মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

জয়া চৌধুরী

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
আজাইরা বাজার কথন,  জয়া উবাচ - ৬
চারিদিকে কান পাতাই দায়। মানে বলছি ক্ষোভে আর দুঃখে আমরা সবাই বিরক্ত থাকি নিশিদিন। তবু ছোটদের সঙ্গে থাকলে সেই আমাদেরই কোঁচকানো ভ্রূ কেমন করে সোজা হয়ে যায় তাই না? 

হুম... ঠিক জানি এ প্রশ্নের উত্তরে সব পাঠকই সদর্থক জবাব দেবেন। শিশু হল গিয়ে কলুষিত দুনিয়ায় পবিত্রতম ব্যাপার স্যাপার। তা বেশ তো। শুনতে শুনতে আয়েসে চোখ বুজে আসছে আমার। তার চে’ বরং চলুন এক ইস্কুলের ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের ক্লাব পিরিয়ডে। ক্লাব মানে বুঝলেন না? মানে আমাদের সময় যেমন গেমস পিরিয়ড আর সেলাই পিরিয়ড থাকত এখন তার চেয়েও অধিক সময় স্কুলে আটকে রাখার জন্য ওসবের বাইরেও এইসব বিভিন্ন নামের পিরিয়ড চালু থাকে। মানে কেউ যদি বিদেশী ভাষা শেখার নামে টুকটাক শব্দ শেখে বা কেউ অন্য কোন শখের শিক্ষা পেতে চায় পাঁচমিশেলি মানে ড্রয়িং, ভাষা, আবৃত্তি, নাচ, অভিনয় হরেকরকমবা শেখানোর জন্য জন্য এইসব পিরিয়ড চালু। তবে শিক্ষা মানে ঠিক ব্যাকরণসম্মত নয়, ঐ হালকা উপায়ে শিক্ষণীয় ব্যাপার আর কি! বাঃ বাঃ কী ভাল আইডিয়া! এঁয়াদের আবার ফ্রি পিরিয়ডও থাকে। তবে সে কিন্তু খেলার পিরিয়ড নয়। মানে যেমন খুশি সময় কাটাও কিন্তু কোন শিক্ষকের তদারকিতে। ভাবছেন সে তো ছোটদের মানে লোয়ার কেজি টেজি তে ঘুমনোর মত হেডস ডাউন, রুমাল চোর খেলার জন্য রিসেস, কিংবা কাগজের এরোপ্লেন চালানোর জন্য প্লে টাইম থাকেই! আজ্ঞে না। এটি বড় শিশুদের জন্য হয়। মানে ক্লাস সিক্স থেকে নাইন অবধি। 

সেদিন ছিল অমনই এক পিরিয়ড। অধমকে যেতে দেওয়া হল এক ক্লাসঘরে। দেখি ঠোঁটের সামনে ল্যাপেল লাগানো, দেওয়ালে টাঙানো কম্পিউটারের বিগ স্ক্রিনে ছবি ও তার মাধ্যমে অঙ্ক শেখানো চলছে। দশখানি ফ্যান আর দুটি এয়ার কন্ডিশনার লাগানো ঘর। জানলাম সেটি ক্লাব পিরিয়ডই ছিল তবে দিদিমণি না আসাতে অঙ্ক ম্যাম ক্লাস নিচ্ছেন। আমায় বলা হল – ম্যাম, আপনিও যদি ক্লাসটা নেন।

বেশ তো। এ আর কঠিন কি! গোটা পঁয়ত্রিশ বাচ্চা সামলানো কী এমন ব্যাপার! অমনি সারা জীবন ১৮ থেকে ৬৭ বছরের ছাত্র পড়িয়ে অভ্যাস। ছোটরা তো সহ অ অ জ ব্যাপার। বেশ ক’বার চোখ পাকিয়ে ক্লাস সিক্সের ছাত্রছাত্রীদের যার যার সিটে বসিয়ে এক পাশে চুপটি করে রইলাম। ঝকঝকে তরুণী অঙ্ক ম্যাম পড়াচ্ছেন-

- চিলড্রেন লুক অ্যাট দ্য স্ক্রিন। ইন আ গ্রসার’স শপ প্রাইস অফ হুইট ইজ রুপিজ নাইন পার কেজি... দেবমাল্য হোয়াই আর’ন্ট ইউ লুকিং অ্যাট দ্য স্ক্রিন। ইন আ গ্রসার... কিপ কোয়াইট চিলড্রেন, দিস ইজ নট ফুটবল গ্রাউন্ড... শালিনী , হোয়াই আর ইউ টকিং ...অ্যাঁ? ডোন্ট ইউ সি দ্যাট দ্য ক্লাস ইজ গোইং অন...

একটি খোঁচা খোঁচা চুল ছাঁটা ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল – ম্যাম মে আই গো টু দ্য টয়লেট?

- হোয়াট!!! আই ওন্ট অ্যালাউ ডিউরিং দ্য ক্লাস টু গো আউটসাইড।

কিছুক্ষণ চলল- ইন অ্যা গ্রসার’স শপ প্রাইস অফ... অঙ্কিত ভার্মা হোয়াই আর ইউ নট রেডি উইথ ইওর কপি অন দ্য টেবল? হে ইউ... বিশাল... হোয়াই আর ইউ ফাইটিং উইথ নিখিল? স্ট্যান্ড আপ স্ট্যান্ড আপ ইমমিডিয়েটলি...হাউ মেনি টাইমস আই টোল্ড ইউ নট টু ফাইট উইথ ফ্রেন্ডস... ডোন্ট ইউ বিহেভ প্রপারলি? 

- ম্যাম মে আই গো টু দ্য টয়লেট?

- ম্যাআআম সুপ্রীত সেইড স্ল্যাং ওয়ার্ড ম্যাম

- নো ম্যাম আই ডিডন’ট টেল। ইটস হি...

চারপাশ থেকে কুহু ধ্বনির বদলে কেকা রব উঠল। মরীয়া হয়ে অঙ্ক ম্যাম পড়িয়ে যাচ্ছেন কখনও ল্যাপেলটা ঠোঁটে কখনও এমনি দিগবিদিক শূন্য হয়ে...

বেচারী দিদিমণিকে সাহায্য করতে পায়চারী করতে লাগলাম ক্লাস জুড়ে । যেই না কাছে যাওয়া অমনি দিকে দিকে আর্ত চিৎকার- 

- ম্যাম প্লিজ, মে আই গো টু দ্য টয়লেট। বললাম- 

- ইজ ইট আর্জেন্ট? 

- ইয়েস ম্যাম

- ওকে , দেন গো।

এতক্ষণ কারো পায় নি কিন্তু। যেই না একজনের আর্জেন্ট হল ব্যস। সমস্ত ক্লাস যেন অগস্ত্য মুনির মত সসাগরা জল পান করে পেট ফুলে ঢোল হয়ে রয়েছে এমন চিল চিৎকার শুরু করল। ওদিকে করুন কন্ঠে শোনা যাচ্ছে-

- ইফ, প্রাইস অফ হুইট ইজ নাইন রুপি পার কিলো, দেন হোয়াট ইজ... এগেইন ইউ আর লিভিং ইওর সীট অক্ষয়! হাই মেনি টাইমস আই সেইড নট টু লিভ চেয়ার। গো। নেক্সট টাইম আই উইল মেক ইউ সিট অন দ্য ফ্লোর... সমী ই ই ইর হোয়াই আর টেকিং ইওর ব্যাগ, ইজ দ্য বেল র্যাং ? ইজ ইট ওভার? গো, গো টু ইওর সীট। আই মাস্ট কল ইওর গার্জেন। ডোন্ট ইউ নো দ্য রুল? আর ইউ বেবি? যতীন ... ইউ আর ভেরি স্লো। আই হ্যাভ রিপিটেড সেভারেল টাইমস দ্য সেম লাইন – ইফ দ্য প্রাইস অফ হুইট ইজ নাইন রুপি পার কিলো, দেন হোয়াট ইজ দ্য প্রাইস অফ ফাইভ কেজি হুইট অ্যান্ড সিক্স কেজি বাজরা। আই থিঙ্ক অল অফ ইউ নো হোয়াট ইজ বাজরা... দেবমাল্য টেক দিজ কপিইইস...

এক ঘন্টা চলল সেই ক্লাব পিরিয়ড। সাকুল্যে দেড়খানা অঙ্ক, আট জনের বাথরুম যাওয়া, তিনজনের জল তেষ্টা, ছজনের ছুটির কার্ড ইস্যু...

কলেজের অধ্যাপকেরা কোন আইনে বেশি মাইনে পান শুনি? এর চেয়েও কঠিন বড়দের পড়ানো???

প্রশ্নটা কি আজাইরা হল পাঠক? আর একটা কথা ক্লাসে ছেলে মেয়ের ভারসাম্য কিন্তু ভীষণ অভাব পঁয়ত্রিশটি বাচ্চার মধ্যে ৭/৮ টি মাত্র মেয়ে। এটি কোন অতীতের কর্মফল কিংবা কোন ভবিষ্যতের ইঙ্গিত!!! 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-