বুধবার, জানুয়ারী ৩১, ২০১৮

নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত

শব্দের মিছিল | জানুয়ারী ৩১, ২০১৮ |
 আমোদিনী পর্ব- আলোকিতা
পিঠের পিছন দিকে ভয় লুকাইয়া থাকে। সেই কারনে কোল বালিশ টিকে পিঠের পেছনে দিয়া ঘুমাইবার চেষ্টা করিতেছে আমোদিনী। তাহার মা প্রত্যহ রাত নয় ঘটিকার মধ্যে অফিস হইতে গৃহে পদার্পণ করিয়া থাকে। আজ তাহার অফিসে কোন অভূতপূর্ব পরিস্থিতির কারণে এখন ও ছুটি হয় নাই। অন্যদিন দিদিমার সিরিয়াল দেখা শেষ হইবার পূর্বে মা আসিয়া যায়। সে আর তাহার মাতা উভয়ে সারাদিনের ঘটনাবহুল বৃতান্ত ব্যাক্ত করিয়া থাকে। আজ মার আসিতে কত রাত হইবে কে জানে। দিদিমার শরীর কিঞ্চিৎ অসুস্থ রহিয়াছে। কয়েক দিন হইতে তাহার হাঁটুতে কোমরে বড্ড ব্যাথা। আজ বাড়িয়াছে। বিছানা হইতে উঠিতে দিদিমার বড় কষ্ট। আমোদিনী অনেক কিছু খেলিল। টিভিতে ডোরেমন,ছোটাভীম সকল কিছু দেখিল। অন্যদিন যে পরিমাণ চকলেট খাইয়া থাকে তাহার বেশী খাইল। ছবি রঙ করিল। দিদিমা আধো তন্দ্রাছন্ন অবস্থায় তাহার জিমন্যাসটিক দেখিয়া উৎসাহ দান করিলেন। আমোদিনীর এই বার কান্না পাইতেছে। ইহার পরেও মা না আসিলে আর কেমন করিয়া সে জীবন উৎযাপন করে।সে সপ্তমবার তাহার মাকে ফোন করিল। মা অত্যন্ত উদবিগ্ন হইয়া জানাইলেন ঘরে ফিরিতে তাহার অনেক রাত হইবে। আমোদিনী যেন লক্ষ্মী হইয়া দিদিমার কাছে খাইয়া লইয়া, ঘুমাইয়া পড়ে।আমোদিনী খুব চিৎকার করিয়া জানাইল মা না আসিলে সে এই সব কিছুই করিবে না। মা জানাইল যদি সে এইরূপ অবাধ্য হইয়া থাকে। তাহা হইলে মা আর কোনোদিন ফিরিয়া আসিবে না। সে ফোনের মধ্যদিয়া কিছু অবোধ্য ক্রন্দন মা কে ফেরৎ পাঠাইল। মা ফোন কাটিয়াদিল। দিদিমা শয্যাত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। ক্রন্দনরত শিশু আর তাহার মাতার ভয়াবহ যুদ্ধ তাহার পক্ষে বড়ই অসহ্য হইল। ভূলুণ্ঠিত আমোদিনী কে শান্ত করিতে যে শারীরিক ও মানসিক শক্তির প্রয়োজন তাহা দিদিমার আজ নাই। তিনি কিঞ্চিৎ বিব্রত অবস্থার সন্মুখিন হইলেন। ফ্রিজ হইতে দুগ্ধ গরম করিলেন। “ এমনি করে আমুবাবুকে কাঁদতে আছে নাকি। কত বড় হয়ে গেছ তুমি। এই তো তুমি আমাকে কেমন ওষুধ এনে দিলে। জল পুরে দিয়েছ গ্লাসে। আর কি কেউ পারে নাকি? কৈ আমার আমু বাবু কৈ। ছি কাঁদে না।”বারবিডল ছুঁড়িয়া ফেলিয়া ভাঙিয়া ফেলিল আমোদিনী। দিদিমা চুপ করিয়া যান। তাহার আমুবাবুর দুই গণ্ড বহিয়া অশ্রুজল পড়িতেছে। কিয়ৎক্ষণ পড় সে বুঝিল সে তাহার দিদিমা কে দুঃখ দিয়া ফেলিয়াছে। দিদিমার শরীর ভালো নাই। আর দিদিমা ভিন্ন কেহ তাহার পাশে নাই। রাত গভীর হইতেছে। তাহার পশ্চাৎ দেশে কখন কেহ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিবে কে জানে। যদি বিপত্তি ঘটিয়া থাকে।আর হিসি করিতে যাইলে অবশ্যই বিপদ হইতে পারে।

পিতার ফোন আসিল। পিতা বিদেশ হইতে ফোন করিয়াছে। যে ক্রন্দন আমোদিনী গিলিয়া ফেলিয়া ছিল তাহার অগ্ন্যুৎপাত ঘটিল। দূর কোনও হিমায়িত দেশ হইতে পিতা তাঁহাকে শান্ত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তিনি আর এক বছরের মধ্যেই আসিতেছেন। একখানি শুভ্র লোমশ কুকুর তাহাকে আনিয়া দিবেন। তাহার জন্যে লাল টুকটুকে একখানি সিন্‌ডারেলা ড্রেস আনিবেন।আমোদিনী তাহার পিতা কে জানাইল যে তাহার মা তাহাকে ভালবাসিতেছে না। মায়ের উপর তাহার যত রাগ আর অভিমান সে পিতাকে জানাইল। পিতা কিছুটা সহমত পোষণ করিলেন আবার ইহাও বলিলেন যে মার প্রয়োজনীয় কাজ আছে। উহা শেষ হইলে জাদু করিয়া মা চলিয়া আসিবেন। ইতিমধ্যে আবার ছোটা ভীম শুরু হইল। রাত্রিকালে দিদিমা আর আমোদিনী একসাথে খাইয়া লইলেন।ক্ষুধা মিটিলে শিশু শান্ত হইয়া থাকে। কন্যার জন্যে একটু উদ্বিগ্ন হইলেন দিদিমা । ইহার পূর্বে এইরূপ অপেক্ষা তিনি বহুবার করিয়াছেন। কিন্তু তাহার এই বৃদ্ধ বয়সে এই মায়াময় দায়িত্ব টি বড্ড ভারী হইয়া উঠিতেছে। আমোদিনী বালিশ সাজাইতেছে। তাহার গোলাপি ছোট্টবালিশ টিকে রাখিয়া টেডি বিয়ার টিকে পায়ের দিকে বসাইল। দেওয়ালে যে গভীর অরন্যের বিরাট ছবি টি আছে সেই টি ঘুমাইবার আগে তাহার দেখিতে অসুবিধা হইয়া থাকে। টেডিবিয়ার টি থাকিলে ভয় করিবে না। দিদিমা শান্ত হইয়া কন্যা কে ফোন করিয়া কথা বলিলেন। প্রবল কর্ম কাণ্ড লইয়া কন্যা ক্লান্ত হইয়া আছে। সে রাগ করিতেছে যে কেন বারংবার ফোন করিয়া তাহাকে পর্যুদস্ত করা হইতেছে। সে অফিসে জাইবার পূর্বে দেখিয়া গিয়াছে তাহার মা অসুস্থ। কর্মযজ্ঞে ব্যস্ততা হেতু ভুলিয়া গিয়াছে সে কথা। অসীম স্নেহ যেখানে দান করিয়া থাকেন সেই স্থান হইতে প্রবল দুঃখ পাইলেন। 


দিদিমা গরম জলের বোতল লইয়া আপন কক্ষে যাইলেন। “ আমুবাবু তুমি বালিশ নিয়ে এখানে আমার কাছে এসো।” ছুটিয়া আমোদিনী তাহার দিদিমার ঘরে আসিল। একগাল হাসিয়া কহিল, “ মা চলে আসবে তো তুমি শুয়ে পড়। আমি আলো নিভিয়ে দিচ্ছি। তুমি ঘুম ঘুম যাও।তোমার কি খুব ব্যাথা। হাত বুলিয়ে দেবো?”। দিদিমা তাহার আমুবাবুর আদরে সকল বেদনা ভুলিয়া গেলেন। “ তুমিও এই বার ঘুমিয়ে পড় আমুবাবু। মা এলে তখন আবার উঠে না হয় গপ্পো কোর।” আমোদিনীর ঘুম আসিতেছে। টুলে উঠিয়া সে সারা বাড়ির আলো বন্ধ করিল।বারান্দার আলো নিভাইল ক্রিকেট ব্যাট দিয়া। 

আমোদিনী পিঠের পিছনে অজস্র ভয় লইয়া ঘুমাইয়া পড়িল। সে জানিল না তাহার পিতা মাতা পৃথিবীর দুই পাড়ে বসিয়া কি ভয়ানক কলহ করিল। তাহাদের আমোদিনীকে পৃথিবীতে আনয়ন টি আদৌ সঠিক সিধান্ত হইয়াছে কিনা তাহাও উভয়ের মনে হইল। পিতা ঝগড়া করিবার অবসানে অনেক গুলি সিগারেট খাইল। আর মা বাথরুমে যাইয়া একা একা কাঁদিল। আমোদিনী তাহার পালংকের নীচে অন্ধকারে এক খানি টর্চ জ্বালাইয়া রাখিয়া দিয়াছে। আলো জ্বলিলে পালংকের নীচের ভয় পালাইয়া যায়। একা বাঁচিবার কৌশল সে শিখিয়া লইয়াছে।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-