বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭

শ্রী শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৮, ২০১৭ |
শ্রী শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়



শেষ পর্ব - 



বয়ঃকনিষ্ঠ লেখকদের প্রতি আপনার প্রশ্রয় সুবিদিত। আপনি নিজে এমন কাউকে পেয়েছিলেন?





শেষ প্রশ্নের উত্তরটা কোনওভাবে দিয়েই ফেলি। আমার স্ত্রী বেশ অসুস্থ এখনও, মনের সুস্থিতি কম, তবে আমি তো পোড়খাওয়া বয়স্ক এক লেখালেখির লোক, একটু প্রসঙ্গ ডিঙিয়েই আমার ঢঙে কিছু বলে হাত ধুয়ে ফেলি।

ধরে নিই, ষাটের দশকের গোড়ায় চক্রধরপুরে (আগের বিহার প্রদেশে, বর্তমানে ঝাড়খন্ড) আমার চেয়ে বছরখানেক ছোট এক বন্ধুর সাথে কিছু কিছু বিদেশি এবং দেশি সাহিত্য, কবিতা নিয়ে জোর আলোচনা হতো। কখনও শীতের রাতে নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, কখনও সাইকেলে চেপে বড়দা নদীর ঘোর গ্রীষ্মের দুপুরে কথা আর আলোচনায় বুঁদ হযে যেতাম। বন্ধুটির নাম বরুণ বোস। বোদলেযর, ডষ্টয়েভস্কি থেকে জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু আরো অনেক দিকপালরাই আসতেন। আর নিজেদের কবিতার খাতা খুলে নিজের নিজের কবিতা পড়তাম,আলোচনা হতো আগাপাশতলা। আমি মাঝে মাঝে এক আধটা লিখতাম এবং নানা ঘটনা ও পড়তে পড়তে বিভিন্ন থিম আমায় অস্থির করে তুলতো, এবং কবিতার মধ্যে দিযে একটা মুক্তি বা ভারসাম্যের জায়গা যেন খুঁজে পেতাম। বরুণ আমার মতো নিশিপাওযা অবস্থায় ছিল কিনা জানি না। কোনও গ্লানি বা দ্ধিধা নেই বছর কুড়ির সত্যভাষণে, তাই বলি একটি মেয়ের প্রেমও এই সময়ে আমাকে কিছু কবিতা লেখার বিপুল প্রেরণা যুগিয়েছিল। বেশ সুন্দরী সেই সদ্যযুবতীর হৃদয়মথিত ভালবাসা আমার কবিতাকেও অভিষিক্ত করে গেছিল ; সে এখন অনেক দূরে আরবসাগরের পাশে নিজ সংসারে বা হয়তো বিদেশে রযেছে তার প্রিয় পুত্রের কাছে, আমি কেবল ওই কয়েক বছরের প্রম-সঞ্জাত আমার সৃষ্টির ঋণ এই অবকাশে স্বীকার করে গেলাম এই প্রথম কাউকে। সব মানুষের জীবনই কতরকম অভিজ্ঞতা-বিচিত্রার মধ্যে দিয়ে তৈরী হয় , আমরা সবাই কতই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এসব জেনে থাকি।

ডি বি কে রেলওয়ের চাকরিতে সুদূর ওড়িষার টেন্টে বসে চাঁদিফাটা রোদ বাঁচিয়ে  কিছু কাঁচা গদ্যই লিখতাম অবসর সময়ে। ওখানে খবরের কাগজও যেত না, আমি তখন একুশ। ব্রিজ, কালভার্ট, কোয়ার্টার নির্মাণের কাজে সমর্পিত এক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিঙ কর্মী। ১৯৬২ সালে রৌরকেলা স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি পেলাম। ওখানে টি পি এন পিল্লাই নামে এক কোলিগ হলো ( পারাপার কাব্যগ্রন্থে ওকে নিয়ে একটা কবিতা আছে আমার),যার সাথে ভিন্নতর এক জগতে ঢুকলাম। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব, কোয়ান্টাম ফিজিক্সের কিছু আভাস, দর্শন নিয়ে ভাবনা চিন্তার নতুন দরজা খুললো ওর সাথে আলাপ আলোচনায়, আমাকে পড়তে দেওয়া হাল্কা বইয়ের মাধ্যমে। আমিও এম এন রায় কিনলাম কলকাতাবাসী এক কোলিগের মারফত ( জীবনে প্রথম রিষ্টওয়াচও ওখানে চাকরি পেয়েই কিনি। এখন কি হাসি পায়, নিজেরই) । পিল্রাই বাংলা, হিন্দি জানতো কমই, ওই স্বল্পজ্ঞানের, অভ্যেসের ভিত্তিতেই চলতো আলোচনা। কখনও ওর বাড়িতে ইডলি দোসা খেয়ে রাত জেগে, আবার সেক্টর ফাইভের দিল্লিবারের ছড়ানো বাগানে কিছু ডিস, এমনকি একবার স্বাভাবিকভাবেই বিয়ারপান করতে করতে। আমি খাইনি আগে বলতে গেলে, জিজ্ঞেস করলাম তুমি বিযার- টিয়ার  খাও? ও নির্দ্বিধায় বললো -- আই হ্যাব নো প্রেজুডিস অ্যাট অল, ওনলি সামটাইমস ইফ আই ফিল, নো হ্যাবিট, নো কমপালশন। ওই তরুণতাজা বয়েসে পিল্লাইকে পেয়ে কবিতার রাজ্যে বিচরণ না করলেও অনেক জীবনের গভীর জ্ঞান ও চিন্তার রসদ পেয়েছিলাম। পিল্লাই কিছু দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বার্ট্রান্ড রাসেলকেও একটা চিঠি লিখেছিল। তবে ওঁদের সময় কোথায়, ওঁর সেক্রেটারি সৌজন্যবশত একটা ফর্মাল উত্তর দিযেছিলেন, পিল্লাই বলেছিল। আমার কাছ থেকে রায়ের মেটিরিয়ালিজম নিয়ে পড়ে মুগ্ধ, তবে বললো---মিঃ ব্যানার্জি, অরডিনারি গ্রাজুযেট ওন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড দিস ইংলিশ। পিল্লাই বলতো ---আমি সেই কাজকেই মন্দ বলি যা আমার মধ্যে কোনও গিল্টফিলিং তৈরি করবে। কথায় আলোচনায় আমাদের মধ্যে এমন কতো কথাই হতো। পিল্লাই বেশিরভাগই বিজ্ঞান, দর্শন নিয়েই কথা বলতো, খুব সুস্থ স্বাভাবিক ভাবভঙ্গিতে। সহজ সাদামাঠা ইংরেজি, আমারই বরং হল্টিংটাইপ এবং সব বোঝাতেও পারতাম না মনে হতো। ও কিন্তু বলতো তোমার ইংরেজি কিন্তু ভাল। আমাকে খুব ভালবাসত বলেই বলত, আমার অতো জ্ঞান বা দক্ষতা কি করে আসবে, এখনো গভীর  কিছু ঠিকঠাক বলতে, বোঝাতে পারি না। এখনও ওর ৮৭/৮৮ বছর বয়সেও কেরল থেকে আধঘন্টা ধরে ফোনকরে। আমি কি পড়ছি, ভাবছি জিজ্ঞেস করে। কি ভাবে জানিনা, বছর দু-তিন আগে আমার ফোন নম্বর জোগাড় করেছিল। এইসব অভিজ্ঞতা আমার লেখার মনোভূমিকে অবশ্যই গড়ে তুলেছে। আর হাবিজাবি থাক, আমি ১৯৬৬-র মার্চ থেকে কলকাতায় চলে এসেছি। শরীর মনে একটু অবসাদ জমা হচ্ছিল। একটু অ্যাঙজাইটিতে অস্থিরতা এসেছিল, তার একটা উপশম দরকার ছিল জীবনের জন্য।

শেষমেশ রৌরকেলার চাকরি ছেড়ে কলকাতায় সিঁথির বাসায় উঠে এলাম। বাবা একা তখনও রেলের চাকরিতে এক্সটেনশনে কাজ করছে। মা- বাবার এই ত্যাগ,সততা, পরিশ্রম আমার জীবনকে খুবই প্রভাবিত করেছে। আমি একটু বিপন্ন, অতো ভাল চাকরিটা প্রায় ছেড়ে দেবার পথে। ' মানব মন' পত্রিকা রৌরকেলায় থাকতেই হাতে এসেছিল, বিশ্বমানের পত্রিকা বলতে গেলে। পাভলভ ইন্সটিট্যুটের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ ধীরেন্দ্রনাথ গাঙুলি পত্রিকাটির সম্পাদক। আমার সমস্যাটির জন্য ওনার কাছে গিয়েছিলাম। উনি অভয় তো দিলেনই এবং আমাকেও মানবমন পত্রিকাগোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত করে নিলেন। আমরা কযেকজন তরুণ ও একদু'জন তরুণী কার্যনির্বাহক কমিটিতে এলাম। ডাঃ গাঙ্গুলির  ( আমি মামা বলতাম) মেয়ে উশ্রী ( ডাকনাম টুনটুন) ওই কমিটিতে ছিল। টুনটুন কবিতাও লিখত। অন্য অনেক কাজের কথা বলে লেখাটা বেশি এলোমেলো করে দিতে চাই না। কফিহাউসে গিয়েও আড্ডা দিযেছি নাটক, টপিক্যাল সাংস্কৃতিকবিষয়, মার্কসীয় দর্শন ইত্যাদি নিয়ে আর পড়তাম নিজেদের কবিতাও। অন্য বন্ধুরা কবিতা লিখত না আমি ও টুনটুন ছাড়া। এই বেকার পর্যায়ের  সময়টাই আমার জীবনটা পুরো রিওরিয়েন্ট করে দেয়। দু বছর বেকার জীবনটায়  প্রচুর পড়তে লাগলাম লাইব্রেরিতে গিয়ে ,স্টাডি সার্কলে টুনটুনদের বাড়ির ভেতরে। মামা আমাকে নানান গুণী বন্ধুদের কাছে পাঠাতেন পত্রিকার লেখা আনতে বা অারো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদনের জন্যে। এইভাবে ক্রমেই আমারও বিভিন্ন যোগাযোগ গড়ে উঠতে লাগলো। মামা, মামীমা ও ওখানকার বন্ধুরাও বেশ ভালোই বাসত। ওখানে কবি নবেন্দু চক্রবর্তী, রাম বসু, মোহিত চট্টোপাধ্যায়, সিদ্ধেশ্বর সেন প্রমুখ কবিরা মাঝেমাঝে আসতেন। পাভলভে ( শ্যামবাজার জলযোগ-এর ওপরে)-এর আড্ডায় ওঁদের সাথে ভাব হলো, কবিতাও শুনেছি কখনও বা। এমনকি মামার যুবক বয়েসের কবিতা পর্যন্ত। এমনিতে ওখানে গভীর বিজ্ঞান,মনোবিজ্ঞান,জীববিজ্ঞান এবংবিধ বিষয় নিযেই আলোচনা হতো পন্ডিতমানুষদের। আমরা শুনতাম, মানবমন পড়তাম, ওঁদের কাছে তো শিশু। রাজনীতির তাত্ত্বিক আলোচনাও এসেই পড়তো। নবেন্দুদা আবার তখন ঐ পত্রিকার সহ- সম্পাদকও ছিলেন। আমার দাদার মতো হবার দরুণ ওঁর মারফৎ অনেক শিখেছি, পড়েছি, দেখেছিও। এসব শিবের গীত থামাই, বড় বোর করছি শর্মিষ্ঠা।

১৯৬৮-র মে মাসে কলকাতা বন্দরের চাকরিতে যোগ দিয়ে  হলদিয়া বন্দর নির্মাণের কাজে সেখানে যাই। হলদি নদীর পাশে অ্যানকারেজ ক্যাম্পে থাকতাম প্রথমে। বুঝতেই পারছ অনেক কঠিন দিনের মধ্যে দিয়ে  চলতে হয়েছে পান্ডববর্জিত ওই স্থানে। কাজ আর পড়াশুনো : কিছু টেকনিক্যাল আর আমার প্রিয় নানান ধরণের বই। কবিতার পাঠ থেকেও বোধহয় বিজ্ঞান, দর্শন,রাজনীতি, নাটকের বিদেশি ও স্বদেশি পুঁথিপত্তর। ডায়েরি লিখতাম, আর কবিতা গদ্য সামান্য অনুবাদ যৎসামান্য ইংরেজিলেখা ( পাতে দেওয়া যায় না, তবুও) । ধারাবাহিক কবিতা গদ্যের চর্চা করিনি আগে। পড়তাম বেশি ; ওটাও সঠিক প্রক্রিযা নয়, মনে হয়! আশীর দশকে হলদিয়ায় একটু আধটু লেখা ছাপানো শুরু করি। আগেও যে ছাপে নি তা নয়। ১৯৮৫ থেকে কবিতার বই বের করি। আপনজন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হই। তখন অনেক কাগজে লিখতে শুরু করেছি। কলকাতায় আসি মাঝে মাঝে। সন্দীপ দত্ত থেকে শুরু করে অনেক লিটল ম্যাগাজিনে লিখতে শুরু করি ; কবিতার আড্ডায় যাই, কবি সভায় কবিতা পড়ার ডাক আসে হলদিয়া , মেদিনীপুর জেলার কয়েক জায়গায়, কলকাতা জীবনানন্দ সভাঘর, নন্দনের সভাঘরে বা আরো কিছু মঞ্চে। হলদিয়া উৎসব তো রাজসূয যজ্ঞের মতো এলাহি ব্যাপার। কলকাতা ভেঙে পড়ত ওখানে। অনেক নামী দামী সবি লেখক শিল্পী ; কত যে আলাপ আড্ডা হযেছে তার ইয়ত্তা নেই কোনও। মানবমনের প্রচুর সেমিনারে ছিলাম, শ্রোতা হিসেবেই মূলত। ইংরেজিতে কখনওবা। হলদিয়াতেও  সেমিনারে সেমিনারে ছয়লাপ। টাকার তো অভাব নেই ; বাম আমল তখন।

অনেক বয়ঃকনিষ্ঠ কবির সাথেও আলাপ হয়েছে বিশেষত হলদিয়ায়  --- সকলের নামও এখন সেভাবে মনে নেই। তমালিকা পন্ডাশেঠও কবিতা লিখতো, গদ্যও। আপনজন পত্রিকার মূল সম্পাদিকা তো সেই-ই। চলে গেছে অল্প বয়েসেই । অামরা হলদিয়া টাউনশিপে ' মুক্তকলাচক্র' নামে একটা সাহিত্যের আড্ডা বসাতাম। আমার বাড়িতেও প্রায়ই হতো ; বছর ছয়েক চলেছিল। মাসে, দু' মাসে একবার। গান, সেতার, গল্প, আলোচনা, কবিতা পড়তো পুরুষ, মহিলা লিখিয়েরা। কতো কনিষ্ঠ কবিরা থাকত। আমার ছেলের দলকেও একবার ডেকেছিলাম ওদের চিন্তাধারা ও সমস্যার কথা শোনার জন্য, উচ্চমাধূমিক স্তরে ছিল ওরা। সমবয়েসী বলতে তপোব্রত সান্যাল ছিলেন, আমাদের চারপাঁচজন খুঁটির মধ্যে আমি,বিশ্বজিৎ মিশ্র, দেবদাস মুখোপাধ্যায়, তুষার কান্তি দাশ, গৌতম কুমার দে ( প্রোরে নাটা-র সম্পাদক, তখন ওখানে ইউ বি আই-তে) । আসত নরেশ দাশ, ননীগোপাল মন্ডল, সুদীপ্ত চক্রবর্তী, সবিতা দে, অনসূয়া গাঙুলি, রেবা ব্যানার্জি, নীহারকণা দাশ, চিত্রলেখা মিশ্র অারো কতজন, জায়গায়  টান পড়ে যাচ্ছে যে।



কলকাতা, হলদিয়া দু জায়গাতেই আমার অনেক চেনা জানা লেখক/ কবি বন্ধু। কলকাতায় একসময় সাহিত্যপ্রয়াসী- র বন্ধুরা মুক্তকলাচক্রের অনুষ্ঠানে এলেন। আমিও গিয়েছি ওদের শিবপুরের অনুষ্ঠানে কবিতা পড়তে। সুখরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়রা অনেকেই কবি। প্রোরেনাটা-র কবি গৌতম কুমার দে তো ভাই-বন্ধুর মতো, ওই গোষ্ঠির অনেকের বই এসেছে আমার কাছে। আরও লিটল ম্যাগাজিনের  কিছু তরুণ কবিদের কবিতা শুনে ভাল লেগেছে, অনেকের কবিতায় পরীক্ষানিরীক্ষার নজিরও দেখেছি। সেটা হলদিয়াতেও যে দেখি নি তাতো নয়। কবিরা সিরিয়াসলি কবিতা চর্চা করলে তাতে নিজস্ব ঢঙ, নব নব আঙ্গিকের আবির্ভাব ঘটবেই। অভিজ্ঞতা, পড়াশোনার বিস্তৃতি, অনুভব, শব্দও ভাষার প্রয়োগকুশলতা ইত্যাদি অজস্র প্রশ্ন মিশে থাকে এতে। বিদেশি কবিতা, অন্যান্য ভারতীয় ভাষাসাহিত্যের পঠনপাঠনে  কবিতার আয়তন বাড়তে পারে, নতুনত্ব আসতে পারে। সেটা তরুণ কবিরা অনেকেই বোঝেন। আমি তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় কত কিছু বুঝেছি। তাদের লেখা পড়ে বিস্মিত হযেছি কখনও। হলদিয়ায় তপন মাইতি, নরেশ দাশ, মধুসূদন ঘাটি, রতনতনু ঘাটি, মৃণাল কান্তি দাশ এমনকি শ্যামল কান্তি দাশের কবিতাও শুনেছি, কত বৈচিত্রও লক্ষ্য করেছি। প্রলয় চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল রক্ষিত, তমালিকার কবিতা ( তমালিকা বলতো শ্যামলদার কাছ থেকে কবিতা লেখা শিখেছি। এটা বিনয় করেই বলা বুঝি। কবিতা লেখা কাউকে সেভাবে মোটেই শেখানো যায় না। তাই না?)। হরপ্রসাদ সাহু, মনোরঞ্জন খাঁড়া, দেবাশিস প্রধান, প্রণব মাইতি দের কবিতাও ভাল। ওরা হলদিয়ারই নন। কেউ মেচেদায়, কেউ কেউ কাঁথির। এমন অনেককেই জানি। সুচন্দ্রিমা বন্দ্যোপাধ্যায় অামার কন্যাপ্রতিম হলেও ভাল হাত ছিল, কিন্তু চর্চ হয়তো করে নি পরে। এখন শুনেছি বিদেশেই থাকে--ইঞ্জিনিয়ার। টুনটুনও তেমন চর্চা করলো কই ; এতো প্রতিভাময়ী মেয়ে এম স্ট্যাট, ডক্টরেট করে অন্যলাইনে চাকরি করে কাটালো ; রাশিয়ান ভাষা শিখে একমাসের জন্য ওদেশে ঘুরেও এল ওদেরই খরচায় ( আমার তো ভাল বন্ধুও ছিল। দুঃখ, বছর কযেক আগে গতায়ু হয়েছে ) । তাহলে, দেখার চোখ, অনুভূতি-উপলব্ধির গভীরতা, ভাষার উপর অধিকার ( কবিভাষা বলছি), জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি ইত্যাদি কবিতা লেখার সহায়ক ---এটা অনেক তরুণ কবিকেই শেখাতে যাওয়া ধৃষ্টতারই নামান্তর হবে। উল্টে, তারাও আমার মত অনেককে নানা প্রশ্নে ঘায়েল করতে পারে। তবে হলদিয়ার এক তরুণতাজা সিপি এম পার্টি করা কবি একবার আমাকে একটু ঠেস দিয়ে বললো' শ্যামলদা বলেছে প্রেমের কবিতা লিখতে '।আমি নরম করেই বললাম 'তাহলে বিপ্লব করতে চাও কেন?  বিপ্লব মানে!  সেখানে প্রেমের দরকার নেই!  প্রেমের জায়গা নেই?  তুমি কার্ল মার্কসের প্রেমের কবিতা পড়েছ?  ' আর কথা বাড়ায় নি সে। আসলে কালচারাল রেজিমেন্টেশনও বিপদ ডেকে আনতে পারে। যেমন অনেককে দেখেছি যৌনগন্ধী শব্দ দেখলেই অশ্লীল, বিকারগ্রস্ত বলে শিখিয়ে দেওযা বুলির চীৎকার, ধিক্কার জুড়ে দেয়। আরে বাবা, উদ্দেশ্যটা দেখ!  বিজ্ঞানটা যথাযথ বোঝ !  বড় অদ্ভুত লাগে এই চোখ-বাঁধা ফরমুলেশন। অনেকেই উগ্র রক্ষনশীল, অগভীর, আত্মপ্রবঞ্চক, বা পশ্চাদগামী কিংবা আরো কিছু। যাক গে এসব।

           ২০০১ থেকে বেশ কয়ে কবছর খুবই কম লিখেছি। আমার কবিতাচর্চায় অনেক গ্যাপ আছে। পড়াশুনো কিছুটা অন্তত চলেই ; সেটাও নানা বিষয়ে, স্তরে। বই তো খুব কম কিনিনি!  তাছাড়া পত্র পত্রিকা তো আসছেই। তবু এই না লেখাটা অন্যায় হযেছে। আসলে, গানও একটু আধটু গেয়েছি নিজের মতো, সিনে ক্লাবের সদস্য ছিলাম হলদিয়ায়। পড়েছি, ওদের কাগজে লিখেওছিলাম। সেমিনারে এসেছিল কতো উজ্জ্বল ফিল্মজ্যোতিষ্ক ; আমার দাদা ও পাভলভ ইন্সট- এর বন্ধু সুব্রত নন্দী ( আগে ভুলে রুদ্র লিখেছি কোথাও), অলকানন্দা রায় এলেন একসাথে কলকাতা থেকে। আমি টোটালিটি দেখেছি বরাবর, তাই এককভাবে কবিতায় সিদ্ধিলাভ হয়তো সম্ভব হয নি, হয় না। তবে সব জ্ঞান এবং শিল্পই কোনও না কোনওভাবে সংযুক্তথাকে বলেই আমি মনে করি। ২০১০ নাগাদ আবার লিখতে লাগলাম কবিতা, কিছু গদ্যও। প্রচুর নাটক দেখতাম কবে থেকেই ( করেওছি কয়েকটা, ভাল হয় না। ততো ইচ্ছেও নেই)। নাটক কবিতা ফিল্ম পেন্টিং স্কাল্পচার সবকিছুই প্রযোজনে স্থান বদলে থাকে ; এতে আমার আত্মবিস্তার, উপলব্ধি, বিভিন্ন বোধ অনেক বেড়েছে। আমি প্রয়োজনে পোযেটিক ডিকশন কমিয়ে সরাসরি কথা বলেছি কবিতায়। হয়তো অনেকের না-পসন্দ এটা। হোক, আমি তো আমার মতো চলবো, বাঁক নেব, অন্য সুরে ঢঙে বলবো। জীবনের পথের মতোই কবিতার সোজা একটানা কোনো পথ থাকে না, রোজই বুঝতে পারি।

বেলঘরিযায় থাকার সুবাদে কাছাকাছি  কিছু সাহিত্যের আড্ডায় যাচ্ছিলাম। নানা পত্রিকায় লিখছিলাম। নন্দন চত্বরের সভাতেও যেতাম, কবিতা পড়তাম, কি বললাম দু'চার কথা। তারপর ব্যালান্সের সমস্যার জন্যে দূরে যাওয়াটা কমে গেল, আটকে গেল। শরীর শক্তপোক্ত থাকলেও এটা বেশ অসুবিধে ঘটাতে লাগলো। বনহুগলি পাঠাগারের সভা, ডানলপে ইচ্ছেকুসুমের আড্ডাগুলোতে নিয়মিতই যাচ্ছিলাম ; হালফিলে বন্ধ রেখেছি বাড়িতেও একটু বারণ করে থাকে। আমি সাহিত্য আর মানুষের কাছে যেতে না পারলে যেন মনখারাপে ভুগি একটু। পড়তে সবচেয়ে ভালবাসি এটা একশ' ভাগ সত্যি। এইসব সাহিত্যের আড্ডার পছন্দের কবি/ লেখকদের কয়েকজনের নাম বলি: কেদার নাথ দাস,অশোক রায়চৌধুরি, শ্যামসুন্দর গুঁই, সুজিত দাস,মৃদুল শ্রীমানী, অলক মিত্র,সমরশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রিমা চক্রবর্তী, ইরা দলুই, প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায়, কমল মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মুখোপাধ্যায়, সনৎ বসু, উত্তম মুখোপাধ্যায়, পরিমল মুখোপাধ্যায়, দীনেশ ভট্টাচার্য ।



একজোট সাহিত্যের আড্ডা হতো পাইকপাড়ায় কবি- লেখক জ্যোতি ঘোষের বাড়িতে। উনি অত্যন্ত গুণী, বিনয়ী এক ভাল মানুষ ( দুবছর আগে প্রয়াত) । ওখানেও স্বপন ভদ্র, অারতি দে, শ্রীময়ী চক্রবর্তী, পুরুষোত্তম  তালুকদার, শুভ মিত্র এবং আরো অনেক ভাল কবিরা আসতেন। মহিলা কবিরা তো বয়েসে যথেষ্ট কম আমার চেয়ে। পুরুষ কবিরাও  আমার চেয়ে কমবয়েসী বেশিরভাগ। আমার কবিতা, মতামত শুনতে চাইতো সভাস্থ সহকবিরা, এটাই আমার প্রাপ্তি। অনেক বয়ঃকনিষ্ঠ কবিরা আমায় শ্রদ্ধা জানাতো ; জানিনা, আমি কতটা সম্মানের যোগ্য সাহিত্যের ক্ষেত্রে। যাইহোক, কিছু সম্মাননা তো জুটেইছে কবে থেকেই। হলদিয়াও আমাকে চিনতো। কেউ কেউ অতি-মূল্যায়নও করেছে। আবার এক-দুটো মজার ঘটনা বলে এটার যবনিকা টানবো।

হলদিয়ার কাছের কবি হরপ্রসাদ সাহু, অনেক তরুণ, একবার ওদের এক পত্রিকায় লিখেছিল 'শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ কবি,যারা কলকাতা থেকে এসেছেন, তাদের  লেখা ছাপানোর চালাকি '। বছর খানেক পর এক লিটল ম্যাগাজিনের আলোচনা ও অনুষ্ঠানে ওর সঙ্গে দেখা হলে নরম কিন্তু ঋজুভাবে বললাম ' শব্দ কি চাকর বাকর যে যা খুশি লিখে দেওয়া যায়!  তুমি আমাকে কতটুকু জানো যে এরকম কথা কাগজে লিখে দিলে ! ' হর সাথা নীচু করে আমাকে প্রণাম করে ক্ষমা চেয়ে বললো : আমি সত্যি আপনাকে জানতাম না, ওর কোন বন্ধু নাকি এসব বলেছিলো ওকে। আর একটা ছোট্ট মজারই কথা। একদিন আপনজন দপ্তরে সম্পাদক মন্ডলীর বৈঠকে কোন একটা মার্কসীয় ব্যাখ্যায় ওখানকার সিপিএম পার্টির নির্দেশ ও করণীয় ব্যাপার স্যাপার নিযে কথায় তমালিকা শেঠ আমায় একটু অথরিটেটিভ ভঙ্গিতে কিছু বললেন। আমি একটু বিরক্ত মুখে বলেছিলাম, 'দেখুন তমালিকা মার্কসিজমের তত্ত্ব আমায় পার্টির এই সব চটি বইপত্তর থেকে শিখতে হবে না। ওসবের শিক্ষা আমি কলকাতা থেকেই পেয়েছি।' আমার অনেক অরিজিনাল ওয়ার্কস-ই আছে ; যদিও আমি কোনওদিন পার্টিসদস্য ছিলাম না। পার্টির একটু খবরদারী করার বাতিক আছে, অনেক সময়-ই মনে হয়েছে। মানবমন দপ্তরে অনেক জ্ঞানীগুণী মার্কসিষ্টকেও দেখেছি। অনেক দেখেছি তাদের সৎ, সাধারণ জীবনচর্যা। মামারা তো সারাজীবন ভাড়াবাড়িতেই কাটিয়ে গেলেন। অমিয়া গাঙ্গুলি  ( মামিমা) তো হাওড়া গার্লস্ এর ইংরেজির অধ্যাপিকা ছিলেন। গোপাল হালদার, অরুণা হালদার, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, কপিল ভট্টাচার্য  আরও কতজন  আসতেন পাভলভীয়ান  মঙ্গলবারের আড্ডায় কখনও কখনও। বড় বাজে বকছি, যেন মেমোয়ার লিখছি। এখন তো ফেসবুকে অনেক কবি, লেখক বন্ধু আমার। শিঙ ভেঙে নানা বযেসের পুরুষ, মহিলাদের সাথে সহজ স্বাচ্ছন্দে মতামত বিনিময় করি। তাদের কবিতা, গদ্য পড়ে আমার মূল্যায়ন নির্দ্বধায় লিখি। বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখার দু একজন ছোট বন্ধুও আমার মতামত শুনতে চায়। তাদের কতজন আমার যে কত প্রিয়, স্নেহ ও বিশ্বাসভাজনের তালিকায় রয়েছে কি বলবো। কত সুখ, কত আনন্দ আমার। অনেকের লেখা বেশই ভাল লাগে। কারও কারও কবিতা, গদ্যের বই এসে গেছে আমার কাছে। সোস্যাল মিডিয়ায় কিছু পরিতৃপ্তি ও উষ্ণতা এভাবেই পাই আমি। আমার কিছু কবি লেখক বন্ধুর নাম লিখে যাই , এত যখন বললাম। সাত্যকি দত্ত, রমেন আচার্য, কেদারনাথ দাস, নৃপেন চক্রবর্তী, শ্যামলী বন্দ্যোপাধ্যায়,অজয় চক্রবর্তী, শান্তা মারিয়া, দীপশিখা পোদ্দার, প্রসূন আচার্য, স্বাতী চক্রবর্তী, জয়া চৌধুরি ( কুন্ডু), শর্মিষ্ঠা ঘোষ। আরও অনেকে আছেন কিন্তু অনেক লম্বা হযে যাবে লাইন। নাম লিখতে না পারার জন্যে কিছু ভুল বুঝবেন না বন্ধুরা। চটজলদি সরাসরি লিখছে ৭৬ বছরের এক মামুলি কবি ; স্মৃতি এখন অতো প্রখর নয়, রাতও অনেক। বেশি রাতজাগা বারণ, ছেলের হুঁশিযারি ফোন এল ঘন্টাখানেক আগে ( ডাক্তার বলে দিযেছে বারবার, ঘুমাতে বলেছে বেশি আরও) । এদের মধ্যে জয়া ও শর্মিষ্ঠার কবিতার বই এসে গেছে হাতে, অনেকদিন আগের এক কলকাতা বইমেলায় ওদের সাথে আলাপ,  সামান্য গল্প ও একত্রে কফিপান হলো। আমি ভাগ্যবান যে এমন দুই সুকবির সাথে বইমেলার রাঙাধুলোর রাজ্যে এই অসম বন্ধুত্বের নিবিড় সারস্বত বন্ধন রচিত হলো। দুজনের লেখার ঢঙ একেবারেই ভিন্ন, নিজ নিজ সৃজনবিভায় ওরা উজ্জ্বল। আর শর্মিষ্ঠা তো আমার অত্যন্ত প্রিয় কবির লিষ্টভুক্ত কবেই হয়ে গেছে। এ লেখায় তৃপ্তি অতৃপ্তি দুই-ই রয়ে গেল। যাঁরা ছাপবেন বা ব্লগ করবেন তাদের অকুন্ঠ ধন্যবাদ, ভাই। আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে দাঁড়ি টানলাম।

পূর্বের পর্বটি পড়ুন -


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-