বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭

সোনালী মুখার্জী

শব্দের মিছিল | ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ |
অশ্বত্থামা
হাভারত এক রোমহর্ষক উপাখ্যান। যে কোন হলিউড,বলিউড,টলিউডকে অনায়াসে হার মানিয়ে দেয় এই গল্প। আর এই প্রাচীন মুখে মুখে ফেরা কথা ও জীবন্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় চারপাশে; “যা নাই ভারতে তা নাই ভারতে-’

এত বছর পরের আধুনিক ভারতবর্ষে যা ঘটে চলেছে তার সমান্তরাল ছবি মহা ভারতেও পাওয়া যাবে, ফোক লোর এমনই বলে চলে।

সৌপ্তিক পর্বঃ
গভীর রাতে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা, কৌরব পক্ষের জীবিত দুই বীর কৃপাচার্য ও কৃতবর্মাকে সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ করল ঘুমন্ত পাণ্ডব শিবির। আঠার দিনের ভয়ানক কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষে, বিজয়ী পাণ্ডব যোদ্ধারা তখন ক্লান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন।বীভৎস ভাবে হত্যা করা হল নিরস্ত্র ঘুমন্ত পাণ্ডবদের। অবশেষে পঞ্চ পাণ্ডবকে হত্যা করার আনন্দে পাঁচটি মুণ্ড কেটে নিয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদের ধারে পৌঁছাল অশ্বত্থামা। মৃতপ্রায় দুর্যোধনকে বলল, “এই নিন মহারাজ, আপনার শত্রু নিধন করে এসেছি, তার প্রমান।”

মৃত্যু ঘনিয়ে আসা রাজা অতি আহ্লাদের সঙ্গে সে মুণ্ডগুলি হাতে নিলেন। নিয়েই হাহাকার করে উঠলেন ভূলুণ্ঠিত ভগ্ন ঊরু দুর্যোধন। দ্বৈপায়ন হ্রদের তীরবর্তী গাছপালা থেকে ঝটপট করে উড়ে গেল পাখি পক্ষী,সেই কাতর আর্তনাদে ... 

“ কি করলে অশ্বত্থামা, হায় হায়, এতো মহাবীর পাণ্ডবদের বজ্রসম অস্থি নয়।এ যে শিশুমুণ্ড । এ ত আমার পঞ্চ ভ্রাতুষ্পুত্র । হায় হায়, এরা যে আমার ও বংশধর ...”

যুদ্ধ শেষ হয় নি। দৈনন্দিন জীবনে ব্যক্তি স্বাধীনতা ,আত্মসম্মান রক্ষার লড়াই করছি প্রত্যেকে। ঢেউ উঠছে ঘরে, বাজারে, সেলুনে, স্টাফ রূমে,ক্যান্টিনে, সব ধরনের চায়ের কাপেই। পোষাকআশাক, চলা ফেরা, সাজ গোজ, সব ব্যাপারে সব বয়েসের মানুষেরি দাবী ,স্বাধীনতা। আমার ও স্বাধীনতা চাই।

অনেক মানুষের পর্ণোগ্রাফী দেখার স্বাধীনতা থাকুক, আমি সেখানে নাক গলাচ্ছি না। কিন্তু কাউকে জোর কোরে যৌনপ্ররোচোনামূলক বা নগ্নতা সম্বলিত ছবি লেখা ইত্যাদি দেখানো তো আইনের খাতায়ে অন্যায়? তা হলে , গত দশ বারো বছর ধরে , আমি , আমার বাড়ির বিরক্ত ষাটোর্ধ বৃদ্ধ , শিউরে ওঠা আট নয় দশ পেরোনো শৈশব কৈশোর , প্রত্যেক দিন, প্রত্যেক টি সুন্দর সকালে বিভিন্ন দেশের নানান মাপের নগ্ন শরীরের ছবি ও সেই সংক্রান্ত আলোচনা দৈনিক পত্রিকায়ে মানে পাতি খবরের কাগজে দেখতে বাধ্য হই কেন? এটা বেআইনি নয়?

কোন পরিবার থেকে এর প্রতিবাদ হয় না কেন? যে শিশুরা বয়স্ক মানুষদের নগ্নতা ও যৌনতা দেখে বড় হল , সেই প্রজন্ম যখন সতের ছোঁবে, সে কুড়ি, তিরিশ, বা ষাট এর কোঠার মহিলা বা মানুষকে দেখে শ্রদ্ধা করতে পারবে? তার মস্তিষ্কের মেমারি কার্ডে ভাসবে না জেএলও র বুক, বা ম্যাডোনার নিতম্ব ? তার কাছে কেউ কি পূজনীয়া রইল আর?



প্যারানয়েড, গোঁড়া, সেকেলে তকমা দেবেন আমায়?

আমার চেম্বারে দুই তিন সপ্তাহ আগে এক তরুণী মা এলেন। ফ্যাশনসম্মত সালোয়ার কামিজে আধুনিকা, আর ওড়না জড়ানোয় মধ্যবিত্ত সংযম। সুন্দর দেখতে মেয়েটি। সংগে একটি ফুটফুটে বাচ্চা।ছোট্ট মেয়ে। সাদার মধ্যে কার্টুন প্রিন্ট করা একটা ফ্রক পড়ে এসেছে মায়ের সাথে। বাচ্চাটিও সুন্দর, তবে বড্ড রোগা।হাড় ক খানা গুনে দেখা যাচ্ছে। হেসে বসতে বললাম। প্রেসক্রিপশন প্যাড বের করলাম নামধাম লেখার জন্যে।

-বলুন, কি নাম আপনার। "
-"না ম্যাডাম, আমার নয়, আমার মেয়ের জন্য এসেছি। 
পাতলা ঠোঁটগুলো কেঁপে ওঠে কথা বলতে গিয়ে।ফ্যাকাসে মুখখানা।
-ও এই পুচকের।বেশ তো। নাম বলুন। কি হয়েছে? "তাকালাম আমার ক্ষুদ্র রোগিণীর দিকে। মাটি থেকে অনেক ওপরে ঝুলছে পা। চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে। আর দেওয়ালে টাঙ্গানো ক্যালেন্ডারের ছবি দেখছে ঘাড় ঘুরিয়ে। এত এখন ও মহিলা নয়। নেহাতই শিশু। একে পিডিয়াট্রিশিয়ানের কাছে নিয়ে যেতে বলাই উচিৎ হবে বোধহয়। এইসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই তাকালাম মায়ের দিকে।
- হ্যাঁ কি হয়েছে -"
চোখে জল এসে গেল মায়ের। চোখের পলক নামিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলললেন, "হোয়াইট ডিসচার্জ "।
-বয়েস কত?"
-দশ।"
আমি আর কিছু বলার আগেই কেঁদে ফেললেন মা।
-খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। গত এক সপ্তাহ ঘুমোইনি জানেন। "
পিঠ সোজা করে বসলাম।
-কি ব্যাপার? "
মা বললেন, " ওর ক্লাসে অন্য স্কুল থেকে একটি নতুন মেয়ে এসেছিল গত মাসে।ওর বেঞ্চেই বসছিল। এক একটা বেঞ্চে তিন জন করে বসে তো ওরা। "
-দাঁড়ান দাঁড়ান, কোন স্কুল আর কোন ক্লাস? "
-ক্লাস থ্রি ",বলে কাছাকাছির এক বিখ্যাত ইংলিশ মিডিয়াম গার্লস স্কুলের নাম করলেন মা। তারপর বাকি কথায় ফিরে গেলেন।
"খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল তিন জনের, জানেন। আমার মেয়ে,আরেকটি মেয়ে,আর এই নতুন মেয়েটার। এই মেয়েতো আমায় কিছু বলেনি। গত সপ্তাহে অন্য মেয়েটি বাবা মাকে জানিয়েছে, নতুন মেয়েটা স্কুলে মোবাইল নিয়ে আসে। তাতে নানা রকম সিনেমা দেখায়। ওদের প্যান্টের ভিতর হাত দিয়ে কি সব করতে শেখায়। ও বাচ্চাটা কয়েক দিন ধরে টয়লেট করতে গেলেই কাঁদছিল। শেষে মাকে বলেছে। মা বাবা এসে ক্লাস টিচারকে জানিয়েছেন।
-সেকি! "
-হ্যাঁ। প্রিন্সিপাল সাসপেন্ড করে দিয়েছেন মেয়েটিকে। এসব শুনে ভয় পেয়ে আমার মেয়েকে পরীক্ষা করতে গিয়ে মনে হল, ওর শরীরে লাল ঘা হয়ে আছে। আর ওই ডিসচার্জ, আপনাকে যা বললাম। "
দৃষ্টি দিলাম বাচ্চাটির মুখের দিকে। নির্বিকার মুখে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে।
-তুমি মাকে কিছু বলনি কেন?
এ দিক ও দিক চোখ ঘুরিয়ে বলল, "ও তো বলেছিল বললে আমাকেই লোকে নোংরা মেয়ে বলবে,মারবে। "
-মা কি মেরেছেন? "
-না না ম্যাডাম। বকিওনি। শুধু বুঝিয়ে বলেছি। কিন্ত --" মা আর্ত গলায় বলে উঠলেন।
-হ্যাঁ, বুঝিয়ে বললেই ও ঠিক বুঝবে। তাই তো?" তাকালাম ছোট্ট মেয়েটির মুখে। চুপ করে তাকিয়ে রয়েছে সে আমার দিকেই।
মা পাশ থেকে ব্যাকুল গলায় বললেন, " বুঝছে না তো। কেবলই হাত ঢোকাচ্ছে দেখছি।কিছুতেই থামছে না। যেই একটু একলা হচ্ছে...."

শিরশির করে উঠল ভিতরটা ।ঠান্ডা কিসের স্রোত কুলকুল করে নেমে যায় মেরুদণ্ড বেয়ে। যৌনতা। কত ধার তোমার। কত জ্বালা। আগুন। আবার সাপের চোখের ভয়ানক সম্মোহনের মত চুম্বকের টান।

হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্রকাররা নাম দিয়ে ছিলেন মহামায়া। সেই বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিকদের আমরা সত্যদ্রষ্টা মুনি ঋষি বলে ডাকতাম। হালের নব্য ম্যাজিশিয়ান  শ্রীরামকৃষ্ণ অনুপম উপমায় ছবি এঁকেছেন," ছোট্ট মেয়ে যেমন হাতে চাবিরতোড়া ঘোরায় তেমনি অনায়াসে রথী মহারথীকে ও বনবন করে ঘুরিয়ে দেবে।" তাই দাবানলের আগুনকে প্রনাম মন্ত্রে শ্রদ্ধার সংগে সংযত করে ঘর গৃহস্থালির আলোর প্রদীপ, উনানের আগুন, আরামের উত্তাপ বলে উপাসনা করতে বলেছেন,বারবার।

আমরা কান দিচ্ছি না এসব ছেঁদো কথায়। আমরা বিশ্ব নাগরিক হব বলে পশ্চিমের যৌনতা বিক্রির খোলা বাজারে নিলাম হাঁকছি। সেই নিলামের তক্তাপোষে বিক্রি হয়ে গেছে এই নিষ্পাপ ছোট মেয়েটা। কি নিষ্ঠুর ভাবে এর ফুলের মত মনের ভেতরটা ধর্ষণ করে গেছে সহজলভ্য যৌন মিডিয়া।

যে মেয়েটিকে ইস্কুল তাড়িয়ে দিল, তাকে "সেক্সি " পোকারা কামড়েছে আগে। সে রোগ ছড়াচ্ছে বসন্ত বা কলেরার মহামারীর মত। তার বীজাণুও ছড়াবে এ ভাবেই। যে আগুনের আকর্ষণে বিরাট মানুষ মানুষীরাও নিজেদের হারিয়ে ফেলেন, মহাভারত, রামায়ণ, বা ট্রয়ের মত বিধ্বংসী যুদ্ধ ঘটে যায়, তার ঝিনঝিন করা নেশা শরীর থেকে কি করে সরাবে শিশু মন?

আস্তে আস্তে মাকে বললাম, " ওকে বাইরে বসতে বলুন।"
বাচ্চাকে বাইরে বসিয়ে রেখে এসে, ভয়ার্ত মা বললেন, "বলুন?"
-খুব সাবধানে আপনাকেই চলতে হবে। শরীরের মধ্যে হাত দিলে হাত থেকে নোংরা ছড়িয়ে ইনফেকশন হবে। আর ব্যথা করবে। সেটা সারাতে রোজ ইংজেকশান নিতে  হবে তখন। এই বলেই সাবধান করুন। আর চোখে চোখে রাখুন সব সময়। কিন্ত ভুলেও শরীরের ভাল লাগা কে পাপ বা অন্যায় বলে ভয় দেখাবেন না। তা হলে পরবর্তী কালে বিবাহিত জীবনের সৌন্দর্যটাই মাটি হয়ে যাবে বেচারার। সারা জীবন ও এবং ওর পার্টনার দুজনেই অসুখী হয়ে দিন কাটাবে। সেটা ইনফেকশনের চাইতে ও ভয়ানক অবস্থা।

চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়ায় মায়ের।
-আমারই কোন ভুল, ম্যাডাম?  পারিনি বাচ্চাকে ঠিক মত মানুষ করতে?
- না ভাই, আপনি খুব ভাল মা। তাই ঠিক সময়ে খেয়াল করে বাচ্চাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে এসেছেন। একটু ধৈর্য ধরে আদর করে রাখুন। বেশি করে সঙ্গে  থাকুন। অনেক গল্প, খেলার মধ্যে রেখে দিন মনকে। ওষুধ ও দেবো ।ঠিক হয়ে যাবে।

চলে গেলো মা আর শিশু। বসে বসে ভাবলাম। যে বাচ্চাটাকে স্কুল তাড়িয়ে দিল, সেও এক আক্রান্ত শৈশব। আবার যেখানে যাবে, এই বিষ ছড়াবে বাচ্চাদের মধ্যে। অথচ তার নিশ্চই এমন যত্নশীল বাবা মা নেই যাঁরা রোগের উৎস বুঝে বাচ্চাকে ভয় না দেখিয়ে পরিচ্ছন্ন করে তুলবেন।

অশ্বত্থামা পৃথিবী যৌনতার আগুন নিয়ে খেলতে খেলতে অন্ধকারে অকাতরে শেষ করে দিলে শিশু প্রান গুলোকে। কিসের লোভে বিপনণ? অর্থ?  আহ! এরা তো  তোমাদেরি ভবিষ্যৎ।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-