো আনানোর ব্যবস্থা করুন। আগামীকাল সকালে আমার ল্যাব থেকে একজন মেয়েকে পাঠাবো, ওর ব্লাড ইউরিনের স্যাম্পল নিয়ে যাবে। আশাকরি রিপোর্ট ঠিক আসবে।” তুলি চলে যাবার জন্য ব্যাগ নিয়ে ওঠে।

বিপিনবাবু হাতজোড় করেন, “দিদি আপনাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবো! চিকিৎসা বাবদ যা খরচ হবে আমি বৌদির কাছে দিয়ে দেবো। তবে পুলিশে যেতে বলবেন না দয়া করে। ওই গুণ্ডাটা তো রোজই বাইক দাঁড় করিয়ে, কারখানার ভিতরে ঢুকে বসে মদ খায়। আমার মেয়েটা তো এসব জানতো না, ওই রাস্তা দিয়েই ফিরছিলো তাই। এইটুকু বাচ্চাকে নিয়ে থানা পুলিশ আদালত, লোক জানাজানি, এত চাপ আমরা নিতে পারবোনা।”

আমি আর তুলি চোখ চাওয়াচাওয়ি করি, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও আমাকে ওষুধগুলো বুঝিয়ে হাসপাতালে ফিরে যায়। তাকিয়ে দেখি খুকু কখন ঘুমিয়ে পড়েছে, ওর গালে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ।

!!৪!!

গত সাতদিন ধরে আস্তে আস্তে খুকু ভালো হয়ে উঠছে। ওর রিপোর্ট সব ভালো আমরা যা ভয় পেয়েছিলাম তেমন কিছু নেই তবে মনের ক্ষত কিভাবে সারাবো জানি না। ওর স্কুলে বিপিনবাবুকে দিয়ে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছি, আশা করছি সামনের সপ্তাহ থেকে স্কুলে যাবে। ওকে ভালো ভালো রান্না করে খাওয়াই, গল্পের বই পড়ে শোনাই, সাহস দিই। নীপা নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলো পরিস্কার বলেছি সম্পূর্ণ সুস্থ না হলে খুকু যাবে না। নীপা আমাকে সমঝে চলে আর কিছু বলেনি, বললে ওকে পুলিশের ভয় দেখাতাম। কর্তা এখন ছোট ঘরটায় শোয় রাত্তিরে, বড় ঘরটা খুকুর আর আমার।

বিয়ের পরে প্রথম যখন এই পাড়ায় আসি, এই অঞ্চলে তখন বাড়িঘরের সংখ্যা নিতান্ত নগণ্য। চারদিকে খালি জমি, পুকুর, মাইলখানেক দূরে রেমিংটনের কারখানা। সেই সময়ে কারখানার বিখ্যাত শ্রমিক নেতা ছিলো গজানন রায়, কারখানায় নিত্য শ্রমিক অশান্তি লেগেই থাকতো। শোনা যেত গজাননের সাথে কলকাতার বড় বড় নেতা মন্ত্রীদের দহরম মহরম। এই গজাননের ছেলে তিলু বা তিলক রায় সেই সময়ে গুণ্ডামিতে দীক্ষা নিচ্ছে। বাইক নিয়ে রাস্তায় ঘোরা, মহিলাদের দেখে টিটকারি, টিকেট ব্ল্যাক থেকে, তোলাবাজি সব কিছুই করতো। কারখানা বন্ধ হয়ে যাবার পরে তিলু এই অঞ্চলের ত্রাস হয়ে ওঠে। বাপের কথাও সে আর শুনতো না। বছর ছয়েক আগে একটা মারপিটের ঘটনায় দুদলের মারামারিতে নিত্য বলে একটা ভবঘুরে ছেলের প্রাণ চলে যায়, খুনের মামলায় নাম জড়িয়ে যায় তিলুর। শুনেছিলাম জেলও হয়েছিলো কিন্তু বছর খানেক ধরে এই অঞ্চলে আবার তিলুকে দেখেছি নিয়মিত। সম্ভবত তার বাবা তাকে জামিনে ছাড়িয়ে এনেছে।

খুকুর সাথে আদর করে কথা বলতে বলতে যেদিন ওর অত্যাচারী হিসেবে তিলু গুণ্ডার নাম শুনলাম, কেঁপে উঠেছিলাম। তিলুর বয়স অন্তত চল্লিশ বেয়াল্লিশ, আড়ে বহরে বিশাল চেহারা, ওজন একশ কেজি হবেই। এই ছোট ফুলের মত রোগা মেয়েটা না জানি কত কষ্ট পেয়েছিলো ভেবে সেদিন খুকুর সামনেই আমি কেঁদে ফেলি। খুকুই আমার পিঠে হাত রেখে আমাকে সান্ত্বনা দেয়। ইদানীং খুকুকে রোজ বোঝাই ওকে স্কুলে যেতে হবে, স্বাভাবিক হতে হবে। মুখে হ্যাঁ বললেও ও কেমন ভয়ে শিঁটিয়ে থাকে, জানিনা কবে স্বাভাবিক হবে।

খুকুকে ছেড়ে বেরোই না আজকাল তবে আজ একটা জরুরী কাজ ছিলো তাই সন্ধ্যেবেলা বেরোতেই হোল। বিকেল থেকেই রিমঝিম বৃষ্টি, গায়ে একটা বর্ষাতি চাপালাম, ভিতরদিকে গলায় ঝোলানো ব্যাগে কয়েকটা জরুরী জিনিস। ছাতা নিয়ে হেঁটেই গেলাম, ফিরতে রাত আটটা বেজে গেলো। এসে দেখি কর্তা সবে ফিরে স্নান করছেন, বৃষ্টির জন্য আজ ট্রেন দেরিতে চলছে। সব গুছিয়ে গেছিলাম। চটপট কটা বেগুনি ভেজে, মুড়ি মেখে তিনজনে জমিয়ে খেলাম চা সহযোগে। রাতে মুসুরডালের খিচুড়ি আর ডিমভাজা খেয়ে বহুদিন বাদে তলিয়ে গেলাম শান্তির ঘুমে।

সকালবেলায় কর্তা আর খুকু দুজনেই খবরের কাগজ নিয়ে ভাগ করে পড়ে, আমি রান্নাবান্নায় ব্যস্ত থাকি সময় পাইনা। হঠাৎ দেখি খুকু মণিমা মণিমা বলে খুশি খুশি গলায় ডাকছে।

“কি হয়েছে রে খুকু?”

“মণিমা আমি ক্লাল থেকে স্কুলে যাবো, মেসো তুমি অফিস থেকে এসে আমাকে পড়িও, সব পড়া ভুলে গেছি।”

আমি আর কর্তা মুখ তাকাতাকি করছি এমন সময়ে, খুকু বললো “এইদিকে দেখো মণিমা।”

দেখি খবরের কাগজের ভেতরের পাতায় একটা ছোট খবর। ‘নিত্যলাল খুনের মামলার জামিনপ্রাপ্ত অপরাধী তিলক রায়, গতকাল বাইক অ্যাক্সিডেন্টে সাংঘাতিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। প্রচন্ড বৃষ্টিতে সম্ভবত বাইকের চাকা স্কিড করে গেছিলো, এছাড়া অ্যাক্সিডেন্টের অন্য কোন তথ্য জানা যায়নি। তিলকের বাবা প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা গজানন রায় পুলিশকে জানিয়েছেন তার ছেলে পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী এবং তিলকের বিপদে পার্টি তার পাশে থাকবে এটা তার স্থির বিশ্বাস। এই বিষয়ে পার্টির অন্য কোন নেতা এখনো কোন মতামত জানাননি। দুর্ঘটনায় দুটি পা বাদ চলে যাবার কারণে তিলকের প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং ৭২ ঘণ্টার আগে ডাক্তাররা সুস্পষ্ট ভাবে কিছু জানাতে অক্ষম।”

বুঝলাম এই খবরটা দেখেই আমার খুকু বুকে বল পেয়েছে, ওর চুলের ঝুঁটিটা একটু নেড়ে আদর করে বলি “নিশ্চয় যাবি খুকু, কাল আমি নিজে তোকে স্কুলে পৌঁছে দেবো। আজ থেকে কিন্তু পড়াশোনা করতে বসবে।”

ওর উজ্জ্বল চোখ আর হাসিমুখের মাথা হেলানো দেখে রান্নাঘরে ফিরে আসি। গ্যাসের পাশে একটা ছোট ব্যাগে এখনো রয়েছে দুচারটে যন্ত্রপাতি, যেগুলো দিয়ে কাল একটা বাইকের দুটো চাকারই ব্রেকের তার আলগা করে দিয়েছিলাম। ব্যাগটা চিলেকোঠার তোরঙ্গে জায়গামত রেখে এসে মন দিয়ে রান্না করি। আজ খুকু মাংসভাত খেতে চেয়েছে।

ritu_rudr@yahoo.co.in


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-