রবিবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮

জয়তী রায়

শব্দের মিছিল | সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৮ |
সারপ্রাইজ
হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালানোর মজা তখনই পাওয়া যায়, যদি কেউ আরিন্দমের গাড়িতে বসে। গাড়ি বিদেশী। আর কোটিপতি আরিন্দমের ড্রাইভিংয়ের হাত তার মসৃণ গালের মত নিখুঁত। পরিপাটি। গাড়ি ড্রাইভিং অরিন্দমের এক নেশা। 

রাস্তা দিয়ে উড়ে যেতে যেতে স্বামীর দিকে তাকায় মালবিকা। ক্লাবে, পার্টিতে তার এত প্রতিপত্তি --কারণ ওই অরিন্দম। এক্সপোর্ট ইম্পোর্টের সফল ব্যবসা। কোটিপতি অরিন্দমের মিসেস হিসেবে সোসাইটিতে তার প্রতিপত্তি প্রচুর। ব্লুজিন্স আর লাল টপ পরা সুন্দরী ছিপছিপে বউয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে অরিন্দম--দারুণ লাগছে। 

লাল লিপস্টিকে রাঙান ঠোঁট ভেঙে মালবিকা বলে

---লাবিউ। কিন্তু এখনো বললে না, এবার কোথায় যাচ্ছি! 

----সারপ্রাইজ! বলে গাড়ির মিউজিক দ্রুত করে দেয় অরিন্দম। এটা তার আর এক নেশা --সারপ্রাইজ দেওয়া। এগার বছরের বিয়েতে এগার হাজার সারপ্রাইজ পেয়েছে মালবিকা। কখনো গাড়ি, কখনো হিরের দুল, টুক করে নতুন ফ্ল্যাটের চাবি। একবার সারপ্রাইজ হিসেবে এল মানুষ। 

ছোটবেলায় দাদুর বাড়ি যেতে খুব পছন্দ করত মালবিকা। বারুইপুরে বড়বাড়ি বললে এক ডাকে চিনত সবাই। বাড়িটা যেন মিউজিয়াম। পৃথিবীর সবদেশের কিছু কিছু সংগ্রহ আছে সেখানে। বন্দুক হাতে গোর্খা দারোয়ান পাহারায়। বাড়ির চারদিক ঘিরে বাগান। তাতে অনেক পোষ্য। সবাই খোলা ঘুরে বেড়ায়। নানা ধরণের পাখি। হরিণ। ময়ূর। পরে দেখেছে, অনেক উঁচুতে সূক্ষ্ম জাল বিছিয়ে রাখা আছে। খোলাভাব আসলে ভান। অদৃশ্য নিষেধ একটা রয়েছে। 

দাদুর বাড়ি প্রিয় হবার আর একটাও ছিল। সে হল নতুন মামা। ছোটবেলায় বুঝতনা। পরে বড় হয়ে এদিক ওদিক শুনে বুঝেছে, মা হল দাদুর একমাত্র আদুরে মেয়ে। দিদিমা ছোটবেলায় মারা গেলে, মা আরো বায়নাদার হয়ে ওঠে। যেটা চাই সেটা না পেলে, টানা না খেয়ে থাকত। একবার কোন বন্ধুর জন্মদিনে গিয়ে , তার ভাই দেখে পাগল পাগল দশা। ভাই চাই। 

চাই তো চাই। বাড়ির সকলের ত্রাহি ত্রাহি রব। বোঝানো ধমকানো সব গেল জলে। মাথায় হাত দিয়ে বসা, দাদুর ত্রাতা হয়ে এল নেপালী দারোয়ান গুরুং। নেপালের ভূমিকম্পে অনাথ শিশুটি এল নতুন মামা হয়ে। বিধিদত্ত উপায়ে দত্তক নিলেন দাদু। খুব ছোট্ট সে। দুই বছর বয়স। মায়ের তখন দশ বছর। 

মায়ের চোখের মণি হয়ে উঠল নতুন ভাই। পড়াশুনোতে খুব ভালো। স্বভাবেও তাই। দাদুর মৃত্যুর পরে, বাড়ি বাগান গুটিয়ে ছোট করে ফেলেছিল মামা। নিজে বড় চাকরি করে দুঃস্থ মানুষদের সেবা করত। কিছুতেই বিয়ে করল না। মালবিকা ছোট্ট থেকে ওই মামার ন্যাওটা। সে মামাও তেমনি। মালবিকা ছুটিতে এলে , সব কাজ ফেলে , তাকেই সময় দেবে। সকলের খুব প্রিয় মানুষ হঠাৎ হারিয়ে গেলেন। একেবারে হঠাৎ। তখন মালবিকার বিয়ে হয় নি। অকৃতদার ভোলেভালা বছর চল্লিশের মামা কর্পূরের মত উড়ে গেলেন! তার বছর দুই পরে মালবিকার বিয়ে হয়।

তখনো মামার খোঁজ চলছে, তখনো গোটা পরিবার শোকাহত, অরিন্দম অনেক শুনেছে ওনার কথা। ছবি দেখেছে -- শুনেছে --ভালো শ্যামা সংগীত গাইত, চায়ের কাপে পাঁচ চামচ চিনি খেত , বাম হাতে তার ছয়টি আঙ্গুল --

শুনেছে, মানুষটি বড় সরল। বাড়ির সবাইকে খুব ভালোবাসত। 

বিয়ের পাঁচ বছরের সারপ্রাইজ হল , মামাবাবু। খুব গোপনে, প্রচুর লোক আর অর্থ কাজে লাগিয়ে হরিদ্বার থেকে খুঁজে বার করে তাকে অরিন্দম। বিশ্বাসী লোকের ফোনে খবর পেয়ে নিজেই দৌড়ে যায় হরিদ্বার। ভদ্রলোক কিছুই অস্বীকার করেন নি। কিন্তু ফিরেও যেতে চাননি। ফোনে ,মালবিকার মায়ের কান্না শুনে, বিচলিত হয়ে বললেন--দিদি। ছোট্টবেলা থেকে মানুষ করছ এই অনাথকে। এবার আমাকে মুক্তি দাও। নির্জনতায় আমি ভালো থাকি। “ 

এমন সব সাংঘাতিক সারপ্রাইজ অপেক্ষা করে থাকত মালবিকার জন্যে। বিয়ের তিন বছরে, বুবুন যেবার হল, সোনোগ্রাফি রিপোর্ট ভুল বলতে বলেছিল ডাক্তার বন্ধুকে। ছিল ছেলে। বলা হল মেয়ে। মালবিকা জানত , গর্ভে তার মেয়ে। ছেলে মেয়ে কোনো ব্যাপার না। তবু ,যখন ভাবছে কোলে নেবে কোনো মেয়ে সন্তান তখন হঠাৎ ছেলে! সেবার,ওর খুব অদ্ভুত লেগেছিল। এটা কি স্বাভাবিক? কেমন এক ধরণের পাগলামী! এটা আবার কেউ করে নাকি? 

এমন হঠাৎ বুবুনকে দেরাদুন স্কুলে পাঠান ঠিক করে ফেলল। মালবিকা অবাক হয়ে ,রেগে অনর্থ বাঁধাল। অরিন্দমকে টলান গেল না। তার বক্তব্য খুব পরিষ্কার। কলকাতায় ছেলে মানুষ হবে না।

তিন বছর হল, বুবুন হোস্টেলে। মালবিকা একা। 

ফেসবুক আর তার মতই কিছু উচ্চবিত্ত মহিলার একটা গ্রুপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। 

সাংঘাতিক বাঁক নিল গাড়ি। শহর ছাড়িয়ে চলে এসেছে অন্য কোথাও। সকাল এগারটা। টুকটাক মুখ চলছে। সে মৃদু ঠেলা দিল আরিন্দমকে

খাবে না? চা আছে সঙ্গে। একটু দাঁড় করাও গাড়ি।

---জো হুকুম মহারানী।

সবুজে হলুদে মেশান ধানক্ষেত। নির্জন। আকাশ মেঘলা। কোথাও কেউ নেই। কি অসহ্য নির্জনতা ! 

মালবিকার খুব রাগ হল। চা আর স্যান্ডউইচ নিয়ে সে সেলফি তোলার জোগাড় করতে লাগল। দামী গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে, চায়ের কাপ কায়দা করে ধরে, ছুঁচোল ঠোঁট করে---বন্ধুদের কাছে এই পচা ধানক্ষেতকেও কোটিপতির কায়দায় দেখাতে হবে তো! 

সন্ধ্যে নাগাদ তারা পৌঁছল এক ছোট্ট গ্রামে। আদিবাসী কয়েক ঘর। ওখানেই থাকা। ওদের সঙ্গেই। মালবিকা একেবারে অবাক। কি করে থাকব? তাও তিনদিন? সে ফেটে পড়ল

---তোমার এই সারপ্রাইজ? আমি মাঠে বাথরুম করব? নদীতে স্নান করব? 

---yes ডার্লিং। বিয়ের দশ বছর হল। একটা সাংঘাতিক সারপ্রাইজ না দিলে হয়!

---তোমার মাথা খারাপ। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। এতদিন বলিনি। সহ্য করেছি। 

---আরে তিনটে মোটে দিন! আর পাগলামী কেন বলছ? আমি কি কোনোদিন তোমাকে কষ্ট দিয়েছি? 

---তিনদিন ? মোটে? ফোন নেই! নেট নেই।

---আমি তো আছি। কি হবে ফোন দিয়ে? বুবুনকে বলে এসেছি।

---বুবুন ও জানে? যত সারপ্রাইজ আমার বেলায়? আমি ফিরে যাব। এই ভাবে থাকা? আর তুমি থাকলে কি সুবিধা আমার? দিনে কটা কথা হয় তোমার সঙ্গে? ফেসবুক ছাড়া একঘন্টাও থাকতে পারি না আমি। hate your surprize.

হাত উল্টে বলল অরিন্দম---এই অঞ্চল থেকে বাস পাবে না। গাড়ি করে দুঘন্টায় এমন রিমোট এরিয়ায় পৌঁছুতে পারবে? নেভার। জিপিএস এই অঞ্চল জানে না। সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন বলতে পার। 

---কারণ কি অরিন্দম? আমরা দুজন দুজনের মত করে ভালোছিলাম। হঠাৎ এমন করে...। 

---ভালো ছিলাম? আমরা দূরে সরে যাচ্ছিলাম একে অন্যের থেকে। মালু, সবে তো এলে , একটু শান্ত হয়ে দেখো। এখন দুপুর তিনটে। ফ্রেস হয়ে চলো একটু ঘুরে ফিরে আসা যাবে। 

#

ছোট্ট ছোট্ট টিলা পাহাড়ের চড়াই ভেঙে উঠছিল দুজনে। মুখ হাত পায়ে জল লাগায়নি। তখন থেকে হিসিও করেনি। মেয়েদের বাথরুম চেপে রাখার অসম্ভব ক্ষমতায় মালু এখনো ঠিক আছে। কাঁটা ঝোপ, ফণী মনসার ঝাড়, শিয়াল কাঁটা , মোটা বুনো ঘাস, এবড়ো থেবড়ো মাটি। সূর্যের তেজ কমে শীত করছে এখন। চায়ের তেষ্টা আকণ্ঠ। কেউ নেই। চারিদিক তাকিয়ে, অরিন্দম প্যান্টের জিপ খুলে ছর ছর চালিয়ে দিল। আহ! কি আরাম। চোখ বুজে বলল

মালু, তুমিও বসে পড়ো। জিন্স নামিয়ে । কেউ দেখবে না। বড়জোর ঘাস সুড়সুড়ি দেবে। 

বিশাল বিশাল গাছ ঘেরা উঠোনের চারদিক ঘিরে ঘর। মশাল পোঁতা রয়েছে গাছের গায়ে। আলো অন্ধকার মিলে বেশ ছমছমে। দুটো মেয়ে টুংরু আর বুরু, চোদ্দ পনের বছর হবে, বুক থেকে কোমর অবদি পেঁচিয়ে বাঁধা টকটকে লাল রঙের একফালি কাপড়। কুচকুচে পাথরের তৈরি হিলহিলে শরীর, হাত ধরে নিয়ে গেল মালবিকাকে, একটু ঘেরা জায়গায়। স্নান বাথরুম সব ওই খোলা আকাশের তলায় রাখা চ্যাপ্টা চৌকো পাথর। বহমান তিরতির জলধারা। জমা হচ্ছে গর্তে। আবার উপচে বেরিয়ে যাচ্ছে বাইরে। টাওয়েল নাইটি নিয়ে এক মেয়ে দাঁড়ান। অন্ধকার। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে দেখাও যাচ্ছে সব। কিরকম করে স্নান সারা হল। তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে নাইটি পরে নিল। বাতাস বইছে। ঝিঁঝি ডাকছে। লোকের গলার আওয়াজ পাচ্ছে। বাথরুমের বন্ধ নিরাপত্তা নেই। সামনে আয়না নেই। শির শির করছে শরীর। উঠোনের মশালের আলোয় মাটির হাঁড়ি ঘিরে মেতে উঠেছে কয়েক জন পুরুষ নারী। অরিন্দম বসে আছে সেখানে। মাটিতে থেবড়ো বসে গান গাইছে। অসহ্য। অরিন্দম হাত নেড়ে ডাকল--হেই মালু। মহুয়া খাবে এসো। বুক জ্বলে যাবে তোমার! 

ভেজা শরীরে বাতাস লেগে ঠান্ডা লাগছিল মালবিকার। সে বলল--

কিছু খাবার পাবো? খিদেয় পেট জ্বলছে। আর আমি শুতে চাই। প্লীজ অরিন্দম , তোমার পাগলামী থেকে আমাকে বাঁচাও। 

---কড়া ঝালের মুরগি আর ভাত। শালপাতের থালায়। সব অর্গানিক। হিহিহি। অর্গানিক। শালা। অর্গানিক সেক্স খুঁজতে আসতে হবে জঙ্গলে। 

মাথার উপর মোটা ঘাসের চাল। বাঁশের চাটাই। তার উপরে মোটা করে খড় আর বাবুই ঘাস বিছানো। মাটির ঘর।। ঘরের মেঝে দেয়াল তকতকে পরিষ্কার। এখন কত রাত কে জানে! পাশে হাত পা ছড়িয়ে ঘুম অরিন্দম। নাক ডাকার বিকট গর্জন। তিনদিন এখানে থাকতে হবে! সবে একদিন শেষ হল না। যদি তাঁকে ফেলে রেখে চলে যেত অরিন্দম? যদি চলে যেত? ভাবতেই হাত পা ঠান্ডা হয়ে এল। এমন ঘটনা ঘটল কেন, সেটাই তো ভাবতে পারছে না। বনবাস শুনতে বেশ রোমান্টিক। নিজের ঘরে , এসি রুমে বসে হাতে ফোন নিয়ে সবকিছু সহজ লাগে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। অরিন্দম কেমন সাঁওতালদের মত ব্যবহার করছে! মাটির ঘরে গোবরের গন্ধ পাচ্ছিল মালবিকা। বাইরে থেকে কোনো জংলী ফুলের তীব্র গন্ধ। সাপ আসবে না কি? মাঝরাতে বাথরুম পেলে কি করবে? আবার সেই পাথরের উপর বসতে হবে? 

সারাজীবন এমন সকাল দেখেনি। বিছানায় শুয়ে হাত বাড়িয়ে মোবাইল টেনে নেয়। ঘুম চোখেই গুড মর্নিগের পালা সারে। সেদিনের প্রোগ্রাম দেখে নেয়--তারপর চা ইত্যাদির পালা শুরু হয়। মোবাইল ছাড়া জীবন? সকালে উঠে কেমন জল ছাড়া মাছের মত লাগছে। অরিন্দম নিশ্চয় প্রচুর টাকাও এদের। নাহলে এত খাতির করত না! টাকা এবং প্ল্যান দুটোই আগে এসে নিঃশব্দে করে গেছে। 

বাইরে মেয়েলী গলায় খিল খিল হাসি শোনা যাচ্ছে। অরিন্দম বিছানায় নেই। ওই মেয়েদুটো আবার এসেছে তাকে সাহায্য করতে। ঘরে উঁকি দিচ্ছে। সে হাত নাড়তেই খিলখিল হেসে গড়িয়ে ঢুকল, চকচকে এক মেয়ে

তুয়ার মরদ চা বানাইছে। চল দিকি। চা খেইয়ে মাঠে যাবি। পরে হাট যাব। কত্ত কিনবি। চল ক্যানে?

মাঠে যাব? মাঠ মানে পটি? ওরে বাবা। তিনদিন পটি না করে কাটিয়ে দেবে। সে গম্ভীর হয়ে বলল

আমি বাথরুমে যাব। 

#

প্রতি ঘন্টা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে মালবিকা। 

পঞ্চাশ ষাট ঘর বাসিন্দা হবে এই গ্রামের। গ্রামের প্রান্তে বড় একটা মাঠমত খোলা জমি। একদিকে দুটো বাঁশের খোঁটায় বাঁধা লাল শালু। শালুর গায়ে দেবনাগরী অক্ষরে হরফে কিছু লেখা। লাল মাটির রাশতার দুই ধার জুড়ে হাট বসেছে। ঝুড়ি কুড়াল, বেলচা, মেটে কলসী, নুন--আদিবাসী গয়না। আর বড় বড় পাত্র ভর্তি হাড়িয়া তাড়ি। 

নীল রঙের লং ড্রেস পরেছে মালবিকা। টুংরি তার কথা শোনে নি। কি সব জরিবুটি দেওয়া মাটির মত এক জিনিস এনে, প্রায় উলঙ্গ করে গা ঘঁষে, চুল ধুইয়ে দিয়েছে। কলকাতায় পার্লার প্রচুর টাকা নেয় ভেষজ জিনিস দিয়ে বডি স্ক্রাব করার। ভেজাল দ্যায় মনে হয়। এত ফ্রেস তো লাগে না। কোথা থেকে হুপ করে অরিন্দম ঘাড়ে এসে পড়ল। সে অবাক হয়ে বলল

এ কি চেহারা তোমার? মনে হচ্ছে মাটি কাটতে কাটতে উঠে এলে। 

--মাটি মেখে এলাম মালবিকা। বহু রোগ সারবে। ভিটামিন ডি পয়সা দিয়ে কিনতে হয়না। এই আকাশে বাতাসে মিশে আছে। 

--অরিন্দম। অনেক হয়েছে। আজ ফিরে চলো। অনেক শাস্তি দিলে আমাকে। 

--শাস্তি? কিসের?

অবাক হবার ভান করে মালবিকার ছল ছল চোখের দিকে, স্নানকরা টাটকা শরীরের দিকে তাকান মাত্রেই উত্তাল বাতাসের মত চারটি মেয়ে ছিনিয়ে নিয়ে গেল তাকে---হে বাবু। টুকুন হাড়িয়া দিবি চল ক্যানে। তুকে লাচ দিখাব। 

মালবিকার সঙ্গী টুংরি হেসে গড়িয়ে পড়ে বলল

দিদি চল। মোরা খাব হাড়িয়া চল। 

#

রাতে আজ উৎসব। বড় করে আগুন জ্বালান হয়েছে উঠোনের মাঝখানে। চারিদিক ঘিরে ঘিরে নেচে উঠছে পুরুষ নারী। খাটো ধুতি খাটো শাড়ি, খোলা শরীর, মাদল বাজে ডিং ডং ডিং ডং। একটু দূরেই সীমারেখার মত লাইন অরণ্যের। ঠিক যেন ছবি। কালো সবুজ লাল সোনালী দূরের পাহাড়, সরল খল খল হাসি--সব মিলিয়ে আদিম জীবন। 

অরিন্দম মিশে গেছে ওদের মধ্যে। শহুরে পালিশ উড়ে গেছে একদিনেই। জ্বলন্ত আগুন থেকেই চুটা ধরিয়ে টান মেরে , বসে বসেই একটা মেয়ের কোমর ধরে ঘুরিয়ে দিল। মেয়েটি দুহাত উপরে তুলে হুহুহু বলে এক পাক ঘুরেই বসে পড়ল অরিন্দমের কোলে। মালবিকা বসে আছে মাটির দাওয়ায়। তিক্ত বমি বমি রাগের চোঁয়া ঢেঁকুর গলা বেয়ে উঠছে আর নামছে। একটু দূরেই কাঠ কুটো জ্বালিয়ে রান্না হচ্ছে। মুরগির পোড়ার গন্ধ ভাসছে। পেঁয়াজ রসুনও পুড়ছে মনে হয়। একটু পরেই তার সামনে সবুজ শালপাতায় করে ছোট মুরগি পোড়া সঙ্গে পেঁয়াজ টমেটো লঙ্কা পোড়া দিয়ে গেল। সাদা সাদা পাথুরে নুন ছড়ান। 

মালবিকা ভাবছিল এমনটা ঠিক হল কেন? এটা তিনদিনের একটা সারপ্রাইজ ভাবতে পারছে না সে। কোথায় যেন প্যাঁচ আছে একটা। অনেক গভীরে শিকড় ছড়ান বিষবৃক্ষের ফল আজকের সারপ্রাইজ। 

প্রায় চব্বিশ ঘন্টা বাইরের দুনিয়া থেকে সরে আছে। ফেসবুক হোয়াটস আপ কিছুই নেই। কি করছে শিল্পী ? কি করছে সায়ন? তার খবর না পেয়ে কটা মেসেজ করেছে? নিশ্চই আতঙ্কে ভুগছে? ফোন পাচ্ছে না কেউ। সবাই জানে অরিন্দমের সঙ্গে বাইরে যাচ্ছে। তার মা তো পাত্তাই দেবেনা, কারণ সে একলা নয়। আর কে আছে যে ব্যাকুল হবে! কেউ নেই। বন্ধুরাই তার আপন। একমিনিট কথা না বললে থাকতে পারত না, অথচ এখন পার হয়ে গেল চব্বিশ ঘন্টা! অন্যমনস্ক হয়ে কাঁচা শালপাতার সুবাসে ভরা টক টক ঝাল ঝাল মুরগি খেতে খেতে মাটির গ্লাসে রাখা হাঁড়িয়ায় চুমুক মারে মালবিকা। 

#

সকালে মাঠে যেতেই হল। উপায় ছিল না কোনো। কচি সবুজ ঘাসে ভরা প্রান্তর। দূর দূর নীরব। মোরগ ডাকছে। পাশেই ছোট ঝরনা।

তু আরামসে কর দিদি। হামি রইলাম ক্যানে। উ দ্যাক, জল বইছে। উখানে ধুইয়া আসিস। কুনো ভয় নাই। ইধার জানোয়ার আসে না।

মালবিকার আজ সত্যি মনে হচ্ছে, টাইম মেশিনে করে বহু বছর আগের পৃথিবীতে চলে এসেছে সে। কোনো বিশাল শপিং মল নেই। বিজ্ঞাপন নেই। হোটেল রেস্টরেন্ট কিছুই নেই। 

আজ টুংরি জিদ করে বুনো ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিল তাকে। সারাদিন জঙ্গলে নদীতে হুটোপুটি করল তারা। 

গড়ান কলসীর জলের মত গড়িয়ে গেল দিন। সন্ধ্যে ঘনিয়ে এল। 

রুপোর মত আকাশে উঠল সোনার থালার মত এক চাঁদ। উঠোনে জমায়েত ছেলে বুড়ো আজ বাঁশি শুনছে। আরিন্দমের গা ঘেঁষে বসেছে মালবিকা। 

ফিস ফিস করে অরিন্দম বলল

তোমার শরীরে ফুলের গন্ধ। 

কি ফুল? বলতে পারবে? 

--বিষ ফুল!

---জানো না, এমন ফুলের গন্ধে সাপ আসে। 

---কি বলছ তুমি? কিছু একটা বলতে চাও তুমি। অরিন্দম তোমার কোনো উদ্দেশ্য আছে? 

---বিশ্বাস আছে। 

ধক করে বুকের মধ্যে লাগে মালবিকার। খুব অচেনা লাগে এতদিনের চেনা মানুষকে। কেউ কি চেনা হয় আদৌ। জীবনভর সঙ্গে থেকেও পরস্পরের সব গলি ঘুঁজি চেনা যায় কখনো? 

রাতে সজারুর মাংস পোড়া , লাল চালের ভাত। গান ...

দেলয়াইয়া দেলয়াইয়া হাম দ ওড়ার 
বৈষতে দিবঅ তালাই পাইত্যে দক্ষিন উঠানে
দক্ষিন উঠান গোবর নিকান পখোর গোড়া রে।
তাল পাতার পাখা দিবঅ গতর জুড়ানি। 
জল খাবারে মহুল গুড় আর ঢেঁকি কুটা চিড়া রে। 

দুপুইরা ভাত চালি ধানের
লংকাসানা জঙ্গলী মানের।
খাইও শ্যাঙ্গাত মাংসের ঝোল বনা মুরুগ সাঁড়া রে। 

শিমল তুলার নরমা শিতান
নকশী কাঁথার নরম বিছান
জিরান লিব্যে শুয়িয়ে বৈই স্যে মুঈদয়ে নয়ন জোড়া রে। 

দুলে দুলে গান তালে তালে শরীর। মালবিকার ঘোর লেগে গেল। খাদ্য যৌনতা সততা শিল্প সংগীত-- এই নিয়ে বেঁচে যদি থাকাই যায়, তবে কি করছে নগর সভ্যতা? কি পাচ্ছে মানব সভ্যতা নগরের কাছ থেকে? 

চাটাইয়ের বিছানায় ধামল বাজল আজ। বহুদিন পরে মিলিত হল অরিন্দম মালবিকা। শ্রান্ত তৃপ্ত ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে লেপ্টে গেল মালবিকা অরিন্দমের শরীরে। 

---তোমার সারপ্রাইজ শেষ পর্যন্ত খারাপ হল না। কেমন যেন ভালোবেসে ফেলছি এই ভাবে থাকা। 

---মালু , তুমি রামায়ণ পড়েছ?

চাঁদের আলো ঢুকছে চাল ভেদ করে। অবাক গলায় মালবিকা বলে--

---রামায়ণ? সে তো ঠিক…

স্বগতোক্তির মত অরিন্দম বলে চলে

ঠিক মত পড়ো নি। পড়লে জানতে পারতে সীতার দ্বিতীয় বনবাসের কথা। 

---দ্বিতীয়বার বনবাস? 

---রাম সীতা অযোধ্যায় ফিরে এলেন। চোদ্দ বছর বনবাস, আর ওমন ভয়ঙ্কর লড়াই--সবকিছুর পরে নতুন করে রাজ্য ঢেলে সাজানো--রাম ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। 

তার মধ্যেও ফিসফিস শুরু হয়ে গেল রাজ্য জুড়ে। ব্রাহ্মণরা সীতার চরিত্র নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলতে লাগল। 

রাম আবার দিশেহারা। ঘূর্ণিস্রোতে হারিয়ে যাওয়া নৌকার মত রাম, রাজকাজে মন বসেনা, এক দুপুরের অসময়ে উঁকি মারলেন অন্দর মহলে। হলুদ বসনে আবৃত শরীর, এলো চুল, পিছন ফিরে ছবি একছিলেন সীতা। 

: এসব কি গল্প অরিন্দম? 

---সারপ্রাইজের গল্প। মালু, শোনো পুরোটা। রাম প্রচন্ড সারপ্রাইজ হলেন, কারণ সীতা যার ছবি আঁকছিল সে ছিল রাবণ। এর পরে সীতাকে আবার অরণ্যে নির্বাসন দিতে রাম দ্বিধা করেনি। 

: অরিন্দম তুমি তুমি…

: আমি রামের মত পাষন্ড নই মিলু। আমার বুবুনের মা তার ফ্ল্যাটের রাজ্যেই থাকবে। তবে ফেসবুক লগ আউট না করে শুয়ে আমাকে চরম সারপ্রাইজ তুমি দিলে মিলু। সুপ্রতিমের সঙ্গে তোমার সম্পর্কের কথা জানতে পেরে আমি হতবাক। 

: বিশ্বাস কর আমি ঠিক ওই ভাবে..

: নাগরিক সভ্যতার খোকলা জীবন এর জন্যে দায়ী। মানুষকে যত দিচ্ছে তত শুষে নিচ্ছে। যন্ত্রের বোতাম টিপলেই হাজির বন্ধু, হাজির আরাম আয়েশ , হাজির প্রেম ভালোবাসা বিচ্ছেদ। 

: অরিন্দম। শোনো কথা বোঝার চেষ্টা করো। তুমি আমাকে সময় দিতে না। 

: ভালোবাসা হল আশ্রয়। অরণ্য শেখায় আশ্রয়ের মূল্য। মাটির সঙ্গে মিশে যাবে যে শরীর, তার প্রযোজন কতটুকু ? মালু, গভীর ভাবে ভাব একবার! আমাদের মনের নিরন্তর চাহিদার আগুনে ঘি ঢালছে যন্ত্র। তোমাকে হারাতে চাইনা বলে, নিয়ে এলাম অরণ্যে। 

এবারের সারপ্রাইজ আমাদের অস্তিত্বের সংকটকে বাঁচিয়ে তোলার জন্য । আশাকরি আমাকে ভুল বুঝবে না। “

স্তব্ধতার চিত্র কেমন হয় কেউ দেখেছে? অথবা স্তব্ধতা পরবর্তী চিত্র কেমন হতে পারে জানে কেউ? না জানাই ভালো।

সারপ্রাইজ কিছু থাক। 

joyeelove@gmail.com



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-