শনিবার, জুন ৩০, ২০১৮

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৮ |
আমোদিনীঃ অন্তহীনা
পূর্বদিকের সমস্থ আকাশ ছোঁয়া বাড়িগুলি বোমার আঘাতে ভাঙিয়া গিয়াছে। হাজার হাজার মানুষ তাহাদের বাসস্থান হারাইয়াছে। নিজেদের পরিশ্রমে ও স্নেহে যে সংসার তাহারা তৈয়ারি করিয়াছিল তাহার মর্মান্তিক পরিণতি সকল কে মূক করিয়া দিয়াছে। সময় বুঝিয়া সকলে নিরাপদ স্থানে সরিয়া যাইতে সক্ষম হয় নাই। তাহারা বীভৎস মৃত্যুবরণ করিয়াছে।বিপুল পরিমানের ভয় ও ধ্বংস সকল কে কাঁদিতে ভুলাইয়া দিয়াছে। আমোদিনীর কোলে তাহার ল্যাপটপ ভিন্ন আর কিছুই নায়। তাহার পিতা অসুস্থ ছিলেন। তাহাকে সে টানিয়া বাহির করিতে পারে নাই। লিফট অচল হইয়া গিয়াছিল ।আমোদিনী একাই ছুটিয়া তাহাদের অষ্টম তলা হইতে কেমন করিয়া নামিয়া আসিয়াছে মনে করিতে পারিতেছে না। আধুনিকতম বোমারু বিমানগুলি বিস্ফোরণ ঘটাইয়া দ্রুত পশ্চিম আকাশে অন্তর্হিত হইল। তীব্র গতি ছিল তাহাদের কিন্তু তাহারা শব্দহীন। অ্যাম্বুলেন্স আসিয়াছে প্রায় বিশঘণ্টা পরে। আমোদিনী তাহাদের কঙ্কালের ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকা বাড়িটিতে পিতার অন্বেষণে যাইল। তাহার পিতা ভগ্নস্তুপের মধ্যে চাপা পড়িয়া আছেন, মৃত। আমোদিনী বুঝিতে পারিল সে পৃথিবীতে সম্পূর্ণ একা হইয়াছে। তাহার আর কিছু নাই।স্বেচ্ছাসেবকরা কয়েক জন আসিল। তাহারা দেহ বাহির করিবার চেস্টা করিতেছে। আচমকা আমোদিনী মুখ দিয়া অস্ফুট আওয়াজ করিল। পিতার পাশে তাহার প্রিয় কুকুরটি সেও চাপা পড়িয়া মরিয়াছে। সে আমোদিনীর সহিত পলায়ন করে নাই। প্রভুর সহিত সেও মৃত্যুবরণ করিয়াছে। আমোদিনী নিজের প্রতি ঘৃনায় এবার ভাঙিয়া পড়িল। ভগ্নস্তূপ সরাইয়া দেখা গেল তাহার পিতা কুকুরটির পিঠে হাত রাখিয়া স্থানু হইয়াছেন। এই অপূর্ব ত্যাগ দেখিয়া সকলেই অবাক হইল। আমোদিনীর হৃদয় আর মস্তিষ্ক অনুশোচনায় দগ্ধ হইল। 

পুনঃ আক্রমণ হইতে পারে।সকলেই উদগ্রীব হইয়া আছে। যদি কোন প্রশাসনিক সাহায্য পাওয়া যাইতে পারে। মধ্যরাত্রির এই ভয়াবহ আক্রমণ হইবার পর আরও বেশ কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে গিয়াছে। ভোর হইয়া যাওয়াতে ক্ষতি আর বীভৎসতা স্পষ্ট হইয়াছে। যাহারা বাঁচিয়া আছে তাহার মধ্যে অনেক গুলি শিশু অনাথ হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে দুইজন আমোদিনীর অতি পরিচিত, দ্বাদশ বর্ষীয় রুহা আর তাহার ছোট ভাই হারুন। দুইভাই একে অপর কে জড়াইয়া নিঃশব্দে কাঁদিতেছে। তাহাদের মাতা সম্পূর্ণ চাপা পড়িয়া গিয়াছে।এখন ও সন্ধান নাই।আর পিতা কিয়ৎক্ষণ পূর্বেও জীবিত ছিলেন। আমোদিনী আপনার অশ্রু মুছিয়া দুই ভাই কে পাশে লইল।সর্বস্ব হারিয়ে ফেলিয়া তিনজন একে অপর কে নির্ভর করিল। বেলা বাড়িল, উত্তাপ বাড়িল, সকলেই আশ্রয় খুঁজিতেছে। কঙ্কালসার বাড়ি গুলিতেই যার যার ঘরে গিয়া বসিতেছে। সন্ধ্যের পূর্বে সকল মৃতদেহ এক সাথে সৎকার করিবার ব্যাবস্থা হইল। অনেক গুলি বাচ্চা অনাথ হইয়াছে। আমোদিনী আর চার পাঁচজন যুবক যুবতী ইহা দের দেখাশোনা করিতেছে। বৃদ্ধ বুয়াম আমোদিনী কে কিছু খাদ্য চাহিতেছে। সে দুপুর পার হইয়া গেল কিন্তু কেন তাহাকে কেহ কিছু খাইতে দিতেছে না এই লইয়া অনুযোগ করিতেছে। সে বুঝিতে সক্ষম নহে যে কি ভয়াবহ ক্ষতি হইয়া গিয়াছে। তাহার নাতি তাহাকে ধমক লাগাইতেছে।এতো দুঃখের মধ্যেও ইহা হাস্যরসের কারণ হইতেছে।

চারদিন কাটিয়া গেল। আরও একবার আক্রমণ হইয়াছে। আট টি শিশুকে লইয়া আমোদিনী খুব সন্তর্পণে মাটির নিম্নের একটি ঘরে আশ্রয় লইয়াছে। তবুও সে বুঝিতে পারিতেছে, যদি আর একবার আক্রমন ঘটিয়া থাকে,তাহাদের মৃত্যু অনিবার্য। বৃদ্ধ বুয়াম আর তার নাতি যে কোথায় সে জানিতে পারে না। শিশুগুলির মধ্যে একজনের সুন্দরী যুবতী মা রাত্রের অন্ধকারে হারাইয়া গেল কি করিয়া তাহা কেহ জানে না। শিশুগুলির মধ্যে রুহা একটু সাহসী কিন্তু সকলেই বড় দুর্বল। ভগ্নস্তূপে পরিনত গৃহগুলি খুঁজিয়া খুঁজিয়া খাবার সংগ্রহ করিয়া আনে রুহা আর হারুন।কখন ও প্যাকেটবদ্ধ বিস্কুট কখনও বন্ধ ফ্রিজাএর অভ্যন্তর হইতে তখনও খারাপ না হয়ে যাওয়া খাদ্য। ভাগ করিয়া তাহারা খাইয়া লই। দুটি কন্যা শিশুর প্রবল জ্বর হইয়াছে। কোন ঔষধের ব্যাবস্থা করিতে মোদিনী সক্ষম হয় নাই। আমোদিনী কেবল ভাবিতে লাগে,তাহার ল্যাপটপ টাতে যদি কোন ভাবে ইন্টারনেট যোগাযোগ করিতে সে সক্ষম হইত। তাহলে নিশ্চয় তাহার বিশ্বময় ছড়িয়ে থাকা বন্ধুদের কাছ হইতে কিছু সাহায্য সে লাভ করিত। যদি সাহায্য নাও পাইত, অন্তত অনেক মানুষ কে জানাইতে সক্ষম হইত যে কি ভয়ানক এই যুদ্ধের ধ্বংসলীলা।

মাঝে মাঝে কাহারা সব আসে।বাড়িগুলির ভিতরে ঢুকিয়া কিছু খুঁজিয়া দেখিয়া লয়। দামী তৈসজপত্র লইয়া যায়। আমোদিনী লুকাইয়া থাকে। নারীর সর্বদা ভয়। তাহার শরীর লুকাইয়া রাখিতে হয়। স্নান করিতে ইচ্ছা করে তাহার। কোন ত্রাণ শিবিরে তাদের আমন্ত্রণ করে নাই। তাহার পিতা ভিন্ন আর কেহ ছিল না। কোথায় যাইবে সে। অন্য সকলেই এই স্থান পরিত্যাগ করিয়াছে।দেশের আসল অবস্থা সে বুঝিতে পারিতেছে না। পুলিশ কিংবা মিলিটারি এখন অবধি কাহারও আর দেখা পাওয়া যায় না। যে স্বেচ্ছাসেবকরা সেইদিন তাহাদের উদ্ধার করিয়াছে তাহারা কোথায়? আটটি শিশু আর আমোদিনী

খাদ্যহীন,জলহীন,ঔষধহীন হইয়া কাহারো উপকারের আশায় কিভাবে আর অপেক্ষা করিবে। দিনের আলোতে প্রবল উত্তাপ। মরুর বালু রাশি উড়িয়া উড়িয়া আরও শুষ্ক করিয়া দিতেছে।শহরের মূল প্রশাসনিক অঞ্চলের দিকে কাল ভোরে যাইতে হইবে।একটি গাড়ি হইলে ভালো হইত,এতো দীর্ঘ পথ ইহারা হাঁটিতে পারিবে? আমোদিনী হিসাব করিল তাহার রজঃস্বলা হইবার দিন আগত। সে কি করিবে। আকাশভরা তারার দিকে তাকাইয়া আমোদিনীর আজ কান্না পাইতেছে। পিতা আর পিতার কুকুরটির ন্যায় মরিয়া গেলে ভালো হইত। এতো কষ্ট করিতে হইত না। 

মাটি কাঁপিয়া উঠিল।মধ্যরাত্রে আবার কোথাও আক্রমন হইল। থামিলে অবশ্যই আজ এই স্থান ত্যাগ করিয়া অন্য কোথাও শিশু গুলি কে লইয়া যাইতে হইবে। সব কটি শিশু তাহাকে জড়াইয়া বসিয়া আছে। পুনঃ পুনঃ আক্রমণে তাহাদের ভয় সহ্য করিবার ক্ষমতা বাড়িয়াছে।ইহাদের আর বুঝাইতে দিতে হয় না বিপদের তীব্রতা কতখানি,শান্ত হইয়া থাকে। ভোরবেলা সূর্য উঠিবার পূর্বে চারিধারে এতো বালি উড়িতেছে যে কিছু দেখা যায় না। শিশুগুলি কে কোলে কাঁধে লইয়া যাত্রা শুরু করিল আমোদিনী। হারুন আর রুহা তাহাকে খুব সাহায্য করিতেছে। জঠরে অগ্নি জ্বলিতেছে। ধুলা বালির পর্দা সরাইয়া তারা মূল শহরের দিকে যাইবে বলিয়া স্থির করিয়াছে। কাল ঐদিকে কোন আক্রমন হয়নি। পথি মধ্যে মাত্র কয়েক জনের দেখা মিলিল। তাহারা কেমন সন্দেহের চোখে তাকাইতেছে। নিজেদের চেনা অঞ্চল শেষ হইবার পূর্বেই সকলের শরীর অবসন্ন হইল। বিশ্রাম প্রয়োজন। একটি ভগ্ন পরিতক্ত্য গ্যারেজ পাইল তাহারা। একটি গাড়ি সেখানে আছে। আমোদিনী গাড়ি চালাইতে জানে। গাড়িটির ছাদ ভাঙিয়া গিয়াছে। কাঁচগুলি বিপদব্যাঞ্জক কিন্তু যদি ইহা চালাইতে পারে তাহলে শিশুগুলিকে ত্রাণ শিবিরে আশ্রয়ের ব্যাবস্থা করা যায়।হারুন আর তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রুহা সকল কাঁচ সরাইয়া পরিষ্কার করিয়া গাড়িটি বসিবার উপযুক্ত করিয়া তুলিল।অতি ক্ষুদ্র আশার আলোটি দেখিয়া শিশুরা উৎসাহিত হইল। তাহারা দীর্ঘ পদচারনায় অভ্যস্থ নহে। আমোদিনী দেখিল গাড়িটি জীবিত আছে।সে তাহার মানসিক অবসন্নতা কাটাইয়া নব উদ্যমে বাঁচিবার আর বাঁচাইবার কথা ভাবিতে লাগিল। আবার তাহারা খাইতে পাইবে, পরিস্কার জল পান করিতে পারিবে, স্নান করিতে পারিবে। 

গাড়ি লইয়া দ্রুত শহরে আসিয়া আমোদিনী বুঝিল ত্রানের কোন ব্যাবস্থা সেখানে নাই। প্রচুর মানুষ মারা গিয়াছে।যাহারা আছে তাহারা রাসায়নিক অস্ত্রের আক্রমণে ভয়াবহ ভাবে অসুস্থ।একটি পরিতক্ত ঔষধের বিপনি হইতে বেশ কিছু ঔষধ, ব্যান্ডেজ, পানীয় জল সে তুলিয়া লইল। এই স্থান হইতে তাহাকে পালাইতে হবে। তাহার ল্যাপটপ টি কে বহুশ্রম করিয়া চার্জ করিতে পারিল কিন্তু ইন্টারনেট এর সহিত যুক্ত করিতে সক্ষম হইল না।এই স্থল হইতে খাদ্য সংগ্রহ আরও বিপদের হইবে বলিয়া মনে হইল তাহার।আর কোথায় যাওয়া যায়। মরুভুমির উদ্দেশে যাওয়া উচিৎ হইবে বলিয়া তাহার মনে হইল। মরুভুমিতে আক্রমন হইবে না। তবে দস্যু থাকিতে পারে। কিন্তু পার হইতে পারিলে আর একটি জনপদ।যদি ত্রাণ শিবির জুটিয়া যায় কিংবা খাদ্য। 

মধ্যরাতে মরুভুমি পার করিবার পূর্বে আমোদিনী আর তাহার শিশুরা অন্য শহরটি কে বোমা পড়িয়া ধ্বংস হইয়া যাইতে দেখিল। শত্রুপক্ষ যদি গাড়িটি কে লক্ষ্য করিয়া বোমা নিক্ষেপ করিয়া থাকে তাহলে আরও বিপদ হইবে। গাড়ি ত্যাগ করিয়া দূরে গিয়া বালি সরাইয়া সকলে আশ্রয় লইল।

ভোর হইলে দুটি ঘটনা ঘটিল। অসুস্থ শিশুকন্যা দুটির একটি নিঃস্পন্দ হইল অন্যদিকে ল্যাপটপটি তে যোগাযোগ স্থাপন হইল। মৃতদেহ টি কোলে করিয়া আমোদিনী শিশুদের ত্রানের ব্যাবস্থা করিতে সক্ষম হইল। একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হেলিকপ্টার পাঠাইবে। তাহারা যেন স্থান পরিবর্তন না করিয়া স্থানু থাকে। সারাদিন কোন হেলিকপ্টার আসিল না। ক্ষুধা,তৃষ্ণা আর উত্তাপে মৃত প্রায় সকলে। আমোদিনী নিজেকে নিজে বারংবার প্রশ্ন করিল সে কেন বাঁচিয়া আছে। দ্বিতীয় অসুস্থ শিশুটিও অসাড় হইয়া যাইতেছে।অন্ধকার নামিয়া আসিল। ল্যাপটপ টির চার্জ শেষ হইয়া গিয়াছে। একটি হেলিকপ্তারের আওয়াজ পাইল আমোদিনী। তাহারা সকলে মিলিয়া চিৎকার করিল কিন্তু নিঃসীম অন্ধকারের মধ্যে কেহ তাহাদের দেখিতে পাইল না। ঘুরিয়া আবার আসিতেছে। আমোদিনী গাড়িটির দিকে ছুটিয়া গেল। একটি বোতলের তলানিতে কিছু খনিজ তৈল পড়িয়া আছে। সে তাহার মাথায় ,পোষাকে তাহা ঢালিল। গাড়ির ভিতরে পুরাতন মনিবের সিগারেটের সহিত একটি লাইটার ছিল।তাহার পর......

ইন্টারনেট,কাগজে, টিভিতে খবর টি সারা পৃথিবীময় রাষ্ট্র হইয়া গেল। এক সদ্য তরুণী হেলিকপ্টারের মনযোগ আকর্ষণের হেতু নিজের শরীরে অগ্নিসংযোগ করিয়াছে। হেলিকপ্টার হইতে মানবাধিকার কর্মীরা সেখানে নামিয়া সাতটি প্রায় মৃত প্রায় শিশু আর একটি মৃত শিশু উদ্ধার করিয়াছে। তরুণী কে বাঁচানো সম্ভব হয় নাই। রুহা নামে শিশুটি কেবল কাঁদিতেছে আর বলিতেছে,“ আমরা যাতে বেঁচে যাই , আমাদের যাতে তোমরা দেখতে পাও তাই গায়ে আগুন দিল, এবার আমাদের কে দেখবে?” 

niveditaghosh24@gmail.com

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-