মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

সাত্যকি দত্ত

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
প্রতিদিন তব গাথা
মাদের বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই বিনোদদাকে দেখছি সারাদিন মালীর কাজ করে রাত হলেই গেটের কাছে লাঠি হাতে বসে থাকতে । এমনকি বৃষ্টির রাত গুলোতেও বিনোদদা সেই ভাবেই গেটের কাছে বসে থাকে । বাড়ির সবাই কত করে ধমক দেয়  , " বিনোদ এখনকার দিনে আর চোর ডাকাতের ভয় নেই । তুমি রাতে করে ঘুমিও । " বিনোদ দা হেসে বলে , " কি করি , নেশা হয়ে গেছে যে , রাত হলেই ওই গেটের কাছটা আমাকে ডাকে । না গিয়ে পারি না !  "

সেবার বিনোদ দা গ্রাম থেকে ফিরল বৌ নিয়ে , তখন কত আর বয়স হবে মেয়েটার , এই কুড়ি একুশ । আমাদের দিকের কুড়ি একুশের মেয়েরা বিছানা তোলা তো দূরের কথা , দাঁত টাও ঠিক করে ব্রাশ করতে শেখে না । কিন্তু বিনোদ দার বৌ সেই বয়সে এসে কি না কি করত - এই আচার গুলো রোদ থেকে তুলে আনছে , এই বিশাল বিশাল লেপ একা মাথায় তুলে রোদে দিচ্ছে , কিংবা গেট অবধি রাস্তাটা ঝাড়ু নিয়ে পরিষ্কার করতে গেল , আবার স্নান করে এসে রান্না ঘরে শাকসবজিও কাটতে বসে গেল । যদিও এই একটাও কাজ তার করার কথা নয় , এরজন্য আলাদা লোক ছিল তবুও মেয়েটা সব কিছুর উপর অধিকার চায় ।  

প্রথম দিনের কথা , পিসি জিজ্ঞেস করল - কী নাম তোমার ? বিনোদ দার বৌ প্রণাম করতে করতে বলল - সোনিয়া । আমারা সবাই অবাক হয়ে বললাম - কে রাখল এমন নাম? বিনোদ দার বৌ এইখানে লজ্জার নীল হয়ে গেল, দেখলাম তার নরম মুখের উপর সেই ছাপ পড়েছে । আপনারাও হয়ত ভাবছেন , " আহা কি বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে শিখেছে , আবার মালীর বৌয়ের নাম দেয় সোনিয়া । " সে আপনরা যা ভাবছেন ভাবুন , কিন্তু এখন আর গ্রামের লোকের নাম মাছি , ব্যাঙ ইত্যাদি হয় না । এক কালে হত , কারণ সেকালে ছেলেপিলে ঝাঁক ঝাঁক জন্মাত , মাছি ব্যাঙ যেমন গাদা গাদা জন্মায় , সেইরকম । ভাবতো , আলু পটল যা হোক একটা নাম রাখলে আর ছেলে পিলে জন্মাবে না । গ্রামে এখন সে দিন অপগত । 

মাঝখানে কেটে গেছে পনেরোটা বছর । ইদানীং আর বিনোদ দার বউকে দেখতে পাই না , শুনতে পাই তার শরীর বড় খারাপ , চলাফেরা করা মানা। এখন যখন রাতের বেলা বিনোদ দা গেটের কাছে বসে , বাবা দেখতে পেয়েই ঘর থেকেই চিৎকার করে - বিনোদ ঘরে যা । বিনোদ দা চুপচাপ রাধাচূড়া গাছটার তলায় তার সেই অনেক পরিচিত ঘরে ফিরে আসে । আমি ব্যালকনি থেকে দেখি , সে ঘরে আলো জ্বলেই থাকে তারপর থেকে । রাত আরও গভীর হয় , একটা সময় চোখ পড়তেই দেখা যায় সে আলো কখন নিভে গেছে আর বিনোদ দা আবার সেই গেটের পাশে চুপ করে বসে আছে , ওর হাতে হলুদ লালের রাধাচূড়া । 

আজ সকালে দেখলাম ফুলের বাগানে এক ঝাঁক প্রজাপতি তুমুল খেলা করে বেড়াচ্ছে , তাদের রঙের তীব্র কোলাহলে চারিদিক যেন মেদুরতায় ভুগছে । আমি না গিয়ে পারলাম না । ঘুরতে ঘুরতে কখন যেন চাঁপা গাছটার তলায় চলে এসেছি , তখনও সূর্যের আলো আলাপের লজ্জা কাটিয়ে ওঠেনি , সাদা সাদা ফুলের ঘ্রানে ওর তলার বাতাস ভারী হয়ে আছে । হটাত দেখলাম , কুয়ো পাড়ে বিনোদ দা বসে বসে বাসন ধুচ্ছে আর বিনোদ দার বৌ একটা ছোট কদম গাছে কোনো রকমে হেলান দিয়ে আছে । শুনলাম বিনোদ দার বৌ বিনোদ দা কে বলছে - " কেন জেদ করছ , দুটো মাত্র বাসন , আমি ঠিকই ধুয়ে নিতে পারব , আমাকে দাও । তুমি নোংরা বাসন ধুয়ে দিচ্ছ ভাবতেও ঘেন্না করছে ।  " বিনোদ দা বলল - " ঘেন্না লাগার কিছু নেই , বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর ; অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক নর । থালা বাসন ধোয়া তো এমন কিছু মহান সৃষ্টি নয় , এটা একটা সাধারণ সৃষ্টি । বিশ্বে যা কিছু সাধারণ সৃষ্টি তাতে নারীর অধিরকার থেকে পুরুষের অধিকার বেশি । নারীর অধিকার চিরকল্যাণকর সৃষ্টিতে । " বিনোদ দার কথা আমাকে শিউড়ে দিল , বিনোদ দা কিছু পড়াশুনা করেছে বলে জানি , কিন্তু ঠিক কত দূর পড়েছে ও ? বিনোদ দা কি রবীন্দ্রনাথ নজরুল পড়ে ? পড়ে সে ভাব আত্মস্থ করার চেষ্টা করে ? কিন্তু আজ যেন বিনোদ দার এই সামান্য অনুভবের কথা গুলো নজরুলের থেকেও সম্পূর্ণ বলে মনে হলো । 

স্পষ্ট দেখলাম বিনোদ দার বৌয়ের চোখ ভিজে উঠল , কেন যে ভিজে উঠল সে হয়ত নিজেও জানে না । আমি জানি , এখন সে চোখের জল লুকানোর জন্য ঘুরে দাঁড়াবে । আর দাঁড়ালাম না , তরল সবুজ ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম , আমার পাঞ্জাবিতে তখনও চাঁপা ফুলের গন্ধ ।

Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-