শনিবার, জুন ৩০, ২০১৮

জয়া চৌধুরী

শব্দের মিছিল | জুন ৩০, ২০১৮ |
El Don Juan দোন খুয়ান /  বেনিতো পেরেস গালদোস অনুবাদ- জয়া চৌধুরী
“আমার কাছ থেকে পালাতে পারবে না এটা। পালাতে পারবে না, যদিও যতকটা নরকের শক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছি আমি সবকটার বিরোধিতা করেছে ওরা”- কিছুটা দূরে থেকে ওর পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে বললাম আমি। একফোঁটাও চোখ সরাই নি ওর ওপর থেকে। ওর সঙ্গীর কাছ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কোন সাবধানতাই নিই নি। ওভাবে গেলে কী কী বিপদ ঘটতে পারে সে কথা না ভেবেই হেঁটে যাচ্ছিলাম। 

কী ভীষণ মনে পড়ে ওকে! লম্বা, ছিপছিপে স্বর্ণকেশী সুন্দরী, বিশাল বড় বড় দুখানা চোখ, মরালীর মত আভিজাত্যময় চলাফেরা, আর পটচিত্রের মত সুহাসিনী মুখ। টানা নাক এসে শেষপ্রান্তে ঈষৎ বেঁকে গিয়েছে, আর তাতেই মুখখানায় তাচ্ছিল্য ও ঔদ্ধত্যের রূপ দিয়েছে, আদ্ধেক দুনিয়াকে পায়ের তলায় রাখতে পারবে তা। উষ্ণ ও ক্লান্ত ওর শ্বাস প্রশ্বাস । সেন্টিমেন্টাল যন্ত্রের চলাফেরার ফলে ওর সবকিছুই আগ্নেয়গিরির মত বিস্তার আর অবিচলিত নিবাত ডিপ্রেশন দিয়ে চিহ্নিত, যা দিয়ে সে ইংল্যান্ডের অভিজাত নাইট শ্রেণীর ভদ্রলোকদের মত অনায়াস গরিমায় হেঁটে যেত। ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখদুটো সাধারণত আধবোজাই থাকত। ওর গায়ের রঙ যে উষ্ণ উদ্ভাসের জন্ম দিত সেখান থেকেই জোরালো ছটা বের হত। হারিয়ে যাওয়া ফুলকিগুলো জ্বলত অথচ ওর দৃষ্টিটাকে নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞাও দেওয়া যেত না। কিন্তু আমার মন চাইত পুড়িয়ে দিই , বুকটা ধকধক করত ঠিক আলোর চারপাশে মরীয়া ঘুরতে থাকা প্রজাপতির মত। ওর ঠোঁট দুটো সূক্ষ্মতম প্রবালের মত, ঘাড় শ্বেত স্ফটিকের মত গরীমাময়, দুটো হাত যেন মার্বেল ছেনে গড়া, সূক্ষ্ম অথচ ভঙ্গুর , সূর্য অস্ত যাবার সময় যেমন অন্ধকার হতে থাকে ঠিক সেইরকম দেখাত ওর সোনালি চুলের রাশি। মুখের দক্ষিণ ভাগ, নাকের চূড়োর কিছুটা অংশ আর মুখগহবরের সঙ্গে প্রায় এক দ্রাঘিমায় থাকা গালের অংশটুকু যেন চাঁদের মত। চুলগুলো ওকে সাজিয়ে তোলে লোভনীয় করে, হাওয়ার উড়তে থাকা চুল, শস্যক্ষেতের মত দোল খায়। পাদুটো এত সুন্দর ছিল যে যখন ও হেঁটে যেত খোয়া নুড়িগুলোও ফুলে রূপান্তরিত হত। চলার সময় ওর দুলে ওঠা বুক, হেলতে থাকা চুল... কি বলে বোঝাব তা? ওর শরীর বিজলী উদ্ভাসের এক অনন্ত কেন্দ্র, ডুবোজাহাজের শৃঙ্খলের ভেতর থাকতে গেলে তা এক বছরের খাবার প্রায়।

ওর গলা শোনা যায় নি, হঠাত করেই তা কানে এল। কী কন্ঠ! ঈশ্বর! মনে হচ্ছিল স্বর্গের সব দেবদূতেরা ওর মুখ দিয়ে কথা বলছিলেন একসঙ্গে। মনে হচ্ছিল চাঁদের সুরেলা সঙ্গীত ধ্বনিত হচ্ছে, ওর মুখের ওপরে আঠেরো সিম্ফনির স্বরমালা লিখে দিচ্ছে। সেই সুর গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম মানে বলতে চাইছি ওকে গিলতে লাগলাম, কেননা নাহলে সেই চাঁদ গিলে খেত আমায়, সেই লেন্টিল স্যূপের জন্য দুনিয়ার সব দোন খুয়ানকে ছাড়িয়ে আমাকে আমার জন্মসিদ্ধ অধিকার দিয়ে দিয়েছিল।

ওর গলায় এই শব্দগুলোই উচ্চারিত হল যা কখনও ভুলি নি। 

- লাউরেন্সো, তুমি জানো ও মুখভরতি কি খেতে পারে?- ওটা ছিল মুর্গী।

- মি লর্ড, ওর স্বামী বলল, যে কিনা ওর সঙ্গে সঙ্গেই থাকত, - এখানেই আমাদের শতাব্দীর সেরা কফিটা পান করার জন্য মিলবে, ঢুকে পড়ুন, আমরা মিষ্টি হ্যাম খাই। 

ওরা ঢুকেছিল সেখানে, আমিও। বসলাম ( ওর মুখোমুখি), খেলো ওরা, আমিও খেলাম ( ওরা হ্যাম খেলো , আমি... মনে পড়ছে না আমি কি খেলাম, তবে এটা নিশ্চিত আমিও খেয়েছিলাম কিছু। )

ওর স্বামী আমার ওপর চোখ থেকে সরায় নি। দেখে মনে হচ্ছিল লোকটাকে বিশেষ করে আলারকন শহরের কারিগর দিয়ে বানান হয়েছে যাতে গালিসিয়ার সেই মহিলাকে আরো বেশী সুন্দরী বলে মনে হয়। যেন পারো দ্বীপের [ এক গ্রীক দ্বীপ] মর্মর মূর্তির মত বেনভেনুতো সেল্লিনির [ইতালীর বিখ্যাত স্বর্ণকার ১৫০০-১৫৭১] হাতে বানানো মূর্তি। লোকটা বেঁটেখাটো ভারী চিবুকওয়ালা পুরুষ, পুরোনো পুঁথির মলাটের মত খসখসে হলদে মুখ। তার কৌণিক ভুরুগুলো আর নাকের শীর্ষ রেখা ও মুখের কিছু নিজস্ব লিপি ছিল। সেটাকে কোন গায়ে গতরে মোটা, সাতশো পৃষ্ঠার পুরোন, অপাঠ্য, পোকায় খাওয়া বইয়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। লোকটার নীল বর্ডার দেওয়া বাদামী- ছাই রঙের গাবানের ওভারকোটে পরা ছিল। 

তারপরে জেনেছিলাম লোকটা পুরোনো বইয়ের সংগ্রাহক।

সুন্দরীর মুখ দিয়ে আমি ওই মুখটা মুছে দিতে শুরু করলাম। 

প্যালেন্টোলজি বা জীবাশ্রম সংক্রান্ত বিজ্ঞানে আমি বেশ দড়। তক্ষুণি বুঝে ফেললাম ভাষাটা কি? ওটা আমার পক্ষেই কথা বলেছে।

- ভিক্তোরিয়া- আমি বললাম। আর নিজের ক্যাটালগে নতুন শিকারকে নথিভুক্ত করে চিহ্নিত করানো শুরু করলাম। 

ওরা খাওয়াদাওয়া করে ক্লান্ত হয়ে পড়ল তারপর চলে গেল। বেরোনোর সময় মেয়েটা আমার দিকে চাইল। লোকটাও ভয়ংকর চোখ পাকিয়ে তাকাল আমার দিকে, বোঝাতে চাইল এসব সে বরদাস্ত করবে না। দেখে মনে হচ্ছিল তার মুখের প্রত্যেক রেখা থেকে আগুনের ফুলকি ছুটছে। আমাকে বোঝাচ্ছিল সেগুলো যেন আমি তার হৃদয়ের কোমল খুব গোপন কোন পাতাকে আহত করে ফেলেছি- ঈর্ষার কোন পাতা কিংবা আঁশ। 

ওরা বেরিয়ে গেলো, আমিও বের হলাম।

তখন আমি ছিলাম দোন খুয়ান, দুনিয়ার সবচাইতে নামী নায়ক, বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত মনুষ্য প্রজাতির আতংক এক। 

আমার জয়ের সিরিজের গল্পগুলো শেষ হবার গল্প নয়। সবাই আমাকে নকল করতে চাইত। আমার হাবভাব আমার পোশাক আসাক সব কিছু নকল করত। দূর দূর পৃথিবীর থেকে লোক আসত শুধু আমায় দেখতে। রোমাঞ্চকর ঘটনাটা যে দিনটায় ঘটেছিল বলে তোমাদের বলছি সেটা ছিল গরমকালের এক দিন। একটা সাদা গেঞ্জি আর জলপাই রঙের গ্লাভস পরে গেছিলাম যেগুলো উচ্চকিত হয়ে বলছিল ‘আমাকে খাও” ।

সবাই থেমে গেছিল , আমিও থামলাম। ভেতরে ঢুকল সবাই, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওরা ওপরে উঠল, সামনের এক ফুটপাথের পাশ দিয়ে গেল ওরা। 

পাঁচতলার ব্যালকনি থেকে একটা ছায়া উঁকি দিল- ওই যে ঐ তো মেয়েটা! খর নজরে দেখে আমিই বলে উঠলাম। 

কাছে এগিয়ে গেলাম, উঁচুতে তাকালাম, একটা হাত বাড়ালাম, কথা বলতে যেই মুখ খুলেছি “করুণাময় ঈশ্বর!” “আমার মুখের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পড়ল”... কিসের? এইসব জিনিষের নাম করি আমি, যেমন আমার গেঞ্জি আর গ্লাভস জোড়া ছিল।

রাগে গা জ্বলে গেল। আমি হারিয়ে ফেললাম ওদের। প্রচন্ড রাগে আমি দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগলাম।

তিনতলায় পৌঁছে, বুঝতে পারলাম ওরা পাঁচতলার দরজা খুলে রেখেছে। স্বামীটা মুখ বাড়াল। তারপর সমস্ত শক্তি দিয়ে আমার মাথার ওপর কি যেন ছুঁড়ে ফেলল। ওটা সত্তর পাউন্ড ওজনের একটা বই ছিল। তারপর একই ওজনের আর একটা বই ছুঁড়ল। তারপর আর একটা, তারপরে আরো। নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলাম। বইয়ের পর বই থেকে বাঁচাতে বাঁচাতে শেষমেশ Compilatio decretalium “পোপের সম্পূর্ণ চিঠি” বইটা মাথার ওপর পড়াতে ধুপ করে মেঝেয় পড়ে গেলাম, জ্ঞানহীন হয়ে।

জ্ঞান ফিরে এলে দেখলাম একটা ময়লা ফেলার গাড়িতে পড়ে আছি।

সেই গোলাপের বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। তারপর যতটা পারলাম সরে গেলাম সেখান থেকে। জানলার দিকে তাকালাম। দেখি সেখানে আমার জহ্লাদ মশাই সকালের স্যুট পরে দাঁড়িয়ে আছে। হল্যান্ডবাসীর মত পোশাক পরনে। বিশ্রীভাবে হাসছে, রাগভরা চোখ নিয়ে আমাকে কুশল ছুঁড়ে দিল। 

আমার ১০০৩ তম অ্যাডভেঞ্চার এখানেই শেষ হল। ওটাই আমার প্রথম হার যেটা সারাজীবন আমায় জ্বালিয়েছে। আমি। হিজ এক্সেলেন্সী দোন খুয়ান, যার সামনে কিনা যে কোন সুন্দরী, রমণীয়, আত্মবিশ্বাসী, সাহসীরা, দুনিয়ার সবচেয়ে নিখুঁত ভগবানও হাল ছেড়ে দেয়...! প্রথমবারেই প্রতিশোধ নেওয়াটা জরুরী ছিল। সে সৌভাগ্য আমার সামনে আসতে দেরী করল না।

তখন আইই! আনন্দে গোটা পৃথিবী বেড়াতে লাগলাম। নানান জায়গা দেখে বেড়াতে লাগলাম, নানান থিয়েটার, আড্ডা, এমনকী গির্জাগুলোও। 

একদিন রাতে সুযোগ যে কিনা চিরকাল আমার পথপ্রদর্শক ছিল , সে আমাকে নিয়ে এসেছিল নাইন্থ চ্যাপেলে। সন্দেহজনক কোন সূত্র এগিয়ে না দেবার জন্য গির্জার নাম উল্লেখ করতে চাই না । চ্যাপেলে লুকিয়ে ছিলাম, যেখান থেকে দেখা যেত না আমাদের অথচ প্রতিযোগিতার ওপর নিয়ন্ত্রণ করা যেত। থামের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একটা ছায়া দেখলাম, একটা শরীর, নারীর। ওর মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না, শরীরটাও না, এমনকী হাঁটা চলা, কোমর কিচ্ছু না। কারণ একটা কালো আলখাল্লা মত পোশাক দিয়ে মাথা থেকে গোড়ালি ঢাকা দেওয়া ছিল ওর। তবুও আমরা দোন খুয়ানরা যেরকম অসাধারণভাবে আন্দাজ করে থাকি ঠিক সেভাবেই বুঝতে পারছিলাম ও সুন্দরীতমা। 

মেয়েটা প্রার্থনা শেষ করল। বেরিয়ে পড়ল, আমিও বের হলাম। এক তরুণ ওর সঙ্গে যাচ্ছিল, ওর স্বামী! নিজের মুখ দিয়েই বেরিয়ে এল, কোন মধুচন্দ্রমার রাতে হওয়া বিয়ে। 

ওরা ঢুকল, আমি থেমে গেলাম। চোখ পড়ল কাছের এক রেস্তোরাঁতে কাঁকড়া ও চিংড়ির পদ থরে থরে সাজিয়ে রাখা লোভনীয়ভাবে। ওপরে তাকালাম। ওহ কী সৌভাগ্য! একটা মেয়ে বারান্দায় এল, হাত বাড়াল, আমাকে ইশারায় ডাকল... দেখাল বই সংগ্রহকারী লোকেদের মত হাতে কোন শোবার ঘরের জিনিসপত্তর বা ফ্লাস্ক কিচ্ছুটি নেই, কাছে এগিয়ে এল। উড়ন্ত প্রজাপতির মত একটা পাতা প্রজাপতির মত ডানা ছড়িয়ে উড়ে এল আমার কাঁধের ওপর। পড়লাম। ওটা একটা নেমন্তন্ন! বাগানে উঠে যাওয়া খুব জরুরী। ওটাই আমার খুব ভাল লাগল। পরদিন রাতের বেলা দেওয়াল টপকে ওর বাগানে লুকিয়ে রইলাম।

একটা নীলচে নিভু নিভু চাঁদের আলোর ছটা ডালপালার ফাঁক ফুঁড়ে এসে পড়ছিল। মন খারাপ চেপে বসছিল, সেই চারকোণা মাঠটায়, গাছপালা মাটি সব কিছুর ওপর আলোর তুলি বুলিয়ে দিচ্ছিল। 

গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে একটা সাদা ছায়া আসতে দেখলাম, ধোঁয়া ধোঁয়া। ওর পায়ের আওয়াজ শুনি নি। রহস্যময় ভঙ্গীতে হেঁটে আসছিল ও, যেন কোন নরম বৃষ্টির ছাঁট ওকে এগিয়ে আসতে ধাক্কা দিচ্ছিল। কাছে এসে একটা হাত তুলে নিল নিজের হাতে। অভিধানের সবচেয়ে সুন্দর শব্দগুলো হাতড়াচ্ছিলাম তখন আমি, পায়ে পায়ে চলে গেলাম দুজনে বাড়ির ভেতরে। অলস মরালীর মত হাঁটছিল ও, সামনে একটু ঝুঁকে। এলিজি প্রাসাদে ঢোকবার সময় মিষ্টি ছায়াগুলো নিশ্চিত এভাবেই হাঁটে। [এলিজি প্রাসাদ- ফরাসী দেশের রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ] । পোপ দ্বিতীয় পায়াসের সামনে নিশ্চিত এভাবেই পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল দিদো-র। [দিদো- প্রাচীন গ্রীসের কারথেজের রানী] ।

অন্ধকার একটা ঘরে ঢুকলাম আমরা। আমার কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু বলল ও। চট করে মনে হল সুরেলা কোন সঙ্গীত, দাঁতের ফাঁকে শিস দেওয়া। যাই হোক, সেই সুর নিশ্চয়ই কোন জীবন্ত ভালবাসার শিখায় জ্বলতে জ্বলতে কোন বুক থেকে বেরিয়েছিল। হাঁটু গেঁড়ে বসলাম। দুহাত বাড়ালাম ওর দিকে। ... ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা অদ্ভুত হাসির আওয়াজ ভেসে এল কানে । দরজা খুলে গেল আর কুড়িজনেরও বেশি লোক হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। আমায় লাঠি দিয়ে পিটতে শুরু করল আর ঠাট্টা করে হো হো হাসতে লাগল। যে কাপড়টা দিয়ে মাথা ঢাকা ছিল সেটা পড়ে গেল। আর আমি দেখলাম স্বর্গের ঈশ্বরকে!! সে ছিল নব্বুই বছরেরও বেশি বয়সী এক বুড়ি। দুমড়ানো কোঁচকানো, মমির মত শুকনো মুখের ডাইনি। জরাজীর্ণ বয়সের ছাপ তার সর্বাঙ্গে। ক্রুদ্ধ কুকুরীর মত গোঁ গোঁ করছে তার গলার স্বর। নাকটা শিঙার মত, মুখগহবর চোরেদের মত বাঁকানো। ওর চোখ দৃষ্টিহীন আর জঘন্য চোয়াল, হাসছিল। পিশাচী! এমন ভাবে হাসছিল ঠিক যেন শয়তান লুসিফারের ঠাকুমা। এমন ভাবে হাসছিল যেন দোন খুয়ান ওর সঙ্গে কোন পিরিতের কথা বলেছে।

লোকগুলোর পিটুনি আমায় পেড়ে ফেলেছিল। আমার দন্ডদাতাদের মাঝখানে ছিল সেই বইসংগ্রাহক লোকটা আর তার বৌ। দেখে মনে হচ্ছিল ওরাই এই চিত্রনাট্যের লেখক।

লাথি, ঘুষি, বেতের বাড়ি, ধোলাই দিয়ে ওরা আমায় জনসমুদ্রের মাঝখানে রাস্তায় বের করে দিল। কথা নেই বার্তা নেই তাদের মাঝে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম । অনেকক্ষণ ওভাবেই ছিলাম যতক্ষণ না ঝাড়ুদার সাফাইকর্মীরা এসে আমায় জাগায়। পৃথিবীর সবচেয়ে নন্দিত দোন খুয়ান, অন্যেরা যাকে স্টাইল হিসাবে অনুসরণ করে, তার একমাত্র অভিযান এমনই ছিল। বরাবর আমার এত কপাল খারাপ যে সারা রাত ধরে জমা নোংরা তুলে নিয়ে যাওয়া যে ট্রাকগুলোর কাজ আমি তাদেরই সমানে থামিয়ে যেতাম। সেদিন ওরা এখানে নিয়ে এল আমায় আটকে রাখার জন্য। বলতে লাগল আমি পাগল। সমাজ আমাকে সবসময় দোষী করেছে হিংস্র জন্তু বলে। বাস্তবে বলি আমিই তাকে ধ্বংস করেছি।


বেনিতো পেরেস গালদোস

লেখক পরিচিতিঃ ১৮৪৩ সালে স্পেনের কানারিয়া দ্বীপপুঞ্জে জন্ম নেন এই ঔপন্যাসিক। উনিশ শতকের রিয়ালিস্ট লেখকদের মধ্যে এর স্থান শীর্ষে। অনেকে মনে করেন এর অবস্থান স্পেনীয় সাহিত্যে মিগেল সেরভান্তেসের পরে দ্বিতীয় স্থানেই।  রয়্যাল আকাদেমী এস্পান্যিওল এর সদস্য এই সাহিত্যিকের নাম ১৯১২ সালে নোবেল পুরষ্কার প্রাপকদের সম্ভাব্য তালিকায় উঠলেও মেলেনি। Fortunata y Jacinta বা ভাগ্যবতী এবং হায়াসিন্থ ফুলটি Doña Perfecta বা নিখুঁত ম্যাডাম ও Misericordia বা ঈশ্বরের করুণা ইত্যাদি তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। ১৯২০ সালে মাদ্রিদে প্রয়াত হন এই অকৃতদার সাহিত্যিক।


jayakc2004@yahoo.co.in


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-