মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৮, ২০১৭

তপশ্রী পাল

শব্দের মিছিল | নভেম্বর ২৮, ২০১৭ |
Views:
প্রতিশ্রুতি
ও সোনা বন্দে আমারে পাগল করিল 
সোনা বন্দে আমারে দেওয়ানা বানাইলো 
কি জানি কি মন্ত্র পড়ি জাদু করিল 
সোনা বন্দে - 

ন্যান্য দিনের মতোই বেলার দিকে সিঙ্গুর কারখানার গেট এ জমায়েত হয়েছিল নেতাই ও তার বন্ধুরা। এখানেই কিসের অভ্যাস মতো রোজ চলে আসে সে ও তার মতো জনা দশ পনেরো মানুষ। বসে বসে নিজেদের দুঃখ, নিজেদের আশা, নিজেদের অতীত আর ভবিষ্যতের চিন্তার জাবর কাটে। আজ হঠাৎ দোতারা নিয়ে হাজির হয়েছিল কল্যাণ বৈরাগীও। তার গলায় হাসন রাজার গান শুনে নেতাই এর মনে হলো তারাও তো একদিন কার মন্ত্রে বা জাদুতে দেওয়ানা হয়ে আর প্রতিশ্রুতি তে বিশ্বাস করে এগিয়েছিল - সেই মরীচিকার খোঁজ আজও মেলে নি। 

সিঙ্গুরের হাজার চাষির মতো নেতাইএরও সোনা ফলানো জমি ছিল সিঙ্গুরে। ক্ষেতের পাশেই ছোট্ট চালা ঘরে নেতাইয়ের বৌ নেত্যকালী, ছেলে মনোজ ও সূরজকে নিয়ে ভালোমন্দে চাষ বাস করে দুটি খেয়ে পরে দিন কাটতো নেতাইয়ের। নেতাই ঠিক করেছিল তার ছেলেরা তার মতো চাষি হবে না। তাদের লেখা পড়া করিয়ে মানুষ করবে সে। তাই বড়ো ছেলে মনোজ কে কলকাতায় মামাবাড়িতে পড়তে পাঠিয়েছিল। অনেক কষ্টে পড়ার খরচ যোগাতো। ছোট সূরজ গ্রামের ইস্কুলেই পড়তো।

মনোজ যেবার দশ ক্লাস ফার্স্ট ডিভিশন এ পাস করলো, সেই বাড়ি তাদের গ্রামে এসেছিলো গাড়ির কোম্পানি প্রথম জমি সার্ভে করতে। তারপর এলো পার্টির দাদারা। ততদিনে নিতাইয়ের টাকার প্রয়োজন প্রচুর। বড়ো ছেলে মনোজ ইঞ্জিনিয়ারিং এ সুযোগ পেয়েছে। যা তাদের পক্ষে স্বপ্ন। কিন্তু পোড়ানো ক্ষমতার বাইরে। পার্টির দাদারা বললো "সিঙ্গুর বদলে যাবে। বড়ো কোম্পানি বিরাট গাড়ির কারখানা বসাবে। এখন তোমাদের সাহায্য দরকার। তোমরা যদি জমি দাও, তবেই হবে কারখানা। দেখো, পশ্চিমবঙ্গে শিল্প নাই, শিল্প না হলে শুধু চাষ করে তোমরা ক পয়সা পাবে? কারখানা হলে তোমরা চাকরি পাবে, জমির পয়সাও পাবে। কেউ গরিব থাকবে না আর - এই আমাদের প্রতিশ্রুতি" নেতাই এর কিছু বন্ধু বান্ধব তো ক্ষেপে উঠলো। "কি ! জমি নেবে ! আমাদের তিনফলা বাপ পিতামোর জমি ভিটে ! মরে গেলেও দেব না। জমি আমাদের মা ! আহা ! চোখ ভরানো সবুজ ফসল ফলে, আমাদের পেটের ভাত যোগায় !" তারপর অনেক মিটিং, মিছিল কাজিয়া হলো, মারপিট হলো। কেউ খুশি হয়ে জমি দিলো, কারোটা কেড়ে নিলো। নেতাই কিন্তু বিশ্বাস করেছিল প্রতিশ্রুতিতে। সে পার্টির পাশে ছিল। তাই যখন বিশাল কারখানা দেখতে দেখতে মাথা তুললো তখন তার গর্বের শেষ ছিল না। তার বসত বাড়িতে হাত পরে নি। শুধু জমির বেশিরভাগ চলে গেছিলো কারখানার মধ্যে। বদলে সরকারি অফিস থেকে নিয়ম মতো কিছু টাকার চেক পেয়েছিলো নেতাই আর কারখানায় কাজের প্রতিশ্রুতি। একসঙ্গে একথোকে সেই টাকাই কাজে এসেছিলো তার - ছেলেকে প্রাইভেট কলেজ এ ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি করতে পেরেছিলো। তারপর একদিন পার্টির দাদারা বললো "চলো তোমাদিগের কজনের ফিটার ট্রেনিং হবে। তারপর ফিটার এর কাজ পাবে কারখানা চালু হলে - আর ট্রেনিং এর সময়ও হাতখরচ পাবে। "

চলে গেলো চাষি নেতাই শ্রমিক হতে। ট্রেনিং হলো, শেখা হলো। হঠাৎ একদিন দেখে কারখানা গেট এ মহা হৈচৈ। পুলিশ,অন্য অন্য পার্টির লোকজন, কাগজের লোকজন, ফটো তোলা দাদারা, টিভির লোক কে নেই? আর আছে জমি দিতে না চাওয়া চাষিরা। ধন্নায় বসে গেছে সবাই। কাউকে ঢুকতে দেবে না কারখানায়। দিন গেলো, মাস গেলো। রাজায় রাজ্য যুদ্ধ হলো, উলুখাগড়ার প্রাণ গেলো। একদিন শুনলো কারখানা তুলে বাবুরা গুজরাট চলে যাবে। হায় তাদের জমিও গেলো কাজ ও গেলো। তারপর কতদিন কেটে গেলো। এই বিরাট কারখানার ভিতর এখন কুকুর ঘোরে, গরু ছাগল চড়ে। রাত বিরেতে মাস্তানরা বসে মদ গাঞ্জা খায় - জমি এখন পাথর বাঁধানো কংক্রিট। নেতাই আর তার সঙ্গে ট্রেনিং নেওয়া ক জন রোজ ই গেট এ আসে নতুন কিছু শোনার আশায়। 

নেতাইয়ের বড়ো ছেলে মনোজ পাস করে চাকরি পেলো ইনফোসিস কোম্পানি তে। চলে গেলো সেই বেঙ্গালুরু। কতদূরে ! নেতাই কোনোদিন পৌঁছতে পারবে না সেখানে। নেতাই কে কোনো সাহায্য পাঠায় না ছেলে। বললে বলে "ওখানে অনেক খরচ ! নিজেরই চলে না, দাঁড়াও ক দিন বাদে টাকা পাঠাবো !" সে দিন আর আসে না। 

ছোট ছেলে সুরজের পড়াশুনো বেশিদূর হয় নি। ইস্কুল ফাইনাল ফেল করার পর নেতাই এর আর পোড়ানোর সাধ্য হয় নি। কিন্তু নতুন পার্টির সঙ্গে সুরজের খুব খাতির। ইদানিং সুরজ এর হাতে অনেক কাঁচা টাকা দেখতে পায় নেতাই। বৌ নেত্যকালী বলে "তোমার ছেলে জমি বাড়ির দালালি করছে। ভালো হয়েছে। ওতেই এখন টাকা !" সেদিন সুরজ বললো "বাবা ! সিঙ্গুর বাজারে আমাদের অফিস ঘর হয়েছে। শিগগির একটা জমি দেখছি। বাড়ি তুলবো। নিয়ে যাবো তোমাদের। নেতাই এর মনে ঢেউ তোলে নতুন প্রতিশ্রুতি। কিন্তু না। কানাঘুষো শোনে নতুন পার্টির কোন দাদার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে সে। নতুন বাড়ি করে বৌ নিয়ে চলে যাবে সেখানে। নেতাই শ্বাস ফেলে। দিন কাটে। আজকাল বৌ এর শরীর ভালো যাচ্ছে না। থেকে থেকে জ্বর আসে, বুকে সারাক্ষণ কাশি। শহরে নিয়ে না গেলে চিকিৎসা হবে না। 

বড়ো ছেলেকে লিখেছিলো নেতাই। বড়ো ছেলে বললো ইনফোসিস শিগগির কলকাতায় আসবে। এলে সে এখানে চলে আসবে। বাবা মাকে কলকাতায় নিয়ে আসবে। চিকিৎসা করাবে। প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছিল নেতাই। কিন্তু ইনফোসিস আসে নি। মনোজ বললো তারা যে সুযোগ সুবিধে চেয়েছিলো তা নতুন পার্টি দেয় নি, তাই তারা আসে নি। জমি নীতি, SEZ কত কি বললো মনোজ। কিচ্ছু বোঝে নি নেতাই। সে সার বুঝেছে এখানে কেউ আসবে না। কিন্তু কোনো পার্টি ই তো মানুষের খারাপ চায় না , চায় নি ! তার ছোট্ট মাথা তো তাই বলে। এক পার্টি কারখানা করতে চেয়েছিলো, অন্য পার্টি গরিব চাষিদের জমি ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলো , ইনফোসিস কে আনতে চেয়েছিলো - তবে কিছু হলো না কেন? কেউ এলো না কেন ? কে এর জবাব দেবে? আবার এই বাজারে সুরজ তো পড়াশুনা না করে, চাষবাস না করেও দিব্যি করে খাচ্ছে - একে কি বলবে নেতাই ! তার মতো গরিব তো গরিব ই রইলো - জাদু প্রতিশ্রুতি মরীচিকার মতো মিলিয়ে গেলো।


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-