বুধবার, মে ০৯, ২০১৮

তপশ্রী পাল

শব্দের মিছিল | মে ০৯, ২০১৮ |
ব্রেকিং নিউজ
ভূপতি গোল গোল চোখে উদগ্র কৌতূহলে খবর শুনছেন – “আজ বারুইপুর স্টেশনের বাইরে, এক অজ্ঞাত পরিচয় ব্যাক্তিকে লাঠিপেটা করে হত্যা করে একদল দুষ্কৃতি । মৃত ব্যাক্তির নাম আমিনুল ইসলাম । খুনের কারণ জানা যায় নি। পুলিশ সন্দেহ করছে সম্ভবত এটি অনার কিলিং ।“

কসবার পুতুল কারখানায় কাজ করে বুলা আর আমিনুল । একসাথেই বারুইপুর থেকে বাস ধরে রোজ নামে রুবি হসপিটালের সামনে । তারপর কোনরকমে দৌড়তে দৌড়তে ঢোকে কারখানায় । নটার পর ঢুকলেই লাল দাগ । চলে যাবে একদিনের রোজগার । পাশাপাশি বসে নিপুণভাবে সুতো দিয়ে পুতুলের আঙ্গুল সেলাই করতে করতে বা চুল লাগাতে লাগাতে কখোন বড় কাছাকাছি এসে যায় দুজনের মন । সাতটা বাজলেই আবার প্রতিদিনের যুদ্ধ । ভারী ব্যাগ কাঁধে আর পিঠে নিয়ে দুটি বাজার করে দৌড়ে ওঠা ভিড় ঠাসা বাসে । হাঁপাতে হাঁপাতে বাসের পাদানিতে পা রাখতেই সেদিন অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাচ্ছিল বুলা । আমিনুল কোনরকমে ধরে না ফেললে সেদিন – 

বাস থেকে নেমে কিছু খাইয়ে হাত ধরে বাড়ি পৌঁছে দেয় বুলাকে আমিনুল । পাড়ার মোড়ে দেখা হয়ে যায় বুলার বাবার সাথে । বুলা নিজের শরীর খারাপের কথা বলে আর পরিচয় করিয়ে দেয় আমিনুলকে । চশমার ওপর দিয়ে তাকান ভূপতিবাবু । আমিনুলের নাম শুনে মুখে ঘোর বিতৃষ্ণা ফুটে ওঠে তাঁর । কোনরকমে ধন্যবাদ দিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ঢোকেন ভূপতি । মেয়ের রোজগারেই চলছে চারজনের সংসার ভূপতির রিটায়ারমেন্টের পরে । ছেলে নীলুর পড়াশুনো হয় নি । এখন পাড়ার আর নেতাদের তাঁবেদারি করে যা দুপয়সা পায় মদের পিছনে ওড়ায় । বাড়িতে এক পয়সা দেয় না ।

বুলার বিয়ের বয়েস গড়িয়ে গেছে । রোগা ক্ষয়াটে চেহারা । তিরিশ পেরিয়েছে, তবে মুখে একটা আলগা শ্রী আছে । ভূপতির কোন উদ্যোগ নেই মেয়ের বিয়ে দেবার ।

সেদিন একটা বর বৌ জোড়া পুতুল বানাতে বানাতে হঠাত আমিনুল বলল “বুলা, বিয়ে করবে আমাকে? এরকম সাজিয়ে ঘরে তুলব তোমাকে – “। হঠাত হকচকিয়ে গেলো বুলা । নখ খুঁটতে লাগলো। মুখ লাল ।

“কি হল? উত্তর দিলে না?” বলল আমিনুল ।

“ইচ্ছে তো করে – কিন্তু – কিন্তু – বাড়িতে রাজী হবে না । তুমি তো – “

“কি আমি? মুসলমান ! তোমার কোন আপত্তি নেই তো?”

“না আমিনুল । আমি ভালোবাসি তোমাকে – ধর্মে কি যায় আসে?”

“তবে আর চিন্তা নেই । আম্মি খুব ভালো । আম্মিকে তোমার ছবি দেখিয়েছি । আম্মি বলছে জুম্মাবারে নিকাহ করে নিতে । কাজীকে আমি বলে রাখবো । তোমার বাবার কোন খরচ নেই ।

“না ! না ! তুমি বুঝছ না । কেউ মেনে নেবে না ! আমি খুব ভয় পাচ্ছি আমিনুল ! তোমাকে না হারাই !”

“আমি থাকতে কিসের ভয় ?” শক্ত হাতে বুলার নরম হাত চেপে ধরে আমিনুল ।

তারপর ঝোড়ো হাওয়ার টানে উড়ে যায় বুলা । কলমা পড়িয়ে নিকাহ হয় তাদের । বুলার নতুন নাম হয় বিলকিস বেগম ।

বিয়ের পর জোড়ে বাবাকে প্রনাম করতে যায় বুলা । নিজের চোখ কানকে বিশ্বাস করতে পারেন না ভূপতি ব্যানারজী । বামুনের মেয়ে মুসলমানকে বিয়ে করে এসেছে ! তিনি পাড়ায় আত্মীয়স্বজনের কাছে মুখ দেখাবেন কেমন করে !

“আমার দরজা তোমার জন্য বন্ধ !” মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন ভূপতি । ছেলে নীলুকে বলেন বুলার কীর্তির কথা । পাড়ার ক্লাবে এই নিয়ে জোর হুল্লোড় ! নীলুর দিদি মুসলমান বিয়ে করে এসেছে ! নেতা নিতাই হাজরাকে ঘটনাটা জানায় নীলুরা ।

গুরু গম্ভীর গলায় নিতাই বলেন “চক্রান্ত ! চক্রান্ত ! ভোটার বাড়ানোর ধান্দা ! কদিনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গটা বাংলাদেশ হয়ে যাবে । এঁরা হিন্দু মেয়েদের ধরে ধরে মুসলিম করে । ধর্মনাশ করে । তারপর কিভাবে বংশবিস্তার করে দেখেছ তো ! পারবে হিন্দুরা ওদের মতো ছেলে বিয়োতে ? দুদিনে মাইনরিটি হয়ে যাবে । না না – আমার এলাকায় আমি এসব হতে দেব না । এতো সাহস ছেলেটার ! হিন্দু ব্রাহ্মণের মেয়ে ভাঙ্গায় ! নীলু তুই আমিনুলকে একটু মজা চাখিয়ে আয় – তারপর তোর দিদিকেও ফিরে পাবি, দিদির রোজগারও ! দেঁতো হাসেন নিতাই ।

দলবল নিয়ে বাইকে চেপে বেরয় নীলুরা ।

“ওই তো ! ওই তো সামনে – ট্রেন থেকে নেমেছে –

“দাঁড়া, একটু অন্ধকারে আসতে দে – 

মোক্ষম লাঠির ঘায়ে উলটে পড়ে আমিনুল । গলগল করে মাথা থেকে রক্ত গড়ায় । “ও গো ! মা গো !খুন খুন ! বলে চেচায় বুলা । এরা কারা ! মুহূর্তে ওর মুখ বেঁধে, হাত বেঁধে বাইকের পিছন পিছনে তোলে মুখে রুমাল বাঁধা দুর্বৃত্তরা । অজ্ঞান হয়ে যাবার আগে বুলা দেখে তার মুখের ওপর ঝুঁকে থাকা চোখদুটি তার খুব চেনা - নীলুউউউউউ 

tapasripal57@gmail.com


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-