মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

শ্রীশুভ্র

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ | |
Views:
ডেঙ্গি দিয়ে যায় চেনা
ডেঙ্গি! না ডেঙ্গি নয়। অজানা জ্বর। কথায় বলে গোলাপকে যে নামেই ডাকো গোলাপ গোলাপই। তেমনই ডেঙ্গিই হোক আর অজানা জ্বরই হোক, তাতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। রাজ্যের এই মৃত্যুমিছিলে কে কখন সমিল হবে, কেউ জানে না। মিছিল কিন্তু প্রতিদিন লম্বা থেকে লম্বাতর হচ্ছে। রাজ্যে ডেঙ্গি এখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। কথায় বলে চোখ বন্ধ করে থাকলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। এদিকে তর্ক চলছে, মানুষ কিসে মারা যাচ্ছে ডেঙ্গিতে না কি অজানা জ্বরে? তাই নিয়েই সরকার আর বিরোধীদের চাপানউতোর। ওদিকে রাজ্যব্যাপি ছড়িয়ে পড়ছে জ্বরের ভাইরাস। বিরোধীদের অভিযোগ সরকার ডেঙ্গি মোকাবিলায় ব্যর্থ। তাই মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে দেখাচ্ছে। সরকার বলতে চাইছে, এসব বিরোধীদের অপপ্রচার। সম্প্রতি সরকারের তরফে আদালতে জানানো হয়েছে, পুজোর ছুটিতে রাজ্যবাসীর একাংশ ভ্রমণে গিয়ে ভিন রাজ্য থেকে ডেঙ্গির ভাইরাস নিয়ে ফিরে এসেই এই বিপত্তি বাধিয়েছে। ডেঙ্গিতে মৃত অধিকাংশের পরিজন সংবাদ মাধ্যমে জানাচ্ছেন, না পুজোর ছুটিতে তারা রাজ্যের বাইরে জাননি কোথাও। অর্থাৎ বিতর্ক সর্বত্র। বিতর্ক সব কিছু নিয়েই। বিতর্কের একদিকে রাজ্যসরকার। মা মাটি মানুষের সরকার। অপর দিকে বাকি সব। মাঝখানে কার্যত ভেঙ্গে পড়া স্বাস্থ্য পরিসেবা। ভেঙ্গে পড়া এই কারণেই যে রুগীর তুলনায় অপ্রতুল হাসপাতাল ওষুধ চিকিৎসক ও দিশেহারা পরিসেবা। পরিসেবা কতটা দিশেহারা সেটি রুগীর আত্মীয় পরিজন মাত্রেই জানেন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনগুলি থেকেও সামগ্রিক চিত্রের একটি সুস্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়। ফলে বিষয়টি সম্বন্ধে অধিকাংশ রাজ্যবাসীর মনেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে স্বাভাবিক কারণেই। আর এইখানেই সরকারে আপত্তি। তাদের দাবি, বিরোধীদের অপপ্রচারের কারণেই ছড়াচ্ছে অহেতুক আতঙ্ক। কিন্তু সত্যই কি তাই? সরকারী বেসরকারী হাসপাতালগুলির সাম্প্রতিক চিত্র কি সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে না? 

ভিন্ন কথা যে বলছে, সেটা বুঝতে খুব বেশি বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো সরকারের ভুমিকা নিয়েই। ডেঙ্গি নিয়ে কেন এতো লুকোচুরি? সরকারী হাসপাতালে অনেক সময়েই ডাক্তাররা মৃত্যুর কারণ হিসাবে ডেঙ্গি লিখতেই ভয় পাচ্ছেন। কেন এই আতঙ্ক? সরকারের রোষানলে পড়ার সম্ভাবনাই কি এই ভয়ের উৎপত্তির কারণ?  ডেঙ্গি একটি মশা বাহিত রোগ। আবহাওয়ার খামখেয়ালীতে তার বাড়বাড়ন্ত। তার উপর কোন সরকারেরই হাত থাকে না। তাহলে ডেঙ্গিতে মৃত্যুর এই বাস্তব পরিস্থিতিকে অস্বীকার করার জন্যে সরকারের এই রকম তৎপরতার কারণই বা কি? সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যাচ্ছে, গত বছরে এই সময়ে এই ডেঙ্গিতেই রাজ্যে মৃত্যু ঘটেছিল পঁয়তাল্লিশ জন রুগীর। যেটা সংখ্যার বিচারে সারা ভারতে প্রথমস্থান অর্জন করেছিল। তবে কি এই তথ্যটুকুই রাজ্যসরকারকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে? গোটা ভারতে ডেঙ্গিতে এক নম্বর হওয়ার এই আতঙ্ক থেকেই কি এতো লুকোচরি? পরপর দুই বছরই এক নম্বর হওয়ার লজ্জার হাত থেকে বাঁচার মরিয়া প্রচেষ্টাতেই কি এতটা আতঙ্কগ্রস্ত রাজ্যসরকার?

যদি সেটিই কারণ হয়, তবে মন্দ কি? খুব একটা অস্বাভাবিকও নয় সেটা। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে ডেঙ্গি মোকাবিলায় রাজ্যসরকারের তো আরও বেশি করে তৎপর হয়ে ওঠাই স্বাভাবিক ছিল। তাই না? বিশেষ করে গত বছরে ডেঙ্গিতে পঁয়তাল্লিশ জনের মৃত্যুর পরে এবার সারা বছর ধরে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া থাকলে ডেঙ্গি মোকাবিলায় সরকারকে এইরকম দিশাহারা দেখাতো না। পরিবেশগত কারণে মশা জন্মাবে। মশায় ডেঙ্গি ম্যালেরিয়া ইত্যাদি মারণ ভাইরাসও দেখা দেবে। কিন্তু একবিংশ শতকে এসে ডেঙ্গি মোকাবিলায় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত একটি সরকার জনগণের সাথে লুকোচুরি খেলবে, এটা প্রত্যাশিত নয় আদৌ। প্রথমাবধি সরকারের তরফে ডেঙ্গিতে  হওয়া মৃত্যুগুলি অজানা জ্বরে মৃত্যু বলে প্রচারের চেষ্টা। মৃত্যুর কারণ ডেঙ্গিই হোক আর অজানা জ্বরই হোক, সেই মৃত্যু যখন প্রতিদিন পালা করে ঘটতে শুরু করে তখন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময়। সরকারের তরফে তার বদলে ডেঙ্গি কি ডেঙ্গি নয় এই বিতর্কেই বেশি তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। তারপরেও সরকারের তরফেই আদলতে জানানো হল, পুজোর ছুটিতে ভিন রাজ্যে বেড়াতে গিয়ে রাজ্যবাসীর একাংশই নাকি ডেঙ্গির এই মারণ ভাইরাস রাজ্যে নিয়ে এসেছে। রাজ্যের আন্তর্জাতিক সীমান্ত দিয়েও নাকি ডেঙ্গির ভাইরাস রাজ্যে ঢুকছে। সুখের কথা, সেই কারণ দেখিয়ে এখন অব্দি বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের কর্মতৎপরতার বিষয়ে কোন প্রশ্ন তোলা হয় নি। এরই সাথে শোনা যাচ্ছে সরকারী হাসপাতালে ডেঙ্গিতে মৃত্যু হওয়া রুগীর ডেথ সার্টিফিকেটে ডেঙ্গির উল্লেখ করার বিষয়ে নাকি নানাবিধ অলিখিত বিধিনিষেধ রয়েছে। এইসব ঘটনাই ভাবতে বাধ্য করে ডেঙ্গি পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সরকার কতখানি দিশাহারা।

ভারতবর্ষে বা পশ্চিমবাংলায় মশা বাহিত ভাইরাসের রমরমা আজকের ঘটনা নয়। এক সময়ে গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে যেত ম্যালেরিয়ায়। কিন্তু সে ছিল ব্রিটিশ আমল। পরাধীন দেশ। আজ স্বাধীনতার সাতটি দশক পেরিয়ে এসে সমান্য মশার মোকাবিলায় স্বাধীন দেশের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার উভয়ই সমান ভাবে অপদার্থতার প্রমাণ দিয়ে বছরের পর বছর ব্যর্থতার খতিয়ান জমিয়ে তুলবে; সেটা কিন্তু কোনভাবেই প্রত্যাশিত নয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় ঠিক সেটিই ঘটছে। প্রথম কথা মশা নিধনে সারা বছর ব্যাপি প্রয়োজনীয় সকলরকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করার কার্যকরি সরকারী পরিকল্পনা থাকা উচিৎ ছিল। এবং এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার উভয়েরই দায়িত্ব। কিন্তু সেইদিকে কারুর খেয়াল নাই। মশাবাহিত নানান ধরণের ভাইরাস নিয়ে গবেষণায় যথেষ্ট পরিমাণে সরকারী উদ্যোগের প্রয়োজন। এবং সেই বিষয়ে বেসরকারী উদ্যোগকেও উৎসাহ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরী। আরও জরুরী, উন্নত বিশ্বে এই ধরণের ভাইরাস মোকাবিলায় কি ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, সেই বিষয়েও যথেষ্ঠ পরিমাণে কার্যকরি খোঁজখবর নেওয়া। আমাদের দূর্ভাগ্য আমাদের দেশে কোন সরকারই সেই সব নিয়ে ততটা ব্যস্ত থাকে না, যতটা ব্যস্ত থাকে লোকসভা আর বিধানসভায় মোট আসনের হিসাব নিকাশ নিয়ে। যে রাজ্যে প্রতিবছর মশা বাহিত ভাইরাসের তাণ্ডব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই রাজ্যে চিকিৎসা পরিকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে আরও তৎপর হওয়া কি উচিৎ ছিল না? শুধু তাই নয় রাজ্যের প্রতিটি পুরসভা পঞ্চায়েতকে নিজ নিজ এলাকায় আরও বেশি তৎপরতার সাথে পরিবেশ সুরক্ষার কাজে দায়িত্বশীল করে তোলাও উচিৎ ছিল। কিন্তু পুরসভা ও পঞ্চায়তগুলির পরিকাঠামোই হয়তো উপযুক্ত নয়। আবার যেটুকুও বা পরিকাঠামো রয়েছে, সেটুকুও যে পুরোপুরি কাজ করছে ঠিকমত সেটিও বোধহয় দেখার কেউ নাই। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। এরই সঙ্গে রয়েছে জনগণের সার্বিক সচেতনতার অভাব। আমরা ধরেই নিই সব দায়িত্ব সরকারে। আমাদের কোনই দায়িত্ব নাই। পরিবেশ সুস্থ রাখা পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সাধারণ জনগণেরও যে একটা ন্যূনতম দায়িত্ব রয়ে যায়, সেকথা মনে করার শিক্ষাই নাই আমাদের। 

ফলে সবকিছু মিলিয়ে আজ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পৌঁছিয়ে গিয়েছি আমরা। সবকিছুতেই রাজনৈতিক সুবিধা আর ক্ষমতার ফয়দা তোলার মানসিকতায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী সমর্থকদের মধ্যে একটি অলিখিত প্রতিযোগিতায় বাকি সব দায়িত্ব ও কর্তব্যই গৌন হয়ে পড়েছে। এটাই এই রাজ্যের বর্তমান চরিত্র। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের দিকে আঙুল তুলতে ব্যস্ত। কিন্তু কারুর চেতনাতেই রাজ্যের সামগ্রিক স্বার্থের বিষয়টি মুখ্য হয় ধরা পরে না। বিরোধী দলগুলির নজর যে কোন পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারকে কতটা কোনঠাসা করে কত শতাংশ ভোট ভাঙিয়ে নেওয়া যাবে। সরকারের লক্ষ্য মানুষকে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্বন্ধে অন্ধকারে রেখে পরবর্তী নির্বাচনে কি করে আরও বিপুল ভোটে ক্ষমতার মধু খেতে ফিরে আসা যাবে। আমাদের দুর্ভাগ্য এই রাজনৈতিক দলগুলি ও তাদের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের বাইরে সাধারণ মানুষের জন্যে আর কোন পরিসরই নাই। ফলে দেশের প্রকৃত উন্নতি, যে উন্নতি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের মানের উন্নতি ঘটাতে পারে সে বিষয়ে তৃতীয় কোন বিকল্প পথ খোলা নাই। আর সেই কারণেই সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দলগুলির বদান্যতার উপরেই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর নিয়তি ঠিক করে দিতে চাইছে ডেঙ্গি ম্যালেরিয়া ইত্যাদি নানান রকমের ভাইরাস। 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-