বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮

পূজা মৈত্র

শব্দের মিছিল | ফেব্রুয়ারী ২১, ২০১৮ | |
Views:
পূজা মৈত্র , পাপ সমীক্ষা
পর্ব-১৯

বাড়ি ফিরে এসে বেজায় অবাক হল নিখিলেশ। শিঞ্জিনী এসেছে। গৈরিকা কলকাতায় গেছে সেই সুযোগে আবার এসেছে ও? প্রচণ্ড রাগ হয়ে গেল। নিজের পদস্খলনের কারণকে চোখের সামনে দেখে মার্জিত নিখিলেশও সংযম হারাল

-তুমি এখানে? কি মনে করে? আমার সংসারটা ছারখার না করে ছাড়বে না?

শিঞ্জিনী শান্ত চোখে তাকাল

-আমি সাধ করে আসিনি।

-আমি নিমন্ত্রণ করেছিলাম?

-আপনি না,গৈরিকাদি,আজ আমাকে ফোন করেছিলেন। বারবার করে বলেছেন আমি যেন ওনার কালকের আচরণকে মনে না রাখি-আর্চিকে যেমন আগে দেখভাল করতাম,তেমন ভাবেই করি।

নিখিলেশের বিস্ময় সীমা ছাড়াল। গৈরিকা শিঞ্জিনীকে একথা বলেছে? কেন? তাহলে ও কি চলে গেল? ফিরবে না-ফিরবে না আর?

-আর্চিকে খাইয়ে দিয়েছি। আমি চলি। গৈরিকাদি বলেছেন আপনার টেবিলে একটা চিঠি রেখে গেছেন। আপনি যেন পড়ে নেন।

নিখিলেশ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। টেবিলের উপর চিঠি আগেরবারও রেখে গিয়েছিল গৈরিকা, “চাকরি খুঁজতে যাচ্ছি,কদিন ফিরব না” এই বয়ানে চিঠি লিখে চলে গিয়েছিল,আর ফেরেনি। এবার কি লিখেছে...কি এমন লিখল ও?

-আমি যাচ্ছি।

শিঞ্জিনী যাওয়ার আগে বলে গেল। নিখিলেশের কানে ঢুকল না। গৈরিকাকে সত্যিটা না বললেই হত। ও যে বড় অভিমানী। ওর মনের গভীরে কোথাও না কোথাও যে বিশ্বাসটা নোঙর করেছিল। তাকে ভূমিচ্যুত করেছে নিখিলেশ। অবিশ্বাস করে ও বিশ্বাসের মর্যাদা পেল না। নিখিলেশ ওকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসতে পারে না। এই দৃঢ় ধারনা যখন আহত হয়েছে-তখন ও যে আর এখানে থাকবে না। নিখিলেশের বোঝা উচিৎ ছিল। নিজের উপর ভীষণ রাগ হচ্ছিল ওর এখন। সত্যবাদী যুধিষ্ঠির না হলেই কি চলছিল না? বিবেকের দংশনের মত ছেঁদো চিন্তায় কাবু হয়ে ও এভাবে সব কিছু তছনছ করে দিল? আগেরবার গৈরিকা চলে গিয়েছিল। কিন্তু এবার তো নিখিলেশ,নিখিলেশ বাধ্য করেছে ওকে,বাধ্য করেছে চলে যেতে।

        চিঠিটা পড়ল নিখিলেশ। বারবার পড়ল। যা পড়ছে,তাকে বিশ্বাস করতে পারল না কোনমতেই। “নিখিল,আমি চলে যাচ্ছি,যা মিথ্যা তাকে চলে যেতেই হয়। শত চেষ্টাতেও সে ফিরতে পারে না। চিন্তা করো না,যা সত্যি যা সঠিক তাকে তোমার সংসারে দিয়ে গেলাম আমি। তাকে মেনে নাও,সুখে থাকবে। ও হ্যাঁ,রিন্টুকে আমার কাছে পাঠিও না আর। যা ও কখনো পাবে না,তার মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই। দোষটা আমার ঘাড়েই দিয়ে দিও। এমনিতেই ওকে এটা বোঝানোর লোকের অভাব নেই যে ওর মামমাম বাজে,ওকে ভালোবাসে না মোটেও। তুমিও তাই বোলো। এই ক’দিনটা যেন অভিনয় ভেবে ভুলে যায় ও। ওকে অভ্যস্ত হতে হবে,ওর মিস্‌ যেমনভাবে তোমার জীবনে আমার স্থানটা ভরিয়ে দিয়েছে-দেখো,একদিন রিন্টুর মা হয়ে ওর জীবনটাকেও পরিপূর্ণ করে তুলবে। শিঞ্জিনী ভালো মেয়ে। আমার রিন্টুকে ভালোবাসে। ওকে ভালো রাখবে,জানি। আমার তাই রিন্টুর থেকে দূরে সরে যাওয়াটাই ভালো। অভাব সৃষ্টি না হলে চাহিদা অনুভূত হয় না। আর আমার কথা যদি বলো,একা থাকাটাই আমার ভবিতব্য। বুঝে গিয়েছি আমি। অথচ একা থাকতে ভালো লাগে না আমার,কষ্ট হয়,ভয় পাই। কিন্তু একাকীত্বই আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। যে ক’দিন আছি-তাকে নিয়েই কাটিয়ে দেব। তুমি ভালো থেকো। তোমার ভ্রমটা একরাতের নয়-ঘোরটা চিরস্থায়ী হোক-কামনা করি। ইতি-গৈরিকা সান্যাল।”

সান্যাল-শব্দটা জোর দিয়ে লিখেছে গৈরিকা। ওর সম্পূর্ণ নাম সই করে কি বোঝাতে চেয়েছে? ও যে নিখিলেশের কেউ নয়,নাম ধরে ডাকার মত আপন কেউ নয়-এটাই জোর দিয়ে বলতে চেয়েছে কি? দূরে সরিয়ে দিয়েছে নিখিলেশকে। চিরতরে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একটা ভুলের এত গুরুতর শাস্তি কি প্রাপ্য ছিল ওর? ভুল বুঝেছে গৈরিকা। ভুল বুঝেছে নিখিলেশকে। ও যাকে সত্যি বলে চাপিয়ে দিতে চাইছে তার মত মিথ্যা তো আর কিছু হয় না। এই মিথ্যার বোঝা সারাজীবন বয়ে বেড়াবার রায় দিয়েছে গৈরিকা। বিচারকের আসনে বসে যে রায় ও ঘোষণা করেছে-সেই রায় কি গৈরিকাকেও সমানভাবে আঘাত করেনি? সর্বশ্রেষ্ঠ বিচার হয়েছে কি ঋষিকবি? বিচারে ফাঁক থেকে গেল না? নিখিলেশ মানবে না,কোনদিন গৈরিকার জায়গায় কাউকে মেনে নিতে পারবে না। আর ওর রিন্টু?  রিন্টু যে গৈরিকার কাছে কি-এ কয়েকদিনে তা বুঝেছে নিখিলেশ। নিজের প্রাণের থেকে প্রিয় যে সন্তান,তার থেকে দূরে থাকার কথা বলে নিজেকে কেন শাস্তি দিচ্ছে ও? রিন্টুর অসুখ বলে সব ছেড়ে এসেছিল ও। ইন্দ্রনীলের চোখ রাঙানি,উচ্ছ্বাস থেকে বিতারিত হওয়ার ভয়-সব হেলায় পিছনে ফেলে এসেছিল। আজ অক্লেশে রিন্টুকে নিজের থেকে সরিয়ে দিল? তাও কোন অজুহাতে,না রিন্টুকে শিঞ্জিনীর সাথে অভ্যস্ত হতে হবে। ওকে মা বলে ভাবতে শিখতে হবে। কেউ কোনদিন নিজের মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারে? পারবে না। আর্চি কখনো ওর মামমামের জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারবে না। পাগলামি করছে গৈরিকা। পাগলামি করছে। নিখিলেশ ওকে থামাবে এবার। আগেরবার বাধা দেয়নি,ভেবেছিল গৈরিকা ওকে ভালোবাসে না। এবার যখন জেনে গেছে গৈরিকা ওকে কতটা ভালোবাসে তাহলে জোর দেখাবে। গৈরিকার উপর অধিকার আছে ওর। ষোলোআনা অধিকার আছে। সেই অধিকারবোধ না দেখানোর মত ভুল করবে না আর। ফোনটা হাতে নিল নিখিলেশ। ফোন করল গৈরিকাকে। ফোন ঢুকল না। পাগলের মত বারবার ফোন করল। একটা বিপের পর ফোন কেটে যাচ্ছে। ও। রিজেক্ট লিস্টে ফেলে রেখেছে তাহলে। কি করবে নিখিলেশ? অন্য কোন নাম্বারও তো জানা নেই। অথচ গৈরিকার সাথে ওর কথা হওয়া জরুরী। খুব জরুরী।

আর্চির ডাক শুনে তড়িঘড়ি চোখ মুছল নিখিলেশ। চিঠিটা লুকাল। ওকে বলা যাবে না ওর মামমাম চিঠিতে কি লিখেছে।

-বাবা,মামমাম এল না তো?

-কাজে গেছে। আজ আসবে না।

-আবার কাজ? বলেছিল যে আসবে।

-কাজ পড়ে গেলে কি করবে? চল্‌ তোকে খাইয়ে দিই।

-না,আমি খাবো না। আগে মামমাকে ফোন করো। মামমাম বললে তবে খাবো,

নিখিলেশ সহজে রাগে না। আজ অরিনের সামান্য জেদেও রেগে গেল।

-আবার জেদ? মামমাম ব্যস্ত,ফোন করা যাবে না।

-তুমি মিথ্যা বলছ। মামমামের সাথে তুমি আবার ঝগড়া করেছ তাই চলে গেছে। আমি সব জানি।

নিখিলেশ অরিনের গালে সজোরে থাপ্পড় মারল একটা। নিজের সব রাগ,সব হতাশা,সব খারাপ লাগা একত্রিত করে চড়টা কষাল নিখিলেশ। অরিনের গালে না নিজের গালে ভেবে পেল না।

-চুপ। একদম চুপ। বেশি কথা বলার কোন প্রয়োজন নেই। জেদ না করে খেতে চল্‌। খেয়ে শুয়ে পড়বি। কাল স্কুল। দু’দিন পর পরীক্ষা।

বাবাকে এত রেগে যেতে কখনো দেখেনি অরিন। বাবা এভাবে ওকে কখনো মারেনি। চোখ দিয়ে জল পড়ছিল ওর। অনবরত জল পড়ছিল। নিখিলেশের বুকের মাঝে একটা খারাপ লাগা মুচড়ে উঠল। নিজেকে এই শাস্তিটা দিতে চেয়েছিল ও। দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত হত। অথচ নিজেকে না দিয়ে নিজের ছেলেটাকে এভাবে আঘাত করল কি করে? নিজের চোখে আরো নেমে গেল নিখিলেশ। মাটির সাথে মিশে গেল।

আর্চির সাথে শোবে বলে ওর ঘরের দরজায় এসে থমকে দাঁড়াল নিখিলেশ। ছেলেটা হাতজোড় করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বসে আছে। কি বলছে ও? কান করল নিখিলেশ। “মামমাম তুমি প্লিজ চলে এসো,জানো,আমার তোমাকে ছাড়া থাকতে একটুও ভালো লাগে না। তুমি গল্প না বললে ঘুম আসে না। জানো,বাবা আমাকে মেরেছে। খুব করে বকেছে। তুমি থাকলে বকতেই পারত না। সবার তো বাবা আর মা একসাথে থাকে তোমরা খালি ঝগড়া করো,করো না প্লিজ।”

নিখিলেশের দু’চোখ আর্দ্র হয়ে উঠল। আর্চির মামমাম যদি এই কথাগুলো শুনতে পেত,তাহলে মিথ্যা রাগ করে,জেদ ধরে বসে থাকতে পারত না।

-আর্চি ঘুমাস নি?

আর্চি চমকে তাকাল। বাবা এসে পড়েছে। ও ভেবেছিল বাবা ও ঘরে থাকবে। আসবে না।

-ঘুমাব...

-শুয়ে পড়। আমি গল্প বলছি।

নিখিলেশ অরিনের পাশে শুয়ে পড়ল।

-মামমামের মত পারবেই না।

-তোর মামমামের মত আমি কি কিছুই পারি আর্চি? একটা অযোগ্য অপদার্থ মানুষ। তোর মামমামকে কেবল কষ্টই দিই।

-সরি বলে নাও না কেন?

-তুই বলিস?

-আমি তো দুষ্টুমি করলেই আগে সরি বলে দিই। মামমাম আর বকে না। রাগ করে না।

-তোর মামমাম তো খুব ভালো। আমার মত পচা নাকি? তোকে তো কক্ষনো বকে না।

নিখিলেশ অরিনের মন ভোলাতে চাইল।

-বকে না কে বলল? বাবা,জানো না-মামমাম মুখে কিছু বলবে না। কিন্তু এমন ভাবে তাকাবে-ব্যাস।

-আর্চিবাবু ভয় পায় তখন?

-খুব। তখনি সরি বলে দিই। তুমিও বলে দাও,তোমাকেও ইটস ওকে করে দেবে।

-আমার ভুলের কি আর সরি হয় আর্চি? হয় না। তাও বলব। তোর জন্য বলব না হয়।

-ফোন করে?

-না। সামনাসামনি। তোর পরীক্ষাটা হোক। তারপর দুজনে মিলে গিয়ে বলব। অরিন বিশ্বাস করে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ল। নিখিলেশের ঘুম এল না। অরিনকে ভোলাতে পারলেও নিজেকে কিভাবে ভলাবে বুঝতে পারল না নিখিলেশ।




(পর্ব-২০ / ২১ )

গত চার-পাঁচদিন ধরে উপন্যাসটা লেখার চেষ্টা করছে গৈরিকা। উপন্যাসটা ওকে লিখতেই হবে,অথচ পারছে না। খেই হারিয়ে যাচ্ছে,শব্দগুলো আগে পোষা বেড়ালের মত যেখানে সেখানে বসত ওর নির্দেশে,এই ক’দিন তারাও কথা শুনছে না। বিদ্রোহ করেছে যেন। গৈরিকার কথা মোটেও শুনছে না। একপাতা লিখে সেটা পড়ে দেখে গৈরিকার মনে হচ্ছে-কিছু হয়নি। এরকমটা ও লিখতে চায়নি মোটেও। ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছে পাতাটা। ডাস্টবিন উপচে পড়ছে। আগে যখন লিখতে বসত লেখা কলমের ডগায় আপনাআপনি চলে আসত। অচেনা কল্পিত দৃশ্যগুলোও পরপর অভিনীত হত মানসপটে। আর এখন চিরচেনা সবকিছু নিয়ে লিখতে গিয়েও খেই হারিয়ে ফেলছে। সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে যেন। অসত্যভাষণে নাকি সরস্বতী ছেড়ে চলে যায়। সেই রকমটাই কি কিছু হচ্ছে ওর সাথে? তা না হলে শ্বাসপ্রশ্বাসের থেকে সহজে যে কাজটা করতে পারে ও-আজ সেই কাজটা করতে গিয়ে মনে হচ্ছে হাড়ভাঙা খাটুনি হচ্ছে। আকস্মিক সব নৈপুণ্য চলে গেছে ওর। ক্ষমতা যেন চুরি হয়ে গেছে। রাইটারস্‌ ব্লক কি একেই বলে? রাইটারস্‌ ব্লকের কথা শুনেছে ও-অনেকের হতেও দেখেছে। অথচ ঠিক যখন খুব দ্রুত লেখার প্রয়োজন-তখনি লেখা ছেড়ে গেছে ওকে। কর্ণের নিয়তির মত নিজের নিয়তিকে মনে হচ্ছে গৈরিকার। কর্ণেরও তো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই লড়ার সময় রথের চাকা বসে গিয়েছিল। এই উপন্যাসটাও তো গৈরিকার বাঁচামরার লড়াই-এর মত। চিরন্তনী ওর সাম্রাজ্যে থাবা বসিয়ে ফেলেছে। অনেকটা জমি দখল করে ফেলেছে ওর অবর্তমানে। ওর কবল থেকে নিজের হারানো জমি পুনরুদ্ধার করতে গেলে-এই উপন্যাসটাই তুরুপের তাস। অথচ ঠিক এইসময় ওর অস্ত্র ওকে ত্যাগ করল। নিরস্ত্র গৈরিকার দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছা করে। রাতের পর রাত চোখের পাতা এক করতে পারেনা। লেখে আর ছিঁড়ে ফেলে। ঘরময় কাগজের স্তুপ হয়ে গেছে। ভোরের দিকে বিছানায় পিঠ ঠেকালেও ঘুম আসে না। রাজ্যের চিন্তা মাথায় ভিড় করে। চারপাঁচদিন না ঘুমালে চোখের তলায় কালি পড়ে যায়। গৈরিকারও পড়েছে। কলেজে সব কলিগরাই বারবার করে প্রশ্ন করছে শরীর খারাপ কি না। তাদের লাগাতার প্রশ্নে জেরবার হয়ে পরশুদিন ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিল গৈরিকা।  উনি বলেছেন-কিছুই হয় নি। এটা অ্যান্টি অ্যানকসাইটি। মেডিসিন দিয়েছেন। রাতে শোওয়ার আগে খেতে বলেছেন। টেনশন কমবে ওতে। নার্ভটা শান্ত থাকবে। ভোরবেলা ওটা খেয়ে ঘুমোতে যায় গৈরিকা। ঘুমোবার চেষ্টা করে। ঘুমও যেন ষড়যন্ত্র করেছে। আর সবার মত গৈরিকাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যায়। মাস্তুল বিহীন জাহাজের মত নিজেকে মনে হয় গৈরিকার। মাঝ সমুদ্রে ভাসছে। কোনদিকেই কুল খুঁজে পাচ্ছে না। যে নোঙর করবে। কুল ভেবে যেদিকে যাচ্ছে গিয়ে দেখছে সেখানে চোরাবালি মাত্র। নোঙর গিথবে না। অথচ নোঙর ফেলতে চায় গৈরিকা,থামতে চায়। শান্ত হতে চায়। মাথার মধ্যে যে সুতীব্র যন্ত্রণাটা থেকে থেকে হচ্ছে- তা আর যাই হোক মাইগ্রেন নয়। ডাক্তারবাবু ভাবলেশহীন মুখে বলে দিয়েছেন, “ও কিছু নয়,অ্যানকসাইটি হেডএক।” কিছু নয়টা যখন হয় তখন পাগল পাগল লাগে গৈরিকার। মনে হয় আর সহ্য করা যাচ্ছে না-যত যন্ত্রণার থেকে সব শেষ হয়ে যাওয়াই ভালো।

     সবশেষ করে দেওয়ার চিন্তাটা গত তিনদিন ধরে দানা বাঁধছে গৈরিকার মনে। যতবার লিখতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে-ততবার চিন্তাটা গাঢ়তর হচ্ছে। নেহাত অযৌক্তিক নয় চিন্তা। বরং বেশ যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয় গৈরিকার। যদি না লিখতেই পারে,তাহলে এই পৃথিবীতে ওর থাকার কোন কারণ নেই। লেখা ছাড়া গৈরিকা এক অতিসাধারণ মানুষ। রাস্তাঘাটে,ট্রেনে,বাসে পিলপিল করে বেড়ানো আমজনতা। সাধারণকে ঘেন্না করে গৈরিকা। হয় অসাধারণ নয় শূন্য-এটাই ওর তত্ত্ব। এভাবে চললে একদিন ওকেও নামগোত্রহীনদের দলে মিশে যেতে হবে। ওটা ঠিক নিতে পারবে না গৈরিকা। তার থেকে এখনই চলে গেলে-শোরগোল পড়ে যাবে। লোকে ভাববে ওকে নিয়ে,সর্বত্র কথা হবে,শোকসভা বসবে,গবেষণা হবে-সবাই হা হুতাশ করবে। একটা আনসলভড্‌ মিস্ট্রি হয়ে বেঁচে থাকবে গৈরিকা। কেউ জানতেও পারবে না কেন চলে গেল ও। লিখতে না পারার লজ্জা কেউ বুঝতে পারবে না। ভাববে ইন্দ্রনীলের সাথে ভুলবোঝাবুঝিতেই হয়ত চলে গেছে ও। অথচ ইন্দ্রনীল আজ ওর কাছে একটা নামমাত্র। তার কোন অস্তিত্ব নিজের মনে খুঁজে পায়না গৈরিকা। বাজারে গুজব রটছে-ইন্দ্রনীলকে গৈরিকা ডাম্প করেছে বলে সে বিবাগী হয়ে আমেরিকা চলে গেছে। কার জন্য ডাম্প করেছে কেউ বলতে পারছে না। কানাঘুঁষোয় নিখিলেশের নাম উড়ছে বটে-তবে সে বিষয়ে কেউ নিশ্চিত নয়। ইন্দ্রনীল বসু ট্রাজিক হিরোর মত পূজো পাচ্ছে। একটা মেয়েকে ধূলো থেকে তুলে এনে মসনদে বসিয়েছিল-সেই মেয়েই ঠকিয়ে চলে গেছে। ছি! কত নির্লজ্জ,বেহায়া সেই মেয়েটি-চরিত্র বলে তো কিছু নেই-ই-কৃতজ্ঞতা বোধটুকুও নেই। এই বন্দনাগান একমুহূর্তেই বন্ধ করে দিতে পারে গৈরিকা। চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারে। ও চলে গেলে তখন এই পাখিরাই অন্য সুরে কিচমিচ করবে-ইন্দ্রনীল গৈরিকাকে ছেড়ে গেছে বলেই মেয়েটা আত্মহত্যা করল। আহারে বেচারী! কেউ আসল কারণটা জানবে না। কোনদিন জানবে না।

               আসল কারণটা জানাতে চেয়েছিল গৈরিকা। এখন ভাবছে থাক,কি হবে জানিয়ে? নিখিলেশ দিনে না হলেও পঞ্চাশবার ফোন করে,রিজেক্ট লিস্টে ফেলে রেখেছে ওকে। ফোনের স্ক্রিনে এক মুহূর্তের জন্য আলো জ্বলে-আবার নিভে যায়। গৈরিকার এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। আলো জ্বলাটাকে তাই গুরুত্ব দেয়না আর। এখন ক’দিন পাগলামো করবে লোকটা-পরে সয়ে যাবে। ওকে ওর সুখের উপায় দেখিয়ে দিয়ে এসেছে গৈরিকা। শিঞ্জিনীকে চিনিয়ে দিয়ে এসেছে। শিঞ্জিনী-নামটা শুনলেই শরীরে অস্বস্তি হয় একটা। যতবার উপন্যাসটা লিখতে বসে গৈরিকা-ততবার ওর মুখটা ভেসে ওঠে। এই গল্পটা গৈরিকার হওয়া সত্ত্বেও সুকৌশলে গল্পের শেষে বিজয়ীর আসনটা ঐ মেয়েটা দখল করে নিয়েছে। ওকে বেদখল করবে না গৈরিকা-চলে যাবে। গল্পটা না লিখেই চলে যাবে। কি হবে থেকে? কেউ কি চায় ওকে? কেউ কি ওকে শুধু ওকেই ভালবেসেছে? সব হিসাবনিকাশের বাইরে গিয়ে ওকেই চেয়েছে? না,চায়নি। তাহলে কার জন্য থাকবে ও? কার জন্য নিজেকে রেখে দেবে?

             আজকাল ঘুমের ঘোরে নিজের পাশটা হাতড়ায় গৈরিকা। অস্ফুটে বলে, “রিন্টু,কোথায় গেলি?” ফাঁকা বিছানায় হাত ঠেকলে ঘুম ভেঙ্গে যায়। মনে পড়ে যায়-রিন্টু ওর কাছে নেই। পাশবালিশটাকে আঁকড়ে ধরে গৈরিকা। রিন্টু ভেবে খুব আদর করে। চোখ দিয়ে অঝোরে জল পড়ে ওর। বিছানা বালিশ ভিজে যায়। কমনরুমে বসেও কালকে চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। গৈরিকা টেরই পায়নি। সপ্তমিতা না বললে বুঝতেই পারত না। আজকাল এরকমই হচ্ছে। মায়াও বলে। ও বসে থাকলেই নাকি চোখ দিয়ে জল পড়তেই থাকে। ডিপ্রশনে নাকি এরকম হয়।একটা বই-এ পড়েছিল ও। অথচ ডাক্তার যে বললেন ‘ও কিছু নয়...’ তাহলে কোনটা ঠিক? ডিপ্রেশনে মানুষ পাগল হয়ে যায় নাকি? পাগল হতে চায় না গৈরিকা। পাগলা গারদ খুব নোংরা। ওখানে পাগলদের জন্তু জানোয়ারের মত রাখা হয়। আর শক ট্রিটমেন্টের কথা ভাবলেও শিউড়ে ওঠে ও। সপ্তমিতা ডাক্তার দেখাতে বলেছিল। সাইক্রিয়াট্রিস্ট। তার মানে ওরাও গৈরিকার অসংলগ্নতা বুঝতে পারছে। এভাবে যদি সবাই বুঝে ফেলে-তাহলে তো মুশকিল। এই তো সেদিন,অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসে গিয়ে সেকেন্ড ইয়ারের পড়া বোঝাতে শুরু করেছিল গৈরিকা। ছাত্রছাত্রীরা হাঁ করে শুনছিল। ম্যামকে থামাবে এমন সাহস কারোর নেই। মাঝপথে খেয়াল পড়ায় নিজেই লজ্জিত হয়েছিল। আজকাল সব ভুলেও যাচ্ছে কেমন। কাল বিকালে প্রেসক্লাবে একটা অনুষ্ঠান ছিল,বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছে। সংগঠকরা ফোন করাতে তড়িঘড়ি বাড়ি থেকে বেরোতে গিয়ে পার্স ভুলে গিয়েছিল। ট্যাক্সি ভাড়া দিতে গিয়ে দেখে পার্স নেই। অনুজ ভাড়াটা মিটিয়ে দিল দেখতে পেয়েই। না হলে লজ্জার একশেষ হত।

        লিখতে পারবে না জেনেও রোজ লিখতে বসে গৈরিকা।নিজের জীবনটা নিয়ে লিখতে চায়। মিথ্যার ভার সরিয়ে যদি সত্যিটাও লিখতে পারত-কেউ ছাপুক না ছাপুক...সত্যিটা রয়ে যেত। পাণ্ডুলিপিটাতে রিন্টুর নাম লিখে রেখে যেত গৈরিকা। ও বড় হয়ে,বোঝার মত হয়ে ওটা পড়ত। ওর ইচ্ছা হলে ছাপাত। একটা লিখিত জীবনী অন্তত থাকত। অথচ লিখতে বসেই খেই হারিয়ে ফেলে। কল্পনায় নিখিলেশের মুখটা আর দেখতে পায়না। বদলে ওর কোলে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকা এক শরীর ফুটে ওঠে-এক ভেঙ্গে পড়া পুরুষ শরীর। শরীরটার থেকে নিজেকে বিচ্যুত করে গৈরিকা। যা অপরের তাকে নিয়ে ভাবতে নেই। সে হিসাব করতে গেলে এ পৃথিবীতে গৈরিকার নিজের বলতে কিছু নেই। রিন্টুটুকু ছাড়া। অথচ ওকে নিজের হাতে দানপত্র করে দিয়ে এসেছে। শিঞ্জিনী রিন্টুকে ভালোবাসে। ওর কাছে ভালো থাকবে ছেলেটা। গৈরিকা তো এতগুলো বছর দূরেই ছিল। আরো দূরে চলে গেলেও কোন ক্ষতি নেই। রিন্টুর ওর কাছে না আসাই ভালো। ওর কাছে এলেই সবাই কষ্ট পায়। রিন্টুও পাবে। তার থেকে দূরে থাকুক,ভালো থাকবে।

        বইমেলা কমিটির ফোন পেয়ে অবাক হয় সুহার্ত। পরশু বাঁকুড়া বইমেলা। গৈরিকা উদ্বোধক। ওকে ওরা বারবার ফোন করছে। তাও ধরছে না। ফেসবুকেও আসে না বহুদিন। কি হলটা কি ওর? এখনো রাণাঘাটে,নাকি? ওর নাম্বারটাও নেই...কি যে করে...নিখিলেশদা কে ফোন করলে কেমন হয়?

-হ্যালো।

-নিখিলেশদা,সুহার্ত বলছি।

-বল্‌

-গৈরিকা কোথায় গো? রাণাঘাটে?

-না তো,ক’দিন আগেই তো ফিরে গেছে।

-ওহ। কেমন মেয়ে দ্যাখো বাঁকুড়া বইমেলা কমিটির ফোনটাও ধরছে না। ওকে ফোন করে একবার বলে দাও না...

নিখিলেশ থমকাল। সুহার্তর প্রয়োজনটা জরুরী। ওকে মিথ্যা বলা উচিৎ নয়।

-আমার ফোন ধরছে না।

-হোয়াট? উফ! আবার কি হল তোমাদের। তোমরা না পারোও। থাক গে,নম্বরটা দাও।

-ভাই একটা কাজ করবি?

নিখিলেশের মনটা খুব উতলা হয়ে আছে। সেই যে গেছে গৈরিকা-রাগের মাথায় গেছে,তারপর থেকে কোন খবর নেই। একটা খবর না পেলে মনের অস্থিরতা যাবে না। সুহার্ত ছাড়া এই কাজটা করার জন্য কোন বিশ্বস্ত লোক নিখিলেশের হাতের কাছে নেই।

-বলো।

-একটু ওর ফ্ল্যাটে যাবি? শরীর-টরীর খারাপ হল কিনা...

-দেখছ,তুমি গৈরিকার ব্যাপারে কতটা কনশার্নড? চিন্তা করো না-আমি যাচ্ছি।

-আমাকে একটু ফোন করে জানিয়ে দিস।

-দেব। আমি এখনি যাচ্ছি।

সুহার্তর অনেকদিন ধরেই গৈরিকার ফ্ল্যাটে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। ইনিয়ে বিনিয়ে অনেকবার গৈরিকাকে বলেছে,গৈরিকা কোন তাপ উত্তাপ দেখায়নি। তবে আজকের ব্যাপারটা অন্য। খবরটা গৈরিকাকে দেওয়া জরুরী। তাছাড়া ওর সাথে কয়েকটা কথা আছে। ইন্দ্রনীল আর ওর সম্পর্কটা নিয়ে বাজারে যা রটছে-তা ওর ইমেজের পক্ষে ভালো হচ্ছে না। নিখিলেশেরদার কাছে ফিরে গেছে ভেবে চুপ করেছিল সুহার্ত। কিন্তু এখন তো দেখছে সেখানেও গণ্ডগোল পাকিয়ে চলে এসেছে। কি যে করে মেয়েটা-সবসময় দিদিমণি ভাব নিয়ে চললে হয়? কিছু কিছু ক্ষেত্রে নমনীয় হতে হয়। গৈরিকা সান্যালকে দেখে নাকি সবার মনে শ্রদ্ধা জন্মায়। চারিদিক থেকে ধূপধুনোর গন্ধ পায় ছেলেপিলে। চোখের দিকে তাকাতেই পারে না। আরে ধুর! তাকাতে না পারার কি আছে? গম্ভীর ভাব করে থাকলেও ভেতরে ভেতরে ছেলেমানুষ একটা। নিজের ভালোমন্দটুকুও বোঝে না। সুহার্তর ওকে চিনতে বাকি নেই।




-গৈরিকা আছে?

সুহার্ত ডোরবেল বাজাতে মায়া দরজা খুলেছিল

-আছে। আপনি?

-বলুন,সুহার্ত চ্যাটার্জী এসেছে।

মায়া গৈরিকার বেডরুমের দরজা ধাক্কাল

-দিদিমণি,আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন।

কোন উত্তর এল না। সুহার্ত অবাক হল। কাজে এত ব্যস্ত? মায়া আবার ডাকল

-দিদিমণি...

সুহার্তর ভালো ঠেকল না। এতো জোরে ডাকলে শুনতে তো পাওয়া উচিৎ। ঘুমিয়ে পড়ল নাকি! কানে হেডফোন গোঁজার অভ্যাস নেই তো? জুতো খুলে ঘরে ঢুকে এল।

-জোরে ধাক্কা দিন।

-ডাকলেই তো জবাব দেয়। এত জোরে তো ডাকতে হয় না কখনো।

সুহার্ত মায়ার চোখের আশ্চর্যভাবটা পড়তে পারল। নিজেই দরজা ধাক্কাল।

-গৈরিকা,ঘুমোলে নাকি? আমি এসেছিলাম,সুহার্ত।

উত্তর নেই। সুহার্তর অস্বস্তি হচ্ছিল। প্রথমবার কারোর বাড়িতে এসেই দরজা ধাক্কানো...যদি কিছু মনে করে? তবুও ডাকতে হবে। মনমেজাজ ভালো নেই ওর। নিখিলেশেরদার ফোনে ধরছে না,ইন্দ্রনীলের সাথেও সম্ভবত যোগাযোগ নেই,ফেসবুকেও আসে না...কি হয়েছে কে জানে?

-গৈরিকা...

-দিদিমণি...

সুহার্ত মায়ার দিকে তাকাল

-এরকম প্রায়ই করে?

-না। দরজা বন্ধ করে থাকে বটে। লিখলে বা রাগ হলে দরজা বন্ধ করে থাকে,তবে ডাকলে সাড়া দেয়। ক’দিন ধরে মনমেজাজ খুব খারাপ। কারোর সাথে কথা বলে না। ঠিক করে খায় না। একা একা বসে থাকে। চোখ দিয়ে আপনাআপনি জল পড়ে...

সেকি! ডিপ্রেশনে আছে তাহলে। গৈরিকা না হলে চোখের জল ফেলার মেয়ে নয়। নিশ্চয় গুরুতর কিছু হয়েছে

-লেখে আর ছিঁড়ে ফেলে দেয়। ঘরময় কাগজে ভর্তি। মাঝরাতে ঘুমায় না। ভোরে শোয়। ঘুমের ঘোরে বারবার ছেলের নাম করে। অথচ ছেলেকে ফোন করে না,খোঁজও নেয় না।

সমস্যা গুরুতর। সুহার্ত কর্তব্য স্থির করে ফেলল।

-সরো।

-কেন?

-দরজা ভাঙতে হবে।

-সে কি!

-সরে যাও।

মায়া সভয়ে সরে দাঁড়াল।

         নিখিলেশ মনে মনে চিন্তিত হচ্ছিল। সুহার্ত তখনি যাবে বলল,কই ফোন করে কিছু জানাল না তো। রাত সাড়ে দশটা বাজে,ওকে এখন ফোন করবে একবার? নাহ্‌ বিরক্ত হবে তাহলে। সাত কাজে থাকে,ভুলে গেছে নিশ্চয়। আর্চির পরীক্ষা পরশু থেকে। খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মামমামের জন্য বায়নাটা কমেছে। জানে পরীক্ষার পর বাবা ঠিক নিয়ে যাবে। নিয়ে যাবে নিখিলেশ। কিন্তু গৈরিকা যদি ফিরিয়ে দেয়? ও যে চিঠিতে লিখেছে রিন্টুর থেকে দূরে থাকতে চায় ও। পারবে কি? পারবে না। কোথাও যেন একটা স্থির বিশ্বাস রয়েছে নিখিলেশের মনে। নিজের কাজে মন দেবে এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। সুহার্ত। এতক্ষণে মনে পড়েছে।

-বল্‌।

-নিখিলেশদা,আমি যা বলছি ঠাণ্ডা মাথায় শোনো। এতক্ষণ গৈরিকাকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম,তোমায় জানাবার ফুরসৎ পাইনি।

-গৈরিকা কেমন আছে? ঠিক আছে তো...

-না। ওকে আমি নার্সিংহোমে ভর্তি করেছি...

-নার্সিংহোমে? কেন?

-প্লিজ,আমাকে বলতে দাও। নিখিলেশদা সত্যিটা খুব কঠিন,তবুও প্লিজ হোল্ড ইওর নার্ভ। গৈরিকা সুইসাইডাল অযাটেম্প্ট করেছিল।

-কি?

নিখিলেশের পৃথিবীটা দুলে উঠল। গৈরিকা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে? কিন্তু কেন? নিখিলেশের উপর রাগ করেই কি এরকম করল...

-কেমন আছে?

-আউট অফ ডেঞ্জার নাউ। গত তিনঘণ্টা খুব খারাপ গেছে। ওর ডানহাতটাকে ব্লেড দিয়ে কেটেছিল ও। শিরা কেটেছে। ধমনী কাটতে পারেনি। তাতেও এতটা ব্লিড করেছে কি বলব। জ্ঞান ছিল না। আমি যখন ওর ফ্ল্যাটে ওর বেডরুমের দরজা ভেঙ্গে ওকে উদ্ধার করি-ইট ওয়াজ আ ব্লাডি মেস্‌। কোনক্রমে ওকে তুলে এনে হাতের কাছে যে নার্সিংহোম পেয়েছি,ওখানেই ঢুকিয়েছি। স্টিচ পড়েছে তিনটে। এখন ব্লাড চলছে।

-জ্ঞান?

-ওই না থাকার মতোই। ঘোরের মধ্যে আছে। তবে ডাক্তার বললেন স্টেবল। নিখিলেশদা,আমি জানি না তোমাদের মধ্যে কি হয়েছে। আমি আউটসাইডার। আমার বলাটা সাজে না-তবুও বলব গৈরিকা রাণাঘাট থেকে ফেরার পর থেকেই ভালো ছিল না। শি ওয়াজ ইন পেইন। ডিপ্রেশনে ছিল ও। ওর সুইসাইড নোটটা আমার কাছে আছে। সরিয়ে দিয়েছি ওটা। পুলিশের চোখে পড়লে হ্যাপা হত। তবে আমি বলব,তোমরা সব মিটিয়ে নাও।

নিখিলেশ চোখ মুছল

-আমি আসছি। তুই ওখানে থাকবি তো?

-এত রাতে তুমি আসবে? তার চেয়ে না হয় কাল সকালেই...

-না,না...আমায় আসতেই হবে।

-অ্যাজ ইউ প্লিজ।

ফোনটা কেটে দিল সুহার্ত। গৈরিকার সুইসাইড নোটটা চোখে ভাসল ওর। “যে নাবিক হাল ভেঙে দিশা হারায়,তার জাহাজ কুলে পৌঁছায় না,ডুবে যায়। ডুবতে আমাকে হবেই। তবে সেটাকে বিলম্বিত করে লোক হাসাতে চাইনা আর। কয়েকটা কথা বলা হল না,অনেক কিছুই লেখা হল না-আমার জীবন নিয়ে একটা উপন্যাস হয়-নিজে লিখব এ আশা ছিল। হল না। পরে কেউ না কেউ লিখবে। হয়তো রিন্টু,কিংবা হয়তো তিতির। সে-ও নাকি তার মামনির মতই লেখে। আমার উত্তরাধিকার ওদের দিয়ে গেলাম। কাউকে কিছু বলার নেই,কাউকে দোষ দিতেও চাইনা। না নীল,না নিখিল-তোমরা সবাই তোমাদের জায়গায় ঠিক। আমিই মস্ত বড় ভুল ছিলাম। যা ভুল তা চিরস্থায়ী হয় না,একদিন না একদিন ভেঙে যায়। তোমাদের সবার ভুল যেন ভাঙে।” কাগজের টুকরোটা নিজের পকেটে রেখেছে সুহার্ত। কষ্টে ছিল গৈরিকা। খারাপ ছিল। ইন্দ্রনীল আর নিখিলেশের থেকে এমন কোন আঘাত পেয়েছিল-যা সইতে পারে নি। ভালোবাসায় আঘাত পেলে মানুষ সইতে পারে না। গৈরিকাকে নিয়ে নার্সিংহোমে আসার সময় থেকে ডাক্তার বাবুর মুখ থেকে আউট অফ ডেঞ্জার শোনা পর্যন্ত-সুতোর উপর হাঁটছিল সুহার্ত। জীবনে এত নারীর সংস্পর্শে আসা সত্ত্বেও-কোন নারীই ওকে গৈরিকার মত আকর্ষণ করতে পারেনি। গৈরিকার আগুনে পুড়ে মড়াকে নিজের নিয়তি মনে করে সুহার্ত। ভালোবাসে ওকে। ওর সমস্ত দোষগুণ জেনেও ভালোবাসে। ওর সমস্ত অপবিত্রতা জেনেও ওকে সবচেয়ে পবিত্র মনে করে। ও অপরের জেনেও ওকে একান্ত আপনার কল্পনা করে। গৈরিকার জীবন খোলা পাতার মতো জেনেও ওর মধ্যে রহস্যখনির সন্ধান পায় সুহার্ত। যে রহস্যের তল করতে সারাজীবন কেটে গেলেও কোন আক্ষেপ থাকবে না। গৈরিকা শুধু ওর ভালোবাসাই নয়-অবসেশন। সেই নারীর রক্তাক্ত নিথর শরীরটাকে হাতে করে নিয়ে যেতে যেতে দু’চোখ দিয়ে ঝরে পড়া শ্রাবনধারার মধ্যে সুহার্তর মনে হয়েছিল মাঝ সমুদ্রে দিক ভুল করা জাহাজকে সবসময় যে কুলে পৌঁছাতে হবে তার কোনও মানে নেই। সবুজে ভরা দ্বীপ। যাতে নোঙর করা যায়। যার বুকে বাস করা যায়। যাকে আশ্রয় করা যায় ভালোবাসার উপরেও। বন্ধু হওয়ার সুবাদেই আজ থেকে সুহার্ত সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এর হাত থেকে জাহাজকে বাঁচিয়ে দ্বীপে নিয়ে আসবে। ঘিরে রাখবে গৈরিকাকে। ওর অনেক কিছু বলার আছে,অনেক কিছু লেখার আছে। ওকে এই বয়সে এভাবে চলে যেতে দেবে না। তার জন্য যা কিছু করার করবে সুহার্ত। কোন আশাপোষণ করে না ও। আন্তরিক ইচ্ছাতেই এমনটা করবে ও। গৈরিকার মত প্রতিভা এক যুগে একজনই আসে। তাকে ঝরে যেতে দেবে না। চশমা খুলে চোখের জল মোছে সুহার্ত।

      ট্রেন গণ্ডগোল। আর্চিকে দিদির বাড়ি দিয়ে ট্রেন ধরতে ষ্টেশনে এসে নিখিলেশ দেখল কল্যাণীতে ট্রেন  লাইনচ্যুত হওয়ায় ডাউন ট্রেন বন্ধ। ওর মনে হল গৈরিকার কাছে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। সুহার্তকে ফোন করার কথা মনে হতে থাকল না ওর। স্টেশনের মেঝেতেই বসে পড়ল। যেভাবে ভিখারিরা বসে। ডাউন ট্রেন এল না। নিখিলেশের যাওয়ার ট্রেনটা লাইনচ্যুত হয়ে গেছে।

জ্ঞান হওয়ার পর থেকে গৈরিকার মাথাটা একদম ফাঁকাফাঁকা লাগছে। ডান হাতটায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। সবরকম ওষুধ চলছে তাও অসহ্য যন্ত্রণা করছে। সেদিনকার কথাটা মনে করার চেষ্টা করে গৈরিকা। স্মৃতি হাতড়ে বোঝার চেষ্টা করে,কেন ও হাতটা কাটতে গিয়েছিল। লিখতে বসেছিল সেদিন। সন্ধ্যা থেকে লিখতে বসেছিল। আবারও সব জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। লেখা আসছিল না। নিখিলেশ,নীল,শিঞ্জিনী,চিরন্তনী,অনিমেষ আঙ্কল-সব চরিত্রগুলো মাথায় ভিড় করছিল। কাকে ছেড়ে কার কথা লিখবে বুঝতে পারছিল না গৈরিকা। এদের সবার মাঝে নিজেকে কিভাবে বসাবে,কিভাবে উপস্থাপনা করবে...কিভাবে সমস্ত কৃতকর্মের জাস্টিফিকেশন দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। সমস্ত কৃতকর্মের জাস্টিফিকেশন দেওয়া কি আদৌ সম্ভব? নিজের মনেই খুব বড় প্রশ্নচিহ্নের সামনে পড়েছিল গৈরিকা। আজ অবধি যা কিছু করেছে ও তার সবটা না হলেও অনেকটাই জাস্টিফায়েড নয়,বরং তাদের স্বপক্ষে সাজানো যুক্তি ধোপে টিকবে না। তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। জীবনে যতগুলো ভুল করেছে তার হিসাব করলে পাহাড়ের মত আকার নেবে। অথচ যে মুহূর্তে ভুলগুলো করেছে-সেই মুহূর্তে সেগুলো ভুল ছিল না। ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে নেওয়া সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ভেবে মনে মনে গর্বিত হত গৈরিকা। অথচ ঠুনকো আবেগের চেয়ে বেশি ওগুলো কিছুই ছিল না। না হলে ভালোবাসায় এভাবে কেউ ঠকে না। একবার নয়,দু’বার। পুরো মনটাই তেতো হয়ে উঠেছিল। কিছু ভালো লাগছিল না। বিস্বাদ জমেছিল জিভের ডগায়। অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছিল মাথায়। কিভাবে যে ব্লেডটা হাতে নিয়েছিল মনে নেই। কিভাবে ডান হাতটা কেটে ফেলার সাহস হল,তাও মনে নেই। নিজের গায়ে সামান্য আঁচরটুকু সহ্য করতে পারে না গৈরিকা। রিন্টু হওয়ার সময় নর্মাল হবে ভেবে ডেটের তিনদিন আগেই ডাক্তারকে সিজার করে দিতে বলেছিল। এত বেশি করে নিজেকে ভালোবাসে যে,সে কি ভাবে নিজের শরীরকে নিজের প্রিয়তম অঙ্গকে এভাবে আঘাত করল-নিজেও বোঝে না গৈরিকা। বাঁচার ইচ্ছাটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়। কোন মায়া ছিল না,কোন পিছুটানও ছিল না। সব কিছুর বাইরে চলে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে। সমস্ত মোহের বাইরে। এই অদ্ভুত মানসিক অবস্থাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবে ভেবে পায়না গৈরিকা। এই মানসিক অবস্থার কোনও ব্যাখ্যা হয় না। মানুষ আত্মহত্যার মুহূর্তে সমস্ত ব্যাখ্যার বাইরে চলে যায়। এ এক অদ্ভুত মানসিক দশা-সেখানে যে পৌঁছায়,সে নিজেও জানে না-সে ঠিক কোথায় রয়েছে। ফিরে এসেও তাই যুক্তিযুক্ত কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না-ঐ মুহূর্তে কেন আপাত অযৌক্তিক আচরণটা করে ফেলেছিল। গৈরিকাও খুঁজে পায় না। মাথাটা এত হালকা হয়ে আছে-বেশি ভাবলেই বুক ধড়ফড় করে। মনে হয় শূন্যের উপর দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে ও। চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চায় গৈরিকা। ডাক্তারবাবু চিন্তা করতে মানা করে দিয়েছেন। অ্যাকিউট ডিপ্রেশন চলছে। এমন অবস্থার চিন্তা করা মানা। ওষুধ বদলে দিয়েছেন। মাসখানেক বিশ্রাম করতে বলেছেন। সেই ভালো। কোথাও যেতে ইচ্ছাও করে না। গৈরিকা ওকে বলতে চায় যে এসবের দরকার নেই। ও এখন ভালো আছে। ডাক্তারবাবুর সাথে একটা কাউন্সেলিং সেশনেই ও নিজের মনটাকে বেশ খানিকটা গুছিয়ে আনতে পেরেছে। ও বুঝেছে ঝোঁকের বশে ব্লেড চালানোটা একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল। খুব বড়সড় একটা ভুল। চলে গেলে তো সব শেষ হয়ে যেত। মানুষ একদিন আলোচনা করত,দু’দিন...সাতদিনের মাথায় সব ভুলে যেত। নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যেত সবাই। বাঁচাটা খুব একটা খারাপ নয়-ডাক্তারবাবু বলছিলেন। সুইসাইড নোটটা পড়ে বুঝিয়েছিলেন-অনেক কিছু বলার আছে,অনেক কিছু লেখার বাকি আছে...সেসব অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়াটা অনুচিত হবে। যাওয়ার একটা সময় আছে। সব কাজ শেষ হলে আপন ইচ্ছাতেই চলে যায় মানুষ। আমরা দূর থেকে ভাবি স্বাভাবিক মৃত্যু। অথচ সে মারা যায়,কারণ পৃথিবীতে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তার আর কিছু দেওয়ার নেই। সে রিক্ত। শূন্য পাত্রের মত নিঃস্ব। তাই তাকে অদৃশ্য সুতোর টানে চলে যেতে হয়। অথচ গৈরিকা এখনো ফুরোয়নি। ওর প্রয়োজনও ফুরোয়নি। ডাক্তারবাবু বলেন অসমাপ্ত কাজ ফেলে যেতে নেই। ভারী সুন্দর কথা বলেন মানুষটা। কখনো রাগেননা। মিষ্টি হেসে বোঝান। রোগীর সব কথা ধৈর্য ধরে শোনেন। ডাক্তারবাবু বলেছিলেন আরো ক’দিন নার্সিংহোমে থাকা ভালো। সুহার্ত রাখতে চায়নি। দুদিনেই চারিদিকে কানাঘুষো শুরু হয়ে গেছে। মিডিয়াতে খবরটা গেলে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে,বলেছিল সুহার্ত। ডাক্তারবাবু বাড়িতে কে দেখে রাখবে,কে যত্ন করবে ভেবে ইতস্ততঃ করছিলেন-সুহার্ত বলেছিল, “ও নিয়ে ভাববেন না। আমি তো আছি।” গৈরিকা ভেবেছিল মুখের কথা। তা বলে সুহার্ত যে এখানে রয়ে যাবে,তা ভাবতে পারেনি। শুধু রয়েই যায়নি গৈরিকার উপর কড়া নজরদারি করছে। কখন ব্রেকফাস্ট করবে,কখন স্নান করবে,কখন ওষুধ খাবে,দুপুরে কখন ঘুমাবে...সব ঘড়ির কাঁটা ধরে মেপে দিয়েছে সুহার্ত। একটুও নড়চড় হওয়ার জো নেই। খেতে একদম ভালো লাগে না গৈরিকার। মায়া খাবার দিয়ে গেলেও টেবিলে ফেলে রাখে। আজও রেখেছে। সুহার্ত একটু বেরিয়েছে। খুব জরুরী কাজ আছে একটা। যাক। ওকে তো যেতেই হবে। গৈরিকার জন্য নিজের কাজটা নষ্ট করবে কেন? আজ সুহার্তকে বাড়ি ফিরে যেতে বলবে গৈরিকা। ও তো এখন অনেকটাই সুস্থ। মাথাটাই যা শুধু ফাঁকা হয়ে আছে। শরীরটাও একটু দুর্বল। কিন্তু সুহার্ত যে ভয়ে এখানে রয়েছে-ঐ কাজ গৈরিকা করবে না। ওর চলে যাওয়ার সময় হয়নি। ডাক্তারবাবুর কথা মনে আছে ওর। আবার সামনের সপ্তাহে কাউন্সেলিং। সোমবার,আজ শুক্রবার। তিনদিন বাকি আছে। ডাক্তারবাবু বলেছেন ওষুধপত্র ঠিকঠাক খেলে,খাওয়াদাওয়া ঠিকঠাক করলে আর বাজে চিন্তা না করলে গৈরিকাকে একটা রিওয়ার্ড দেবেন। কি রিওয়ার্ড কে জানে? গৈরিকা কি বাচ্চা নাকি,রিওয়ার্ড দিতে হবে ওকে? সুহার্তর প্যাম্পার করার চোটে আজকাল নিজেকে বাচ্চাই মনে হয় গৈরিকার। সব কিছু হাতের গোড়ায় জুগিয়ে যাবে সারাক্ষণ। ওর মন ভালো করার জন্য অনেক আয়োজন করে। ওর পছন্দের খাওয়ার রান্না করায়,পছন্দের রং-এর পর্দা টাঙিয়েছে,পছন্দের রুম ফ্রেশনার ব্যবহার করে,ঘরের এসিও গৈরিকার পছন্দের উষ্ণতায় চলে নিজে থেকেই। ওর এত পছন্দ সুহার্ত জানল কি করে কে জানে? ও তো কোনদিন বলেনি। সুহার্ত বলে গৈরিকার লেখা পড়েই ও গৈরিকাকে এতটা ভালোভাবে চিনেছে। লেখায় কি ব্যক্তিত্বের এতটা ছাপ পড়ে? সচেতন ভাবে তো কখনো এসব করেনি গৈরিকা,তাহলে অবচেতনেই কি ছাপ পড়ে গেছে? সুহার্ত ঘরে এল তখনি। মুখে বিশ্বজয়ের হাসি লেগে আছে।

-উফ! অনেক কাজ করে এলাম। এমা! খাওনি এখনো? খাবারটা পড়ে আছে? বকব কিন্তু এবার।

গৈরিকা খাওয়ার প্লেটটা হাতে নেয়। সুহার্ত থামিয়ে দেয়।

-লেট মি ফিড ইউ।

-একদম না। আমি কি বাচ্চা?

-বাচ্চারও অধম। চুপচাপ বসে খেয়ে নাও। চলো,হাঁ করো।

গৈরিকা চুপচাপ খেতে থাকে।

-স্নান করেছ?

-হুঁ।

-ওষুধ খেয়েছ?

-হুঁ।

-বাঃ। গুড গার্ল। একটা গুড নিউজ আছে। ইনফ্যাক্ট দুটো।

-গুড নিউজ?

-ইয়েস। তুমি গেস করো তো কি হতে পারে?

-তোমার কোন নতুন কবিতা জাতিতে বেরিয়েছে?

গৈরিকা কিছুক্ষণ ভেবে বলে,এর থেকে বেশি কোন গুড নিউজ ওর মাথায় আসে না।

-ধ্যাৎ! আমার কথা নিয়ে ভাবছিই না আমি। গুড নিউজটা তোমার।

-আমার?

আকাশটা থেকে পড়ে গৈরিকা। ওর আবার কি গুড নিউজ হতে পারে? ওর জীবনে যা কিছু ভালো সব তো মুছে গেছে।

-হুম। তোমার কলেজ গিয়েছিলাম। তোমার লিভ অ্যাপ্লিকেশনটা দিয়ে এলাম,একমাসের লিভ গ্রান্ট হয়েছে।

গৈরিকার মনেই ছিল না অ্যাপ্লিকেশন দেওয়ার কথা। সুহার্তই লিখে সই করিয়ে নিয়েছিল।

-ওহ। আর?

-প্রতিবিম্ব থেকে সুদেববাবু ফোন করেছিলেন। তোমার উপন্যাসটা ভীষণ পছন্দ হয়েছে ওনার।

-উপন্যাস? কোন উপন্যাস?

-কেন? ‘কাঁটা তারের বেড়া’?

-সুদেব কি করে পেলেন ওটা? আমি কি দিয়েছিলাম?

মনে করতে পারে না গৈরিকা। প্রতিবিম্বে যাবে ভেবেও সেদিন প্রিতিবিম্বে যায়নি ও। হ্যাঁ,যতদূর মনে পড়ছে উচ্ছ্বাসে গেছিল।

-তুমি দাওনি ম্যাডাম। আমি দিয়েছি। তুমি যখন নার্সিংহোমে ভর্তি তখনি দিয়ে এসেছি। তোমার টেবিলে ঐ বোকামিতে ভরা চিঠিটার পাশে বড় খামে উপন্যাসটা ভরা ছিল। উপরে প্রতিবিম্বের নাম লেখা ছিল। তোমার ফোনে সুদেববাবু ফোন করেছিলেন ডেডলাইন মনে করাতে। তা আমি ভাবলাম তোমাকে জিজ্ঞাসা করার উপায় নেই,এদিকে ডেড লাইন পেরিয়ে যাচ্ছে-তাই দিয়ে এলাম। ভালো করিনি?

-হয়তো।

-হয়তো কেন? এটা তো উচ্ছ্বাস ছাপত না।

-ওরা কি কিছুই ছাপাব আর?

-না ছাপল। তাতে কি যায় আসে?

সুহার্ত কথা বলতে বলতেই থমকায়। গৈরিকার চোখ দিয়ে জল পড়ছে

-আবার? কেঁদো না। এই বোকা মেয়ে,তোমার লেখা ছাপার জায়গার অভাব আছে?

গৈরিকা নিরুত্তর থাকে।

-আচ্ছা। আমি সরি। এই লেখালিখি নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়। সত্যি বড্ড বোরিং হয়ে যাচ্ছি আমি। দুনিয়ায় কি আর টপিক নেই?

-মন ভোলাচ্ছ?

-মন ভোলাতে যদি পারতাম তা হলে রাতে সোফায় শুতে হত না ম্যাডাম। পা কুঁকড়ে শুতে খুব লাগে,মাইরি বলছি।

-কে শুতে বলেছে? চলে যাও। আমি তো আগেই বলেছি...

-তোমার ফেলে কোথায় যাবো?

-কেন? তোমার বাড়ি।

-তারপর রাতবিরেতে কি না কি ঘটাবে,ছুটতে ছুটতে আবার আসব,নাকি? না,বাবা তার থেকে এখানে আছি। শান্তিতে আছি। সোফায় শুই,মেঝেতে শুই-তোমায় দেখতে তো পাচ্ছি।

-নজরদারি করতে পারছ।

-তাই হল। পুলিশম্যান মার্কিং করছি তোমায়। গোল দিতে পারবে না।

সুহার্ত হেসে বলে। গৈরিকা হাসে না। গম্ভীর হয়ে যায়

-কি হল? আবার মন খারাপ?

-তুমি এখানে থেকে ঠিক করছ না সুহার্ত। আমার কাছে থেকো না। আমি খারাপ। আমার কাছে থাকলে তোমারও ভালো হবে না।

-মন্দ হবে? হোক না,শেষ হয়ে যাব? বেশ তো। তোমার জন্য শেষ হয়ে গেলেও বুঝব-হ্যাঁ,কিছু একটা করলাম। আমার সমাধি ফলকে লেখা থাকবে,”হিয়ার লাইজ আ পোরেট হু নিউ হাউ টু লাভ।”

-কবিতা দিয়ে জীবন চলে না। জীবন বাস্তব। বড় রূঢ় বাস্তব।

-দিব্যি চলে। চালাতে জানতে হয়। ভালোবাসতে জানতে হয়। ভালোবাসলেই দেখবে কবিতায়,কল্পনায়,হাসিতে খুশিতে জীবন কেটে যাচ্ছে।

-উচ্ছ্বাস তোমাকেও ব্যান করবে।

-করুক না। তাতে আমার ঘণ্টা। আরো দশটা দরজা খুলে যাবে তখন। আর সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলে নিজের খেয়ালে লিখে যাব। ডায়েরির পাতা ভরিয়ে লিখে যাব। কেউ ছাপুক না ছাপুক-তাতে রয়েই গেল। গৈরিকা অবাক হয়ে সুহার্তকে দেখে। জটিলতা নামের শব্দটা ওর অভিধানে নেই। সহজ সরলভাবে ভাবতে জানে। অন্যকেও সেভাবে ভাবতে শেখায়। সবাইকে নিজের মত ভাবে সুহার্ত। স্বচ্ছ জলের মত বয়ে যেতে জানে ও। পাহাড়ি ঝরনার মত ঝরে পড়তে জানে। সুহার্তর মুখে মুখে আর তর্ক করে না গৈরিকা। তর্ক করতে ভালো লাগে না। বরং ওর কথা শুনতে ভালো লাগে। কথা বলতেও পারে বটে। বিরাম বিশ্রাম নেয় না,যা মনে আসে বলে চলে। ওর কথা শুনতে শুনতে ডুবে যায় গৈরিকা। গৈরিকা সুহার্তকে যেতে বলতে পারে না। বরং ওর থাকাটাই এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আর ভুলে যাওয়ার ভয় পায় না। সুহার্ত আছে। ও সবকিছু মনে করিয়ে দেয়। ওরা দুজনে লেখালিখি নিয়ে কথা বলে না আর। উচ্ছ্বাস,জাতি,অনিমেষ বসু,ইন্দ্রনীল শব্দগুলো নিষিদ্ধ ওদের আলোচনায়। গল্প করে। গল্প মানে সুহার্তই কথা বলে যায়। গৈরিকা নির্বাক শ্রোতার মত শোনে। ওকে হাসাবার চেষ্টা করে সুহার্ত। মজার কথা বলে। হাসির গল্প শোনায়। আগে হাসত না গৈরিকা। এখন একটু একটু হাসে। কাল ডাক্তারবাবু দেখে খুশি হয়েছেন খুব। অনেকটা ইমপ্রুভ করেছে গৈরিকা। ওষুধ কমিয়ে দিয়েছেন,এটাই নাকি ওর রিওয়ার্ড। গৈরিকা এখন ঘুমোয়। ঘুমোতে পারে। ওষুধ খেয়ে ফেললে চোখে ঘুম নেমে আসে। ডিপ্রেশনের ওষুধ বড্ড কড়া। ঘুম না এসে জো নেই। ও না ঘুমানো পর্যন্ত সুহার্ত ওর শিয়রে বসে থাকে। গল্প বলে,মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। ঘুমিয়ে পড়লে তবেই উঠে গৈরিকার লেখার টেবিলে বসে। সুহার্তরও রাত জেগে লেখার অভ্যাস। অন্য ঘরে গিয়ে লিখতে বসতে চায় না ও। গৈরিকার ঘরে না থাকলে যদি ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়,যদি ওর কিছু প্রয়োজন হয়…তাহলে সুহার্ত কি করে এনে দেবে? লিখতে লিখতে থামে সুহার্ত। ঘুমন্ত নারীটিকে অপলকে দেখে,খুব শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। শিশুর সারল্য ভরে আছে ওর মুখে।  ঘুম ভেঙে যায়,যদি ওর কিছু প্রয়োজন হয়...তাহলে সুহার্ত কি করে এনে দেবে? চাদরটা সরে গেছে। সুহার্ত যায়। সন্তর্পনে চাদর টেনে দেয়। গৈরিকার মাথায় হাত বুলিয়ে কপালে একটা চুমু খায়। গৈরিকা অস্ফুটে বলে, “নিখিল...” সুহার্ত নিজেকে সরিয়ে নেয়। নিখিলেশদা রোজ ফোন করে। গৈরিকাকে লুকিয়ে ফোনটা ধরে সুহার্ত। গৈরিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ মেডিক্যাল বুলেটিন না শুনলে শান্ত হয় না নিখিলেশ। সুহার্ত বলে,অক্লান্ত ভাবে বলে যায়। নিখিলেশের গলার স্বর আর্দ্র হয়ে আসে, “সেরে উঠবে,ঠিক তো?” “ঠিক সারবে,ডাক্তারবাবু বললেন তো। রিন্টুর পরীক্ষা কবে শেষ গো?” “এই তো,আর তিনটে বাকি। কেন বল তো?” “ওকে এখানে নিয়ে আসব তারপর। গৈরিকা ঘুমের ঘোরে অসংখ্যবার ওর নাম করে...” “আর্চিরও সারাদিন এককথা-কবে মামমাম যাবো। হ্যাঁ রে,এমনিতে আমার কথা কিছু বলে,আর্চির কথা?” সুহার্ত সত্যিটা লুকায়,গৈরিকা জাগরণে কখনোই নিখিলেশ যা অরিনের কথা বলে না। তবুও সুহার্ত বলে, “বলবে না? বলে তো।” “ও।” সুহার্ত বোঝে নিখিলেশ ওর গলার স্বরের জোরের অভাব বুঝে ফেলেছে। “নিখিলেশদা,সেদিন নার্সিংহোমে ও তোমার সাথে দেখা করতে চায়নি,উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল-ওটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তখন ওর মনের অবস্থাটা তো বুঝবে?” নিখিলেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “বুঝি। সব আমারই দোষ। বুঝেই তো সরে এলাম। ডাক্তারবাবু কি বললেন শুনিসনি-যা কিছু ওকে উত্তেজিত করে তা ওর থেকে দূরে রাখতে হবে?” “ওটা তোমাকে মিন করেননি। রাখি তো। ওসব লেখালিখির কথা,লেখার জগৎ-এর পলিটিক্স-এসব নিয়ে ওকে কিছু বলি না একদম।” “গৈরিকা লিখতে চায়না? না লিখে তো ও একদিনও থাকতে পারে না।” “চায়নি এখনো,তবে শিগগির চাইবে।” “কি করে বুঝলি?” “আগে তো ঘর থেকে বেরোত না। এখন বেরোয়। ডাইনিং হলে আসে। টিভি দেখে। পেপার পড়ে। তারপর দেখবে-একদিন নিজে থেকেই লিখতে চাইবে।” “বলছিস?” “বলছি। নিখিলেশদা,একটা কথা বলো তো গৈরিকা কার কবিতা সবচেয়ে ভালোবাসে?” “কবিতা ভালোবাসে ও। যতই গদ্য লিখুক,কবিতাই তো ওর প্রথম প্রেম।” “বাঃ। তাহলে ওকে রোজ রাতে কবিতা পড়ে শোনাব। কবিতার মত ওষুধ আর হয় নাকি? নিখিলেশদার কাছে ঋণী সুহার্ত। ওর কাছ থেকেই গৈরিকার সব পছন্দ,অপছন্দ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জেনেছে। গৈরিকা ভীষণ অবাক হয় যখন সুহার্ত ওর জন্য ফ্রুট অ্যান্ড নাট চকোলেট নিয়ে আসে,যখন আকাশি রং-এর পর্দা টাঙায়,যখন চন্দনের গন্ধওয়ালা রুম ফ্রেশনার ব্যবহার করে,এসিটাকে বেঁধে রাখে আঠারোতে...ভাবে সুহার্ত কি করে জানল এত সব? এসবই নিখিলেশের কাছে থেকে জানা ওর। নিখিলেশদা গৈরিকাকে যতটা ভালোবাসে চেনে,ততটা আর কেউ চেনে না। ওদের মধ্যে এত মান অভিমান কি নিয়ে জানে না সুহার্ত। যেটুকু আঁচ করতে পারে-সেটা তৃতীয় কারোর উপস্থিতি। নিখিলেশের জীবনে অন্য কোন নারীর অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেনি গৈরিকা। প্রশ্নটা গৈরিকাকে করবে ভেবেও করা হয় না। নিখিলেশকেও করতে পারে না। রুচিতে বাঁধে। নিখিলেশের উপর রাগ করতে পারে না ও। অভিমান হয়। কি করে গৈরিকার ভালোবাসা ভুলে অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারে মানুষ-ও বোঝে না। ও নিখিলেশ হলে পারত না। অপেক্ষা করত গৈরিকার ফিরে আসার। মন প্রাণ দিয়ে চাইত,গৈরিকার ফিরে আসুক। মন প্রাণ দিয়ে কেউ কিছু চাইলে তা বিফলে যায় না। সুহার্ত আস্তিক। ভগবানে বিশ্বাসী। গৈরিকাকে নিখাদ ভালোবেসেছিল বলেই তা আজ গৈরিকার এত কাছে এসেছে? যা পেয়েছে,তা নিয়েই তৃপ্ত সুহার্ত। গৈরিকা সেরে উঠুক,সুস্থ থেকে-আগের মত আবার লিখুক-এটা মনে প্রাণে চায়। রোজ বেড়িয়ে সামনের কালীমন্দিরে পূজো দেয়। মায়ের পায়ে একটা করে জবা রাখে। গৈরিকার সুস্থতা কামনা করে নতজানু হয়ে,ওর সবকিছুর বিনিময়েও যদি গৈরিকা আগের মত হয়ে যায়-তবে তাই সই। তাই করবে সুহার্ত। একমুহূর্ত ভাববে না। একটুও ইতস্ততঃ করবে না।

-কে ফোন করল?

-একটা বন্ধু।

-কি বলল?

-ঐ কাল একটা কবিতাপাঠ আছে। বিকাল চারটে থেকে। রাত আটটা অবধি চলবে। আমি বললাম হবে না। অত রাত করা যাবে না।

-কোথায়?

-অ্যাকামেডিতে।

-কাদের?

গৈরিকার মুখোমুখি বসেছিল সুহার্ত। ও মিথ্যা বলে না। গৈরিকা শুনলেই সুহার্তকে পাঠাতে জোর করবে,তবুও বলতে হল

-কাশিদাস।

-সেকি? কাশীদাশের প্রোগ্রামে যাবে না? পাগল নাকি? যাও চলে যাও,

-তোমাকে কে দেখবে?

-আমি তো এখন অনেকটাই সুস্থ। তাছাড়া মায়া রয়েছে। অসুবিধা হবে না।

-আমি যাবো না। তোমায় ফেলে গেলেও আমার মন এখানে পড়ে থাকবে।

-এরকম করো না । তুমি যে ভয়টা করছ-আমি বলছি সে ভয় আর নেই। আমি ওরকম বোকামো করবো না।

-বোকামো করেছ,বুঝেছ তাহলে?

বুঝব না? তুমি,মায়া,ডাক্তারবাবু-সবাই মিলে আমায় এটাই তো বুঝিয়ে চলেছ।

-আর করবে না তো?

সুহার্তর চোখে উৎকন্ঠা দেখে গৈরিকা।

-না,আর করব না। কথা দিচ্ছি। তুমি কাল যাবে তো তাহলে?

-তুমি যাবে?

-আমি গিয়ে কি করব? কবিতার অনুষ্ঠান।

-তুমি গেলে সব কবিরা খেলো হয়ে যাবে। মিডিয়া তোমাকেই তাক করবে।

-অত আলো আমার আর সহ্য হয় না।

-সহ্য না হলে হবে? তুমি তো সেলিব্রিটি। বলো যাবে?

-না। ওখানে তোমার সাথে গেলে সবাই না জানি কিসব রটাবে।

-ভালো তো। রটাক। সেই বাহানায় আমিও বিখ্যাত হয়ে যাব। গৈরিকা সান্যালের নতুন বয়ফ্রেন্ড।

-সব কিছু নিয়ে তামাশা ভালো লাগে না।

-ও,তামাশা করলাম? বয়ফ্রন্ড নই। তাহলে, আমি তোমার কে?

-খুব ভালো বন্ধু। ইনফ্যাক্ট সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

-বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথেও তো মানুষ যায় নাকি?

-না। আমার ঐ জগৎ ভালো লাগে না আর। খুব মেকি মনে হয় সবকিছু। সবাই মুখের উপর মুখোশ পরে ঘোরে। ওখানে গেলে আমার দমবন্ধ হয়ে আসবে।

-বেশ। যেও না। তবে আমায় জোর করো না। আমি ওখানে গিয়ে কষ্ট পাব। খালি তোমার কথা মনে পড়বে।

-এবার তুমি বোকামো করছ। তোমাকেও সবাই ভুল ভাববে। সবাই ভাববে তুমি খুব নাক উঁচু হয়ে গেছ বলে অনুষ্ঠানগুলোতে যাও না।

-ভাবুক। আমি জানি আমি কি। আমি ওখানে যাওয়ার বদলে তোমাকে কবিতা পড়ে শোনাবো সারাদিন। আমার তৃপ্তি হবে।

-বেশ। তাই করো।

-আমার কবিতা কেমন লাগে তোমার?

-ভালো। তবে আরও ভালো হতে পারে।

-ধ্যাৎ! তুমি না বড্ড কড়া সমালোচক। কোন কিছুতেই কিছু করা যায় না তোমায়। কবিতা শুনে কোথায় বলবে, "বাঃ। ভালো হয়েছে।" না পেঁচার মত মুখ করে পাচন গেলার ভঙ্গিতে বলো, "হুম।"

গৈরিকার খুব অবাক লাগল। এই কথাগুলো আর একজন বলত। রোজ নতুন কবিতা শোনাত আর বলত, "এটা কেমন হয়েছে?" "ঐ আর কি। তিন আর চার নম্বর লাইনটা বাদে কবিতাটার তেমন কিছু নেই।" "উফ! তোমাকে খুশি করা খুব কঠিন। অসম্ভব বলা যায়।" "কেন? কালকের কবিতাটাকেই তো ভালো বললাম।" "ভালো। একটা মাত্র শব্দ। ব্যাস। কোনও উচ্ছ্বাস নেই তোমার? কোনও হাসি নেই মুখে? না হলে কি করে কি করে বুঝব যে ভালো হয়েছে?" "বেশ, ভালো হয়েছেটা এবার নাচতে নাচতে বলবো।" "থাক নাচন কোঁদনের দরকার নেই। ঐ পাচন গেলা মুখ করেই বলবে। বুঝে নেব।"

-কি হল? কি ভাবছ?

-কিছু না।

গৈরিকা সামলে নিল।

-আমার কবিতা একদম পছন্দ নয় মনে হয়। না হলে মুড এভাবে অফ হয়ে গেল?

-তা নয়। আসলে 'ভালো' শব্দটা বেছে বেছে ব্যবহার করা উচিৎ বলে মনে হয়। সবসময় 'ভালো' বললে তোমার ভালো করার ইচ্ছেটাই চলে যাবে,ভালোর কি কোনও শেষ আছে?

-সাধে কি তোমায় দিদিমনি বলি? বেশ,এবার থেকে আমার ভুলগুলো ধরিয়ে দেবে। আর তোমার মনের মত না হলে কক্ষনো ভালো বলবে না।

-আমি ভুল ধরাব কি করে? নিজেই লিখতে পারি না।

সুহার্ত বুঝল এই সুযোগেই কথাটা পাড়তে হবে

-লিখতে ইচ্ছে করে তোমার?

-আগে করত না। আজ একটু একটু করছে। কিন্তু লিখবো কি করে? হাতে ব্যথা যে।

-কেন? আমি লিখে দেব। তুমি বলবে, আমি লিখব।

-তোমার লেখা?

-পরে হবে।

-এত কেন করবে আমার জন্য?

-উত্তরটা তুমি জানো। তাও বারবার প্রশ্ন করো কেন বলতো?

গৈরিকা অন্যদিকে তাকায়। সুহার্ত ভালোবাসার কথা বলবে। ও শুনতে চায় না। ভালোবাসা শব্দটাই শুনতে চায় না। ভালোবাসার ক্ষত এখনো দগদগ করছে ওর বুকে। সুহার্ত কথা বাড়ায় না।

        গৈরিকার শিয়রে বসে কবিতা শোনাচ্ছিল সুহার্ত। গৈরিকা চুপ করে শুনছিল। কবির নাম বলছিল না ও। একটার পর একটা কবিতা পড়ছিল-গৈরিকাকে কবির নাম ভেবে বলতে হচ্ছিল। সুহার্ত ওর স্মৃতিশক্তি দেখে অবাক হচ্ছিল। প্রায় প্রতিবারই সঠিক নামটাই নিচ্ছিল ও। এত মনে রাখে কি করে কে জানে? নিখিলেশদার একটা লেখা বার করল। গৈরিকা সুহার্তর বলা প্রথম লাইনটা শুনেই থামিয়ে দিল।

-এটা থাক।

-কেন?

-আমি শুনতে চাই না।

-কবিতাটা তো ভালো।

-ভালো নয়। অসামান্য। তবুও নয়।

-এত অভিমান কেন?

-অভিমানের অধিকার নেই আমার। খামোকা করবো কেন?

সুহার্ত বইটা মুড়ে রাখল।

-থাক। তুমি যখন বলতে চাও না। বলতে হবে না।

সুহার্ত উঠে দাঁড়াল। বাথরুমে যাবে ও।

-এবার চুপটি করে ঘুমোও।

গৈরিকা নিরুত্তর থাকে। বাথরুম থেকে ফিরে এসে সুহার্ত দেখে গৈরিকা খাটের উপর উঠে বসেছে। দুই হাঁটুর ফাঁকে মুখ গুঁজে কাঁদছে।

-গৈরিকা, কি হল? কাঁদছ কেন?

সুহার্ত ওর মাথায় হাত রাখতেই ওকে আঁকড়ে ধরল গৈরিকা। সুহার্ত ওর মাথায়,গায়ে পিঠে হাত বোলাতে থাকল।

-প্লিজ,কেঁদো না। আমি সরি। আমার উচিৎ হয়নি।

-কেন? কেন নিখিল এমনটা করল বলো তো? আমি তো ফিরতে চেয়েছিলাম। সংসার করতে চেয়েছিলাম আবার। রিন্টুকে নিয়ে, রিন্টুর বাবাকে নিয়ে...

-থাক। ওসব ভেবো না। যা ভেবে কষ্ট হয়...

-আমি যে ওকে বিশ্বাস করছিলাম। ভেবেছিলাম ও আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারবে না। অথচ...

সুহার্ত বুঝল ওর আন্দাজটাই ঠিক। নিখিলেশদা এটা কি ঠিক করল?

-বাদ দাও। যে বিশ্বাসের মর্যাদা রাখে না-তাকে মনে রেখে কি লাভ?

-আমার যে কিছু ভালো লাগছে না। কিছু ভালো লাগছে না....

গৈরিকা অসহায়ভাবে কাঁদছিল।

এভাবে বলে না। তুমি না ভালো মেয়ে। ডাক্তারবাবু বললেন না,সেরে উঠবে শিগগিরি...

-আমি যে আর পারছি না। আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে যাবে? এসবের থেকে অনেক দূরে?

গৈরিকা মুখ তুলে সুহার্তর চোখে চোখ রাখল। সুহার্ত ওর কপালে চুমু খেল।

-যাব ডুয়ার্স যাবে? তোমায় বলেছিলাম,মনে আছে?

-যাব। কবে যাবে?

-যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তোমার চেঞ্জ দরকার

ডাক্তারবাবু ঠিকই বলছিলেন। গৈরিকা সুহার্তর বুকে মুখ রাখে। সুহার্তর বাহুবন্ধন দৃঢ় হয়। দূরে যাওয়ার দরকার। গৈরিকাই ঠিক বলেছে। ওকে সবার থেকে দূরে নিয়ে যাবে সুহার্ত।






Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-