রবিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

কাজী রুনালায়লা খানম

sobdermichil | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ |
নারীকথা :
এখানে সন্ধ্যা নামে স্বমহিমায়। দিনান্তে ফিকে হয়ে আসা আলোর গেলাসে আস্তে আস্তে মিশিয়ে দেয় অন্ধকারের কুচি। এখানে ত্রিফলা আলো রাতের বসন ছিঁড়ে নগ্নতা হরণ করেনা।পর্ণমোচীর ফলকে জেগে ওঠা জোনাকির ডানায় অরণ্য চিঠি লেখে প্রিয় নদীটিকে। এখানে দূরদেশি পরিযায়ী কোন পাখি উড়ে যেতে যেতে  নরম ওমমাখা  ডানা থেকে খসিয়ে দেয় দু একটি পালক। সে ওম বুক পেতে নেয় কোন নাম না জানা পাহাড়ি ঝরনা। বক্সা পাহাড় মৌনতার সেলাই মেশিনে গোধূলি-জরিন সুতোয় জুড়ে নেয় লাজবন্তী মেঘ আর উড়নচন্ডী হাওয়ার গল্প।
  
রাত নেমে এলে সে সব গল্পেরা আমার বিছানার পাশে এসে বসে।নীলাভ আলোয় আমার ঘরের দেয়াল হয়ে ওঠে বিষন্ন ক্যানভাস। নোনাজলরঙে বেদনার্ত তুলিতে  আঁকা হয় বহুমাত্রিক কোলাজ। আমি মুঠো খুলে দিই।ক্রমশ আমার  হাতের তালু প্রসারিত হতে হতে প্রকান্ড গোল্লাছুটের মাঠ। সেই মাঠ বরাবর রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলে  চারবছরের শিশুকন্যা এক ।আশিবছরের  শিরাওঠা লোমশ আঙুলের সীমা থেকে। যে আঙুল বিষনখে চিরে দিয়েছে অস্ফুট সতীচ্ছদ। চারবছর দৌড়চ্ছে নিজের থেকে, দৌড়চ্ছে ওর দিকে তাকিয়ে থাকা অগণিত প্রশ্নাতুর চোখের থেকে। সংখ্যাতীত ফিসফাস থেকে। 

চারবছরের পাশে ঘন হয়ে এসে বসে আরো এক মুখ। বলিরেখা ওঠা সে  মুখের সামনে আয়না ধরে স্যাঁতসেঁতে দেয়াল। তেরোবছর বয়স থেকে আজ অবধি  ছুটছে সে মুখ।  একটা অস্ফুট লন্ঠনের আলো থেকে, ভূগোল শেখাতে আসা স্যরের পর্বত চেনানোর নামে পিষ্ট করা অনিচ্ছুক স্তনকুঁড়ি থেকে। উপত্যকা, গিরিখাত চেনানোর নামে দুর্বিষহ যন্ত্রণার যোনিপথ হতে। অ্যাসিডপোড়া কোঁচকানো চামড়া তাড়া করে বেড়ায় তাকে।এখনো  রাতভোর।

শিউলির গন্ধ, ঢাকের বাদ্যি, আগমনীর সুর, পেঁজা তুলোর মতো ভাসিয়ে নিতো যে কিশোরী মনটাকে। সেও গল্পের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে ভিন্নরঙে, পৃথক রেখায়। মৌলবী সাহেব কোরাণ পাঠের তালিম দিচ্ছেন। মন তখনও  ইচ্ছেঘুড়ি। মন তখন কোচড় ভরা শিউলি। মন তখন '' শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি।" দুর্বোধ্য বিদেশি ভাষার কালো কালো অক্ষরগুলো বড্ডো বেজান লাগে। চোখের ভাষায় শঙ্কিত প্রশ্নচিহ্ন  "মৌলবী সাহেব, "সিরাতুল মুস্তাকীম' মানে কি?" এগারো বছরের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পিঠে কালসিটে এঁকে দেন কাঠমোল্লা অক্ষম আক্রোশে।মেয়েমানুষের এতো প্রশ্ন কেন? মোল্লারই কি আর জানা ছিলো অতশত  মানে? প্রশ্নহীন কাটিয়ে গেছেন এযাবৎকাল! এগারোর সরল প্রশ্নে তাই ঔদ্ধত্বের তকমা লেগে যায়।অমীমাংসিত, অগম্য থেকে যায় "সিরাতুল মুস্তাকীম।"

নিরক্ষরা অভাবী মায়ের সোমত্থ যুবতী মেয়ে,  গল্পের কোলাজে ভেসে ওঠে চেনামুখ নিয়ে।  গাঁয়ের মাতব্বরের ঘরে এসেছেন সম্মানীয় হুজুর সাহেব। বাড়িময় লোকে লোকাকার।ভক্তের বান।  ঐশী ক্ষমতাবান হুজুরের এক ফুঁয়ে নাকি সেরে যায় দুরারোগ্য রোগ। বন্ধ্যা রমণীর কোলে ফেরেস্তা এসে বসে হুজুরের পলকসম্পাতে। পূর্ণ হয় মনোবাঞ্ছা তাঁর এক ইশারায়। জ্বর পুড়িয়ে দিচ্ছে উঠতি যুবতী শরীর। দুরুদুরু বুকে হুজুরের পায়ের কাছে এসে বসে পঞ্চদশী চাঁদ। অশীতিপর, মেহেদিরঞ্জিত পক্বকেশ হুজুর সাহেবের আঙুল থার্মোমিটার স্কেল। বন্ধ দরজার আড়ালে সন্ধ্যা জানলো জ্বর মাপতে কপাল নয়, গলা নয়, এসবের  আরোও বেশ কিছুটা গভীরে,স্তনবৃন্তে রাখতে হয় হাত ।মেয়েটির কপাল পুড়ছে অসহ্য জ্বরে। অসহ দহন আজও পুড়িয়ে দিচ্ছে একটি সন্ধ্যাকাল। 

সন্তানের মুখে ধরে চুমো খাবার স্বপ্ন দেখা বধূটির দশবছরের রুখাসুখা দাম্পত্য। অধরা স্বপ্নটা তবু আগলে রাখে পেলব আঁচলে, অন্তর্বাসের ওমে। যজ্ঞ করছেন সিদ্ধপুরুষ। ধূপে,ধোঁয়ায়  অগুরুচন্দনে এক অপার্থিব নির্জন মধ্যযাম। যজ্ঞান্তে সাধকের খর চোখে ঝিকিয়ে উঠলো কামার্ত তলোয়ার। ছোপলাগা হলদে দাঁত। গেরুয়া ফুঁড়ে বেরোনো লোমশ আঙুল নেমে  আসে অন্তর্বাসের হুকে। ক্রমে বুক নাভি, নিতম্ব এবং আরো গভীরে।বাইরে তখন চ্যালাদের হাতে তীব্রস্বরে বেজে চলেছে ঢাক। কান্নার গোঙানিটা ঢাকা পড়ে যায় অনায়াসে।


 প্রাকবিবাহ যুবককে দাম্পত্যের সহজপাঠ শেখাচ্ছেন গাঁয়ের মোল্লা "স্ত্রীলোক শস্যক্ষেত্রস্বরূপ।" মানুষ নয়,  সম্মান নয়, শ্রদ্ধা নয়,ভূমিরূপা স্ত্রীলোককে তাই রাতভর চলে  কর্ষণ। ভালোবাসাহীন,পরিচর্যাহীন রমণ প্রতিরাত! একবার নয়, বহুবার। নারী তো কেবল শরীর। স্বামীকে তুষ্ট করাই যার একমাত্র কাজ! অতএব.....পরিচর্যা নয়,সোনার ফসলের সাধনা নয়, কেবল কর্ষণ!মোল্লাসাহেবও যে 'অশ্বত্থামা হত'টুকুই জানেন। তাই রক্তাক্ত চাদরের প্রান্ত ছেড়ে,অসহায় সমর্পণ সীমা ছেড়ে ছুটছে  মেয়ে দীর্ঘ দীর্ঘ পথ।'সোনার ফসল' 'সোনার পাথরবাটি' হয়ে থেকে যায় চিরটাকাল। 

 বিয়ের ঠিক আগের রাতে চার্চের প্রার্থনা শেষে মহামান্য পাদরী যে মেয়েটিকে নিজের কক্ষে ডেকে নিলেন ভার্জিনিটি পরীক্ষার নামে।তার লজ্জা ও অসহায় সমর্পণের যন্ত্রণাদীর্ণতা থেকে ছুটতে ছুটতে সেও এসে দাঁড়ায় অগনিত মুখের ভিড়ে। 

কাকভোর অন্ধকারে পর্দা খুলে নিলে, তোর্সার স্বননে মিশে যায় ভৈরবী রাগ।উত্তরের জানালায় এসে বসে সোনালি ডানার চিল। তখন গল্পের ক্যানভাস হতে এক এক করে বেরিয়ে আসে জীবন্ত সব নারীমুখ। পায়ের তলায় হাঁটি হাঁটি পা পা করে এসে বসে  শিশিরভেজা আস্ত একটা গোল্লাছুটের মাঠ। প্রতিটি নারীর চোখের তারায় জ্বলে ওঠা আগুনে শুদ্ধ হয়  হাজার বছরের নারীজন্মঋণ।পর্ণমোচীর চিরল পাতায় বেনীআসহকলায় ঝিকিয়ে উঠছে সূর্যস্বাক্ষর। 


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-