মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

পিয়ালী গাঙ্গুলি

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
ফুলশয্যা
ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলের দিকে তাকাতেই লাফিয়ে উঠল কাহন। যাচ্ছেতাই কেস খেয়ে গেল আজ। ফুলশয্যা করে বউ নটার সময় ঘুম থেকে উঠছে। একেই তো শাড়ি পড়তে পারে না, তাই আবার তাড়াহুড়োয়। ধুৎ, নিকুচি করেছে শাড়ির। ঘরের বাইরে মুখ দেখানোটা এখন বেশি জরুরী। স্যাটিনের ব্লু, সেক্সি নাইটিটা র ওপরেই হাউস কোটটা জড়িয়ে  যথাসম্ভব স্বাভাবিক মুখ করে বেরিয়ে ব্রাশ করতে গেল। পরিবেশ থমথমে। কেউ ওর সাথে কথা বলল না।। শাশুড়ির মুখভঙ্গিমায় বোঝাই যাচ্ছে মাথায় জল বসিয়ে দিলে, চা হয়ে নামবে। বয়স্ক পিসীমারা চা, জলখাবার সহযোগে নতুন বউয়ের পিন্ডিটা বেশ উপভোগ করে চটকাচ্ছেন। সবই কাহনের কানে আসছে। অরণ্য কিন্তু এখনও পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। ছেলে বলে ওদের তো সাত খুন মাফ। দাঁত মেজে ননদকে ডেকে শাড়িটা পড়ে একটু শান্তি হল।

শেষ নিমন্ত্রিত অতিথিদের বিদায় জানিয়ে ওপরে উঠতে প্রায় পৌনে একটা বেজে গেল। তারপর আবার আরেক নাটক। হ্যাঁ, এসব নাটকই মনে হয় কাহনের। পুরো ফাইভ  একট প্লে। রিসেপশনের শাড়ি ছেড়ে আবার ফুলশয্যার শাড়ি পড়া। শাড়ি পড়াতে পড়াতে ননদ আস্তে করে বলল "ছবি তোলা হয়ে গেলে শাড়ি ছেড়ে নাইটি পড়ে ফেলো।" শাড়ি, ফুলের গয়না পড়ে দাঁত কেলিয়ে ফুলের বিছানার ব্যাকড্রপে বেশ কতগুলো ছবি তোলা হল। অরণ্য আঙুলে হীরের আংটিটা পড়িয়ে দিল। কাহন নিজেই পছন্দ করে কিনেছিল।। সুতরাং কোনো সারপ্রাইজ এলিমেন্ট নেই। ছবি তোলার পর্ব শেষ হতে ননদ আর বাকিদের সাথে অরণ্য ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ধুর শালা চুলোয় যাক অরণ্য। দরজা বন্ধ করে শাড়ি।খুলে নীল স্যাটিনের নাইটিটা গলিয়ে, আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল কাহন। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসছে। সেই আইবুড়োভাত থেকে চলছে।

অরণ্যর ঘরে ঢোকার নাম নেই। একবার শুধু ঢুকে বলল "আসছি দাঁড়াও"। আসার আর নাম নেই। খাটটা খুব সুন্দর সাজিয়েছে। শুধু গোলাপ, ওই একঘেয়ে লাল গোলাপ নয়, বিভিন্ন শেডের। ঠিক যেমন কাহনের পছন্দ। সবেতেই একটু আলাদা পছন্দ হয় ওর। আর ওরই পছন্দে ঘরের সিলিঙে চাঁদ, তারা এসব সিলিং পেন্টিং করানো হয়েছে। কিন্তু উপভাগ করার দোসর কই?শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে আর কি যেন একটা ফুটছে গায়ে। হাত দিয়ে কয়েকবার বোঝার চেষ্টা করল কাহন, কিছুই বুঝল না।  তাহলে কি বিছানায় কিছু পড়ে আছে? আলো জ্বালিয়ে দেখল না তাও তো নয়। তারপর হটাৎ নাইটিটা খেয়াল করতে আঁতকে উঠল। নাইটিতে একটা ছুঁচ গাঁথা ব্যাপারটা বুঝতে কাহনের দেরি হল না। নিজের ভুলো কাকিমাকে নাইটিটার ঝুল কেটে ছোট করে সেলাই করে দিতে বলেছিল। এটা কাকিমার অবদান। মাঝে অরণ্য একবার ঘরে এসেছিল। কাহন জিজ্ঞেস করল "কি করছ বাইরে"? "এত তাড়া তোমার গিফ্ট খোলার? গিফ্টে তো জানি মেয়েদের বেশি ইন্টারেস্ট থাকে"। "আরে বাক্সগুলো খালি করে নীচে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। কাল সকালে করপোরেশনের গাড়ি আসতে বলা আছে। ওগুলো কালকে ফেলিয়ে দিতে না পারলে নীচে ডাই হয়ে পড়ে থাকবে।" বলেই তিনি বেরিয়ে গেলেন।

কাহন শুনতে পাচ্ছে বাইরে ননদের গলা "যা ভাই ঘরে যা, আজ তোর ফুলশয্যা। তুই ঘরে যা। কাহন রাগ করবে"। সমস্ত গিফ্ট আনপ্যাক করে বাবু ঘরে এলেন। বাইরের সব আলোও ততক্ষণে নিভে গেছে। সবাই শুতে চলে গেছে। অরণ্য বাথরুমে গেল। অরণ্যর অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমটা যখন ভাঙল, তখন দেখে ভোরের আলো প্রায় ফুটব ফুটব করছে। ঘুম জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল "এতক্ষণ কি করছিলে?" " আর বলো না। বাথরুমে গিয়ে দেখি সিস্টার্নটা খারাপ হয়ে গেছে। বিয়েবাড়িতে এত লোক, কে কিভাবে ব্যবহার করেছে। এতক্ষণে সারিয়ে উঠলাম। নইলে সকাল থেকে তোমাদেরই অসুবিধে হত।" গভীর ঘুমের মধ্যে কাহনের আর রাগ, দুঃখ, অভিমান কিছু অনুভব করার মত অবস্থা ছিল না।

অরণ্য এসে জড়িয়ে ধরল। তুমুল বিরক্ত লাগল কাহনের। জড়াজড়ি, ঘেঁষাঘেঁষি করে শোয়া ওর কোনোদিনই পছন্দ নয়। ঘুমের ব্যাপারে নো কম্প্রোমাইজ। আর ফুলশয্যার শখ তো অনেকক্ষণ আগেই মিটে গেছে। এখন শান্তিতে ঘুমোতে পারলে বাঁচে। কাহনের মত রোমান্টিক মেয়ের রোমান্টিসিজম ও ঘুচিয়ে দিয়েছে অরণ্য চক্রবর্তী। আর তার নিজের তো রোমানটিসিজমের র ও নেই। কাহনের আধ ঘুমন্ত ঠোঁটে নিকোটিনের কড়া গন্ধ মাখানো বেশ কয়েকটা চুমু খাওয়ার পর কাহনের শরীর সবে যখন জাগতে শুরু করেছে, তখনই ছরছর করে জল পড়ার শব্দ। অরণ্য লাফিয়ে খাট থেকে নেমে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। খানিক বাদে এসে বলল "ট্যাংক একেবারে খালি হয়ে গেছিল, তাই পাম্প চালিয়ে এসেছিলাম।" রাগে মাথা ঝনঝন করে উঠল কাহনের। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করছিল। কিছুই বলল না। বেশি রেগে গেলে বা বিরক্ত হলে ও কিছু বলতে পারে না। চুপ করে যায়।

অরণ্য আরেকবার জড়াতে এসেছিল। তখন প্রায় সকাল পাঁচটা। এক ঝটকায় অরণ্যকে সরিয়ে দিয়ে অন্যদিকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল কাহন। চোখ খুলল নটায়। ফোনের দিকে চেয়ে দেখল পঞ্চাশের বেশি মেসেজ। বন্ধু থেকে কাজিন, সকলেরই এক প্রশ্ন । "কী রে, কেমন হল"? ফুলশয্যার সারারাত ধরে যে ওর বর গিফ্ট খুলেছে, সিস্টার্ন সারিয়েছে আর পাম্প চালিয়েছে, তা কি লোককে বলা যায়? কাহন একটা চোখ মারা স্মাইলি পাঠিয়ে দিল সকলকে। যা মনে করার করে নাও।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-