মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

ঝর্ণা চট্টোপাধ্যায়

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
রাখিতে নারিবি প্রেম জল গো......
বাউল ফকিরদের গানে, তাদের সঙ্গে মেলামেশায় একটা নেশা আছে। যাঁরা এঁদের নিয়ে কাজ করেন, এঁদের সঙ্গে মেলামেশা করেন, তারা জানেন কি নেশা। এঁদের দেখব, শুনব, জীবনযাপনের চিত্রকে তুলে ধরব সেইরকম চিন্তা বহুদিন থেকেই ছিল, যদিও নোটবুক হাতে নিয়ে গুটিকয়েক প্রশ্ন করে একটা খসড়া করব, তা কোনদিনও ভাবিনি। তাই যখনই কেউ এঁদের  সম্বন্ধে কোন খবর দিয়েছেন, চেষ্টা করেছি কয়েকদিন ধরে তাঁর সঙ্গে বা তাঁদের সঙ্গে কাটাতে। এমন কি প্রত্যন্ত গ্রামেও কোন  বাউলানির কাছে গিয়ে আতিথ্য গ্রহণ করেছি, রাত্রিবাসও করেছি। অনভ্যস্ত জীবন, সেই জীবন যাপন করা আমাদের পক্ষে কষ্টকর কিন্তু কাছের থেকে দেখা এবং এঁদের জীবনযাত্রার স্বাদ নেওয়া উভয়  উদ্দেশ্যই ছিল। কতটা কি দেখেছি, কি পেয়েছি তা হয়ত ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়, সকলে বুঝবেনও না। তবে একটা কথা ঠিক, অনেক কাছ  থেকে এঁদের দেখে এটা বুঝেছি, গভীর বিশ্বাস আর মনের প্রসারতা না থাকলে এপথে আসা যায় না। চরম দারিদ্র্য, কিন্তু মন একেবারে খোলা আকাশ। 

আমি দেখতে চেয়েছি মহিলা বাউলদের, কথা বলতে চেয়েছি তাঁদের সঙ্গে। এই সব বাউলানিরা কিভাবে জীবন যাপন করেন, তাঁদের সাধনার মূলে তাঁরা পৌঁছতে পারেন কিনা সেটা জানাও উদ্দেশ্য ছিল। অনেকেই বলেন বাউল সাধনায় বাউলরা নারীদের সাধনসঙ্গিনী করে রেখে দেন, মূলতঃ তারা সেবাদাসী ছাড়া আর কিছুই না। একটা কথা বলে রাখা  ভালো, বাউল আর বৈষ্ণব এক না হলেও উভয় সমাজের মধ্যে একটা মেলামেশা আছে, আমরা সাধারণ দৃষ্টিতে তাদের তফাতটাও ধরতে পারি না বলে আমরা বাউল-বোষ্টম কথাটি একসঙ্গেই বলে থাকি। এক্ষেত্রেও সেই অর্থেই ব্যবহৃত। তাই ‘বাউলানি’ কথাটি ব্যবহার করেছি। অনেকেই এই সমাজের নারীদের প্রতি এরূপ ধারণা করে থাকেন যে, এইসব বাউলানিরা সেবাদাসী বা যৌনদাসী হিসাবেই ব্যবহৃত। কথাটি যে একেবারে মিথ্যে সেকথা যেমন বলতে পারি না আবার সর্বাংশে সত্য একথাও মানতে পারি না। কিন্তু শুধুই কি সেবাদাসী, যৌনদাসী হিসাবে পুরুষের আশ্রয়ে থাকা, গ্রাসাচ্ছাদনের দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া, নারীর কি আর কোন কারণ নেই এই পথে আসার? শুধু এটাই কি মুক্তির পথ? অনেকদিন ধরেই এই চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল, আর সেকারণেই বাউলানিদের কাছে যাওয়া, তাদের সঙ্গে মেশা, তাদের সাধনার দিকটিকে জানার চেষ্টা। বাউল সাধনা করেন এইরকম এক নারীর সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম জয়দেবের মেলায়। নারীসাধনার কথাটি যখন উঠল, তখন তাঁর কথাতেই আসি।

জয়দেব আমার মন টেনেছিল একেবারে প্রথম দেখাতেই। মেলায় আবার যাব, এই চিন্তা নিয়েই প্রথম দিন ফিরে এসেছিলাম জয়দেব থেকে শুধু মন্দিরটি দর্শন করে। অদ্ভুতভাবে সেই সুযোগ ঘটে গেল একবার মেলার সময়। জয়দেবের মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কি, এই প্রশ্ন যদি কেউ আমাকে করেন তাহলে আমি বলব মানুষ। এর চেয়ে বড় আকর্ষণ আর কিছু নেই। কাতারে কাতারে মানুষ, শুধু ভেসে যেতে পারলেই হল। কোন না কোন জায়গায় ঠিক পৌঁছে যাওয়া যায়। বহু আখড়া,  গিজগিজ করছে মানুষ, কোন আখড়াই খালি নেই। নানা ধরণের মানুষ আসেন মেলায়। তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে করতে, কথা বলতে বলতে ঠিক মিলে যায় দু একটি মণিমুক্তো যাঁরা স্থান  করে নেন মনের মণিকোঠায়। এমনই একজন হলেন কল্যাণী দাসী। কিন্তু দাসী কেন?    

--ও মা, গোবিন্দের দাস-দাসী বই তো নয়! আমরা সকলেই গোবিন্দের দাস-দাসী। কেন দিদিমনি কি শোনেননি মীরার গান...ম্যেঁ নে চাকর রাখো জী। ঈশ্বরের দাস হবার মত আনন্দ আর কিসে গো?’ হার মানি।  

কি ভক্তি, বাপ রে! মেলায় যাকেই জিজ্ঞেস কর, থাকেন কোথায়? উত্তর মিলবে-গোবিন্দ যেখানে রাখেন। যাবে কোথায়? গোবিন্দ যেখানে নিয়ে যাবে্ন। শুধু কথার কথাই নয়, এ এক দৃঢ বিশ্বাস। কল্যাণীর সঙ্গে আমার পরিচয় প্রথম বার জয়দেবে গিয়ে। মেলার সময় বাদ দিয়েই আমায় যেতে বলেছিলেন, কারণ তখন আখড়ায় অনেক লোক, কথা বলার সময় কোথায়? বলেছিলাম-- মেলা দেখব না, তবে আর জয়দেবে আসব কেন? কত লোক, কত বাউল-ফকির। তাদের গান শুনব, দেখা করব, কথা শুনব তাই তো আসতে চাই।‘ আমায় দুচোখে যেন জরিপ করে নিয়ে বললেন—আসবেন, টান থাকে, তবে তো? ‘যখন গেলাম একগাল হেসে হাত ধরে টেনে নিলেন। ভর্তি লোক, দুখানি ঘরে পা ফেলার জায়গা নেই। বললাম-- ভিড় থাকুক আর যাই থাকুক, আমার আপনাকে চাই।‘ অত ভিড়েও দেখে চিনতে পারলেন। এই আপন করে নেওয়ার স্বভাব টুকু দেখেছি তাদের সকলের মধ্যে। কি যেন একটা আছে, যা বুকের মধ্যে  চিনচিন করে ওঠে। কথায় কথায় দু  এক কলি গান গুনগুন করে গেয়ে ওঠা ওনার অভ্যাস। প্রথম দর্শনেই যখন ‘আপনি’ করে কথা বলেছি অমনি খিলখিল করে হেসে উঠেছেন---ও কি গো, পর ভাব হলে কথা হবে কেমন করে? আগে তো ‘তুমি’ হোক, মনের ভাবটি ঠিক থাকুক, নইলে দেহটি জুড়বে কি করে? প্রেম করতে এসেছ,  প্রেমের ভাষাটি না বললে চলবে কেন?’ বলেই গান ধরেছেন। নিজের হাতে চায়ের গেলাসটি ধরিয়ে দেবার আগে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে দিয়েছেন। বলেছি—তুমি নিলে না?’ 

--এই দ্যাখো, আগে রাধারাণীর হোক, তাঁর যে মান বেশী গো...তারপর  তো দাসীর।‘ এই বিনয় দেখেছি সর্বত্র। তাই বুঝি কথাতেই বলে বৈষ্ণবের বিনয়। আগেই বলেছি, এক্ষেত্রে বাউল-বৈষ্ণব এক করেই রেখেছি।  চা খেতে খেতে কথা শুরু করেছি, অমনি  আবার খিলখিল হাসি...হবে হবে, সব কথাই হবে। আগে চা খান, জিরোন। আগে তো অনুরাগ পর্ব, তবে তো রাগমোচন। কি ঠিক কিনা?’ বলেই আবার হাসি। এতো অফুরন্ত আনন্দের উৎস কোথায় তাই শুধু ভাবি। ঘরের চারিদিক দেখে ঠিক স্বচ্ছল বলতে যা  বোঝায়, তা নয়। এখন মেলার সময়, পাঁচজনে দিয়ে-থুয়ে কেটে যায়।  কিন্তু স্বচ্ছলতাও যেন হার মানে তাঁর অন্তরের ঐশ্বর্য্যের কাছে। দরিদ্রতা বুঝি লজ্জ্বা পায় এঁদের দেখে।  

কথা হল একে একে, সব কথা। সাধন-ভজন, চারিচন্দ্র ক্রিয়া, নারীর সাধনা, অটল মানুষ...বাকি রইল না কিছুই। আসার আগে জিজ্ঞেস করেছি—আচ্ছা, এই যে এতো সাধনার কথা বল... সবাই তো বলে নারী শুধু ব্যবহৃত হয়, তাঁর কোন  সিদ্ধিলাভ হয় না। তুমি কি বল?’ দপ্‌ করে জ্বলে উঠেছে তাঁর চোখ। যে নারী এতক্ষণ হাসি আর আনন্দ দিয়ে, গান করে মাতিয়ে রেখেছিল, সে যেন অন্য এক জগতে চলে গেল।--- কে বললে হয় না? আগে নারীকে সিদ্ধ হতে হয়, তবে পুরুষ  আসে তার কাছে। দুজনে সিদ্ধ না হলে তো সাধন হয় না দিদিমনি, সে হল কাম, তাকে সাধনা বলে না। নারী সিদ্ধ না হলে, কোন পুরুষের সাধ্য নেই সাধনায় সিদ্ধিলাভ করার, তাঁর কাছে আসার। এটা কেমন জানো, দিদিমনি? টাকার এপিঠ আর ওপিঠ। একদিকে নারী আর একদিকে পুরুষ। টাকায় যেমন দুটো ছবি থাকে, এও তেমনি। কিন্তু টাকা তো টাকাই থাকে দিদিমনি, সে তো আর আট আনি-চার আনি হয় না... হয় কি, বল?  বাউলের সকল নারীর সঙ্গে সাধন নিষিদ্ধ। সে শুধু  সাধন করে তাঁর নিজস্ব প্রকৃতির সঙ্গে। নারী যে মাতৃস্বরূপা দিদিমনি। তা না করলেই প্রেম হবে না গো, সে হল কাম। তবে আর সাধন কি? তবে আমি কিনা মুক্ষু মানুষ’ বলেই আবার গান ধরলেন—ও কাঁচা  হাঁড়িতে লো হাঁড়িতে, রাখিতে নারিবি প্রেম জল গো...’ হাঁড়ি কাঁচা হলে প্রেমবস্তু গলে বেরিয়ে যাবে গো দিদিমনি, সাধন আর হবে না। আগে হাঁড়ি পাকা কর, তবে  সাধন ভজন কর। আগে নারী সিদ্ধ হোক, তাঁর কাছে এসে সাধন করো, তবেই হবে সাধন, নইলে কিসের ভজন? কি, ঠিক বলেছি?” বলেই হাসি। 

কল্যাণীর মতে, বাউল তো জীবনবোধের একটা অঙ্গ, নতুন পথ তো নয়। তবে কেন এত সমালোচনা, এত কথা? এতে যারা সাধনার পথে আছেন, রক্তাক্ত হতে হচ্ছে তাদেরও। কি গভীর বিশ্বাস আর কঠোর ভাবে ব্যখ্যা করেছেন সাধনার কথা। মুগ্ধ হয়েছি তাঁকে দেখে, তাঁর কথা শুনে। একজন সামান্য পড়াশোনা জানা প্রায় নিরক্ষর মহিলার মুখে এসব কথা শুনে বিস্মিত  হয়েছি, বাধ্য ছাত্রীর মত একমনে শুনেছি তাঁর কথা। কতদিন আছ এখানে—প্রশ্ন করি। উত্তর পাই—চল্লিশ বছর। কাম হলে  পারতাম থাকতে? মনটি জুড়েছে বলেই না, প্রেমটি পুড়ে খাঁটি সোনা হয়েছে বলেই না, বল দিদিমনি?’ এক গ্রাম্য দুঃস্থ মহিলা থেকে সাধন স্তরে উন্নীত হওয়া কল্যাণী দাসীকে সেদিন প্রণাম জানিয়ে বিদায় নিলাম।  

যে গভীর বিশ্বাস আর ভালবাসা নিয়ে সাধনার পথে পা বাড়িয়েছেন তিনি, জয় হোক তাঁর...!
                

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-