মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

শ্রী শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
শ্রী শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়  । শর্মিষ্ঠা ঘোষ

                       


সাহিত্য চর্চা কি মানুষ কে সংসার উদাসীন করে তোলে বা আত্মকেন্দ্রিক ? 





উদাসীন করে না । জীবনের প্রতি আসক্তি তাদের মস্তিষ্ক মেধায়, অস্থি-মজ্জায়। কখনও সাময়িক ভাবে একটু অসামাজিক মতো হয়ে যেতে হযই লেখার প্রস্তুতি ও প্রয়োজনে। আর ভাব-চিন্তা- ধ্যানে সংবেদনে আবিষ্ট হওয়ার ফলে একটা অন্তত তাৎক্ষণিক দুরত্যয় ব্যবধান বা বিচ্ছিন্নতাবোধ আসেই। সকলের মধ্যে থাকলেও যেন সকলের থেকে আলাদা ; একটা হয়ত ফিলসফিক্যাল একাকীত্ব। সৃজনচিন্তা-মথিত নিজের মন-মননের জগতে নিবিষ্ট থেকে সাহিত্যকার খুঁজতে থাকে, শব্দের মধ্যে দিয়ে বস্তুর প্রতিরূপ, কখনও নিজের মনের দ্বন্দ্ব- বিভাজন , মহাবিশ্বের ওনাকোনা শব্দে আলো ফেলে বা অজানা অন্ধকারের আকস্মিক চেতনায় বিদ্ধ করে তাকে। রাজনীতি, অার্থসামাজিক পরিমন্ডল, সংসার, প্রেম ও নানা সম্পর্কের ভাঙাগড়া তথা বন্ধুত্বের বাঁকাচোরা পথ এরকম হাজারো স্ফুলিঙ্গ কবি-লেখককে অন্য অপরিচিতলোকে নিযে যায়। ফলে, নানান স্তর থেকে কখনও তাকে ভিনচোখে দেখে কখনও। কেউ ভাবতে পারে উদাসীন, কেউ অহঙ্কারী, কেউ হিষ্টিরিয়া-প্রবণ পর্যন্ত। অথচ তার সৃষ্টি হযত একটা অদৃষ্টপূর্ব সাযুজ্যের সাঁকো তৈরি করে দিল এবং পাঠক সেটা হৃদয়ঙ্গম করে নিজেদেরই উন্নীত করল বা লেখকসৃষ্ট জগতের চৌকাঠে পা রাখলো। এই সদর্থক কথঞ্চিৎ পৃথক হওয়া ব্যতিরেকে কোনও শিল্পই কি ভূমিষ্ঠ হতে পারে ! আমি তো তাই ভাবি। এক প্রখ্যাত কবির, সম্ভবত জ্ঞানপীঠ-প্রাপ্ত, লেখা অস্পষ্টভাবে মনে পড়ছে : বাঘ যখন কোনও শিকার ধরে প্রথমেই তার ঘাড় মটকে রক্তটা পান করে নেয়। সেরকম কবি যখন কোনো ভাব-তরঙ্গ ধরে ফেলে তক্ষুনি সেটাকে স্কেচিভাবে হলেও লিখে রাখার জন্যে আঁকুপাকু করতে থাকে। কিন্তু কবি-লেখক হযতো তখন অন্য কাজে চলেছে বা রত আছে। অনেকে পকেটে/ঝোলায় এজন্য ছোট্ট নোটবই রেখে থাকে, শুনেছি আমি। আমি অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজের ফাঁকে এমন ছটপটানির ভাগীদার হয়েছি। পথে বা সামাজিক গল্পগুজবের মধ্যেও এমন অভিজ্ঞতা হযেছে। কেউ বলেই ফেললো -- কি ভাবছিলেন বা কোথায় ছিলেন ! না, নাতো বলে সামলে নিলেও লজ্জায় একটু পড়েছিই কখনও। একান্তে নিজের নিশ্চিন্ত ডেরায় বা টেবিলে থাকলে পরোয়াহীন অনেক। এরকম কত চিন্তা-চেতনার বীজ কতই হারিযে গিয়েছে, সকলেরই যায় বুঝতে অসুবিধে হয় না। এই 'ওয়ার্ক -লাইফ ব্যালান্স'-টা খুবই কার্যকরী সব ক্ষেত্রেই। আমার ব্রেনটাইপ মতো আমি একটা প্যাটার্ন দীর্ঘদিন ধরেই মেনটেইন করে চলি ; তাই সব সামলেসুমলেও কবিতা বা সংস্কৃতিচর্চা অনেকটা অব্যাহত রেখে চলেছি। এই অবসর জীবনেও, শরীরের এই টলটল-অবস্থা নিয়েও একটু আধটু করে চলেছি। দেখি কতদিন পারি ! আমার স্ত্রীর শারীরিক-মানসিক অবস্থাও তেমন ভাল নয়, কয়েকবছর হলো। একসময় ওর উৎসাহ বা ক্ষমতাও যথেষ্টই ছিল। আমার কাজে ওরও বেশ সাহচর্য, সহযোগিতা ছিল। নিজেও শিক্ষিকা, বিজ্ঞানের ছাত্রী। এখন একটু একাএকা হয়ে গেছি, তবে জীবন তো একখাতে বয় না চিরদিন, কারোরই না। মনোবল নিয়েই চলেছি। ছেলে কাছেই একটা ফ্ল্যাটে থাকে, নিত্যই খোঁজখবর রাখে। তাই ভরসা অনেক, যতই ব্যস্ত লোক হোক না।

এসব থাক। সাহিত্য-কবিতা করতে হলে মানুষের কাছে যাওয়াটা একান্তই প্রয়োজন। কেবল তত্ত্বজ্ঞান, আর পড়াশোনা দিয়ে ক্রিয়েটিভ লেখা সম্ভব বলে মনে হয় না। বেড়ানো, জগৎটা ও মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা-মেলামেশায় লেখার অনেক উপাদান পাওয়া যায়। নিজেকেও আবিস্কার করা যায়। মর্মচোখে দেখতে না পারলে লেখা নিস্প্রাণ হয়ে যায়। যদিও কেউই'নিজের ছায়া বাদ দিয়ে হাঁটতে পারে না '। এখন প্রযুক্তি ও যোগাযোগ মাধ্যম অনেক সমৃদ্ধ, যা কুড়ি বছর আগেও ভাবতে পারতাম না। এখন এই কর্পোরেট কালচার ও কনসিউমারিজমের হাত থেকে পুরোপুরি কেউই বেরিয়ে আসতে পারছে না বলতে গেলে। একটা বিপ্লব ঘটে গেছে যেন, এর সদর্থক দিক অনেক আবার, চাই বা না চাই, অনর্থক দিকও অনিবার্যভাবেই জড়িয়ে আছে। অথচ দেশের বিপুল অংশই সমূহ অন্ধকারে। এবং, গ্রাম ও অনুন্নত এলাকার নিম্নকোটির মানুষের সংখ্যাও সীমাহীন। অত্যন্ত লজ্জা ও পরিতাপের বিষয় এটা। কবি-লেখক- শিল্পীরা ক্রমাগত লিখে চলেছেন অনেকে। এখানেই কবিদের কাজ। 'নিজেরই হৃদয় বলে কবিকে জেনেছে সব জাতি/যে জাতির কবি নেইসে কেবল স্তূপাকার মাটি ' ---মনে পড়ল লাইন দুটো। পোয়েটিক জাষ্টিসের কদর পৃথিবীর সর্বত্রই মান্যতা পেয়েছে আবহমানকাল জুড়ে। আর নিজের প্রতি সৎ থেকে না লিখতে পারলে লিখে রাভ নেই। গজদন্তমিনারে বসে অালঙ্কারিক কবিতা গান একটা শ্রেণীকে খুশি করতে পারে। আত্মপ্রবঞ্চনাও বেড়ে ওঠে তাতে। কবিতা নির্মেদ হয়ে বরং জীবনের সত্যকে তুলে ধরুক। এতেই নিজের মুক্তি, জগৎজীবনেরও। প্রাসঙ্গিক ও অপ্রাসঙ্গিক পর্যায়ে ওভাররিচ করে অনেক কথা বলেছি। অপ্রিয়তা অর্জন করলেও কোনও দুঃখ নেই আমার। তোমার অনুরোধ বলেই নির্দ্বিধায় এত কথা বলছি, অন্যথায় হয়তো এরকম চোখ কান বুজে এসব লিখতাম না। জানি না, এত স্পেস তুমি দেবে কি করে এবং কারই বা দায় পড়েছে এই অতিকথন পড়ার ! এখন তো সবই জিস্টে আর ম্যাগনেটে বলে লোকে !



সাহিত্য কি সময়ের সাথে পুরনো মূল্যহীন হয়ে পড়ে? বর্তমান সাহিত্যিক দের ওপর কি বিগত সময়ের কোন প্রভাব নেই? 




গতকাল এইপ্রশ্নোত্তরটা পুরো লিখে ঠিক পাঠানোর মুহূর্তেই নেটবিভ্রাটে পুরোটা উড়ে গেল, কি মনখারাপ, তাল কেটে গেল। যাকগে, যা মনে হয় কোনওভাবে লিখে দিই আবার।

মূল্যহীন হবার ব্যাপার নেই, তব অনেক সময় একটা সুষুপ্তির মধ্যে থাকে। হারিয়ে যাবে কি করে ! একটা মজার গপ্পো বলি : বছর দুয়েক আগে আমার নাতি (তখন ক্লাশ ফোর, বয়েস দশ হবে) আমার কাগজ পড়ার কালে এসে হঠাৎ বললো --জানো দাদাই, মানুষ মরে গেলেও কিন্তু বেঁচে থাকে! বললাম, হ্যাঁ, স্মৃতির মধ্যে, বা কাজের মধ্যেদিয়েও বেঁচে থাকতে পারে। ও বললো না,ফিসিক্যালি বেঁচে থাকে! ভাবছি, মস্করা করছে.....মুচকি হেসে বললো, ঠাকুরদার জিন তোমার মধ্যে আছে, তোমার জিন আমার মধ্যেও। বললাম, হ্যাঁ, তাহলে তো.... ও ভুরু উঁচু করে বললো হ্যাঁ,একদম হোমোস্যাপিয়েন্স পর্যন্ত। এরকম চমকে দেবার খবরটবর বলেটলে ও। নানা বিষযের এনসাইক্লোপেডিয়া আছে, আর সব বাচ্চারাই তো বেশই মিডিয়া এক্সপোসার আছে আজকাল। আমি একটু অবাক হযে দেখছিলাম এই সদ্যপ্রজন্মের চিন্তার খেলা। আমি এ নিযে একটা ইংরেজি কবিতাও লিখেছিলাম, পড়েছিলামও একটা সাহিত্য-বৈঠকি-তে। এটা কিন্তু দাগিয়ে দিয়ে গেল কিছুই স্ম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায় না। রাতের অনেক তারার মিটমিট বা জ্বলজ্বল করা আলোর মতো আছেই। তেমন দরকার পড়রেই টেলিস্কোপ লাগায় মানুষ।

এখন এই সমৃদ্ধপ্রযুক্তির আর যোগাযোগ মাধ্যম তথা সোসাল মিডিয়ার এই অভাবনীয় পরিবর্তন তো একটা বিপ্লব মতোন ঘটিযে দিযেছে। আমি তো মোবাইলই কিনেছি ২০০০৫ -এ, তাও নেটহীন ; আর এখন বাচ্চারাই কি বিপুলভাবে সড়গড় ; হাজার জিনিষ নিয়ে কেরামতি করে ; জাপানি ভাষা, যে কোনও শব্দ, উচ্চারণ, খবর, মানচিত্র মুহূর্তে দেখে নিতে পারে। তাহলে, বড়রা তো নিত্যই আকাশ ছুঁয়ে দেখছে, বলতে গেলে। সবকিছুই কি রকেটগতিতে পাল্টে যাচ্ছে যেন ! পোশাক আশাক, রীতি আচার, আইন, বিচার-বিবেচনার ধরণ, ভাষার চালচলন, মূল্যবোধ ---কোথায় পরিবর্তন, নতুন-উদ্ভাবন নেই ? আর এটাই তো কাম্য, ভবিতব্য, অকাট্য সত্য ---- 'ওল্ড অর্ডার চেঞ্জেথ ইল্ডিং ইট্স প্লেস টু নিউ' । কিন্তু অবশ্য কর্তব্য, মৌল-মূল্যবোধ ( কোর ভ্যাল্যু)-এ সেরকমের পরিবর্তন ঘটলে বিপর্যয় সমায়ত। মনুষ্যত্ব, মানবিকতা, ভালবাসা, বন্ধুতা, সম্পর্ক ইত্যাদির আদল একটু বদলালেও নরমেটিভ মূল কনসেপ্ট মোটামুটি একই আছে, মানে থাকার কথা। জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন - প্রযোগকৌশল সবই বদলাচ্ছে এবং কোনোটাই দ্যাখো জল-অচল প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ নেই আর। মানববিদ্যা (আর্টস)-এও অভিনব চিন্তা ও রুচি বদল স্থান পেয়েছে। সিলেবাসে বিপুল পরিবর্তন, এ তো সময়ের দাবী। প্রত্যেক শাখার মধ্যে আন্তর্যোগাযোগও বিস্মযকরভাবে বেড়েছে। এটা তো অনস্বীকার্য যে আপডেটিং অব নলেজ ছাড়া নলেজ কার্যকরী হয় না। এসবের ভিত্তিতেই বদলে যাচ্ছে জীবন জীরিকার ধরনধারণ, জীবনের মান ও শৈলি। রাজনীতি- সমাজনীতি -অর্থনীতি ইত্যাদির তত্ত্ব, প্রয়োগ....।

একটা ধনতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজবাস্তব, ব্যবস্থা তার অনেক সু-কু নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। স্বদেশ-বিদেশে যাতায়াত, লাইফস্টাইল ও অ্যাকালচারেশনে সহজগম্যতা, ডায়াস্পোরার উদ্ভব এরকম কতো কি ঘটে চলেছে। এখন তো গ্লোবাল ভিলেজ বলে, তাই না ! কর্পোরেট সমাজ এবং কর্পোরেট শ্রেণীই তৈরি হয়ে যাচ্ছে বিশ্বায়িত অর্থনীতি এবং বিধ কারণ সমূহের জন্যে। এসে গেছে দুর্নীতির কর্কটরোগ বেশি বেশি (চিরকালই ছিল পৃথিবীজুড়েই, অন্য কায়দায়, অজানাও থাকতো। যাইহোক গে থাক , হাজারো কদর্যতা, বিকার, শোষণ -নির্যাতন -বঞ্চনার নিষ্ঠুর ফিকির, ইত্যাদি ইত্যাদি যা সবাই জানেন। আমি এগুলোর ছোয়াঁ ইচ্ছে করেই দিলাম এটা প্রতিপন্ন করতে যে পুরনো সাহিত্য, বিগত সময়ের সাহিত্য এখনো মাঝে মাঝেই চলে আসে ভুল-পথচলা, অবমানবিক জীবন-দর্শনে কিছু আলো ফেলতে, নতুন কোনও উদ্ধারের অভিজ্ঞান দিয়ে যেতে। আমাদের পুরনো ভাষা, লোকায়ত জীবনের কত ঐশ্বর্য্য, পুরাণ, মহাকাব্যের সুবিস্তৃত আলো-অন্ধকারের মহিমা, চর্যাপদ, কালিদাস, ব্রাহ্মণ, থেকে বঙ্কিম , মধুসূদন এবং শেষে যদি ধরে নিই শিট অ্যাঙ্কার মহান বিশ্বকবি-ই ----ভেবে দ্যাখো কতো রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তি-নৈতিকতা সংশ্লিষ্ট সঙ্কটে এই সব সোর্স থেকে কত সঙ্কেত ও সম্ভাবনার ' বিশল্যকরণি ' আমরা এ-সময়েও খুঁজে পাই।

তাই এটা স্বতঃই মনে হয় 'নিজেরই হৃদয় বলে কবিকে জেনেছে সব জাতি / যে- জাতির কবি নেই সে কেবল স্তূপাকার মাটি ' ( শঙ্খ ঘোষের অনুবাদ)। পোয়েটিক জাষ্টিস-এর কদর আছেই, কবিতা-শিল্প-সাহিত্যের মান্যতা সারা পৃথিবীতেই ছিল, আছে, থাকবেও। কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত ২০০৪ সালে 'আমার দুর্গা' কবিতায় এক অতিমানবিক কাছের মানুষের কাছে যাচনা করছেন, জোর করছেন আন্তরিকতার বন্ধনে যেন ' আমার কবিতা যেন নব ভাষা পায়/আমার দেশের মাটি যেন শষ্যে ভরে'.........'আমার সকল দেশ যেন খেতে পায়/ আমার সকল লোক যেন জামা পায়/ আমার সকল গ্রাম যেন ছাদ পায়...আবার নিজেকে ওঁরই সখ্যে, প্রশ্রয়ে বলশালী করে নারীর স্বাধিকার, স্বাধীনতার অকুন্ঠ স্বাভাবিক উচ্চারণে পরিষ্কার বলেন , 'একুশ শতকে দুর্গারা বশ মানে না / শৃঙ্গারে চাই সমান সমান সঙ্গী' । কবেকার ধর্মীয়কাব্য সাম্প্রতিক কবি মনকে উদ্দীপিত করছে, সাহস -সাহচর্য যোগাচ্ছে। তাই না ! শেকসপিয়র, অয়েদিপাউস, গ্রীক মিথোলজি থেকে বেরটল্ট ব্রেখ্ট কত বাংলা নাট্যমঞ্চের নাটকে অন্যভাবে আবির্ভূত হযেছেন এবং বর্তমান সমস্যাসঙ্কুল সমযকে হুঁশিয়ারি দিযেছেন, উদ্ধারের মত-পথের ইঙ্গিত-ইশারাও দিয়েছেন। মঞ্চগৃহে এসব সমস্ত নাট্যানুরাগী, সাহিত্যপ্রিয় মানুষই কখনও অন্তত দেখেছেন, অন্তর্নিহিত অর্থও বুঝেছেন। অনেক কলরব কোলাহল, প্রশংসামুখর সন্ধ্যে এভাবে আমাকে পুরনো কবিতা সাহিত্য নাটক চিত্রকলা ফিল্মের মূল্য নতুন করে বুঝতে সাহায্য করেছে। এবার ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলতে হবে । অতীতের সাহিত্য কতবার কতভাবেই নতুন ধারার সাহিত্যকে নিঃশ্বাসবায়ু জুগিযেছে। তবে সমকালীন সাহিত্যকার, কবিদের পরিবর্তমান জগৎ-জীবনের ঘটনাবলি খুঁটিয়ে দেখতে ও বুঝতে হবে। সমসামযিক বিশ্বের, নিজদেশের শুভ এবং অশুভ পরিবর্তন, ওলটপালটকে তীক্ষ্ণ নজরে রাখতে হবে। গোটা বিশ্বের বিশেষত স্বদেশের সন্ত্রাস, হিংসা, খুনোখুনি, নারীধর্ষণ, অত্যাচার-অনাচারের ছবি নিয়ত মাথায় রাখা দরকার। নারীদের স্বাধিকার, সক্ষমতা, সম্মান-সমাদর, স্বাধীন জীবন-জীবিকার ভিত নির্মাণ, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের সম্পূর্ণ সমানাধিকার ইত্যাকার বহু বহু বিষয়ে সম্যক অবগতি প্রয়োজন।

নিম্নকোটির মানুষদের যথাযোগ্য জীবন-জীবিকার সমঅধিকার অর্জনের লড়াইতে সাহিত্যিকদের কলমকে সচল রাখতে হবে। কবি-সাহিত্যিত যদি জীবনের এত অপচয়ের মুখে বিদ্রোহের ভাষা এড়িয়ে যায়, তাহলে সাহিত্য করার দরকারটা কি ! ইনিয়ে বিনিয়ে কেবল দেহ- মনের খেলাখেলি নিয়ে লিখলেই হবে। আমি বলছি না প্রেম যৌনতা সম্পর্ক কবিতা বা সাহিত্যের মধ্যে থাকবে না। ওসব না থাকলে তো রক্তমাংসের জীবনই বাদ চলে যাবে সাহিত্য থেকে। সে তো বানানো, অসম্পূর্ণ জীবন। নিষ্প্রাণ যাজকীয় বা ধর্মীও উপদেশের মতো শোনাবে সে সব। সে সব কেউ খুলেও দেখবে না শিক্ষিত, পরিণত পাঠক। এখন জীবন অনেক জটিল, আবার মানুষের সহজ প্রাণের মনের কথাও প্রতিদিনই কিছু না কিছু শুনিই। মানুষের মন খোঁজে মানুষেরই মন ---রবীন্দ্রনাথের এ কথা জরের মতো সহজ ও সত্য। কবি- সাহিত্যিককে মানুষের কাছে যেতে হবে, বুঝতে হবে তাদের 'গাট ফিলিং' নাহলে সবটাই বানিয়ে ধারকরা বিদ্যেবুদ্ধি দিয়েই লিখতে হবে। সিরিয়ালের মতো সবকিছু পাঞ্চ করে মনোরঞ্জনী ও নিটোল করতে হবে। অনেক ট্র্যাজেডিও আমাদের নিজের জীবনে এবং বাড়িতে বাড়িতে ঘটছে, ঘুরছে। বুঝতে হবে।

এত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি যে অনেকে মুখচুপ করে শুনবে। সকলের জীবনেই অনেক কমেডি ও ট্র্যাজেডি থাকে ছোটবড়। কবিরা তাদের অভিজ্ঞতাকে অভিজ্ঞায় রূপান্তরিত করে নিজস্ব ভাষানির্মিতি, ভাবচিত্র এবং যথাপ্রযোজন আঙ্গিকের মধ্যে দিয়ে তার অভিব্যক্তি ঘটান। সেটা তখন আর কেবল তার কথা থাকে না, সকলের মনেই সেটা অনুরণিত হতে থাকে। লেখক যদি নিজের লেখার প্রতি অর্থাৎ নিজের প্রতি সৎ না হন তাহলে সেটা একধরণের বেশ্যাবৃত্তির সামিল। যদিও আমি 'ওই নারীদের' প্রতি বিন্দুমাত্র অশ্রদ্ধ নই। বরং, তাদের অনেক কষ্ট, বাধ্যতা, অশিক্ষা অনেকসময় এর জন্য দায়ী। আর স্বার্থ, লোভ, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অভিলাষ, অশুভ উচ্চাশা, ঠগবাজী-জোচ্চুরিতে তে দেশ ছেয়ে যাচ্ছে ক্রমেই। পৃথিবী জুড়েই দেখছি। এই কালো রাজনীতি ও অর্থনীতি তো দেশটারই বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। সাধারণ মানুষ, গরিব মানুষ কি বানের জলে ভেসে এসেছ ? আর নতুন এবং উঠতি প্রজন্ম ? তাদের জায়গা থাকবে তো। তাদের জীবন-জীবিকা ! নৈতিকতার পূর্ণ ভাঙন ধরে যাবে । শিক্ষা, জ্ঞান, স্বাস্থ্য সে সবও কোন পথে যাচ্ছে। সাহিত্য যদি কেবল আপস করে চলে বা মুখবুজে থাকে ---তাহলে দেশের, জাতির, পৃথিবীর সমূহ বিপদ। অনেক দুঃখেই এক বিশিষ্ট কবি লিখেছিলেন হয়তো :

' সত‍্য কেবল বাঁচা, কেবল বাঁচা,
সত‍্য কেবল পশুর মতো মনের বালাই ঝেড়ে ফেলে বাঁচা,
বাঁচা, কেবল বাঁচা ।

কবিরা না থাকলে সমাজ সুস্থ হয় না, সুন্দর হয় না। এখনকার অবস্থা তুলে আনতে হবে। ব্যস্ত সমাজে কম লোকই পড়বে, জানি। কেরিযার আর কনসিউমারিজমের টান এখন ঘরে ঘরে। এখন মানুষ টাকাটাই বোঝে গড়ে। ওটা দিয়েই বিচার করে। যদিও অর্থ অতি অবশ্যই প্রযোজন এবং সেটা সক্কলের হাতেই থাকা দরকার। কবি এক সহমর্মী, সমানুভূতির মানুষ হযে উঠতে থাকে বেশি করে। অন্যদেরও টানে। কবিতা সাহিত্য কর্মসংস্কৃতিকেও উৎসাহ জোগায়। মানুষের যাত্রাপথ তো process of being থেকে process of becoming --- তাই না! সাহিত্য এটা বোঝে মনে হয়। তারা সেইভাবেই ধ্রুবতারাটা দেখিয়ে দিক না কিছুটা অন্তত। নিজেরাও নিরন্তর শিখুক। আমি তো এই ৭৬ বছরেও শিখছি রোজ। শিঙ ভেঙে বাছুরের দলে গিয়েও......।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-