বুধবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৮

রুমকি রায় দত্ত

শব্দের মিছিল | জানুয়ারী ৩১, ২০১৮ |
রুমকি রায় দত্ত
কৌশানিঃ
বাগেশ্বর ছেড়ে আরও প্রায় ঘন্টাখানেক এগিয়ে গাড়ি থেমে গেল একটা মন্দিরএর সামনে। না, এটা কোনো একটা মন্দির নয়। দেখতে পেলাম পৌরানিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালো পাথরের তৈরি একাধিক মন্দির। রাস্তা থেকে মন্দিরের পাশদিয়ে ধাপে ধাপে নেমে গিয়েছে সিঁড়ি। ডানিদিকে একটা সরু নদী বয়ে চলেছে। সামনেই একটা বোর্ডে লেখা আছে ‘বৈজনাথ মন্দির’।

সপ্তম থেকে একদশ খ্রীষ্টাব্দে এই অঞ্চলটির নাম ছিল “কার্তিকিয়াপুরা”। সেই সময় এখানে কাত্যুরি নামে একটি উপত্যকায় ১৪৫ জন জনসংখ্যা নিয়ে গড়ে উঠেছিল একটি ছোট্ট গ্রাম। এখানেই কাত্যুরি রাজা ১১৫০ খ্রীষ্টাব্দে গড়ে তোলেন বৈজনাথ নামে শিবমন্দিরটি। কথিত আছে গোমতী ও গৌরীগঙ্গা নদীর মিলিত এই প্রবাহ স্থলেই ভগবান শিব আর পার্বতীর বিবাহ সম্পন্ন হয়,তাই পৌরানিক দিক থেকে এই স্থানটির যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। বৈজনাথ শিবের নামে এই মন্দিরটি উৎসর্গীকৃত হলেও আসলে এটি কতগুলি মন্দিরের একত্র সমাবেশ। এখানে ভগবান শিব, পার্বতী, দেবী চন্ডী, কুবের, সূর্য এবং ব্রহ্মার মন্দির আছে। গোমতীনদীর বাম উপত্যকায় অবস্থিত এই মন্দিরের সমগ্র অংশই পাথরের তৈরি। মূল দূর্গামন্দিরটি কালো পাথরের তৈরি। মন্দিরের পাশের সিঁড়ি থেকে বসার জায়গা সবই পাথারের। পাশদিয়ে বয়ে চলেছে গোমতীনদী, বুকের উপর জেগে আছে নুড়ি-পাথর। সব থেকে আকর্ষণীয় হলো নদীর স্বচ্ছ জলে ভাসমান মাছেদের খেলা। পড়ন্ত শীতের রোদ্দুরে পিঠ সেঁকতে সেঁকতে যদি দৃষ্টি ক্ষণিক হারিয়ে যায় মাছেদের জলকেলি বা নদীর কুলুকুলু রবে, ক্ষতি তো নেই তাতে।

বৈজনাথ ছাড়িয়ে কৌশানির প্রবেশপথ পিঙ্গলকোটে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো চা বাগান। সিজন অফ। বন্ধ বাগানের নেড়া গাছের ফাঁকে কিছুক্ষণ ঘুরে সামনেই একটা হোটেল থেকে আমরা দুপুরের খাওয়া যখন সারলাম,তখন ঘড়িতে বাজে সাড়ে চারটে। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে। এখানে গান্ধী আশ্রমের পাশে পঞ্চায়েতের যে গেস্টহাউস আছে, সেখানেই আমাদের রাত্রিবাসের আয়োজন করা হয়েছে। সুন্দর বেশ ঘরগুলো। রাতের খাবার খিচুড়ি। কৌশানিতে আলাদা করে দেখার কিছু নেই,তবে পাশেই গান্ধী আশ্রমটি দেখার মত। ওখানে জানতে পারলাম সকাল ৮ঃ৩০ এ গান্ধী মিউজিয়ামটা খোলা হয়। পরেরদিনেও আমাদের সারা রাস্তা গাড়িতেই কাটবে,তাই সকাল সকাল বেরোতে হবে। ঠিক করা হলো বেরোনোর আগে গান্ধী আশ্রমটা আমরা দেখে নেবো। পরদিন সেইমতো প্রস্তুতি। সকালে আশ্রমের প্রার্থনাঘরে গিয়ে দেখলাম প্রার্থনা শেষ হয়ে গিয়েছে, তবু যেন নিঃশব্দ শান্তি তখনও সেখানে বিরাজ করছে। সুন্দর সাজানো বাগানের মাঝে গান্ধী মিউজিয়াম। কিছুসময় কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম নৈনিতালের পথে। পথেই পড়বে রাণীখেত। প্রায় ঘন্টাখানেকের পথ এগিয়ে দাঁড়ানো হলো একটা চায়ের দোকানে। প্রতিদিনের চলার পথে এমন হাজারো চায়ের দোকান আমাদের নজর এড়িয়ে যায়,কিন্তু এমন নির্জন পাহাড়ি পথে মাঝে মাঝে চা পানের মধ্যে কেমন যেন আলাদা একটা ভালোলাগা কাজ করে। এগিয়ে যেতে যেতে গাড়ি থামলো আর্মি গলফ গ্রাউন্ডের পাশে। অনন্ত বিস্তৃত সবুজ গাসের গালিচা দেখে চোখ ও মন দুটোই যেন শান্তিতে ভরে ওঠে। এখানেই দেখে নিলাম সোমনাথ মন্দির আর এর ঠিক সামনেই গুরুদ্বার ও শাল ফ্র্যাক্টারি। তাঁতের মাকুতে শাল বুনে চলেছে মৃত আর্মি সৈনিকদের স্ত্রীরা। ফ্যাক্টরির ছাদের দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো অসংখ্য মাটির হাঁড়ি ঝোলানো রয়েছে ছাদের সিলিং থেকে। ওদের কাছেই জানলাম, এতে নাকি মাকু চালানোর শব্দ অনেক কম ছড়ায়।


ঠিক সন্ধ্যে পৌনে ছটা তখন, গাড়ি প্রবেশ করলো হ্রদ শহরে। সন্ধ্যে ছটার পর প্রধান শহরের রাস্তায় গাড়ি নো এন্ট্রি হয়ে যায়। আমাদের হোটেল আগে থেকে ঠিক করা ছিল না। মাল রোডেই ঠিক নয়না লেকের সামনেই একটা মন মতো হোটেলকে বেঁছে নেওয়া হলো আমাদের আগামী দু’দিনের অস্থায়ী ঠিকানা হিসাবে। “ প্রতাপ রিজেন্সি” সুন্দর কাঠের দেওয়াল ও মেঝে, যদিও ঘরগুলো বেশ ছোটো। তবে সাজানো। যখনই কোথাও ঘুরতে গিয়েছি, চেষ্টা করেছি বেশিরভাগ সময় বাইরেই কাটাতে। কেন জানি মনে হয় একটা জায়গাকে সামান্যও যদি চিনতে হয় তবে পায়ে হেঁটে ঘোরাটা প্রয়োজন। আর ক’টাদিন চারদেওয়ালের থেকে মুক্তির জন্যই তো বেদুইন হওয়া, তবে শুধু শুধু হোটেলে সময় নষ্ট করা কেন? এক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম কিছু ঘটলো না। সারা দিনের ক্লান্তি যেন কোথায় উড়নছুঁ তখন। হোটেলের রুমে জিনিস রেখে সামান্য হাতে মুখে জল ছিটিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম আমরা। মাল রোডে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম মল্লিতালের দিকে। এদিক ওদিক কিছুটা হাঁটা সঙ্গে মোমো। ন’টার দিকে রুমে ফিরে সোজা বিছানায়। একঘুমে সকাল। দিনের আলো ফুটে উঠতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম বাইরে। সামনে রাস্তার ওপারে চকচকে নয়না হ্রদ। রাস্তা দিয়ে গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে দু’একটা মানুষ।

নৈনিতাল,একসময় পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা একটা লুকানো হ্রদ ছিল। প্রকৃতিতে এভাবে কত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে আজও হয়তো! হয়তো কালের নিয়মে একদিন তার সৌন্দর্যের ডালি তুলে ধরবে কেউ একজন, ঠিক যে ভাবে পি.ব্যারন নামে একজন ইউরোপীয়ান শিকারি ও ব্যবসায়ী এই নয়না হ্রদকে তার সৌন্দর্যকে তুলে ধরেন জগতের সামনে। নৈনিতালের এক অখ্যাত গ্রাম ‘রোসা’। একসময় ব্যারন নামে এক ব্যবসায়ী ইউরোপ থেকে ব্যাবসা করার উদ্দেশে উত্তরাখণ্ডের এই অখ্যাত গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন।একদিন শিকারের উদ্দেশে জঙ্গলে ভ্রমণ কালে হঠাৎ তার নজরে আসে সুন্দর জঙ্গলে ঘেরা এই হ্রদ। তিনি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এই হ্রদকে ঘিরে গড়ে তুলবেন Hill Resort. কিন্তু স্বপ্নের ছিল অনেক অন্তরায়। তিনি সেখানে পৌঁছানোর রাস্তা জানতেন না। যদিও স্থানীয় মানুষদের অজানা ছিল না এই হ্রদের কথা,কিন্তু তারা এই হ্রদকে সবার চোখের আড়ালে রাখার চেষ্টা করে ও বারবার ব্যারন সাহেবকে পথভ্রষ্ট করতে থাকে। ১৮৩৯ সালে এক সকালে ব্যারন সাহেব স্থানীয় এক পথপ্রদর্শককে সঙ্গে নিয়ে হাঁটা পথে রওনা দেয় নয়না লেকের উদ্দেশে। দীর্ঘ পথ হাটাঁর পরও যখন পৌঁছাতে পারে না,সন্দেহ হয় ব্যারন সাহেবের যে, পথপ্রদর্শক হয়তো ইচ্ছা করেই তাকে ভুল পথে নিয়ে চলেছে। অনেক ভেবে একটি উপায় বার করেন তিনি। সামনেই পড়ে থাকা একটি বিশাল আকৃতির পাথর তুলে নিয়ে চাপিয়ে দেন ওই পথপ্রদর্শকের মাথায় এবং তাকে ভয় দেখিয়ে অবশেষে পৌঁছে যান নয়না হ্রদের কাছে। বর্তমানে যেখানে নৈনিতাল ক্লাব আছে একদা সেখানেই ব্যারন সাহেব গড়ে তুলেছিলান তাঁর Hill Resort

দিনটা ২২শে ফেব্রুয়ারী। লেক শহরে আমাদের প্রথমদিন। স্নান সেরে বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। ওপাশে স্থির শুয়ে আছে নয়নাভিরাম নয়না লেক।জলের উপরিতল থেকে ধোঁয়ার মতো উঠে আসছে কুয়াশা। ঘষা কাচের মতো লাগছে। আমাদের সফর সঙ্গী দু’জন তখনও প্রস্তুত হতে পারেনি। কিছুটা সময় হাতে রয়েছে। রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম হ্রদের কাছে। পাড় ধরে হাঁটতে লাগলাম বেশ কিছুটা পথ। দেওয়ানজি তখনও গাড়ি নিয়ে আসেননি। মিনিট দশেকের মধ্যেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম সেই দিনের গন্তব্যের উদ্দেশে। গাড়ি এসে দাঁড়ালো “ইকো কেভ পার্কের” সামনে। সামনে একটা গেট। গেটের পাশেই কাউন্টার। টিকিট মূল্য ৫ টাকা। তখন ছিল। একটা সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ। গাছমছমে ছোটো ছোটো বাঁশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা ভিতরে।বাঘ লুকানোর আদর্শ জায়গা। কিছুটা গিয়ে সামনেই টাইগার কেভ। না কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া নেই, একেবারেই প্রাকৃতিক। গুহার এবরো খেবরো পথে কিছুটা যেতেই সূর্যের আলোর সাথে বিচ্ছেদ ঘটলো আমাদের। সামনের পথ বেশ অস্বচ্ছ।ঠিক কোথায় গিয়ে উঠবো জানি না। তবে সাহস বলতে কয়েকজন একসাথেই এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝে বাঘের কল্পনায় পিলে চমকে উঠছে। যদিও জানি সেটা এখানে নেই, তবে কোনো একসময় তিনি এখানে থাকতেন এই কল্পনায় যথেষ্ট এই ভ্রমণকে রোমাঞ্চকর করে গড়ে তোলার জন্য। একটা ফাঁকদিয়ে এক চিলতে আলো এসে পড়েছে গুহার পাথরের গায়ে। নিশ্চিত ওই পথেই এগোতে হবে। আস্তে আস্তে উঠতে লাগলাম উপরে আর একসময় পৌঁছে গেলাম আলোর প্রান্তে,যেখানে সবুজ বৃক্ষরাজি দাঁড়িয়ে আছে প্রাণের ছোঁয়া নিয়ে।

মল্লিতাল থেকে ১২ কি.মি দূরেই রয়েছে খুরপা তাল। এটি একটি ভিউ পয়েন্ট। কাছে থেকে দেখার সুযোগ নেই । প্রায় ৫০০০ ফুট উচ্চতা থেকে এই লেকটি দেখতে লাগে খুরের মত তাই এর নাম খুরপা তাল। দূর থেকেই দেখা যায় এর স্বচ্ছ কাচের মত সবুজ শান্ত জল। কিছুটা ক্ষণ সেই দিকে তাকিয়ে প্রকৃতিকে অন্তরে উপলব্ধি করার মধ্যে একটা আলাদা তৃপ্তি আছে। এখান থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য স্নোভিঊ পয়েন্ট। মল্লিতালের কাছে নৈনিলেকার কাছেই। যাত্রা পথেই পেলাম কাঠের শিল্পের দোকান। এমন অপূর্ব শিল্পীর হাতের কাজ যে, খালি হাতে ফেরা যায় না। কিছু জিনিস সংগ্রহ করে সোজা পৌঁছালাম স্নোভিউ পয়েন্টে। বেশ উপরে একটা টিলার উপর রোপওয়েতে চেপে যেতে হবে আমাদের সেখানে। এই প্রথম রোপওয়েতে চাপার অভিজ্ঞতা। একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চ তখন মনের আনাচে কানাচে ঘোরাঘুরি করছে। কিছুটা উঠতেই দেখতে পেলাম সকাল থেকেই যে নয়না লেকের পাশে হেঁটেছি, সে একটা ভাসমান ছবির মতো আমাদের চোখের সামনে। গাঢ় নীলচেসবুজ জল। স্নোভিউ পয়েন্টে দেখার আছে ছোটো ছোটো কিছু স্পট। আছে বিনোদন পার্ক। বেশ খানিকটা সময় এমনই কেটে যায়। ওখান থেকে আবার রোপওয়েতে নীচে নামা। সোজা লেকের কাছে। তখন পড়ন্ত বিকেল। দেখলাম লেকের মাঝে বেসে বেরাচ্ছে ছোটো ছোটো নৌকা। আমরাও এমনই একটা নৌকায় ভাসতে লাগলাম নয়নালেকের বুকে। জল কেটে এগিয়ে চললো আমাদের নৌকা। গিয়ে
থামলো হনুমান মন্দিরের সামনে। এই পর্যন্তই নৌকা সাওয়ার। এর পর ফেরার দিকে বাকি হাঁটা পথ। হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছালাম নয়না দেবী মন্দিরের সামনে। অপূর্ব চোখ জুড়ানো মন্দির আর মন্দিরের পরিবেশ। আস্তে আস্তে দেখতে লাগলাম সন্ধ্যের আগমন। আলোয় সেজে উঠতে লাগলো লেকের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা বসতির ঘরে ঘরে আলো। পাশেই রয়েছে তিব্বতী বাজার। গরম পোশাকের সম্ভার এখানে। দাম করে নিতে হবে। কিছুটা হেঁটেই মাল রোড বাজার। এখানে একটা জিনিস খুব বিখ্যাত, সেটা হলো মোমবাতি। যেমনতেমন নয়, বিভিন্ন আকৃতির কি কি বললো? নমুনা দিতে পারি। যেমন নৌকা দেখলাম, হাতে নয়ে দেখি মোমবাতি। ছোটো সাজানোর সাইকেল, সেও মোমবাতি। বা! কি সুন্দর ফুলদানিটা! হাতে নিয়ে অবাক! এ ও যে মোমবাতি! হরেকরকমের মোমবাতি যা, জ্বালানোর থেকে সাজিয়ে রাখতেই আনন্দ। রাত হয়েছে, মনে আনন্দের সাথে বিষাদের সুর বাজছে। রাত পোহালেই ফেরার পালা,কিন্তু কাল কি ঘটবে তা কি আগের দিন রাতে জানা সম্ভব?

...শেষ পর্ব পরের সংখ্যায়। পূর্বের পর্ব পড়ুন - 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-