বুধবার, মে ০৯, ২০১৮

অনিন্দিতা মণ্ডল

শব্দের মিছিল | মে ০৯, ২০১৮ |
মাতৃ তন্ত্র
পর্ব ১
জকের পৃথিবীতে ক্ষমতার দখল দেখাতে, ভয় দেখাতে, আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করতে বার বার আঘাত করা হচ্ছে নারী ও শিশুকে। কোনও কোনও সময়ে দুর্বল পুরুষও শিকার হচ্ছে। বলা বাহুল্য, এসব আক্রমণ ব্যক্তিগত আক্রোশ বা বিকৃত কামনার থেকেও বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে হয়ে চলেছে বলে দিনের আলোর মতন পরিষ্কার। কে কত হিংস্র হতে পারে, কে কত বেশি আতঙ্কিত করতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছে বিশ্ব জুড়ে। 

আমরা জানি, এই মাটি দখল বা সম্পদ দখল শুরু হয় সভ্যতার খুব প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু লিপিবদ্ধ ইতিহাসের আগেও সভ্যতার কাল ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগেও সভ্য ছিল মানুষ। সে সবের উন্মোচন হচ্ছে ধীরে ধীরে। আর সেই সব প্রাগৈতিহাসিক সময়ে মানুষ হয়ত এতটা নৃশংস ছিলনা। কারণ সেসময় প্রচলিত ছিল মাতৃতন্ত্র। নিতান্ত জৈবিক ভাবেই মা যখন সন্তানের জন্ম দেয়, তখন স্নেহ নামক আবেগের জন্ম হয় তার মধ্যে। এবং যেসব অত্যাচার পুরুষের দ্বারা সম্ভব তা তার দ্বারা কখনই সম্ভব হয়না। সে সমরে দক্ষা হোক আর বীরাঙ্গনা হোক। এই মাতৃতন্ত্র যখন সভ্যতার ভিত্তি ছিল তখন কেমন ছিল আমাদের সমাজ? কি করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা আঘাত হানল? এই পরিসরে সেই আলোচনার একটি দিক রচনার চেষ্টা করা গেল। 

ইতিহাসের কাল ঠিক কবে শুরু হয়েছে তাই নিয়ে আমাদের পণ্ডিতি মাঝে মাঝেই তার সীমাবদ্ধতা জানান দিচ্ছে। এই পণ্ডিতরা ঘোষণা করলেন যে মাত্র পাঁচ হাজার বছর আগেও মানুষ কোনোরকমে বেঁচে থাকতে শিখল। আর তারপরেই কেউ নতুন কোনও প্রত্নখনন উপলক্ষে জানালেন, উঁহু, মানুষ অন্তত দশহাজার বছর আগেই সমাজবদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবু, মানুষের সভ্যতার নিরিখে পৃথিবীদখলকারী জীব হিসেবে সে নিতান্তই অর্বাচীন। এভাবেই ক্রমউন্মোচন ঘটেই চলেছে। 

যেমন, এখনও পর্যন্ত আমরা জানতাম আর্যসভ্যতা একটি বহিরাগত শক্তি। যা উত্তর পশ্চিম থেকে এসে আমাদের ভূমিপুত্রদের উচ্ছেদ করেছিল। সিন্ধুবাসীরা বিজিত হয়েছিল এই সভ্যতা দ্বারা। আসলে ভদ্রতা বোঝাতে হয়ত সভ্যতা কথাটাকে ব্যবহার করেননা কোনও ইতিহাসবিদ। হয়ত বোঝাতে চান সমাজবদ্ধ হয়ে প্রাকৃতিক শক্তিকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শিখে মানুষ যখন বাঁচতে শিখল তখন তাকে আমরা সভ্যতা বলছি। তারপর তো জানা গেলো, ভুল। সভ্য মানুষ এই ভূখণ্ডে বহুকাল ধরে বাসা বেঁধে আছে। আর্যরা কিছু বহিরাগত নয়। উত্তর পশ্চিম দিকের যাযাবর গোষ্ঠীগুলির ভাষা হিসেবে এদের এই নাম দেওয়া হয়। বহিরাগত নয় এইজন্য বলা, সেসময়ে কিন্তু ভারতবর্ষের সীমা এমন করে দেগে দেওয়া ছিলনা। এশিয়া মাইনরকেও নিজস্ব ভূমি বলা চলত। 

সম্প্রতি আইআইটির গবেষণাগার থেকে একটি তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। দক্ষিণ উপকূলে সাগরের অগভীর অংশে নিমজ্জিত এক প্রাচীন নগর। জোয়ারের জল সরে গেলে যার স্থাপত্য জেগে ওঠে। মুগ্ধ করে উপকূলবাসী জেলেদের। জানা গেল, এই নগরের বয়স নাকি দশ হাজার বছর! তাহলে? মানুষের সভ্যতার সময় মাত্র দশ হাজার বছর নয় তো! দেখা গেলো, বৈদিক সভ্যতার যে গ্রামভিত্তিক গঠন ছিল, যে পুরোহিততন্ত্র তাকে পরিচালনা করত, তার চেয়েও অনেক বেশি উন্নত সভ্যতা ছিল দক্ষিণ উপকূলের এই সভ্যতা গুলো। সিন্ধু সভ্যতা তো তার উৎকর্ষের উচ্চতা প্রমাণ করে দিয়েছে অনেক আগেই। এখন দেখা যাচ্ছে যে এই সভ্যতাগুলো নগরভিত্তিক। বৈদিক সভ্যতার সঙ্গে এগুলোর সমান বৈপরীত্য। আরও কি কিছু বৈপরীত্য আছে? দেখা যাক। 

মাদ্রাজ শহর থেকে কিছু দূরে পূর্ব উপকূলে, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সাগর তটে এমন একটি নাগরিক সভ্যতার নিদর্শন মেলে। মহাবলীপুরম নামটা সকলেই শুনেছেন। সপ্তম শতাব্দীর চোল রাজাদের তৈরি স্থাপত্য। কিন্তু যা অনেকেই জানেন না, তা হল, এরও বহু আগে এই অঞ্চলে নাগরিক সভ্যতার উন্মেষ ঘটে গেছে। বহু খ্রিস্টপূর্বাব্দ আগেই। গত সুনামির সময়ে মহাদেশীয় তল খানিক সরে যাবার ফলে মাটির গভীরে প্রোথিত সেই অবশেষ খানিক বেরিয়ে পড়েছে। স্থানীয় মানুষ, যারা এ নিয়ে চর্চা করছেন, তাদের কাছ থেকে জানা গেলো, এই সাগর তট থেকে পুরাকালে বাণিজ্যবহর যাত্রা করত নানাদিকে। বড় বড় অর্ণবপোত তাদের সম্ভার নিয়ে যেত বহির্দেশে বানিজ্যে। এখন উদ্বৃত্ত সম্পদ এমন কি ছিল? যা দিয়ে রপ্তানি সম্ভব? ছিল কৃষিজ উদ্বৃত্ত। এ অঞ্চল ছিল কৃষিজ সম্পদে ভরপুর। সেই সম্পদ উৎপন্ন করতে প্রয়োজন একটি কুশলী ও শক্তিশালী জাতি। সেই শক্তিশালী দীর্ঘকায় পেশিবহুল মানুষকে, খর্বকায় শিথিলপেশি পুরোহিত মাতব্বরেরা নাম দিলো অসুর। অসুর একটি জাতি বিশেষ। এ নিয়ে পরের কোনও পর্বে লিখব। এই শক্তিশালী মানুষদের মধ্যে ছিল শক্তিশালী স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই। এরা সকলে মিলে সমৃদ্ধ নগর গড়ে তুলেছিল। এদের অস্তিত্ব ছিল গণে। রাজত্বে নয়। এমনই কোনও এক নগরের একটি উঁচু টিলায়, (কেননা দক্ষিণ উপকূলে, লাল পাথরের টিলা আছে) কোনও এক ভূয়োদর্শী পুরুষ ডেকে নিলেন বাকিদের। তিনি জানালেন, একার জমি নয়, সম্মিলিত জমিতে চাষ করলে মিলবে বেশি উদ্বৃত্ত। তা নিয়ে বানিজ্যে যাওয়া যাবে। সকলে সেই নিয়মে রাজী হলে সেই পুরুষটি নিজের বিবেকের কারণেই সম্মিলিত জনগণকে বিপদ আপদে রক্ষা করার ভার নিলেন। মহাবলী। এই নামেই হয়ত তাঁকে সকলে ডেকেছিল। কিন্তু এই নগর গুলির রক্ষণাবেক্ষণে থাকত নারী। তার মর্যাদা ছিল অনন্য। 

সমান ভাবে নিজের মাটিতে কাজ করলেও বিদেশে সাগর পাড়ি দিয়ে বানিজ্যে যেত পুরুষ। মেয়েরা তখন ঘরবাড়ি পরিবার শিশু বৃদ্ধ, কৃষি জমি, ইত্যাদি সামাল দিত। এই সময়ে কোনও এক রমণী অসীম ক্ষমতাবলে এই অপেক্ষাকৃত দুর্বল মানুষদের দেখাশুনোর ভার নিলো। এর সাহায্যে এগিয়ে এলো কমবয়সী রমনীকুল। এদের প্রত্যেকেরই পরিশ্রমের ফলে সুগঠিত শরীর। এইসব রক্ষয়িত্রীদের কারো কারো মূর্তির অবশেষ দেখা যায়। আধুনিক কালের মতো এদের পেটে সিক্স প্যাকের অস্তিত্ব নজরে পড়ে। সুরক্ষার কারণে এরা পশুদের পোষ মানিয়ে তাদের বাহন করে দস্যুদের মোকাবিলা করত। অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত তীর ধনুক, খড়গ, তরবার। বন্যজন্তু পোষ মানানোর কথা অদ্ভুত লাগলেও সত্যি। আফ্রিকার আরণ্যক উপজাতিরা সিংহ পোষ মানায় এখনও। লায়ন হুইস্পারার এরা। সেসময়ে দক্ষিণের উপজাতিরাও বন্য জন্তু পোষ মানানো এবং তাদের সঙ্গে ভাষা বিনিময় জানত। পুরুষের অনুপস্থিতিতে এইসব নগরে এই বীরাঙ্গনা রমণীরা শক্তির উৎস ছিল। পাওয়া যায় কোটরাপ্পা বলে এক রমণীর নাম। যিনি এতটাই শক্তিশালী ছিলেন যে কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁকে দেবী হিসেবে পুজো করতে শুরু করেছিল তার গণের মানুষজন। তিনি সিংহবাহিনী। অবশ্যই সিংহ তাঁর পোষা ছিল! এই যে মাতৃদেবতার জন্ম হল, তাকেও একসময় গ্রাস করল আর্যরা। অনেক পরে, সপ্তম শতাব্দীতে তৈরি টাইগার কেভ বা ব্যাঘ্র গুহায় তৈরি মূর্তিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দেবী কোটরাপ্পা পরিণত হয়েছেন পার্বতীতে। তাঁর সিংহ নেই আর। তিনি শিবের অঙ্কে বসে আছেন। মূল মন্দিরের বাইরে একটি প্রাচীরে দেখা যাচ্ছে বীরাঙ্গনা কোটরাপ্পা যুদ্ধ জয় করে সিংহ থেকে নেমে আসছেন। এই যে আত্তীকরণ, কেউ কি অনুভব করছেন যে, দেবী কোটরাপ্পাই সিংহবাহিনী দুর্গা? যিনি শক্তি পেয়েছিলেন সব পুরুষ দেবতার কাছ থেকে? কুশলী রাজনীতি। 

আর একটু বলা যাক। এই রমণী যেমন শৌর্যের প্রতীক ছিলেন তেমনই আরেক রমণী ছিলেন। তিনি মধ্যবয়স্কা। পৃথুলা। বৃহৎ উদরা। বৃহৎ উদরের তাৎপর্য হল, তিনি বহুজনের জননী। তিনি উর্বরা। তাঁর স্তনভারে অবনত শরীর বুঝিয়ে দেয় যে তিনি বহুজনের স্তন্যদায়িনীও বটে। এই রমণী জননী এবং উর্বরা শক্তির প্রতীক। অতএব জন্মদান পালন ও রক্ষণ, এই তিন প্রকার কর্মে নিযুক্ত রমণীরা গণের পুরুষদের সমীহ আদায় করে নিয়েছিলেন সেই নগর সভ্যতার কালে। 

পুরোহিততন্ত্র যখন দক্ষিণ উপকূল গ্রাস করতে এলো, তখন বুদ্ধিতে বলীয়ান কিন্তু শরীরে হীনবল একদল মানুষকে সেনা হিসেবে ব্যবহার করল। এদের বলা হল শিবগণ। মানে শিবের সৈন্য। অর্থাৎ, পুরুষ রাজার অধীনস্থ সেনা। অথচ হীনবীর্য। এখনও দক্ষিণের পর্বতগাত্রে খোদিত কোটরাপ্পা দেবীর সঙ্গে দেখা যায় বালকসুলভ খর্বকায় একদল সৈন্য। এরা শিবগণ। কিন্তু কি উপায়ে এরা কোটরাপ্পাকে নিজেদের পক্ষে এনেছিল? তবে কি সেই আদিকাল থেকেই নারীশরীর আর রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে জমির দখলকে একযোগে ব্যবহার করা হয়েছিল? নারীশরীরের মালিকানা, একগামিনী নারী ও বহুগামী পুরুষের সেই ঐতিহ্য কি ততটাই প্রাচীন? ধর্ষিতা, আহত নারী কি তখনই সংস্কারে আচ্ছন্ন হয়েছিল যে, যে পুরুষ তার ধর্ষক সেই আসলে তার স্বামী? তার ঔরসে জাত পুত্রই আসলে উত্তরাধিকারী? তখনও কি ভূসম্পত্তির মালিকানায় নারী ব্রাত্য ছিল? মনে হয়না কিন্তু। গণের পরিচালিকা নারী অবশ্যই নিজস্ব ভূসম্পত্তির মালিক ছিল। কারণ পরিবার পালনের দায়িত্বও তারই ছিল। অতএব এই প্রকরণের উদ্ভব ঘটেছে বৈদিক আগ্রাসনের সময়ে। নারী যখন পৃথিবীর মতোই সম্পদ হিসাবে গণ্য হচ্ছে। আবার তাকে অধীনে আনতে এই ধরণের কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রয়োগ করা হচ্ছে নানা স্মৃতি নানা বিধান। 

কোটরাপ্পা দেবীর সঙ্গে পরবর্তীতে, আর্য আগ্রাসনের পর, দক্ষিণী যে পুরুষের সংঘাত হয়, তিনি মহাবলী। তাঁর মুখাবয়বে মহিষের মুখ। তিনিই কি মহিষাসুর? এভাবেই তো অসুরদলনীকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে আবিষ্কৃত স্থাপত্যের মধ্যে বহু বৃষ বা মহিষের মূর্তি। কৃষিকাজের জন্য এদের ব্যপক প্রচলন ছিল নিশ্চয়! আবার শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে এরা কম ছিলনা। অতএব পাশবিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জমিকে উর্বরা করে তোলা, বীজ বপন করা, ইত্যাদি কর্মের মধ্যে দিয়ে নারীর পরিচালন শক্তি ও পুরুষের পেশিশক্তির প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। তখনও নারীপুরুষ সভ্যতার দুটি পক্ষ। যার শক্তি সেকালে পুরোহিততন্ত্রকে আশঙ্কিত করেছিল। তাই বিচ্ছিন্নতাবাদের আশ্রয় তারাও নিয়েছিল। কি উপায়ে সেই বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হল, বিশদে না জেনেও বলা যায়, কূটকৌশলই তাদের অস্ত্র ছিল। মহাভারত রামায়ণের মহাকব্যিক বিস্তারেও আমরা সেই রাজনীতির খেলা দেখতে পাই। চতুরতার সঙ্গে শক্তিশালী শত্রুর মোকাবিলা। 

দক্ষিণ উপকূলের এই সভ্যতার সূত্রটি রেখে গেলাম। শেষে মিলন ঘটবে বৃহত্তম ভারতের অবশিষ্ট আদি জনসভ্যতার সঙ্গে। 

(ক্রমশ)

anindita.gangopadhyaya@gmail.com




Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-