বুধবার, মে ০৯, ২০১৮

জয়া চৌধুরী

শব্দের মিছিল | মে ০৯, ২০১৮ |
আজাইরা বাজার কথন ৮ জয়া উবাচ
প্যান্টালুন দোকানের দোরগোড়া থেকে যে বাচ্চা উড়ালপুল গড়িয়াহাটের ওপর দিয়ে চলে গিয়েছে গোলপার্কের দিকে সেই সেতু থেকে নামলেই নানান ফুটপাথের হকারদের স্টলের ফাঁকে তেনার দেখা পেলাম। ও তল্লাটে পঁচিশ বছর থাকলেও পঁচিশ লক্ষ বার সে ফুটপাথে হাঁটলেও কখন যে ফুটপাথ বদল হয়ে যেত খেয়ালই ছিল না। সদ্য বাড়ি বদলানোর ব্যাথায় তাকে আবিষ্কার করলাম। সেদিন হাঁটছি হনহন, ব্যস্ত কিছুটা ত্র্যস্তও বটে। পড়ানোর খাতায় দের না হো যায়। ছাত্র দেরী করলে কুনো দোষ নাই কিন্তু শিক্ষক দেরী করলে কপালে ঢের গালি গালাজ জুটবেই। আর তাতে দোষ দেওয়াও যায় না। এদানীং শিক্ষার সংজ্ঞা বদলে গেলেও ছাত্রের লক্ষণ বদলে গেলেও শিক্ষকদের উপরে কড়া নজরদারী বহাল। তেনারা ক্লাসে বেয়াড়া ছাত্রের পিঠে ডাস্টার ভাঙছেন কি না কিম্বা পড়াতে গেলে শাড়ি না সালোয়ার না প্যান্ট পরছেন সেসব বহুল জরুরী বিষয় এখন কড়া জরিপাবদ্ধ। তার ওপরে মিড ডে মিল, সাইকেল, চটি, কন্যাশ্রী, আধার কার্ড ইত্যাদির হিসাবরক্ষকের মহান দায়িত্বটিও তাদের ঘাড়েই। উদিকে একটি বিষয়ের চার ভাগের এক ভাগ জানলেই না কি পাশ! মানে আপনি তরকারী কাটতে জানলেই আপনি রাঁধুনি বলে সার্টিফিকেট পাবেন। 

মশলা কি হবে? তেল কী হবে কষবে বা সাঁৎলাবে বা ভাজা হবে কতখানি ইত্যাদি ফালতু বিষয়ে না জানলেও আপনি রাঁধুনি। সুতরাং অঙ্ক খাতায় যোগ বিয়োগ না জানলেও চলবে ব্যাগে অঙ্ক খাতা থাকলেই আপনি পাশ।। বুঝলেন না? যাকগে পড়িয়ে পড়িয়ে স্বভাব খারাপ হয়ে গেছে গো। চান্স পে জ্ঞান! যা বলছিলাম। পথের ধারের কুঁড়েঘর মার্কা একটা দোকান। চায়ের গো চায়ের। বাঁশের খুঁটির ওপর এসবেস্টসের চালা। 

দেওয়ালে প্রায় নাক মুখ চোখ একাকার কোন পূর্ব পুরুষের ছবি। মানে চা দোকানের মালিকের পূর্বপুরুষ প্রথম চাওয়ালার ছবি যিনি কলকাতার এইরকম প্রাইম এরিয়া মানে ব্যস্ত ও গুরুত্বতম জায়গায় ঝাঁপটি তুলে বসেছিলেন। ভাল করে চেয়ে দেখলাম কপাল আর চুলের কালচে ভাব ছাড়া কিচ্ছুটি বুঝতে পারলাম না গো। পাশেই সন তারিখ ছেঁড়া মা লক্ষ্মীর ক্যালেন্ডার। দোকানটিতে ব্যতিক্রম হল একটি মেনু কার্ড। চায়ের দোকানে পাঁচ টাকার চা আর ডিমের মামলেট বিক্রি করতে মেনু কার্ড কেন? ভাবতে ভাবতে উঁকি মেরে দেখি বাপ রে! এ যে মহা শৌখিন কারো কম্মো। দোকানের নাম বিল্লা স্টল। প্রায় পড়া যায় না এমন তার নেম প্লেট। মালিকের চেহারা শীতকালে দেখেছিলাম। মাথায় কম্ফর্টার পায়ে পাম্পপ শু ও লুঙ্গি ফতুয়া পরে বনেদী বাবুটি। বসে আছেন ঝিম মেরে একটা কেঠো বেঞ্চিতে। আর কয়লার উনুনের সামনে যিনি সুস্বাদু টোস্ট সেঁকে দিচ্ছেন তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই চা দোকানী না মধ্যবিত্ত ঘরের মাসীমা। মেনু কার্ড টি না কি দিল্লী থেকে নোটিশ ডেকে এনেছিল। ব্যাপারটা হয়েছিল কি বারিস্তা কফি চেন এর নকলে একবার এক গুণমুগ্ধ কাস্টমার দোকানের নতুন নামকরণ করে সাইনবোর্ড বানিয়ে দিলেন মালিককে। নাম দিলে বিল্লারিস্তা। আর সে ছবি কেমন করে পৌঁছে গেল বারিস্তার মালিকের চোখে। ব্যাস। সঙ্গে সঙ্গে নোটিশ। তাদের লোগো নকল করার দায়ে ক্ষতিপূরণ। মালিকের তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি অবস্থা। অতঃপর বহু কষ্টে মুরুব্বী ধরে বোঝানো যে এটা সামান্য পাঁচ টাকার চা মামলেটের দোকান। আসলে দোকানটার বেঞ্চিত বেঞ্চিতে গপ্পো লুকোনো। কত কত মহারথীরা তাদের ছাত্রা বস্থায় দোকানের লাল চা মানে এখানে যাকে লিকার চা বলে মেনু কার্ডে ঝোলানো তা খেয়ে উদ্দাম তর্ক আড্ডায় রাত গড়িয়েছে। এমনকি ব্রেড বাটার টোস্টের নামও হেথায় নিনি বাবা নিনি। 


মেনু কার্ড টি যে কত ভালবাসায় তৈরী করেছেন এখানের প্রাক্তন চাখোর অধুনা বিশাল রেস্টুরেন্ট চেইনের মালিক পুরনো খদ্দের সেখানেই বিল্লা টি স্টলের সাফল্যের রেসিপি। জিজ্ঞেস করলাম তো এইরকম ঝাঁ চকচকে অঞ্চলে তেলে ঝাপসা কাচের বোয়াম আর মামলেট বিক্রির ধারা পালাটানোর কথা ভাবেন নি কখনো? – ভেবেছি তো। মহিলা ঝটপট উত্তর দিলেন। কিন্তু ছেলেমেয়েরা সবাই চাকরি করে কেউ এখানে আগ্রহ করে না। তাই আর বদলাই নি। তাছাড়া আমরা তো থাকব না। এখানে বিল্ডিং হবে। 

আমিও ভাবলাম গোলপার্ক মোড়ে এত বড় জায়গা ফাঁকা ফেলে রাখবে তেমন বোকা তো প্রোমোটারেরা নয়। 

- আসলে যখন শশুরমশাই এখানে দোকান খুলেছিলেন তখন এটা ডাক্তারবাবুদের জমি ছিল। তা এখন তো তিনি নেই। তার ছেলে পিলে নাতি রা জায়গা বেঁচে দিতে চায় প্রোমোটারদের কাছে। আমরা রাজী হয়েছি। আমাদের ফেলাট দিতে হবে। তখন দেখবন ভাল করে দোকানটা বাড়ানো যায় কি না। 

হিসাব এতক্ষণে পরিষ্কার হল। এটা জবরদখলের কেস। যদিও কাল গড়িয়ে গেছে অর্ধ শতাব্দী। জোরও বেড়েছে দখলকারীর। এ সংসারে বারবার প্রমাণ কি হয় না? লাঠি যার জমি তার? মানে দখল যার জমি তার? এটাও তাই। মাঝখান থেকে কত ইতিহাস কত স্মৃতি। বিল্লাচিনো নামক কুড়ি টাকার বড় এক গেলাস কফি খেয়ে দাম মেটাতে মেটাতে ভাবলাম যাই বল টোস্ট আর কফিটা কিন্তু দারুণ বানায় এখানে। বাকী হিসেব থাকগে মেটিরিয়ালিস্টিকদের জন্য ...

jayakc2004@yahoo.co.in


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-