বুধবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৮

গার্গী রায়চৌধুরী

শব্দের মিছিল | জানুয়ারী ৩১, ২০১৮ |
অসমাপ্ত
জুর কথা বলার মতো কিছু না। ও থাকে মফস্বলে। ওর বাবা ছিলেন স্কুল মাস্টার। মা গৃহবধূ। ওরা একটা একতলা পাকা বাড়ি বানিয়েছিলেন পয়সা জমিয়ে। লেখাপড়া শিখিয়ে ঋজুকে গ্রাজুয়েট করেছিলেন। আর পড়াতে পারেন নি। ওইটুকু শিক্ষার জোরেই ঋজু খেয়ে পড়ে আছে। সে কলকাতা শহরের একটা ল্যাবের কেমিস্ট হিসেবে কাজ করছে প্রায় দশ বছর। ঋজুর নিজের উদ্যোগের খুব অভাব। ও এই চাকরি পাল্টে বেশি মাইনের চাকরি খুঁজতে কখনো চেষ্টা করেনি। ওর মা বাবা দুজনেই মারা গেছেন, এক বছরের মধ্যে। তাও নয় নয় করে ওদের গত হবার তিন বছর পার হয়ে গেল। এখন ঋজু ঝাড়া হাত পা। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পরে সকালে, প্রথমে ট্রেনে তারপর বাস ঠেঙ্গিয়ে ল্যাবে যায়। কাজ শেষ করে আট টার ট্রেন ধরে বাড়ি ফেরে। সপ্তাহের দিনগুলো একই ভাবে কাটে। ঋজু চাকরি পাওয়ার আগেই ঋজুর বাবা গত হন। যেদিন তিনি মারা গেলেন হঠাৎ সেরিব্রাল স্ট্রোকে সেদিন ঋজু এই চাকরি টার ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিল। বাবা মারা যাবার এক সপ্তাহ পর চাকরি হওয়ার খবর পায় ঋজু। নিজে মুখে বাবা কে জানাতে পারেনি। মাও দেখে যেতে পারেন নি রোজগেরে ঋজু কে। বাবার মৃত্যুর শোক সামলাতে পারেননি তিনি। বাবা মারা যাওয়ার তিন দিন পরই মা মারা যান। ওরা দেখে গেছেন ঋজু খুব চেষ্টা করছে কিন্তু কোথাও চাকরি হচ্ছে না ওর। চাকরির জন্য দোরে দোরে ঘোরা ঋজুর ওই যন্ত্রণা ক্লিষ্ট মুখটি দেখে ওরা দুজনেই খুব কষ্ট পেতেন। বাবা দিন রাত বিভিন্ন আত্মীয়সজন পাড়া প্রতিবেশীদের বলতেন ঋজুর একটা চাকরির জন্য। কেউ পারেন নি সাহায্য করতে। শেষে যখন চাকরি পেল ঋজু তখন আর ওর বাবা মা বেঁচে ছিলেন না। তাই চাকরি পাওয়ার দিনটা কোন বিশেষ অনন্দের দিন হয়ে উঠতে পারেনি ঋজুর কাছে। 

ঋজুর বয়স এখন প্রায় পঁইত্রিশ। মাঝারি গড়ন, মাঝারি রঙ, মাঝারি স্বাস্থ্য, ঋজুর সবই মাঝারি। তার উপর দাঁতটা উঁচু। অথচ ওর মা বাবা কারোরই দাঁত উঁচু ছিল না। এই উঁচু দাঁত নিয়ে অযথা অনেক হাসি ঠাট্টার শিকার হয়েছে ও সেই ছোটবেলা থেকেই। এক্ষেত্রে ওর তো কিছু করার নেই, অপমান সহ্য করা ছাড়া। মাঝে একবার বাবার দাতের সমস্যার জন্য ডাক্তারের কাছে যেতে তিনি বলেছিলেন ঋজুর দাঁত নাকি অপারেসান করে স্বাভাবিক করে দেওয়া যায়। কিন্তু টাকার অঙ্ক টা অনেক হওয়াতে ঋজুরা সেদিকে এগুতে পারেনি। ঋজুর মতে ওত টাকা খরচের চেয়ে ঠাট্টা গায়ে না মাখা অনেক সহজ। বাবার মন খারাপ হয়েছিল। সত্যি বলতে কি ঋজুর কষ্ট ছিল ওর চেহারা নিয়ে। আয়নার সামনে নিজেকে নানা ভাবে নেড়ে চেড়ে দেখেছে ঋজু, কোন এঙ্গেলেই ভাল দেখায় না ওকে। 

বলাই বাহুল্য ঋজুর মতো একজন উদ্যম হীন মানুষ নিজের বিয়ের জন্যও চেষ্টা করবে না। নিজের চেহারা যে খারাপ সে বিষয়ে ঋজুর মনে কোন সন্দেহ ছিল না। কোন মেয়ের যে ওকে পছন্দ হতে পারে না সে সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিন্ত ছিল ঋজু। লোক জনের সঙ্গে বিশেষ মেলা মেশা কখনই করতো না ও, ল্যাবেও মুখ গুঁজে কাজ করতো। নিজের জীবনে ভাল লাগার মতো কিছুই ছিল না ঋজুর, শুধু একটা জিনিস ছাড়া।

বাড়ি থেকে সাইকেলে করে স্টেশানে গিয়ে রোজ সাতটার ট্রেন ধরত ঋজু। ট্রেনে দু ঘণ্টা তারপর বাসে দশ মিনিট গেলেই ল্যাব। এই তার যাতায়াতের পথ। এই যাতায়াতের পথটুকু বড় ভাল লাগত ঋজুর। বিশেষ করে রোজকার দুই দুই চার ঘণ্টার ট্রেন জার্নি টা বেশ উপভোগ করতো ঋজু। ট্রেনের এক কোণে দাঁড়িয়ে নির্বিকার মুখে, ঋজু মানুষ দেখত। ও রোজ ট্রেনে উঠে চোখ দিয়ে জরিফ করে একটি বিশেষ মুখ কে ঠিক করে নিতো। তারপর সেই মানুষ টার ভাব ভঙ্গী, কথা ইত্যাদির উপর নজর রেখে যেত । বাড়ি ফিরে ডাইরি খুলে তারিখ সন দিয়ে লিখে রাখত সেই চরিত্রের সব খুঁটি নাটি যা কিছু ও লক্ষ্য করেছে ট্রেন জার্নি তে। দীর্ঘদিন ধরে এই কাজটি করতে করতে ঋজুর মনে হয়েছিল বেশিভাগ মানুষ আসলে যে রকম দেখতে ঠিক সেই রকম নয় মনে মনে। ওর দেখা প্রতিটি চরিত্র কে ও বিশ্লেসণের চেষ্টা করতো ওর সংগৃহীত খুঁটিনাটি প্রমান চিনহের ভিত্তিতে। এটা ছিল ঋজুর কাছে একটা নেশার মতো। নিজের অজান্তেই মানুষ ওর কাছে হয়ে উঠেছিল ওর নিজস্ব গবেষণার বিষয়। নিত্য যাত্রীদের ভিড়ে ঠাসা কামরায় ঋজুর সুযোগ পেত একই মানুষকে অনেকদিন ধরে লক্ষ্য করার। ঋজুর কাছে পরতে পরতে খুলে যেত এক একটি চরিত্র। ঋজুর মনে হতো মেঘের আড়ালে থাকা মেঘনাদ কে দেখতে পাচ্ছে সে কেবল মাত্র সেই। অন্য কেউ নয় এমনকি তাদের নিত্য যাত্রী বন্ধুরাও নয়। মেয়েদের অল্পবিস্তর এড়িয়ে চলত ঋজু। মেয়েদের দিকে বেশি তাকালে মুশকিল কি না কি ভাববে। তাছাড়া অফিস টাইমে বেশির ভাগ মেয়ে ওঠে লেডিস কামরায়। হঠাৎ ওঠা লোক জনদেরও দিয়েও চলত না ঋজুর কারণ তাদের বেশিক্ষণ জরিপ করা সম্ভব নয়। ডেলি প্যাসেঞ্জারাই ছিল ওর টার্গেট যদিও এদের মধ্যে আলাপি হাসি হাসার প্রবণতাটা ঋজুর একদম না পসন্দ। ও কারো সাঙ্গে আলাপ করতে চায় না। বরং বাড়ি ফিরে এসে নোট বুক খুলে ওই চরিত্র গুলোকে পৃষ্ঠাবন্দী করে ফেলাতেই ওর বেশি আগ্রহ। এভাবেই চলছিল। কিন্তু চলল না। ঋজুর কীর্তি ধরা পরে গেল ঝুমের হাতে।




ঝুম সরকারি অফিসার হতে চেয়েছিল। কিন্তু টা হয়নি। ও আয়ার কাজ করতে যায় শহরে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছে ভালভাবেই। আর পড়াতে পারেনি বাবা। এখন বাবা মা আর ছোট ভাই টার পেট চলে ঝুমের টাকায়। ঝুম বাড়িতে বলেনি ও আয়ার কাজ করে। ওর বাড়ির লোক জানে ও অফিসে টাইপের কাজ করে। নিজের অফিস নিয়েও অনেক কিছু বানিয়ে বানিয়ে বলেছে ও বাড়িতে। মাইনে টা ঠিকই বলেছে, ও যে বাড়িতে কাজ করে সত্যিই তাঁরা ওকে দশ হাজার টাকা মাইনে দেয়। কিন্তু আয়ার কাজে সম্মান যায় অফিস বললে সেটা রক্ষা পায়। ঝুম বাচ্চার দেখাশুনা করে কাজের বাড়িতে। বাচ্চার মা বাবা অফিসে যায় বাচ্চা সারাদিন থাকে ঝুমের কাছে। দূরে বাড়ি তাই নটা থেকে সাতটা ডিউটি। ঝুম আটটার ট্রেন ধরে রোজ। কাজটা করতে ওর ভাল লাগে। নিজের মতো থাকে সারাদিন বাচ্চা নিয়ে। ছড়া টড়া অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে বাচ্চাটাকে। বাচ্চার মা বাবা ঝুমের ট্রেনিং এ খুব খুশি। ফেরার সময় ট্রেনে ওর দেখা হয় ঋজুর সঙ্গে। ঝুম দেখেছে এক কোণে দাঁড়িয়ে একটা রোগা কালো ছেলে প্রতিদিন কোন না কোন মানুষ কে লক্ষ্য করে। ছেলেটার টানা টানা, মায়াবী চোখ, সামনের দাঁত সামান্য উঁচু। কিন্তু ঝুমের মনে কোন মায়া জাগেনি ওর জন্য। ও শুধু জানতে চায় কেন লোকটা এরকম নজর করে যাত্রীদের। ঝুম এই ট্রেনের ডেলি প্যাসেঞ্জারদের সবাই কে মোটামুটি চেনে। তার বন্ধু বান্ধবও কম নয় ট্রেনে। ফেরার সময় খুব ভিড় থাকে, লেডিসে জায়গা পাওয়া যায় না। জেনারেলে উঠলে পুরুষ বন্ধুদের বদান্যতায় দাঁড়িয়ে যেতে হয়না ঝুমকে। তাই ঝুম ফেরার সময় জেনারেলে ওঠে। ওই দাঁত উঁচু ছেলেটা ডেলি প্যাসেঞ্জার কিন্তু কারো সঙ্গে কথা বলে না, খুব ডাট। বসতে চায় না কখনো, পুরো রাস্তা দাঁড়িয়ে যায়। আর চুপচাপ কি যেন দেখে। ঝুমের কৌতূহল বেড়েই চলে। ও একদিন আলাপ করতে গিয়েছিল ঋজুর সঙ্গে।

উফফ কি গরম না আজ?

ঋজু চুপ। এমনকি একটু মাথাও হেলাল না।

আপনি অশোকনগরে নাবেন তাই না? আমি গোবরডাঙ্গায়।

ঋজু চুপ। একপা সরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। জায়গার অভাবে পারলো না।

ঝুমের রাগ চড়ছে, ও বেশ সুশ্রী দেখতে। ছেলেরা ওর সঙ্গে জেচে আলাপ করতে আসে। এটা ঝুমের আহঙ্কার। কিন্তু এই ব্যাটা দ্যাখো। 

ঝুম রেগে যায়। আপনি কি বোবা না কালা?

ঋজু, গম্ভীর হয়ে বলে ‘দুটোই’। বলে বিরক্ত মুখে অন্য দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

ওদিকে ঝুমের ডেলি প্যাসেঞ্জার বন্ধুরা ডাকছে ঝুমকে।

‘আরে বসবে এসো ঝুম। তোমায় দেখতেই পাইনি এতক্ষণ’। ঋজুর দিকে তাচ্ছিল্যের নজরে তাকিয়ে গর্বিত কণ্ঠে উত্তর দেয় ঝুম। ‘আসছি আসছি, ফেসে গেছিলাম বাজে ভীড়ে’। বলে আড়চোখে দেখে নেয় ঋজু কে।

ঋজু নির্বিকার মুখে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঝুম আসাতে আজকের সাবজেক্ট সরে গেছে ওর নজর থেকে। 

ট্রেনের কামরায় ঝুমের নাম অল ইন্ডিয়া রেডিও। সব খবর থাকে ঝুমের কাছে। গল্পের ভাণ্ডার ঝুম। সে বক বক করেই চলে আর মন্ত্র মুগ্ধের মতো তাকে ঘিরে বসে থাকে তার বন্ধুত্ব কামী পুরুষের দল। ঋজু দেখেছে এর মধ্যে কেউ কেউ চোখ দিয়ে চেটে পুটে খায় ঝুমের শরীর আবার কারো চোখ ঝুমের প্রতি কামনার রসে টলটল করে। ঋজু আড় চোখে দেখেই চোখ সরায় ঝুমের থেকে। ওর ভয় করে। কিন্তু ঝুম ঋজুর পিছু ছাড়ে না। মাঝে মধ্যেই বসার ইচ্ছে ত্যাগ করে ঋজুর পাশ ঘেঁসে দাঁড়ায়। ‘আজ জ্যাম পেলেন রাস্তায়? ঋজু নিরুপায় হয়ে উত্তর দেয়, ‘না’। আমিও ‘না’, বলে খিল খিল করে হেসে ওঠে ঝুম। ঋজু দেখে আশেপাশের লোক গুলোর মুখ থেকে এক পোঁছ ক্লান্তি মুছে দিয়ে মিলিয়ে যায় ওর হাসি। ‘এই তো আপনি কথা বলতে পারেন’। ঋজু অবাক হয়ে তাকায়, ‘মানে’? ‘না মানে আমি দেখছিলাম আপনি সত্যি সত্যি বোবা কিনা’। ঋজুর গায়ে পরে কোন মেয়ে কোনোদিন এমন রসিকতা করেনি। কুণ্ঠিত হয়ে ঋজু বলে ‘আপনি এবার তো বুঝলেন আমি বোবা নই, আর সময় নষ্ট করবেন না আপনার বন্ধুরা সিট ছাড়বে বলে অপেক্ষা করে আছে’।‘কিন্তু আমার যে আজ দাঁড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করছে আপনার পাশে, এই ভাবে’? ঋজু আর উত্তর খুঁজে পায় না। ঝুমের চোখের দিকে তাকাতেই অবশ হয়ে যায় ওর পা। ঋজু যতটা সম্ভব স্পর্শ বাঁচিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সে আর কতক্ষণ। একসময় ও দেখে কামরায় দরজার পাশের পার্টিশনে পিঠ করে দাঁড়িয়ে আছে ওরা, ঝুম ওর কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, হাওয়ায় ওর চুল উড়ে এসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ঋজুর চোখে মুখে। 


ঝুম এসে মাঝে মধ্যেই দাঁড়ায় ঋজুর পাশে, ঘুমোয় ঋজুর কাঁধে মাথা রেখে। আর ঋজু বাড়ি ফিরে খাতায় লেখে, নির্লজ্জ, গায়ে পরা, বাচাল, কিন্তু সরল’। পরদিন আবার লেখে ‘প্রাণবন্ত, মায়াময় কিন্তু তাল গ্যান শূন্য’। কিছুদিন পর আবার লেখে ‘বোকা মেয়ে একটা, কে কেমন কিচ্ছু বোঝে না। মানুষকে বড় বেশী বিশ্বাস করে’। আবার লেখে ‘বড় মিষ্টি করে হাসে’। আসলে ঋজু ঝুম কে ছাড়া কাউকেই আর লক্ষ্য করে না। যবে থেকে ঝুম এসে গায়ে পরে ভাব করেছে ওর সঙ্গে তবে থেকে ঋজু বাকী সব ভুলে গেছে। ওর অসমাপ্ত চরিত্র গুলো নিয়ে ওর আর কোন মাথা ব্যথা নেই। তাঁরা মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া সমীকরণের মতো অযত্নে পরে আছে ঋজুর খাতার পাতায়। অথচ একদিন এদের নিয়ে পাগলামির শেষ ছিল না ঋজুর। অফিস যাওয়ার সময় ওর দেখা হয় না ঝুমের সঙ্গে, ফেরার ট্রেনে এক সঙ্গে ফেরে ওরা। ঋজু ঝুমের নির্দিষ্ট কামরায় রোজ গিয়ে ওঠে নেশা গ্রস্থের মতো। ঝুম এসে ওর পাশে দাঁড়ায় একসময়, ট্রেন চলতে থাকে। ঝুম কথা বলে, অনেক কথা। ওর মা বাবার কথা, ভাইএর কথা, যে বাচ্চা তাকে নিয়ে থাকে তার কথা, বাচ্চার মা বাবা ওর দাদা বউদির কথা। ঋজু শুনতে পায় ঝরনার শব্দ, কুল কুল করে শীতল জল ওর শরীর বেয়ে নামে। ওর সারাদিনের ক্লান্তি মুছিয়ে দেয়। বাড়ি ফিরে ও স্বপ্ন দেখে ঝুম কে। স্বপ্নে ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে ঋজু। স্বপ্নে ওর উঁচু দাঁতটা মিলিয়ে যায় কোথায় যেন। ঝুমকে চুমু খাবার সময়ে ওরা কক্ষনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। ঋজু মনে মনে লেখে ‘আমি তোমাকে ভালবাসি ঝুম’। কিন্তু এই স্বপ্নের কথা তো ঝুম জানে না। তাই কোন প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না ও। একটা ভালমানুষ কিছুটা অদ্ভুত ছেলে তার ট্রেনের বন্ধু, ছেলেটা কারো সঙ্গে কথা বলে না একমাত্র ওর সঙ্গে ছাড়া এটুকু নিয়েই মহা খুশি ঝুম। 

কিন্তু ঋজুর জীবন থেকে হঠাৎ ঝুম যে উবে যাবে কর্পুরের মতো সেটা ঋজু একেবারে ভাবেনি কখনো। ফেরার সময় ট্রেনের কামরায় যে ঝুম কে দেখতে পাবে না দশ দিন সেটা কেমন করে জানবে ঋজু? কোথায় খুজবে ঋজু ঝুমকে? শেষে অফিস কামাই করে একদিন গোবরডাঙ্গায় গেল, ঝুমের বকবকানির মধ্যে শুনেছিল ঘোষ পাড়ার কথা, মনে করে করে গেল সেখানে। ঝুমের নাম করতেই দোকানি দেখিয়ে দিল একটা রঙ ওঠা ভাঙ্গাচোরা এক তলা বাড়ি। ঋজু বেড়ার গেট ঠেলে ঢুকে গলা খাকারি দিয়ে ডাকল ‘ঝুম আছেন’? একটা তেরো চোদ্দ বছরের ছেলে বেরিয়ে এসে ‘দিদি, তোকে খুঁজছে’ বলে হাঁক পাড়ল ঋজুর সামনে থেকে। ঝুম বেরিয়ে এলো ভিতর থেকে। ‘না মানে আপনি দশ দিন ধরে …তাই…একটু এদিকে এসেছিলাম…তাই ভাবলাম’। ঋজু অপ্রস্তুত মুখে বলতে বলতে বুঝতে পারল এরকম করে ঝোকের মাথায় চলে আসাটা একদম ঠিক হয়নি। ঝুম একটু অবাক হলেও সামলে নিয়ে বলল, ‘খুব ভালো করেছেন। কতদিন পর দেখা হল। মা এসো দেখ, ওর নাম ঋজু, আমরা গোবরডাঙ্গা লোকালে ফিরি একসঙ্গে। আমি যাচ্ছি না তো অনেক দিন তাই খোঁজ নিতে এসেছেন’। মা ঘরে আসাতে ঋজু উঠে দাঁড়িয়েছে যেই ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন ‘আসলে ঝুমের বিয়ে ঠিক হয়েছে হঠাৎই। পাত্র সরকারি চাকরি করে। হাবড়ায় দুতলা বাড়ি। ঝুম কে দেখে পছন্দ হয়েছে তাই নিজে বাড়ি এসে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।ওর যে এতো সৌভাগ্য হবে ভাবিনি বাবা। সামনের মাসেই বিয়ে’। ঋজু ধপ করে বসে পরে চেয়ারে। কিছু বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, কোনরকমে ফিসফিস করে, ‘আমি এখন উঠবো’। ঘর থেকে ছুটে গিয়ে পাত্রের ছবি নিয়ে এসে ঋজুকে দেখায় ঝুম। মনের খাতায় ঋজু লেখে নিষ্ঠুর, স্বার্থপর, লোভী। কিন্তু ছবির দিকে চোখ পড়তেই ফ্যাকাশে হয়ে যায় ঋজুর মুখ। এই ছেলে? এতো সাতটার হাবরা লোকালে রোজ যায়। ঋজুও যায় ওই একই ট্রেনে। ঋজুর মুখ দেখে ঝুম বলে, ‘কি হল চেনেন নাকি’? হ্যাঁ, সকালে আমরা একই ট্রেন ধরি’। ‘কী নাম জানেন’? ‘না, জানি না ঠিক। উজ্জ্বল কি’? ‘না, সজল’। ঝুম হেসে ওঠে। ‘দূর থেকে দেখেছেন নিশ্চয়ই। আলাপ নেই তাই তো? আলাপ হলে বুঝবেন দারুন লোক’। ঋজু দুম করে বলে ফ্যালে, ‘ঝুম ওকে বিয়ে করবেন না। লোকটি হিংস্র, অমানবিক’। মা মেয়ে মুখ চাওয়াচায়ি করে। ঝুম বলে, ‘আপনি কি করে জানলেন? আলাপই তো নেই’। ঋজু বলে ‘আমি বুঝতে পারি ওর চোখ দেখে’। ঝুম বলতে বাধ্য হয়, ‘কি আজেবাজে কথা বলছেন এসব? চোখ দেখেছেন মানে? কিছু করেছে ও, কোন ঘটনা বলতে পারবেন’? ঋজু বলে চলে, ‘ঝুম ওর মুখের গঠন, ওর বডি ল্যাঙ্গয়েজ আমি লক্ষ্য করেছি। ও ভালো নয়, মানুষের সঙ্গে ওর ব্যবহার ভালো নয়, ও ভালো হতে পারে না ঝুম’। ‘কি ব্যবহার বলুন? ঋজু চুপ করে রইল। এবার মুখ খুললেন ঝুমের মা। ‘বাবা তুমি এবার এসো। আমরা ছেলেটি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছি, কোন খারাপ কিছু নেই। এমন সুযোগ তো বার বার আসে না’। ঋজুর আর কিছু বলার রইল না। ও মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো। 


এরপর কেটে গেল কিছুটা সময় তারপর একদিন খবরের কাগজের পাতায় উঠে এলো হাবড়ার এক গৃহবধুর অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর। স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করেছে সেই মেয়ে। সংবাদপত্রের পাঁচের পাতার এক কোণে ছোট করে ছাপা আরও দুটি ধর্ষণের খবরের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে জায়গা করে নিতে পেরেছিল এই খবরটি। ঋজু ছাড়া গা সওয়া এই খবরটিতে হয়তো চোখ পরেনি আর কারো। যেমন কোনোদিন কারো চোখ পরবেনা সেই খাতার পাতায় যেখানে দুবছর আগে বড় বড় করে ঋজু লিখেছিল ‘বোকা মেয়ে, মরবি তুই মরবি’। 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-