মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

রুমকি রায় দত্ত

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
রুমকি রায় দত্ত
মুন্সিয়ারীর পথে...

রাত পেরিয়ে ভোর নামলো। ভোরবেলায় কম্বলের উষ্ণ আবেশ ছেড়ে উঠতে কার ভালো লাগে বলুনতো। তবু উঠতেই হয়। ১৮ই ফেব্রুয়ারী সকাল। আমাদের সারাদিনটা কেটে যাবে গাড়িতে। গন্তব্য মুন্সিয়ারী, সেই আনন্দেই দীর্ঘপথ যাত্রার কষ্টের কথা যেন মাথা থেকেই বেরিয়ে গিয়েছে। ঠিক সকাল ৯ঃ৩০, আমাদের গাড়ি এগিয়ে চললো মুন্সিয়ারীর পথে। ডানদিকে পাহাড় আর বামদিকে খাদের গায়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি সবুজ গাছ। সবুজ শাড়িতে পাহাড়ি কন্যা, মাথায় লাল রডোডেন্ড্রন আর গলায় মুক্তার মালার মত দূর থেকে দেখা যাচ্ছে ঝকঝকে পঞ্চচুল্লি। এই প্রথম পঞ্চচুল্লির সাথে আমাদের দেখা। শুনেছি মুন্সিয়ারী থেকে পঞ্চচুল্লি সব থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। ঘন্টাখানেকের পথ পেরিয়ে একটা চায়ের দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো গাড়ি। ঝরঝরে একটা উন্মুক্ত পরিবেশে মিনিট দশেক কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে স্বচ্ছ সবুজ ক্ষীণ জলরেখা। নদী তোর নাম কি? উওর এলো ‘সরযূ’। না উত্তটা নদী নয়, দেওয়ানজি দিলেন। নদীর বুকে গড়ে ওঠা বাঁধে দাঁড়িয়ে দেখলাম সুতোর মত সবুজ জলরেখা বয়ে চলেছে আর দু’পাড়ে পড়ে আছে ছোটো ছোটো নুড়ি। 

ছুটে চলেছে গাড়ি, ছুটছে জীবন আর ছুটছে নদী। পথের বাঁকে খুঁজে পেলাম এক নতুন নদী “রামগঙ্গা”। ঝকঝকে সবুজ জলধারা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে তার নিজের ছন্দে, কোথাও সে প্রায় রাস্তার সমতলে আবার কোথাও পাহাড়ি পথ থেকে নিচে তাকিয়ে তাকে দেখতে হয়। মনেহয় পাড়ে বসে কিছুটা সময় কাটাতে। কিন্তু যাবার পথে আমাদের হাতে সময় ভীষণ কম। সন্ধ্যের আগে পৌঁছাতে হবে মুন্সিয়ারী। দেওয়ানজি জানালেন এই পথেই ফিরবো আমরা। ঠিক করলাম তখনই না হয় আলাপ হবে নদীর সাথে। সরু কালো রাস্তা আর একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। মুদি দোকান, জামাকাপড়ের দোকান, আমাদের মত পথিকদের উদরের কথা ভেবেই হয়তো গড়ে উঠেছে ছোট্ট খাবারের হোটেল। একটা ছোট্ট গ্রামের জমজমাটি ছোট্ট বাজার। জায়গাটার নাম “থল”। থল থেকে মুন্সিয়ারী বেশি দূর নয়। ৩৫ থেকে ৪০ কিমি হবে। সমতলে এইপথ পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়, কিন্তু পাহাড়ি পথে এই পথই যেতে সময় লাগে প্রায় ঘন্টা তিনেক। থল ছেড়ে আরো উপরে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে ছুটে চলেছি। কিভাবে যেন পৌঁছে যাচ্ছি এক পাহাড়ের থেকে আরেক পাহাড়ে। ফেলে আসা পথের রেখা শুয়ে আছে নিশ্চুপে। যত উপরে উঠছি পথ তত ভয়ঙ্কর হচ্ছে। একটা উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় পড়ে থাকা বোবা পথের বুকের উপর শুধু আমরা, এতটাই নিঃসঙ্গ সে পথ। পথ বলতে ভাঙা নুড়ি ছড়িয়ে আছে,ধুলো রঙের পথ। একটা ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ পেরোতে পেরোতে দেখলাম বিয়ের আসর। নবদম্পতিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে গুটিকয় আত্মীয়। গ্রাম ছাড়িয়ে কিছুটা এগোতেই রাস্তা আরোও খারাপ। প্রকৃতিও বেশ রুক্ষ এখানে। আকাশে বাতাসে কেমন যেন একটা বিষাদের সুর। একটা গ্রাম, একা পড়ে আছে ধ্বংসের স্মৃতি বুকে নিয়ে। “গিরগাঁও” একসময় এই গ্রামেই ঘুরে বেড়াতো অজস্র প্রাণ,কিন্তু আজ গ্রামবাসীর আর্তচিংকার বুকে জেগে আছে গিরগাঁও। কি ঘটেছিল সেই রাতে? সালটা ২০০৯,তখন পাহাড়ি সন্ধ্যে। গিরগাঁওয়ের পাহাড়ের খাঁজে জোনাকির মত জেগে আছে টিমটিমে আলো। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে নিজের প্রিয় বিছানায়। হঠাৎ পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে আসতে শুরু করলো ঘোলাটে জলের ধারা। গাছ,পাথার, ঘর-বাড়ি, পিঁপড়ের মত ভেসে গেল গিরগাঁওয়ের ৩৯জন ঘুমন্ত মানুষ। পাহাড়ি হড়পা বান নিমেষে নিশ্চিহ্ন করে দিল একটা গোটা গ্রাম। গ্রামে ঢোকার মুখেই দেখলাম নিখোঁজ ও মৃত ব্যক্তির স্মৃতির স্মরণে লেখা আছে ৩৯ জনের নাম। পাহাড়ের খাঁজে ধ্বংসের চিহ্ন হয়ে রয়ে গিয়েছে কোনো বাড়ির সিঁড়ির তিনটে ধাপ। ঘড়িতে প্রায় পৌনে চারটে তখন। উচ্চতার কারণে বেশ ঠান্ডা অনুভব হচ্ছে। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সর্বোচ্চস্থান “কালামুণি টপ”। কিন্তু পৌনে চারটেতেই কেমন যেন হালকা আঁধার নেমে আসছে। পথ তখনো কিছুটা বাঁকি। এসে পৌঁছালাম কে.এম.ভি.এন এর হোটেলার সামনে। আর ৩ কিমি পথ এগোলেই আমরা পৌঁছে যাবো কালামুণি টপ। ওখান থেকে দুই কি.মি নিচের দিকে নামলেই মুন্সিয়ারী। আবার গাড়ি এগিয়ে চললো। তখন আমরা ৭৫০০ ফুট উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছি। কে.এম.ভি.এন এর হোটেল ছাড়িয়ে কিছুটা যেতেই আমরা বরফের রাজ্যে প্রবেশ করলাম। রাস্তা বলতে বরফের গায়ে চাকার দাগ। একপাশে পুরু বরফের পাহাড় আর ডানদিকে গাড়ির চাকা থেকে হাত দেড়েক দূরেই নেমে গিয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট গভীর খাদ। বাইরে ক্রমশ কালো হয়ে আসতে
লাগলো, ঠান্ডার কামড়ও তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগলো। গায়ের একটা সোয়াটার এতক্ষণের জন্য যথেষ্ট ছিল,কিন্তু আর কিছু যে জড়াবো সে উপায় নেই। বাকি সবকিছু ব্যাগের ভিতর গাড়ির ডিকিতে। দেখলাম বাঁদিকের বরফ ধীরে ধীরে রঙীন হয়ে উঠছে বিশাল পাহাড়ের চূড়াটার কোলে গোল রঙীন আগুনের গোলাটা ধীরে ধীরে লুকিয়ে যাচ্ছে। এতকাছে যেন মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। পাহাড়ি পথে কিছুদূর অন্তর অন্তর একটু করে প্রসারিত অংশ থাকে পথ চলতি গাড়ি দাঁড়ানোর বা ব্যাক করার জন্য। এমনই একটা অংশে এসে গাড়ি দাঁড় করলেন দেওয়ানজি। আমরা নামলাম গাড়ি থেকে। তীব্র ঠাণ্ডায় হাড় কাঁপতে লাগলো। কালামুণি টপ তখনও ২ ক.মি. দূরে। আমরা বুঁদ হয়ে দেখতে লাগলাম স্বর্গীয় সে সূর্যাস্তের দৃশ্য। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে টুকরো টুকরো রঙীন মেঘ। কেউ হলুদ,কেউ নীল, কেও কমলা আবার কেউ বেগুনী। মেঘের নীচে চাপা পড়া ডুবন্ত সূর্যের সোনালী আলোর ছটা বরফের গায়ে আছড়ে পড়ছে। দেখতে দেখতে সন্ধ্যে নেমে এলো। দেওয়ানজি জানালেন, আমাদের ঠিক ওই মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে আর এগোবো কিনা। কিছু আগেই আমরা পিছনে ফেলে এসেছি “রাতাপানি” নামে একটা গ্রাম। সামনের পথ বেশ দুর্গম। এর পর কালামুণি পর্যন্ত গাড়ি ঘুরানোর কোনো জায়গা নেই সুতরাং আমাদের সামনে দুটো পথ হয় এগিয়ে যেতে হবে , না হলে এখান থেকেই পিছিয়ে ফেলে আসা পথে ছুটতে হবে। মুন্সিয়ারী যাওয়ার পথ যদি বরফে ঢাকা থাকে তবে এই ঠান্ডায় নির্জন জনমানবহীন রাস্তায় গাড়িতেই কাটাতে হবে রাত। চারদিকের বরফে ঘেরা থমথমে পরিবেশ দেখে আর এগোনোর সাহস হলো না। ফেলে আসা পথের দিকেই ঘুরে গেল গাড়ির মুখ। চারপাশ গাঢ় অন্ধকার শুধু গাড়ির আলোয় সরু রাস্তাটাকে আরো ভয়ঙ্কর আর দুর্গম মনে হচ্ছে। আমারা ফিরে চলেছি কে.এম.ভি.এন এর হোটেলের দিকে দুরুদুরু বুকে,যদি ঘর খালি না থাকে! যখন হোটেলে পৌঁছালাম, ঘড়িতে তখন সাড়ে সাতটা বাজে। রাতের আশ্রয় নিশ্চিত হতেই মন জুড়ে নেমে এলো একরাশ হতাশা। এত কষ্ট করেও মুন্সিয়ারী আর পৌঁছাতে পারলাম না! অধরাই রয়ে গেল স্বর্গরাজ্য। প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে এই হতভাগ্য অতিথিদের জন্য রাতের খাবারে জুটলো রুটি আর আলু-কপি। 

ভোরের দিকে অন্ধকার থাকতেই উঠে পড়লাম। প্রকৃতি তখনও জাগে নি। হোটেলের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম সামনের দিকে। এই অঞ্চলটা বেশ পাথুরে। সবুজ প্রায় নেই বললেই চলে। সামনে দাঁড়িয়ে বিরাট দৈত্য আকারের পাহাড়। দুই পাহাড়ের মাঝখানের আকাশটা বেশ মায়াবী নীল হয়ে উঠছে। নতুন দিনের সূচনা হতে চলেছে। রাস্তার সমতলে পাহাড়ের গায়ে দু’একটি বাড়ির ছাদ, সামনে বাগানে বাঁধাকপির চাষ করেছেন গৃহকর্তা। সূর্যের দেখা মিলতেই ফিরে এলাম হোটেলে। হোটেলের ঠিক পিছনেই গায়ে লাগা পাহাড়টা থেকে ভেসে আসছে গমগমে আওয়াজ। ঝর্ণার শব্দ নাম তার “বিরথী”। সকাল সকাল স্নান সেরে বেরিয়ে পড়লাম বিরথীর দর্শনে। বেশি দূর নয়। হোটেলের বামদিকে একদম গায়ে লাগা একটা রাস্তা সোজা চলে গিয়েছে বিরিথীর দিকে। সুন্দর মনোরম পরিবেশ। বড় বড় পাথরের ফাঁকে মাথা ছোটো ঝাঁউগাছ। তার মাঝ দিয়ে উঠে গিয়েছে সিঁড়ি। প্রায় ৫০টা সিঁড়ি দিয়ে উপরে পৌঁছে দেখলাম বিরথী নামের ঝরণাটি আপন ছন্দে ঝরে পড়ে চুমু খাচ্ছে পাথুরে মাটিতে। গড়িয়ে পড়া জলের গায়ে সূর্যরশ্মির ছটা সৃষ্টি করেছে রামধনুরং। একটা ভাঙাচোরা পাথুরে বেদির উপর বসে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে নামতে থাকা নিচে। একটা ছোট্ট পাহাড়ি বাড়ি নজরে এলো, দেখলাম দুজন মহিলা উঠোনে বসে। ঘরের দেওয়াল গুলো পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে তৈরি। আসার পথে দেখে ছিলাম এক বৃদ্ধ পাহাড়ের গায়ে বসে ছেনি আর হাতুড়ি দিয়ে পাথর কাটছে। ফেরার পথেও ঠুকঠুক শব্দে সেই দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখলাম একই ভাবে কেটে চলেছে পাহাড়। কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, পাথর কেটে কি করবেন। একটা শীতল, প্রত্যাশাহীন ঘোলাটে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন আমাদের দিকে তারপর আবার পাথরে ঘা দিয়ে বললেন, ‘ঘর বানানা হ্যয়’। দেখলাম অন্তত পাঁচটা থান ইঁট জোড়া দিলে যে আকৃতি হয়, পাশে ঠিক ততটা বড় একটা কাটা পাথর পড়ে আছে। এভাবে প্রতিদিন সারাদিনের পরিশ্রমে কটা পাথরই বা কাটা সম্ভব? তবু এরা গড়ে তোলে পাথরের ইমারত যার প্রতিটি কোণায় ছড়ানো ঘাম,পরিশ্রম আর অজস্র স্বপ্ন।

সুন্দর বিরথীকে পিছনে ফেলে আমরা চললাম চৌকরির পথে...

ক্রমশ। ২য় পর্ব পড়ুন 

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-