Thursday, December 28, 2017

বনবীথি_পাত্র

sobdermichil | December 28, 2017 |
তুষের আগুন
হুন্ হুনা.......হুন্ হুনা.......

কাটা ধান গাছের মেঠো পথের আল ধরে পালকি চলেছে । পশ্চিম দিগন্তে দিবাকর ঢলছে ।

সেই রঙে লাল ঝালরের আড়ালে লজ্জারাঙা কিশোরী কনে ।

পাশে পাশে হেঁটে চলেছে সদ্যযুবক বর । এ গাঁয়ে এখনো পালকির চল্ থেকেই গেছে ।

দূর থেকে এই দৃশ্য দেখছে গাঁয়েরই এক পূর্ণযুবতী , চন্দ্রলতা । সেওতো বছর আটেক আগে এমনি পালকিতেই চলেছিল । ভাবতে ভাবতে মাথাটা কেমন যেন ঘুরতে থাকে !

সেদিনও কোপাই নদীর তীর দিয়ে এমনি করেই পালকি চলছিল , তখন ভরা অঘ্রাণ মাস । দুধারে ক্ষেত ভরা পাকা ধান কাটা চলছে । পালকির পরদাটুকু ফাঁক করে বাইরে তাকায় চন্দ্রলতা । ইস্ কি লজ্জা , একেবারে চোখাচোখি ঘনশ্যামের সাথে । শুভদৃষ্টির পর এই প্রথমবার দুজনের চোখাচোখি । বরবেশে পালকির পাশে পাশে হেঁটে হেঁটে চলেছে নতুন বর । তবে যে ছোটবেলায় পড়েছিল , বিয়ের পর বৌ পালকিতে যায় আর বর যায় ঘোড়ায় চেপে । ধুস্ বইএর লেখা সব সত্যি হয় নাকি !!!! নিজের ভাবনাতে নিজেই হেসে ফেলে চন্দ্রলতা । ঘনশ্যামকে ঠিক রাজপুত্তুরের মতো দেখতে নয় , রঙটা ময়লা তবে পেটানো শক্তিশালী চেহারা । কাল সবে বিয়ে হয়েছে আর এরমধ্যেই যেন মানুষটাকে ভালোবেসে ফেলেছে । লজ্জা আর ভয় বুকে নিয়ে শ্বশুরের ভিটেতে পা রেখেছিল চন্দ্রলতা । সতেরো বছরের চেনা পরিবেশ ছেড়ে নিজের সংসারে । মা বারবার বলে দিয়েছিল ওটাই তার নিজের সংসার । শ্বশুর-শাশুড়ি ই এখন থেকে তার বাপমা আর ঘনশ্যাম তার আপন মানুষ , জনম-মরণের সাথী । তবু মায়ের জন্য বুকটা হা-হুতাশ করতো থেকে থেকে , মনটা ছুটে ছুটে যেতে চাইত কোপাই নদীর চরে । শ্বশুরমশাই মানুষটি বড্ড রাশভারী , পয়সার গুমোরটা একটু বেশি । গরীবের মেয়ে বলে একটু যেন ট্যারা চোখেই দেখেন ওকে । ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে যেন উদ্ধার করেছেন চন্দ্রকলাকে । শাশুড়ী মানুষটা এমনি ভালোই তবে ছেলে-বৌমার বেশি ভাব দেখলেই যেন মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে তার , এই বুঝি তাঁর ছেলে পর হয়ে গেল । ঘনশ্যামের রোমশ বুকে মাথা রাখলে অবশ্য সব মনখারাপ ভুলে যেত চন্দ্রলতা । অল্প লেখাপড়া জানা গাঁয়ের মেয়ে , সংসারের কাজকর্ম-রাঁধাবাড়া শিখে নিতে বেশি সময় নেয়নি । পাড়া প্রতিবেশীতেও বলতো , লক্ষ্মীমন্ত বৌ ।

বছর ঘুরতেই শাশুড়ির মুখভার , এতদিনেও কোন খুশির খবর না পাওয়ার জন্য । বয়স হচ্ছে এখন কোথায় নাতি-নাতনির সাথে খেলাধূলো করবেন , ওনার পোড়া কপালে নাকি সে সুখটুকুও নেই ।

শ্বশুরমশাই বংশধর চান ।

সন্তান তো ঘনশ্যাম ও চায় , চন্দ্রলতাও তো চায় মা হতে.....কিন্তু সন্তান আসছে কৈ !!!!

শুরু হলো ঠাকুর-দেবতা-তাবিজ-কবচ , কিছুতেই তো কিছু হচ্ছে না !!!! পাড়া-প্রতিবেশী-আত্মীয়স্বজনের মুখে চাপা ফিসফাস , ঘনশ্যামের বৌটা একটা বাঁজা মেয়েমানুষ । যৌবন ফেটে পড়ছে অথচ তিনবছরে একটা সন্তান দিতে পারলো না ঘনশ্যামকে । এমন মেয়েমানুষের মুখদর্শন ও নাকি পাপ ।

মনে মনে কষ্ট পেলেও কিছু করার ছিলনা চন্দ্রলতার । মা বলেছে , মেয়ে হয়ে যখন জম্মেচে অনেক কিচু সহ্য করতে হবে । টিভিতে একটা সিনেমাতে চন্দ্রলতা দেখেছিল , ডাক্তার দেখিয়ে কত বছর পর একটা বৌয়ের বাচ্চা হয়েছে । তাই একদিন রাতে চুপিচুপি ঘনশ্যামকে বলছিল , দুজনে মিলে গিয়ে একবার শহরের বড়ো ডাক্তার দেখানোর কথা । ঘনশ্যাম প্রথমে রাজি না হলেও শেষ অবধি রাজি হয়েছিল । কিন্তু ডাক্তার দেখানোর কথা ঘনশ্যাম তার মাকে বলতেই যেন অশান্তির ঝড় উঠলো বাড়িতে । "ঘরের বৌ কিনা লজ্জাশরম ভুলে যাবে শহরের ডাক্তারের কাছে !! পেটে বাচ্চা আসতে সোয়ামীকে লাগে , ডাক্তারকে লাগে না । আমার অমন সুপুরুষ ছেলে ঘরে থাকতে বৌ যাবে শহুরে ডাক্তারের কাছে !!!!" বৌয়ের আঁচলধরা বলে ঘনশ্যামকে কম কথা শুনতে হয়নি । ঘনশ্যাম নাকি ম্যাদামারা পুরুষ মানুষ , চন্দ্রলতার রূপে মজে বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছে । নাহলে এমন বাঁজা মেয়েমানুষকে বিদায় করে নতুন বৌ আনতো ঘরে ।

সময় কেটেছে আপন গতিতে , সবার প্রিয় লক্ষ্মীমন্ত বৌ ততদিনে বাঁজা মেয়েমানুষ ।

দু-তিনটে গাঁ পেরিয়ে ময়ূরাক্ষীর তীরে নাকি এক সাধুবাবা এসেছেন , তিনি নাকি অসাধ্য সাধন করতে পারেন , মরা গাছেও ফুল ফোটাতে পারেন । 

ঠাকুর-দেবতা-ফকির-সাধু সবেতেই ভক্তি চটে গিয়েছিল চন্দ্রলতার । তবু শ্বশুর-শাশুড়ি এমনকি ঘনশ্যামেরও ইচ্ছা একবার সেই সাধুর কাছে চন্দ্রলতাকে নিয়ে যাওয়ার । কদিন থেকে চন্দ্রলতার শরীরটা ভালো নেই , মাথাটাও কেমন যেন ঘোরঘোর লাগছে । অনেকটা পথ হেঁটে যেতে হবে সাধুবাবার কাছে । তবু যেতে আপত্তি করেনি , তার মতো মেয়েমানুষের মুখে কি আর প্রতিবাদ মানায় !!!! 



গ্রামের মেঠো পথ , মানুষজন কম , যাতায়াতের তেমন কোন যানবাহন নেই । তবে দুটো একটা ভ্যানরিক্সা আছে হয়তো । কিছুটা পথ হেঁটেই সেদিন বারবার হাঁপিয়ে যাচ্ছিল চন্দ্রলতা । ঘনশ্যাম ওর হাতটা শক্ত করে ধরেছিল , ভ্যানরিক্সাও করতে চেয়েছিল । রাজি হয়নি চন্দ্রলতা । শাশুড়ীর কানে খবরটা গেলে পাড়া মাথায় করবে চেঁচিয়ে , চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে দেবে চন্দ্রলতার । ঘনশ্যামের জন্য বড্ড মায়া হয় ওর , মানুষটা চন্দ্রকেও ভালোবাসে আবার মায়ের কথার প্রতিবাদ ও করতে পারে না । 

আজো মনে পড়ে সাধুবাবার কাছে মানুষের লম্বা লাইন । সবাই বোধহয় এসেছে মরা গাছে ফুল ফোটাতে । চন্দ্রলতাকে দেখে সাধুবাবা বলেছিল , মেয়ে হয়ে জন্মেছিস আর মা হবি না তাও কি হয় !!!! আগামী অমাবস্যায় আসবি একটা লালশাড়ি আর তিনটে তামার পয়সা নিয়ে । তারপর দেখি তোর মা হওয়া কে আটকায় !!!!

সাধুবাবার কথায় চন্দ্রলতা আর ঘনশ্যামের মনে খুশির ছোঁয়া । 

হেমন্তের বেলা পড়ে আসে তাড়াতাড়ি । সূর্য ডুবছে ময়ূরাক্ষীর কোলে , এখনি আঁধার নামবে । বড্ড দেরী হয়ে গেল সাধুবাবার কাছে । একটু জোরেই বাড়ির দিকে পা চালায় দুজনে । তাড়াতাড়ি হবে বলে বনবাংলোর রাস্তাটা দিয়ে আসছিল দুজনে । মাঠভরা পাকা ধান থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছিল নাকে । ঠিক তখনি........

চন্দ্রলতা বা ঘনশ্যাম কিছু বুঝে ওঠার আগেই , হিংস্র জন্তুর মতো ওরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল চন্দ্রলতার শরীরটার ওপর । ঘনশ্যামকে পিটুলি গাছটাতে বেঁধে ওর চোখের সামনে তিন-তিনটে মানুষ ছিঁড়েখুড়ে খেয়েছিল চন্দ্রলতাকে । ঘনশ্যাম আপ্রাণ চিৎকার করছিল কিন্তু ঐ ফাঁকা জায়গায় কে শুনবে সে চিৎকার !!!! তবু কেমন করে জানি বনবাংলোর মানুষগুলো শুনতে পেয়েছিল । কিন্তু তেনারা যখন এসে পৌঁছায় সব শেষ । পশুগুলো সব লুঠ করে হারিয়ে গেছে আঁধারে । বনবাংলোর চৌকিদারের টর্চের আলোয় সবার চোখে পড়েছিল রক্তাক্ত চন্দ্রলতার নগ্ন দেহটা । বনবাংলোর গাড়ি করেই ওকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে । চন্দ্রলতার শরীরের অবস্থা ভালো বোঝেননি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তারবাবু । সাথে সাথেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন শহরের হাসপাতালে । আর কিছু মনে নেই চন্দ্রলতার , জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল ।

জ্ঞান ফিরেছিল যখন তখন সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা , হাতে ছুঁচ ফোটানো স্যালাইন চলছে । গতরাতের কথা মনে পড়তেই লজ্জা-ঘেন্না আর আতঙ্কে দুচোখ বন্ধ করে ফেলেছিল চন্দ্রলতা । বাপ-মা খবর পেয়ে ছুটে এসেছে হাসপাতালে । এ কি সব্বোনাশ হয়ে গেলো তাদের আদরের দুলালীর !!!!!

এতো যন্ত্রণাতেও ডাক্তারবাবু একটা খুশির খবর দিয়েছেন , চন্দ্রলতার শরীরে তার সন্তান বড়ো হচ্ছে তিলতিল করে । অমন অবস্থায় শরীরের ওপর এমন ঝড় বয়ে গেছে চন্দ্রলতার , বাচ্চা না হওয়া অবধি খুব সাবধানে থাকতে হবে ওকে ।

চন্দ্রলতার দুটো চোখ বারবার ঘনশ্যামকে খুঁজছিল । ভয় হচ্ছিল সেরাতে মানুষটার কিছু ক্ষতি করেনি তো জানোয়ারগুলো !!!!!!

শেষ অবধি মায়ের মুখে জানতে পেরেছিল , শ্বশুরমশাই বলে দিয়েছেন নষ্ট মেয়েমানুষকে আর ঘরে তুলবেন না তিনি । শাশুড়ী ছেলেকে দিব্যি দিয়েছেন , ঐ বৌয়ের সাথে সম্পর্ক রাখলে মা-বাপের মরা মুখ দেখবে ঘনশ্যাম । চন্দ্রলতার পোয়াতি হওয়ার খবরটা ওর শ্বশুরবাড়িতে দিতে চেয়েছিল মা-বাপ । চন্দ্রলতা রাজি হয়নি । যে সংসারে তার মতো নষ্ট মেয়ের জায়গা নেই ওর সন্তানও যাবে না সেখানে ।

বাপ-মায়ের সাথে হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছিল নিজের বাড়িতে ।

চন্দ্রলতার মেয়েকে দেখতে হয়েছে ঘনশ্যামের মতো । যতবার মেয়েকে দেখে মানুষটার প্রতি ঘেন্নায় মন ভরে যায় চন্দ্রলতার । সে রাতের ঘটনাতে তো চন্দ্রলতার কোন দোষ ছিলনা , যা ঘটেছির তার চোখের সামনেই । তবু মানুষটা তাকেই ত্যাগ দিল !!!! কাপুরুষ কোথাকার । সেই রাতের জানোয়ারগুলোর থেকেও বেশি ঘেন্না হয় ঘনশ্যামকে । রাগে দুটো চোখ যেন দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে , মাথাটা ঘোর ঘোর....

কি রে মেয়েটাকে আজ ইস্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে যাবি তা নয় তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস্ ?

মায়ের ডাকে যেন চমকে ওঠে চন্দ্রলতা । 

মা তখনো বলেই চলেছে , দিদিমণি আগের দিন কিন্তু বারবার বলেছে ইস্কুলে ভর্তি হতে বাপের সই লাগবে । যদি ইস্কুলে ভত্তি না নেয় !!!! বাপ থাকতেও মেয়েটা মুখ্খু হয়ে থাকবে !!!!

মায়ের মুখের দিকে একবার কটকট করে তাকায় চন্দ্রলতা , ওর জন্মের আগেই ওর বাপ মরে গেছে । 

আর না দাঁড়িয়ে হাঁটা দেয় বাড়ির দিকে ।

মেঠো পথ ধরে পালকি ততক্ষণে অনেক দূরে । শুধু ক্ষীণসুরে ভেসে আসছে হুন্ হুনা.......হুন্ হুনা.......

#

মা ওমা তুমি এখনো রান্নাঘরে !!!! তৈরি হওনি এখনো !!!! দেখো তো দশটা বাজতেই চললো....

মেয়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই চন্দ্রলতা ভাতের থালা হাতে হাজির । 

এই নে আগে দুটো খেয়ে নে তো , সারাটা দিন তো নাহলে পেটে কিচ্ছুটি পড়বে না ।

মা একটা দিন তো , বাইরেই কিছু খেয়ে নিতাম । তুমি চটপট তৈরি হয়ে নাও , আর দেরি কোরো না প্লিজ....

আমার এইসব একদম ভালো লাগছে না খুকু । এতোবছর পরে এসবের কি দরকার বলতে পারিস্ ? তুই মানুষ হয়েছিস , ভগবান তোকে সুস্থ রাখুন আমার আর কিছু চাওয়ার নেই জীবনে ।

তোমার না থাকুক , আমার আছে । আমার মায়ের মানসম্মানের দাম আমার কাছে সবথেকে বেশি । সেই ছোট থেকে তোমাকে শুধু সবার থেকে মুখ লুকিয়েই থাকতে দেখেছি । আসল কথাটা কখনো আমাকে জানতেও দাওনি । তোমার নিজের জন্য না যাও , আমার জন্য আজ তোমাকে যেতেই হবে মা ।

মেয়ের বাপের পরিচয় কখনো মেয়েকে জানতে দেয়নি চন্দ্রলতা । সে ছোট থেকেই জেনে এসেছে তার জন্মের আগেই তার বাপ মরে গেছে । কিন্তু বড়ো হওয়ার পর কানাঘুঁষো তো তার কানে আসতোই , সে নাকি অত্যাচারের ফসল - তার নাকি বাপের ঠিক নেই । মেয়ে ঘরে এসে কান্নাকাটি করতো , মা-দিদিমাতে কত বুঝিয়ে শান্ত করতো মেয়েকে । সব কথাগুলো যেন পর পর ছবির মতো মনে পড়ছে চন্দ্রলতার । 

মেয়েটা লেখাপড়ার মাথাটা পেয়েছিল বাপ-ঠাকুর্দার মতো । অভাবের সংসারে থেকে কলেজ পাশ দিয়েছে । শহরে গিয়ে কিসব কম্পুটার শিখেছে । শেষ অবধি একটা চাকরীও পেয়েছে খুকু । বড়োসড়ো চাকরী নয় , তবে চন্দ্রলতাদের মতো অভাবী সংসারে ঐ ঢের । যেদিন খুকুর চাকরীর খবরটা পেয়েছিল চন্দ্রলতা , জীবনে প্রথমবার বোধহয় অত আনন্দ হয়েছিল ।

কিন্তু কখনো চায়নি এমন জটিলতা আসুক খুকুর জীবনে । নিজের অতীত ওদের মা-মেয়ের জীবনটাকে আবার এমন অগোছালো করতে সামনে আসার কি দরকার ছিল !!!!! 

খুকু যেখানে চাকরী করে সেখানে নাকি অমন পরীক্ষে-নিরিক্ষে হামেসাই হয়ে থাকে । তাই বলে এই ঘটনাও ওখানেই আসতে হলো !!!!! নাকি এটাই বিধাতার ইচ্ছে !!!! তিনি তো সবার আড়ালে নিজের খেলা খেলেন , তাঁর খেলা বোঝার সাধ্যি কার !!!! তা নাহলে খুকুর মুখে কেন তার বাপের আদলই থাকবে । আর সে ছেলেকেও তো শুনছি নাকি দেখতে হয়েছে শ্যামল ঠাকুরপো মতো । এ বিধাতার খেলা ছাড়া আর কি বা হতে পারে !!!!

চলো মা এবার আমাদের নামতে হবে ।



খুকুর কথায় হুঁশ ফেরে চন্দ্রলতার । আগে কোনদিন শহরে আসেনি , জীবনে এই প্রথমবার শহরে আসছে মেয়ের হাত ধরে । খুকু গল্প করে শহরে নাকি মেলা গাড়িঘোড়া - মেলা মানুষজন , হুসহুস করে প্লেন ছোটে আকাশ দিয়ে , মাটির তলা দিয়ে নাকি রেলগাড়ি চলে । কেমন যেন ভয়ভয় করতে থাকে চন্দ্রলতার , শক্ত করে খুকুর হাতটা চেপে ধরে ।

স্টেশনে গিজগিজে মানুষের ভিড় । ভারি আশ্চর্য লাগে চন্দ্রলতার । তেইশ বছর ধরে তিনটে গাঁ দূরে থাকা বাপকে লুকিয়ে রাখলো মেয়ের থেকে , এই এতো মানুষের ভিড় থেকে সেই বাপের সন্ধান পেয়ে গেল খুকু !!!!

স্টেশন থেকে বেরিয়ে আবার বাসে চাপতে হয়েছে ।

খুকু বোধহয় বুঝতে পারছে চন্দ্রলতার বুকের ধুকপুকুনিটা ।

তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছো মা । তুমি এমন মুখ করে আছো যেন কোর্ট-থানা-পুলিশ করতে যাচ্ছো । আজ তোমার এতবছরের মিথ্যে অপবাদের গ্লানি থেকে মুক্তির দিন । জানো তো ডাঃ গাঙ্গুলি খুব ভালো মানুষ , উনি না থাকলে এতোকিছু আমি একা কোনমতেই করতে পারতাম না । তবু একটু সাহস দিতেই মায়ের হাতটা নিজের মুঠোয় ধরে খুকু ।

বিশাল একটা ঘর , চারদিকে কাচ দিয়ে ঘেরা আর ভারী ভারী পর্দা , ঠান্ডা মেশিন চলছে বলে হিমহিম ঠান্ডা চারদিকে । কাপড়ের আঁচলটা গায়ে টেনে নেয় চন্দ্রলতা । সারসার দিয়ে কতো গদিআঁটা চেয়ার , সামনে কাচের টেবিলে বইখাতা ছড়ানো ছিটানো । দু-তিনজন মানুষ বসে আছেন । কি ভীষণ চুপচাপ চারদিক । খুকু এইখানে কাজ করে !!!! কথাটা ভাবতেই চন্দ্রলতার বেশ গর্ব হয় খুকুর জন্য । চন্দ্রলতাকে বসিয়ে ভেতরে গেছে খুকু । বুকের মধ্যিখানটা নাকি পেটটা নাকি গলার কাছটা , সব জায়গাতেই যেন কেমন একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে । মনে হচ্ছে কিছুটা বমি হলে বোধহয় শান্তি হতো । 

ঘনশ্যাম আবার যে বিয়ে করেছ খবরটা চন্দ্রলতা অনেকদিন আগেই পেয়েছিল । এবার নাকি লেখাপড়া জানা বড়োলোকের মেয়েকে বৌ করেছিল । শেষ অবধি এতোবছর পর সেই বৌয়ের চরিত্র নিয়েও এমন টানাটানি উঠলো যে এতো পরীক্ষে-নিরিক্ষে করাতে হলো !!!! আর এক রাতের দুর্ঘটনাতে চন্দ্রলতা নষ্ট মেয়েমানুষ হয়ে গিয়েছিল সেদিন !!!!

শ্যামল ঠাকুরপোর চরিত্রটা মোটেও ভালো ঠেকতো না চন্দ্রলতার । দু-চারবার তার সাথেও ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল , বুদ্ধি করে এড়িয়ে গিয়েছিল চন্দ্রলতা । শাশুড়ির আদরের ভাইপো বলে শাশুড়িকে কিছু বলতে পারেনি কিন্তু ঘনশ্যামকে বলেছিল কথাটা ।

ওনারা ভেতরে আছেন , তুমি ভেতরে চলো মা ।

চমকে ওঠে চন্দ্রলতা , এতোবছর পর আবার মানুষগুলোর মুখোমুখি হতে হবে ? একটা ভয় , জমাট বাঁধা অস্বস্তি আর অসহ্য ঘৃণা যেন চন্দ্রলতার সারা মন জুড়ে । 

আমার না গেলেই কি নয় রে খুকু ?

কিচ্ছু হবে না , আমি তো তোমার সাথে আছি মা । আমার ওপর একটু ভরসা রাখো । তুমি এই পর্দার আড়াল থেকে পুরোটা দেখো এখন , আমি যখন ডাকব ভেতরে যাবে ।

ঘনশ্যামের চুলে পাক ধরেছে । শ্বশুরমশাই তো বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন , দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে তেজ আর নেই । শ্যামল ঠাকুরপোর ও সেই ডাকাবুকো চেহারা আর নেই । আর ঐ বছর কুড়ির ছেলেটাই কি তবে ঘনশ্যামের এপক্ষের ছেলে ? চন্দ্রলতার বিয়ের সময় শ্যামল ঠাকুরপোকে দেখতে যেমন ছিল , ঠিক তেমনটাই লাগছে দেখতে । এ যে শ্যামল ঠাকুরপোর ছেলে সে তো রাতের আঁধারে দেখেও বোঝা যাবে , এরজন্য আবার এতো ডাক্তারী পরীক্ষার কি আছে !!!! মুহুর্তে চন্দ্রলতার চোখ যেন যাচাই করে নেয় ঘনশ্যাম আর খুকুর মুখটাকে । একরকম কাঁচকাঁচ রং-লম্বা নাক আর ছোট ছোট চোখগুলো ।

খুকু বলেছিল বটে কি ডিএনএ না কি যেন পরীক্ষে হয়েছে । ডাক্তারি রিপোর্টে ঘনশ্যামের সাথে ওর ছেলের জিনের মিল পায়নি । উল্টে ছেলের জিন মিলেছে শ্যামল ঠাকুরপোর সাথে । শ্বশুরমশাই সেখানেই তম্বিহম্বি শুরু করে দিয়েছেন , ঘনশ্যাম মুখে একরাশ বিরক্তি আর ঘৃণা । শ্যামল ঠাকুরপো তখনো সাফাই গাইছে । সবথেকে অসহায় লাগছে ছেলেটাকে । ওর কাঁচুমাচু মুখখানা দেখে কষ্ট লাগছে চন্দ্রলতার । আহা রে , ও বেচারার কি দোষ !!!!

ডাক্তারবাবু কি সব বলছে ইংরাজীতে আর খুকু পাশে কম্পুটারে কি সব করছে ।

এখানে উত্তেজিত হয়ে চিৎকার চেঁচামিচি করবেন না । ডাক্তারবাবুর কথায় চুপ করে সবাই ।

আপনাদের কটা কথা বলবো চুপ করে শুনুন প্লিজ ।

আজ থেকে তেইশ বছর আগে এক অন্ধকার গ্রামের পথে এক মহিলা ধর্ষিতা হন । আপনারা নিশ্চই মানেন , যে ধর্ষিতা হয় তার কোনো অপরাধ থাকে না । সেটা তার জীবনের একটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিছুই না । অথচ কি আশ্চর্য দেখুন এই মেয়েটির মা ধর্ষিতা হয়েছিলেন বলে , ওর বাবা ওর মাকে ত্যাগ করেছিল ।

দেখুন তো একে আপনারা চেনেন কিনা । এর মুখটা কি একটুও চেনাচেনা লাগছে আপনাদের ?

এতক্ষণ ডাক্তারবাবুর কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছিল না কেউ । এতক্ষণ নিজেদের টেনশনে বোধহয় কেউ খেয়াল করেনি খুকুকে । কিন্তু খুকুকে দেখেই যেন চমকে ওঠে ঘনশ্যাম আর ওর বাবা । 

আপনারা চমকে উঠলেন তো !!!!

প্রথমদিন ঘনশ্যামবাবুকে দেখে ও ও ঠিক এভাবেই চমকে উঠেছিল । আমাকে বলেছিল ওর মায়ের জীবন কাহিনী । আর ওর কৌতুহলের নিরসন করতেই আমি ঘনশ্যামবাবু আর ওর ডিএনএ টেস্টটাও করেছি । আর এই দেখুন , কি অদ্ভুত ভাবে মিলে গেছে দুজনের রিপোর্ট ।

রিপোর্টটা হাতে নিয়ে চমকে ওঠে ঘনশ্যাম ।

যাও তোমার মাকে ভেতরে নিয়ে এসো , আশা করি ওনারা চিনতে পারবে ।

চন্দ্রলতাকে দেখে হতবাক ঘনশ্যাম আর শ্বশুরমশাই দুজনেই । 

এতোবছর পর এই পরিস্থিতিতে কারোরই যেন কোনো কথা বলার ক্ষমতা নেই । কি অসহায় ভাবে চন্দ্রলতার দিকে তাকিয়ে ঘনশ্যাম । 

আমার ভুল হয়েছে , ঘরে ফিরে চলো বৌমা । নীরবতা ভেঙে প্রথম কথাটা শ্বশুরমশায়ই বললেন । এই মানুষটাই একদিন নষ্ট মেয়েমানুষ 'চন্দ্রলতা'কে ঘরে তুলতে অস্বীকার করেছিল ।

খুকুর হাতটা চেপে ধরেন উনি , ক্ষমা করে দে দিদিভাই । তোর নিজের বাড়িতে চল্ এবার । ও কুলাঙ্গারের ছেলে জাহান্নামে যাক , সে নচ্ছাড় মেয়েমানুষকেও আজ বাড়ি থেকে লাথি মেরে বের করে দেবো । আমার যা কিছু সব তো তোর দিদিভাই । তুই যে আমার ঘনার মেয়ে ....

আরো কিছু বলতেন হয়তো উনি , তার আগেই হাত ছাড়িয়ে নেয় খুকু । 

আমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার তো কিছু নেই , অন্যায় তো করেছেন আমার মায়ের সাথে । ক্ষমা চাইতে হলে তার কাছে চান । অবশ্য ক্ষমা করবেন কি না সেটা মায়ের ইচ্ছা ।

আর সম্পত্তির লোভে আমি আমার পিতৃপরিচয় খুঁজে বের করিনি । আমি আমার মায়ের পরিচয়ে বড়ো হয়েছি আর মায়ের পরিচয়েই বেঁচে থাকব । আমি শুধু মাকে দেওয়া মিথ্যা অপবাদটুকু মুছতে চেয়েছিলাম ।

আমার মা গঙ্গার মতো পবিত্র , নোংরা স্পর্শে আমার মা নষ্ট হয়না ।

অমন সুন্দর করে কথা বলছে তার সেই ছোট্ট খুকু !!!! খুকু কবে এতো বড়ো হয়ে গেছে যেন জানতেও পারেনি চন্দ্রলতা ।

চলো মা এবার আমাদের ফিরতে হবে । 

মেয়ের হাত ধরে বেরিয়ে আসছে চন্দ্রলতা । উফ্ কি শান্তি সারা বুকটাতে । এত বছর মিথ্যা অপবাদটা বইতে বইতে সত্যি যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল চন্দ্রলতা ।

চন্দ্র.......

বহুবছর পর পিছন থেকে ডাকটা শুনে থমকে দাঁড়ায় । 

কিছু কি বলতে চায় মানুষটা ?

তেইশ বছর আগে সেদিন তো কিচ্ছু বলেনি !!!! সবটুকু তো তার চোখের সামনে ঘটেছিল , তবু তো সে কাছে টেনে নিতে পারেনি চন্দ্রলতাকে !!!! ক্ষণিকের আবেগটা তিত্কুটে ঘৃণায় পরিণত হয়ে যায় ।

খুকু একটু দূরে দাঁড়িয়ে । হয়তো ভাবছে কিছু কথা হয়তো এখনো বাকি আছে ঐ দুটো মানুষের । ঘনশ্যামের সাথে সব কথা সেই তেইশ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে চন্দ্রলতার ।

চন্দ্রলতা এগিয়ে গিয়ে মেয়ের হাতটা ধরে , কি রে লাস্ট ট্রেনটাও ফেল করবি নাকি !!!!!!


Comments
0 Comments

-

সুচিন্তিত মতামত দিন

 

অডিও / ভিডিও

Search This Blog

Support : FACEBOOK PAGE.

সার্বিক অলঙ্করণে : প্রিয়দীপ ,আহ্বায়ক : দেবজিত সাহা

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

Powered by Blogger.