মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

পি না কি

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
সন্ধ্যাপাখি

এক বসন্তের দিন । 

শীতে পাতা ঝরে, স্মৃতির মতনই সে রাস্তার একপাশে জড়ো হতে থাকে। অরণ্যের শাখা পাতা শূন্য শাখা –প্রশাখায় নতুন প্রাণ ফিরছে । অনেক কিছুই এই ঋতুতে হারিয়ে যায় । এত কিছু খালি হয়ে থাকে যে, চারপাশে প্রকৃতির অভাব বোধ হয়! এই হারিয়ে যাওয়া দৃশ্য শীতের একান্ত নিজের। এই হারিয়ে যাওয়া অনুভূতি নিয়েই, বসন্ত প্রকাশিত ।

শর্মিষ্ঠা বসন্তের বার্তা নিজের দু’ চোখ দিয়ে দেখছিল। গাছের শাখায় যৌবনকে আহ্বান করছে। শীতে হারিয়ে যাওয়া রূপ যেন ফিরে আসে, সেই রূপের প্রতিবিম্ব অনেকটাই নিজের মতন। সেখানে কখনো জোয়ার আবার কখনো ভাঁটা । ফুলের বুকে মধু জমেছে । মৌমাছির আনাগোনা দেখছে । সে মনে –মনে বুঝতে পারছে , এখন ঘরে বসে সময় নষ্ট করবার নয়। এই সময় ভালোবাসার । বনান্তরে , পত্রপল্লবে , পাখির কলরবে যে উচ্ছাস ভেসেছে, মানুষের দেহে তারই জোয়ার ! সারাদিনের অনবরত পরিশ্রমের মাঝেই, মানুষের হাতে সময় থাকেনা । প্রকৃতি নাছোড়বান্দা , জনবসতি ঘিরে তার আসর, অবস্থান, ছুঁয়ে যাওয়া হাওয়ায় বসন্ত মুখরতা । সবকিছু মাতিয়ে রাজপথ ছুটছে । 

রাজপথে গ্রাম্য মহিলারা, যুবতিরা মাথায় ফুলের ঝুড়ি নিয়ে চলেছে । ফলের পসরা রাস্তার দুইধারে। এদের রাজসভায় অনবরত যাতায়াত । রাজধানীর ভিতর , রাজপ্রাসাদ ছুঁয়ে থাকা এই ভিড় , এতটাই জীবন্ত , যেন প্রতিমুহূর্তে নিজের বেঁচে থাকা উপভোগ করে চলেছে । 

মানুষেরা সকলেই রাজাকে নিজের ঘরের লোক বলে মনে করে । বসন্তের হাওয়ায় রাজধানীর অলিগলি ছুঁয়ে , মাতিয়ে শেষ অব্দি রাজমহলের অন্দরমহলে ভাসিয়ে গেল ! এখানে বিলাসব্যাসনে কখনই খামতি নেই । তাও যখন প্রজারা সুখে থাকে , রাজপরিবারের মুখে হাসি থাকে । এখন প্রজারা শীতের রুক্ষতাকে ভুলবে , বসন্তের রঙে । 

রাজমহলের এই কক্ষের জানলায় দুটো কনুই রেখে , তার উপর মুখ রেখে চাপা রঙের এক অপরূপা লাবণ্যময়ী বছর কুড়ির কন্যা বসে আছে । গায়ের রং পোড়া মাটির মতন আর তাকিয়ে দেখছে বাইরের দৃশ্য , কেউ বুঝি এঁকেছে , খুব যত্ন করে । পোড়া ইঁটের বাড়ি , নিজেদের মতন তাদের নিজস্ব উঠান আছে , সেখানে নানা রকমের ফুল গাছে সাজানো । এই নগর বেশ সুন্দর , আর বৈভবে ভরা । এখানকার অধিবাসীরা সকলেই হয়ত রাজার সমকক্ষ নয় , তবে একেবারে পিছিয়ে পড়া শ্রেণীও নয় । রাজাকে প্রভু হিসেবে নয় , নগরের প্রতিটি পরিবারের অভিভাবক হিসেবে দেখে । 

এখন মধ্যাহ্ন । আকাশের মাঝখানে সূর্য নিজের গুণকীর্তণ প্রচারে এতটুকু খামতি রাখেনি । বসন্তের রোদ্দুর অকৃপনতায় ছড়িয়ে পড়ছে । মেয়েটি জানলা দিয়ে , নগরের প্রবেশ মুখ থেকে রাজপ্রাসাদের প্রাঙ্গণ পর্যন্ত যে সবুজ গালিচায় ঢাকা পথ আছে , যেখান দিয়ে একজনের আজ এই সময় আসবার কথা আছে । তার জন্যই সকাল থেকে শর্মিষ্ঠার দুটো চোখ অপেক্ষা করছে । সে খুব সুন্দর করে চুলে বেনুনি করে , সুগন্ধি ফুলে ঢেকে দিয়েছে । অন্তর্বাসহীন কাপড়ে নিজেকে সাজিয়েছে । দু’হাত পোড়া মাটির অলংকারে ঢাকা। গভীর চোখ । পাতলা ঠোঁট । লম্বা মুখে , গভীর কালো চুল অগোছালো রেখার মতনই , ছড়িয়ে আছে । মনের উদ্বিগ্নতা , দেহে প্রভাব ফেলেছে ; দুটো নিটোল স্তন যুগল এর খাঁজে যে কণ্ঠ মালাটি রয়েছে , ক্রমশই উঠছে আর নামছে । ঘন –ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে । 

আজ সারাদিন কেটে যাবে, দেখা হবে কি ? সেই যুবকের স্বপ্ন চোখে মেখে রয়েছে । তার স্পর্শ সহজে ভুলতে পারছে কই ! লোমশ বুকে জমতে থাকা স্বেদের গন্ধ , নরম নিঃশ্বাসের পাগলামি ,শক্ত সমর্থ ক্ষত্রিয় বাহু , পুরু ঠোঁটের মাঝখানে সাদা দাঁত , মুক্তোর মতন প্রতিফলিত হাসি , সব কিছু নিয়ে এক পরিপূর্ণ পুরুষ । কথাগুলি মনে আসতেই , অজান্তেই নিজের চোখ ডান দিকের স্তনে চলে গিয়েছে, বৃন্তের খুব কাছেই কামড়ের দাগ । রাজা যযাতি , এক ডুবন্ত সূর্যের আলোয় , ক্ষয়িত বিকেলে , গোপন স্থানে , প্রেমচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল । একমাস আগে , কথা দিয়েছিল - এই দাগ মিলিয়ে যাবেনা ; তার আগেই তাদের আবার মুখোমুখি হতে হবে । আরেকটা দাগ দিয়ে যাবে , পুরানো দাগটার কাছেই । সে প্রেমিক , প্রেমিকার শরীর -মনে তার অবারিত দ্বার । 

শর্মিষ্ঠা মনে – মনে ভাবছে , যযাতি নিষ্ঠুর । সে বোঝেনা , নারী যখন পুরুষের ভালোবাসার স্বাদ পায় , তাকে খাঁচায় বন্দী করে রাখা দুর্দমনীয় । সে উড়বে । ভালবাসার চিহ্ন তার কাছে অলংকারের চেয়েও দামি । এই চিহ্ন নিতে যতই মুখ লাল হয়ে উঠুক না কেন , সে প্রতি রাতে এই স্মৃতি ভাবতে থাকে , আর অদ্ভুত এক তৃপ্তি , বিহ্বলতায় ভেসে যায় ! 

মন ভালো নেই । রাজা যযাতিকে যতক্ষণ না দেখতে পাচ্ছে , অবস্থার পরিবর্তনেরও সম্ভাবনা কম । সে পুরুষ চুম্বকের মতনই , শর্মিষ্ঠাকে আকর্ষণ করে চলেছে । প্রথম দিন , রাজদূত খবর নিয়ে এসেছিল । দৈত্য গুরু শুক্রাচার্য নিজে ছিলেন দায়িত্বে । অসুর রাজ বৃষপর্বার মেয়ের সাথে , যযাতির বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল । শুক্রাচার্য বৃষপর্বাকে রাজি করিয়ে নিয়ে , যযাতির কাছে প্রস্তাব পাঠিয়ে দেয় । এই সম্পর্কে প্রথমে ভীষণ একটা টানাপোড়েন ছিল ; ব্রক্ষ্মার পুত্র প্রজাপতি , তার বড় মেয়ে অদিতি , তার ছেলে যযাতি । এমন উচ্চবংশের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করা , যে কোন অসুর পরিবারের জন্য গর্বের । যযাতি খুব অল্প বয়স থেকেই তার পুরুষোচিত রূপের  জন্য বহু কাঙ্ক্ষিত পাত্র ছিল । নিজেও আধুনিক ও স্বাধীনচেতা । এত কিছু নিয়েও , শুক্রাচার্য কথা ফেলতে পারল না। শীতের সকালে রাজমহল থেকে বেরিয়ে পড়ল , শর্মিষ্ঠার সাথে একান্তে দেখা করবে বলে । সে নিজেও চাইছে , যিনি তার পত্নী হবে , সে যেন তার মনের মতন হয় । 

-সখী , আজ এমন ভাবেই অপেক্ষা করবে ! মধ্যাহ্নের মুহূর্ত অনেক আগেই ফুরিয়ে গিয়েছে।দেখো আকাশে বিকেলের রঙ প্রসারিত । তুমি নিজের ক্ষতি করছ । সামনের মাসেই তোমায় রাজা যযাতির বাড়ি যেতে হবে । এই অনিয়ম ঠিক না। তখন তারা যদি ভাবেন , তাদের বাড়ির মেয়েকে অসুস্থ করে পাঠিয়েছি !

কিছুক্ষণ বাদে হুঁশ এল । শর্মিষ্ঠা দেখল , শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মেহগনি । তার খুব কাছের মানুষ । সুখ দুঃখের সাথী । 

-মেহে , তুই জানিস সে আমায় কত ভালোবাসে ! 

-জানব না । সেই দিন আমিও যে তোমার সাথে ছিলাম । আমি ভুলিনি । তোমাদের প্রথম দেখা। শুধু শুনেছিলাম রাজা যযাতি রূপবান । সেই দিন চোখ দুটো দিয়ে দেখলাম গো ! এই রূপের আগুনে , নারীরা আত্মহুতি দিতে দেরী করবে না । যযাতির কথা শুনেছি , সেই দিন দেখলাম । তাকে একবার ভালোবেসে ফেললেই বিপদ । হারানোর ভয় পেয়ে বসে । আমি তাকে ভালোবেসে ফেলতাম , ভাগ্যিস...

শর্মিষ্ঠা চোখটাকে ধারালো ফলার মতন তীক্ষ্ণ করে বলল 

-তাহলে তুই নিতিস ওনাকে ।

-তাহলে তুমি আমায় ছাড়তে সখী ?

শর্মিষ্ঠার থুতনিতে হাত রেখে বলল । মেহগনি তাকিয়ে আছে । 

-তাহলে আমি বেঁচে যেতাম । এত ব্যাথায় ভুগতে হত না । বুঝলি ! তুই এখন যা , আমায় বিরক্ত করিস না। 

মেহগনি দেখল, শর্মিষ্ঠাকে একা রেখে গেলেই, সে আবার মনখারাপে ডুবে যাবে । তারচেয়ে গল্প করে , সময় কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে । 

-আচ্ছা এমনই সে দিন ছিল না।

-ধুর , তোর দেখি মনে নেই ! আমরা পিতার আজ্ঞা না নিয়ে গিয়েছিলাম । মনে আছে। শীতের সকাল , তুই আর আমি গিয়েছিলাম বনভোজনে ।

-আছে মনে শর্মিষ্ঠা । মাত্র একমাস আগের কথা ...... 



২।

-সখী , রাজামশাই জানতে পারলে রক্ষা নেই । 

-জানবে কেন ? আমরা এতো গোপনীয়তা রক্ষা করব বলেই , সকাল হতেই বেরিয়েছি ।

-তুমি শর্মিষ্ঠা । অসুর রাজা বৃষপর্বার কন্যা । তুমি ভাবছ , কেউ আমাদের পিছু নেয়নি !

-চুপ কর । মেয়েদের বিশ্বাস না করা । তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা , অসুর সংস্কৃতি সমর্থন করে না । তোর মনে হচ্ছে পিতা এমন কিছু করে , আমাদের অপমান করবেন?

-তুমি যেটাকে অপমান ভাবছ ।আমি সেটা পিতার দায়িত্ব বলব । আমাদের সুরক্ষা নিয়ে উনি চিন্তিত হতেই পারেন ।

-তা পারেন মেহগনি । তবে আমি কি বর্শা চালনায় পারদর্শী নই ? 

-হায় , এ কথা স্বয়ং ইন্দ্র অব্দি স্বীকার করবেন । লাবণ্যের আগুনে ঝলসে ,তোমাকে যে হতভাগ্য আক্রমণ করবে , তার নিস্তার নেই । বর্শার প্যাঁচ তাকে শেষ করে দেবে । 

-দেখ এই বন শিতে নিজের মতন সেজে আছে । এই ওই দেখ । সামনে সরু রাস্তা , বনের ভিতর দিয়ে এগিয়েছে । সামনের দিকে আয় । সরোবর দেখতে পাচ্ছি । জলের সাথে সূর্যের আলো মিশছে ! আয়... 

শর্মিষ্ঠা আর তার সাথী মেহগনি পাশা –পাশি হাঁটছে । 

-দাঁড়াও ......... 

আচমকাই যেন , পুরুষালি কণ্ঠের ধ্বনিতে , শীতে গুটিয়ে থাকা অরণ্য , জেগে উঠল ! শর্মিষ্ঠারা পিছনে তাকিয়ে দেখল , বেশ লম্বা আর স্বাস্থ্যবান এক সুপুরুষ দাঁড়িয়ে ।

-আপনি !

-তোমরা কে ? এই অরণ্যে দেহরক্ষী ছাড়াই এসেছ ? খুকি ...

শর্মিষ্ঠা বলল – সাবধান , আসুন আমরা যুদ্ধ করি । 

পুরুষটি হাতের অস্ত্র ফেলে দিল । বলল – করেন কি ! নিজের জন্য পাত্রী পরখ করতে গিয়ে , শেষে , নিজের পাত্রীর হাতেই প্রাণ হারাই আর কি ! 

-তাই বলুন । রাজা যযাতি । আপনাকে হারানোর মধ্যেও সুখ আছে । আমায় সেই সম্মানটুকু দেবেন না ?

-আপনার মতন সুন্দরীর জন্য আমার গোটা জীবন রইল । এমন লাবণ্য আমি সত্যিই অপ্সরাদের মধ্যেই দেখেছি । তাদের মধ্যে ব্যক্তিত্ব রয়েছে । তবে স্বতন্ত্রতা কোথায় ! আমি অনেক দিন বর্ষার মেঘেদের দেখেছি । ভেবেছি , তাদের ভিতরে জমে থাকা জলের গভীরতা । তুমি সেই মেঘ , যার শরীর জুড়ে শুধুই বৃষ্টির হাতছানি । আমাকে ভিজিয়ে দেবে ?

এমন কাতর আহনে , নারী নিজেকে গুতিয়ে রাখে। লজ্জা ভেসে উঠছে । শর্মিষ্ঠা বুঝতে পারছে না, এই আহ্বান এত নিকট ভাবে চলে এল ! আজ বিশেষ গুপ্তচর মারফৎ এই স্থানে দেখা করবে বলেছিল । সেই মতনই দেখা । তাদের বিয়ের কথা রাজধানীতে অনেকটাই এগিয়েছে । যযাতি বলেছিল , শর্মিষ্ঠাকে দেখে তারপর বিয়ের কথা দেবে । দুই পরিবারের অজান্তেই তারা পরস্পরের সাথে দেখা করবে । 

-শর্মিষ্ঠা আমাকে চিনলে কেমন করে ?

-আপনি সূর্যদেবকে লুকিয়ে রাখতে পারবেন ? চন্দ্রের আলোয় যখন চরাচর ভাসতে থাকে ! তখন যে স্বপ্ন দেখে পৃথিবী , আপনি সেই সময়টুকুকে অস্বীকার করবেন ? 

-মানে ?

-যযাতি একাধারে তেজস্বী আবার প্রেমিক , স্বপ্নালু ,তাকে চিনতে হয়না । বুঝতে হয় । আপনাকে বুঝেছি । 

যযাতি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল । 

মেহেগনির দিকে তাকিয়ে বলল – আমি , তোমার দিদিকে নিয়ে একান্তে সময় কাটাবো । ভয় নেই , শর্মিষ্ঠার অপমান হবে না। 

ওরা দুজনে কিছুটা দূরে , সরোবরের কাছেই বসল । শর্মিষ্ঠা মাথা হেলিয়ে দিয়েছে , যযাতির বুকে । পুরুষালি হাত দিয়ে শর্মিষ্ঠার মাথা বুলিয়ে দিল । 

-শর্মিষ্ঠা , তুমি আমার প্রেরণা হবে ?

-না । আমি আপনার দাসী । 

-ছিঃ অমন কথা বলেনা । আমি নারীদের দাসত্বে বিশ্বাসী নই । 

-জানি । রাজা যযাতি সাধারণ বংশজাত নন । তাদের আভিজাত্য , গরিমা , এখানে আর্য ভূমিতে প্রশংসিত । 

-শর্মিষ্ঠা এটাও জেনে রেখো , আমাদের সবটাই ভালো নয় । এক গভীর ক্ষত আছে । খুব ছোটবেলা থেকেই , আমি নারী সঙ্গ করেছি । আমি চাইনা কোন এক নারীর কাছে বাঁধা পড়তে । 

-আমি আপনাকে চাই । আমার দিক থেকে আপনি কখনই বাঁধা পড়বেন না । আমি আপনার ভালোবাসা চাই ।

-তুমি এত সুন্দর যে , তোমায় কেউ না ভালোবেসে থাকতে পারবেনা । 

-আর আপনি খুব যাদু জানেন । এমন কথা বলেন , আমি হারিয়ে যাচ্ছি ! মন বলছে সারাদিন রাতব, আপনার সাথে গল্প করি ।

- শর্মিষ্ঠা , ভালোবাসার মানুষরা যখন মিলিত হয় , তারা নিজেদের ভালোবাসার মুহূর্ত উদযাপন করে ।

শর্মিষ্ঠা লজ্জায় মাথা নিচু করেছে। যযাতি বুকের বস্ত্রের আঁচলটা সরিয়ে দিল। ডানদিকের স্তনের উপর কামড় দিল । নরম , উষ্ণ মাংসপিণ্ড । বলল ...

-একে প্রেমরেখা বলে । সামনের বসন্তে তোমার পিতার সাথে কথা বলতে যাব ।


-তুমি , কোথায় হারিয়ে গেলে ! 

মেহগনির কথায় , শর্মিষ্ঠার হুঁশ ফিরল । একমাস আগে , এক শীতের দিনে ফিরে গিয়েছিল । 

-দেখো , এখন সন্ধ্যা । আমি আসছি । 

এমন সময় এক দাসি এসে খবর দিল ,- রাজা যযাতি দেখা করেতে চাইছেন । 

এই অব্দি শুনে শর্মিষ্ঠার চোখে জল চলে এলো ।

৩।

কক্ষে , দু’জনে গোপন ভাবে দেখা করেছে । যযাতি চেয়েছিল একান্তে দেখা করতে । শর্মিষ্ঠা দেখল , আলোর শিখা কাঁপছে , কম্পিত রেখার ছায়া , ঘরের মেঝেতে আলপনার মতনই বিছিয়ে আছে । এত কিছুর ভিতরেও , সামনে যে মানুষটি বসে রয়েছে , মুখে হাসি নেই ।

শর্মিষ্ঠা দেখল , যযাতির মুখ পৃথিবীর সেরা অসুখী মানুষের মতনই হয়ে উঠেছে । এমনটা হওয়ার ছিল না , কেননা এই বসন্তের রাতে , প্রেমিক পুরুষেরা , মহাপুরুষ হয়ে ওঠে । যযাতি আর শর্মিষ্ঠা এই স্থানে একা , তাদের ভিতরে এই শূন্যতা থাকবার কথা ছিলনা । তাই হল । যযাতি মাথা নামিয়ে , বসে রয়েছে । শর্মিষ্ঠা পিছনে দাঁড়িয়ে । ঘাড়ে হাত রেখে বলল ।

-আপনার , কিছু হয়েছে ? আমায় বলুন । 

যযাতি চুপ হয়ে আছে । চোখের মনি স্থির । শর্মিষ্ঠা পাশে এসে বসল । মাথায় হাত বুলিয়ে বলল 

-আপনার মুখ বলছে , চোখ বলছে , ভালো কিছু ঘটেনি । আপনি আমাকে বলবেন না ? আমি আপনার দাসি হব বলেছিলাম । মনিবের দেখাশোনা করা দাসীর ধর্ম । সেখান থেকে আমাকে পতিত করবেন না ।

যযাতি মুখ তুলল । তার চোখে , গোধূলি পরবর্তী সন্ধ্যার ছায়া ভাসছে । সে স্থির হয়ে বসেছে । আচমকাই দু’হাত দিয়ে শর্মিষ্ঠার কোমর জড়িয়ে বলল 

-যে নিজেই ধর্ম থেকে সরে গিয়েছে , তার কাছ থেকে ধর্মের আশা রাখছ ! আমি আজ থেকে তোমার চোখে আগের মতন থাকব না। আমার প্রতি যে সম্মান রয়েছে , সে জায়গা নিজের দোষেই নষ্ট হল !

-আপনি আমাকে বলুন , সন্ধ্যা অতিক্রান্ত রাতের প্রথম প্রহরে , রাজা যযাতির মনের উদ্যানে অস্তায়িত মেঘের বার্তা কেন ? এতটুকু যদি আমাকে ভালোবেসে থাকেন । 

যযাতি মুখের উপর নিজের হাত রেখে বলতে শুরু করল 

আমার রাজ্য থেকে তোমাদের রাজধানীতে আসার মাঝে উপবন পড়ে । আমি তখন ঘোড়ার বিশ্রামের জন্য সেই বনের এক নিরিবিলি স্থান নির্বাচন করলাম । তখন রাতের দ্বিতীয় প্রহর । আমি এক বিরাট গাছের তলায় ঘোড়া বেঁধে রেখেছিলাম । আকাশে সাদা চাঁদ ভাসছে । জ্যোৎস্নায় ভিজে গিয়েছে বনের গাছ , পাতা । আমি মাথা তুলে তাকিয়ে আছি , আমার সাথে রাতজাগা পাখিরা জেগে রয়েছে । 

মধ্যরাতে এক নারীর কান্নার স্বর শুনতে পেলাম ! আমি সেই স্বর অনুসরণ করতে – করতে এগিয়ে চলেছি । আচমকাই এক পরিত্যক্ত নোংরা আর ঝোপের মাঝখানে থাকা বাঁধানো জলাধার দেখলাম । বেশ অন্ধকার । সেখান থেকেই নারীর কণ্ঠস্বরটি আসছিল । দুটো পাথরের ঘর্ষণে , শুকনো কাঠে আগুন জ্বালালাম । জলাধারের মুখে ধরতেই দেখলাম , এক যুবতি ভিতরে বসে আছে ! শরীরে একখণ্ড কাপড় । মাথার চুল খোলা । চোখে আলোর প্রতিবিম্ব পড়েছে , অপরূপা হয়ে উঠল । শর্মিষ্ঠা তার দুই চোখে এক অদ্ভুত আকর্ষণ । আমি এই অচেনা নারীর প্রতি সেই ক্ষণেই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম ! রাজা যযাতির জীবনে এখনো অব্দি নারী সঙ্গের অভাব হয়নি । সেই মুহূর্তে নিজের ভিতরের তৃষ্ণা প্রকাশ পেল 

-আপনি ?

-আমি এক ব্রাক্ষ্মণ কন্যা । আমাকে আমার বন্ধু ইর্শাম্বিত হয়ে এই স্থানে ফেলে রেখে গিয়েছে । আমায় উদ্ধার করুন দেব । আপনার ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করুন । 

-আপনার হাত দিন । আমি গহ্বর থেকে উপরে তুলে নিচ্ছি । সাবধানে ।

আমি দেখলাম , যুবতির কনুইয়ে চিঁরে গিয়েছে ! রক্তের লাল সরু রেখা গড়িয়ে নামছে । 

-আপনার হাতে রক্ত , আমি পাতা মাখিয়ে দিচ্ছি । এক্ষুনি রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে ।

সেই যুবতির নরম ঠোঁট, আমার খুব কাছে । আমি তার ঘেমে থাকা শরীরের উত্তাপ অনুভব করছিলাম। সেইরাতে , কিছুই সাজানো ছিল না । আমি আচমকাই যুবতিকে নিয়ে ভেসে গেলাম ! তার নরম তামার বর্ণের মতন স্তন , গোলাপি আভায় মুড়ে থাকা বৃন্ত , জঙ্ঘা , পানের পাতার মতন সুগন্ধি স্ত্রী যোনি , রসালো ফলের মতন ঠোঁট , সব কিছু নিয়ে এক অনাবিল , অনভস্থ স্বপ্নে বিভোর হয়েছিলাম ।

অনেক ভোরে আমি ঘুম থেকে উঠে , নিজেকে নরম ঘাসের উপর পেলাম । দুজনেই ছিলাম বস্ত্রহীন , অগোছালো । 

শর্মিষ্ঠার দুই চোখ বেয়ে নিষ্ঠুর ভাবে জল গড়িয়ে নামছে । তার ভিতরটা জ্বলছে । যযাতি কখনই একজনের নয় , এই সত্য জেনেও তাকে নিজের মতনই ভালোবেসেছে । প্রতিটা নারী এমনই হয় , যাকে নিজের মনে করে , তাকে নিজের সবটুকু দিয়েই ভালোবাসে । অন্য কোন নারীর সাথে ভাগ করে নিতে পারেনা । এমন স্বার্থপর প্রেম যযাতি চেয়েছিল । শর্মিষ্ঠার ভালোবাসা পেয়েও সে নিঃস্ব । রাজা যযাতির কাছে নতুন মেয়ের প্রেমে পড়া , নতুন কিছু নয় । তাও কোন কিছুতেই আর পাঁচজনের মতন এই অনামি নারীকে , সে অস্বীকার করতে পারছে না! 

শর্মিষ্ঠা বলল – আপনি তাকে ভালোবেসেছেন ?

-না ।

-সত্যি ? নাকি মন রাখবার জন্য বললেন ?

-তোমার কী মনে হচ্ছে ?

যযাতি হাসল । বলল 

-তুমি তার পরিচয় জানবে ? 

-বলুন... সে কোন দেবতার কন্যা বা বোন ? আপনাদের পালটি ঘর । নিশ্চই দেবীই হবেন । 

-হ্যাঁ । সুন্দরি । উচ্চ বংশজাত । সন্দেহ নেই । তবে আমার চোখে আর হৃদয়ে তোমর স্থান কেউ নিতে পারবে না । 

-তাও তো দিলেন । আপনি আমাকে বিয়ে করতে পারবেন ? 

-না । পারব না। 

-আমি এই অবজ্ঞারই যোগ্যা । আপনি তার পরিচয় দিন ।

-সে অসুর গুরু শুক্রাচার্যের কন্যা আর তোমাদের আশ্রিতা দেবযানী ।

-মানে ?

-আমাকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছে । তাকে যেন ছেড়ে না যাই । যেহেতু আমি তাকে উদ্ধার করেছি , তাই এখন থেকে আমিই তার স্বামী । তাইতো বিশ্বাস করে আমাকে সব কিছু দিয়েছে। আমায় এখন তাকে বিয়ে করতেই হবে । আমি বাধ্য । 

-আপনি বলেন নি , আপনার বাগদত্তা আমি । আমাদের দুই পরিবারের বিয়ের কথা হয়েছে । আপনি এত চুপ কেন ? 

-আমি সব কিছু বলেছি । দেবযানী নাছোড়বান্দা । ওর যুক্তি হচ্ছে , আমার প্রধান রানী হওয়ার অধিকার একমাত্র দেবযানীরই । 

শর্মিষ্ঠা চুপ করে আছে । যযাতি চোখ বন্ধ করে বসে আছে , মাথায় হাত দিয়ে । জীবনে এমন একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারবে, ভাবতেও পারেনি ! শর্মিষ্ঠাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। আজ সব কিছুই নষ্ট হতে চলেছে । দেবযানীকে বিয়ে না করা মানে , আর্যাবর্তে নিজের শত্রু বৃদ্ধি করা । শুক্রাচার্য নিজের মেয়ের অপমানের প্রতিশোধ নেবে । আবার অসুরের সাথে বিয়ের জন্য দেবতাদের সহায়তা থেকেও বঞ্চিত হবে । নিজের সম্মান ও ক্ষমতা হারাবে ! 

যযাতি বলল – শর্মিষ্ঠা , শুনেছি তোমরা স্নানের পর পোষাক নিয়ে নিজদের মধ্যে ঝামেলা করেছিলে । সেখানে ঝগড়া থেকেই নাকি দেবযানীকে হত্যা করতে চাও ।

-আর কিছু । কেননা আমার বাবাকে সে অনেক বিশ্রী কথা বলেছে । তবে তাকে কিন্তু আমি খুন করতে চাইনি । তাকে অন্য একজনের পরামর্শে গুপ্তহত্যা করবার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল ।

-কেন ?

-আছে এক কারণ । সেই সব বাদ দিন । মার মনে হয় আমাদের এক্ষুনি গুরুদেবের কাছে যাওয়া উচিত । তিনিই সহায়তা করবেন । 

-তিনি নিজের মেয়ের পক্ষ নিয়ে বলবেন ।

-সে বলতেই পারেন । আচ্ছা সে যদি জানেন , দেবযানীকে কেউ গুপ্ত হত্যা করতে চেয়েছে । তুমি সেই গুপ্তঘাতকের নাম বলও ।

শর্মিষ্ঠা চুপ করে রইল । ধীরে –ধীরে বলল –দৈত্য গুরু শুক্রাচার্য নিজেই , দেবযানীকে গুপ্তহত্যা করতে চেয়েছিলেন । তার আদেশেই আমার সেনারা তাকে সেই পরিত্যক্ত জলাধারের ভিতর ছুঁড়ে ফেলেছিল । ভেবেছিলাম ভয়ে আর ক্ষুধায় মৃত্যু হবে । ভাগ্যের পরিহাস দেখুন , সে নিজেই স্বয়ং মৃত্যু হয়ে আমার জীবনে প্রবেশ করেছে ! 

যযাতি গভীর চিন্তায় ডুবে গেল । পিতা নিজেই নিজের কন্যাকে হত্যা করতে গিয়েছিলেন ! কেন ? 

৪ ।

প্রায়ন্ধকার কক্ষে , ষাটটি বসন্ত অতিক্রান্ত এক পুরোহিত বসে আছে । কালো রঙের উত্তরীয় উর্দ্ধাংশ আর নিম্মাংশ ঢেকেছে । ভ্রুর মাঝখানে হোমের কালো টিকা । সে একটানা সামনেই জ্বলতে থাকা আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে ।

একটা নাটকের সে সফল নাট্যকার । এই নাটকের প্রধান চরিত্র শর্মিষ্ঠা , যযাতি আর দেবযানী । নিজেরাও জানেনা , নাট্যকারের ষড়যন্ত্রের ঘুঁটি তারা । এমন এক পরিকল্পনার পিছনেও রয়েছে প্রস্তুতি পর্ব । দীর্ঘ দিন ধরে একটু –একটু করে তৈরি হয়েছে সে। অসুর আর দেবতাদের সংগ্রামে , সত্তরের যুবক অসুর পক্ষের সেনাপতি । 

তার মেয়ে দেবযানী । যাকে গুপ্তহত্যা করতে গিয়েও ব্যর্থ হলেন ! তার চরেরা এই খবর কানে পৌঁছিয়ে দিয়েছে । সে আপাতত অন্য ভাবে ভাবছে । যেভাবেই হোক রাজা যযাতির সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে । এই উদ্দেশ্যে শর্মিষ্ঠাকেও ব্যবহার করবে ।

শুক্রাচার্য চোখ বন্ধ করে গভীর নিঃশ্বাস নিল । দেবতাদের সাথে জিততেই হবে । 

দেবযানীর অতীত বলছে , সে খুব একটা ভরসাযোগ্য নয় । তাই শর্মিষ্ঠাকেই দাসী হিসেবে , নিজেদের পক্ষের গুপ্তচর নিয়োগ করবে । সে দেবযানীর সাথে যযাতির গৃহে প্রবেশ করবে । দেবযানী , আর বিশ্বাসের জায়গায় নেই । কেন ? একটা অতীতের অভিজ্ঞতা , চিরদিনের মতনই পিতার মনে , নিজের একমাত্র কন্যার প্রতি অবিশ্বাসের বীজ বপন করেছে ।

খুব কষ্ট । সে এই পর্বে এসে কিছুতেই হারতে রাজি নয় । রাজা বৃষপর্বা সাথে এই নিয়ে কথা হয়ে গিয়েছে । সে ভাবছিল , সন্ধ্যার ছায়ায় যে পাখি ঘরে ফিরে আসে , সে সাথে অবসন্নতা নিয়েই ফেরে। নিজের মেয়ের বেঁচে ফিরে আসাটা পিতা হিসেবে তার কাছে সুখের কিনা ? 


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-