রবিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ | |
সিরিয়াল কিলার
না, এ লেখা কোন রোমহর্ষক ধারাবাহিক খুনের বৃত্তান্ত নয় । আবার হ্যাঁও বটে । মানুষের বোধ, রুচি, যুক্তিবোধ ও স্বাভাবিক মননশীলতার ধারাবাহিক খুনের বৃত্তান্ত তো বটেই । বলছি বাঙালির ঘরেলু বিনোদনের নয়া মাধ্যম বাংলা টেলি সিরিয়ালের কথা । টেলি সিরিয়ালের বিষয়ে আমরা সোশাল মিডিয়া বা গণমাধ্যমে বিশেষ আলোচনা করি না । ‘ওসব ছাইপাঁশ আমি দেখি না, সময় নেই’ বলে এড়িয়ে যাই । বায়ু দূষণ, শব্দদূষণ কিংবা ভেজাল খাদ্য নিয়ে আমাদের উদ্বেগের শেষ নেই, থাকাই উচিৎ । কিন্তু বিনোদনের নামে জীবনসম্পর্কহীন বাংলা টেলি সিরিয়ালগুলো কি বিষ ছড়াচ্ছে, যারা নিরুপায় হয়ে দেখেন তাদের জীবনবোধ, বিচারবুদ্ধি ও স্বাভাবিক মননশীলতাকে দিনের পর দিন ভোঁতা করে দিচ্ছে, সমাজদেহকে বিষাক্ত করছে তার বিরুদ্ধে আমাদের অনেক কিছুই বলার আছে, আমরা বলি না । আমার মনে হয় এড়িয়ে না গিয়ে এবার কিছু বলার সময় হয়েছে । দিনের পর দিন নিঃপাপ শিশুকে দিয়ে অভিনয়ের নামে ষড়যন্ত্র করাচ্ছে তার মা, নায়ক-নায়িকার তিনবার করে বিয়ে হচ্ছে,শাশুড়ি-ননদের লাগাতার ষড়যন্ত্র হচ্ছে – এরকমই বাংলার সমাজ ? ১৩ই সেপ্টেম্বর রাত্রে জি বাংলার 'অন্দরমহল' সিরিয়ালে এক কিশোরীকে দিয়ে লিঙ্গবৈষম্যমূলক মন্ত্যব্যের সংলাপ বলানো হল । মেয়েটি তার নবজাতক ভাইয়ের প্রতি ঈর্ষা প্রকাশ করছে লিঙ্গবৈষম্যমূলক সংলাপ বলে । কে চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন ? আর কেউ নন, লিখেছেন মাননীয়া লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি আবার রাজ্য মানবাধিকার কমিশনের কর্তাব্যক্তি । সিনেমার ক্ষেত্রে সেন্সর ব্যবস্থা আছে, কিন্তু একই গোত্রের হলেও টেলিসিরিয়ালের কোন সেন্সর ব্যবস্থা নেই । চ্যানেলওয়ালারা পরদায় একটা স্ট্রিপ চালিয়ে দেন “এই কাহিনীর মধ্যে কেউ যদি বাস্তব ঘটনার কোন মিল খুঁজে পান তা অনিচ্ছাকৃত... ইত্যাদি । ব্যস, দায়মুক্ত ! ‘রাণী রাসমণি’ সিরিয়ালে পরদায় লিখে দিচ্ছেন ‘এটি একটি কল্পিত কাহিনী’ অর্থাৎ চিত্রনাট্যকারের যথেষ্ঠ পরিমান গঞ্জিকা সেবনের ছাড়পত্র আছে । রানী রাসমণি৯, রাজচন্দ্র দাসরা ঐতিহাসিক চরিত্র, কাল্পনিক হয় কিকরে !

কয়েকদিন আগে প্রযুক্তিকর্মী ও শিল্পীদের সঙ্গে সিরিয়াল নির্মাতাদের বিরোধের ফলে দিন পাঁচেক সিরিয়াল-উৎপাৎ বন্ধ ছিল । অবশ্য সেই যুদ্ধং দেহি ব্যাপারটা যে নেহাতই এলেবেলে গট আপ খেলা ছিল সেটা আর গোপন থাকেনি, ঝাঁকের কই ঝাঁকেই ফিরেছিল । তো সেই সময় সিরিয়াল নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কেউ কেউ ঝাপিয়ে পড়ে বলেছিলেন সিরিয়ালের অ-দর্শকরাই নাকি চাইছেন টেলি সিরিয়াল বন্ধ হোক কয়েক হাজার টেকনিশিয়ানদের রুজি বন্ধ হোক । এক প্রথম সারির কবি তো ফেসবুকে পোষ্ট দিলেন যে তিনি সিরিয়াল দেখেন না, কিন্তু তার গৃহ পরিচারিকার ছেলে সিরিয়ালের টেকনিশিয়ান তার যদি কাজ চলে যায় তাই তিনি উদ্বিগ্ন । আর এক সিরিয়াল কাহিনীকার তো বলেই দিয়েছিলেন হ্যাঁ তাঁকে সিরিয়ালের আজেবাজে কাহিনী লিখতে হয় টাকার জন্য, যে টাকায় তিনি তাঁর থিয়েটারের লোকসান সামাল দেন ।

না, কেউই চান না টেলিসিরিয়াল সম্প্রচার বন্ধ হোক । তাঁরা চান জীবনসম্পর্কহীন, শুধুই ষড়যন্ত্র, একজনের তিন/চারটে বিয়ে, বাপের বিয়ে – এইসব অসুস্থ্য মানসিকার কাহিনী নির্ভর সিরিয়ালগুলো বন্ধ হোক, কাহিনীতে আসুক জীবনের ছোয়া, তার হাসি-কান্না, বিষাদ-আনন্দ আর জীবনের সুস্থ্য ছবি । বাংলার সাহিত্যভান্ডারের প্রতি সিরিয়াল নির্মাতারা মুখ ঘুরিয়ে থাকবেন কেন ?

এই নিবন্ধকার এ দেশে টেলিভিশনের প্রবর্তন সময়ের সাক্ষি, সাক্ষি টেলি-বিনোদনের বেড়ে ওঠার নান পর্যায়েরও । ভারতীয় সাহিত্যে জীবনধর্মী সাহিত্যের অভাব নেই । তাই অতীতে আমরা পেয়েছি সাহিত্যনির্ভর অসামান্য সব টেলি সিরিয়াল । তমস, মালগুডি ডে’স, মুজরিম হাজির, ব্যোমকেশ বক্সি, নুক্কড়, সার্কাশ, গণদেবতার মত কত মনে রাখার মত সিরিয়াল । আর ওম পুরি, নূতন, অনিল চ্যাটার্জী, উৎপল দত্ত, ফারুখ সেখদের অভিনয় দেখেছি সেইসব সিরিয়ালে । আজকের মহা তারকা শাহরুক খানের অভিনয় জীবন শুরু হয়েছিল দূরদর্শন সিরিয়াল ‘সার্কাস’ থেকে । তখন দূরদর্শনের যুগ । নব্বইএর দশক থেকে অবস্থাটা পাল্টাতে শুরু করলো দ্রুত । শুরু হল বিনোদনের কর্পোরেটায়ন । 

এ দেশে সাধারণের জন্য টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয়েছিল ১৫ই অগস্ট ১৯৮২ থেকে, প্রধানত বিরাশির এশিয়ান গেমসের সম্প্রচারকে সামনে রেখে । শুরুতে অনুষ্ঠান বলতে কৃষিকাজের অনুষ্ঠান, খেলা ও নানান শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান । তখন একটাই টেলিভিশন সম্প্রচার বন্দোবস্ত – সবেধন নীলমণি দূরদর্শনের ন্যাশনাল চ্যানেল । টিভি দর্শকদের জন্য বিনোদন বিতরণের বন্দোবস্ত হল আরো দু বছর পরে । আজ যে নানান ভাষায় টিভি সিরিয়াল এতো লোকপ্রিয় হয়েছে, যার টানে আফিং’এর নেশার মত আচ্ছন্ন হয়ে ঘরবন্দী হতেও সম্মত হয়েছে সে, তার কিছু কৃতিত্ব দাবী করতে পারেন তখনকার কেন্দ্রীয় সম্প্রচার মন্ত্রী প্রয়াত বসন্ত শাঠে । ১৯৮২তে মেক্সিকো সফরে গিয়ে মেক্সিকান টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ‘ভেন কনমিগো’ বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষামূলক একটি জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিক দেখেন । শাঠে অতঃপর ভারতের টেলিভিশনে এমন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন । শাঠের পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করলেন লেখক মনোহর শ্যাম যোশি ও পরিচালক পি কুমার বাসুদেব আর প্রতিটি পর্বের শেষে সেই পর্বের মেসেজ ব্যাখ্যা করার জন্য এলেন প্রবাদপ্রতীম অভিনেতা অশোক কুমার, আর সঙ্গীত নির্দেশক ছিলেন আর এক প্রবাদপ্রতীম সঙ্গীতকার অনিল বিশ্বাস । জন্ম নিল ভারতের প্রথম ছোট পর্দার বিনোদন ধারাবাহিক ‘হাম লোগ’ । অভিনয় করেছিলেন দিল্লীর ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামার শিল্পীরা । ৭ই জুলাই ১৯৮৪ থেকে ১৭ই ডিসেম্বর ১৯৮৫ পর্যন্ত ১৫৪টি পর্বে শেষ হয়েছিল । তারপর বুনিয়াদ (মে ৮৬ ), ইয়ে জো হ্যায় জিন্দাগী (১৯৮৪), নুক্কড় (৮৬-৮৭), সার্কাশ (৮৯-৯০), করমচাঁদ ইত্যাদি কত সিরিয়াল দর্শককে টেলিভিশনের সামনে টেনে নিয়ে যেত । হামলোগ, বুনিয়াদ বাঙালি টেলিদর্শককে এই নব্য বিনোদনে বেশ অভ্যস্ত করে দিল আর ১৯৮৬তেই তৈরি হয়ে গেল প্রথম বাংলা মেগা সিরিয়াল ‘তেরো পার্বণ’ । খ্যাতনামা নাট্যকার অভিনেতা জ্যোছন দস্তিদারের ‘সোনেক্স’ বানিয়েছিল সমরেশ মজুমদারের কাহনী নিয়ে কলকাতা দূরদর্শনের প্রথম মেগা সিরিয়াল ‘তেরো পার্বণ’ । দূরদর্শনের নিয়মানুযায়ী প্রযোজককে ১৩টি পর্বের অনুমোদন দিত । সিরিয়ালের নামও তাই রাখলেন ‘তেরো পার্বণ’ । প্রবল জনপ্রিয়তার কারণে কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দিয়েছিল আরো আরো দু বার ২৬ পর্বের । অর্থাৎ মোট ৩৯ পর্ব চলেছিল ‘তেরো পার্বণ’। তেরো পার্বণ’ থেকেই আত্মপ্রকাশ হল আজকের জনপ্রিয় অভিনেতা সব্যসাচি চক্রবর্তীর । এ সব গল্প দূরদর্শ যুগের, নব্বইয়ের আগে ।

নব্বইএর দশক থেকে শুরু হল এলোমেলো হওয়ার যুগ । আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজবোধ, চাওয়া-পাওয়া, বিশ্বাস, ভালোবাসা সব কেমন এলোমেলো করে দিল পণ্যায়ন বা পণ্য সংস্কৃতি । হংকং’এর বৃটিশ দখলদারি শেষ হয়ে চিনে অন্তর্ভুক্ত হল । মিডিয়া ব্যারন রুপার্ট মারডক তাঁর স্টার টিভির ব্যবসার পাততাড়ি গুটিয়ে মুম্বাইতে স্টার ইন্ডিয়া’র পত্তন করলেন । মারডকের প্রবল প্রতিদ্বন্দী সুভাষ জৈন অক্টবর ৯২এ পত্তন করেছেন জি টিভির । অতঃপর তারা দুজনেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন বাংলার বিনোদন বাজারে । জি বাংলার সম্প্রচার শুরু হল ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ থেকে তাদের থিম স্লোগান ‘জীবন মানে জি বাংলা’ দিয়ে আর স্টার টিভি ‘চলো পালটাই’ থিম স্লোগান দিয়ে বাংলার টেলি-বিনোদন বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়লো ৮ই সেপ্টেম্বর ২০০৮ থেকে । ‘চলো পালটাই’ স্লোগানে সামিল হয়ে গেলাম আমরা । ভেতর থেকে পালটাতে শুরু করলাম । আমাদের সুস্থ্য বোধ,জীবনের প্রতি ভালোবাসা, সমাজের বাঁধন আর জীবনকে দেখা বা চেনাটাও পালটে ফেলতে শুরু করলাম । জীবনটা যে আমার নিজস্ব সেই ভাবনা ভুলে ‘জীবন মানে……’ভাবতে শুরু করলাম ।

টেলি দুনিয়ায় কর্পোরেটায়নের ছবিটা এই রকম । চ্যালেনগুলো নিয়ন্ত্রণ করে সিরিয়ালের প্রোডাকশন হাউসগুলোকে আর প্রোডাকশন হাউসগুলো প্রায় ক্রীতদাস করে রাখে সিরিয়ালের সমগ্র ক্রিয়েটিভ টিমকে, যার মধ্যে পড়েন কলাকুশলী ও অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও । সকলের সামনেই চ্যানেলগুলো ‘টি আর পি’ নামক একটি গাজর ঝুলিয়ে রাখে । কি এই টি আর পি বা ‘টার্গেট রেটিং পয়েন্ট’ ? ইংরাজি পরিভাষায় টি আর পির সংজ্ঞা এইরকম “ টার্গেট রেটিং পয়েন্ট ফর ক্যালকুলেশন পারপাস ইস এ ডিভাইস এটাচড টু দি টিভি সেট ইন আ ফিউ থাউস্যান্ড ভিউয়ার্স হাউসেস ফর জাজিং পারপাসেস । দিস নাম্বার্স আর ট্রিটেড অ্যাস আ স্যাম্পল ফ্রম দি ওভারঅল টিভ ওনার্স ইন ডিফারেন্ট জিওগ্রাফিকাল এন্ড ডেমোগ্রাফিক সেকটর্স । ইট রেকর্ডস দি টাইম এন্ড দি প্রোগ্রাম দ্যাট আ ভিউয়ার ওয়াচেস অন আ পার্টিকুলার ডে । দি এভারেজ ইস টেকেন ফর এ থার্টি-ডে পিরিওড, হুইচ গিভস দি ভিউয়ারশিপ স্ট্যাটাস ফর দি পার্টিকুলার চ্যানেল” । গ্রাহক কোন চ্যানেল কতক্ষণ দেখছেন, কোন অনুষ্ঠান দেখছেন তা পৌছে যায় কেবল অপারেটরদের বৈদ্যুতিন যন্ত্রে আর সেগুলি বিশ্লেষণ করে তৈরি হয় টি আর পি, সিরিয়াল নির্মাতা আর তার ক্রিয়েটিভ টিমের মরণ-বাচন । কলাকুশলী, নির্মাতা, অভিনয় শিল্পী সবাই এই টি আর পির খুড়োর কলে বন্দী । এই টি আর পির হিসাবে একটু জল মেশানো হয়না এমনটাও বিশ্বাস্য নয় । টি আর পি তাদের বাধ্য করায় দশ কি বারো ঘন্টা কাজ করায় । একজন শিশু শিল্পীকেও আট’দশ ঘন্টা স্টূডিওতে বসে থাকতে হয় কখন তার কাছে অভিনয়ের স্ক্রীপ্ট আসবে তার অপেক্ষায় । আগামীকাল যে পর্বটি দর্শকরা দেখবেন তা ভিডিও বন্দী করতে হবে আজই । দিন আনি দিন খাই অবস্থা । সামনে যে টি আর পি জুজু !

এই টি আর পি জুজুর মহিমা জানতে পারলাম টেলি ও চিত্র জগতের নামী অভিনেত্রী পাপিয়া অধিকারীর একটা লেখায় । পাপিয়া তাঁর লেখায় এক নামী সিরিয়াল চিত্রনাট্যকার লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন (বলা বাহুল্য বাংলা টেরিসিরিয়াল বাজারে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের টি আর পিই সবচেয়ে বেশি )। লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন – “আমি প্রযোজককে জানালাম, অনেকদিন তো হল কাহিনী আর টানতে পারছি না । কি করবো । মাথায় কিস্যু আসছে না । যেভাবে গল্পকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তারপর আর টানা যাচ্ছে না । কাহিনী জোলো হয়ে যাবে । কিন্তু আমার কথা কে শোনে ? চ্যানেলওয়ালা জানিয়ে দিয়েছেন এ গল্প শেষ করা যাবে না । যেভাবেই হোক টেনে নিয়ে যেতে হবে” ।(‘সিরিয়ালের কর্পোরেটায়ন’ - পাপিয়া অধিকারী / গণশক্তি শারদ সংখ্যা ১৪২৩) । অতয়েব গল্প টেনে নিয়ে যাবার জন্য নায়কের বারতিনেক বিয়ে, নায়কের বাপের বিয়ে, মৃত খলনায়ককে আবার জ্যান্ত করে ষড়যন্ত্র ফাঁদা ইত্যাদি চলতেই থাকে । পাপিয়া আরো লিখেছেন ‘... তোমার স্লটগুলোর টি আর পি রেটিং কেমন, তোমার স্থান কোথায় ।আসলে এগুলি বৃহষ্পতিবারই জেনে নেন চ্যানেলওয়ালারা ! শুক্রবারই সিরিয়াল নির্মাতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, আগামী সপ্তাহে তোমার স্থান কোথায় অর্থাৎ তুমি মরলে না বাঁচলে ...মোদ্দা কথা হল, সিরিয়ালে কর্পোরেটায়নের শর্ত পূরণে আশ্বস্ত প্রবুদ্ধ সি ই ওদের মতানুযায়ী সিরিয়ালের গতিপথের মান নির্ধারিত হয়’ । অতয়েব এটা সহজবোদ্ধ যে কেন প্রতিষ্ঠিত গল্পকারদের লেখা বা চিরায়ত সাহিত্যের চিত্রনাট্য লীনা গঙ্গোপাধ্যায়রা লেখেন না । কারণ সেগুলির একটা শেষ থাকে সেই কাহিনীতে মৃত মানুষকে ফিরিয়ে আনা যায় না, চ্যানেলওয়ালাদের ইচ্ছামত টেনে বাড়িয়ে শেষহীন করা যায় না ।

এ যেন বন্দুকের নলের সামনে বসিয়ে চিত্রনাট্য লেখানো চ্যানেলওয়ালাদের । তাদের বন্দুক মানে সেই খুড়োর কল ‘টি আর পি’ । চিত্রনাট্যকার লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন “এখনকার সিরিয়াল হচ্ছে পরিচালক,প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকারদের কাছে সাপ্তাহিক মরণ-বাঁচন লড়াই” (পাপিয়া অধিকারীর লেখায় উদ্ধৃত) । তিনি প্রতিটি সিরিয়ালের তথাকথিত ‘ক্রিয়েটিভ টিম’এরই অস্তিত্বের সংকটকেই নির্দেশ করছেন এবং মেগা সিরিয়ালের অভিনেতারাও এই অস্তিত্বের সংকটের বাইরে নন । দিনেরপর দিন একটা চরিত্রে অভিনয় করার ফলে তাদের একটা ইমেজ তৈরি হয়ে যায়, সেই ইমেজ তারা ভাংতে চান না । তারাও চান তাদের সিরিয়াল অনন্তকাল টেনে চলুক । ‘বামা খেপা’ সিরিয়ালটা ২২৯০ পর্ব পর্যন্ত চলেছে আর অভিনয় চালিয়ে গেছেন অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায় । অরিন্দমের সংকট, সেই ইমেজের বাইরে হয়তো দর্শক তাঁকে অন্যরকম চরিত্রে আর গ্রহণ করবে না । আশঙ্কা, রঙচঙে মোড়কে ক্রমাগত ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো রাণী রাসমণির দিতিপ্রিয়ারও এই দশা হবে, যেমন হয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘ইচ্ছে নদী’র সোলাঙ্কির ।

সিরিয়াল বা তথাকথিত মেগা সিরিয়াল বন্ধ হোক কেউ চায় না, চাইবেনও না । চাইবেন একটু রুচির স্পর্শ থাকুক, কাহিনীতে বাস্তব জীবনের ছোঁয়া থাকুক।, সিরিয়ালগুলোর সমাজের ‘সিরিয়াল কিলার’ হয়ে ওঠা বন্ধ হোক । বন্ধ হওয়া সম্ভব, কেন না শেষ পর্যন্ত, এবং চ্যানেলওয়ালারাও জানেন যে টেলিভিশনের রিমোটটা থাকে দর্শকের হাতেই । 

phalgunimu@gmail.com


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-