সোমবার, ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭

পিয়ালী গাঙ্গুলি

sobdermichil | ডিসেম্বর ২৫, ২০১৭ |
স্যান্টার জবানী
সুদূর নর্থ পোল থেকে সারা পৃথিবী ঘুরে শেষে কলকাতা। একদিনে এত ধকল কি আর পারা যায়? বয়েস তো দিনদিন বাড়ছে। এই কলকাতা শহরের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। এত দুঃখ, কষ্ট, সমস্যার মধ্যেও এই শহরটা বাঁচতে জানে, হৈ চৈ করতে জানে, উৎসবে মেতে উঠতে জানে। তাই তো প্রতিবছর আমি কলকাতাকেই শেষ গন্তব্য রাখি। সারাদিন ধরে পিঠে ভারী থলিটা বইতে বইতে কাঁধে আর পিঠে ব্যথা হয়ে গেছে। একটু স্প্রে করে নিতে হবে। আগে এই সময়টা কলকাতার বাচ্চাগুলো একটু শান্তিতে বড়দিন উপভোগ করতে পারত। বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে স্কুলগুলো ছুটি পড়ে যেত। এখন কি ছাতার এক সেশন হয়েছে এপ্রিলে। যত্তসব। যাকগে, তাড়াতাড়ি করে বাচ্চাগুলোকে উপহারগুলো দিয়ে এসে পার্ক স্ট্রিটে এসে এনজয় করব। রেন ডিয়ারগুলোকেও ভালো করে খাইয়ে দিতে হবে। ওরাও খুব ক্লান্ত।

এদেশে চিমনি দিয়ে ঢুকতে হয় না এই এক রক্ষে। এই মোটা সোটা চেহারা নিয়ে চিমনির মধ্যে দিয়ে গলতে যে কি কষ্ট। এখানে সেসব চাপ নেই। গত কয়েক বছরে কলকাতা শহরটা অনেক বদলে গেছে। কত ফ্লাইওভার, শপিং মল। আলোর জোয়ারে ভাসছে শহর। আর কত যে হোটেল, রেস্টুরেন্ট হয়েছে তা তো বোধহয় আমি গুনেও শেষ করতে পারব না। যতগুলো বহুজাতিক, পাঁচতারা হোটেল আছে সবকটা এসে জুটেছে কলকাতায়। 

গত কয়েকবছর ধরে পার্ক স্ট্রিটে ক্রিসমাস কার্নিভালটা ভালোই হচ্ছে। হ্যাঁ, রিওর কার্নিভালের সঙ্গে তুলনা করাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে বটে, তা নিয়ে অত রসিকতা করারও কিছু নেই। ঝড়ের গতিতে গিফ্টগুলো দেওয়া হয়ে গেছে। গত কয়েক রাত এলফদের সাথে মিলে হাতে হাতে সব গিফ্ট বানিয়েছি নিজের ওয়ার্কশপে বসে। বসে বসে কোমরে আর হাঁটুতে যা ব্যথা হয়েছে না! সবসময়ই একটা টেনশন থাকে যদি কম পড়ে যায়। সারাক্ষণ পটপট করে কত যে বাচ্চা জন্মাচ্ছে অত কি হিসেব রাখা যায়? না, সেরকম কোনো অঘটন ঘটেনি। থলিতে এখনও অনেক গিফ্ট পড়ে আছে। দুস্টু বাচ্চাগুলো ঘুম থেকে উঠে যখন গিফ্টগুলো দেখবে, তখন ওদের মায়েরা নিশ্চয়ই বলবে "এবারে আমি আর বাবা অনেক রিকোয়েস্ট করাতে স্যানটা ক্লজ তোমায় গিফ্ট দিয়ে গেছে। সামনের বছর এরকম দুস্টুমি করলে আর কিন্তু গিফ্ট দেবে না বলে গেছে স্যানটা দাদু।" 

ভাবলাম সামপ্লেসে ঢুকে বিয়ার খেতে খেতে একটু গান বাজনা শুনব। পার্ক হোটেলে ঢুকতে গিয়েই সে এক বিপত্তি। প্রথমেই মেন এন্ট্রানসে প্রহরীর এক চাপড় মারল পিঠে "যা জলদি সে যা, সাব ঢুঁনড ঢুঁনড কে পরিশন হো গ্যায়া"। আরে, এ কি অসভ্যতা! বয়স্ক একটা লোকের কোনো সন্মান নেই? ভেতরে ঢুকতেই একটা লোক হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল "এতক্ষণে আসার সময় হল? পার্টি কখন শুরু হয়ে গেছে। ও, দেরী করে এসেছিস বলে আবার একেবারে কস্টিউম পরেই এসেছিস? নে, যা যা, ক্যান্ডি আর চকোলেট ভর্তি ঝোলাটা ওখানে আছে, নিয়ে শুরু করে দে"। এইবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। এরা ভাবছে আমি নকল স্যানটা ক্লজ, মানে পার্টিতে লোকজনের মনোরঞ্জনের জন্য সাজা স্যানটা ক্লজ।



ঘাড় ধরে আমায় ঢুকিয়ে দিল সুসজ্জিত ব্যাংকয়েট হলে। আমি ঢুকতেই লোকজন হৈ হৈ করে উঠল। তারপর শুরু হল আমার সাথে সেলফি তোলার হিড়িক। অসহ্য লাগে আমার এই জিনিসটা। ক্রমশ একটা মানসিক বিকারে পরিণত হয়েছে। সেলফি তুলতে মশগুল হয়ে কত লোকের প্রাণ গেছে আজ অবধি। তাতেও এদের শিক্ষা হয়না। যাকগে, কয়েক ঘন্টা নিজে নিজের ভূমিকায় অভিনয় করে রোজগারপাতি নেহাত মন্দ হল না। আমি অবশ্য সাথে করে কিছু টাকাপয়সা নিয়েও এসেছিলাম টুকিটাকি জিনিস কিনে নিয়ে যাব বলে। তালিকায় সর্বপ্রথমে অবশ্যই রসগোল্লা। ইন্টারনেটে পড়ছিলাম রসগোল্লা নিয়ে সম্প্রতি কি একটা কেস হয়েছিল। আজকাল তো আবার বেকড রসগোল্লার খুব চল হয়েছে। সেও নিয়ে যাব খানিকটা সাথে করে।

ভাবলাম যাই বো ব্যারাকসটা একবার ঘুরে আসি। এককালে কি জমজমাট ছিল এখানের বড়দিনের উৎসব। গিয়ে মনটাই খারাপ হয়ে গেল। মাত্র গুটিকয়েক এঙলো ইন্ডিয়ান পরিবার এখনো টিকে আছে। টিমটিম করে কয়েকটা আলো ভরা স্টার জ্বলছে। ক্রিসমাস ট্রিটারও কোনো জৌলুশ নেই।  ছোটখাটো একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে দেখতে পাচ্ছি। কয়েকটা বাচ্চা ছোটাছুটি করছে। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আবার ফিরে এলাম পার্ক স্ট্রিটেই। রাস্তায় মানুষের ঢল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। এল ই ডি আলোর বন্যায় ভাসছে পার্ক স্ট্রিট। বড় বড় রেস্তোরাঁগুলোর বাইরে লম্বা লাইন। এরই মাঝে বেলুনওয়ালা বা নানারকম আলোজ্বলা টুপি ইত্যাদি বিক্রি করে দুপয়সা রোজগার করার চেষ্টা করছে। অনেকে কিনছেন, অনেকে আবার দূর দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছেন।

বারোটা বাজতে বাজতেই চার্চে চার্চে মিডনাইট মাস শুরু হয়ে গেল। আমিও টুক করে ঢুকে পড়লাম লোরেটো কলেজ সংলগ্ন সেন্ট টমাস চার্চে। চার্চ সার্ভিস শেষে একে অপরকে মেরি ক্রিসমাস উইশ করে সবাই একে একে বেরিয়ে পড়ল। আমিও বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তাঘাটে ভিড় ও তখন ফাঁকা হয়ে এসেছে। গায়ে ছেঁড়া, ফাটা, নোংরা চাদর বা কম্বল গায়ে জড়িয়ে ফুটপাথে শুয়ে আছেন কত মানুষ। কয়েক ঘন্টা আগেও এই রাস্তার চেহারাটাই কত আলাদা ছিল। মনটা ভারী হয়ে গেল। ফ্লুরিস তখনও খোলা। ভেতরে ঢুকে যা টাকা পয়সা ছিল তাই দিয়ে যে কটা কেক, চকোলেট, কুকিজ হয় কিনে নিলাম। ফুটের ঘুমন্ত শিশুগুলোর মাথার কাছে একটা একটা করে রেখে মনে মনে বললাম "মেরি ক্রিসমাস"।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ,GS WorK । শব্দের মিছিল আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-