মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

পিয়ালী গাঙ্গুলি

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
আবর্ত
৭ বছর আগে গ্রামতুতো পিসির হাত ধরে এই গেটের ভেতর দিয়ে প্রবেশ করেছিল পদ্ম। ১৮ বছরের যুবতী তখন সে। বড়, চওড়া রাস্তা পেরিয়ে মেন বিল্ডিংয়ে প্রবেশ। কি বড় বড় হল ঘর, কত ছবি, কত ভাস্কর্য। পদ্ম হাঁ করে দেখে আর ভাবে 'ইশ আমিও যদি এমনি আঁকতে পারতাম'। ছবি আঁকার খুব শখ পদ্মর।। রঙ, তুলি তো জোটেনা, বাড়ির দেওয়ালে বা উঠোনে ইঁটের টুকরো দিয়ে এঁকে বেড়ায়। বাবা কোন কালে মারা গেছে, যেটুকু জমি ছিল বেচে দিতে হয়েছে। মা এখন পরের জমিতে খেতমজুরের কাজ করে। যা পায় তাতে দুটো পেট চলে না। তারপর আবার অসুখ বিসুখ ও লেগেই থাকে। তাও তো খুব বাড়াবাড়ি না হলে ওরা ডাক্তার মুখো হয়না।। পাড়ার হরেন ডাক্তার না হয় বিনা পয়সায় দেখে দেবে, ওষুধ পাবে কোত্থেকে? অগত্যা খুব বেগতিক দেখলে সেই দূরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই লাইন দিতে হয়।

সিঁড়ি, বারান্দা, বড় হলঘর পেরিয়ে ওরা একটা ছোট্ট ঘরে এসে ঢুকল। হাতের ব্যাগ ট্যাগ রেখে পিসি বলল ... 
-নে এবার জামা প্যান্ট যা পড়ে আছিস সব খুলে ফেল।
বলতে বলতে নিজেও তাড়াহুড়ো করে নিজের শাড়ি, ব্লাউজ খুলতে লাগল সব। এসব দেখে পদ্ম চেঁচিয়ে ওঠে
-কি বলছ আর কি করছ এসব? তুমি না আমায় কাজ জুটিয়ে দেবে বলে এনেছিলে? আমি এক্ষুনি বাড়ি গিয়ে মাকে সব বলে দেব।
-যা, বলে দে। এখন থেকে একা ফিরতে পারবি তো? যা, আমি গাড়ি ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি। আর শোন, আমি সোনাগাছির দালাল নই যে মেয়ে ভাগিয়ে আনব, তোর মাকে সব বলেই এনেছি, বৌদি সব জানে।
-মা সব জানে? জেনেশুনেও নিজের মেয়েকে পাঠিয়েছে? ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ। মায়ের প্রতি রাগে আর ঘেন্নায় ভরে উঠল পদ্মর বুক। চোখ ফেটে জল গড়াতে লাগল। মা হয়ে পারল এমন কাজ করতে? আজ বাবা বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই পদ্মকে এমন দিন দেখতে হত না।
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে পদ্ম। পিসি এসে মাথায় হাত রাখল ... 
-এই কাজে খারাপ কিছ নেই রে পদ্ম। এটা সোনাগাছি বা কালীঘাট নয়। এখানে কেউ গায়ে হাত দেয় না, জোর জবরদস্তি করে না, কুদৃষ্টিতে দেখে না, বরং সন্মান করে, দিদি বা মাসি বলে ডাকে। বিপদে আপদে সাহায্য করে। পোশাক খুলে ৫ ঘন্টা তোকে একজায়গায় একভাবে বসে থাকতে হবে, আর ওরা তোকে দেখে আঁকবে। এই তোর কাজ। এগুলোকে বলে সেশন, আর আমাদের বলে নুড মডেল। সেশনের শেষেই টাকা পেয়ে যাবি। আমাদের ছাড়া এদের পড়াশুনো অসম্পূর্ন। ছবি দেখে তো আর  এত ভালো করে মানুষের শরীর আঁকতে শেখা যায় না। গ্রাম গিয়ে বলবি কোনো দোকানে কাজ পেয়েছিস। এসব কথাবার্তার মাঝে আরো কয়েকজন বিভিন্ন বয়সের মহিলা এসে পোশাক খুলতে লাগলেন। সবাই এসে এসে পদ্মর গালটা টিপে বললেন
-ও মা, মুখ টা কি মিষ্টি। একবারে বাচ্চা মেয়ে। তুমি ভয় পেও না, প্রথম প্রথম ওরকম অস্বস্তি লাগবে, আস্তে আস্তে সব অভ্যেস হয়ে যাবে। আমরা তো আছি, এতগুলো মাসি, আমরা সবাই একটা পরিবারের মত।

পলাশপুর থেকে সেই শুরু হল লোকাল ট্রেনে প্রাত্যহিক যাতায়াত। আর্টিস্ট দাদা দিদিদের ব্যবহারে লজ্জাটা আস্তে আস্তে কেটে গেছিল, মায়ের ওপর রাগটাও। বাতের ব্যথায় মা আজকাল আর খেতে বেশি কাজ করতে পারেনা। ঘরে বসে মুড়ি ভাজে আর সেল্ফ হেল্প গ্রূপের যা টুকিটাকি কাজ পায়, তাই করে। পদ্মরও রোজ রোজ সরকারি আর্ট কলেজে যাওয়ার সুবাদে কলকাতা শহরটা বেশ সরগর হয়ে গেছে। পার্ক স্ট্রিট, নিউ মার্কেট, বড়বাজার এখন এসব ওর নখদর্পনে। সাউথে হাজরা, রাশবিহারি, গরিয়াহাট, টালিগঞ্জ এসবও চেনে, তবে অত ভালো নয়। ওদিকটায় যাওয়ার মত সময় পায় না। নিজেদের মধ্যেও বেশ ভালোই সম্পর্ক আছে। সবাইকার জীবনের গল্পগুলো প্রায় একইরকম। পুজো, পয়লা বৈশাখ, জন্মদিন, বড়দিনে একে অপরকে টুকিটাকি উপহার দেওয়া বা বাড়ি থেকে ভালোমন্দ রান্না করে এনে একসাথে খাওয়া, এসব চলতে থাকে। দাদা, দিদিরাও খুব ভালো, অনেক সাহায্য করে। এখানেই অসীমদার ড্রাইভার শান্তনুর সাথে পরিচয় এবং প্রেম। কয়েকদিন এগ রোল, চাউমিন, নিউ মার্কেটের পর হঠাৎ একদিন হুট করে কালীঘাটে গিয়ে বিয়ে। তারপর শিয়ালদহের দিকে ঘরভাড়া, বছর ঘুরতেই শালুক। বেশ চলছিল জীবন।

বুকের লাম্পটা অনিন্দ্যদাই একদিন প্রথম লক্ষ করেছিল। বলেওছিল। পদ্ম পাত্তা দেয়নি। ধুর, শরীর থাকলেই কিছু না কিছু হবে। তাছাড়া জ্বালা, ব্যথা কিছুই হয়না। ডাক্তারের কাছে যাওয়া মানেই একগাদা খরচ। গেলেই এত টেস্ট ধরিয়ে দেবে। অত টাকা কোথায়? কত কষ্ট করে একহাতে শালুককে মানুষ করছে। শিয়ালদহ লোরেটো থেকে পাশ করে এবার লোরেটো কলেজে ভর্তি হয়েছে। নেহাত পড়াশুনায় ভালো বলে, পুরোটাই স্কলারশিপের টাকায় হয়ে যায়, ওই নিয়ে আর পদ্মকে ভাবতে হয়না। তবু সংসার খরচ, গাড়ি ভাড়া এসব তো আছে। শালুকের বাবা তো কবেই ওদের ছেড়ে চলে গেছে। পদ্ম কি কাজ করে সব জেনে শুনেই বিয়ে করেছিল। তা সত্ত্বেও উঠতে বসতে খোঁটা, নোংরা কথা, মারধোর। তারপর হটাৎ একদিন অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করে এনে ঘরে তুলল। ততদিনে অসীমদার ড্রাইভারিও ছেড়ে দিয়েছে। কিছুদিন একসাথে থেকে পদ্মকে দিয়ে ঝিগিরি করালো। তারপর একদিন নতুন বউ নিয়ে উধাও। আর কোনোদিন কোনো খোঁজখবর রাখেনি ওদের।

সঞ্চিতাদির বাবা ডাক্তার। সঞ্চিতাদিই জোর করে পদ্মকে নিয়ে এসেছিল রাজারহাটের এক বেসরকারি মেডিক্যাল সেন্টারে। তার আগে এস এস কে এম এ লাইন দিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে পদ্ম। ওখানের ডাক্তারবাবুরা কি একটা লিখে দিয়েছেন কার্ডে। মুখে বলেছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করতে হবে। কথাটা আর্ট কলেজে বলতেই দাদা দিদিরাই পুরো উদ্যোগ নিয়ে নিল। সঞ্চিতাদির যেহেতু ডাক্তার মহলে প্রচুর চেনা শোনা, ওই টাটার কথা বলল। গরিব রুগীদের ওরা নাকি অনেক কম খরচে চিকিৎসা করে। সেখানের ডাক্তাররাও পরীক্ষা, নিরীক্ষা করে একই কথা বললেন। ক্যানসার দুটো ব্রেস্টেই ছড়িয়ে গেছে, এক্ষুনি সার্জারি করতে হবে। ব্যবস্থা করে যতদূর কম খরচে হয়, রাজারহাটের টাটাতেই অপারেশন করানো হল। কিন্তু নারী সৌন্দর্যের প্রতীক যে স্তন, সেই স্তন ছাড়া পদ্মর শরীরের আর কি মূল্য আছে? কে আঁকবে স্তনহীন মডেলের ছবি?

ব্রেস্ট ইমপ্লান্টের অনেক খরচ। তার আগে তো কেমোথেরাপি, ওষুধপত্র আরও অনেক কিছু আছে। আর্ট কলেজের সহকর্মীরা এবং দাদা দিদিরা মিলে অনেক টাকাই জোগাড় করে দিয়েছেন, কিন্তু তা প্রায় সবই অপারেশনেই খরচ হয়ে গেছে। মডেলদের তো আর কোনো পার্মানেন্ট চাকরি নয়, তাই কোনো মেডিক্যাল ইনসিউরেন্স ও নেই। লোকে আর কতই বা দেবে? অন্য কোনো কাজ খুঁজে নেবে সেই শারীরিক অবস্থাও নেই। তাছাড়া এখনও অনেকদিন চিকিৎসা করাতে হবে। শালুক সবে কয়েকটা টিউশন শুরু করেছে, তাতে আর কত রোজগার? মাথাভর্তি চিন্তা নিয়ে পদ্ম ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে জানলার বাইরে। শালুকের কাছে কিন্তু একটা 'ইমিডিএট সলিউশন' আছে।
-কি তোর সেই সলিউশন?
-আমি তোমার জায়গায় কাজ করব। ওদের বলে দাও
-তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? এই কাজ করার জন্য আমি তোকে এত কষ্ট করে পড়াশুনো করাচ্ছি?
- এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই মা। এই মুহূর্তে আমি তো কোনো চাকরি পাব না। তাছাড়া এটা তো সাময়িক ব্যবস্থা, যতদিন না তুমি সুস্থ হচ্ছ। ওখানে আমি সবাইকে চিনি, সবাই আমাকে। "এই উইল বি কমফর্টেবল মা। প্লিজ, তুমি আর আপত্তি করো না। যেকোনো উপায়ে আমাদের এখন টাকার প্রয়োজন।

আজ মেয়ের হাত ধরে পদ্ম সেই একই রাস্তায় হাঁটছে, একই গেট ঠেলে। কিন্ত শালুকের মধ্যে কোনো লজ্জা, দ্বিধা বা কুণ্ঠা নেই। অনেক পরিণত। কঠিন বাস্তবকে মেনে নেওয়ার পাঠ ও নিজের জীবন থেকেই পেয়েছে। ওকে কিছুই বলতে হল না। নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে নিজের সালোওয়ার কামিজটা খুলে রেখে, একটা তোয়ালে জড়িয়ে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে গেল ক্লাসরুমের দিকে।

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-