মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

শাশ্বতী সরকার

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
অমরত্ত্বের খোঁজে
সারা ফেসবুক জুড়ে একটা ভাইরাল ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে এক কুখ্যাত দুষ্কৃতি পথচলতি এক মহিলাকে ঢাল করে ঘিরে ধরা পুলিশের থেকে নিজেকে বাঁচাতে চাইছে। হাতে তার অতি আধুনিক অস্ত্র এবং মহিলা প্রাণপণে তার কবল থেকে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে। টানটান উত্তেজনা। সি সি টিভির ফুটেজে দেখা যাচ্ছে খুব সন্তর্পণে দেওয়াল ঘেঁষে একজন মানুষ অবিকল বাঘ যেমন নিঃশব্দ পায়ে যে ভঙ্গিতে শিকারের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সেভাবে এগোচ্ছে, তারপর আচমকা ছুটে গিয়ে সামনে থেকে দুষ্কৃতিকে ঢাক্কা দিয়ে পেছনে ফেলে দিলে মহিলা ছাড়া পেয়েই দৌড় দেয়। দুষ্কৃতি সঙ্গে সঙ্গে উঠে পাঁচ রাউন্ড গুলি একেবারে সামনাসসামনি সেই মানুষটির বুক লক্ষ্য করে ছোঁড়ে এব্বং দেহ ভেদ করে এ ফোঁড় ও ফোঁড় হয়ে বেরিয়ে যায়।এই অবসরে পুলিশ আরও একটু কাছাকাছি এগিয়ে আসে এবং ওই মানুষটিও যেন কিছুই হয় নি এভাবে ঠেলতে ঠেলতে দুষ্কৃতিকে পুলিশের দিকে নিয়ে যায়। দুষ্কৃতি পুলিশের একেবারে কব্জার মধ্যে চলে আসে এবং পুলিশের গুলিতে সিঁড়ির ওপর লুটিয়ে পড়ে। মানুষটি সেদিকে তাকিয়ে তারপর সামনের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে হঠাৎ-ই আরও ঋজু টানটান বুক করে দাঁড়ায়, মুখে হাল্কা হাসির ছাপ লেগে,জামা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।তারপর পিছন ফিরে সামান্য একটু গিয়ে রাস্তায় যেখানে বসে থাকত সেখানেই টলতে টলতে বসে পড়ে। দুষ্কৃতিকে সামলে পুলিশের দু-একজন যখন সেই মানুষটির কাছে যায় তখন সব শেষ।

(২)

এক নিম্নবিত্ত পরিবারের চতুর্থ সন্তান বিকি। মা-বাবার মধ্যে টাকাপয়সা নিয়ে নিত্য অশান্তি লেগেই আছে। বাবার কথায় কথায় মাকে তড়পানো,মার ওপর অত্যাচার নিত্যদিনের ছবি। অন্ততঃ পাঁচবার মা আত্মহত্যা করতে গিয়েও বা করার ভয় দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত করতে পারে নি, ছোট হলেও বিকি ভাল করেই বোঝে ওদের ভাইবোনদের কথা ভেবেই মা আত্মহত্যাটুকুও করতে পারে না, পিছিয়ে আসে। ক্রমে ক্রমে ছোট বয়স থেকেই মার বিষাদ তার মধ্যেও সঞ্চারিত হতে থাকে এবং নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয় কিন্তু সেও ওই একই কারণে অর্থাৎ মার কারণে পারে না। এভাবেই চলতে থাকে জীবন।

ক্রমে ক্রমে বিকি কিশোর হয়, কিশোর থেকে তরুণ। দিনের মধ্যে পুরোটাই বলতে গেলে বিকি দিবাস্বপ্নে কাটায়। অজস্র বিষয়ে তার প্রেম। কখনো মনে হয় সে যদি গায়ক হত! চোখ বুজে চিন্তা করতে থাকে বাজনদার ভর্তি স্টেজে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সে হল কাঁপিয়ে দিচ্ছে। উচ্ছ্বসিত জনতা তার হাতের ইশারায় তার সুরে সুর মেলাচ্ছে, নাচছে। গানের শেষে হল ফাটানো হাততালি পড়ছে। কখনো তার মনে হয় যদি সিনেমার নায়ক হত! বিকি আবার কল্পনা করতে থাকে, নায়কের নাম তো বিকি হতে পারে না। কি নাম নেওয়া যায়? হ্যাঁ, কুমার বিক্রম। চিরকুমার থাকবে সে, কোনদিন বুড়ো হবে না। আর সেইরকম সিনেমার নায়কদের মত পেটানো চেহারা, অমিত বিক্রম, সমস্ত রকম ভিলেনকে একা হাতেই সে কুপোকাৎ করে দিতে পারে। রোজ রোজ সে শোনে ধর্ষণের কথা, বীভৎস রকম তার বর্ণণা।এই তো দুর্গাপুজোর কদিন আগেই রাস্তায় মার কোলে শুয়ে থাকা বালিকাকে মাঝরাতে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে চারটে ধেড়ে মাতাল অত্যাচার করে, খুন করে নর্দমার পাঁকে ফেলে দেয়। কাকে ফেলে দেয়? ভেসে উঠল দুর্গাষ্টমীর দিন পুজোর প্যান্ডেলে দেখা কুমারী পুজোর সেই মেয়েটির মুখ। মনে পড়ে গেল বাবার কথা, বাবাও তো ধর্ষকই। রোজ রোজ মাকে একটা চোরা পাঁকের মধ্যে ডুবিয়ে মাথা চেপে ধরে যাতে উঠে আসতে না পারে, দম নিতে না পারে। মাথায় আগুন চেপে যায়। সব মেয়েরা পুরুষদের দোষ দেয়, ঘেন্নার চোখে তাকায়। মনে হয় দেশে একটাও সত্যিকারের পুরুষ নেই। একটা স্বপ্নের মত সিনেমার নায়ক হবে সে, প্রতিটা ধর্ষককে ধরে ধরে নিজের হাতে শেষ করবে। দেখিয়ে দেবে পুরষ কাকে বলে! তারপর ভালবেসে বিয়ে করবে নায়িকাকে। বাবার মত স্বামী নয়, প্রেমিক বন্ধু।তার ভাবী সন্তানের মা, তার ফুলের মত ভালবাসার ধনকে সে সব দিক দিয়ে আগলে রাখবে। মেয়েদের ছোট করার যত নিয়ম সমাজ বানিয়েছে সমস্ত নিয়ম পালটে দেবে সে। 

এক একটা সময় এক-একটা বিষয়ের প্রেমে ডুবে যেতে থাকে বিকি। কিছু একটা করতে হবে, এমন একটা কিছু যাতে সারা পৃথিবী তাকে মনে রাখে। না না না - কোন সাধারণ মানুষ হওয়ার জন্য জন্ম হয়নি তার। পেটের ভাত জোগাড়ের জন্য কাজ করলাম, বিয়ে করলাম, ছেলেমেয়ের বাপ হলাম, বুড়ো হলাম, মরে গেলাম। মরে গেলাম তো গেলামই - গরু, ছাগল, পিঁপড়ের মত পৃথিবী থেকেই মুছে গেলাম। কিছুতেই নয়, কিছুতেই নয়। আমাকে অমর হতে হবে, এমন কিছু করতে হবে যাতে সারা পৃথিবী মনে রাখে মরার পরেও। কিন্ত কোন্‌ সে পথ? কি করা যায়? ওহ্‌ ভগবান! মাথা চেপে ধরে চোখ বুজে বসে পড়ে বিকি। বড় কষ্ট, বড় কষ্ট মাথায়। তার যে কিছু নেই, কিচ্ছু নেই। না আছে ডিগ্রী, না টাকা-পয়সা, না চেহারা। আস্তে আস্তে বিকি পাগল হয়ে যেতে থাকে। সারাদিন শুয়ে থাকে, কাজ করতে বললে কাজ করে না, খেতে বললে খায় না, দশবার সাধতে হয় তবে উঠে খায়। খোদার খাসি ছেলেকে বাবা শেষ পর্যন্ত বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসা করার পয়সা তার নেই।

(৩)

এখন সে বিকি পাগলা, ভবঘুরে এক উন্মাদ। সারাদিন জঞ্জাল ঘেঁটে ঘেঁটে কি যেন কি খুঁজে বেড়ায়। খুঁজে বেড়ায় এক পরশপাথর, যার ছোঁওয়ায় একদিন সে অমর হয়ে উঠবে। 







Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-