মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

মৌ দাশগুপ্ত

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ | |
Views:
মৃত্যু ধুসরতা ও  কবি জীবনানন্দ দাশ
আমি কবি- সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আনমনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল- মেঘের পানে! 
মৌন নীলের ইশারায় কোন কামনা জাগিছে প্রাণে !

( জীবনানন্দ দাশ )

জীবনানন্দ দাশ নিসর্গের কবি, ধূসরতার কবি, নির্জনতার কবি। ১৯৫২ খৃস্টাব্দে তাঁর জনপ্রিয় কবিতার বই বনলতা সেন নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্রসাহিত্য সম্মেলন-কর্তৃক ঘোষিত "রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার" জয় করে। ১৯৫৪ খৃস্টাব্দের মে মাসে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। বইটি ১৯৫৫ খৃস্টাব্দে ভারত সরকারের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করে।জীবদ্দশায় তাঁর ৭টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশিত ঝরাপালকশীর্ষক কাব্যগ্রন্থে তাঁর প্রকৃত কবিত্বশক্তি ফুটে ওঠেনি, বরং এতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার ও সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রকট প্রভাব প্রত্যক্ষ হয়। তবে দ্রুত তিনি স্বকীয়তা অর্জন করেছিলেন। দ্বিতীয় কাব্যসংকলন ধূসর পাণ্ডুলিপি-তে তাঁর স্বকীয় কাব্য-কৌশল পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। ‘সাতটি তারার তিমির’ প্রকাশিত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুবোর্ধ্যতার অভিযোগ ওঠে। নিজ কবিতার অবমূল্যায়ন নিয়ে জীবনানন্দ খুব ভাবিত ছিলেন। যে কারণে কবি নিজেই নিজ রচনার কড়া সমালোচক ছিলেন। তাই সাড়ে আট শত কবিতার বেশি কবিতা লিখলেও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও কাব্যসংকলনে প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন। এমনকি রূপসী বাংলার সম্পূর্ণ প্রস্তুত পাণ্ডুলিপি তোরঙ্গে মজুদ থাকলেও তা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি জীবনানন্দ দাশ। কবির মৃত্যুর পরে “রূপসী বাংলা (১৯৫৭, খসরায় কবি স্বয়ং নাম দিয়েছিলেন বাংলার ত্রস্ত নীলিমা )”, “বেলা অবেলা কালবেলা(১৯৬১)”, “মনবিহঙ্গম(১৩৮৬ বঙ্গাব্দ)”, “আলোপৃথিবী(১৩৮৮ বঙ্গাব্দ)”, এবং “হে প্রেম, তোমারে ভেবে ভেবে(১৯৯৮)” এ প্রকাশ পায়। প্রাবন্ধিক জীবনানন্দের প্রবন্ধ “কবিতার কথা”-ও প্রকাশিত হয় কবির মৃত্যুর পরে ১৩৬২ বঙ্গাব্দে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দ অবধি প্রকশিত তাঁর রচিত উপন্যাসের সংখ্যা ২১ এবং ছোটগল্পের সংখ্যা শতাধিক। তিনি সম্পূর্ণ নিভৃতে উপন্যাস-ছোটগল্প লিখেছিলেন এবং জীবদ্দশায় একটিও প্রকাশ করে যান নি। কবিতায় যেমনি, কথাসাহিত্যেও তিনি তাঁর পূর্বসুরীদের থেকে আলাদা, তাঁর গল্প-উপন্যাসে আত্মজৈবনিক উপাদানের ভিত লক্ষ্য করা যায়, যেমন-"মাল্যবান" । কিন্তু তাই বলে সবরচনাগুলোই আত্মজৈবনিক নয়। জীবদ্দশায় নয়, মৃত্যুর পরেই তিনি বাংলাভাষায় আধুনিক কবিতার পথিকৃতদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে ট্রাম দুর্ঘটনায় আহত হন কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে ভর্তি করা হয় শম্ভূনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে। এ সময় ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ-সহ অনেক তরুণ কবি জীবনানন্দের সুচিকিৎসার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস এ ব্যাপারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধেই পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কবিকে দেখতে এসেছিলেন যদিও এতে চিকিৎসার তেমন উন্নতি কিছু হয়নি। জীবনানন্দের অবস্থা ক্রমশ জটিল হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন কবি। চিকিৎসক ও সেবিকাদের সকল প্রচেষ্টা বিফলে দিয়ে ২২শে অক্টোবর, ১৯৫৪ তারিখে রাত্রি ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। 

১৪ অক্টোবর "জলখাবার" "জুয়েল হাউজের" সামনে দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন জীবনানন্দ দাশ। শুধু অন্যমনস্ক নয়, কী এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন কবি। চলন্ত ডাউন বালিগঞ্জ ট্রাম স্পটিং স্টেশন থেকে তখনো প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ হাত দূরে। অবিরাম ঘণ্টা বাজানো ছাড়াও বারংবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করছিল ট্রাম ড্রাইভার। যা অনিবার্য তাই ঘটলো। গাড়ি থামল তখন, প্রচন্ড এক ধাক্কার সঙ্গে-সঙ্গেই কবির দেহ যখন ক্যাচারের ভিতর ঢুকে গেছে। ক্যাচারের কঠিন কবল থেকে অতিকষ্টে টেনে-হিঁচড়ে বার করলেন সবাই কবির রক্তাপ্লুত, অচেতন দেহ। কেটে, ছিঁড়ে থেঁতলে গেছে এখানে-সেখানে।।....... চুরমার হয়ে গেছে বুকের পাঁজরা, ডান দিকের কণ্ঠা আর উরুর হাড়।" ( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায়)। রহস্যের কবি জীবনানন্দের মৃত্যুটাও বড় রহস্যাবৃত। 

জীবনানন্দের যে সব বিখ্যাত পংক্তি বাঙালী পাঠকের মুখে-মুখে ঘোরে, তার প্রায় সবকটিতেই জীবন সম্পর্কে এক অদ্ভুত নিরাসক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। বিশেষত: তাঁর শেষের দিকে লেখা কবিতাগুলোয় দু’টি শব্দের বারবার প্রয়োগ বড়চোখে লাগে, এক- হেমন্ত আর দুই- মৃত্যু। 

‘চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা-ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল!
প্রচুর শস্যের গন্ধ বুকে তার থেকে আসিতেছে ভেসে
পেঁচা আর ইঁদুরের ঘ্রাণে ভরা আমাদের ভাঁড়ারের দেশ’; 

অথবা,

‘হেমন্তের রৌদ্রের মতন
ফসলের স্তন
আঙুলে নিঙাড়ি
এই ক্ষেতে ছাড়ি
অন্য ক্ষেতে চলিব কি ভেসে
এ-সবুজ দেশে
আরো একবার’—

এমন পঙিক্তমালায় হেমন্তের জীবনদায়ী রূপ ফুটে ওঠার পাশাপাশি 

‘সমস্ত পৃথিবী ভ’রে হেমন্তের সন্ধ্যার বাতাস
দোলা দিয়ে গেল কবে।—বাসি পাতা ভূতের মতন উড়ে আসে
কাশের রোগীর মতো পৃথিবীর শ্বাস—
যক্ষ্মার রোগীর মতো ধুঁকে মরে মানুষের মন’;

কিংবা,

‘যখন হেমন্ত আসে গৌড় বাংলায়
কার্তিকের অপরাহে হিজলের পাতা শাদা উঠানের গায়
ঝ’রে পড়ে, পুকুরের ক্লান্ত জল ছেড়ে দিয়ে চলে যায় হাঁস’; 

অথবা,

‘বনের পাতার মতো কুয়াশায় হলুদ না হতে
হেমন্ত আসার আগে হিম হয়ে প’ড়ে গেছি ঝরে’ 

জাতীয় কবিতাগুলোয় হেমন্ত বিনষ্টি, ক্ষয়িষ্ণুতা ও মৃত্যুর প্রতীক হিসেবে নজরে পড়ে। যুগজীবনের জটিলতায় তিনি মুষড়ে পড়েছিলেন। মানবজন্ম তাঁর কাছে অসাড় মনে হয়েছিল। প্রকৃতির বুকে আশ্রয় নিয়ে তিনি জীবনের জ্বালা মেটানোর জন্যই লিখেছিলেন : ঘাসের ভিতর ঘাস হয়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার / শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে, / [“ঘাস”, ‘বনলতা সেন’]

মৃত্যুরে বন্ধুর মত ডেকেছি তো,- প্রিয়ার মতন !-
চকিত শিশুর মত তার কোলে লুকিয়েছি মুখ ;
রোগীর জ্বরের মতো পৃথিবীর পথের জীবন ;
অসুস্থ চোখের পরে অনিদ্রার মতন অসুখ ;।

[“জীবন”, ‘ধূসর পান্ডুলিপি’]

এভাবে ‘ধুসর পান্ডুলিপি,’ ‘বনলতা সেন’ এবং ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় কবি প্রত্যক্ষভাবে মৃত্যুচিন্তা করেছেন।’ কখনো বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্বের যন্ত্রণায় উচ্চারণ করেছেন :

‘পাই নাই কিছু, ঝরা ফসলের বিদায়ের গান তাই গেয়ে যাই আমি, মরণেরে ঘিরে এ মোর সপ্তপদী।’  অথবা, ‘যে ঘুম ভাঙে নাকো কোনো দিন ঘুমাতে ঘুমাতে সবচেয়ে সুখ আর সবচেয়ে শান্তি আছে তাতে।

সত্যি বলতে কি, হেমন্ত আর মৃত্যু, শব্দদুটির প্রতি কবির যেন একধরণের ছেলেমানুষী পক্ষপাত ছিল। অথচ জীবনানন্দ কবি হিসাবে শব্দচয়নে যে ভীষণ খুঁতখুঁতে ছিলেন,তা ‘সে’ কবিতার পান্ডুলিপির কাটাকুটিতেই প্রমান। একটির জায়গায় একাধিক বিকল্প শব্দের প্রয়োগ রয়েছে কবির অনেক কবিতাতেই। সুতরাং মৃত্যু বা হেমন্তের পৌনঃপুনিক ব্যবহার কবি সচেতনভাবেই করেছিলেন তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। কবিতাগুলো কেমন যেন রহস্যময় হয়ে আছে এই হেমন্তের ধূসরতায় এবং মৃত্যুর অনিঃশেষ বন্দনায় ।মৃত্যুর প্রতি এই টানকেই কবির মৃত্যুরহস্যের ভিতর “আত্মহত্যা”র স্বপক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করান কিছু সমালোচক।

এ প্রসঙ্গে বলি,“কারণহীন স্বেচ্ছামৃত্যুকে তিনি প্রথমবারের মত বাংলা কবিতায় ব্যবহার করেছিলেন আট বছর আগের একদিন কবিতায়। এখানে কবি যেমন সরাসরি মৃত্যুকে এনেছিলেন তা কবি শেলীর Ode de the West Wind কবিতার সাথে তুলনীয়। ১৯৪৪ সালে জীবনানন্দ দাশের চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মহাপৃথিবী’ কবিতার নায়ক বেছে নিয়েছিলেন আত্মহননের পথ, এক দীর্ঘ দুঃসহ ক্লান্তি থেকে নিজেকে মুক্তি দিতে। 

জানি-তবু জানি
নারীর হৃদয়-প্রেম-শিশু-গৃহ-নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়-
আরো-এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;
আমাদের ক্লান্ত করে
ক্লান্ত-ক্লান্ত করে;
লাশকাটা ঘরে
সেই ক্লান্তি নাই;
তাই
লাশকাটা ঘরে
চিৎ হ’য়ে শুয়ে আছে টেবিলের ’পরে।

জীবনান্দের কাব্যচেতনায় সম্ভবত এখানেই প্রথমবারের মতো ‘আত্মহত্যা’ স্থান করে নেয়। জ্যোতির্ময় দত্ত বলেন: “ভাবতে অবাক লাগে জীবনানন্দের আগে বাংলা কবিতায় আত্মহত্যা প্রবেশ করে নি। স্থির বিশ্বাসে আত্মদানের নিদর্শন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য আছে। কিন্তু আত্মহত্যার উদাহরণ নেই। এবং ইউরোপীয় সাহিত্যেও অকারণ আত্মহত্যা নতুন। জীবনানন্দের আগে সেই ধারনা কি কোনো ভারতীয় আহ্বান করে নি ? দস্তয়ভস্কির আগে কোনো ইউরোপীয়কে ?” আবার কবিতাটি সম্বন্ধে জীবনানন্দ নিজে বলেছেন , “লাশকাটা ঘরের কবিতাটিকে আমার সমস্ত কাব্যের একটি শ্রেষ্ঠ representation হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। ঐ কবিতাটির নিকষে আমার সমস্ত কাব্য অধ্যয়ণ করতে যাওয়া ভুল।“ বুদ্ধদেব বসু আট বছর আগের একদিন কবিতার পঙক্তিগুলোর ব্যাপারে বলেছেন—‘মৃত্যু পার হয়ে বেজে উঠল জীবনের জয়োধ্বনি, আর সেই সঙ্গে নির্বোধ ও পাশবিক জীবনের প্রতি চৈতন্যের বিদ্রুপ!’ জীবনানন্দও এই ব্যাখ্যাই দিয়েছেন। কিন্তু জীবনানন্দকে যারা মৃত্যুবাদী বলে সমালোচনা করতে ভালোবাসেন, তারা এই ব্যাখ্যায়ও সন্তুষ্ট হননি। তাদের কথা হল— গোটা কবিতাজুড়েই এমন একটি আবহ, যা অতি প্রত্যক্ষভাবেই আত্মহত্যার প্রতি ইন্ধন যুগিয়ে যায়। অর্থাৎ এই একটি বিশেষ কবিতাটিকেই বারবার জীবনানন্দ দাশের আত্মহত্যার প্রামাণ্য লক্ষন বলে কাটাছেঁড়া করা হয়, তারসাথে যোগ হয় কবির জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত কিছু মৃত্যুবিলাসী রচনা আর দাম্পত্যকলহের গুঞ্জণ। ( যদিও শেষেরটি নিয়ে আমার আপত্তি আছে, আমার মতে এই সমালোচকরা জীবনানন্দের ব্যক্তিজীবন নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। যার কারণে তাঁদের সমালোচনা একমুখী প্রবাহে নেতিবাচক হয়ে ওঠে।) এইপ্রসঙ্গে কবির মাল্যবান উপন্যাসটিকেও অনেকে সাক্ষী মানেন। বলেন, মাল্যবান চরিত্রটির সাথে জীবনানন্দ প্রায় মিলে যান। উৎপলাকে দূর্মূখ , স্বার্থপর ঝগড়াটে দুশ্চরিত্র টাইপের দেখানোর কারণ নাকি চরিত্রটি কবিপত্নীর আদলে রচিত।যে কারণে উৎপলার প্রতি পাঠকমনকে একেবারে বিষিয়ে দেয়ার জন্য লেখকের অতিব্যস্ততা এবং উত্তেজনা লুকিয়ে রাখাও যায়নি।দীর্ঘ পঁচিশ বছরের দাম্পত্যবিষ যেন এই উপন্যাসে উজাড় করে দিয়েছিলেন জীবনানন্দ। অর্থাৎ, ‘মাল্যবান’ আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস হলে সাংসারিক ঝামেলার কারণে জীবনানন্দের আত্মহত্যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।

জীবনানন্দ গবেষক ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ এ বিষয়ে তিনি তার ডায়েরিতে লিখেছেন - if his wife died it would be beneficial for his writing. তিনি আরও বললেন “ লাবণ্য দাশ মহিলা হিসেবে অসাধারণ ছিলেন। জীবনানন্দ দাশ উৎকৃষ্ট স্বামী ছিলেন না। উৎকৃষ্ট পিতাও ছিলেন না। কাব্য নিয়েই ছিল তার যত সাধনা। ধ্যান। কবিতার জন্যই, সাহিত্যের জন্যই তিনি তিক্ত জীবনযাপন করে গেছেন।“ আত্মহত্যার পক্ষধারী সমালোচকরা তাদের মতবাদকে আরো পাকাপোক্ত করেন কবিপত্নী লাবণ্য দাশের উক্তি দিয়ে; "...মৃত্যুর পরপার সম্বন্ধে ওর একটা অদ্ভুত আকর্ষন ছিল। মাঝে মাঝেই ওই কথা বলতেন। বলতেন, মৃত্যুর পরে অনেক প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হয়। আর খালি বলতেন, আচ্ছা বলতো আমি মারা গেলে তুমি কী করবে? " (আমার স্বামী জীবনানন্দ দাশ : লাবণ্য দাশ)। আবদুল মান্নান সৈয়দ-সহ কেউ-কেউ ধারণা করেছেন হয়তো আত্মহত্যাস্পৃহা ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ। ডাঃ ভূমেন্দ্র গুহ মনে করেন জাগতিক নিঃসহায়তা কবিকে মানসিকভাবে কাবু করেছিল এবং তাঁর জীবনস্পৃহা শূন্য করে দিয়েছিল। মৃত্যুচিন্তা কবির মাথায় দানা বেঁধেছিল। তিনি প্রায়ই ট্রাম দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কথা ভাবতেন। এছাড়াও ভূমেন্দ্র গুহ জীবনানন্দের মধ্যে বাইপোল ডিজঅর্ডার আবিষ্কার করেছেন। তার মতে, এটা এক ধরনের মানসিক সমস্যা। এ জাতীয় সমস্যা থাকলে একজন মানুষ আনন্দের চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছাতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি প্রতিভাবান লেখক হলে, হয়ে ওঠেন অসম্ভব সৃষ্টিশীল। আবার এ রোগ থাকলে তিনি পৌঁছে যেতে পারেন হতাশার চূড়ান্ত জায়গাটিতে।

জীবনানন্দের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালকে উচ্ছল এক কবিহৃদয়কেই আমরা আবিষ্কার করি। সে ধারা অব্যহত ছিল পরবর্তীতেও। কবির জবানীতেই বলি, ‘আমাকে অনুভব করতে হয়েছে, খণ্ড-বিখণ্ডিত এই পৃথিবী, মানুষ ও চরাচরের আঘাতে উত্থিত, মৃদুতম সচেতন অনুনয়ও এক এক সময় যেন থেমে যায়, একটি পৃথিবীর অন্ধকার ও স্তব্ধতায় একটি মোমের মত যেন জ্বলে ওঠে হৃদয়, এবং ধীরেধীরে কবিতা-জননের প্রতিভা ও আস্বাদ পাওয়া যায়। এই চমৎকার অভিজ্ঞতা যে সময় আমাদের হৃদয়কে ছেড়ে যায়, সে সব মূহুর্তে কবিতার জন্ম হয় না, পদ্য রচিত হয়, যার ভেতর সমাজশিক্ষা, লোকশিক্ষা, নানারকম চিন্তার ব্যায়াম ও মতবাদের প্রাচুর্যই পাঠকের চিত্তকে খোঁচা দেয়।’ (কবিতার কথাঃ৭-৮)। পরবর্তী অনেক কবিতাতেই জীবনের প্রতি এক অনির্বার আকর্ষণ দেখা যায়। যেমন,

তবুও তো পেঁচা জাগে
গলিত স্থবির ব্যাঙ আরেক মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে
আরেকটি প্রভাতের অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে
টের পাই যুথচারী আঁধারের গাঢ় নিরুদ্দেশে
মশা তার অন্ধকার সংঘারামে জেগে থেকে
জীবনের স্রোত ভালোবাসে...

এই কবিতায় বয়সের ভারে জর্জরিত পেঁচাটাই তার জীবনতৃষ্ণা হয়ে বারবার ফিরে এসেছে।

থুত্থুরে অন্ধ পেঁচা অশত্থের ডালে বসে এসে চোখ পাল্টায়ে কয়
বুড়ি চাঁদ গেছে বুঝি বেনোজলে ভেসে
চমৎকার
ধরা যাক দুয়েকটা ইঁদুর এবার....

পেঁচার এই জীবনতৃষ্ণা এবং বেঁচে থাকার আকুতি শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দের মাঝেও ছড়িয়ে যায় কবিতটির শেষ লাইনে।যদিও এ কবিতায় পেঁচাকে অনেকেই মহাকালের রূপক বলেই মনে করেন আর ফড়িং, ব্যাং, মশার জীবনকে মানুষের জীবনের সাথে তুলনা করে কবিতায় জীবনানন্দের নিরন্তর মৃত্যু ভাবনারই বহিঃপ্রকাশ পেয়েছে বলে অভিমত পোষণ করেন। একই দ্বৈত ধারণার প্রতিফলন একাধিক কবিতায় ঘুরে ফিরে আসে। যেমন, 

হে প্রগাঢ় পিতামহী
আজও চমৎকার?
আমিও তোমার মতো বুড়ো হবো
বুড়ি চাঁদটারে করে দেবো কালিদহে বেনোজলে পার
আমরা দুজনে মিলে শূণ্য করে চলে যাব
জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার

এক গোপনীয় গূঢ় রহস্য লুকানো রয়েছে যেন এই ‘শূণ্য করে চলে যাব জীবনের প্রচুর ভাঁড়ার” শব্দবন্ধটির মধ্যে। জীবনের প্রতি টান নাকি অনীহা? আধাগ্লাস জল নাকি আধাগ্লাস শূণ্যের মত পাঠকের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গীতেই এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে। ‘ধূসর পান্ডুলিপি’-র দীর্ঘ কবিতা ‘জীবন’ এ কি বলেছিলেন কবি? 

‘মৃত্যুরেও তবে তারা হয়ত ফেলিবে বেসে ভালো!
সব সাধ জেনেছে যে, সেও চায় এই নিশ্চয়তা!
জেগে জেগে যা জেনেছ-জেনেছ তা-জেগে জেনেছ তা-
নতুন জানিবে কিছু হয়তবা ঘুমের চোখে সে!
সব ভালবাসা যার বোঝা হল—দেখুক সে মৃত্যু ভালোবেসে!’

তাহলে কবিতার নাম ‘জীবন’ কেন হল? কারণ পরের লাইনেই আছে জীবনানন্দের জীবনের জন্য তীব্র আকুলতা—

‘কিংবা এই জীবনেরে একবার ভালোবেসে দেখি!’

জীবনের প্রতি জীবনানন্দের অপ্রাপ্তির হাহাকার ছিল, ছিল আক্ষেপভরা পিছুটান। 

‘পৃথিবীর অন্ধকার অধীর বাতাসে গেছে ভরে,
শষ্য ফলে গেছে মাঠে, কেটে নিয়ে চলে গেছে চাষা;
নদীর পাড়ের বন মানুষের মত শব্দ করে,
নির্জন ঢেউয়ের কানে মানুষের মনের পিপাসা—
মৃত্যুর মতন তার জীবনের বেদনার ভাষা,
আবার জানায়ে যায়—কবরের ভূতের মতন
পৃথিবীর বুকে রোজ লেগে থাকে যে আশা হতাশা,
বাতাসে ভাসিতেছিল ঢেউ তুলে সেই আলোড়ন,
মড়ার কবর ছেড়ে পৃথিবীর দিকে তাই ছুটে গেল মন!’

অনেক পাঠকই জীবনানন্দের মৃত্যুচিন্তাকে একধরনের পুনর্জন্মনিচন্তা বলেই মনে করেন। জীবনানন্দের জীবদ্দশায় অপ্রকাশিত কবিতাগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাঠকপ্রিয় হয় ‘রূপসী বাংলার কবিতাগুলি। সে কবিতাগুলিতে মৃত্যু খুঁজতে যাওয়ার কোন অর্থ হয় না; কারণ সেগুলির প্রতিটিই মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের ধারাবিবরণী। ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যে জীবনানন্দ যেন নিজের জন্যই লিখে রেখে গেছেন এক একটি সমাধিলিপি। অথচ তার বেশ কিছু কবিতায় আছে মৃত্যুর পরবর্তী পর্য্যায় থেকে জীবনে ফিরে আসার অদম্য ইচ্ছা, 

"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে - এই বাংলায় 
হয়তো মানুষ নয় - হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে, 
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিঁকের নবান্নের দেশে 
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়। 
হয়তো বা হাঁস হবো - কিশোরীর - ঘুঙুর রহিবে লাল পায় “

জীবনানন্দের কবিতাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন চিত্ররুপময়,— প্রকৃতপক্ষে জীবনানন্দ যে চিত্র এঁকেছেন তা একইসাথে আধার ও আধেয়— ফলে জীবনানন্দের কবিতা একইসাথে ছবি ও কবিতা, তাই পাঠক কিছু না বুঝলেও একটি ছবি সে দেখে, চোখের ভেতরে, মাথার ভেতরে। এক্ষেত্রে তিনি একজন আধুনিক চিত্রশিল্পী । এধরনের সৃষ্টি আর সৃজন যার জীবনের মূলমন্ত্র, নিসর্গের প্রতি অমোঘটান যার জীবনের বীজমন্ত্র, তিনি মৃত্যুকে কিভাবে নিয়েছেন, সেটা তাঁর দু একটি বিশেষ রচনা বা ব্যক্তিগত জীবনের প্রাপ্তি / অপ্রাপ্তি দিয়ে বিচার করতে যাওয়াটা কত যুক্তিসঙ্গত, সে আমার জানা নেই। কারণ ব্যাক্তিমানস আর কবিমানস দুটি সমান্তরাল স্বত্ত্বা বলেই আমার ধারণা। ‘মহাপৃথিবী’ এবং ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যে জীবনের প্রতি কবির যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, পরবর্তী দুটি কাব্য ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ ও ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’য় তা পাল্টে গেছে। এ কাব্যদুটিতে তিনি জীবনের ইতিবাচক দিকের কথা বলেছেন— জীবন সম্পর্কে হয়েছেন আশাবাদী। জীবনানন্দ নিজে নেতিবাচক হিসাবে চিহ্নিত হতে চাননি। সুহৃদ দেবীপ্রসাদকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘হাওয়ার রাত, বিড়াল, বনলতা সেন ইত্যাদি কবিতাগলো আমার কাব্যজীবনের এক বিলুপ্ত পর্যায়ের রচনা। এর পরবর্তী অধ্যায়গুলো থেকে কয়েকটি কবিতা না নিলে অ্যানথলজিতে আমার কবিতা কোনক্রমেই রিপ্রেজেন্টেটিভ হবে না।’

পৃথিবীর ভরাট বাজার ভরা লোকসান
লাভ পচা উদ্ভিদ কুষ্ঠ মৃত গলিত আমিষ ঠেলে।
সময়ের সমুদ্রকে বার বার মৃত্যু থেকে জীবনের দিকে যেতে বলে।

[“পৃথিবীতে এই”, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’]

শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থে জীবনানন্দ দাশ নৈরাশ্য-হতাশা থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তিনি ভাবেন, উপলব্ধি করেন: ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়।’ তাই হতাশা বা ক্লান্তি নয় ; কারণ :

হয়তোবা মানবের সমাজের শেষ পরিণতি গ্লানি নয়;
হয়তোবা মৃত্যু নেই, প্রেম আছে, শান্তি আছে মানুষের অগ্রসর আছে…

[“মহাত্মা গান্ধী”, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’]

অর্থাৎ জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুচিন্তা থেকে সরে এসেছেন। উপলব্ধি করেছেন প্রেম দিয়েই সম্ভব সকল শান্তি ও স্থিরতাকে জয় করা। 

শান্তি এই আজ;
এইখানে স্মৃতি;
এখানে বিস্মৃতি তবু; প্রেম
ক্রমাগত আঁধারকে আলোকিত করার প্রমিতি।

[“অনেক নদীর জল”, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’]

মৃত্যুকে সত্য জেনেও কবি তার কাছে সমর্পিত হতে রাজি নন, বরং যতদিন বাঁচবেন ততদিন ‘সূর্যে সূর্যে’ চলতে চান। 

মৃত্যুই অনন্ত শান্তি হয়ে
অন্তহীন অন্ধকার আছে
নীলসব অরণ্যের কাছে
… আমি তবু বলি ;

এখনো যে কটা দিন বেঁচে আছি সূর্যে সূর্যে চলি।

সুচেতনা কবিতায় তিনি লিখেছেন—

‘মাটি পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি,
না এলেই ভালো হত অনুভব করে,
এসে যে গভীরতর লাভ হল সেসব বুঝেছি,
শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে
দেখেছি যা হল হবে, মানুষের, যা হবার নয়
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।’

এখানেও নেতির ভেতর দিয়ে ইতি; জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণার পরক্ষণেই জীবনের প্রতি আকুতি।মানুষের জীবনে অন্ধকার আছে, আসে, ‘মানুষের কত দেশ, কাল, চিন্তা, ব্যথা, প্রয়াণের ধূসর হলুদ ফেনা’ এসব ঘিরে ধরে ‘অন্ধকারের মত সংখ্যাহীন শৈবাল জঞ্জাল’— কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষ বুঝতে চায় ‘নীলিমার অমৃতত্ব’, ‘সাহস সাধনা প্রেম আনন্দের দিক লক্ষ্য করে’ খুঁজতে যায় সূর্য। প্রজাপতি ওড়ে, ‘আলোর সাগর ডানে, আনন্দসমূদ্র তার বাঁয়ে।’ মাছরাঙা সন্ধান পায় ‘অন্তহীন সূর্যের ঋতুর।’ কবি এরপর প্রবলভাবে হয়ে ওঠেন অস্তিত্ববাদী, জাঁ পল সার্ত্রের এক্সিসটেনসিজমের ধারক, মানুষই ইতিহাস, ইতিহাস আসলে মানুষ, মানুষই পূর্ণ করে এই অন্তহীন শূন্যতার জগত, 

‘শূন্য তবু অন্তহীন শূন্যময়তার রুপ বুঝি,
ইতিহাস অবিরল শূন্যের গ্রাস,
যদি না মানব এসে তিন ফুট জাগতিক কাহিনীতে হৃদয়ের নীলাভ আকাশ,
বিছিয়ে অসীম করে রেখে যায়
অপ্রেমের থেকে প্রেমে, গ্লানি থেকে আলোকের মহাজিজ্ঞাসায়।’

( মহাজিজ্ঞাসা )

জীবনের শেষ কবিতায় জীবনানন্দ ফিরে আসেন ‘অপ্রেমের থেকে প্রেমে, গ্লানি থেকে আলোকে’— কবিমাত্রেই মানুষ, মানুষের জীবনে মৃত্যু নিশ্চিত কিন্তু যতদিন কবিতার অস্তিত্ব থাকে ততদিন কবি অমর। মানুষ জীবনানন্দ দাস মরণশীল, কবি জীবনানন্দ নন। কবির অসময়ে চলে যাওয়াটাই এত সংশয়ের কারণ। “আচ্ছা, এত যে লিখেছি, একটিও কি সুপ্রিম পোয়েট্রি হয়নি? যা আমার মৃত্যুর পর বেঁচে থাকতে পারে। “জীবনানন্দ নিজেই তাঁর কাব্যসম্ভার সম্পর্কে সুবোধ রায়কে একথা বলেন। মৃত্যুর পরও যাঁর বেঁচে থাকার এত আগ্রহ, তিনি কখনো স্বেচ্ছামৃত্যুকে আশ্রয় করতে পারেন? আমার ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেন নি। তাঁর মৃত্যু ছিল নিছকই দুর্ঘটনা।‘মহাজিজ্ঞাসা’-র মত কবিতা লেখার পর আত্মহত্যা যৌক্তিকতার সাথে যায় না। আর তিনি আত্মহত্যাই যদি করবেন তবে তা প্রকাশ্য রাজপথে কেন? আত্মহত্যা করার মতো নিরিবিলি স্থান কি তার জানা ছিল না– যেমনটি করেছিলন কবি সিলভিয়া প্লাথ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে,প্রবাদপ্রতিম রুশ কবি ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ মায়াকোভস্কি ,এডগার এলান পো’ অথবা এ্যাডেলাইন ভার্জিনিয়া উল্ফ? জীবনানন্দ দাশের মতো ‘রূপসী বাংলা’র কবি , জীবনবাদী কবি কি কখনো আত্মহত্যা করতে পারেন? আর্থিক দৈন্য, দাম্পত্য কলহ, কবি হিসেবে উপযুক্ত স্বীকৃতি না পাওয়া— এসব ঘটনা তাঁকে অসম্ভব যন্ত্রণা দিয়েছে সন্দেহ নেই। তাই বলে আত্মহত্যা! অসম্ভব!! আর আত্মহত্যাই যদি করবেন তো এত পরিণত বয়সে কেন, অনেক আগেই তা করতে পারতেন।২০১৫ সাল অবধি প্রকাশ হয়েছে তাঁর প্রচুর প্রবন্ধ,২১টি উপন্যাস শতাধিক সমাপ্ত অর্ধসমাপ্ত ছোটগল্প ও পঞ্চাশটিরও বেশি লিটারারি নোটস। ‘ঝেঁপে আসুক অন্ধকার, না থাক চাকরি, না খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে হোক, তবু মরে যাবার আগে আরও কিছু লেখা তার লিখতে হবে, জীবনবাবুর কাছে জীবনের সমার্থক হয়ে উঠেছিল লেখালেখি। এর অপর পিঠ মৃত্যুচেতনা। লেখা>মৃত্যু যেন। মৃত্যু এবং লেখার ভেতর লেখাকে বেছে নিলেন জীবনানন্দ– (একজন কমলালেবু : শাহাদুজ্জামানের কষ্টিপাথর)

সামগ্রিক সৃজনতার নিরিখে বিচার করলে আবিষ্কার করি তিনি শুধু এক ব্যতিক্রমী শব্দশিল্পীই নন, এক অন্তমুখী ভাবুক, গভীর মানবচরিত্র পর্যবেক্ষক। তিনি ‘কাকের বাসা থেকে শ্যাওলার ওপর খসে পড়া ডিম’ যেমন লক্ষ করেন, তেমনি গভীর জ্ঞান রাখেন নিলস বোরের ‘কোয়ান্টাম থিওরি’ বা আইনস্টাইনের ‘আপেক্ষিকতাবাদ-এরও’। যার অন্তঃকরণে এত গভীর বাস্তববোধ, আধুনিক পৃথিবী সম্পর্কে এতখানি অনুসন্ধিৎসা, কাব্যভাবনায় এত বৈচিত্র্য, যিনি এত জীবনকে ভালোবাসেন, তিনি এত সহজে পরিস্থিতির কাছে হার মেনে জীবনে দাঁড়ি টেনে দেবেন এমনটা ভাবা যায়না। 

প্রাতঃভ্রমণ ছিল জীবনানন্দ দাশের নিত্যদিনের অভ্যাস। রোজই তাঁর সঙ্গী হতেন সুবোধ রায়।সেদিনই তিনি কোনকারণে ছিলেন না। দুর্ঘটনার সময় কবি শারীরিকভাবে অসুস্থও ছিলেন। ৯.৩.৫৪ তারিখের এক চিঠিতে লিখেছিলেন : ‘আমার শরীর আজকাল অসুস্থ।’ অসুস্থ কবি অন্যমনস্ক হয়ে ট্রামলাইনের ঘাসের উপর দিয়ে হাঁটছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরাই জানিয়েছেন : ‘শুধু অন্যমনষ্ক নয়,কী এক গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিলেন কবি। দুহাতে দু’থোকা ডাব নিয়ে মাথা নীচু করে হাঁটছিলেন। কোন কিছুই তাঁর কানে যায় নি।“ যিনি আত্মহত্যাই করবেন তিনি মরার আগে ডাব কিনতে যাবেন কেন? সুবোধ রায়ও লিখেছেন, "শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে দু নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় কবিকে। খবর পেয়ে দেখতে আসেন অনেকেই। এসে পড়েন কবির নিকটাত্মীয় স্বনামধন্য চিকিৎসক শ্রী অমল দাশ, এবং আরেকজন খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ ডঃ এ.কে.বসু। ডাক্তার অমল দাশকে দেখে ধড়ে প্রাণ এলো কবির, “কে বুবু ? বুবু এসেছিস ? বাঁচিয়ে দে....। শিশুর মতো অসহায় কণ্ঠ “বুবু, বাঁচিয়ে দে ভাই!" ( জীবনানন্দ স্মৃতি । সুবোধ রায়)… এখানে মৃত্যুকে ুকে ড়িয়ে ধরা নয়, উল্টে কবিকে বেঁচে থাকার জন্যই ব্যাকুল হতে দেখতে পাই ! অথচ শেষ অবধি এতখানি বাঁচার বা বেঁচে থাকার আকুতি বুকের মধ্যে পুরে নিয়েই ধানসিঁড়ি, গাঙুর, পেরিয়ে কবি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।’ এরপরেও বলব কবি আত্মহত্যা করেছিলেন?

অশ্বত্থ বটের পথে অনেক হয়েছি আমি তোমাদের সাথী;
ছড়ায়েছি খই ধান বহুদিন উঠানের শালিখের তরে;
সন্ধ্যায় পুকুর থেকে হাঁসটিরে নিয়ে আমি তোমাদের ঘরে
গিয়েছি অনেক দিন, 

জীবনানন্দকে আজ পর্যন্ত কী কী বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়নি? নির্জনতম কবি, শুদ্ধতম কবি, নৈসঙ্গঃচেতনার কবি, ধূসর জীবনবোধের কবি, রুগ্ন চেতনার কবি, জগত সংসারবিমুখ, পলায়নবাদী, সুররিয়ালিস্ট, আত্মমগ্ন, বিমর্ষ, এক্সিস্টেন্সিয়ালিস্ট, নিহিলিস্ট, মর্ষকামী ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার কাছে কিন্তু তিনি শুধুই প্রকৃতির কবি। প্রকৃতির সব রূপ-রস-গন্ধ পরতে পরতে ভরে নিয়ে হাঁস-শালিকের মতোই আজো কবি মিশে আছেন বাংলার বুকে।


তথ্যসূত্র:
১। ক্লিনটন বি সিলি লিখিত আ পোয়েট আপার্ট 
৩। জীবনানন্দের মৃত্যু, ফয়জুল লতিফ চৌধুরী, ২০০৮।
৪। বাংলাপিডিয়ায় জীবনানন্দ দাশ
৫। ওয়েব্যাক মেশিনে অবস্থিত জীবনানন্দ দাশের উপর ওয়েবসাইট
৬। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় জীবনানন্দ দাশ নিবন্ধ
১০। লিঙ্ক



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-