বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

তুষার কান্তি দত্ত

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
Views:
মাইরুং
পথের সঞ্চয় 
ফেলে রেখে পথে
আরো দূর... বহু দূর...
একা একা পায়ে 
রাস্তা এগোয়

ঢালুপথ উঁচু নীচু
ছড়ানো প্রস্তর 
সময়ের খন্ডচিত্রে 
পাললিক স্তর..... 

এবারের যাত্রাপথে মাইরুং নতুন ট্রাভেল ডেস্টিনেশন। অল্পচেনা এই গ্রামে আসতে গেলে পেডং কিম্বা কালিম্পং থেকে গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে। কাগজে কলমে ২০১৬ সাল থেকেই এখানে ট্যুরিজিম শুরু হয়েছে সেবাস্টিয়ান প্রধানের নেতৃত্বে। 

সেবাস্টিয়ান প্রধান পূর্ব-সিকিম ট্যুরিজিমের প্রবাদ পুরুষ। তার চেষ্টাতেই সিলেরিগাঁও, রেশিখোলা, পেডং, আরিটার, জুলুখ কুপুক, ও নাথং ভ্যালিতে প্রসার লাভ করেছে পর্যটন শিল্প।

৫-১০-১৭তে আমরা রেশিখোলার সেবেস্টিয়ানের লজ থেকে ৮০০ টাকায় একটা বোলেরো রিজার্ভ করে চলে এলাম বাল্লাখানিতে। এখান থেকে হাঁটা পথ। জঙ্গলের মধ্যদিয়ে ১কিমি নীচে নেমে গেলে মাইরুং গ্রাম। ছবির মত এই গ্রাম থেকে উত্তর সিকিমের জুলুখ কুপুক দেখা যায়। দেখা যায় আরিটার, লিংসে, কাগে, রেনক আর পেডংকে। আকাশ পরিস্কার থাকলে পাকিওং ও গ্যাংটক শহরকে দেখা যায়। উত্তরে পাহাড়ের দিকে মুখ করে তাকালে হাতের ডানদিকের জঙ্গল ঘন অন্ধকার। এটাই নেওড়া ভ্যালি রেঞ্জ। হাতে সময় থাকলে তেনদ্রাবুং হয়ে চলে যাওয়া যায় ডুকাতে। ডুকায় সুন্দর একটা জলপ্রপাত আছে। মাইরুং থেকে ডুকা, যাওয়া আসা ৩/৪ ঘন্টা সময় লাগে। ইচ্ছে করলে এখান থেকে লাভাতে চলে যাওয়া যায়, গাড়ি রিজার্ভ করে। শেয়ারে গাড়ি পাওয়া যায় এখান থেকে আলগাড়া কিম্বা কালিম্পং এ যাওয়ার জন্য। 

পেডং থেকে আমাদের রিজার্ভ করা গাড়িটা আমাদের বল্লাখানি স্টপে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো। 

পাশাপাশি ছোট্ট দুটি ঘর। বড় বড় বিছানা। ঘরের ভেতরে ব্যাগ আর জলের বোতল রেখে চলে এলাম বাইরে। দুরে পাহাড়ের মাথায় তখন মেঘের টুকরো টুকরো ভেলা। ঠান্ডা বাতাস। আর একটানা ঝিঁঝিঁ ডাক। আজ সকালে রেশিখোলা থেকেই স্নান করে এসেছি। ব্যালকনিতে একটা চেয়ার টেনে বসে সিগারেট ধরাই। টেবিলের উপরে ধোঁয়া ওঠা গরম চা রেখে যায় রাজেশ। 

সন্ধ্যা নামার কিছু আগে পাহাড়ে তখন এক অদ্ভুত স্বর্গীয় নিস্তব্ধতা.... 

যৌবনের দামালপনা যেমন বার্ধক্যে একটু একটু করে কমে আসে। ঠান্ডা হাওয়ার দাপটে ধোঁয়া ওঠা গরম চা তেমনি করেই উষ্ণতা হারাচ্ছিল ক্রমাগত....

বাড়ির মালিক কুশন আর তার বউ ডোমা তামাং। কুশনের দুই ছেলে অজয় তামাং আর রাকেশ তামাং। চারজনের সুখি পরিবার। কুশনরা বৌদ্ধ ধর্মালম্বি। নীচের বস্তিতে থাকে। আমরা আসবো বলে, আজ ওরা এখানে এসেছে। এটা ওদের একটা খামারবাড়ি। বাইরের উঠনে প্রেয়ার ফ্লাগ। ঠান্ডা বাতাসে কেঁপেই চলে পতাকাগুলো। ওয়াইফাই সাউন্ড সিস্টেমে একটা চেনা সুফি গান। 

বিকেলের বৈকালিক আড্ডায় সেদিন ছিল কোয়াশের তৈরি একদম ট্রাডিশনাল পাহাড়ি মোমো। বায়নাটা রাজাই করেছিল। রাজা আমাদের কনিষ্ঠ পার্টনার। রাজেশের মা ডোমা তামাং নিজে হাতে বানিয়েছিল গরম গরম মোমো। সাথে ছিলো ঠোটনের চাটনি। ঠোটনে লম্বা পাতাযুক্ত একধরনের পাহাড়ি গাছ।

সেদিন, মাইরুং এ যাবার পথে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে রাজেশ একটা গাছের ডাল ভেঙে ছাল ছাড়িয়ে খেতে বলে। মুখে দিতেই অদ্ভুত এক টকটক স্বাদ। পরে জেনেছিলাম ওই গাছটাই ঠোটনে। পাহাড়ের ঢালুপথে নামতে নামতে ফোন করি কুশন কে। কুশনের ছেলে রাজেশ আমাদের রিসিভ করতে চলে এসেছে। বন্ধু বিশ্বজিৎ এর লাম্বার পেইন। তাই ওর ব্যাগ আর জলের জারকিনটা তুলে দিলাম রাজেশের হাতে। পথ দেখিয়ে রাজেশ আমাদের নিয়ে চললো তাদের কটেজে। এবারের সিজিনে মাইরুং এ আমরাই প্রথম ট্যুরিস্ট। পাহাড়ে বন্ধের কারণে এবারে ট্যুরিজিম ব্যবসা শেষ।

পথের শেষে পড়ে থাকে শুধুই একটা নদী। ছড়ানো পাথর আর বালির বুকে বাঁশের সাঁকো জুড়ে দেয় নদীর এপার ওপার। সকালের সোনা রোদ টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পরে চারিদিকে। ঘন বন পাহাড় চিক চিক করে। নদীতে পা-ডুবিয়ে বসে কেটে যায় সারাবেলা। মন কেমন করা দুপুর গুলো স্বচ্ছ জলের অবগাহন, আর একলা রাত্রি গুলোতে সঙ্গী হয় জলের একটানা শব্দ। কান পাতলেই জলের পতন.... নিস্তব্ধ অন্ধকারে জলের শব্দ জেগে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। যতক্ষন না ঘুম আসে চোখে। 

রাতের অন্ধকারে কুকুরের ডাক উপত্যকায় ছড়িয়ে দেয় রহস্যের গন্ধ। সাথে সঙ্গী ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা শব্দ... ব্যালকনিতে পা দুলিয়ে মোবাইল টাওয়ারে রাজা খোঁজে তার পাগলিকে। আর আমাদের সাথে জেগে থাকে অঞ্জনের পুরনো গীটার। বিনিদ্র রাত্রিগুলো আমার একার। 

কিভাবে যাবেন
______________

শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটকগামী গাড়িতে চেপে রংপো পর্যন্ত গিয়ে রংপো থেকে রিজার্ভ গাড়িতে রেনক বাজার হয়ে চলে আসা যায় রেশিখোলায়। সরাসরি শিলিগুড়ি থেকেও গাড়ি রিজার্ভ করে আসা যায়। 

মাইরুং এ আসতে গেলে বাল্লাখানি পর্যন্ত গাড়ি রিজার্ভ করতেই হবে। সেক্ষেত্রে পেডং, রেশিখোলা বা কালিম্পং যে কোন জায়গা থেকেই এখানে আসা যেতে পারে।

কোথায় থাকবেন
______________

রেশিখোলা
প্রধান লজ
সেবাস্টিয়ান প্রধান
ফোন নম্বর - ৯৯৩২৭-৪৪৪০৭, ৯৬৭৯৯-২৮৫৪৪

গ্রেস রিসোর্ট
রাজ তামাং
ফোন নম্বর - ৯৯৩২০২৮২৯৭, ৯৮০০৬৯৯৮৬০

মাইরুং
তামাং সাংবু হোমস্টে
কুশান তামাং
ফোন নম্বর -- ৮০১৬৪৮০৬৮৪,  ৮৯০৬২৪০৬২৩, ৯৯৩৩১৮৭৯৮৪


Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-