মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

কোয়েলী ঘোষ

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
তীর্থের পথে পথে --
তিরুপতি 

'' আমি চোখ মেললুম আকাশে 
জ্বলে উঠল আলো 
পূবে --পশ্চিমে
গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ,সুন্দর 
সুন্দর হল সে ।''

সেই সুন্দরের খোঁজে পথ চলা ,ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া । অন্ধ্রের তিরুপতি শহরে এসে পৌঁছেছি সরাসরি ট্রেনে হাওড়ার সাঁতরাগাছি ষ্টেশন থেকে । তিরুপতিতে নেমে বাইরে এসে গাড়ি করে চলেছি পাহাড়ি পথ ধরে । পূর্বঘাট পর্বতমালা শেষ হয়েছে সমুদ্রের ধারে । যেখানে শেষ তার নাম শেষাচলম। দুদিকে বনাঞ্চল ,মধ্যে পাকদণ্ডী পথ ধরে গাড়ি উঠছে ওপরে । সেই ঘন অরণ্যে কত গাছ ,কি নাম জানা নেই ।প্রকৃতি তার ডালি পথের ধারে এত সুন্দর সাজিয়ে রেখেছে ।

তিরুপতি পর্বতের সাতটি চূড়া । পুরাণের কথায় --এগুলি নাগরাজ বাসুকির সাতটি মাথা । এখানেই ভেঙ্কটেশ্বর নারায়ণ শ্রীনিবাসন অনন্তশয্যা নিয়েছেন । আর এক নাম সপ্তগিরি মন্দির । এখানে ভগবানের অনেক নাম -- শ্রীনিবাসন ,তিরুপতি বালাজী , ভেঙ্কটেশ । মন্দিরের আর এক নাম সপ্তগিরি । 

অবশেষে হোটেলে পৌঁছলাম । হোটেল নয় , যেন মন্দির । সামনেই বড় তিরুপতি নাথের ছবি । তার নিচে ফুল ,ধূপ জ্বলছে ।ড্রাইভার সাহেব আগেই বলে রেখেছিলেন রাতেই দর্শন সেরে নিতে ,দিনে আরও ভিড় বাড়বে । অতএব তাড়াতাড়ি স্নান সেরে রওনা দিলাম । পায়ে হাঁটা পথ ,তারপর লাইন । বিশাল লাইন ধরে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল ভারতবর্ষে এত ভক্ত ।

মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের আগে তিনটি প্রবেশ দ্বার পেরোতে হয়।মহাদ্বারম , রৌপ্যদ্বার আর স্বর্ণদ্বার --ঝকঝকে রূপো ,ঝকঝকে সোনার পাতের ওপর অপরুপ শৈলী দেখে মুগ্ধ । দু ঘণ্টা লাইনের পর এসে পৌঁছেছি দেবতার সামনে । বেশিক্ষণ দাঁড়াবার উপায় নেই । নয়নাভিরাম তিরুপতি বালাজী নাথকে প্রণাম জানিয়ে বাইরে এসে বসলাম । বিশাল বড় হুন্ডিতে মানুষ দান করে চলেছে । কাছেই পদ্মাদেবীর মন্দির ।ছড়িয়ে আছে নানা পুরাণের ইতিহাস ।

এরপর প্রসাদ গ্রহণ , কিশমিশ ,কাজু ,পেস্তার বড় বড় লাড্ডু প্যাকেটে করে বাড়ির জন্য নিলাম । তাছাড়া পোঙ্গল,আর পেরুগনম নামে খিচুড়ি আর ভাতের প্রসাদ দেওয়া হয় । মন্দিরের দুদিকে অজস্র দোকান ।ফেরার পথে বালাজির লকেট কিনলাম সবার জন্য । এবার হোটেলে ফেরা । সামনে এক রাধা কৃষ্ণের মন্দির ।অপূর্ব সুন্দর এই মূর্তি । থাকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু পরের দিন আবার যাত্রা শুরু । ক্লান্ত দুটি পা ,বালাজিকে প্রণাম জানিয়ে ঘুমের দেশে । 

পণ্ডিচেরী 

তিরুপতি থেকে ট্রেনে মুম্বাই আর মুম্বাই থেকে বাসে এসে পৌঁছেছি পণ্ডিচেরী । আগে থেকেই অরবিন্দ আশ্রমে ব্যবস্থা করা ছিল । ঋষি অরবিন্দ আর শ্রীমায়ের টানে এখানে আসা । পরদিন সকালে হাঁটতে বেরিয়েছি । বিশাল লম্বা সী বিচ ,একদিকে সমুদ্র অন্য দিকে ঝকঝকে পরিস্কার রাস্তা । কেউ জগিং করছে ,কেউ মর্নিং ওয়াক। নানারকম ভেষজ দিয়ে তৈরি জুস বিক্রি হচ্ছে । সকালে চায়ের খোঁজ পাওয়া গেল না । সবাই দেখি এক গ্লাস করে জুস খাচ্ছে । কি তেতো বিস্বাদ খেতে কিন্তু স্বাস্থ্যকর । দূরে সূর্য উঠছে । 

এক সময় এই শহর ছিল ফরাসীদের দখলে । বঙ্গোপসাগরের জল এসে আছড়ে পরছে বালুতটে । নীল আকাশ আর সমুদ্র এক হয়ে মিশে গেছে । কালো খণ্ড খণ্ড পাথরে আছড়ে পড়ছে । অনেক বীচ আছে । পিছনে নারকেল গাছ ,জেলেদের নৌকো ,বালিয়াড়ি । বীচের নাম সেরেনিটি , রকি বীচ ।যেখানে দাঁড়িয়ে আছি , এখানে সমুদ্র নিচে ,নামতে হলে পাথর দিয়ে সাবধানে নামতে হবে । কাছে পিঠে চার্চ , আশ্রম , পায়ে হেঁটে সকালে ঘুরে নিয়েছি । 

তারপর অরবন্দ আশ্রম । শ্রীমা ও ঋষি অরবিন্দ পাশাপাশি সমাধি । ফুলে ফুলে সাজানো সমাধিস্থল । শান্ত ,নির্জন স্থান । সবাই লাইন করে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে কেউ কেউ ধ্যানে বসেছে । এখানে দুটি চোখ বন্ধ করে ধ্যানে বসেছি । 

মায়ের পুন্য স্মৃতি বিজরিত এই আশ্রমে অনেক ভাগ আছে। খাদ্য বিভাগ , শিল্প বিভাগ , কৃষি বিভাগ -- মন্ত্রের মতন কাজ করছেন কর্মীরা ।একবার এখানে টিকিট কেটে নিয়ে সারাদিন খাওয়া যায় । মায়েরা নিজেরা খাবার দিচ্ছেন পরম মমতায় । সেখানে গিয়ে পরিচয় হল কত বাঙ্গালী বৃদ্ধ ,বৃদ্ধার সাথে। এঁরা শেষ জীবনে এই আশ্রমকে ভালবেসে চলে এসেছেন। লাইব্রেরিতে গিয়ে মায়ের বই কিনলাম আর ধূপ, চন্দন ।


পরদিন বাসে করে গেলাম অরোভিল। মায়ের স্বপ্ন এখানে সার্থক। শহরের উত্তরপূর্বে প্রায় ছ মাইল দূরে ১৫ বর্গ মাইল জুড়ে বিস্তীর্ণ বনভূমি । সারা পৃথিবীর ১২৬ টি দেশের মাটি এনে একটি মর্মরের রচিত পদ্মফুলের কোরকে মুখবন্ধ করে তার ওপর ভিত্তি স্থাপিত হয় । মায়ের কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয় -- ''অরোভিল কারো সম্পত্তি নয় , অরোভিল সমগ্র বিশ্ব মানবের । ....সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে শ্রীমা যা চেয়েছিলেন , শান্তি প্রতিষ্ঠা ,তা কি সাকার হয়েছে ? গাইড বুঝিয়ে চলেছে , সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত । 

বনভূমির মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছি -- পায়ে চলার পথ , দুদিকের অজানা গাছের সারি ,ফুল ফুটে আছে , পাখিদের কিচিরমিচির আওয়াজ । পথ ফুরালে দেখি দূরে এক স্বর্ণ গোলক রৌদ্র কিরণে ঝকঝক করছে , তার মধ্যে দিয়ে সূর্য কিরণ প্রবেশ করে ।এটি ধ্যানকক্ষ কিন্তু আগে থেকে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে । তাই এবার আর হল না ভেতরে জাওয়া । বনের পথ ধরে আসতে আসতে এক রঙের শাড়ি পড়া মেয়েদের দেখা গেল ।

পন্দিচেরিতে দেখেছি গনেশ মন্দির , সেখানে পুজো দিলাম । মন্দিরের বাইরে বিশাল বড় দুটি হাতি । দুপাশে দোকান , নানা শিল্প কর্ম , ঘর সাজানোর জিনিস । এখানে বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখার মত আর আছে বিশাল বড় বড় চার্চ । সমুদ্রের ধারে নানা স্টোনের গয়না নিয়ে সেখানের মানুষ বিক্রি করছে । নানারকম ফল টুকরো করে একসাথে ঠোঙায় বিক্রি হচ্ছে । 

শান্তি সর্বত্র বিরাজমান । শেষ জীবনের জন্য এক আদর্শ জায়গা । বার বার গেলেও যেন আশ মেটে না । 

এবার ফেরার পালা । মুম্বাই থেকে কলকাতা ট্রেনে ফিরেছি । মনে রয়ে গেছে সাজানো সব দৃশ্য , সমুদ্র ,বালিয়াড়ি , আকাশ , অরোভিল নগর । ভারত বর্ষকে ভাল করে চিনতে হলে আবার বেরিয়ে পড়ব ঘরছাড়া বিবাগী এক মন নিয়ে । 


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-