শনিবার, জুন ৩০, ২০১৮

পিনাকি

sobdermichil | জুন ৩০, ২০১৮ |
ব্রহ্মরাক্ষস ও চণ্ডালের গল্প

ধুতি তুলে, হাঁটুর উপর কিচ্ছুক্ষণ চুলকে নিল, গণেশ ভাউরাও চেইরি। মহারাষ্ট্রের ইয়াভাতমাল জেলার, এক হতদরিদ্র গ্রামের, আলোবিহীন , মাটির দাওয়ায় বসে হুঁকায় টান মারলেন --- বয়স সত্তর , রুগ্ন , কালো কুচকুচে গায়ের রং , ক্লান্ত চোখে ঘুম নেই । চাঁদের আলোয় , খণ্ড –খণ্ড মেঘের আনাগোনায় - সন্ধ্যার আকাশটা রাতের আকাশ হয়ে উঠছে ! ছড়িয়ে থাকা গ্রামের এক পাশে বিস্তীর্ণ চাষাবাদের জমি , আরেক পাশে চাষীদের ভাঙা – ভাঙা ঘর । খড়ের ছাউনির ভিতর দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে । 

গরমে বেশ কষ্ট । গ্রাম থেকে পায়ে হেঁটে চল্লিশ মিনিট গেলেই নলকূপ ; গ্রামের লোকেরা জল ভরে নিয়ে আসে । নিজস্ব পাতকুয়া থাকলেও শুকিয়ে গিয়েছে , নতুন খনন শুরু হবে । গ্রাম পঞ্চায়েত কথা দিয়েছেন - চাষের জমিতে ফসল জলের জন্যই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । তাই জলের ব্যবস্থা করে দেবেন । 

গণেশ দাওয়ায় বসে , নিজেকে নিয়ে ভাবছিলেন । এই চিন্তা নিজের পরিবারের তিনটি মেয়ে (বিবাহযোগ্যা ) , বছর কুড়ির ছেলেকে নিয়ে ; কলেজে ভর্তি হলেও, মন দিয়ে পড়তে চায় না । বাপের সাথে জমিতে কাজ করলেও নিজেকে চাষী বলতে চায়না । সে মুখে বলে ---- জমি বেঁচে শহরে গিয়ে সবজির দোকান খুলবে ; এখানে থেকে লাভ নেই । 

এই গ্রামে এখনো সারাদিন বিদ্যুৎ থাকেনা । মেঘের ঝলকের মতন দুর্মূল্য নাহলেও , বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ ভাবেই আজও অধরা ! মহারাষ্ট্রে জলের সংকটের একটা কারণ , বৃষ্টির অভাব । কৃষকেরা ঋণ নেন , চাষ করবে বলে । এই চাষের সফলতা নির্ভর করছে , ফসল বাজারে বিক্রি করে যে টাকা ফিরবে , এই টাকাই ফিরিয়ে দিয়ে ঋণমুক্ত হতে হবে । এটাই কারণ কৃষকের ছেলে , বংশগত জীবিকা ত্যাগ করতে চাইছে । কৃষকের কাছে , চাষে ফলনের থেকেও ঋণ মুক্তির পন্থা ভয়ের কারণ হয়ে ওঠে । 

গণেশের চোখে রাতের অন্ধকারের মতনই গভীর চিন্তা ভাসছে ! এইবছর ঋণ শোধ দিতে পারবে তো ? দাওয়ায় চারপায়ির উপর শুয়ে , আকাশের দিকে চোখ রেখে , নিজের মনেই এইসব কথা ভাবছিলেন । বেশ কিছুটা দূরে ফাঁকা প্রান্তরের বুকে, পুরানো অশ্বত্থ গাছটা, রাতের অন্ধকার জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে । গাছের পাতা, শাখা গুলো অন্ধকারে ছায়া হয়ে ঝুলছে ! আকাশে চাঁদের আলো , সাদা হয়ে গাছের মাথায় পড়ছে , চারপাশটা সেই আলোয় ভেসে গিয়েছে, শুধু গাছের মাথায় জমাট অন্ধকার ! 

এই গাছটাকে নিয়ে অনেক রূপকথা আছে, গ্রামে অনেকের মুখে - মুখে সেই রূপকথা যেন সত্যি হয়ে উঠেছে ! যদিও গাছটা , গণেশের বাড়ির সীমানার বাইরে , এক নিরাপদ দূরত্বে , তাও এই মুহূর্তে ভয় করছে । 

ভয় অনেক সময় মানুষের নিঃসঙ্গতা আর দুর্বল মনের প্রতিফলন। গণেশ দিনের বেলায় যে গাছে মাথা ঠেকিয়ে ক্ষেতে যায় । এই রাতে গাছের মাথার দিকে তাকিয়ে, সাদা লোমে ঢেকে থাকা বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল ! 

চারপায়িতে শুয়ে গণেশ ভাবছিলেন, গ্রামের লোকেরা বলে ওই গাছে এক ব্রহ্মরাক্ষস বাস করেন । তিনি কৃপা না করলে, ক্ষেতে ফসল ফলবেনা । তাঁকে আনন্দ দেওয়ার জন্য পুজো দরকার । সন্তুষ্ট করবার জন্যই প্রতি অমাবস্যায় মুরগী উৎসর্গ করা হয় । 

ঘুম পাচ্ছে । 

গণেশের চোখ দুটো লেগে গেল । সারাদিনের ধকলে ঘুম নামছে । 

আচমকাই নিঃশ্বাসের হাওয়ায়, কেঁপে উঠলেন। চোখে ঘুম আছে। জড়ানো চোখেই তাকিয়ে দেখলেন, আগের থেকেও চারপাশ আরও অন্ধকার হয়ে গিয়েছে । রাত অনেক । ঘরে কেউ নেই । আরেকটু ঘুমিয়ে তারপর উঠবেন , গণেশ টানটান হয়ে শুয়েছেন , আর ঠিক সেই সময়ই চোখে পড়ল ! 

প্রথমটায় ভেবেছিল চোর । তাঁর মতন গরীব কৃষকের ঘরে কিসের জন্য চোর চুরি করতে আসবে । তাহলে কে ? গণেশ পায়ের কাছে এক পুরুষ ছায়া মূর্তিকে বসে থাকতে দেখলেন । দেহের উপরিভাগ নগ্ন । নিম্মাংশ লজ্জা ঢাকার মতনই কাপড় জড়িয়েছে ; মাথার জটা ধরা চুলের স্রোত ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে । 

গণেশ তাকিয়ে রইলেন । এই অদ্ভুত রকমের মানুষটা কে ? 

⇌ ২

-অত ভয় পাচ্ছিস কেন ? 

সামনের লোকটার ভারী কণ্ঠস্বর শুনে , গণেশ চমকে গেলেন ! গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । বললেন - আপনি ?

লোকটি মাথা নামিয়ে বলল - এতক্ষণ যার কথা মনে - মনে ভাবছিলিস । প্রতিদিন , জমিতে যাওয়ার আগে আমার থানে মাথা ঠেকিয়ে যায় গ্রামের লোক । তুইও তাই করিস ... 

-মানে ?

-দূরের গাছটার দিকে তাকিয়ে দেখ । আমি ওখান থেকেই এসেছি ।

-বুঝলাম না ।

-এমনটাই হয় । মানুষ কানে যা শোনে , তা প্রথম দর্শনে মানতে চায়না । 

গণেশের মনের ভিতর অনেক প্রশ্ন , সে তাকিয়ে রয়েছে । 

লোকটি বলল - তোকে একটা গল্প বলছি , মন দিয়ে শুনবি । অনেক রাত হয়েছে । চারদিক বড় নিঃস্তব্ধ । এমন রাতে যদি কেউ কোন মানুষের ঘাড় মটকিয়ে দেয় , বলবার কেউ নেই ! বাঁচাতেও আসবেনা । কিরে ভয় লাগছে ?

গণেশ ঘামছে। টের পেলেন গলা আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে । চিৎকার করবার মতন ক্ষমতা নেই ! 

লোকটি হাসতে –হাসতে বললেন - ভয় নেই , আমার গল্প মন দিয়ে শোন । দেখবি এটা শেষ হলেই তুই আবার কথা বলবার শক্তি ফিরে পাবি , আমি চাইছি আমার গল্পের প্রতি তোর মনঃসংযোগে ব্যাঘাত না হয় । অবশ্য গল্প চলাকালীন তুই প্রশ্ন করতেই পারবি । মন দিয়ে শুনবি ...

অবন্তী নগরের খুব কাছেই , জলে ভরা ক্ষিপ্রা নদী । নদীর ধারে বিস্তীর্ণ ক্ষেত ভূমির মালিক দেবশর্মা । এই এলাকা তারই । নদীর জলে , পলির আদরে যে চওড়া ভূমি লালিত হচ্ছে , সেখানে যদি ফসলে ভরে যায় , খুব আনন্দ হবে । পরিশ্রমী নয় । হ্যাঁ ক্ষমতা আর পাশবিক বলে , এই অঞ্চল নিজের দখলে রেখেছে । এমনটা করে , এই তল্লাট ফাঁকা হয়ে গিয়েছে ! দেবশর্মা একপ্রকার নদীর ধারের ফাঁকা জমি দেখে ই দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল । 

সে বসন্ত কালের এক ভোরে । বহেড়া গাছের তলায় , পায়ের উপর পা তুলে , নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিল দেবশর্মা । ঘুম ভেঙে যেতেই , দেখল - চণ্ডাল এইদিকেই আসছে । এমন সুযোগ পেয়ে যাবে বুঝতেও পারেনি ! দশ বছর জমি ফাঁকা পড়ে রয়েছে । মাথায় বুদ্ধি খেলছিল । যেমন ভাবেই হোক , এই চণ্ডালকে বশে আনতে হবে । 

এখন একটা বুদ্ধির দরকার যাতে চণ্ডাল তার কথা শুনে , কাজ করে । মনে – মনে ভাবছিল ... 

চণ্ডাল আচমকা ফর্সা টকটকে , লম্বা মানুষটিকে শুয়ে থাকতে দেখে , চমকেই গেল । 

দেবশর্মার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল । গলা কাঁপছে । চণ্ডাল বলল 

-আমায় মাপ করে দিন । 

কেউ নিজে থেকে যদি আত্মসমর্পণ করতে চায় , তাকে বন্দী করবার মজাই আলাদা । দেবশর্মা দেখল , চণ্ডালকে এমন ভাবে বন্দী করতে হবে , সে ঋণে জড়িয়ে থাকে । ঋণ সে শোধ করবার জন্য আমার কাছেই আসবে । দেবশর্মা উঠে দাঁড়িয়ে স্থির চোখে গম্ভীর গলায় বলল

– এই ভূমির মালিক আমি । আমার নাম দেবশর্মা । 

কথা শুনে , হাত জড়ো করে চণ্ডাল বলল – আপনাকে দেখেই বুঝতে পেরেছি , এই ভূমির মালিক আপনি । আমি ভুল করে এই সীমানায় আসিনি । আমার খুব দরকার, এই গাছের কা , পাতা , ফল আর নদীর পিছনে যে বনভূমি রয়েছে, সেখান থেকে কিছু পাখি শিকার করব । এই নদীতে রুপালী মাছের ভেসে যাওয়া দেখে টের পেয়েছি , হাঁসের ঘুরে বেড়ানো দেখে আন্দাজ করেছি , খুব সুন্দর জায়গা । খাদ্যের কোন অসুবিধা হবে না । আমার পরিবারের জন্য এইখানে আসতেই হয়েছে । আমার পরিবারের পেটে খাদ্য তুলে দিতে হবে । তাই এই উত্তম স্থানের খোঁজে এলাম । 

দেবশর্মা হাসল । 

-এই নদীর মালিক আমি । বনভূমি আমার সীমানার মধ্যেই পড়ে । তুমি বিনা অনুমতিতে এখানে এসেছ । শিকার করছ । 

-আমি চণ্ডাল । পশুদের ছাল - চামড়া নিয়ে কারবার করি । এটা ঠিকই অন্যের ভূমিতে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করে অপরাধ করেছি । তাইবলে আপনাদের বিরোধী নই । আমি আপনার বিষ্ণু মন্দিরে পুজা দিয়েছি । প্রতি একাদশীতে উপবাস করি । এটাই আমার স্বভাব । হে ব্রাক্ষ্মণ পুরুষ আমায় উদ্ধার করুন । 

এই প্রথম দেবশর্মার মুখে হাসি খেলেছে । মন ভালো হয়ে গেল । অনেক দিন বাদে কেউ তাকে আবিষ্কার করল ! শুধু আবিষ্কার কেন , সম্মান দিল বলা যায় ! 

সেই অনেক দিন আগের কথা । দাদু , মানে বাবার বাবা, সেই সময়কার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল । এই ঘটনা দেবশর্মা শুনেছে , নিজের পিতার মুখে । 

বহুদিন দিন বাদে পিতার মৃত্যুর পর , এক অন্তজ চণ্ডাল যখন তাকে ব্রাক্ষ্মণ বলে সম্বোধন করল , আচমকাই একপুরুষের জীবিকা , সম্মানের মুহূর্ত ভেসে উঠল - চোখের সামনে । এই সম্মান দেবশর্মাকে বেশ আনন্দ দিল , উত্তেজিত করল । 

দেবশর্মা বলল – চণ্ডাল তুমি যা বললে তা ঠিক । আমার এক পুরুষ ব্রাক্ষ্মণ ছিলেন । তাঁদের ব্রহ্মতেজে আমরা বিশেষ শক্তির অধিকারী । তাই আমি তোমার অতীত সম্পর্কে অবগত ।

কথাটা শুনে , চণ্ডাল বলল - প্রভু , আমার অতীত !

-সকলেরই অতীত রয়েছে , তোমারও আছে । তুমি শুনবে সেই কথা ?

-আপনি আমার জন্মের রহস্য জানেন ! বলুন ...

চণ্ডাল হাত জোর করে হাঁটু ভাঁজ করে বসে পড়ল । সামনে দাঁড়িয়ে দেবশর্মা । মুখে স্মিত হাসি । সূর্য মধ্যগগনে ; দেবশর্মার মধ্যবসন্তের মতনই তা তেজে ভরপুর । দেবশর্মা বলল – আমরা দূরের ওই ছায়া ঢাকা স্থানটি আলোচনার জন্য বেছে নিতে পারি । অসুবিধা না থাকলে , ওইদিকে গিয়ে বসতে পারি ।

চণ্ডাল ও দেবশর্মা গাছের ছায়া ঢাকা উত্তম পাথরের তৈরী ঠাণ্ডা বিষ্ণু মন্দিরের ভিতর বসল । দেবশর্মা র পায়ের কাছে , পাথরের চাতাল ; চণ্ডাল পা’ ভাঁজ করে বসেছে । 

চণ্ডাল বলল – প্রভু আপনি কিছু বলছিলেন । 

-হ্যাঁ , তুমি চণ্ডাল হয়ে কেন জন্মেছো জানও ? এই চণ্ডাল জন্মের পিছনের এক করুণ কাহিনী রয়েছে । 

-করুণ কাহিনী ! না প্রভু আমি জানিনা । আপনি বলুন আমি জন্মের ইতিহাস জানতে চাই ... 

দেবশর্মা চোখ বন্ধ করে , পা ঝুলিয়ে বসে , চণ্ডালের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করল ..। 


⇌ ৩

অনেক দিন আগেকার কথা । এক সন্ন্যাসী একান্ত মনে ধ্যানে আচ্ছন্ন । তার অনেক অনুরাগী রয়েছে । ঈশ্বরের কথা সে , এমন সুন্দর ভাবে বলে , অনুরাগীরা বিভোর হয়ে থাকে । তাঁর এক শিষ্য ছিল । নাম তার চণ্ডু । মূলত গোশালার দেখাশুনো করত । সন্ন্যাসীর অদ্ভুত ক্ষমতায় , তাঁর ভক্তরা বিভোর হয়ে থাকত । চণ্ডু খুব কাছের শিষ্য । সন্ন্যাসীর অনেক খবরই সে জেনেছে । সন্ন্যাসীর নিজের একটি আশ্রম ছিল , ভক্তদের উপহারেই সেই আশ্রম চলত ।   

সন্ন্যাসী খুব সুন্দর কথা বলে মানুষকে সম্মোহিত করে ফেলতে পারেন। এই সম্মোহন বিদ্যা দীর্ঘ দিনের অনুশীলনের দ্বারাই আয়ত্তে এসেছে। একদিন গভীর রাত পর্যন্ত ধ্যানে ব্যস্ত ; চণ্ডু খুব ব্যস্ততায় প্রভুর সাথে দেখা করবে ; বিশ্রাম কক্ষের সামনে এসে অনুমতি চাইল ।

সন্ন্যাসী অনুমতি দিলেন । 

তখন মধ্যরাত । আকাশের অন্ধকার আশ্রমে মিশে গিয়েছে । সকলেই নিদ্রায় । এমন সময় উত্তম সময় , গোপন পরামর্শের জন্য । 

-আয় , মেঝেয় বস । 

সন্ন্যাসীর কথা শুনে , চণ্ডু ইতস্তত বোধ করছিল । আজ কিছু বলবে বলে এসেছে । এই কথা না বলে সে থাকতে পারছেনা । আবার গুরুদেবের সামনে বললে , তিনি রেগে যেতে পারেন । নিজের মনকে বুঝিয়ে নিচ্ছে । আজ তাকে বলতেই হবে । 

সন্ন্যাসী বললেন - কিছু বলবার থাকলে বলতে পারিস । 

চণ্ডু চুপ করে মাথা নামিয়ে বলল – আপনার ভক্তরা অনেক কিছুই দেয় । আপনি আমাকে অত অল্প দ্রব্য দেন কেন ?

সন্ন্যাসী হেসে বললেন - নিজের লোভকে সম্বরণ করা দরকার । তোর শিক্ষা সেই স্তরের মধ্যে দিয়েই চলেছে ...

চণ্ডু প্রণাম করে বেড়িয়ে এলো । 

মন খুব বিচিত্র । সন্ন্যাসীর ইঙ্গিত চণ্ডু বুঝতে পারল না , কিম্বা মানতে চাইল না । গোশালা থেকে গরু চুরি করে পালিয়ে গেল । 

এই পর্যন্ত বলে দেবশর্মা গল্প থামিয়ে দিল । চণ্ডাল বলল – প্রভু । চণ্ডুর কী হল ?

দেবশর্মা চোখ দুটোকে , দূরের দৃশ্যের দিকে রেখে বলল - এক সন্ন্যাসীর কথা না শুনে , চুরির জন্য তার বংশ মহাপাতক হল । চণ্ডুর দোষের শাস্তিই তোমরা ভোগ করছ । তোমার পূর্বপুরুষ চণ্ডু । 

চণ্ডাল মাথা নিচু করে রইল । ক্ষিপ্রা নদীর ঝুরঝুরে হাওয়া , তার শুকনো তেলাক্তহীন কেশ গুচ্ছকে উড়িয়ে দিচ্ছিল । সে হাওয়ায় পলির গন্ধ মেখে রয়েছে । এই মুহূর্তে মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না । 

দেবশর্মা , চণ্ডালের শক্ত পেশীবহুল চওড়া কাঁধে ডানহাত রাখল । বলল - চণ্ডাল , এটা কর্মযুগ । তুমি নিজের পূর্বপুরুষের পাপের জন্য প্রায়াশ্চিত্ত করতে পারো । সেই সুযোগ আমি তোমায় দেব ।

চণ্ডালের স্থির হয়ে যাওয়া চোখ দুটো আশার আলোয় ঝলমল করে উঠল ! আচমকাই মেঘ বাহিত আকাশের বুকে , কেউ বিদ্যুতের তলোয়াড় চালিয়েছে , এখনই ঝর - ঝর করে নামবে , মোহময়ী বৃষ্টি ! রুক্ষ প্রান্তরে বৃষ্টির স্বাদের মতনই , চণ্ডালের পাপঙ্খলনের সুযোগ ! 

-বলুন দেব , ব্রাক্ষ্মণ পুরুষ ... সেই পথ আপনি আমায় দেখিয়ে দিন । 

দেবশর্মা পুনরায় চোখ বন্ধ করল । বলল - চণ্ডাল , তুমি নিজের ভক্তি দিয়ে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারো ।

চণ্ডাল অবাক হয়ে বলল - কিছু মনে করবেন না দেব , ঠিক বুঝলাম না ! 

-তুমি পরিশ্রম করো । জমিতে চাষাবাদ করে ফসল উৎপাদন করো । এই যুগ চণ্ডালের মুক্তির যুগ । পরিশ্রম করে নিজের মুক্তির পথ প্রস্তুত করো । আমার জমিতে আমি তোমায় সেই সুযোগ দেব । তুমি দশ বছরের জন্য আমার জমিকে কর্ষণ করবে । তোমার শ্রম আছে , আমার সামর্থ্য । তুমি সমাজে প্রতিষ্ঠা তখনই পাবে , যখন এই সমাজের প্রচলিত অর্থ ব্যবস্থার অংশীদার হতে পারবে । অবন্তী নগরে যে আর্থিক পরিবর্তন ঘটছে , তাতে কৃষি ব্যবস্থার ভূমিকা রয়েছে । চণ্ডাল , তুমি যে জীবিকার সাথে যুক্ত তা মূলত যাযাবর অর্থনীতির অন্তর্গত । এই সময় নতুন সভ্যতা সৃষ্টির সময় । এই সময় স্থায়ী আর্থিক ব্যবস্থাকে বেছে নিতে হবে । গ্রামীণ সভ্যতায় কৃষিই তোমাকে মুক্তির পথ দেবে । আমার প্রস্তাব বিবেচনা করে জানিও । দশ বছর তোমাকে আমার জমি ব্যবহার করতে দেব । তোমার বয়স আমার থেকে কম । এখন তুমি ঠিক করবে , নিজের উত্তরপুরুষের জন্য কোন পথে হাঁটবে ? 

চণ্ডাল বলল - প্রভু , আমি মুক্তি চাই । 

⇌ ৪ 

ক্লান্ত দেহটাকে টানতে – টানতে নিয়ে যাচ্ছে চণ্ডাল । দেবশর্মা সেই দিকে তাকিয়ে ভাবছে - 

সেই সন্ন্যাসী , সেই রাতেই চণ্ডুকে খুন করেছিল ! এই রহস্য অবশ্য আজও , দেবশর্মাদের পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ । সন্ন্যাসীর বিলাস বহুল জীবন যাত্রার খোঁজ পেতেই , চণ্ডুর ভক্তির দেওয়াল ভেঙে যায় ! আর কাহিনী এখান থেকেই নতুন ভাবে মোড় নিয়েছিল । 

সন্ন্যাসীর কাছে চণ্ডু গিয়েছিল সেই রাতে , নিজের কথা বলতে । সে আর সন্ন্যাসীর আস্থায় নিজেকে মত্ত রাখতে পারছিল না । সে চাইছিল নতুন কৃষি অর্থনীতির জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দেবে । খাদ্য উৎপাদনের সাথে নিজেকে নিযুক্ত রাখবে । 

এই চিন্তা সমাজে ছড়িয়ে গেলে বিপদজনক হত । এই সমাজব্যবস্থায় ভক্তির সাথে একটা আর্থিক যোগাযোগ রয়েছে । কেননা যদি সকলেই গ্রামীণ শ্রমকে মর্যাদা দিতে শুরু করে , সন্ন্যাসীর ভাববাদের পক্ষে তা বিপদজনক হয়ে উঠত । চণ্ডু ক্রমশই নিজস্ব চিন্তার জন্য শ্রমজীবীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে পড়ছিল । সেই রাতে , অনুমতি নিতেই গিয়েছিল - নিজের মৌলিক মতবাদ প্রচারের জন্য । সন্ন্যাসী বুঝতে পারল , আর বেশী দিন নয় , চণ্ডু জনপ্রিয় হলে , ভক্তির মতবাদ ক্রমশই জনপ্রিয়তা হারাবে । তাই সেই রাতেই চণ্ডুকে খুন করা হয়েছিল । রাতারাতি দেহটাকে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল , রাতের শেষ প্রহরে ক্ষিপ্রা নদীর গর্ভে ; এর খুব কাছেই সন্ন্যাসীর আশ্রম । পরের দিন চক্রান্ত করে চণ্ডুর নামে গোধন চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছিল । 

দেবশর্মা ভাবছে , এই যুগেও চণ্ডুর বংশধরদের আয়ত্তে রাখতে হবে । চণ্ডালকে তাই একটা পাপমোচনের পথ দেখিয়েছি । তাদের শ্রমই সম্পদ । এই সম্পদের ব্যবহারই , এই ভূমির ছবি পাল্টে দেবে । কৃষি অর্থনীতিকে দূঢ়তা দেবে । 

কয়েক পুরুষ আগের ঘটনা । দেবশর্মা , নিজের দাদুর মুখে শুনেছে । নিজেদের সাত পুরুষের ব্যবসা পৌরহিত্যের বিরুদ্ধে তাঁদের কোন এক পূর্বপুরুষ কথা বলেছিলেন । তিনি বুঝতে পারেন নতুন অর্থনীতিতে কৃষিব্যবস্থা এক আধুনিক পরিবর্তন । সে ভাবেন , যদি জমির সহায়তায় কৃষি শ্রমকে সঞ্চিত করা যায় , খুব সহজেই মুনাফা লুঠতে যাবে । এই কারণেই ব্রাক্ষ্মণত্ব ত্যাগ করবে বলে ঠিক করেন । 

দেবশর্মাদের বংশ এখান থেকেই নিজেদের , ঋণ প্রদানকারী হিসেবে দেখতে শুরু করলেন । 

আজ চণ্ডালকে মুক্তির ফাঁদে ফেলে , তার কৃষি শ্রমকে দখল করে নিল ! দেবশর্মা হাসছে , সে বুঝতে পেরেছে - পিতা পুত্রের বচসা আর পৈতে না হয়েও , রাজবাড়িতে যজ্ঞের আগুনে আহুতির অপরাধের গল্প বানানো হয়েছিল । সেই গল্পের ভিতরের আসল রহস্যটি ! 

দেবশর্মা হাসছে । সে বুঝে গিয়েছে , চণ্ডালদের শ্রমকে এমন ভাবেই নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হবে । 


⇌৫ 

গল্পটা থেমে যেতেই , গণেশের খেয়াল হল , ভোর হতে হয়ত এখনো ঘণ্টা তিনেক বাকী আছে । সামনের কালো ছায়া মূর্তিটা অনর্গল যে সব ঘটনা গুলো বলছিল , নিজের চোখের সামনে ক্ষিপ্রা নদী , দেবশর্মা , অবন্তী নগর , কিম্বা সেই হতভাগ্য চণ্ডাল ! সে আজও হয়ত ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পায়নি । 

গণেশ বললেন - আচ্ছা দেবশর্মা সেই চণ্ডালের সাথে শেষ পর্যন্ত কী করল ? 

মূর্তি আচমকাই যেন উত্তেজিত হয়ে বলল - সব ঠিক চলছিল । দশ বছর পর , একদিন চণ্ডাল আচমকাই দেবশর্মার কাছে নিজের শ্রমের মূল্য দাবী করে বসল । 

-মানে ?

তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা হয়েছে । দেবশর্মা নিজের হিসেবের ঘরে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন । ঠিক তখনই ভগ্নপ্রায় দেহে চণ্ডাল এসে ঢুকল । বলল 

-প্রভু , আমাকে আমার পাওনা দিয়ে দিন । 

দেবশর্মা কিছুটা অবাক হলেও , নিজেকে শান্ত রেখে বললেন - আরে , তুমি তো মুক্তি চাইছিলে । আমার জমির সেবা কর । বিষ্ণু মুক্তি দেবে । পাপঙ্খলন হচ্ছে । ভয় নেই । তুমি আর চণ্ডাল থাকবে না । তোমার বংশধরেরাও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে ।

- প্রভু , সমস্ত পাওনা না পেলে , ফসলের ন্যর্য মূল্য না পেলে , আর চাষ করব না । আমার শ্রমের সম্মান চাই । কাজের সম্মানেই আমার মুক্তি । অন্য কিছুর দরকার নেই । 

-মানে ?

-মানে আমি আপনার কাছে চণ্ডাল হয়ে আসিনি , কর্ষক হয়ে এসেছি । ভূমির পিতা হয়ে এসেছি । আমার কর্মের মর্যাদা চাইছি । না পেলে , আপনার জমির দায়িত্ব আমার নয় । 

গণেশ নিঃশ্বাসটাকে চেপে রেখে বললেন – তারপর ... 

মূর্তি বলতে শুরু করল – চণ্ডালের ভিতর তার পূর্বপুরুষের আত্মা ভর করেছিল । দেবশর্মা টের পেয়েছিল , চণ্ডুর মতনই চণ্ডালও দেবশর্মার বিরোধীতা করবে । এখানেই থেমে থাকবেনা । হয়ত দেবশর্মার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিতে পারে ! দেবশর্মার শরীরে সন্ন্যাসীর রক্ত বইছে , তাই ...

-তাই কী ?

দেবশর্মা হাল্কা হাসি হেসে বললেন - ঠিকাছে । এই সময়ে কালকে আসবে । আমি সব পাওনা দিয়ে দেব ।

-তারপর সব হিসেব দিয়ে দিল ! 
মূর্তি ভারী গলায় বলল - এইবার চণ্ডালের লাশটাকে নর্মদা নদীর চরে পুঁতে দিল । 

গণেশ পা ভাঁজ করে , ঘন –ঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছে । - ইস ! এত নিষ্ঠুর !! 

-নিজের ক্ষমতা রাখতে হলে , চরম নিষ্ঠুরতাই দরকার । দেবশর্মারা বিদ্রোহীদের কখনও ক্ষমা করে না , আর করবেও না । 

মূর্তি কথা গুলো বলেই খুব আক্রোশে বলল - এরপর এক ভয়ঙ্কর অভিশাপ নেমে আসে , দেবশর্মার শেষ বংশধর আর তাঁর পরিবার - পৃথুদকে পালিয়ে যায় । কেননা , চণ্ডাল তখন আর জাতিতে চণ্ডাল নেই । তারা এখন একসাথে কৃষক । গ্রামীণ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক । দেবশর্মার পরিবার শাপিত হয়ে , পৃথুদকাতেই অনাহারে প্রাণ দিয়েছিল । তাদের মুক্তি হলেও, দেবশর্মা নিজে পৃথিবীতেই থেকে গেল ! 

গণেশ বড় – বড় চোখ করে বলল – মানে ? 

মূর্তি বলল - ব্রহ্মরাক্ষসের কথা শুনেছিস ? অতৃপ্ত , কৃষকদের শোষণকারী , দেবশর্মা এখন ব্রক্ষ্মরাক্ষস !! 

গণেশ বললেন - আপনি এত খবর কেমন করে জানলেন ?

এই সময় মূর্তি তীব্র অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল । হাসি শুনে গণেশের দেহ ঠাণ্ডা হয়ে আসছে । এই হাসি যেন তাঁকে গিলে খাবে ! এখন যদি ভোর হয়ে যায় , খুব ভালো হয় । তার শরীরটা অবশ হয়ে যাচ্ছে । উল্টো দিকের মূর্তির দিকে তাকিয়ে , এক আশ্চর্য ঘটনা লক্ষ্য করলেন । হ্যাঁ মূর্তিটা যেন ক্রমশই দূরে চলে যাচ্ছে । হ্যাঁ ওইতো অশ্বথ্থ গাছটার উপর উঠে গেল ! মূর্তির মাথাটা জমির দিকে , পা দু’টো আকাশের দিকে ; কেউ যেন অদৃশ্য হাতে টেনে নিচ্ছে । গাছের মাথার দিকেই মূর্তিটা উঠে যাচ্ছে । একসময়ের পরেই আর দেখা গেল না ! 

ভয়ে , সারা শরীর ঘেমে গেল ! গণেশ টের পেলেন , আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বেহুঁশ হয়ে যাবেন । ধপ করে চারপায়ির উপর হাত ছড়িয়ে শুয়ে পড়লেন , যতক্ষণ পর্যন্ত হুঁশ ছিল মুখ দিয়ে বিরবির করে বললেন - ‘দশ বছরে অনেক ঋণ । হে প্রভু উদ্ধার করো ... হুজুর আমার আর ঋণের দরকার নেই , মুক্তি চাই , মুক্তি... ’

chakrabortypinaki50@gmail.com



Comments
0 Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Blogger দ্বারা পরিচালিত.