বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৬, ২০১৭

তপশ্রী পাল

শব্দের মিছিল | অক্টোবর ২৬, ২০১৭ |
Views:
পাথরের চোখ
"দাদু তোমার ডান চোখ টা নড়ে, বাঁ চোখ টা নড়ে না কেন? ওরকম বড় হয়ে থাকে !" রিনরিনে গলায় জিজ্ঞাসা করলো ছোট্ট বাবুই। তাড়াতাড়ি কালো চশমাটা পরে নিলেন ডাক্তার সোম। ক্লিষ্ট হেসে বললেন "ওই চোখটা যে পাথরের দাদুভাই !" চোখ গোলগোল হয়ে গেলো বাবুইয়ের। "তোমার চোখ পাথরের কেন ! তুমি দেখতে পাও !" "না দাদুভাই, ওই চোখে তো দেখতে পাই না, অন্য চোখটা দিয়ে দেখি। তোমার সুপারম্যানের আছে এরকম চোখ ! এটা দিয়ে আমি দুষ্ট লোকদের দিকে তাকালে তারা ভয় পায় !" হাঃ হাঃ করে হেসে তিন বছরের নাতির মন ভুলিয়ে দিলেন ডাক্তার সোম।

বাইরে বন্ধুদের ডাকে বেরিয়ে গেলো বাবুই। আজ সবাইকে বলতে হবে দাদুর এই স্পেশাল চোখের কথা। 

ডাক্তার সোম এর মন চলে গেলো সেই উত্তাল সত্তরের দশকে। তখন তিনি ডাক্তারি পড়ছেন। দাদা কুনাল তখন পুলিশ অফিসার। দুই ভাই থাকতেন গড়িয়াহাটের কাছে একচিলতে ভাড়া বাড়িতে। আর ঘরে ছিল দাদার সুন্দরী বৌ - বৌদি সুনীতি। প্রথম থেকেই বৌদির সঙ্গে এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল মৃনালের। বৌদির যৌবন, তার সৌন্দৰ্য আকর্ষণ করতো মৃনালকে। কিন্তু সেকথা কখনো জানতে দেয় নি কাউকে মৃনাল। বৌদিকে বিভিন্ন ইংরেজি বইয়ের গল্প বাংলায় শোনানো ছিল মৃনালের অবসর সময়ের কাজ। বদলে বৌদির হাতের দারুন সব রান্না প্রথমেই চাখতো মৃনাল ! আর প্রশংসা করলে খুশিতে লাল হয়ে উঠতো বৌদি। ছুটির দিনে বৌদির সঙ্গে সিনেমা দেখতে যেত মৃনাল। এইভাবে আনন্দে কেটে যাচ্ছিলো দিনগুলো। যেদিন শুনলো বাড়িতে নতুন অতিথি আসছে , কি খুশি যে হয়েছিল মৃনাল - ঠিক করলো ছেলে হলে নাম রাখবে মৃন্ময় আর মেয়ে হলে মিনতি।

দাদা কুনালের ছিল ব্যস্ত রুটিন। রাত বিরেতের আগে কখনো বাড়ি ফিরত না। দাদার মুখে সারাক্ষণ টেনশনের ছাপ। কিরকম যেন আনমনা হয়ে থাকতো সারাক্ষণ। মৃনাল জিজ্ঞাসা করলে একদিন বললো "শিক্ষিত ভালো ছেলেগুলো বিপথে যাচ্ছে রে ! একদল লোক ভুল বুঝিয়ে ওদের মাথাগুলো খেলো ! বিপ্লব করছে সব। কি নৃশংস ভাবে মানুষ মারছে বিপ্লবের নামে। আমাদের ওপরেও কড়া নির্দেশ ওদের ধরতে হবে ! তা ধরা কি দিতে চায় ? ইচ্ছে না থাকলেও গুলি চালাতে বাধ্য করে। আর ভালো লাগে না এই চাকরি ! ছেড়ে দেব এবার। "

তারপর সেই ভয়াবহ রাত !! ভাবলেই কেঁপে ওঠেন ডাক্তার সোম। সেদিন ফিরে খেতে বসেছিল দাদা। বৌদি সযত্নে পরিবেশন করছিলো। এমন সময় বাইরের দরজায় প্রথমে টোকা, তারপর কিল চড় লাথি পড়তে লাগলো। বৌদি দাদাকে দরজা খুলতে বারণ করলো প্রানপন ! কিন্তু দাদা হাত ধুয়ে দরজা খুলে দাঁড়ালো ! "বেরিয়ে আয় বুর্জোয়া আর শ্রেণী শত্রূ দের দালাল !" পাগলের মতো দাদার পিছন পিছন বেরোলো মৃনাল। দ্যাখে দূরে নিয়ে গিয়ে দাদাকে উপুড় করে লাঠি দিয়ে নৃশংস ভাবে মারছে ওরা ! দিগ্বিদিগ ভুলে ছুটে গেলো মৃনাল। আটকে ধরলো একজনের লাঠি। হঠাৎ অন্য আরেকজনের লাঠির আঘাত এসে পড়লো তার বাঁ চোখে ! অন্ধকার হয়ে গেলো চোখ। জ্ঞান ফিরেছিল দু দিন পরে হাসপাতালে। এক চোখে বিশাল ব্যাণ্ডেজ , অন্য চোখ দিয়ে ঝাপসা দেখেছিলো সামনে বৌদিকে।

চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়ছিলো বৌদির। সেদিনের পরে দাদাকে আর দেখেনি মৃনাল। ভালো হয়ে যখন বাড়ি ফিরলো তখন বৌদির অবস্থা দেখে নিজের চোখ হারানোর যন্ত্রনা ভুলে গেছিলো মৃনাল। বৈধ্যব্যের সাদা পোশাকে কি পবিত্র কি অসহায় দেখাচ্ছিল বৌদিকে। দাদার জমানো পি. এফ আর গ্রাচুইটির টাকা শেষ হতে বেশি দেরি হলো না। ডাক্তারি পড়ার খরচ চালাতে পাগলের মতো টিউশন করতে লাগলো মৃনাল। বৌদি সেলাইয়ের কাজ করতে লাগলো দোকানে। তারপর এতো দুঃখের মধ্যে ঘরে এলো ফুটফুটে মিনতি। এক চিলতে ভাড়া বাড়িতে আনন্দের বান ডাকলো। চোখে সর্বদা কালো চশমা পরে থাকতো মৃনাল। খুব অসুবিধে হতো পড়াশুনো করতে। তও এমনি করেই একদিন ডাক্তারি পাস করে সরকারি হাসপাতাল জয়েনও করলো মৃনাল। ক্রমে সংসার চলতে লাগলো তারই টাকায়।

এর মধ্যেই একদিন কান্না কাটি করতে লাগলো বৌদি। পাড়ার লোকেরা নানা কথা বলছে দেওর বৌদির সম্পর্ক ঘিরে। বৌদি বললো " তোমার জন্য আমি মেয়ে দেখছি। তুমি এবার বিয়ে করে নিজের ঘর বাঁধ। কতদিন আমাদের জন্য আত্মত্যাগ করে পড়ে থাকবে ?"

কিন্তু না ডাক্তার সোম কোনো কেয়ার করেন নি লোকের কথার। হেসে বৌদিকে বলেছেন "আমার এই কানা চেহারা দেখে কোন মেয়ে বিয়ে করবে বোলো তো !" ডাক্তার মৃনাল সোম তার জীবনের ব্রত নিয়েছেন ভাইজি মিনতি কে মানুষ করার। আর কেউ না জানুক, তিনি নিজে জানেন বৌদিকে ছেড়ে আর কোনো দিন কোনো মেয়েকে ভালোবাসতে পারবেন না। কিন্তু তাও এক অভেদ্য দেয়াল তাদের সম্পর্কের মধ্যে। একদিনের জন্য ও বৌদির ঘরে যান নি বা তাঁকে স্পর্শ করেন নি ডাক্তার সোম। কেবল বৌদির ঐকান্তিক অনুরোধে চোখের গর্তটা বুজিয়ে নিয়েছেন এই পাথরের চোখ দিয়ে, যাতে তার চেহারা দেখে ভয় পেয়ে না যায় মিনতি। মিনতিকে মেয়ের মতো স্নেহে মানুষ করলেন, এম এ পাস করালেন ডাক্তার সোম। তারপর ডক্টরেটে করলো সে ! আজকের ডাক্তার মিনতি সোম। লেকচারার হিসেবে জয়েনও করলো কলেজ এ। তারপর একদিন সুন্দরী মিনতিকে বরণ করে নিলো যাদবপুর উনিভার্সিটির প্রফেসর অমলেন্দু। ঘরে এলো ছোট্ট বাবুই। কিন্তু আজও বৌদির এই সংসারে এই এক চিলতে ভাড়ার ঘরে পড়ে আছেন ডাক্তার সোম। ত্যাগ করেছেন সবকিছু তার লুকোনো অব্যক্ত ভালোবাসা সুনীতির জন্য। কত কথা বলতে চায় তার চোখ দুটি, কিন্তু কিছুই ব্যক্ত করতে পারে না তার পাথরের চোখ। বিকেলে এখনো নাতি বাবুইকে চিলড্রেন্স লিটল থিয়েটারে দিয়ে আসা তার কাজ, তাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার দায়িত্বও তার। 

কাঁধে কাপড়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লান্ত ভাবে হেঁটে চলেন বাবুইয়ের কাকাদাদু চোখে কালো চশমা পরে ডাক্তার সোম। আজকাল আর ডাক্তারি করেন না। 



Facebook Comments
0 Gmail Comments

-

 
ফেসবুক পাতায়
Support : Visit Page.

সার্বিক অলঙ্করণে প্রিয়দীপ

Website Published and © by sobdermichil.com

Proudly Hosting by google

শব্দের মিছিল > English Site best viewed in Google Chrome
Blogger দ্বারা পরিচালিত.
-